আনসারউদ্দিনের গল্প : নেনিনের মা

পঞ্চায়েত নির্বাচনের মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। পাড়ায় পাড়ায় ঘন ঘন বৈঠক, মিটিং মিছিল বক্তৃতা। মাটির দেওয়ালে বড় বড় হরফে প্রাথীদের সমর্থনে পোস্টার। ভোটের আবেদন। মাটির দেওয়ালে জেল্লা ফেরে এ সময় রঙ-বেরঙের লেখার কারুকার্যে। কোথাও কাস্তে-হাতুড়ি, কোথাও কাঁটা হাত, কোথাও বা পদ্মফুল, তীর ধনুক। কে একজন দাঁড়িয়েছে কঁঠাল নিয়ে। পোস্টারও পড়েছে অল্পবিস্তর। দেখে মনে হয় সদ্য গাছ থেকে পেড়ে এনে কেউ ঘরের দেওয়ালে লটকে দিয়েছে। সামান্য কঁঠালও যে মাটির দেওয়ালে এত সুন্দর করে আঁকা যায় ভোট না হলে কেউ বুঝি বিশ্বাস করত না। অচেনার ছেলেটা ঐ ছবি দেখেই কদিন ধরে কঁঠাল খাওয়ার বায়না জুড়েছে। ঠাস ঠাস চড় মেরে ফলটার স্বাদ পাল্টে দিতে চেয়েছিল অচেনা। অচেনা এবার প্রার্থী গ্রাম পঞ্চায়েতে। জিতলে পঞ্চায়েতের মেম্বার হবে। হারলে? কিছুতেই হেরে যাবার কথা চিন্তা করতে পারে না সে। দাঁড়াতেই চায়নি ভোটে। স্বামীহারা বিধবা সে। বয়সের তাতে পরপুরুষেরা চোখ টাটায়। অচেনার শরম লাগে। তার নাম মানুষের মুখে, ঠোঁটে। পুরুষদের আড্ডায়। মেয়েদের পুকুরঘাটে উকুন বাছাবাছির মজলিসেও। অচেনাকে চিনতে বাকি নেই কেউ। শুধু কি তাই। অচেনার নাম এখন গরমেন্টের খাতায়। কাঁপা কাঁপা মেয়েলি কাঁচা হাতের বুপোটে নিজের নামটা সই করতে পেরেছিল মনোনয়ন পত্রে। তারপর থেকেই অচেনার ঘুম নেই। চোখের পাতায় পাতায় প্রতিদিন জিইয়ে রাখে রাত আর অন্ধকার। মুখে হাই ছেড়ে রাতের নৈঃশব্দের কাঁপন লাগায় অচেনা। কাঁপন বুকেও। কেন সে দাঁড়াতে গেল ভোটে। সেদিন যদি সন্ধেবেলা পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে না পড়ত জলিল। যদি না বলত, ভাবীজান গো, বড় বিপদে পড়ে এলাম। বিপদ। শরীরটা ঝুঁকি দিয়ে দিয়ে উঠেছিল অচেনার। ছড়িয়ে পড়েছিল জলিল সহ শুকুরালি হেবুল বিলাতের বোঁটকা ঘামের গন্ধ। খুপরী ঘরের কোণে আরও সরে বসে ছিল ও। হাঁটু থেকে কাপড়টা নামিয়ে দিয়েছিল পায়ের পাতায়। জলিল বলেছিল ভাবী একটা কথা তুমাকে রাখতেই হবে। বলো– রাখবে? সরে এসে গলা লতিয়ে দিয়ে কান খাড়া রেখে মোক্ষম উত্তরটা শোনার অপেক্ষায় শুধিয়েছিল আবার।
ভয়ে কাঠ আড়ষ্ট হয়ে উঠেছিল অচেনা। চার চারটি জোয়ান যুবকের খেজুর চাটায়ের উপর বসিয়ে রাখা প্রসারিত তালু চার জোড়া জ্বলন্ত চোখের জিজ্ঞাসু। আতঙ্কে লম্পোর সলতেটা বাড়িয়ে দিয়ে ঘুমন্ত শিশুটাকে কাঁদিয়ে কোলে বসিয়ে সাপটে ধরে জিজ্ঞাসা করে, কি?
– আমাদের কথাটা রাখতে হবে ভাবী। বলো, ফেরাবে না?
এমন করাল কষ্টিতে কেমন সন্দেহ হয়েছিল ওর। কে জানে কি কথা। তবু বলেছিল, রাখবার মতো হলেই রাখবো! ঘাড় তুলতেই অচেনা দেখেছিল, ওদের চোখের তারায় তারায় কম্পমান আগুনের শিখা।
অচেনার কথায় চার চারজন যুবক নড়ে বসে। সামনে থেকে জলিল গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বললে — ভোটে দাঁড়াতে হবে তুমাকে?
আমাকে?
হ্যাঁ ভাবী, তুমাকে। জাবের ভাই আমাদের ভালো কমরেড ছিলো।
আমি পারব না। আমি মেয়েমানুষ।
মেয়েমানুষ বলেই বলছি। গরমেন্টের আইন শতকরা তিরিশ ভাগ আসনে মেয়েরা প্রার্থী হবে।।
উকুরালি বললে — কুন্নো ভয় নেই। তুমার জন্য আমরা জান লড়ে দেব। গভমেন্ট মেয়েদের ইজ্জত দিয়েছে। স্বাধীনতা দিয়েছে। ঘোমটা দিয়ে ঘরে বসে থাকার দিন নাই।
শুকুরালির শেষ কথাটার ইঙ্গিতে আপত্তি জানিয়ে থামিয়ে দিল জলিল, জানো ভাবী, মেম্বার হলে তুমার কাজটা তো আমরাই করব। শুধু বাড়ি বসে সই করে দেবে।
কোলের উপর বসে থাকা বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গিয়েছে যখন অচেনা ভেবেছে আকাশ পাতাল। মাথার উপর মানুষ নেই। জীবন যে তার ভেসে আছে নিরালম্ব শূন্যতায়। এক পা ঘরের বাইরে বাড়াতে হাজারো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, মানুষের কটু কথা, অবিশ্বাস, সন্দেহ। অচেনা ঘেমে ওঠে। জলিল তাড়া লাগায় – জবাব খোলো ভাবী। আবুতালিবের মেয়ে মনচেহারা শেষ পর্যন্ত ফেসাদে ফেললে। প্রার্থী হবার কথা ছিল তারই। কিছুক্ষণ আগেই আবুতালিব আমার বাড়ি এসে বলল – বাপু, কিছু মনে করো না এলেমনগরে মেয়ের আমার বিয়ের কথা চলেছে। বোঝোই তো কাচা কাপড় আর যাচা কন্যে। এখন যদি শোনে, মেয়ে ভোটে নড়ছে সব কিছু কেঁচিয়ে যাবে। এরপর তুমিও যদি অমত করো ভাবী মধ্যে থেকে কাশিমের বউ ছকিনা বিনি ভোটে বেরিয়ে যাবে। জলিল অসহায় ভাবে নিজের হাত কচলাতে থাকে। অচেনা পুরুষ মানুষ হলে হয়তো এতক্ষণ হাত দুটো জড়িয়ে ধরত।
জলিলের কথা শেষ হতেই বিলাত বললে – কাশিমের বউ ছকিনা মেম্বার হলে আর কুনোদিন ইলিপ পাবে?
হরকিসিমের অনুরোধ আর প্রশ্নের ফাঁসে গলা শুকিয়ে আসছিল অচেনার। এতদিনে রিলিফ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে জলিল। বিধবা পেনশনের টাকা সেও তো পেয়েছিল পঞ্চায়েত থেকে। লোকটা মরে যাবার পর থেকেই এরাই জ্যান্ত রেখেছে তাকে। এদেরকে কেমন করে বিমূখ করে সে? ছকিনার স্বামী ছকিনাকে ভোটে দাঁড়াতে অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু তাকে? ঘুমন্ত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃত স্বামীর আদলটা মনে করার চেষ্টা করে অচেনা। সুন্দর স্বাস্থ্য ছিল তার। প্রসারিত বুকের ছাতিতে ছিল এক পরম নির্ভরতা। লাল পতাকার লাঠিতে কাঁধ বাঁধিয়ে ভোটের মিছিল করত। লোকে বলত, জাবের সি পি এম।দলের লোকেরা বলত কমরেড। কোলকাতায় জ্যোতিবাবুর মিছিলে যেত কখনো কখনো। ভোরের ট্রেনে বাড়ি ফিরত ঘাম জবজবে গায়ে। আজও ভোরে দূরে ট্রেনের সিটি বাজলে অচেনার শরীরে কাঁপন জাগে। অচেনা উঠে বসে। আলো জ্বালে। একজন মানুষ কমরেড হয়ে বাড়ি ফিরবে। মিছিল গেয়ে বসে যাওয়া গলাটা সারাতে সে রাতেই নুন-জল গরম করা। ভাঙা ভাঙা গলায় রেলগাড়িতে বিনে পয়সায় চড়ার অভিজ্ঞতা। মাথার পাক খুলে পড়া কোলকাতার আকাশ-ঘেঁষা অট্টালিকার বিবরণ। মিটিং-এর ফঁকতালে দেখে আসা যাদুঘর-চিড়িয়াখানা রাজভবন পাতাল রেল নাখোদা মসজিদের গল্পের বিনুনী। মনে আছে অচেনার একদিন বলেছিল,তুমারে একদিন লিয়ে যাব কোলকেতাতে।। টিক্সি গাড়ি চড়ে দেখবে কি বাহার! কি বাহার!
স্বামীকে এই মুহূর্তে খুব বেশি করে মনে পড়ে অচেনার। ভোট মিছিল কোলকাতার সমাবেশ কিছু একটা হলেই মনটা ভরে ওঠে ব্যথায় বেদনায়। পরের ক্ষেতে জন খেটে যে মানুষ সংসার চালায় সে মানুষটা কি করে কমরেড হয়ে যায়। একদিন বলেওছিল – কমরেড হওয়া যার তার কম্মো লয়, জোতিবাবুই ল্যায্য কমরেড। লোকটা ফিরিস্তা।।
এহেন পাটিভক্ত মানুষটা মরে গেল একলা একলা পেটের ব্যামোতে। সে আজ আড়াই বছর পেরিয়ে। বাবার বাড়ি চলেই যেত অচেনা যদিনা হাতে কাজললতা তুলে দিয়ে যেত। ছ’মাসের ছেলেটা যে তখন বাপ বলতে শেখেনি। আদর করে নাক কাঁপা নাম রেখেছিল, নেনিন। লাল ঝান্ডা কচি হাতে ধরিয়ে বলেছিল – বল বাবা ইনকিলাব—
সেদিন নেনিন লাল ঝান্ডাতে পেচ্ছাপ করেছিল বলে জাবের ক্ষেপে উঠেছিল – হেই নেনিনের মা, দেখি যা নেনিনের কাণ্ড। ব্যাটা বড় হলে মির্জাফর হবে। পতাকার হাল দেখে জোর করে কেড়ে নিতেই নেনিন কেঁদে উঠেছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অচেনা প্রশ্ন করেছিল – হ্যাঁগো নেনিন কাঁদচে ক্যানে? গলা ফাটিয়ে জাবের বলেছিল – কাঁদচে ঝান্ডায় আর একবার পেচ্ছাপ করবে বলে।
ঘরে লম্পোর আলোয় ধুয়ে যাচ্ছিল অচেনার মুখ। নির্বিকল্প বসে জলিল শুকুরালি বিলাত। মাঝে মধ্যে মাটিতে পায়ের পাতা ঠুকে ঝিনঝিনানি কাটিয়ে নেয়। সেই শব্দে নেনিন চমকে ওঠে মায়ের কোলেই। অচেনা বুঝতে পারে তার সম্মতির লগনের ডাক বয়ে যায়। আঁধারের আধারে বেড়ে যাচ্ছে রাত। ঘরের মধ্যে এতগুলো পরপুরুষ পালা করে নিঃশ্বাস নেয়। কে কোন কথা এই রাতে রটিয়ে দেবে কে জানে। অস্বস্তিতে আরো ঘেমে উঠেছিল অচেনা। অথচ মুখ থেকে নারাজ হবার কথাটা কিছুতেই মুখের বশে আসছে না। ঘরে জলিলের দেওয়া পঞ্চায়েতের গমের পিঠে এখনো জিয়োনো আছে মালসাতে। অচেনা ঘাড় তোলে। ঘাড় তোলে জলিলসহ অন্যেরা – কথা দাও ভাবী কালই তুমার নামে প্রচারে নেমে যাই। জাবের ভাই থাকলে, তুমার সামনে এমন হত্যে মেরে বসে থাকতে হত না। জাবের ভাইয়ের মত কমরেড হয় না।
নিজের স্বামী সম্পর্কে এমন মূল্যায়ন যখন তখন কি করে না করা যায়। একটা অদৃশ্য বঁড়শির টান অনুভব করে অচেনা। গোটা জীবনের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যায় সন্ধেতে। লোকটার সঙ্গে যখন প্রথম বিয়ে হয়েছিল তখনই বুঝেছিল খুব বিছানা-ভক্ত মানুষ। বেলা ডুবতে তর সয় না। মালপোকা, গোবরে পোকা উচুঙ্গার কিরি কিরি গজলের তানে সারা অঙ্গ জুড়ে ছন্দের নাচানাচি। এখন! থেমে যাওয়া সুরের ঝংকারে আশ্চর্য নৈঃশব্দ। মুখের ফুঁয়ে লম্পোর আলো নিভিয়ে যে রাতকে সে বিছানায় ডেকে আদর করেছিল। সেই মুখে হাজারো ফুঁ দিয়ে রাতটাকে তাড়াতে পারে না অচেনা। সলতেটা জ্বালিয়ে দেয় আরো। নেনিনের সারা মুখে চিত্রিত হয় জাবেরের মুখ। অচেনা বলেছিল, তেনার সোম্মানে যেদি দাঁড় করাতি চাও তাহলি আর আপত্তি নাই।
অচেনার মুখ থেকে ভোটে দাঁড়ানোর সম্মতি আদায় হতেই জলিলসহ প্রত্যেকের দীর্ঘশ্বাসে লম্পোর আলোটা গেল নিভে। অচেনার আঁচল ফুঁড়ে সেই দীর্ঘশ্বাসে পুড়ে যায় বুক। নেনিনকে জড়িয়ে ধরে আরো। নেনিন কেঁদে ওঠে।
ভোটে দাঁড়াতেই নামটা যে এমন ভারী হয়ে উঠবে ভাবতেই পারেনি অচেনা। সাক্ষরতা কেন্দ্রের সদ্যসাক্ষর সে। দেওয়ালে নজর খুঁড়ে খুঁড়ে কোন মতে পড়তে পারে। কমরেড অচেনা বেওয়াকে কাস্তে হাতুড়ি তারা চিহ্নে ভোট দিন। কাস্তের মধ্যিখানে হাতুড়ি। দোমটটা নেমে এসেছে অনেকটা নীচে। নিজের নামের নীচে সিঁথি ভোর ফাঁক রেখে গ্রাম পঞ্চায়েতের আরেক প্রার্থী জলিল। প্রার্থী সুবাদে বেড়েছে নামের জৌলুস — কমরেড জলিল উদ্দীন।
জ’ভোটে দাঁড়াতেই নাম দেওয়ালে নজর খুঁজে দিন। কাস্তের মধ্যিখাগ্রাম পঞ্চা চেনা বেওয়াকে কানাচে। নিজের একই প্রতীক। এভাবেই সাফ ছুতরো নামে অচেনা জলিলের নির্বাচনী দেওয়াল লিখন অচেনার গা’টা ঘুলিয়ে উঠেছিল, এ আবার ক্যামন কতা।– মেয়ে মানুষের আবার কমরেড হওয়া। ছিঃ ছিঃ! কি নজ্জা? জলিলকে বলতেই ও বললে – ভাবী, এতে মনখারাপের কিসে? নামের আগে কমরেড থাকলে ভোটের সময় বুকে বল বাড়ে। তুমি না নেনিনের মা। কথাটা বলে জলিল অচেনার গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই অচেনা সরে দাঁড়ায়। একটা বোটকা গন্ধ ঝাপটা মারে নাকে। আঁচলে মুখ ঢাকা দেয় অচেনা। দেওয়ালের গায়ে নিজের নামের কাছাকাছি জলিলের নামটাও সহ্য হচ্ছিল না। ওর নামের হ্রস্বস্বর দীর্ঘস্বরের চিহ্নগুলো ছুঁয়ে অচেনার নাম। নাম নাকি তার শরীর। কাপড়ে বুক ঢাকে। অঙ্গে অঙ্গে চোখ রেখে দেখে নেয় নিজেকে। এই বয়স এই শরীর, বৈধব্যের ফাটা বসন্তে উগরে আসে বিষাদের ভাব। মনে হয় প্রতি মুহূর্তে তার যেন ধর্ষণ হচ্ছে। নির্বাচনী দেওয়াল লিখন থেকে তার নামটা পেষণ করে দুটো পুরুষালি হাত কুঁড়েঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। অচেনার বেজে ওঠে গা। অন্ধকারের নেনিনকে জড়িয়ে ধরে বুকে।
নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে রাজনৈতিক কর্মীদের তৎপরতা বাড়ছে ততই বেশি। ভোটার লিস্ট মুখে করে ভোটারদের গোত্র অনুযায়ী সম্ভাব্য ভোটের পরিসংখ্যান মেপে ঘাটতি এলাকা চিহ্নিত করা হচ্ছে। অবশ্য গোপনে। পুব পাড়ার হানিফ যদি ডি.আর. ডি.এ লোন না পায় সে ক্ষেত্রে তার ক্ষোভ থাকতেই পারে। পশ্চিম পাড়ার নিছারণ বুড়ি যদি পর পর দু হপ্তা রিলিফ না পায় সেক্ষেত্রে মেম্বারদের মাথা ভিজবে এ সময়। পঞ্চায়েতের প্রার্থী জলিল বোঝে দু-রকম ক্ষোভের গুণগত পরিমাণগত তফাৎটা। নিছারণ বেওয়া মানুষ, এক ভোটের দফাদার। অপরদিকে হানিফের গোষ্ঠী ভোট যদি বেশি থাকে তবে ওর বাড়িতে ঘনঘন চলবে ওঠা বসা। জলিলের ভাষায় এটা হচ্ছে জনসংযোগ। গত পঞ্চায়েতে এই মুষ্টিযোগের বলেই পঞ্চায়েতের মেম্বার হয়েছে জলিল। এবার পরিস্থিতি অন্যরকম। দাস পাড়ার জগা জগবন্ধু নাম নিয়ে বি. জে. পি-র প্রার্থী। একটা কমরেডের এহেন অধঃপতনে চিন্তিত জলিল। যার মুখ থেকে ইনকিলাবের ফোয়ারা ছুটত সে এখন জয় ছিরাম ছাড়া কথা বলে না। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেস বহুদিন পরে কাপড় ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। আতাহার তাই চটকদারী হাঁটন হাঁটে। দু’দুবার পঞ্চায়েতে হেরে গিয়েও তো আক্ষেপে বলেইছিল, সবাই বলে আছি আছি; ভোটের বাস্কে সবই কাচি।
কংগ্রেসের বাবরি মসজিদের রক্ষার ব্যর্থতা এখন জলিলের মারণ অস্ত্র। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণ তেমন কোন কাজে লাগছে না। অচেনাকে বলেছে, এসময় একটু সাফছুতরো থাকতে। পঞ্চায়েতের প্রার্থী বলে কথা! ব্যালট নিয়ে পাঁচ বাড়ি ঘুরতে হবে।
আমাকে? প্রথমে ভড়কে গিয়েছিল অচেনা।
প্রার্থী হয়ে পাড়ায় না বেরুলে হয়? জাবের ভাই কতদিন বাড়ি বাড়ি ভোট চেয়ে বেড়িয়েছে সে তো তুমি জাননা। এটাতো সেই জাবের ভাইয়ের পার্টি সর্বহারা পার্টি। চাইতে আর লজ্জা কিসের?
পাড়ায় বেরুনোর নাম শুনে শরমে মুখ দিয়ে রক্ত উঠে এসেছিল প্রায়। জাবেরের কথা ভেবে জলিলের সঙ্গে অচেনা বার হয়। সঙ্গে কুকুর মাছির মত আরো কিছু লোকজন। কমরেড এমন অহঙ্কারী নামের দল কিনা সর্বহারা? কিছুতেই মেলাতে পারে না অচেনা। সে নিজেও একজন কমরেড। ভোট প্রার্থী। এতদিন পঞ্চায়েতের রিলিফে পেট-পোষ গিয়েছে। এবার মেম্বার হলে সে নিজেই বিলি করবে গাঁয়ের আর পাঁচটা দুঃস্থ বেওয়াদের রিলিফ। অচেনার হাতে ব্যালট। নকল ভোটপত্র। পাড়ার মানুষ নতুন করে চিনছে অচেনাকে। মৃদু গুঞ্জন। মায়ের বুকে দুগ্ধপানরত শিশুও একবার ঘাড় ঘোরায়। দ্যাখে অচেনাকে। হানিফের ছেলেটা কি ভেবে বলে উঠেছিল, এমা হিজরে
প্রথম দিন দলীয় ব্যালট দেখাতে গিয়েই মন ভাঙল অচেনার। গাঁয়ের মেয়ে-বৌদের মধ্যে আঁচলে দাঁত চেপে তির্যক হাসি হেসেছে কেউ কেউ। –মদ্দ চরানির মাগির ধ্যেয়ান দেখ। জোয়ান হাতি পুরুষ মানুষটার জন্য একটু শোগ নেই গো– পুব পাড়ার আয়ুব মিয়া বললেন—দিনে দিনে মেয়েমানুষ যে মাথায় তুললে জ্যোতি বোস। হ্যঁ গো অচেনা,ঈদের চাঁদে ফেৎরা দিই বকরীদের চাঁদের কুরবানীর গোস্ত দিই বলে কি ভোটটাও দিতে হবে তুমায়?
অচেনা ঘোমটা টানে। পাশে থেকে জলিল বললে – ইটা নারী স্বাধীনতা।
সব বুঝি বাপু সব বুঝি, এসব নাফরমানের আজত্ব। রোজ কেয়ামতের আর দেরি নেই।
কথাটা ঠিক বললে না চাচা।
ভুল বললাম কিসে? মেয়েমানুষের সই নিয়ে পঞ্চায়েতে ছুটতে হবে? দেখবে বেগানা মেয়েমানুষ নিয়ে অঞ্চল অফিসটা বালাখানা তৈরি হবে। ইসলাম কুরবানী হবে তুমাদের হাতে।
ধর্মের কথা বলছ? বাবরি মসজিদটা বি জে পি-কে দিয়ে কারা ভাঙালো শুনি? মাথা কঁকিয়ে প্রশ্ন করল জলিল।
আয়ুব মিয়া একটু হোঁচট খেলেন। বারকতেক দাড়ি চুলকিয়ে বললেন – যারাই ভাঙুক তাতে অচেনার কি? মেয়েমানুষ কি শাড়ি পরে মসজিদের মধ্যে নামাজ পড়বে? আর তুমরা তো ধম্মে মানো না, আল্লা রসুলে বিশ্বাস কর না, বাবরি মসজিদের জন্য এত দরদ কিসের? কুরান শরিফকে তুমাদের এক নেতাই বলেছে ওটা ছাত্রবন্ধু।।
অচেনার কান দুটো আঁ আঁ করছিল। ভোটে দাঁড়িয়ে এত মানুষের এত কথা তর্কাতর্কি এ সবই অসহ্য। পায়ের আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়ছিল। হয়তো বা সে চেয়েইছিল এই মাটির ভিতর মুখ লুকাতে। ইচ্ছে করছিল এক দৌড়ে এখান থেকে পালিয়ে যায়। বলে দেয় জলিলকে সাফ কথা — আঁড় বেধবা হয়ে মেম্বারগিরি সাজে না আমার। বলতে পারেনি। লোকটা কমরেড ছিল। তাছাড়া জলিলও বলেছিল- – বিগড়ে যাবার কিছু নেই ভাবী, জেতার পরে দেখবে কত লোক তুমারে লাল সেলাম জানাতে আসে।
কংগ্রেসের প্রার্থী ছকিনার হয়ে ভোট প্রচারে নেমেছে স্বামী কাশিম। অচেনা ঘরে বসে দেখতে পায়। হাতে ব্যালট নিয়ে টহল মারছে পাড়ায়। চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তার স্বামী নেই। কেউ নেই। যারা আছে তারা কমরেড। সেই কমরেডরা ভরসা। তাদের সঙ্গেই ঘুরতে হয়েছে পাড়ায় বে-পাড়ায়। কিছু মানুষের কূট বাক্য। তবু তো অনেকে আশা দিয়েছে। নিছারণ বুড়ি দু হপ্তার রিলিফের শোক ভুলে কথা দিয়েছে তাকে, আমার ভোটটা তোর জন্যি তুলা থাকল অচেনা। তুইও বেধবা আমিও বেধবা। বেধবার আর জাত কিসের? ঠিক ঠিক বুঝে নিবি চটের ঘরে। তারপর গলার সুর পাল্টে বলেছে – মিম্বার হয়ে জি, আর ইলিপে ফাঁকি দিসনে অচেনা। বেওয়া মানুষের পঞ্চাই-ই তো স্বামী সতীন।
বেশকিছু নেওয়া ভোট অচেনার পক্ষে। আরো অনেক ভোট আছে সেগুলো না অচেনার না ছকিনার। শুকরালি বললে – ভাবী, পাড়ায় প্রচারের সময় নেনিনকে সঙ্গে নিয়ে, ওর মুখ দেখে দু’চারটে উড়ো-ভোট পেলেও পেতে পারো।
উড়ো ভোট ধরার জন্য সব দলই ফিঙে পাখির মত চক্কর মারছে। নতুন কৌশল নিয়ে জলিল হানা দিচ্ছে রাতবিরেতে। যে ইব্রাহিম মোল্লা এতদিন হাতে ভোট দিয়েছে সেই লোকটা কাবু হল জায়নামাজের পাটিতে। নামাজের সালাম ফিরিয়ে বসতেই দেখলো জলিলের হাতে ব্যালট। চাচা কি বলছ? এ এক কঠিন প্রশ্ন। থম মেরে ভাবতে ভাবতে গালের ঘামে দাড়ি ভিজিয়ে জবান দিয়েছিল – ইলশাল্লাহ! অর্থাৎ আল্লা যদি রাজী হয় তো নিশ্চয় পাবে।
এখন প্রতিদিন অচেনার বাড়িতে মিটিং বসছে। জড়ো হয়েছে আরো কিছু তরুণ কর্মী। এদের একবার কমরেড বললে তিনবার মাথা ঝাঁকিয়ে নড়ে বসে। মিছিল গেয়ে গলা ভেঙেছে অনেকের। এরাই তো তার নাম ধরে চেঁচিয়ে ভোট চেয়েছিল। বাতাসে কথার বাড়ি খেয়ে নিজের নামটা ফিরে এসেছিল নিজের কাছে, কমরেড অ-চে-নাকে ভোট দিন।
অচেনার মনে হয়েছিল তার পরনের শাড়িটা খুলে যেন কেউ উড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়ায়। ক্রমশ নগ্ন হয়ে যাচ্ছে সে। তারপর একটু একটু করে নিজেই ঝেড়ে ফেলতে পেরেছে সেই জড়তা। পঞ্চায়েতের ভোটে জিতে যাবার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তার। অচেনা সাহস পায়। এতগুলো মানুষ কমরেড হয়ে তার জন্য লড়াই করছে। অচেনা জল ঢালে গ্লাসের পর গ্লাসে। কাচের গ্লাসে স্পষ্ট পাঁচ আঙুলের ছবি। হাতের চুড়িতে ঝুন ঝুন বোল ফোটা শব্দে পিপাসা বাড়ে। ভাবী, এদিকে এ্যাক গিলাস।
অচেনা জলের গ্লাস বাড়িয়ে ধরতেই মধ্যিখানে বিলাতের হাতে গ্লাস আটকায়। আর এক কমরেড জলিল হাত বাড়িয়েই থাকে। বুকের ভিতর তার জ্যৈষ্ঠের খরা বইছে।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটা এসে গেল নিজে থেকে। এক একজন কমরেড কামানের গোলার মত ছুটছে। দীর্ঘ লাইন পড়ছে স্কুলঘরের সামনে। ভোটদাতাদের হাতে হাতে বুথ শ্লিপ। গোপনে ভোট পড়ছে, হাতে বা কাস্তেতে। কখনো বা পদ্মফুলে, হাত ফস্কে কাঁঠালে। অচেনাও দাঁড়িয়ে এক পাশে। কোলে দামাল নেনিন। শেষ ভোট ভিক্ষার নিঃশব্দ আবেদনে করুণ মুখ। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে ঠা-ঠা রোদের আঁচে। অচেনার ঘাম ঝরে পিঠে গালে বুকের চাতালে। সেই ঘামে সিক্ত হয়ে ওঠে বসন। রোদের তাতে নেনিনের কাবাব হয়ে যাবার জোগাড়। মাথার উপর শাড়ির আঁচলে আচ্ছাদিত শরম। অচেনা রোজা রেখেছে। নফর রোজা। এক নাগাড়ে তিনদিন নফর রোজা রাখার জন্য ঘানি গাছের মত শরীরটা ঝলসে গেছে অনেকটা। সারারাত নফর নামাজ পড়ায় চোখের কোণে রাত্রি জাগরণের সুস্পষ্ট ছাপ। এই নামাজ আর রোজা দিল একিনে পালন করতে পারলে হয়তো আল্লা রাজী হবে। পঞ্চায়েতের মেম্বার হবে সে। নামাজের মোনাজাতে দুটো কমনীয় হাত শূন্যে ধরে একসময় অচেনা ডুকরে কেঁদে উঠেছে জায়নামাজের পাটিতে।
ভোট শেষ হয়েছে নির্বিঘ্নে। অচেনা ফিরে এসেছে ঘরে। স্কুল বাড়ির চারপাশে রাজনৈতিক দল আর উৎসুক জনতার ভীড়। গণনা চলছে – অচেনা বেওয়া এক ছকিনা বিবি এক। কিছুক্ষণ আগে জলিল এক চক্কর ঘুরে গিয়েছে। অচেনা তখন সদ্য নফর নামাজ শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। বাইরে নড়ে ওঠা অন্ধকার আর পায়ের শব্দে সচকিত অচেনা। ভয়ে সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। দেওয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। কাস্তে হাতুড়ির রঙিন পোস্টার তখনো ঝলসে উঠছে। অচেনা হাত রাখে কাস্তের বাঁটে। ইজ্জত রক্ষার সে এক – অনন্য নারী মূর্তি।।
ভাবী। জলিলের ডাকে দেওয়ালের কাস্তে থেকে হাত পিছলোয় অচেনার। কেঁপে ওঠে ও। আড়ষ্ট গলায় অচেনা প্রশ্ন করে, কি খবর?
তুমি পঁচিশ ভোটে এগিয়ে আছ এখনও। কাল সকালবেলা আবীর মেখে তোমায় নিয়ে বিজয় মিছিল করব। অন্ধকারে খোদাই করা জলিলের দাঁত দেখে আঁতকে ওঠে অচেনা।
শুনতে পায় বাষ্পিত কণ্ঠস্বর — নেনিন ঘুমুয়েছে? মায়ের হাতে আঁকানি খেয়ে ঘুমন্ত নেনিন আচমকা জোরসে কেঁদে ওঠে।
শুধু জলিল নয়। রাতের ভোট গণনার খবর পালা করে দিয়ে গেছে শুকুরালি বিলাত। বিলাতের শেষ সংবাদ অনুযায়ী পাঁচ ভোটে এগিয়ে অচেনা। তারপর আর কোন খবর আসেনি। উৎকণ্ঠায় অচেনার ঘুম নেই। চারপাশে জমাট অন্ধকার ঝামরে আছে। অচেনার এলোচুল বেয়ে ঘরের মধ্যে সেই অন্ধকার আরো গাঢ়। দুয়ে। রহস্যময়।
হঠাৎ জোর শব্দ হল। অচেনার শরীরটা নেচে ওঠে। নেনিন ককিয়ে ওঠে। ঘাড় ফেরায়। এক ঝলক তাজা আগুনের দাপাদাপি তার উঠোনে। চোখ ধাঁধরে যায়। বুঝতে পারে ভোটে হেরে গেছে সে।
বন্দেমাতরম আর ঘন ঘন বাজির শব্দ। গাছের শেষ পাতা ছুঁয়ে উড়ে যাওয়া পাখির ডানায় যেন হাততালি দিয়ে জেগে ওঠে রাত। ছকিনা বিবির কাছে মাত্র এক ভোটে হেরে যাবার যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে সারা শিরায় শিরায়। কলজে টাটায় অচেনার। জাবেরের কথা মনে পড়ে। আজ যদি তার স্বামী থাকত তবে ছকিনার কাছে এভাবে হেরে যেত না সে। অচেনা কেঁদে ওঠে। ভোরের ফিকে আলোয় দেওয়ালের রঙিন পোস্টারে পুড়ে যায় তাবৎ শরীর! তার মান-সম্মানের আর কী বা রইল! কী বাকি রইল ইজ্জতের! একটা পাশব শক্তির কাছে যে যেন ধর্ষিত, বিপর্যস্ত। অচেনা শুনতে পায়, ভোরে সিটি মেরে ছুটে যাওয়া ট্রেনের শব্দ বুকের ভিতর কাস্তের দাগ কেটে যায়। আবার যেন সে নতুন করে বিধবা হল।
বুকের উপর একহাতে ধরে থাকা নেনিন অন্য হাতে ন্যাতা অচেনার। সে মুছতে থাকে নির্বাচনী পোস্টার। আর নয়। পঞ্চায়েতের মিম্বার হওয়া সাজে না তার। সে বিধবা-বেওয়া। সে কমরেড নয়। আজ থেকে শুধু নেনিনের মা।
লেখক পরিচিতি
আনসারউদ্দিন
জন্ম ১৯৫৯-তে নদিয়ার শালিগ্রামে। বাড়ি নদিয়ার ধুবুলিয়ায়।  
জন্ম ১৯৫৯; শালিগ্রাম, নাকাশিপাড়া, নদীয়া। শিক্ষা : স্নাতক। পেশা : প্রান্তিক কৃষক। প্রকাশিত বই— আনসারউদ্দিনের গল্প [ধ্রুবপদ, ১৯৯৪] আনসারউদ্দিনের ছোটগল্প [প্রতিক্ষণ, ১৯৯৮] আনসারউদ্দিনের গল্পসমগ্র [২০০৩] গৈ-গেরামের পাঁচালি [গাংচিল, ২০০৬] শোকতাপের কথামালা [ধ্রুবপদ, ২০১৪] গো-রাখালের কথকতা [অভিযান, ২০১৫] মাটির মানুষ মাঠের মানুষ [অভিযান, ২০১৬] গনি চাচার খেত খামার [অভিযান, ২০১৭] জনমুনিষ [অভিযান, ২০১৮] গ্রামজীবনের সাতকাহন [ধ্রুবপদ, ২০১৮] জীবনের কথা যাপনের কথা [অভিযান, ২০১৯] স্বীকৃতি— সোমেন চন্দ পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০০৩ ই-মেইল : answaruddin57@gmail.com।
পেয়েছেন বাংলা অকাদেমির সোমেন চন্দ পুরস্কার, আন্নদাশঙ্কর রায় স্মারক পুরস্কার, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইলাচন্দ পুরস্কার-সহ বহু সম্মাননা। শখ বলতে বই পড়া, খবরের কাগজ পড়া আর খবর শোনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.