কাকলি দেবনাথের গল্প : শ্মশানের পাশে ওদের বাড়ি

কী নাম দেব মেয়েটার–রুমা ? চুমকি ? নাকি বিন্দু ? কিছুতেই ঠিক করতে পারছি না । আসল নাম দেওয়া যাবে না ।বিখ্যাত লেখকরা সত্যি ঘটনা নিয়ে গল্প লিখলেও চরিত্রের নাম কিন্তু পালটে দেন । সত্যি নাম অনেক সময় আইনি জটিলতা বাড়াতে পারে । তাই এই সাবধানতা । আর এটা তো সর্বজনস্বীকৃত , “সাবধানের মার নেই । “
মেয়েটা ছিল আমার মেয়েবেলার বন্ধু। আচ্ছা, বন্ধু বলা কি ঠিক হল ? নাম ছাড়া এই গল্পে আর কিছু মিথ্যে বলব না । এ লেখা তো আর সে পড়তে আসছে না ।এখানে লুকোচুরি করার দরকার নেই । ধরে নিলাম ওর নাম ছিল বিন্দু। হ্যাঁ, এই নামটাই পারফেক্ট ।কারণ বিন্দু সবসময় দৃষ্টি্গোচর হয় না।অনেক শব্দের মাঝে অতি সন্তর্পণে লুকিয়ে থাকে ।কেউ যদি তার দিকে ভুল করেও তাকায়, বুঝতে পারে না, সে আছে কী নেই ।এমনই ছিল আমার স্কুলবেলার বান্ধবী বিন্দু। দেখলেন, আবার বান্ধবী বলে ফেললাম। যাই হোক সে আমার কী ছিল ,আমি তার কী ছিলাম, গল্পের শেষে আপনারাই বিচার করবেন।গল্পটি অবশ্য শুধু বিন্দুকে নিয়ে নয় । এ গল্প বিন্দুর বাড়িটাকে নিয়ে ,বাড়ির ভেতরের মানুষগুলোকে নিয়ে ,আর বাড়ির পাশের শ্মশানটাকে নিয়ে, শ্মশানের ভেতর গভীর রাতে কিংবা গনগনে দুপুরে যেনারা ঘোরাঘুরি করে তাঁদের নিয়ে।
এখনও আমাদের সমাজে কোনো মেয়েকে নিয়ে আলোচনা শুরু হলে প্রথমে আমরা তার রূপ নিয়ে আলোচনা করি ।অত্যাধুনিক নারীবাদী লেখকরা অবশ্য এর বিপক্ষেই বলবেন । আমি অত্যাধুনিকাদের মত সাজতে ভালোবাসি কিন্তু মনের গভীরে এখনও সেকেলে মনটাকে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছি। এই কারণে সুক্ষ্ম অহং বোধও আছে । তাই বিন্দু সম্বন্ধে বলার আগে ওর চেহারা নিয়ে কয়েকটা কথা না বললেই নয় । ও ছিল -বেটে ,মোটা । গায়ের রং বার্ণিশ করা কালো । চোখ দুটি অতি ক্ষুদ্র,মাথার চুলও খুব হালকা । উল্টোদিকে আমি ছিলাম একটু অতিমাত্রায় সুন্দরী। হয়ত এই বিপরীতমুখীতাই ছিল আমাদের বন্ধুত্বের মূল কারন ।বিন্দুরা ছিল এক বোন , একভাই। বিন্দু ছোট । আমি যেমন বিন্দুর বান্ধবী ছিলাম ।বিন্দুর বাবা তেমনি আমার বাবার বন্ধু ছিল । এই রে,আবার বন্ধু
বললাম । তার চেয়ে বলা ভালো ছোটবেলায় বাবার সহপাঠি ছিল । অনেকক্ষণ ধরে বিন্দুর পরিচয় দেওয়া হয়েছে ।এবার আসি আসল কথায়।এই বিন্দুদের বাড়ি ছিল শ্মশানের ঠিক পাশে। বাড়ি নয় বরং ঝুপড়ি বলা ভালো । ঝুপড়ি বলে ঠিক কতটা বোঝানো গেল জানি না । আসলে ওদের ঘরের ভেতরে আমি কোনোদিন ঢুকিনি । রাস্তা থেকে শুধু খড় দিয়ে ছাওয়া ঝুপড়ির চালের খানিকটা দেখা যেত। রাস্তার থেকে বেশ খানিকটা নীচুতে ছিল ওদের বাড়ি । চারিদিক থেকে জংলি গাছপালায় ঢাকা । বাড়ির পাশেই নোংরা একটা খাল চলে যাওয়ায় স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ । ওর বাবা একটি মুদিখানার দোকানে কাজ করত।
বিন্দুদের বাড়িতে যে খুব অভাব ছিল, তা ওই ছোট বয়সেই আমি বেশ বুঝতে পারতাম । আমাদের টিউশন টিচারের বাড়ি যেতে হত সেই শ্মশানের পাশ দিয়ে। মায়ের কড়া হুকুম থাকত , বিন্দুদের বাড়ির সামনে যেন না দাঁড়াই । দিনের বেলা টিউশন থাকলে যাওয়ার পথে সাইকেল থেকে একবার হলেও ‘বিন্দু উউউ’ বলে ডাক দিতাম। যদিও বেশিরভাগ দিনই ও বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করত। যাতায়াতের পথে আড়চোখে শ্মশানের দিকে তাকাতাম ।কেমন যেন ছায়া ছায়া পরিবেশ ।বড় বড় তেতুল গাছ আর শিমূল গাছে ঘেরা জায়গাটা। চারিদিকে চিতার কাঠ কয়লা , ভাঙা কলসী , পরিত্যক্ত ছেঁড়া জামা কাপড় ছড়ানো । মাঝে মাঝে তো জ্বলন্ত চিতাও চোখে পড়ত । ভয়ে শিউরে উঠতাম । কিন্তু সন্ধে হলে ওদের বাড়ির সামনে দাঁড়ানো তো দূর অস্ত । ওইটুকু রাস্তা প্রাণপণে সর্বশক্তি দিয়ে সাইকেলে প্যাডেল করতাম ।ভুলেও শ্মশানের দিকে তাকাতাম না । মনে মনে রাম নাম করতে করতে জায়গাটা পার হতাম ।
বিন্দু যেদিন স্কুলে আসত না সেদিন ওকে নিয়ে বান্ধবীরা অনেক উল্টো পালটা কথা বলত। যেমন কেউ বলত ,ওদের বাড়িতে ভূত আছে । কেউ আবার বলত ,বিন্দু ওমন বিচ্ছিরি দেখতে কারন ওর মা ওর জন্মের আগে ভূত দেখেছিল।কেউ আবার একটু অসভ্য কথাও বলত । তারা বলত ,ও আসলে ভূতেরই বাচ্চা ।রাতের বেলায় ভূত নাকি ওর বাবা সেজে বিন্দুর মায়ের সাথে শুয়েছিল । সত্যি বলছি, এসব কথা শুনে আমার কেমন ভয় ভয় করত । শুধু আমার নয় আরও অনেকেরই হয়ত করত ।তাই সবাই ওর সঙ্গে মিশতে চাইত না । আমিও যে খুব মিশতে চাইতাম তা নয় ,তবে বিন্দু আমার পিছু ছাড়ত না। স্কুলে এলেই আমার পিছু পিছু ঘুরত । আসলে বন্ধুদের এক ঘেয়ে প্রশ্নে ও বিরক্ত হত।এই যেমন কেউ জানতে চাইত-“তোর ভয় করে না ওই বাড়িতে থাকতে? “
কেউ বলত –“তোদের বাড়ির পাশেই তো শ্মশান। তুই কখনও ভূত দেখেছিস ?”
কেউ আবার জিগ্যেস করত ,”কখনও গভীর রাতে ভূতের কান্না শুনতে পেয়েছিস ?”
এসব প্রশ্নে বিন্দুর মুখ কালো হয়ে যেত ।ঘাড় ঝুলে পড়ত বুকের কাছে । মাথা নীচু করে , মাটির দিকে তাকিয়ে , মিনমিন করে ও বলত –“ ভয় কেন করবে ? শ্মশানে তো কালী মায়ের পূজো হয়। কত সাধু সন্নাসী আসে । আমার মা বলেছে ,শ্মশান সবচেয়ে পবিত্র স্থান। শ্মশানের পাশে যাদের বাড়ি তারা খুব ভাগ্যবান ।“
মুখ বেঁকিয়ে কিছু ঝগড়ুটে মেয়ে বলে উঠত ,”উঃ,আবার কবিতা করা হচ্ছে -ভাগ্যবান না আরও কিছু । আমাদের বাড়ি অমন জায়গায় হলে আমি কিছুতেই থাকতাম না ।“
আমি অতটা না বলতে পারলেও ওদের কথায় সায় দিতাম। সত্যি কথা বলতে কী বিন্দুর কিছুই আমার ভালো লাগত না । ওর নেতানো , ম্যাড়ম্যাড়ে স্কুলের ড্রেস, যেটা বোধহয় ক্লাস ফাইভে ভর্তি হওয়ার সময় বানানো হয়েছিল । এই তিন বছরে সেটা হাটুর উপরে উঠে গেছে । জামার নীচ থেকে বিচ্ছিরিভাবে বিন্দুর কালো হাটুর উপর লাল লাল ঘা দেখা যেত । আমার কেমন যেন ঘেন্না করত । বিন্দুকে স্কুলে কোনোদিন ভালো টিফিন আনতে দেখিনি । পুরোনো তোবড়ানো টিফিন বক্সে হয় মুড়ি চানাচুর , নয় মুড়ি গুড় । দৈবাৎ যদি কোনোদিন দানাদার আনত , সেদিন দেখ না দেখ , চট করে দানাদারটা ও আমার খাওয়ার ভেতর দিয়ে দিত। হাসি হাসি মুখ করে বলত “তুই খা । “
ইশ! ঘেন্নায় আমার সেদিন টিফিন খাওয়াই হত না । তো একবার হয়েছে কি বিন্দুর মায়ের ইচ্ছে হলো বিন্দুর জন্মদিন পালন করার । আসলে ওদের বাড়িতে সচরাচর কেউ যেতে চাইত না ।গেলেও বাইরে দাঁড়িয়ে , কথা বলেই চলে আসত। জন্মদিন পালন হবে জেনে বিন্দুর তো খুব আনন্দ ।স্কুলে এসে আমাকে চুপি চুপি বলল, “আজ বিকেলে আমরা তোদের বাড়ি নিমন্ত্রণ করতে যাব ।“
আমি মাকে এসে একথা বলতে ,মা যেন তেমন খুশি হলো না ।বলল,”তুই বিন্দুকে নিয়ে সারা ঘর ঘুরে বেড়াবি না ।বাইরের বসার ঘরেই চুপ করে বসে গল্প করবি । বলা যায় না কী ধরনের হাওয়া বাতাস সঙ্গে করে নিয়ে আসে ।“
সন্ধে বেলা বিন্দুর দাদা ছাড়া ওরা সবাই এল আমাদের বাড়ি ।ওর দাদাকে আমি কখনও দেখিনি। সে মামার বাড়িতে থাকত ।বিন্দুর মুখে শুনেছি -ভালোভাবে মানুষ হওয়ার জন্য,ছোটবেলাতেই মামারা তাকে নিয়ে যায় । সেদিন বিন্দুরা আসার সাথে সাথেই ওদের চা বিস্কুট দিয়ে দিয়েছিল মা ।বিন্দুর মা হাসিমুখে ঠাকুমাকে প্রণাম করতে চাইলে , ঠাম্মী “ না না প্রণাম করার দরকার নেই” বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল। ।এমন ভাব করেছিল যেন ওরা ছুঁয়ে দিলে আমাদের জাত চলে যাবে । বেশিক্ষণ বসেনি সেদিন ওরা । যাওয়ার সময় ওদের মুখে একটুও হাসি ছিল না । বিন্দুরা চলে যাওয়ার পর ঠাকুমা সারা ঘরে ধূপধুনো ঘুরিয়েছিল । ওদের আনা সিঙাড়া, মা ফেলে দিয়েছিল ।রাতে খেতে বসে মা বলেছিল ,”ইস ! কি বিচ্ছিরি দেখতে হয়েছে মেয়েটা । সবাই যে ভুতের বাচ্চা বলে, ঠিকই বলে ।“
ঠাকুমা বলেছিল ,”এ মেয়ের বিয়ে দেবে কেমন করে ?“
বাবা বলেছিল,”ওদের বাড়িটাতে দোষ আছে । ওদের বাড়ির সামনের বেল গাছটা খুবই খারাপ। কোনোদিন ওদের সংসারে উন্নতি হতে দেবে না ।“
বলা বাহুল্য আমাকে বিন্দুর জন্মদিনে যেতে দেওয়া হয়নি । এক স্টেশন পরে আমার মামার বাড়ি। সেখানে দুদিনের জন্য আমায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের বাড়ির থেকে শুধু বাবা গিয়েছিল ।পরে যেদিন ওর সাথে স্কুলে দেখা হয়েছিল ,বিন্দু আমায় জিগ্যেস করেছিল ,” তুই কেন আমার জন্মদিনে এলি না? তোর জন্য স্পেশাল কেক এনেছিলাম ।“
আমার সেদিন খুব রাগ হয়েছিল বিন্দুর উপর । অনেকেই তো যায়নি , কাউকে জিগ্যেস না করে ও শুধু আমাকেই জিগ্যেস করল কেন ? বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম , “তুই নেমতন্ন করেছিস বলেই আমাকে যেতে হবে ? ইচ্ছে হয়নি তাই যাইনি ।“
আমার কথা শুনে বিন্দুর কালো মুখে অমাবস্যার অন্ধকার নেমেছিল ।কেন জানি না ওর অমন মুখ দেখে সেদিন খুব আনন্দ হয়েছিল ।
(দুই)
বিন্দু আর আমার বন্ধুত্ব এইভাবেই এগোচ্ছিল । তখন আমি ইলেভেনে পড়ি। একদিন দেখি বিন্দু স্কুলে এল একটি খুব সুন্দর ছেলের সাইকেলে চড়ে । ছেলেটা এতই সুপুরুষ যে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না।
আমাদের গ্রামে অমন স্মার্ট ছেলে একটিও নেই ।মনে মনে বিন্দুর উপর ঈর্ষা হচ্ছিল । বিন্দু খুব হেসে হেসে কথা বলছিল ছেলেটার সঙ্গে । আমি দূর থেকে ওদের দেখছিলাম । আগেই বলেছি আমি একটু বেশিমাত্রায় সুন্দরী। সহজেই সবার নজরে পড়ে যাই ।কিন্তু ছেলেটা একবারও আমায় লক্ষ্য করছে না বুঝতে পেরে, আমার খুব রাগ হল। বিন্দু ক্লাসে ঢুকতেই বান্ধবীরা ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম । “কে রে ছেলেটা ?”
এর আগে এত উজ্জ্বল মুখ বিন্দুর কখনও দেখিনি । সে যেন এই প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। গর্বের সঙ্গে জানাল, “ও আমার দাদা ।“
“তোর নিজের দাদা ? “ সবাই অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম ।
“হ্যাঁ,মামার বাড়ি থাকত।এখন দুর্গাপুরে চাকরি পেয়েছে ।বাড়ি থেকেই যাতায়াত করবে ।“
একটা জিনিস লক্ষ্য করছিলাম ,বিন্দুর দাদা বাড়িতে আসার পর ওদের ভাব ভঙ্গী ,চলন বলন পালটে যাচ্ছে। বান্ধবীদের চোখে বিন্দুর মর্যাদা অনেকটাই বেড়ে গেল ।এখন ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি আর জোরে সাইকেল চালাই না বরং সাইকেলটা নিজের অজান্তেই একটু আস্তে হয়ে যায় ।
একদিন বিন্দুর বাবা -মা, ওর দাদাকে নিয়ে আমাদের বাড়ি এল। সেদিন সারাক্ষণ আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম । মা, ঠাকুমা আগের বারের মত অত খারাপ ব্যবহার করল না ওদের সঙ্গে ।দেখলাম গতবারের নুইয়ে পড়া ভাবটাও বিন্দুর বাবা মায়ের মধ্যে থেকে উধাও ।বিন্দুর দাদা ,ঠাকুমার পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করল । ঠাকুমাও ওর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করল । আজ ওরা অনেকক্ষণ বসে গল্প করল ।মা প্রথমে ওদের সরবত দিল ।বাবা বিন্দুর দাদার পিঠ চাপড়ে বলল, “ কাস্টমসে চাকরি ,বিশাল ব্যাপার।দু হাতে ইনকাম করবে ।প্রচুর উপরি পয়সা আছে এই চাকরিতে। “
মা কফি বানালো ,বাবা দোকান থেকে সিঙাড়া মিষ্টি নিয়ে এল । অনেক হাসাহাসি, গল্প হল। ওদের আনা মিষ্টিগুলো এবার আর ফেলে দেওয়া হল না। আগুনে ছুঁইয়ে বাড়ির সবাই খেলাম ।
এরপরের ঘটনা খুব দ্রুত পাল্টাতে থাকল । কয়েক বছরের মধ্যেই বিন্দুদের বাড়ির চারদিকে উঁচু করে পাঁচিল দেওয়া হল। খুব তাড়াতাড়ি ওদের দোতলা বাড়ি হল। এত সুন্দর বাড়ি আমাদের ওই অঞ্চলে খুব কম আছে ।আমার যে বান্ধবীরা বিন্দুকে ভূতের বাচ্চা বলত তারাই এখন বিন্দুর দাদার প্রেমে পাগল হয়ে উঠল । বিন্দুরা নতুন বাড়ির গৃহ প্রবেশ করল খুব বড় করে । এইবার কিন্তু আমরা সবাই গেলাম নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে । সন্ধে হয়ে আসতেই আমি মায়ের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম,”তাড়াতাড়ি বাড়ি চল ,সন্ধে হয়ে আসছে যে।“ বলেই শ্মশানের দিকটায় তাকালাম।
মা বলল, “ভয় নেই ,এখন তো উচু পাঁচিল হয়ে গেছে । কিচ্ছু হবে না।“
আমি মনে মনে ভাবলাম ,এতদিন তো শুনেছি ভূতেরা যে কোনও জায়গায় চলে যেতে পারে ।এই টুকু উঁচু পাঁচিল কি ভূত টপকাতে পারবে না ?
ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি মা দেখলাম বেলগাছের নীচে এসে হাত জোড় করে প্রণাম করল । ভয়ে না ভক্তিতে বুঝতে পারলাম না । মায়ের দেখাদেখি আমিও কপালে হাত ঠেকালাম।
(তিন)
গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত , কিন্তু হল না ।
গভীর রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল । কান খাঁড়া করে শুনলাম , বাবাকে মা বলছে ,”খুকু তো এখন কলেজে উঠে গেল । এবার তো বিয়ের জন্য পাত্র দেখতে হয় ।“
নিজের বিয়ের কথা শুনলে সব মেয়ের মনের মধ্যে যেমন শিহরণ জাগে আমারও তেমনই হয়েছিল ।
বাবা বলল, “হ্যাঁ তা তো দেখতেই হবে। আচ্ছা আমার বন্ধু পঞ্চার ছেলেটাকে তোমার কেমন লাগল?”
এই প্রথম আমার বাবা, বিন্দুর বাবাকে বন্ধু বলল।
মা অত রাতেই প্রায় লাফিয়ে উঠল ।বলল,”তুমি তো আমার মুখের কথা ছিনিয়ে নিলে । ওদেরও খুকুকে খুব পছন্দ মনে হল । দেখছিলে না ,কেমন আদর করে বিন্দুর মা , খুকুকে সারা বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল । তাছাড়া বিন্দু তো খুকুর ছোট বেলার বান্ধবী । বাড়িতে ননদ থাকলে যে ভয়টা থাকে, এক্ষেত্রে সেটা হবে না ।“
আমার বুকের ভেতর তখন দামামা বাজতে শুরু করেছে ।মনে হচ্ছে এক্ষুণি গিয়ে বাবা -মাকে জড়িয়ে ধরি । নিজের আবেগকে দমন করে বালিশটাকেই সেদিন জড়িয়ে ধরেছিলাম ।
তারপর কী এমন হল যে ,আজ আমায় এই গল্প লিখতে হচ্ছে —
হ্যাঁ , সে কথাই বলছি।একদিন অফিস থেকে বাবা ফিরল মুখ কালো করে। বাড়িতে তখন বিয়ের প্রস্তুতি জোর কদমে চলছে । দূরের আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে নিমন্ত্রণের কার্ড পাঠানো হয়ে গেছে । প্রতিদিন সন্ধেবেলায় ক্যাটারিং -এর লোক , প্যান্ডেলের লোক আসছে ।বিয়েতে কী কী রান্না হবে , প্যান্ডেলে কোন কোন রঙের কাপড় লাগানো হবে তার আলোচনা হচ্ছে । তত্বে কী কী পাঠানো হবে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছে । আমার গয়নাগাটি সব চলে এসেছে ।এমনকি লাল বেনারসীর ম্যাচিং ব্লাউজও বানানো হয়ে গেছে । এইরকম পরিস্থিতে যখন আমি নতুন জীবনের স্বপ্নে মশগুল ঠিক সেইরকম একটি দিনে বাবা অফিস থেকে ফিরল মুখ কালো করে । উঠোনে সাইকেলটা কোনোরকমে দাঁড় করিয়ে মাটিতেই থপ করে বসে পড়েছিল বাবা । চুল উসখো খুসখো , চোখ দুটো জবা ফুলের মত লাল । বাবার ওইরকম চেহারা দেখে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস পাচ্ছিলাম না । ঠাকুমা আস্তে করে বাবার গায়ে হাত দিতে গেলে , বাবা বলল ,” গায়ে হাত দিও না । শ্মশান থেকে আসছি । “
আমাদের সবার মুখ থেকে একসঙ্গে একটা প্রশ্নই বেরিয়ে এসেছিল ,” শ্মশান থেকে !”
বাবা গম্ভীর হয়ে বলেছিল ,”হ্যাঁ শ্মশান থেকে । বিন্দু সুইসাইড করেছে ।“
বিন্দু সুইসাইড করেছে! কিন্তু কেন ?
ও নাকি কিছুতেই আমাকে ওর বৌদি হিসেবে মেনে নিতে পারবে না ।একথা বহুবার জানিয়েছিল বাড়ির সবাইকে । কিন্তু ওর কথা কেউ তেমন পাত্তা দেয়নি । তাই…
আমার কানের ভেতর যেন কেউ গরম শিশা ঢেলে দিয়েছে । অসহ্য যন্ত্রণা । ভাবতেই পারছি না , বিন্দু আমায় বৌদি হিসেবে মেনে নিতে পারবে না বলেছে ! আমি তো ভেবেছিলাম আমি ওর বৌদি হলে ও ধন্য হয়ে যাবে …।
মাঝে অনেকগুলি বছর কেটে গেছে । আজও চোখ বুজলে দেখতে পাই শ্মশানে জ্বলছে বিন্দুর চিতা । আর সেই চিতা থেকে উঠে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় বিন্দু । খিলখিল করে হাসে । অট্টহাসি । ওর হাসি দেখে আমি শিউরে উঠি। হাসতে হাসতে আমার দিকে আঙুল তুলে, ও অনেক কথা বলে । বুঝতে পারি না …
মনে মনে ভাবি , কেন আমরা ভুলে যাই ,সব বড় কাহিনীর শেষ হয় একটা ছোট্ট বিন্দু দিয়ে…
লেখক পরিচিতি
কাকলি দেবনাথ
কুলুপুকুর, চন্দননগর, হুগলীতে থাকেন।
গল্পকার। 

2 thoughts on “কাকলি দেবনাথের গল্প : শ্মশানের পাশে ওদের বাড়ি

  • June 17, 2022 at 9:31 am
    Permalink

    ভালো লাগলো। শুরুর কিছু শব্দ বাদ দিলে নির্মেদ গল্প।

    Reply
  • June 24, 2022 at 5:50 pm
    Permalink

    Msg khub valo. Lekhar vangio sundar.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.