জয়শ্রী সরকারের গল্প: বিজয়া টকিজ

দুইটা শালিখ ঊর্ধ্বাকাশের দিকে চেয়ে যখন বসে আছে তখনই তিনটা চড়–ই ফুড়ুৎ, ফুড়ুৎ করে উড়ে এল। মুহূর্তেই পাড়া উজার। দুর্গেশপত্রনবীশের পোষা বিড়ালটা রেলিং টপকে প্রাচীরে এসে বসতেই দজ্জাল পক্ষীরা চিলের মত উপরে চক্কর কাটতে লাগল। বিড়ালটা প্রাণভয়ে বাড়ির ভিতর ছুটে গেল।
পাড়াটা কেমন পাল্টে গেছে।ভাবতে ভাবতেই নিখিলেশ ফুল্লুদের বাড়ির সামনে এসে থামলো।ফুল্লু তার খেলার সাথী ছিল। সমবয়সীদের মধ্যে ঐ প্রথম সাঁতার শিখেছিল। দেখতে রোগা পটকা হলেও গায়ে বল ছিল। মুরগীর লড়াইয়ে একে ওকে গুতিয়ে ফেলে দিত। যতদূর তার মনে পড়ে এই বাড়িটাই তাদের। টিনের চৌচালা পাল্টে হাফ বিল্ডিং হয়েছে। সবুজ ঘাসের যে বিশাল একটি উঠোন ছিল সেও সিমেন্টের অতলে ডুব মরেছে। নিখিলেশ এদিক ওদিক উঁকি দিয়ে গৃহস্থকে দেখার চেষ্টা করে। একটা টোপর দোলানো মুরগী ছাড়া কাউকে দেখা যায়না।
 
ফুল্লুর স্মৃতি ফুরতে না ফুরতেই মন্দিরা কাকীমাদের ঘাটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে নিখিলেশ। এই সেই ঘাট। কাকীমা সারাদিন ঘাটেই পরে থাকতেন। ছুঁচিবায় তাকে ঘাটছাড়া হতে দিতনা। ঘুম ভেঙ্গে উঠে বাসী মুখে জল দিতেন এসে ঘাটে। পুবমুখী হয়ে সূর্যপ্রণাম করতেন।এরপর হাত ধুয়ে বাড়ির মধ্যে যেতে যেতে উনার আবার হাত ধোওয়ার সময় হয়ে যেত। সারাদিন ঘাট ঘর করে করে হাত পায়ে ঘা হয়ে গিয়েছিল। এই নিয়ে ঘরেবাইরে সবাই মুখ টিপে হাসত। এতকাল পরে তিনি নিশ্চয়ই আর বেঁচে নেই, ভাবতে ভাবতে নিখিলেশ এগিয়ে যায়।
 
হাঁটার পথে লক্ষ্মী গৌরী কারোর দেখা মিলেনা। এতকাল পরে ওদের ঠিকানা বদল হওয়াইতো প্রথা। তাছাড়া সকলেই এতদিনে বুড়িয়ে গেছে। হয়তোবা বেঁচেও নেই। তবু একবার ওদের বাড়ির উঠানের সেই জাম গাছটা দেখার ইচ্ছে হয় তার। গাছের নিচে জাম টুইটুম্বুর হয়ে থাকতো। কি সে কম্পিটিশন কার আগে কে জামতলায় পৌঁছবে। চোখের সামনে সে দেখে ইংলিশ প্যান্ট পরা একটি ছেলে ছুটে আসছে।নিজের ছোটবেলা দেখে মনটা কেমন দুলে ওঠে।নিখিলেশ একটু দাঁড়ায়। একবারটি উঁকি দিয়ে সেই গাছটি দেখার সাধ হয়। বিশাল ইমারতের কোন ফাঁক দিয়ে যে বাড়ির ভিতর দেখা যাবে, তাই বুঝে উঠতে পারেনা। খলাপাড়া, সেন, দত্তকাকু কারো বাড়ির সামনেই সে কোন উঠান দেখতে পেলনা। যে উঠান ধরে সে তাদের অন্দরে পৌঁছে যেতে পারে। বাড়িরগুলোর সদর দুয়ার বন্ধ। ঘুমটুম কারো ভাঙেনি এখনো। অথচ গোবর ছিটানোর সময় বয়ে যায়। ঘাটে বউঝিয়েদের সমাগম নেই। বাড়ির সামনে ফুঁটে থাকা সারিসারি রক্তজবা, ঝুমকোলতা, শ্বেতজবা, কলাবতি ফুলের গাছ থেকে কত বাহারী ফুল ঝুরঝুর ঝরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত সকালে। তাদের চিহ্নমাত্রও আজ চোখে পড়ছে না। কত আম-জাম-বেলগাছ ছিল চারধারে। চেনা উঠান, মানুষ, গাছগাছালি সব উধাও। বাড়িগুলো উঠান ডিঙ্গিয়ে এগোতে এগোতে যেন পুস্কনির উপরে ঝাপিয়ে পড়তে চাচ্ছে। ঘুমচোখে এ বাড়ি, ও বাড়ি দাপিয়ে বেড়ানো খোকাখুকুরাই বা কই চলে গেল!
 
ভাবতে ভাবতে নিখিলেশ এগোয়। যতই এগোয় ততই তার মন ভিজে উঠে।
 
কিছু মানুষের আনাগোনা এখন শুরু হয়েছে। কেউ কেউ প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছে। ফুল খুঁজে না পেয়ে কেউ কেউ হা পিত্তেশ ভঙ্গিতে ছুটে যাচ্ছে। কারো কারো সাঁঝির তলানিতে গোটাকয়েক ফুল। যাওয়ার পথে আড়চোখে ওরা আগন্তুককে দেখে যায়। কেউ তাকে চিনতেও পারেনা। সেও কাউকে চিনতে পারেনা।
 
নিখিলেশের হঠাৎ জব্বার ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। বাড়ির সামনে একটি গন্ধরাজ ফুলের গাছ ছিল। বাড়িটা পুস্কনির কোন কোণায় ছিল গোল পাকিয়ে যায়। তিনি বেঁচে থাকলে নিখিলেশকে নিশ্চয়ই চিনবে। বাড়িটির আবছা ছবি চোখে ভাসলেও দিক মনে হয়না। পথগুলোও বদলেছে। পুস্কনির রূপই কি পাল্টায়নি! অযুত নিযুত পরিবর্তনের মধ্যেও নিখিলেশ স্মৃতি হাতরায়। ড্রয়িংখাতায় স্কেচে আঁকা যেন সেসব দৃশ্য। একটি একটি ছবি বের হয়ে আবার খাতায় এঁটে বসে যাচ্ছে। সেইসব স্মৃতি ছুঁয়ে আপনমনে সে হেসে ওঠে। পুস্কুনির কোনায় জংলীছাপা ঘোমটা তোলে দুজন হেলি শাক কুড়াচ্ছিল। হাসির শব্দ পেয়ে ওরা সচকিত হয়। চোখাচোখি হতেই ওরা ঘোমটা টানে। নিখিলেশ ওদের মুখটি যেন একবার দেখতে চায়। গোপনে থাকা কোন চেনামুখ যদি পেয়েই যায়। ওরা ততক্ষণে হেঁটে চলে গেছে। নিখিলেশ ওদের পথ ধরেই হাঁটে। হঠাৎ আকাঙ্ক্ষা কোন মুখচ্ছবি দেখার জন্য মন চঞ্চল হয়ে উঠে। কিন্তু ঘোমটা পরিহিতারা পশ্চিম দিকে চলে যাচ্ছে। নিখিলেশ থামে। ঘুরতেই চোখে পড়ে বাড়িটি। পিতলের প্লেটে কালো অক্ষরে লেখা মৃত্তিকা ভবন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর বাসভবন। নয়া বার্নিশের আস্তর, আতাফল রঙের পাচিল ঘিরে রেখেছে বাড়িটিকে। এইতো সেই বাড়ি।
 
আনন্দ ও বিস্ময়ে নিখিলেশের চোখ জ্বালা করে ওঠে। কত প্রতিক্ষীত এই বাড়ির সাথে দেখা। কিন্তু যে বাড়ি এতকাল স্মৃতিতে এই বাড়ি কি সেই বাড়ি! চারদিকে এমন প্রাচীর ছিল না। পুস্কনির মিঠে হাওয়া সারাক্ষণ ঘরময় থাকতো। বাইরে থেকে বাড়ির কিচ্ছুটি প্রায় দেখা যাচ্ছে না। এই দেখতেই কি সে এতদূর এল! এইবাড়িতে তার আঁতুরঘর। এখানে তার শৈশব ঘুমায়। এই মাটিতে তার নাড়ি পোতা। এতবছরের ধৈর্য্য যেন গলে গেল। নিখিলেশের চোখের সামনে ঘরদোর, খাট পালং, মায়ের শালকাঠের ড্রেসিং ট্রেবিল, আলমারী, বসার চেয়ার, ঠাকুর ঘর, খেলনা পাতি কত কি জড়ো হতে থাকে। সেসব দেখার জন্য বাড়ির ভিতরে যেতে হয়না। তবু কি সে একবার তার ভিটেতে বসে যাবেনা। অন্দরে না বসলেও কি উঠানে একটু ঠাঁই পাবে না! সাগরের ফেনিল ঢেউয়ের মত কথারা ধেয়ে আসছে। তোলপাড় করে আছড়ে পড়ছে হৃৎপিন্ডের মাঝখানটায়।
 
আহা, কত ছবি। একের পর এক আসছে। অনেকটা বায়োসকোপের মত। সেইযে হলুদ পলেস্টার কাপড়ের চোখ ধাঁধানো জড়ি পাড়ের পোশাক পরা মানুষগুলো আখড়ার সামনে বায়োসকোপ নিয়ে বসে থাকতো। চোখে একটা রঙিন চশমা পরিয়ে দিলে নিখেলেশ ফুটো দিয়ে তাকাতো। লোকটি গাইতো, দেখো দেখো দেখো উল্টা ছাতার পাট দেখো. . . .লালা..লা। তারপর সেই বাক্সে বাঘ, সিংহ, শহর, দূরদেশের ছবি একের পর এক দেখা যেত সেইরকম।
 
নিখিলেশ ভাবে, একবার কি গেইটে নক করবে? ভদ্রতায় বাঁধে। রাষ্ট্রপক্ষের মানুষ থাকে।কোনরকম অনুমতি ছাড়া কি সে ঢুকতে পারবে? সে যে চোর বা ডাকাত নয় যে কেউ দেখে বুঝতে পারবে।তবু, এতবছর পর কোন অধিকারতো নেই। শত্রুসম্পত্তির মালিকের অর্থ দাঁড় করালে তার আইডেন্টিটি দাঁড়ায় শত্রু। শত্রুকে কি দিবে অন্দরে প্রবেশের অনুমতি! একটু খটকার মধ্যে পড়ে যায় মন। সাধারণ বাড়ি হলে সে কলিংবেল বাজিয়ে ঢুকে যেত। এখনতো একটুআধটু ভেবেই ঢুকতে হবে। তবু সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। গেইট খুলে কেউ যদি বাইরে আসলে সে না হয় অনুমতি নিয়েই এক নজর দেখে চলে যাবে।
 
একটি গাড়ি বের হয়ে আসছে। গাড়িতে বসে আছেন অফিসার মত একজন। ডানে বামে চেয়েও দেখছে না। নিখিলেশ ভাবেন, গাড়িটি থামাবে। এই বাড়িটি তাদেরই ছিল। কেন সে এতদূর এসেছে তা খুলে বললে নিশ্চয়ই তাকে অ্যালাউ করবেন। কিন্তু কোন সুযোগ না দিয়ে গাড়িটি শ শ করে ছুটে যায়। দাড়োয়ান সঙ্গে সঙ্গে গেইটটি লাগিয়ে দেয়।
 
নিজ গৃহে প্রবেশে অন্যকারো অনুমতির অপেক্ষা যতটা অসম্মানের তার চেয়েও বেশি হৃদয়ভাঙ্গা। নিখিলেশের মুখাবয়বে তারই ছায়া ঘনায়। সে পুস্কনির পাড়ের পাথরের বেঞ্চিতে বসে দম নেয়। সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়েছে চারপাশে। বসে বসে সেসব দেখে সে। কেউ বাজারের ব্যাগ নিয়ে হনহন করে ছুটে যায়। কেউ বাচ্চাকে নিয়ে যাচ্ছে স্কুলে দিতে। কেউ কেউ পুস্কুনির পাড়ে বসে নিমের ডালে দাঁত ঘসছে। কেউ মাত্রই সাঁতারের জন্য ভেসে গেল। কেউ ডুব দিয়ে পাড়ে উঠে বসলো। কেউ লুঙ্গিতে দাঁত গুজে ভেজা কাপড় পাল্টাতে পাল্টাতে গল্পে মেতে। কেউ কেউ অলস সকালে বাসার সামনে পুকুর ধারে দাঁড়িয়ে এমনিতেই পায়চারী করছে। কিছু বাচ্চাকাচ্চা সদর দুয়ারে একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার উধাও।
 
একটি মেয়ে এপথেই আসছে। কোলে ষোল সতের মাসের একটি শিশু। ‘বাপ চাচাদের না দেইখ্যা যাসগা, তোর সাহস কত্তরে ছেরি’ – মাঝবয়সী একজন ভদ্রলোক হেঁকে উঠে। লোকটির কথায় মেয়েটি থামে। এক গাল হাসি ছড়িয়ে বলে, দেখিনাইগো চাচা। আছ কেমন? লোকটি মেয়েটিকে কবে এসেছে, কতদিন থাকবে এসব জিজ্ঞাসা করে। এরপর বাসায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় দেয়। দৃশ্যটি মনে রেখাপাত করে নিখিলেশের। এইখানে কি এমন একটি মানুষও আর বেঁচে নেই, যে তাকে চিনতে পারবে। তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে এমনি করে জিজ্ঞাসা করবে। শাসনের সুরে বলবে, কত বড় সাহস তোর বাপের! না বলে ভিটা ছাইড়া গেলোগা! আমরা কি আছিলাম না! আবার তুই আইসা বাইরে বইসা আছস ছেরা?
 
অভিমান হয়, আবার নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। সেই সত্তরের দশকে এই বাড়িতে কে থাকতো, তারা বেঁচে আছে না নেই, কেনই গেল- আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে সেসবে কার কি আসে যায়! তার নিজেরেই কি কিছু আসে যায়! এখন সে যদি ফিরেও পায় সব, সেই কি থাকতে পারবে! পরবাস কি এতবছরে তার অভ্যাস হয়ে যায়নি! একটি গাছকে শিকড় উপড়ায়ে কোথাও নিয়ে ফেললে সেই গাছ যেমন আগের মত মাটির অতলে তাকে প্রতিস্থাপন করতে পারেনা। তেমনি অনেকবছর পর তাকে পূর্বের মাটিতে এনে রাখলেও কূল মেলে না। বাস্তুহারাদের সংকটটাই সেখানে। তাই আমৃত্যু এই টানাপোড়ন তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হবেই। জেনারেশন থেকে জেনারেশনকে এর ঘানি টানতেই হবে। ইটস এ্যা নেভার এন্ড ইস্যু।
 
তাইতো ওদেশে দুঃখ অসম্মান সুখেও নিখিলেশদের অতীতের মায়া কাটে না। সময়ে অসময়ে আদুরে উঠান, মেঠো পথ, পুস্কুনিতে ধুপধাপ লাফিয়ে পড়া, সাঁতার কাটা, মাঞ্জা দেয়া লাটাই-ঘুড়ি, কাগজের নৌকা, বিজয়া টকিজের লাল নীল বাতিরা টলমল করে। এই ভিটেদর্শন কি শুধু পিতৃআজ্ঞা পালনের জন্যই! তীব্র আকাঙ্ক্ষা না থাকলে ছেলে মেয়ে, স্ত্রীর কথা অমান্য করে নাতিকে বশ মানানোর যুদ্ধটা সে করতনা। কিসের এত টান?
 
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বারবার নিখিলেশ ঘাড় ফিরিয়ে বাড়িটি দেখে।ভিটেয় আশ্রয় না পেয়ে আবার জলেই চোখ গুজে। কত স্মৃতি গচ্ছিত রাখা এই জলে। ঝুমম ধরা বৃষ্টিতে জমজ দুই ভাইয়ের একজন সুপারির কূলে বসে, অন্যজন তাকে টেনে নিচ্ছে। বৃষ্টিতে গাড়িগাড়ি খেলা ভিজে চুপসে গেছে। কুলটা ভিজে জুবুথুবু হয়ে যাওয়ায় টানতে পারছেনা। বিজয়া দেবী দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়।
 
‘ওরে জ্বর হইবো। এক্ষুনি আয়’
 
নিখিলেশ অবাক বনে যায়। তার মা এইখানে চলে এসেছে! তাহলে গঙ্গায় যাকে ছাই করে ভাসিয়ে দিলে সে কে! হঠাৎ পুস্কনির উপর ঝুঁকে থাকা গাছ থেকে একটা নারকেল টুপ করে জলে পড়ে। ঝপাৎ করে ঘটিখানেক জল লাফিয়ে ওঠে। নিখিলেশ ছিটকে আসা জলটা মুছে নিয়ে রুমালটা পকেটে রাখে। এসব আবেগকে উপেক্ষা করা যাবে না সে জানতো। আজ তার সেসব ইচ্ছেও করে না। অনেকবছর পর সে মাকে দেখতে পেল। ঘোর হলেও তার সুখ লাগে। মিঠে সুর খেলে যায় মনে। অপরাহ্নের মৃদু হাওয়ায় কেউ একজন কথা বলে ওঠে।
 
আইজ আমি খুব খুশি বড়খোকা? আমি জানতাম তোমরা আসবা? সবাই আসবা।
 
নিখিলেশ চমকে উঠে। বিজ্ঞানের এই বিপুল বিজয়ের দিনে এও কি সম্ভব! নিখিলেশের দর্শন এসবকে অগ্রাহ্য কোনদিন করেনি। তবে তন্দ্রা শুনলে ভুতুরে ভেবে এই বয়সেও তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইবে ভয়ে। মেয়ে হয়তো রাতে ঘুমাবেই না। কিন্তু সে তো জানে, কেউ চিনুক আর নাই চিনুক বিশ্বেশ্বরীর তাকে চেনবারই কথা। মানুষের মত ক্ষণজন্মাতো নয় সে। জনপদের সাক্ষী হয়ে সেই কবে থেকে ঠাঁয় বসে আছে। পরম মমতায় নিখিলেশের চোখদুটো ছলকে ওঠে। কতকথা জমা আছে এই পুস্কুনিতে। ভিটেহারা জীবনে ঠাকুরমা এইসব কিচ্ছা বলে বলে শিশুমনে সেসব রেখাপাত করে গেছেন। সেসব কিচ্ছা বলে বলেই যেন তিনি স্বদেশ ভ্রমণ করতেন। স্বদেশের স্মৃতি জিইয়ে রাখার লড়াই করতেন।
 
এই পুকুরের একটা গল্প আছে। গল্পটা একটু বলে নেই। তখন নিউটাউন ছিল সাতপাই মৌজা। সাতপাই মৌজার পুরোটাই কালিগঞ্জ। গৌরীপুরের রাজা বীরেন্দ্র কিশোর সাতপাই মৌজার অধিপতি ছিলেন। বিজয়া টকিজ থেকে বিলপাড় পর্যন্ত ছিল বিশাল জলাভূমি। বর্ষাকালে এই পুরো এলাকা জলে থৈ থৈ করতো। বিশাল বিশাল পাটের নৌকার আনাগোনা ছিল এ জলপথে। শুকনো মৌসুমে জল কমলেও একাংশ জলে ডুবে থাকতো সবসময়। একসময় রাজা বীরেন্দ্র কিশোর এক অংশে মাটি কেটে খনন করলো তিনটি পুকুর। তিন পুকুর থেকে উত্তোলিত মাটি ভরাট করে মানুষের বসত গড়লো। নতুন এ বসতির নাম হলো নিউটাউন। নিউটাউনের দক্ষিণপাশে অনন্তপুকুর, পূর্বপাশে কসাই পুকুর, উত্তর পাশে বিশ্বেশ্বরী পুকুর। বিশাল তিনপুকুর পূর্ব ও দক্ষিণ দিক ঘিরে নামকরা দেওয়ালের বিল।
 
এই যে বিশ্বেশ্বরী এটি রাজা বীরেন্দ্র চন্দ্রের মায়ের নাম ছিল। এখান থেকে সাতপাই মৌজার মানুষ খাবার জল সংগ্রহ করতো। বিশ্বেশ্বরী ট্যাংক ছিল মূলত রিজার্ভ ট্যাংক। ঐ সময় সাতপাই মৌজায় কোন টিউবওয়েল ছিল না। পুকুর আর কূয়া ছিল খাবার জলের উৎস। কেউ এই পুকুরের জলে স্নান তো দূরের কথা হাত পা পর্যন্ত ধূতে পারতো না। জলকে জীবাণুমুক্ত করার জন্যে প্রতিবছর শোধনকরার ঔষধ দেয়া হতো। রাজার সৈন্য সবসময় পাহাড়ায় থাকতো বিশ্বেশরীর। কাঠের রিং দিয়ে বিশ্বেশ্বরীর চারপাশ মোড়ানো ছিল। ফুটে থাকা লাল শাপলায় কি সুন্দর দেখাতো এই বিশ্বেশরী। বউ ঝিয়েরা কলস দিয়ে জল নিত এখান থেকে। বিশাল বিশ্বেশ্বরীর বুকে জল টুইটুম্বুর ছিল সারাবছর।
 
নতুন বসতির বউ ঝি, পুরুষ সবাই স্নান করতে যেত অনন্ত সাগর পুকুরে। বিশাল পুকুর। স্বচ্ছ পানি। পুকুর আর বিলের জলের মিলন পথ ছিল কিছু সরু পথ। সারা বছর থৈথৈ করতো অনন্ত সাগর। অনন্ত সাগরের জল দিয়ে নিউটাউনের আসবাব কাজ চলতো। সাতপাই মৌজার অনেকে আসতো এখানে স্নান করতে। পাশেই কসাই পুকুর। কসাই পুকুরে একপাশে ছিল কসাইদের বসতি। তাই এই পুকুরের নাম হলো কসাই পুকুর। পদ্ম ফুলে ছেয়ে থাকতো কসাই পুুকুর। কসাই পুকুর পাড়ের মানুষ এ পুকুরে জল ব্যবহার করতো।

কসাই পুকুরের সাথেও দেওয়ালের বিলের সংযোগ ছিল। বর্ষাকালে এইপথে মগড়া থেকে পাটবোঝাই নৌকা দেয়ালের বিল হয়ে কসাই পুকুরে আসতো এসে ভিড়ত। মাঝিরা ঘাটে রান্না করতো। রাতে ভেসে আসতো তাদের ভাটিয়ালি সুর। মাঝরাতে ইলিশ মাছের গন্ধে ম ম করতো চারদিক। কতদিন ইলিশ মাছের গন্ধে ঘুম ভেঙ্গেছে। ‘বুঝছোগো ভাই, তুমার মনে নাই। আমার চোক্ষে ভাসে খালি. . . . . .’

সেইসব দৃশ্য ছিল নিখিলেশের ঠাকুমার চোখে দেখা। তাই বলতে বলতে চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে যেত।

ঐতিহাসিক এই পুকুরগুলো এখন মরিমরি করছে। প্রকৃতিখেঁকোরা উন্মাদ হয়ে গেছে সর্বত্র। ভাতমাংস খেয়ে ওদের পেট ভরেনা। তখন পুকুর খায়, নদী খায়, বৃক্ষ খায়, পাহাড়-পর্বত সব খায়। এখানে এরা পুকুর খেয়েছে। যে পথে মগড়া হয়ে বিল থেকে পাটের বহর এসে ঢুকতো সেই পথগুলি আটকে দিয়েছে। ড্রেনের মত নালা আটকে দিয়েছে লাভের আশায়। বিশ্বেশ্বরীর জল খাবার কথা শুনলে মানুষ হাসবে। জারমুনিতে ভরে থাকে সে। ময়লা ভাসে। নিউটাউনের ডাস্টবিন এখন এই তিনটা পুকুর। একটু পয়সাওয়ালা বাড়ির মানুষ ঘাটে স্নান বা জলের জন্যে আসেই না। ফলে তারা নষ্ট করে মনখুলে। লাল শাপলার বদলে ভেসে থাকে সভ্য জীবনের আর্বজনা। পুস্কনির উপরে মুরগীর খামার। নৌকার বদলে এখন ময়লা আর্বজনা ভেসে যায়।

নিখিলেশের স্মৃতিতেও যে পুস্কুনি সেই-ই নেই! আর মেনকাদেবী কিচ্ছার পুস্কুনি তো অনেক দূরের কথা। সময়ের সাথে তাদের মনোহর নামও পাল্টেছে। স্থানীয়রা বিশ্বেশরীকে বলে বড় পুস্কুনি, কসাই পুকুরকে পঁচা পুস্কুনি, অনন্ত সাগরকে নিউটাউন পুস্কুনি। আর ঐ দিকে দেওয়ালের বিলে এখন আর জল নেই। ইটের খলা, তেলের পাম্প, বসতবাড়ি বিলকেও গিলে খেয়ে নিয়েছে। পাটের বহর, রুপালী মাছ, রিজার্ভ ট্যাংক, লাল শাপলা, মাঝির গান সবই এখন রূপকথা, রূপকথা বিশ্বেশ্বরী, অনন্ত সাগর, কসাই পুকুর।

স্মৃতির ভাঁজে স্মৃতি ডানা ঝাপটায়। স্বদেশে এসে আজ কতবছর পর ঠাকুমার কথা মনে পড়ে গেল। ভিটার জন্যে কি ছটফটই না করেছে বুড়ি। মৃত্যুর আগে বড়ছেলেকে একদিন কাছে ডেকে বললেন,
 

ঐ বাড়ির উঠানে তুলসিতলায় তোর বাপের অস্থি। আমারে মরণের আগে একটু হেইখানে রাইখা আইতে পারবি বাপ?’
আচ্ছা, এতকাল পর অস্থিটা নিশ্চয়ই নেই বা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। থাকলে ঐটাও কি সে নিয়ে যেতে পারেনা-ভাবে নিখিলেশ! পরক্ষণের ভাবে, যেখানে বাড়িতে ঢোকার পথই মিলছেনা সেখানে এতকিছু চিন্তা করা বৃথা।

গাড়ির হর্ন বাজলো। নিখিলেশ উঠে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি নেয় গেইটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। গাড়িটি ততক্ষণে গেইটের ভিতরে ঢুকে গেছে। নিখিলেশ উঠে যেতে যেতে দারোয়ান গেইট লাগিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি শেষ করেছে। অবশ্য পলকের দেখা মিললো অন্দরের। চালতা গাছটি দিব্বি রয়েছে। প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে সে গাছ রাস্তা থেকেই নজর কাড়ছে অথচ এতক্ষণ নজরেই আসেনি নিখিলেশের। ঘরগুলো পলিশ হয়েছে কিন্তু পাল্টায়নি তো। সেইতো লাল ইটের বাড়িই আছে। নিখিলেশের হৃদয় খুঁড়ে হুড়মুড়িয়ে কতকি বেরিয়ে আসছে।
 

এই চালতা গাছটি খুকির হাতে বোনা। খুকি নিখিলেশের দিদি হয়। অবশ্য হয় না বলে হতো বলা চলে। পাড়া ঘুরে কার উঠান থেকে একটা চালতার চারা নিয়ে এল একদিন। শ্রাবণ মাস। ভেজা মাটিতে জোড়া ভাইদের নিয়ে গাছটা বুনে দিল। সে কি খুশি তার। খুকির গাঁয়ের রঙ ছিল চাপা। ললিত ভঙ্গী। ডাগর ডাগর চোখ থেকে সারাক্ষণ হাসি ঠিকরে বেরুতো। কথার খৈ ফুটতো সারাক্ষণ। সারাবাড়ি মাতিয়ে রাখতে খুকিই সেরা। যেকোন বিষয় এমনি হাত পা নেড়ে বর্ণনা করতো যে সকলে বিরক্ত হলেও, না শুনে উপায় নেই।
 
মিত্রমশাই লাস্ট শো শেষে না ফেরা অবধি খুকি জেগে থাকতো। তিনি বাড়ি ফিরে আগে মেয়েকে ডাকতেন। খুকি জেগে থাকলে ছুটে আসতো। ঘুমে থাকলে বাবার ডাকে জেগে চোখ কচলে ওঠে বসে যেত। সেদিন চালতা গাছটি মিত্রমশায় তখনোও দেখেনি। নতুন সিনেমা আসায় হলে কাজের চাপ ছিল। শেষ শো শেষে রাতে এসে ঢুকলেন বাড়িতে। খুকি তখনো জেগে। এসে বাপের গা ঘেঁষে বসলো।

হ্যাগো বাবা, চালতা গাছে চালতা ধরতে কতদিন লাগে?

মিত্রমশাই কিছু বলার আগে বিজয়া দেবী চাপা স্বরে ভেংচি বলে, আর যদি এদিক ওদিকে গেছিস পায়ের নলি ভেঙ্গে দেবো তোর। মায়ের ভয়ে খুকি পালঙ্কে গিয়ে শুইয়ে চোখ বুজে। মিত্রমশাই খেয়ে মেয়ের কাছে গিয়ে বসতেই খুকি উঠে বসে। ঘুম আসছে না তার। বিজয়দেবীও হেঁসেল গুছাতে চলে গিয়েছিল। সুযোগ পেয়ে খুকি চালতা ফুলের চারা কিভাবে সে বৃষ্টির মধ্যে আবিস্কার করলো, কিভাবে তা প্রতিস্থাপন করা হলো সেইসব শুনালো। মেয়েকে খুশি করতে মিত্রমশাই পরদিনই চটি দিয়ে চারদিকে বেড়া তুলে দিয়েছিল। এই সেই চালতা গাছ। কিন্তু তার দিদিটা কই গেল? বেঁচে আছেতো?

অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও সে দিদির মুখখানা মনে করতে পারলো না। সব আবছা, টুকরো টুকরো মনে পড়ে কিন্তু তাকে জড়ো করে ঠিক মুখশ্রীটা মনে করতে পারেনা। কিন্তু সে মুখের কথা সে ভাবছেই বা কেনো! যে সর্বনাশ তার জন্য সকলের হয়েছে। নিখিলেশ খুকিকে নিয়ে ভাবনাটা মন থেকে ঠেলে বের করে দিতে চায়। অন্যসব স্মৃতি দিয়ে দিদিকে পাশ কেটে চলে যেতে চায়।

অথচ নিষিদ্ধ আর্কষণের মত দিদিও তার পিছু ছাড়ছে না! এতক্ষণ যে গাছটি তার চোখেও পড়েনি। এখন বারবার সেই কেমন নজর কাড়ছে। কোন কোন সম্পর্ক হৃদয়ের বামপাশটায় চুপটি করে লুকিয়ে থাকে। না চাইলেও সহসাই তারা জাপটে ধরে। ঠেলে বের করে দিতে চাইলেও নড়তে চায়না।

ত্যাগ করা আর ভুলে যাওয়ার অর্থ কি এক! নাতো। দিদির কথা মুখে নেবার দায়ে শাস্তি দেবার জন্যে আজ কেউ আর বেঁচে নেই। তবে ভয় কি! মনে যদি পড়ে, পড়ুক। মা ঠাম্মা কাকীমা লুকিয়ে কত কেঁদেছে। বাপ কাকারা বুঝিয়েছেন ভুলে গেছে কিন্তু ভুলতে কি সত্যিই পেরেছেন! কি যে সব ঘটেছিল আজ তা স্পষ্ট করে মনে পড়েনা। শুধু দিদি হঠাৎ নেই।

টকিজে তখন রুব্বান সিনেমাটি চলছে। হাউজফুল ব্যবসা। খবর পেয়ে ছুটে এলেন বাবা কাকারা। তারপর কাকপক্ষিটি টের পাওয়ার আগেই সব ছেড়েছুড়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠে গেল। তারপর কলকাতা মেইলে ছুট।

এত সম্পদ রেখে গিয়ে উঠতে হলো একটা ঘুপচি ঘরে। মালিক বনে গেল ভাড়াটিয়া। বিশাল সিনেমাহলের মালিকদের রোজগারের জন্য কি লড়াইটা না করতে হয়েছে। সেসব দিনের কথা মনে হলে দিদির প্রতি বিষাদে মন ছেয়ে যায় তার। ভাবে, কি দরকার ছিল! নিখিলেশ তখন শিক্ষা-দর্শন ভুলে প্রথাগত বিশ্বাসের ঘোরে পড়ে যায়। এ নিয়ে আজ কত যুগ ধরে সে যুদ্ধ করছে! মুক্তিতো মিলছে না। কলকাতার একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সে শিক্ষকতা করেছে। কয়েকবছর হলো রিটায়ার্ড করেছে। মতের স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ। তবু নিজের দিদির প্রসঙ্গ আসলেই কেমন সংস্কারে ডুবে যায় সে।
যেকোন বিষয়ে সে ভীষণ শান্ত ও স্থির। স্মৃতিকাতর হয়ে সব যেন বিসর্জন দিতে বসেছে। নিখিলেশ এবার নড়েচড়ে বসে। একবার কাউকে জব্বার ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করা যায়। অনেকের নাম সে গল্পে গল্পে শুনেছে। রবীন্দ্র শর্মা, সুশীল পাল, ঠাকুরবাড়ি। উনাদের একটু খোঁজ করলে পাওয়া হয়তো যাবে। সময়ও বেশি নেই হাতে। এর মধ্যেই তাকে যা চায় খুঁজতে হবে।

তবে তার আগে সিনেমাহলে একবারটি যাবে। ভুল না হলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে হাতের ডানপাশের রাস্তাটা ধরে এগোলে পুকুরের কোনায়ই টকিজটি ছিল। নিখিলেশ পশ্চিমদিকের পথটি ধরে এগিয়ে যায়। বেশভূষায় অচেনা ছয় সাতটা বাড়ি পেড়িয়েই সেই লাল ইটের পুরনো বাড়িখানা দেখে। ঠিকই আছে। এইপথেই সিনেমাহল। কিন্তু তেমাথার এপার ওপারে তেমন কোন বিল্ডিংই তার চোখে পড়েনা। দোকানপাট বলতে দুইখানা চায়ের দোকান ছাড়া কিছু নেই। নিজেরও ভুল হতে পারে ভেবে কাউকে একটু জিজ্ঞাসা করবে কিনা বারকতক ভাবে। মোড়ে চায়ের একটা দোকানই খোলা। কয়েকটা অল্প বয়সের ছেলে বসে বিড়ি টানছে আর মিছিল টিছিল নিয়ে কথা বলছে। তাদের আলোচনাতেই নিখিলেশ বুঝতে পেল, গতকাল শহরে কোথাও একটা পার্টির সমাবেশকে ঘিরে সংঘর্ষ হয়েছে। শহর তাই থমথমে।

নিখিলেশের একবার এখানকার পার্টির এক্টিভিজম নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সাহস হয়না। দুইবাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি মন্দা। সেসব তো এখন চাপা থাকেনা। নেহাতেই বাবার কাজটা থেমে আছে, তাই সব বারণ উপেক্ষা করেও সে এসেছে। তন্দ্রার সাথে এ নিয়ে তার মনোমালিন্য হয়েছে একচোট। শেষে মেয়ে সাপোর্ট দেয়ায় আসার অনুমতিটা পেয়েছে। তবু সঙ্গে নাতি এসেছে। নিজদেশে পরদেশী আর পরদেশে অধিবাসী এই টানাপোড়নটায় সে আর কোন বিপদ বাড়াতে চায়না। এসব ভাবনাই নিখিলেশের আশায় ছাই ছাপা দেয়। ছেলেগুলো নিখিলেশের মনের কথা বুঝতে পারেনা। ওরা ওদের মত খাওয়া শেষ করে বিড়ির ধোঁয়া উড়িয়ে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে গেল।

নিখিলেশ বসে আছে। চুলায় কয়লা গুঁজতে থাকা ছেলেটিকে নিখিলেশ বলে, এককাপ চা হবে বাবা?

লোকটির কথা শুনেই দুলু বুঝতে পারে লোকটি বোধহয় বাইরে থেকে এসেছে। তাছাড়া এবাংলা ওবাংলার ভাষা খাবার এইগুলো সম্পর্কে সকলেরই কমবেশী ধারণা রয়েছে। সে মাথা নেড়ে বলে, হবে, হবে। কই আইছুইন দাদু? নিখিলেশ উদাসচোখে শূন্য মাঠটার দিকে চেয়ে আছে। যেন সে ছেলেটির কথা শুনতেই পায়নি। দুলু চায়ের কাপের চিনি নাড়তে নাড়তে আবার জিজ্ঞাসা করে কাওরে খুঁজতাছুইন?

নিখিলেশ এবার শুনতে পায়। সে আমতা আমতা করে বলে এখানে কোথাও কি একটা সিনেমাহল ছিল?

হু, আছিন তো।

এরপর লুঙ্গিতে ভেজা হাতটি মুছতে মুছতে ছুটে আসে টেবিলের দিকে। টেবিলের সামনে কয়েকটা ফাঁকা কাপ, বনরুটির টুকরো আর বিড়ি সিগারেটের ছাই পড়ে ছিল। নিখিলেশের সৌজন্যে সে টেবিলটা দ্রুত মুছে নিয়ে চায়ের গ্লাসটি রাখে।

হল একটি আছিন। কাগজপত্রে হাসনা টকিজ নাম। এলাকাত পুরান সিনেমাহল কয়। ঐ হিরামনের আগেই তো হলটা, হেরলাইগ্যা। তা সেই সিনেমাহল ভাইঙ্গা দিছে কয়েকবছর। ঘরেই সিনেমা দেহে সব, হলে কেউ আয়েনা। সিনেমা হল নাই কিন্তু পুরান সিনেমাহল কইলে অন্ধও আপনেরে এই মোড়ে নামাইয়া দিয়া যাইবো।

নিখিলেশ মাত্রই চায়ে চুমুক দিচ্ছিল। সিনেমাহলটাকে ভেঙ্গে দিয়েছে শুনে মনে হল তার মাথার ভিতরে কেউ যেন হাতুড়ি শাবল দিয়ে খুঁড়ছে। সেখান থেকে ইট সিমেন্টের আস্তর খুলে খুলে পড়ছে। তার মনে পড়ে, মালকোচা দিয়ে ধবধবে সাদা ধূতি আর গরদের পাঞ্জাবী পরে বাবা দাঁড়িয়ে আছে। সামনে বিশাল পোস্টার। পোস্টারে কত নায়ক নায়িকা ভিলেনরা নানা ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে। পাশেই ইটের দোতলা। ক্ষণে ক্ষণে বেল বাজছে। রাস্তামুখী ছোট্ট ঘরটায় প্রজেক্টার মেশিন। মেশিনটা ভূমমমভূমমম করে স্টার্ট নিচ্ছে। সমগ্র পাড়ায় সে শব্দ ছড়িয়ে যাচ্ছে। দুইভাই দিদি কাকার সাথে মেশিন ঘরে সে দাঁড়িয়ে। মেশিনটা চালু হতেই একছটা ফিল্মিআলোর রশ্নি ধেইধেই করে দেয়ালের সুরঙ্গ পথ ধরে সামনের বিশাল পর্দায় আছড়ে পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে মিউজিক।মিউজিকের সাথেসাথে ঝিকঝাক অক্ষরের নাম। কত ঢঙেই না আসছে যাচ্ছে। নাম শেষ হলেই বহু প্রতীক্ষার নায়ক নায়িকারা পর্দায় আসবেন। পর্দার সামনে সারি থেকে হৈ হৈ আনন্দের রব ভেসে আসবে।

সেসব স্মৃতির বেদনায় বাবাটাই তার কেমন হয়ে গেল। এরপর আর কোনদিন প্রাণখুলে তাকে হাসতে কেউ দেখেনি। কোনদিন সিনেমাহলমুখী হননি। আজীবন শেষ শো ভাঙ্গার সময় পর্যন্ত জেগে থাকতেন। মুখফুটে কোনদিন বলেননি। সকলেই জানতো কেন তিনি ঘুমাননা। নিখিলেশ গ্লাসের চা শেষ না করেই বসে থাকে। দোকানে কেউ আর নেই। রাস্তাগুলো ফাঁকা। শহরে অবরোধ চলছে। শুনশান পরিবেশ তার ব্যথাকে উস্কে দিল। নিখিলেশ পকেট থেকে মানিব্যাগটি বের করে ছেলেটির হাতে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট গুজে করে দেয়। চায়ের দাম রেখে বাকি টাকা ফিরত দিতে গেলে সে তাকে রেখে দিতে ইশারা করে।

শোন, সিনেমাহলটি যেখানে ছিল সে জায়গায়টা একটু দেখিয়ে দিতে পার? দুলু বিশাল একটি দায়িত্ব পাওয়ার ভঙ্গিতে নিখিলেশের সাথে বেড়িয়ে এক লাফে রাস্তাটার ওপাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়।

এইযে এইখানেই তো আছিন। ইস কত সিনেমা দেখছি। আমরার টেকা লাগতোনা। সিনেমা শুরু হইলে ম্যানেজার মামারে কইয়া চিপাচাপা দিয়া ঢুইকা দেখতাম। এই দোকানটা তহন আমার বাবা করতো বুঝলেন। আইচ্ছা আপনে কেডা?

নিখিলেশ চমকে ওঠে খানিক। এর উত্তরে কি বলবে সে? সেকি বলবে, সিনেমাহলের আসল নামটি যার আমি তারই ছেলে! ভাবতেই ভাবতেই অস্ফুট স্বরে বলে আমি নিখিলেশ মিত্র! তারপর এগিয়ে যায়। ওর মনে তখন কি চলছিল তা ঠাওর করা দুলুর পক্ষে সম্ভব হয় না। সে দাঁড়িয়ে থাকে। পা যেন মাটির সঙ্গে এঁটে গেছে। সরছে না। জীবনে অতল থেকে স্মৃতি খুঁড়ে আনে। এরপর নিচু হয়ে এক চিমটি মাটি তুলে নেয়। পকেটে রাখা ছোট্ট একটি কৌটায় নিয়ে আবার পকেটেই রাখে। এবার ভিটের একটু মাটি নিলেই তার কর্তব্য শেষ। কিন্তু বাবা কি শুধু মাটির জন্যেই তাকে দিয়ে অমন প্রতিজ্ঞা করিয়েছেন? নাকি ভিন্ন চাওয়াও ছিল?

খুকিকে সে চোখে হারাতো। মুখ ফুটে সে কথা হয়তো বলেন নি। কিন্তু হিউম্যান সাকোলজির বিদ্যা বলে না যে মানুষ মন থেকে সব মুছে ফেলতে পারে। নিখিলেশেরও তাই বিশ্বাস। এখনো হাতে একটা দিন রয়েছে। কাল আবার সে এখানে আসবে। জব্বার ভাইকে পেয়ে গেলেই একটা না একটু ক্লু সে পাবে।

তবে এবার তার রেস্টহাউজে ফেরা দরকার অথচ ফিরতে ইচ্ছে করে না। ওখান থেকে সরতেও ইচ্ছে করে না। ভিতরটা গুড়িয়ে যাচ্ছে। এইসব ব্যথা বইতে আর ইচ্ছে হচ্ছে না। বাবা যদি জানতো তার টকিজটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে। কি জানি সহ্য হতো কিনা! বাবা নেই, একদিকে ভালোই হয়েছে। ফিরে গিয়ে সে কি বলতো! এসব এলোপাথারি ভাবতে ভাবতে নিখিলেশ দুলুর দিকে হাসি বিনিময় করে পুরনো পথে হাঁটে।

সারাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি। অবশ্য খিদে টিদে পায়ওনি। এক আধবেলা না খেয়ে থাকা ছোটবেলার অভ্যেস। দেশছেড়ে যাওয়ার পর কত তাপই পোহাতে হয়েছে। রোদ বৃষ্টি খিদেয় জ্বলে শরীর ইস্পাতের মত হয়ে গেছে। তা না হলে এখনো এই বয়সে সে পাহাড়ে চড়ে। সুযোগ পেলেই এদিক সেদিক হাওয়া বদলে বেরিয়ে পড়ে। তবে অন্যসব স্থানের হাওয়ার সাথে আজকের হাওয়ার বিস্তর ফারাক। কি এক ঘোর। যে ঘোরে সে এখনো হেঁটে চলেছে। ঘাটে রাত্তির নামছে। পাকা বেঞ্চিটায় নিখিলেশ এসে বসে। আকাশে সন্ধ্যা তারা। মৃত্তিকা ভবনের গ্যাটটি শুনশান। নিখিলেশ ভাবে, আর একটিমাত্র দিন! এমন সময় কেউ একজন বলে উঠে,

বইনটারে না দেইখা চইলা যাইবা খোকা!

পোড়ামুখি আবারো ভিলেনের মত চিন্তার দুয়ারে কুট মেরে বসে। রাগে ক্ষোভে নিখিলেশের সব তছনছ করে দিতে ইচ্ছে করে। এই যে ভিটের দুয়ারে উদ্বাস্তুর মত বসে আছে এর দায় নেবে কে! আকাশে ছোপছোপ মেঘ ভেসে যায়। সেই মেঘের পাট ভেঙ্গে একটি চাঁদ চালতা গাছের মগডালে উঁকি দেয়।

সকালে চায়ের দোকানটিতে ভিড় ছিল। নিখিলেশ রিকশার ভাড়া মিটিয়ে কিছুক্ষণ পায়চারী করে। কাস্টমারদের ভিড় কমলে সে দোকানে ঢুকে। দুলু তাকে দেখেই ছুটে এসে বেঞ্চির একটি কোনা মুছে দেয়। নিখিলেশ অপেক্ষা করে। তার কোন তাড়া তো নেই। তাই পরে চা খাবে বলে দুলুকে বিদায় দেয়। দুলু কাস্টমারদের চা দিতে ব্যস্ত হয়ে যায়।

ঘন্টাখানেকের মধ্যেই দোকান প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। বিল মিটিয়ে দিয়ে সব কাজে ছুটে গেল। দুলু সুন্দর একটি কাপে করে মিস্টিরিয়াস মানুষটির জন্য চা নিয়ে আসে।

চা খেতে খেতে নিখিলেশ মানুষ দেখে। সিনেমা হলের খা খা করা শূন্য জমিটা দেখে। প্লেটে করে নুনতা দুইটা বিস্কুট নিয়ে দুলু সামনে এসে দাঁড়ায়।

বিস্কুট খাইয়া দেখেন। টেস্ট পাইবেন।

নিখিলেশ হাত বাড়িয়ে একটি বিস্কুট নেয়। দুলু হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে, আইচ্ছা আফনে কেডা?

নিখিলেশ আবারো থতমত খায়। জ্ঞানের জন্য কত নামডাক অথচ এই প্রশ্নের উত্তর কাল থেকে সে দিতে পারছে না। বলতে গেলে এই ছেলেটিই তাকে একটু আধটু খাতির করছে।তার কাছে তো টুকটাক বলাই যায়। কিন্তু বলবেটা কি . . . .!

আমি আফনেরে চিনছি। এইটুকু বলে দুলু একগাল হাসি ছড়ায়।

নিখিলেশ ভ্রু কুঁচকায়।

হু। মা গপ্পো করে তো। এই সিনেমা হল একটা হিন্দু মালিকের আছিন। ঐ পুস্কনির কোনাত হেরা থাকতো।

তোমার মা বাঁইচা আছে?

আছে।

আমাকে নেবে তোমাদের বাসায়।

দুলু রাজী হয়ে যায়। দুপুরে সে তাকে নিয়ে যাবে বলে আশ্বাস দেয়। নিখিলেশের মনে তড়িৎবেগে কিছু একটা খেলে যায়। নিশ্চয়ই সেসব গল্প এই জনপদে রয়ে গেছে। খুকিদি কোথায় আছে তা জেনে যাওয়ার ক্ষীণ আশা উঁকি দেয়। সে অপেক্ষা করে দুপুরের।

আজ রোদটা মৃদু। সকাল থেকেই উদাস করা বাতাস বইছে। বিশ্বেশ্বরী আনন্দে তিরতির কাঁপছে। চালতা ফুলের শাখায় দুলতে থাকা পাতা এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ছে। কেন যেন নিখিলেশের আর বাড়ির উঠানে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছেনা। কেবল এক চিমটি মাটি নিয়েই সে ফিরবে। যে জিনিস ছেড়ে গেছে তাতে মায়ায় জড়িয়ে দুঃখ আর বাড়াতে চায়না। কেবল তার মার্বেল, রথ থেকে কেনা টমটম গাড়িটা, মাঞ্জা দেয়া লাটাইটা যদি পেত তবে সঙ্গে করে নিয়ে যেত। এগুলোর জন্যে এখনো তার বড় কষ্ট।
 

দীর্ঘশ্বাস উড়ে যায়। দীর্ঘশ্বাস উড়ে আসে। ধীরে ধীরে সূর্য মাথার উপরে সরে।
 
একটা পুরনো জংধরা টিনের ঘরে ওরা থাকে। দুলুর স্বরের আওয়াজ পেয়েই তার মা ছুটে বাইরে আসে। বয়সে তিনি নিখিলেশের চেয়ে ছোট তা তাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে। সংগ্রামেরও পরে বই আগে জন্ম নয়। নিখিলেশ দুইহাত জোর করে নমস্কার জানায়। পরম আদরে ঘরে যেতে আকুতি জানায়। নিখিলেশ মাথা নুইয়ে ঘরে ঢুকে। ঘরে থাকবার মধ্যে একটা বড় চৌকি, একটা আলনা,একটি টেবিলে আয়না, স্নো,পাউডার, তেলের শিশি, চিরুনিসহ টুকিটাকি আর একটা বড় বাক্স। একটি চেয়ার টেবিলের পাশে সালু কাপড় দিয়ে ঢাকাই ছিল। বোঝাই যাচ্ছে অতিথির জন্যেই এই সজ্জিত আসনটি। নিখিলিশকে বসিয়ে দুলুর মা বের হয়ে যায়। দুলুও যায় মায়ের পিছন পিছন।

নিখিলেশের হার্টবিটটা যেন বেড়ে গেছে। দুস্পর্শ কোন স্মৃতির সম্ভাবনায় সে কেঁপে কেঁপে উঠছে। অস্বস্তি কাটাতে সে ঘরের চারদিকে চোখ বুলায়। বোঝায় যাচ্ছে ওদের এই একটি মাত্র ঘর। ঘরের ডগায়ই রান্নার চুলা। সেখানটাই মা ছেলে কিছু একটা করছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই থালায় দুটো লুচি আর বাটিতে খানিক আলুর দম ও একটি ডিম ভাজি নিয়ে ওরা ফিরে। থালাটা নিখিলেশের সামনে রাখতে রাখতে সলজ ভঙ্গিতে বলে, আগে জানলে ভাতের ব্যবস্থা করতাম। পাজি ছেরা, সকালে কয় আপনের কথা। এত বড় ঘরের মানুষ আপনি, পায়ের ধূলা দিলেন।

নিখিলেশ অপ্রত্যাশিত আপ্যায়নে কি বলবে বুঝে পায় না। শুধু ভদ্রতার জন্যে বস্তাপচা সেসব কথা তার বলতে ইচ্ছে হলোনা। যে আক্ষেপ কাল সারাদিন তাকে কুঁড়ে খেয়েছে। মুহূর্তেই সেখানে কেউ যেন শান্তিজল ছিটিয়ে দেয়েছে। অন্তত কাউকে তো সে দেশে এসে পেয়েছে যে তার জন্য কষ্ট করে লুচি ভেজেছে। নিখিলেশ হাত ধুইয়ে আলুর দমে লুচি ডুবালো। কত যুগ পর সে বাংলদেশে পাত পাতলো যেন। সে পরম আনন্দে খায়।

দুজন অচেনা মানুষ সে খাওয়া দেখে। দৃশ্যটি কিছুটা অস্বস্তির। অস্বস্তি কাটাতে নিখিলেশ জিজ্ঞাসা করল, আপনি এসব কোথায় শুনেছেন বোন?

দুলুর মা জানায় তার মায়ের মুখেই এসব গল্প সে শুনেছে। জানেনতো, মা বেঁচে থাকলে আপনাকে দেখে খুব খুশি হইতেন।

নিখিলেশের ইচ্ছে করে তার মায়ের নামটি একবার জানতে। এমন একটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক নয় ভেবে আর জিজ্ঞাসাও করে না। লুচিটা ভীষণ স্বাদ হয়েছে খেতে সেই কথা বলে। খেতে খেতে প্রসঙ্গ এগিয়ে চলে।

আচ্ছা তিনি আর কি বলতেন?

দুলুর মা এই প্রশ্নের উত্তরে কিছু বলেনা। যেন ইচ্ছে করেই না শুনার ভান করে বেরিয়ে যায়। নিখিলেশ বুঝতে পেরে চুপ হয়ে যায়। খুকির প্রসঙ্গে কোন গল্প এ জনপদে রয়েছে কিনা সেকথা জানা হয় না তার। বিব্রতকর হাওয়া কাটাতেই নিখিলেশ দুলুর কাছে জব্বার নামে কাউকে চিনে কিনা জিজ্ঞাসা করে। দুলু লাফিয়ে ওঠে।

ঐ পুস্কনির কোনার বুড়াতো? চিনি চিনি।

কিছুক্ষণ আগে যে আশা নিভু নিভু করছিল তা ধপ করে জ্বলে ওঠে। নিখিলেশ চায়ে চুমুক দিতে দিতে তার তৃপ্তির কথা জানায়। যাদবপুরে কোনদিন গেলে যেন অবশ্যই তাদের বাসায় যায় সেই আমন্ত্রণ রেখে কাগজে ঠিকানা লিখে দেয়। তারপর প্রণাম জানিয়ে উঠে দাঁড়ান।

আকাশে শেষ বিকেলে সূর্য। নিখিলেশ মৃত্তিকা ভবনের সামনে গিয়ে থামে। প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে আসা চালতা গাছ থেকে চালতা গন্ধ আসছে। গেইটের সামনে থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে নিখিলেশ উঠে দাঁড়ায়। এমনসময় গেইটের ছিটকিনি খোলার শব্দ হয়। দারোয়ান হাতে তামাক পাতা ডলছে।

কাউকে খুঁজছেন স্যার?

নিখিশেষ মাথা নাড়তে নাড়তে যতদূর দেখে নেয়া যায় মন ভরে দেখে নেয়। দুলু এতক্ষণে অনেককিছুই জেনে গেছে। ও আগ বাড়িয়ে কিছু একটা বলতে নিলে নিখিলেশ তাকে থামিয়ে দিয়ে সামনে হাঁটে। মনে মনে বলে যাওয়ার আগে আমি আবার আসবো মা। মনেমনে এটুকু বলে দুলুর দেখানো পথ অনুসরণ করে।

তেতলা একটি বাড়ি। সামনে কোন ফুলের গাছটাছ নেই। দুলুই আগে ঢুকে বাড়িতে। নিখিলেশ বাইরে অপেক্ষা করে। জব্বার ভাইয়ের সাথে দেখা হওয়ার অস্থিরতায় সে ঘনঘন নাকের ডগায় আঙ্গুল ঘুটে। দুলুকে আগেই সে বলেছিল, জব্বার ভাইয়ের এক ছোটভাই বিদেশ থেকে দেখা করতে এসেছে এইটুকুই যেন তাদের বলে। দুলুও সেই বলে অনুমতি নিয়ে এসে নিখিলেশকে নিয়ে ভিতরে যায়।

ছিমছাম ড্রয়িংরুম। সেখানেই তাকে বসতে বলে একটি মেয়ে। বোঝাই যাচ্ছে গৃহপরিচারিকা। দুলু তাকে রেখে দোকানে ফিরে যায়।জানায় কিছুক্ষণ পর সেই এসে নিয়ে যাবে নিখিলেশকে।দুলু চলে গেলে, মেয়েটি জানায় জব্বার মিয়া ঘুমাচ্ছেন। তাকে ডাকা হয়েছে। সে হাতমুখ ধুইয়ে আসছেন। এরপর সে কারো একটা ডাকে চলে যায় না। নিখিলেশ টেবিলে থাকা পত্রিকাটা তুলে নেয়। চোখ বুলায় কিন্তু মন লাগেনা। বাতাসে পর্দাটা কেঁপে উঠে। নিখেলেশ চমকে ওঠে। কিন্তু না কেউ নেই। তবু কানপেতে থাকে জব্বার ভাইয়ের আসার প্রতিক্ষায়।

মিনিট কুড়ি পর লাঠিতে ভর করে একজন ঢুকলেন। পরনে আকাশী রঙের একটা লুঙ্গি ও চেক কাপড়ের পাঞ্জাবী। কোমর থেকে শরীরটা নুইয়ে গেছে। মেন্দিরঙা দাঁড়ি কঙ্কালসার শরীরটাতে অতিরিক্ত বলে মনে হয়। নিখিলেশ ওঠে দাঁড়ায়। অচেনা মানুষের আগমনে গৃহস্থ ঠিক বুঝতে পারছিলনা কি বলবে। নিখিলেশেই বলে, সে জব্বার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। শুনে বৃদ্ধ যেন অবাক চোখে তাকালো। এরপর কি বলবে সেইটা বোধহয় অনেকক্ষণ ধরে গুছিয়ে তারপর বললো, আমিই তো।

সূর্যাস্তের সময়ে সূর্যকে দেখলে যেমন বিষণ্ন লাগে নিখিলেষের তেমন লাগতে শুরু করে। যেভাবে সে ভাবছিল জব্বার ভাইকে দেখেই হৈহৈ করে উঠবে। হাউমাউ করে কাঁদবে। ঠা ঠা করে হাসবে। তেমন কিছুই হওয়ার মত অবস্থা তাদের নেই। কি বলবে তালগোল পাকিয়ে যায়। নিখিলেশ তবু নিজের নাম ও মনে করিয়ে দেয়ার জন্য যে পরিচয়টি সে বহন করছে সেটি বলে।

এও জানায়, মৃত্যুর আগে নিখিলেশের বাবা বলে গেছেন, ভিটে ও বিজয়াটকিজের একটু মাটি যেন তার নামে গঙ্গায় ভাসায়।তার বাবা অপেক্ষা করছে স্বদেশের মাটির। নিখেলেশ সেই জন্যেই এসেছে।সব শুনে জব্বার ভাই শুধু মাথা নাড়ে। তাকে আদতে চিনতে পারলো কিনা তা স্পষ্টতর হয়না। সব কথা শুনে হুম ছাড়া কিছুই বলে না। জব্বার মিয়ার ভ্রুর নীচে চোখদুটো ঢাকা পড়ে গেছে। ভ্রুর থেকে চোখ যেন খাঁদে পড়ে গেছে।সেই খাঁদের নিচে সে কি ভাবছে পড়াও যাচ্ছেনা।

জব্বার ভাইয়ের কাছে নিখিলেশ মূলত যে কারণে ছুটে এসেছে সে কথাটা গলার কাছে আটকে আছে। কিছুতেই তা বলবার মত ভাষা খুঁজে পাচ্ছেনা। তাকে সেকথা আর বলা যায় কিনা সেটিও বুঝে উঠতে পারছে না। তবু নিখিলেশ কথা বলে। জব্বার ভাই তার কাঁপাকাঁপা গলায় বলে, বাসার সবাই বালাতো? আসবা খবরটবর তো দিয়া আসলানা!

এরপর আবার ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে মেঝের দিকে। এমন সময় মেয়েটি ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে ঘরে ঢুকে। পিছন পিছন আসে একুশ কি বাইশ বছরের একটি মেয়ে। পরিচারিকার হাত থেকে ট্রেখানা নিয়ে নিখিলেশের সামনে রাখে। তারপর খুব পরিচিত মানুষের মত বলতে থাকে আপনি কি নানাভাইয়ের বন্ধু? দুলু কি কি বলছিল সব ভালো বুঝতেও পারিনাই। নানার বয়স হয়েছে। আগের কথা কিছুই মনে করতে পারেনা। এক কথা থেকে অন্য কথায় চলে যায়। ভুলভাল বকে। কোন দরকার না এমনিতেই বেড়াতে এসেছেন?

নিখিলিশের মুখ থেকে কোন কথা বেরোয় না। সে চমকে উঠে। মেয়েটির মুখটিতে কি মায়া। যেন নিখিলেশকে সে কতদিন চিনে। কথার খৈ ফুটছে। ললিত ভঙ্গী। ডাগর ডাগর চোখ দুটো থেকে হাসি ঠিকরে বেরুচ্ছে। ঝাপসা একটা মুখের মত। নিখিলেশ অপ্রস্তুত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। এরপর এমনিতেই এসেছিল দেখতে বলে দ্রুত বের হয়ে আসে।

আকাশে তক্ষুনি অমাবস্যার চাঁদটি উঠেছে। একটি মৌটুসি পাখি চালতা গাছের ডালে বসে আছে। অন্ধকারে ঠিক ঠাওর করা গেল না ওর চোখের কোণে ছলকে ওঠা ছায়াটা জল না চাঁদের আলো!

 
 
লেখক পরিচিতি:
জয়শ্রী সরকার
গল্পকার।
ঢাকায় থাকেন।
 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=