নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তীর গল্প : দহন

সুমির বিবর্ণ জীবনে একদিন হঠাৎই শাক্যমুনি বুদ্ধ ঢুকে পড়লেন। এতদিন যেন তার জীবন এক অন্ধকার বৃত্তের মোহজালে দিবারাত্রি চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছিল। হঠাৎ সুমির দু’চোখ খুলে গেল। সে দেখতে পেল এতদিন ধরে কতটা ক্লেদাক্ত এক জীবন যাপন করছিল সে। তার সেই যাপনে কোথাও আশার আলো নেই, কেবল মালিন্য। সে চমকে উঠে ভাবতে লাগল, কেমন করে সে এতদিন বেঁচে ছিল! হঠাৎই তার সর্ব শরীর জ্বলতে শুরু করল। এই কী সেই প্রবল অগ্নিজ্বালা? যার প্রাবল্যে ভগবান বুদ্ধের নিজের শয্যাকে একদিন মনে হয়েছিল জ্বলন্ত অঙ্গার? সেই যাতনায় এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে একদিনের সদ্যোজাত শিশুপুত্র, বিবাহিতা স্ত্রী ও রাজসুখ ছেড়ে রাজপুত্র সিদ্ধার্থ অজানা পথে মহানিষ্ক্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলেন?

পরিত্রাণের আশায় সুমি এবার দৌড়াতে শুরু করল। সে তার চারিপাশের সমস্ত কিছু থেকে এই মুহূর্তে দূরে পালাতে চায়। এক অনন্ত লেলিহান শিখার তাপে জগতের সবকিছু জ্বলছে। কোথাও শান্তি নেই! নার্সিংহোমের বিবর্ণ দেওয়াল ঘেরা করিডরগুলো দ্রুত পেরিয়ে যেতে লাগল সুমি। সে কী পাগল হয়ে গেছে? নাকি বাকি সব মানুষেরাই আসলে পাগল? যারা তাদের জীবন কাটাতে গিয়ে এই অসহ্য জ্বালা কখনও অনুভবই করে না! এবার তাকে এই আগুনের কুয়ো থেকে যে করে হোক পালাতে হবে! কিন্তু পালিয়ে সে কোথায় যাবে? সুমি তা জানে না। বুদ্ধের মত মানসিক শক্তি তার কোথায়! তার আশ্রয় প্রয়োজন, কে দেবে তার তাপিত প্রাণে শান্তির পরশ?
সুমি একজন গৃহবধূ্। স্বামীর মৃত্যুর পর সে শ্বশুরবাড়িতেই বেশ মানিয়ে নিয়ে থাকে। ঘটনার দিন নার্সিংহোমে সে গিয়েছিল তার এক আত্মীয়া দিদিকে দেখতে। বাড়ি ফিরে আসার পর সে ক্রমাগত স্নান করতে থাকে। কোনো কথা বলে না, ঘরের রোজকার কাজগুলো করে না। রোজকার ঝগড়ায় কান দেয় না। চারবার স্নান করেও সে শরীরে তখনও তীব্র জ্বালা অনুভব করতে থাকে। বাধ্য হয়েই সে তখন নিজেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে ফেলে। নগ্ন অবস্থায় সে ঘরের চারদিকে ছোটাছুটি করতে থাকে। সুমির শ্বশুরবাড়ির লোকেরা শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তারা ভাবে, তাদের বাড়ির বউটি হঠাৎ পাগল হয়ে গেছে।
আজ সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অফিস ফেরত পুড়ে ঝলসে যাওয়া বেলাকে নার্সিংহোমে দেখতে গেছিল সুমি। তারপর একটু পরেই বাড়ি ফিরে এসেছে। বাড়ি ফেরার পর থেকেই সুমির এই অস্বাভাবিকতার সূত্রপাত হয়েছে। হঠাৎ করে সে জামা কাপড় গায়ে রাখতে চাইছে না। শেষে তার হাত পা বেঁধে রাখতে হয়েছে। তাও সুমির শরীর ধনুকের মত বেঁকে যাচ্ছে মাঝে মাঝেই। ডাক্তার এসে তাকে ট্রাঙ্কুইলাইজার ইঞ্জেকশান দিলেন। সুমি এক মিনিটও চুপ করে থাকছে না। তার সর্বশরীর জুড়ে অসহ্য জ্বালা শুরু হয়েছে। সত্যিই বড় বড় ফোস্কার মত দাগ ফুটে উঠেছে তার চামড়ায়। কেন?
বহুকাল আগের কথা। সেইবার রাজগৃহ নগরে গ্রীষ্মে ভয়ানক গরম পড়েছে। জ্যৈষ্ঠ মাস। মাঠে এতটুকু জল নেই। বৃষ্টি কম হওয়ার জন্য এবারে শালিধান সব খেতের মধ্যেই শুকিয়ে গেছে। ফসল হয়নি। শ্রমণেরা সকালে ভিক্ষায় বের হলে শূন্য হাতে বিহারে ফিরে আসছেন। অনেকদিন পরে কয়েকজন ভিক্ষু একজন গৃহস্থের বাড়ি থেকে ঘোড়ার খাবার জন্য তৈরি করে রাখা যবের গুড়ো আর কিছুটা ভাজাছোলা ভিক্ষা হিসেবে পেয়েছেন।
দুপুরের খাবার সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। সূর্যের পড়ন্ত রোদ বাঁকা হয়ে এসে পড়েছে বিহারের মাথায়। অসময়ে ছোটো ছোটো বালক শ্রামণেরদের জন্য খাবার তৈরি করা শুরু হল। ভিক্ষায় পাওয়া সেই ভাজাছোলা ভিক্ষুসংঘের পাকশালায় হামানদিস্তা দিয়ে ভাঙা হতে লাগল। সেই একটানা শব্দ কানে যেতে বুদ্ধ বিরক্ত হলেন, তিনি শব্দ অপছন্দ করেন। জানতে চাইলেন শব্দের কারণ। বেণুবন বিহারে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী ভিক্ষুদের খাবার তৈরি হচ্ছে শুনে বুদ্ধ কিছু বললেন না। বরং সেই কাজের প্রশংসা করলেন। তারপর শব্দের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে হাঁটতে হাঁটতে বিহার থেকে বেরিয়ে পড়লেন।
বুদ্ধের বয়স এখন চল্লিশের সামান্য বেশি। তিনি দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণ, অপরূপ সুন্দর। তাঁর পরনে গৈরিক চীবর, কোমরে কোমর বন্ধনী, কাঁধে একটা ঝোলা। তাতে আছে ভিক্ষাপাত্র ও ভিক্ষুর আবশ্যক জিনিসগুলি, যেমন জল ছেঁকে খাওয়ার ছাকনি, সূঁচ, ক্ষুর, একটি ত্রি-চীবর ও কটি-বন্ধনী। বুদ্ধ বেরিয়ে পড়তে কয়েকজন শ্রমণ এবং ভিক্ষুরাও তাঁর সঙ্গী হলেন। বুদ্ধ গৃধ্রকূট পাহাড়ের উপরে উঠতে লাগলেন, শিষ্যরাও তাঁর অনুগামী হলেন। পাহাড়ের উপর থেকে রাজগৃহ শহরটি ছবির মত দেখা যায়।
ততক্ষণে দূরে দিকচক্রবালে দেখা যাচ্ছে সূর্য তার সব রং ঢেলে দিয়ে পশ্চিমদিগন্তে যাত্রা করেছে। ভিক্ষুরা সকলে নিশ্চুপে বুদ্ধের একপাশে এসে দাঁড়িয়ে রইলেন। বুদ্ধ বুঝলেন, ভিক্ষুরা অভুক্ত ও ক্ষুধার্ত। হঠাৎ দূরে পাহাড়ের উপর দূরের বনে দাবানলের আগুন জ্বলে উঠল। অনাবৃষ্টিতে বনের গাছপালা অনেকদিন থেকেই শুকিয়ে গেছিল, সহজেই সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল বহুদূর পর্যন্ত। সেই গাঢ় লাল অগ্নিশিখার দিকে আঙুল তুলে বুদ্ধ সেদিন আবার আদিত্যপরিয়ায় সুত্তটি আবৃত্তি করলেন।
এই সূত্রটি বুদ্ধ কয়েক বছর আগে বুদ্ধ মুখে মুখে রচনা করেছিলেন। যখন বোধিজ্ঞানলাভের পর তিনি সশিষ্য প্রথমবার গয়াশীর্ষে এসেছিলেন। বুদ্ধের সঙ্গে তখন কয়েক হাজার ভিক্ষু। তারা বেশিরভাগই আগে জটিল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বুদ্ধ তাঁর বোধিলাভের বর্ষপূর্তির পুজো করতে উরুবেলা গ্রামে এসেছিলেন। তখন তিন জটিল গুরু শিষ্যসহ তাঁর ধর্মমত গ্রহন করেছিলেন। সেদিনটিও ছিল এমনই এক নিদাঘ তাপিত দুপুর। দূরে পাহাড়ের বুকে বনে তখন এমনই দাবানলের আগুন টকটকে লাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল।
সামনে জ্বলন্ত সেই লেলিহান অগ্নিশিখা দেখিয়ে বুদ্ধ ভিক্ষুদের বললেন,
ভিক্ষুরা! দেখো সমস্ত কিছু কেমন জ্বলছে! চোখ জ্বলছে, রূপ জ্বলছে, চোখের সংস্পর্শে যা কিছু আছে সব কিছুই প্রবলভাবে জ্বলছে। সমস্ত মানুষের জীবন সেই জ্বালার অসহনীয় দুঃখে জর্জরিত। এ জগতও এমন করেই জ্বলছে। সেই জ্বালা থেকে কোনো জীবের রক্ষা নেই। জন্ম থেকেই জঠরাগ্নির জ্বালা। ক্রমশঃ কামাগ্নির দহনজ্বালা, ক্রোধাগ্নির জ্বালা, স্বজন হারানোর শোকানলের দহন। দহনজ্বালা ও যন্ত্রনার যেন শেষ নেই। সমস্ত প্রাণিরা বারে বারে জন্মগ্রহন করে একইভাবে শোকগ্রস্ত হয় এবং জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর যন্ত্রণায় ক্লীষ্ট হয়।
এই প্রবল শোকে আকীর্ণ জগত দেখে শ্রুতবান আর্য্যশ্রাবক সমস্ত বিষয়ে নিরাসক্ত হয় এবং ধর্মে নির্বেদপ্রাপ্ত হয়। এভাবে নির্বেদপ্রাপ্ত হয়ে সে হয় বীতরাগ, এবং বীতরাগ হয়ে সে হয় বিমুক্ত। এইভাবে তার জন্ম জন্মান্তরের চক্র ক্ষীণ হয়। তাকে এই দুঃখের আগারে আর পুনরায় জন্মগ্রহন করতে হয় না। ভিক্ষুরা! যদি শান্তি এবং দুঃখমুক্তি চাও, তবে দৃঢ়মনে দুঃখনিরোধের এই পথের শরণাগত হও।”
মুহূর্তে সমস্ত পরিবেশ এক অন্য মাত্রা পেল। ভিক্ষুরা সকলে শারীরিক ক্লান্তি ও অনাহারের জ্বালা একেবারে ভুলে গেলেন। সমস্ত চরাচরে নেমে এল এক অপূর্ব শান্তি।
সুমি একজন বাঙালি গৃহবধূ, তার চেহারা গড়পড়তা এবং মেধা মাঝারি মানের। সে বিয়ের আগে বাপ মায়ের যেমন বাধ্য মেয়ে ছিল, এখন শ্বশুরবাড়িতে এসে তেমনই বাধ্য বউ হয়েছে। আকস্মিক ভাবে বিয়ে আর হঠাৎ করে স্বামীর মৃত্যু ছাড়া তার জীবনে কোনো কিছুই হঠাৎ হয়নি। তার জীবন বেশ নিরাপদ। স্বামীর চাকরিটা পাবার পর সে শ্বশুরবাড়িতেই থাকে। অল্পবয়সে স্বামীকে হারিয়েও সুমি কখনও কোনো পুরুষের প্রেমে পড়েনি। সকালের অফিস ও রাতের রান্নাঘর সুমি খুব মন দিয়ে সামলায়। সংসারে ডিভোর্সী ননদের খিটিমিটিও সে মোটামুটি মুখ বুজেই সহ্য করে নেয়। এইভাবেই চলে আসছিল। বাধ সাধলেন তথাগত বুদ্ধ। সুমি পারিপার্শিকের বিরুদ্ধে হঠাৎ বিদ্রোহ করল। সে দেহ মনে আদিত্যপরিয়ায় সুত্তকে হঠাৎ করে অনুভব করল। সুমির ধরাবাঁধা জীবন তছনছ হয়ে গেল।
সুমির জীবনের গল্পে আসা যাক। বেশ কিছু বছর আগেকার ঘটনায় যাওয়া যাক।
সুমির দিদি বেলার আজ বিয়ে। বেলা সুমির মামাতো দিদি। তবুও সুমি ও বেলার বেশ ভাব। সুমির মা ঘনঘন বাপেরবাড়ি আসতেন, বেলাও তার পিসির বাড়ি যেত, এভাবেই তাদের সখ্যতা ছোটবেলা থেকে গড়ে উঠেছে। বেলা ও সুমি দুজন একেবারেই আলাদা। বেলা ফর্সা, সুমি কালো। বেলা লম্বা, সুমি বেঁটে। বেলা সুন্দরী, সুমি সাধারণ। আরও বলা যায়, বেলা মেধাবী এবং সুমি মধ্য-মেধার। যাইহোক সুমি তবুও বেলাকে হিংসে করে না, বরং বেলাকে সে একধরণের শ্রদ্ধা মিশ্রিত সমীহ করে চলে। বিয়ের দিন সকালে স্নান ও খাওয়ার পর মামাবাড়ির টালাপার্কের বাড়িতে সুমি খাটের উপর বসে বসে পায়ের আঙুলে নেলপালিশ লাগাচ্ছিল। এমন সময় ঘরের মধ্যে ছুটে এলেন সুমির মা ও মামা। বললেন তাঁরা, বেলাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! কিছুক্ষণের মধ্যেই বর ও বরযাত্রী চলে আসবে। এখন কী উপায়? বেলা চিঠি লিখে চলে গেছে। এতদিন কেউ একবারও এতটুকু কিছু জানতেই পারেনি। পার্লার থেকে লোক এসেছিল, বেলাকে সাজাতে। তাদের শাড়ি পরতে যাচ্ছি এ কথা বলে, বেলা কোথায় যেন চলে গেছে।
এরপর বেলার হবু-বর কমলেশকে ফোন করা হল। তাদেরও বাড়ি ভর্তি আত্মীয়রা এসে গেছে। লোকলজ্জা থেকে বাঁচতে সেই লগ্নে সুমি আর কমলেশের বিয়ে হয়ে গেল। কমলেশ ভালো ছেলে। সরকারী চাকরি করে, চেহারাও সুন্দর। বেলার সঙ্গে মানানসই ফর্সা ও লম্বা। বরং সুমিই যেন কেমন বেমানান। বউ বরণ করতে গিয়ে কমলেশের মা রং ময়লা ও অসুন্দর সুমিকে দেখে কপাল চাপড়ে কেঁদে উঠলেন।
কিন্তু কোথায় গেল বেলাদিদি? এর উত্তর কয়েকদিনের মধ্যেই জানা গেল। বেলা একজন সিএবির ক্রিকেট খেলোয়াড় পাত্রকে বিয়ে করেছে। তার নাম রীজু। রীজুদা দারুণ হ্যাণ্ডসাম। সুমি কখনও বেলাদির এই সম্পর্কের কথা জানত না। বেলা তাকে আগে কখনও কিছু বলেনি।
ফুলশয্যার রাতে অসহ্য সুখে ভেসে যেতে যেতে সুমি ভাবতে লাগল, ভাগ্যিস বেলাদিদি চলে গেছিল। সে আরও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরল কমলেশকে, আর ঠিক তখনই বিছানায় শোয়া অবস্থায় হঠাৎ যন্ত্রনায় একেবারে নীল হয়ে গেল কমলেশ। ভয়ে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল সুমি। সে তাড়াতাড়ি জল এনে দিল কমলেশকে। জল আর খাওয়া হল না, কারণ কমলেশ তখন অজ্ঞান হয়ে গেছে। ভয় পেয়ে সুমি তাড়াতাড়ি শ্বশুর শাশুড়িকে গিয়ে ডেকে আনল। ওরা ডাক্তার খবর দেওয়ার আগেই বলতে লাগল,
‘এ কী অলক্ষণ! ছেলের হঠাৎ কী হয়ে গেল? এমন তো দেখিনি কখনও?’ তারপর যা তারা বলতে লাগলো, তার মাথামুণ্ডুই নেই। অজ্ঞান ছেলেকে দেখতে দেখতে এমনকী সুমিকে ডাইনি এবং রাক্ষসী এ কথাও বলা হল।
সুমি যেন পাথর হয়ে গেছে। একটু আগেই সে একজন দুর্দান্ত পুরুষসঙ্গ জীবনে প্রথমবার উপভোগ করছিল। অসহ্য গভীর এক সুখ তার ভেতরে তখনও দাপাদাপি করছিল। তার সমস্ত শরীর জুড়ে যেন সেই অনুভূতির রেশ রয়ে গেছে। সে এমন অবস্থায় কী করে এত কদর্য কথার জবাব দেবে?
নার্সিংহোমের বেডে জ্ঞান আসতেই কমলেশ সবাইকে জানাল, এমন ব্যথা তার আগেও মাঝে মাঝে হয়েছে। তবে, তার আগেই সুমির প্রতি কুবাক্যগুলো প্রয়োগ করা হয়ে গেছিল।
সেদিন থেকে কমলেশ আর কখনও সুস্থ হল না।
কমলেশকে নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটছিল সুমির। বিভিন্ন পরীক্ষা, ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি। বেলাদিদির খবর আসতে থাকল মায়ের মাধ্যমে। ভীষণ ভাল আছে ওরা দুজনে। নিজের জীবন ওরা নিজেরাই বেশ সাজিয়ে নিয়েছে। মা ওদের মাঝে মাঝে বাড়িতে খেতে ডাকেন। তখন সুমিও দেখেছে ওদের, অবশ্য একবারই। কী অপূর্ব মানিয়েছে যে ওদের! রীজুদা কী দারুণ দেখতে! একটা কর্পোরেট অফিসে চাকরি পেয়ে গেছে রীজুদা। খুব তাড়াতাড়ি ওরা দক্ষিণ কলকাতায় একটা দামি ফ্ল্যাট কিনে নিল। সুমি ওদের দেখে কেবল অবাক হয়েছে। তার ভেতরে জেগে উঠেছে বিস্ময়। সিনেমার নায়ক নায়িকার সুখ দেখে যেমন দর্শকেরা আনন্দ পায়, তেমন সুমিও পেয়েছিল।
অন্যদিকে কমলেশ তখন রুগ্ন দেহে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। একদিন দরকারে মায়ের কাছে এসেছিল সুমি। ওদের দেখেই তুলনাটা তার মনের ভেতর চলে এসেছিল। ভেবেছিল, সে কী দুর্ভাগা? অপয়া? সত্যি সত্যিই? হয়তো বেলাদিদিকে বিয়ে করলে কমলেশের এমন কিছু হতোই না। হয়তো বেলাদিদি কমলেশকে নিয়েও ভাল থাকত। কিংবা কমলেশের এমন হবে বলেই বেলাদিদি সেদিন হঠাৎ করে চলে গেছিল, আর দুর্ভাগ্য রেখে গিয়েছিল সুমির জন্য।
সুমির আর স্বামীসঙ্গ কপালে জোটেনি। বিয়ের তিনমাসের মধ্যেই তার স্বামী কমলেশ মারা গেল। বহুদিন ধরে পেটের যন্ত্রনাকে সে অবহেলা করেছে। ডাক্তার না দেখিয়ে সে ইচ্ছেমতো ওষুধ খেয়ে গেছে বরাবর। রোগ ধরা পড়ার পর আর সময় পাওয়া যায়নি। শেষদিকে অ্যাপেন্ডিক্স থেকে সেপটিসেমিয়া হয়ে গেছিল কমলেশের। সুমি তখন তিনমাসের অন্তঃসত্বা।
কমলেশ নার্সিংহোম থেকে সোজা নিমতলা শ্মশানঘাটে ইলেক্ট্রিক চুল্লির ভেতর ঢুকল এসে। তারপর সুমির জন্য পড়ে রইল কেবল এক মুঠো ছাই। ততদিনে তিনমাসের গর্ভ নিয়ে সুমি সংসারে সকলের বোঝা।
তবে অনেক ছোটাছুটির পর শেষ পর্যন্ত কমলেশের চাকরিটা পেয়ে গেল সুমি এবং সে থেকে গেল শ্বশুরবাড়িতে।
রাতের রান্না করতে করতে সুমি ভাবছিল, এখন কেমন আছে বেলাদিদি? রীজুদা এখন কী করছে? এমন বউপাগল ছিল লোকটা! সে তো এতক্ষণে হয়তো পাগলই হয়ে গেছে! সুমির নিজের ধূসর আর বিবর্ণ জীবনের প্রতিপদে তার অজান্তেই বেলাদিদির তুলনা এসে যায়। শোক তাপ অনুভব করার আগে, সে আজ একটা ভয়ানক ধাক্কা পেয়েছে খবরটা শুনে। যেন চলমান একটা ঘড়ি হঠাৎ থমকে গেছে। জোর করে সে একটা শ্বাস চেপে রাখল বুকের ভেতর, কিন্তু বুকের ভেতর চিন্তাগুলো সারাক্ষণ মাথা কুটতে লাগল। অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও পায়নি সুমি। তাকে সবটা জানতে হবে।
আজ অফিস থেকে ফিরেই রান্না বসিয়েছে সুমি। রোজই এমন করে সে। বাইরের পোশাক ছেড়ে এসেই ঘরের কাজে হাত দেয়। রাতে বেশি কিছু রান্না হয় না এ বাড়িতে। ছোটখাটো তরকারি দু’ এক পদ আর কয়েকখানা রুটি। এ রান্না সকালে সেরে রাখা যায় না, কারণ এ বাড়িতে ফ্রিজে রাখা খাবার কেউ মুখে তোলে না। সকালে এক প্রস্থ রান্না হয়। তখন মাছের ঝোল, ভাত আর দু তিন রকম তরকারির সঙ্গে রোজই থাকে একটা চাটনি। বারোমাসই চাটনির চল এ বাড়িতে। চাটনি ছাড়া সুমির শ্বশুর ভাত খান না, আর প্রতিদিন সকালে এইসব ভজঘটো রান্না করে সুমির ননদ পিউ। রাতে তাই সুমির মনে হয়, একবার তার রান্নাঘরে না ঢুকলে, তা নিতান্ত খারাপ দেখায়, তাছাড়া উদাসীনভাবে কর্মবিমুখ হয়ে সে একদম থাকতে পারে না।
আজ সুমির মনটা খারাপ। অফিস থেকে ফিরে, রান্নাঘরে ঢুকতেই ইচ্ছে করছিল না তার, কিন্তু এ অজুহাত সে কাকেই বা দেবে? আর তার সেই কথা শুনছেই বা কে? বিয়ের পর থেকেই সুমি আত্মীয়দের থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ রাখার চেষ্টাও সে করেনি। এক ভীষণ ঘূর্ণিপাকের মধ্যে তখন তার জীবন প্রবাহিত হচ্ছে। সুমি কমলেশের চাকরিটা কমপ্যাশনাল গ্রাউন্ডে পাবার পর থেকে দীর্ঘ এতগুলো বছর এই বাড়িতেই আছে। সুমির ছেলে আকাশের বয়স এখন সাত। এই সাত বছরে সে কখনও কোথাও বেড়াতে যায়নি। কমলেশের মৃত্যু তাকে হঠাৎ করে বাস্তবের ভীষণ কঠিন মাটিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
দুপুরবেলা অফিসেই ফোনটা পেয়েছিল সুমি। মায়ের ফোন। বেলাদিদিকে নাকি অর্ধদগ্ধ অবস্থায় ওর বাড়িতে পাওয়া গেছে। বীভৎস অবস্থা। দেখলে আর চেনা যাচ্ছে না।
সুমি অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল, ফোনটা পেয়ে। তার বুকের ভেতরে অনেক প্রশ্ন তোলপাড় করছিল। সে ভেবেছিল একবার যাবে বেলাদিদিকে দেখতে। যাওয়াই উচিৎ। পরক্ষণেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিল শুধু উচিৎ বলেই যাবে সে? তার কি আগের মনটা মরে গেছে একেবারে? দিনে দিনে এমন নিষ্প্রাণ সে হল কেমন করে? ছোটবেলা থেকে বেলাদিদি আর সুমির সম্পর্কটা কত গভীর ছিল!
এ কথা ভাবতে ভাবতে তক্ষুণি সুমির মনে পড়ে গেছিল, বাড়ি ফিরে গিয়ে তাকে রাতের রান্না করতে হবে। রাতের রান্না কিছুতেই পিউ করবে না। তখন সে পর পর অনেকগুলো সিরিয়ালের ধারাবাহিক পর্ব দেখে। তাই রাতের রান্না তার জন্যই ফেলে রাখবে পিউ, আর ঠিক সময়ে খাবার না পেলেই অশান্তি শুরু করবে বাড়ির সবাই। সে কয়েকবার বাড়িতে রান্নার একটা লোক রাখবে ভেবেছে। তার শাশুড়ি আর ননদ তা হতে দেয়নি। দায়সারা করে খাওয়াদাওয়া করতে পারবে না তারা। সত্যিই এ বাড়িতে খাওয়ার বড় ধূম। এখানে থরে থরে অনেকরকম রান্না হয়। সুমির এক এক সময় মনে হয়, এরা বুঝি কেবল ভালো খাওয়ার জন্য সবাই সবসময় উৎসুক হয়ে থাকে। সারাটা দিন রান্নার ভালোমন্দ নিয়েই চর্চা চলে এ বাড়িতে। রান্না আর খাওয়াটাই এদের কাছে জীবনের একটা পরম বস্তু।
রান্নারলোক এত ঝামেলা নেবেই বা কেন? তারা ঘড়ি ধরে আসে যায়। তার বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেও কথা উঠবে, তা ভাল করেই জানে সুমি। তাই বেলাদিদির মুখটা ভাবতে ভাবতেই একটা চলন্ত বাসে উঠে পড়েছিল সে, তার যাওয়া হয়নি। বেলা উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারের কাছে একটা নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছে। কতটা পুড়েছে ওর শরীর? কত পার্সেন্ট বার্ন? সেন্স আছে কি? বাঁচবে তো?
না, এত প্রশ্ন মাকে করা হয়নি। সুমির রুচিতে বেধেছে। মা বেলাদিদিকে খুব ভালোবাসে। বেলাদিদিকে বোধহয় ওর চেনা-জানা সবাই ভালোবাসে।
রাতের রান্নার জন্য তরকারি সকালেই কেটে রেখেছিল সুমি। মোটামুটি রোজই রাখে। রাতের রান্নার পুরো দায়িত্ব তার। আজ সে রাঁধছে, বেগুন আর বড়ির টকমিষ্টি ঝাল, ঘি দিয়ে পটল আলুর শুকনো তরকারি আর রুটি। রুটি ভাজতে ভাজতে হঠাৎ অন্যমনস্ক হওয়ায় হাতটা তাওয়ার গায়ে লেগে গেল সুমির। মুহূর্তে সেখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে টলটলে ফোস্কা পড়ে গেল। ব্যথায় সুমির মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল উফ্ শব্দটা।
পিউ সোফায় বসে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকলেও ওর কান সজাগ ছিল রান্নাঘরের দিকে। সে মায়ের গায়ে কনুই দিয়ে ঠেলা মারল।
”দেখলে! ভাবখানা দেখলে একবার! যেন একবেলা রেঁধে আমাদের উদ্ধার করছে। ওইটুকু আর আমরা যেন পারি না! তবুও রোজ ওকে রান্নাঘরে ঢুকতে বলি শুধু এইজন্য যে, সংসারটা কার? বাড়ির বউ একেবারে সংসার ধর্মই করবে না! কেবল বাইরে বাইরে ঘুরবে তা কি হয়? কিছু বলো না কেন, মা? তোমার দোষেই ওর এমন ধারা হয়েছে। মুখটা বাড়ি ফেরার থেকে এমন করেছে, যেন তোলা হাঁড়ি।”
সুমি এই কথাগুলো চুপ করেই শুনল। সে জানে, পিউ তাকে একেবারে সহ্য করতে পারে না। প্রথম থেকেই কমলেশের চাকরিটা তারই করার ইচ্ছা ছিল। পড়াশুনো তেমন না থাকায়, সুমিই আগ্রাধিকার পেয়েছে। সেই নিয়ে সুমির সঙ্গে তার বিবাদ। সে সময় সুমির শ্বশুরও চেয়েছিলেন, সুমি’ই চাকরিটা করুক। কী করে যেন তিনি টের পেয়েছিলেন, সুমি তাদের প্রতি কর্তব্য করতে কখনও দ্বিধা করবে না।
সুমি বাপের বাড়ি ফিরে যায়নি, কারণ তার মনে হয়েছিল এই চাকরির টাকায় এই বাড়ির সবার অধিকার আছে। পিউকে বরাবর সহ্য করে নেয় সুমি। পিউয়ের ডিভোর্স হয়েছে। খোরপোশের মামলা করে সামান্য কিছু টাকা পায়, মাসে মাসে। সুমির অফিস যাওয়াকে সে মনে করে একটা বিলাসিতা। যেন সুমি ব্যাভিচার করতে সেখানে যায়।
সুমির বাড়ি ফিরতে সামান্য দেরি হলেই তার মুখে কদর্য ইঙ্গিতবাহী বাক্য ঝরে। সুমি কমলেশ মারা যাওয়ার পর থেকেই, সব বিষয়ে কেমন যেন নিষ্পৃহ হয়ে গেছে। সে যেন জীবনের সমস্ত আকর্ষণ হারিয়েছে। ঝগড়া করতে বা প্রতিবাদ করতে তার ক্লান্তি আসে। পিউয়ের চীৎকার তাকে স্পর্শ করে না। এ বাড়িতে তার বেঁচে থাকার একমাত্র আকর্ষণ হল তার ছেলে আকাশ। আকাশের জন্য এই বাড়ি ছাড়েনি সুমি। কেন ছাড়বে? এ বাড়ির উত্তরাধিকারী যে আকাশ! তাকে কেন ওর সব আত্মীয়দের থেকে আলাদা করে দেবে সে?
আকাশ পড়া ছেড়ে উঠে এল রান্নাঘরে। সুমির আঁচলের কোণাটা ধরে বলল,
‘মা খিদে পেয়েছে।’
‘এখন রাতের রুটি আর একটা তরকারি হয়ে গেছে, খেয়ে নাও’
‘না রুটি খাব না। একটু ভাল খাবার কেন করো না? রোজ রোজ খালি রুটি?’
‘রাতে রুটিই তো ভাল।’ ছেলের কথার মাঝখানে শাশুড়ি টিভি সিরিয়াল দেখে উঠে পড়েছেন।
‘ওকে না হয় একটা ডিম ভেজে দিও বৌমা। ছেলেমানুষ রোজ রাতে নিরিমিষ কি ভালোলাগে ওর?’
সুমি হাতের পোড়ার তীব্র জ্বালা উপেক্ষা করে, যন্ত্রের মত ডিম ভাজতে লাগল।
‘একটু চা বসাও তো বৌমা!’ শ্বশুর ঘরের ভেতর থেকে হাঁক পাড়লেন।
‘এই দিচ্ছি বাবা। ওভেনে একটা তরকারি হচ্ছে, নামিয়েই দিচ্ছি।’
কাজের মধ্যে সুমির মাথাটা যন্ত্রনায় ফেটে যাবে মনে হয়। এক একদিন বিকেলে হঠাৎ করে তার এমন হয়, মাইগ্রেনের ব্যথা। সে তবুও যন্ত্রচালিতের মতো কাজ করে যায়। তাকে কেউ একবারও কিছু খাবে কিনা জিজ্ঞেস করে না। এমনটা নতুন নয়, এমন ব্যবহারই এ বাড়িতে সে বরাবর পেয়ে আসছে। কমলেশ থাকলে কি এমন হত? নিশ্চয়ই না। কিছুতেই না। কমলেশ বেঁচে থাকলে তাকে ভালোবাসত খু-উ-ব। তার জীবনটা অন্যরকম হতে পারত কমলেশ থাকলে।
তবে কমলেশকে সে বেশি পায়নি। তবু তাকে কয়েকদিনেই বড় বেশি ভালোবেসেছিল সুমি। ভালোবাসে বলেই তো সে, প্রথমদিকে অফিসে আর যাতায়াতের সময় রাস্তাঘাটে অনেক তরুণদের অনেক আবেদন হেলায় ফিরিয়ে দিতে পেরেছে। কমলেশের মুখ মনে করতে করতে সে মনে মনে উচ্চারণ করেছে, আর কোনও পুরুষকে সে এ জীবনে ভালোবাসতে পারবে না। এই উচ্চারণ যেন সুমি নিজের অন্তরাত্মাকে শুনিয়েছিল।
মনে মনে সে নিজেকে বলেছে, ঠিক বেলাদিদির মতো সে কেবল স্বামীকেই ভালোবাসে। সে দূর থেকে বেলাদিদির অপার সুখ দেখে ভেবেছে, আছে একটা সুখের জগৎ আছে! সেখানে তার প্রবেশের অধিকার না থাকলেও, পৃথিবীর বুকে এমন জগৎ মোটেই অলীক নয়। তার মনে এক ধরণের সতৃষ্ণ ভালো লাগার অনুভূতি হয়েছে।
কমলেশের মুখটা মাঝে মাঝে কিছুতেই আর মনে করতে পারে না সুমি। সাত বছর আগে দেখা মানুষটার একটা অস্পষ্ট অবয়ব সামনে আসে। আবার ফিরে যায়। মুখটা কি ভুলে গেল সে? সুমি কমলেশের ছবি দেখে। ছবি দেখলে আবার মনে পড়ে যায়, সেই মুখ। কমলেশের বয়স বাড়েনি আর একফোটা। অথচ সুমি এখন প্রায় চল্লিশ।
মা একদিন বলছিল, ‘এবার নিজের কথা একটু ভাব সুমি।’
নিজের কথা বলতে মা কী বোঝাতে চেয়েছে? তার নিজের জন্য কী ভাববে সে? বিয়ে? তা কী করে হয়? এখন সে যথেষ্ট মুটিয়ে গেছে। মুখে চোখে হতাশার ছাপ বয়সটাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আর কেউ প্রেম প্রস্তাব দেবে না তাকে। দেবে কি? আচ্ছা এমন কেন ভাবছে সে? কেউ তাকে বিয়ের কথা বললেই কি সঙ্গে সঙ্গে সে এগিয়ে যাবে নাকি? আকাশের কী হবে তখন? ওর মা ছাড়া যে পৃথিবীতে কেউ নেই! অবশ্য বিদেশে এমন বিয়ে হয়। দুপক্ষেরই ছেলে মেয়ে একসঙ্গে থাকে। এখানেও গল্পের বইতে এমন বিয়ের কথা সে পড়েছে। খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে পাত্র পাত্রীরা নিজেরাই নিজেদের বিয়ের ব্যবস্থা করে আজকাল।
সুমির মাথাটা ভার লাগে। রান্নার পরে তার রাতের রুটি করা এখন শেষ হয়েছে। এবার একটু গিয়ে শুয়ে পড়বে সে। বিছানাটা যেন টানছে তাকে।
‘বৌমা! তোমার বাবাকে এবার রাতের খাবারটা বেড়ে দাও। আকাশকেও খেতে দাও। বাচ্চা আর বুড়ো দুজন আগে খেয়ে নিক। আমি এবার একটু জপ করতে বসব। আজ সন্ধ্যায় একটা ভাল বাংলা সিনেমা দেখছিলাম। সন্ধ্যের পুজোটা আজ সারা হয়নি এখনও।’
সুমি দুটো থালায় রাতের খাবার সাজাল। তারপর সে একগ্লাস জল খেল, সঙ্গে একটা পেইন কিলার আর অম্বলের ওষুধ। আজ রাতে তার খেতে ইচ্ছা করছে না। শুয়ে শুয়ে বিয়ের দিন মায়ের বলা কথাগুলো মনে করছিল সুমি।
”কী হল সুমি? চুপ করে কী ভাবছিস? তুই তো আমার কথা ফেলতে পারবি না, আমি জানি। তোর উপর আমার সে ভরসা আছে। এমন করে চেয়ে চেয়ে কী ভাবছিস তবে? যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। নাহলে মুখ পুড়বে আমার দাদাটার। মানুষটাকে দেখ, একবার! শেষে স্ট্রোক না হয়ে যায়। একেই হাই প্রেশারের রুগী!”
সুমি এখন বোঝে, তার মা-ও তালেগোলে তার বিয়েটা বিনা পয়সায় দিয়ে দিতে চেয়েছিল। তাদের ছিল অভাবের সংসার। মাকেও একেবারে দোষ দেওয়া যায় না।
মাঝে মাঝে সুমির অফিসে আসত বেলা। সে খুব সুন্দর করে সাজে সবসময়। সুমিকে দেখে বলত,
তোর এই বেশ একটা পাকাপোক্ত ব্যবস্থা হয়েছে। তুই বেশ ভাল আছিস। মেয়েদের নিজের কিছু টাকা পয়সা থাকা বড় দরকার। আমিও তাই এখন একটা ব্যবসা করছি। যদিও আমাদের সংসারে তেমন প্রয়োজন নেই, তবুও করি। নিজের খরচ চালাই। ব্যবসাটা হল কসমেটিক্সের। ওরিফ্লেম। তুই কয়েকটা সাজার জিনিস নিয়ে নিস, তোদের অফিসে কারুর লাগলেও বলিস। সুমি বেলার কাছ থেকে কয়েকরকম প্রসাধনী কিনে নেয়। সে যদিও এসব ব্যবহার করে না, তবুও। বেলাদিদিকে দেখে অফিসের বুড়ো বুড়ো লোকেরাও চঞ্চল হয়ে ওঠে কেমন। কেউ কেউ বলেও,
‘উনি কে হন তোমার? দারুণ সুন্দরী তো!’
সুমি হাসে মনে মনে। বলে,
‘আমার দিদি।’
‘তোমার কীরকম দিদি হয়? ওঁকে মনে হয় আগেও কোথাও দেখেছি!’ মিত্রদা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলেন।
ঘুমের মধ্যে হাতে ঘসা লেগে ফোস্কাটা গলে যেতেই, যন্ত্রনায় চোখে জল চলে এল সুমির। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল, পুড়ে ঝলসে যাওয়া বেলাদিদির কথা। সারা শরীরে পোড়ার জ্বালা নিয়ে কী ভয়ানক কষ্টে আছে বেলাদিদি! শিউড়ে উঠল সুমি। আবার ঘুমিয়ে পড়তেই সে এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখল। গভীর বনের ভেতর একটা গাছতলায় সে যেন একা বসে আছে। গভীর ধ্যানে তার শরীর চেতনা লোপ পেয়ে গেছে। চারদিকে অপার শান্তি। কেউ কোথাও নেই চারপাশে। এমন শান্ত বনভূমি সে কখনও দেখেনি। স্বপ্নটা এমন বাস্তব যে সুমি নিজের শরীরে ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ পেল। সে একটা পার্বত্য ছোটো নদীর কাছে গাছের নীচে বসে আছে। নদীর জলের ছলছল কানে আসছে তার। এমন সময় সে একরকম নরম আলো দেখতে পেল। সেই আলোর ছটায় সে বিভোর হয়ে গেল। সেই আলো তীব্র উজ্জ্বল, অথচ তাতে কোনো তাপ নেই। এই আলোর উৎস কোথায়? ভাবতেই সে দেখতে পেল, সেই আশ্চর্য আলো তার বুকের ভেতর থেকে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বুদ্ধের জীবনী মন দিয়ে একসময় পড়েছিল সে। বুদ্ধের বানী ‘আত্মোদীপো ভব’, কথাটা তখন তাকে বড় নাড়া দিয়েছিল।
সুমি দেখল আলোর ভেতর শাক্যমুণি বুদ্ধকে। তিনি হাত তুলে সুমিকে আশীর্বাদ করলেন। এক অপূর্ব শান্তিতে সুমির মন ভরে গেল। খুব ভোরে তার ঘুম ভেঙে গেল। সুমি ভাবতে লাগল, সে কি এই বন্ধন, এই সংসার থেকে পরিত্রাণ চাইছে মনের গভীরে? নিত্য দিন যাপনের কালিমা আর সে কি বইতে পারছে না? তাই কি এমন একটা স্বপ্ন দেখল সে? কিন্তু এমনটা কখনও হবার নয়! আকাশকে বড় করতে হবে। বাড়ির সকলের দায়িত্ব কি এমন করে এড়িয়ে যাওয়া যায়! সকালে অফিস যাওয়ার আগে শাশুড়িকে বলল সুমি,
‘আজ আমি একবার বেলাদিদিকে দেখতে যাব।’
‘ও তোমার সেই যে দিদি, বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে গেছিল? তা কেমন আছে এখন? পুড়ে গেছে শুনছিলাম, পিউ বলছিল।’
‘আজ আমার বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হতে পারে।’
‘দেরি বেশি করো না। রাতের রান্না কিন্তু পড়ে থাকবে। আকাশ আর তোমার বাবা বেশিক্ষণ আবার না খেয়ে থাকতে পারে না।’
সুমির মুখে এসে গেল, একদিন একটু পিউকে বলবেন, যেন রাতের রান্নাটা ও করে নেয়। কিন্তু অশান্তির ভয়ে চুপ করে থাকল। সে বিতর্ক এড়িয়ে চলে। প্রাণান্তে চায় না বিবাদ বেড়ে উঠুক। বলে উঠল,
‘রাস্তায় এখন খুব ট্রাফিক জ্যাম হচ্ছে। যদি রাস্তা ফাঁকা থাকে, তাহলে অনেক তাড়াতাড়িই ফিরে আসব।’
অফিস বেরনোর সময় একদম বাড়ির গেটের মুখে এসে কথাটা বলেছে সুমি। যাতে কথাকথি এড়ানো যায়। পিউ এর হিংস্র চীৎকার শোনার আগেই সে বাড়ির সামনের এই গলিটা পেরিয়ে যেতে চায়।
যেতে যেতে শুনতে পেল পিউ বলছে,
‘আজ কোথায় একটা যাবে বলে গেল? তাই না? ফিরবে কখন তোমাকে কিছু বলে গেছে? না সেটুকুও বলেনি?’
বাসে অফিস যেতে যেতে ভাবছিল সুমি, রীজুদা এখন কী করছে? বেলাদিদি আর রীজুদার এমন ভালোবাসা যেন মনে হয়, দুজন শুধু দুজনের জন্যই পৃথিবীতে এসেছে। সুমি একবার ভাবল, রীজুদার সঙ্গে কথা বলে নেবে। নেওয়াই উচিৎ। খবরটা শোনার পর থেকে, একবারও কিছু বলা হয়নি ওকে। বলতে পারেনি। ওদের একটাই মেয়ে, মউল। তার ছেলের চেয়ে একটু ছোট হবে বয়সে। আহা! মউল এখন কেমন আছে? এই খবর কি তাকেও দেওয়া হয়েছে? মামা মামি, মানে বেলাদিদির বাবা এবং মা, মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। মামি তো বিয়ের আগে থেকেই ছিলেন না। মামাও চলে গেলেন, বছর খানেক আগে। সুমি রীজুর ফোনে একবার ডায়াল করল। ফোন সুইচড্ অফ।
অবশ্য সুমি তখনও পুরো খবর পায়নি। খবরটা পেল অফিসে ঢুকে। ওর মা ফোন করে বললেন,
‘জানিস! রীজুকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে! ওদের নাকি ওকেই সন্দেহ হচ্ছে! ও-ই নাকি আগুন লাগিয়েছে বেলার গায়ে। পুলিশ বেলার জবানবন্দীর জন্য হাসপাতালে ঘুরছে।’
‘না না এটা সত্যি নয়। হতেই পারে না। আমি বিশ্বাস করি না।’ বলল সুমি। তার গলায় যেন স্বপ্ন ভঙ্গের হতাশা! একটা স্বপ্নিল জীবনের সুখের গল্প এমন করে মিথ্যে হয়ে যাবে হঠাৎ?
অফিস থেকে একটু আগে আগেই বেরিয়েছে সুমি। তারপর পৌঁছাল গ্রীনভিউ নার্সিংহোমে। শুনেছিল বটে, বেলাদিদি বিশ্রী ভাবে পুড়ে গেছে, তবে এমন বীভৎস দৃশ্য দেখত হবে, ভাবেনি সুমি। বেলাকে দেখে তার গা গুলোতে থাকে। মুখের চামড়া বলে আর কিছু নেই। ঠোঁটের মাংস ঝুলছে। চোখদুটো প্রায় গলে গেছে। সুমিরও যেন সর্ব শরীর জ্বলছে মনে হয়। বেলার মাথার কাছে বসে থাকে সুমি। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, বেলাদিদি আর কিছুতেই বাঁচবে না, যেন মৃত্যুর থেকে ওর সামান্য দূরত্বটুকুই কেবল বাকি। পুলিশ কয়েকবার ঘুরে গেছে জবানবন্দীর জন্য। সবসময় জ্ঞান থাকছে না ওর। মাঝে মাঝে জ্ঞান ফিরছে, তবে বেদনার অনুভূতি বোধহয় নষ্ট হয়ে গেছে। নার্ভ পুড়ে গেছে। বেলার একটা ভোঁতা দৃষ্টির সামনে সব কিছু ওলোটপালট হয়ে যেতে থাকে সুমির। একটা সুখের জগৎ, একটা সাজানো স্বর্গ যেন সামনে থেকে হঠাৎ খানখান হয়ে ভেঙে যাচ্ছে তার। সুমির চোখ জলে ভেসে যেতে থাকে। তাহলে পৃথিবীর সবকিছুই বাইরে থেকে যা সাজানো সুন্দর মনে হয়, সবই এমন ফাঁপা? মিথ্যে? যেমনটা এতদিন সে ভেবেছিল, তার সব ভুল?
এখন ঘোরের মধ্যে কেবল ভুল বকছে বেলা।
”বেশ, আমি না হয় বেশ্যা! আর তুমি? তুমি কী রীজু? যে নিজের বউকে ভেট পাঠিয়ে নিজের চাকরি গুছিয়ে নেয়! দামি ফ্ল্যাট কেনার জন্য লোন পাশ করায়! সব কিছুই তো হলো রীজু! তবে এখনও তোমার এত লোভ কেন? আর কত? আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না। একদিন তোমার হাত ধরে চলে এসেছিলাম। সেদিন পিছনে ফেরার কোনও উপায় ছিল না, আমার। আমি তোমাকে ভালোবেসে সাহায্য করতে স্বেচ্ছায় তখন নীচে নেমেছিলাম। তোমার একটা পাকা চাকরির জন্য পার্টির নেতা, আর তোমার অফিসের বসের শয্যায় নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছি। অথচ সেই তুমিই আমার দিকে যখন জ্বলন্ত দেশলাই কাঠিটা ছুঁড়ে দিলে, দেখতে পেয়েও আমি জানো, এমন তুমি করতে পারবে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারিনি। আজ আরও একটা জিনিস বুঝলাম, মনের ক্ষতের যে বীভৎস দহন তার কাছে শরীরের কষ্টের কোনো তুলনা হয় না। তা তো অতি তুচ্ছ! ছি রীজু ছি!”
সুমি পাশে বসেও বেলার কোনও কথা বুঝতে পারল না। তার মনে হল, বেলাদিদি কী সব যেন অস্পষ্ট ভাবে বিড়বিড় করছে। যেন বেলাদিদি কেবল বলছে,
উফ জ্বালা —জ্বলছে! ছি রীজু! ছি!
সুমির নার্সিংহোমে আর একটুও ভালো লাগে না। এখানে সে আর আসবে না। কেবিন থেকে বেরিয়ে ফাঁকা করিডরে এসে, একটু শান্তির নিঃশ্বাস নিল সুমি। তার নিজের শরীরে সে কেমন একরকম দহন অনুভব করে। হঠাৎ সুমির মাথা ঘুরছে। তার মনে হচ্ছে এক্ষুণি এখান থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে। কোথায় যাবে সে জানে না। তার শরীরের উত্তাপে যেন তার ত্বক ঝলসে যাবে। হঠাৎ তার মনে হল শুধু সে নয়, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী এক একজন এক একরকম জ্বালায় জ্বলছে। কেউ বাদ নেই। কেউ ভালো নেই। এক একজনের ক্ষেত্রে সেই দহনের চরিত্র আলাদা, রূপ অন্য, কিন্তু আছে। এর হাত থেকে কারুর মুক্তি নেই, তবে কেবল কেউ কেউ এমনটা টের পায়। কারণ বেশিরভাগ মানুষেরই এই ভয়ানক দহন-জ্বালায় কোনও অনুভূতিই হয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.