জয়েস ক্যারল ওটসের গল্প: চলেছ কোথায়, ছিলেই বা কোথায় তুমি?

 গল্পপাঠ: গল্পপাঠ ।। ভাদ্র-আশ্বিন।।১৪২৭ বঙ্গাব্দ।। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর।।২০২০  খ্রিস্টাব্দ।। সংখ্যা--৭৪

সমকালীন আমেরিকান গল্প

অনুবাদ- ফারহানা আনন্দময়ী

মেয়েটার নাম কনি। পনের বছর বয়সী একটা মেয়ে ও। কী এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল ওর, একটু পরপরই গলা বাড়িয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি হাসতো আর প্রতিবারই নিজের মুখটা দেখে নিতো। আবার অন্যদের দিকে তাকিয়েও সচেতনভাবে বুঝে নিতে চাইতো, ওকে ঠিকঠাক দেখাচ্ছে কি না! কনির মা অবশ্য এই বিষয়টা খুব খেয়াল করতো। আর বিরক্ত হতো ভীষণ, মেয়ের এই এত তীব্র নার্সিসিস্টিক আচরণে। কিছুতেই তিনি বুঝতে পারতো না, কী এমন আছে ওর মুখে যে বারবার করে নিজের মুখটা দেখতে হবে! ধমক দিয়ে বলতো, “থামাও তোমার এই পাগলামি! এতবার করে নিজের মুখটায় কী দেখছো? ভাবছো, তুমি দেখতে খুব সুন্দর?”

মায়ের এই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি গায়েই মাখতো না কনি। ভুরুটা একটু উঁচু করে এমন এক রহস্যময় দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকাতো, যেন চোখ দিয়েই বললো, তুমি যা বলো তাই বলো, আমি জানি আমি সুন্দর। কনির মা-ও একটা সময়ে সুন্দরী ছিল, পুরনো ছবির অ্যালবাম ঘাটলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। তবে সেই সৌন্দর্যের এখন আর তেমন কিছু বাকি নেই। আর এই আক্ষেপেই হয়তো তিনি কনির পেছনে এটা নিয়ে লেগে থাকে সারাক্ষণ। 

“আচ্ছা, তুমি কি তোমার ঘরটা একটু গুছিয়ে রাখতে পারো না ঠিক করে, তোমার বোনের মতো? এই, তোমার চুলগুলো এমন শক্ত হয়ে আছে কেমন করে? আর কেমন একটা বিশ্রী গন্ধও আসছে চুল থেকে! হেয়ার স্প্রে ব্যবহার করেছ? ইশ্‌শ্‌! কই, তোমার বোন তো এসব ছাইপাশ চুলে দেয় না!” কনিকে থেকেথেকে এসব বলতেই থাকে মা। 

জুন ওর বোন, বয়েস চব্বিশ, একই বাড়িতেই থাকতো। দেখতে শুনতে গাট্টাগোট্টা, স্বভাবে ধীরস্থির। কনি যে স্কুলে পড়তো, সেই স্কুলে সে সেক্রেটারির কাজ করতো। একই বাড়িতে থেকে সারাক্ষণ যদি সেই বোনের প্রশংসা শুনতে হয়, মা আর মায়ের বোনের মুখে- সেটা কনির একটুও ভালো লাগতো না। লাগার কথাও নয়! জুন এটা করেছে, জুন ওটা করেছে, জুন টাকা জমিয়েছে, ভালো রান্না করতো, ঘর গুছাতো! বোনের এতসব পারার মধ্যে কনি কিছুই করতো না , শুধু দিবাস্বপ্ন দেখা ছাড়া! ওর বাবা কাজে সারাদিন প্রায় বাইরেই থাকতো। আর কাজ সেরে ঘরে ফিরেই খবরের কাগজ হাতে নিয়ে সান্ধ্যখাবারটা খেতো। এরপর সোজা বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর আয়োজন। কনির বাবা খুব একটা কথাই বলতো না, তবে তার মাথার কাছে বসে ওর মা কনির বিষয়ে বলতেই থাকতো। ও বিরক্ত হয়ে ভাবতো, মা টা মরে না কেন! আর এরপর সে-ও মরে গেলে ভালো হতো। মুক্তি মিলতো এতসব কথার ঝামেলা থেকে। সে তার বন্ধুদেরকে মাঝেমধ্যে বলতো, “সে আমাকে বাধ্য করে আমি যেন তাকে ছেড়ে চলে যাই।“ আর এই কথাটা সে এমন বিষাদী স্বরে বলতো যে, আদতেই এটা সত্য না কি মিথ্যা, বোঝা কঠিন হতো। 

বাড়িতে এতসব অসহ্য লাগা বিষয়ের মধ্যে একটা জিনিস কনির ভালো লাগতো। জুনের মেয়ে বন্ধুরাও জুনের মতো সোজা আর শান্ত হওয়ায়, ওর বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘোরাঘুরি করতে যাওয়াতে কোনো বারণ ছিল না। সেই সুযোগে কনিরও বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘুরতে যাবার বিষয়টি সহজ ছিল। কনির সবচেয়ে কাছের বন্ধুর বাবা ওদের সব মেয়েবন্ধুদেরকে গাড়িতে করে তিন মাইল দূরে শহরের একটা শপিং মলে নামিয়ে দিয়ে আসতো, প্রায় প্রায় সপ্তাহান্তে। ওরা সদলে ওখানে দোকানে ঘোরাঘুরি করতো, সিনেমা দেখতো, খাওয়াদাওয়া করতো,, হইহল্লা করতো। তারপর রাত এগারোটার দিকে এসে মেয়েটির বাবা আবার নামিয়ে দিতো যার যার বাড়িতে। সারাপথ একবারো জিজ্ঞেস করতো না, ওরা সারা বিকেল-সন্ধ্যে ওখানে কী করলো! 

ওখানে ওরা পরিচিত জায়গার মধ্যেই ঘোরাঘুরি করতো, মলের আশেপাশেই থাকতো। সকলেরই পরনে থাকতো ছোট প্যান্ট, পায়ে ব্যালেরিনা স্লিপারস, হাতে চিকন চুড়ি- ওদের চুড়ির আওয়াজ আর খিলখিল হাসির আওয়াজে বাকিরা ফিরে ফিরে তাকাতো ওদের দিকে। এদের মধ্যে কনির ছিল দীর্ঘ গাঢ় সোনালী রঙা চুল, চুলগুলো সে সামনের দিকে ফুলিয়ে উপরে তুলে বেঁধে রাখতো। কিছুটা চুল ছেড়ে রাখতো যা ওর ঘাড় বেয়ে নিচে নামতো। এটা যে কারোরই নজর কাড়তো। ওর গায়ে থাকতো একটা গলাঢাকা ব্লাউজ- ঘরে সে এটা পরতো একভাবে আর যখন বন্ধুদের সাথে বাইরে আসতো, তখন পরবার ঢঙটা বদলে নিতো। তার চলন-বলনের সবকিছুই ঘর আর বাইরে- দুইরকম ছিল। ঘরে সে একদম অন্য এক মানুষ। আর বাইরে বেরোলেই যেন সে হয়ে উঠতো অন্য এক কনি। চপল-চঞ্চল হাঁটবার ছন্দ, হাঁটবার সময়ে কানে হেডফোন লাগানো থাকতো ওর। সারাক্ষণই হাঁটতো, চলতো গানের সুরে দুলে দুলে। তবে ঘরে যখন থাকতো, কেমন মলিনতা মাখানো থাকতো ওর চোখটায়। আর সেই চোখই ঘরের বাইরে বেরোলে হয়ে উঠতো উজ্জ্বল। চোখের তারাটা নাচতো তখন। ঘরের অকরুণ জলভরা চোখ দু’টো যেন পুলকিত হয়ে ওঠে, হাতের চুড়ির মতো রিনরিনিয়ে গেয়ে উঠতো, উচ্চকিত স্বরে। 

সবসময়েই যে তারা শপিং মলে বা সিনেমায় যেত, তা নয়। মাঝেমাঝে হাইওয়ে ধরে দ্রুতগতিতে চলে যেতো আরো দূরের কোনো রেস্তরাঁতেও। ওখানে ওদের চেয়ে আরেকটু বেশি বয়সী ছেলেমেয়েরা আনন্দ-ফূর্তি করতো। রেস্তরাঁটা দেখতে ছিল একটা বোতলের মতো, তবে বোতলের চেয়ে একটু খাটো অবয়ব। মুখটার কাছে একটা ছেলের মূর্তি- হাসিহাসি মুখে বসে আছে আর একটা হ্যামবার্গার শুণ্যে ছুড়ে দিচ্ছে, এমনটা। একরাতে হলো কী, ওরা এক দমে রাস্তাটা পার হয়ে দেখলো, একটা গাড়ির জানালায় দিয়ে একটা ছেলে ওদেরকে ইশারা দিয়ে ডাকছে। হাইস্কুলে পড়া ছেলে মনে হলো। ওরা ওকে পাত্তাই দিলো না। সারি সারি গাড়ি রাখা পার্কিং পাশ কাটিয়ে ওরা সেই আলোয় ঝলমল রেস্তরাঁটার দিকেই এগুলো তারা। ভেতরে ঢুকে মনে হলো, ঠিক এরকম একটা স্বর্গীয় আনন্দের জায়গাই তো ওরা খুঁজছিল। কাউন্টারের পাশে একটা জায়গায় বসলো গোড়ালিতে ভর দিয়ে। চারপাশ দেখেশুনে ওদের ছোট্ট কাঁধটা শক্ত হয়ে উঠলো উত্তেজনায়। ভেতরে তখন গান বাজছিল। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল, চার্চে যেমন বাজে। কী মধুর সেই সঙ্গীত! যেন এর ভেতরে ডুব দিয়ে থাকা যায়! 

এডি নামের একটা ছেলে পাশের একটা টুলে এসে বসলো। আর একটু পরপর পিঠটা ঝুঁকে ঝুঁকে যেন ভাব জমাতে চাইলো ওদের সাথে। কনিকে সে জিজ্ঞেস করলো কিছু খাবে কি না! কনি সম্মতি দিল। ও তার বন্ধুর হাতটায় একটু টোকা দিতেই সে সকৌতুকে কনির মুখ তুলে কনির দিকে তাকালো। কনি বললো, “আমি আসছি, এগারোটার মধ্যেই দেখা হবে আবার, আমাদের ফেরবার সময়ের আগেই আসবো আমি।“ 

“ওকে এভাবে একা রেখে যেতে আমার খারাপ লাগছে।“ যেতে যেতে ছেলেটিকে বললো ও। 

“না, না। বেশিক্ষণ তোমার বন্ধুকে এখানে একা থাকতে হবে না”। বলেই কনিকে নিয়ে বেরিয়ে এসে গাড়ির কাছে এলো। গাড়ির কাচে নিজের মুখটা দেখতে পেল কনি। আনন্দে চকচক করছে ওর চোখ মুখ। এডির সাথে ওর অন্তরঙ্গ কিছু হলো, এরকম কিছু নয়। ওর উচ্ছ্বাস, আনন্দটা বোধহয় ভেতরে বাজতে থাকা সঙ্গীতের ওই মূর্ছনার জন্য। সে কাঁধটাকে একটু ঝাঁকা দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, ভেতরের উচ্ছ্বাস সে চেপে রাখতে পারছিল না। হঠাৎ-ই কনির চোখ পড়লো কয়েক ফুট দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলের দিকে। সোনালি রঙের জেলোপির পাশে দাঁড়ানো ঝাঁকড়া চুলওয়ালা একটা ছেলে। ওর দিকে তাকিয়ে আছে আর ঠোঁটটা প্রসারিত করে হাসছে। কনি একবার দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিলো। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরে আবার ফিরে তাকালো। দেখলো ছেলেটি তখনো তাকিয়ে আছে। আর আঙুল দুলিয়ে ওকে বলছে, “তোমার সঙ্গ চাই, বেইবি।“ কনি আবার এদিকে ফিরলো, এডি কিছু বুঝে উঠবার আগেই। 

প্রায় তিন ঘন্টা এডির সাথে কাটালো কনি। ওরা হ্যামবার্গার খেল, কোক পান করলো, যদিও জায়গাটা খুব একটা আরামের নয়, ওরা গরমে ঘামছিল। এরপর প্রায় মাইলখানেক ঢালু রাস্তা পেরিয়ে এগারোটা বাজবার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে কনিকে ওর সেই মেয়ে বন্ধুটার কাছে পৌঁছে দিলো এডি। মলের সব দোকানপাট তখন বন্ধ হয়ে গেছে, সিনেমা হলটা ছাড়া। মেয়েটা একা ছিল না, একটা ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। কনির সাথে চোখাচোখি হতেই, দুজনেই হেসে উঠলো। কনি বললো, “সিনেমা কেমন দেখলে?” মেয়েটা হেসে বললো, “সে তো তুমিই ভালো জানো আমার চেয়ে!” ওরা বেরিয়ে মেয়েটার বাবার সাথে ফিরতি পথ ধরলো। কনির কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছিল, তৃপ্তিতে। ও পেছন ফিরে ফাঁকা হয়ে যাওয়া, প্রায় অন্ধকার সিনেমা প্লাজাটা দেখলো। ওপারে রেস্তরাঁটা তখনো খোলা, পার্কিং এ অনেক গাড়ি তখনো চলাচল করছিল। কনি দেখতে পাচ্ছিল, কিন্তু ওখানে বাজতে থাকা গানের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল না আর। 

পরদিন সকালে জুন ওকে জিজ্ঞেস করলো সিনেমা কেমন লেগেছে। “ভালোই।“ কনির উত্তর। 

সেই বন্ধুটা আর আরো একটা মেয়ের সাথে কনি সপ্তাহে কয়েকবার বেরতো। ওটা ছিল গরমের ছুটির সময়। বাড়িতেই বেশিটা সময় কাটতো কনির- মায়ের ওইসব কথা শুনে আর নিজের ভাবনায় ডুবে থেকে। ও সেই ছেলেগুলোর কথা ভাবতো বসে, যাদের সাথে ও বাইরে গেলে দেখা করেছিল। তবে আলাদা করে কারো মুখ মনে করতে পারতো না। প্রতিটা ছেলের মুখই গুলিয়ে মিলিয়ে একটা কোনো ছেলের মুখে- না মুখ নয়, একটা কোনো ধারণা বা ভাবনায় গিয়ে মিশে যেত। আর সেই ভাবনা গিয়ে ডুবে যেত কানে বাজতে থাকা গানের সুরের মধ্যে, মধ্য জুলাইয়ের রাতের আদ্র হাওয়ার সাথে। দিনের আলো ফুটলেই মা আবার তাকে খোঁচাখুঁচি শুরু করে দিতো, বিভিন্ন কাজের তাগাদা দিতে থাকতো। হয়তো হঠাৎ করে বলে উঠতো, “কই, সেই আহ্লাদী মেয়েটার কী খবর, কী যেন নাম, পেটিনজার?” 

“ওহ! ওই মেয়েটা? বোকা মেয়েটার কথা বলছো?” কনি উত্তরে বললো। ও সবসময়ই একটা মোটাদাগের আড়াল রেখে চলতো এইসব মেয়েদের কাছ থেকে। আর ওদেরকে নিয়ে মাকে যা-ই বলতো, ওর মা সবই বিশ্বাস করতো। একটু সহজ আর বোকা টাইপ মানুষ ছিল কনির মা। মাঝেমধ্যে কনিরও মনে হতো, মাকে এভাবে বোকা বানানোটা কি ঠিক হচ্ছে? ওর মা সারাদিন স্লিপার একটা পায়ে গলিয়ে সারাঘর এলোমেলো ঘুরে বেড়াতো। আর অবসর পেলেই ফোনে বোনেদের সাথে কথা চালাচালি করতো। এর কথা শুনে ওকে বলতো আবার ওই বোনের কথা শুনে একে বলতো। আর নিজের মেয়েদের প্রসঙ্গ এলে জুনের কথা যতটা সন্তোষের সাথে বলতো, কনির কথা ততটা নয়। তবে আবার এ-ও নয় যে, কনিকে খুব একটা অপছন্দ করতো। তবে কনি মনে করতো, তার সুন্দর চেহারার জন্যই হয়তো জুনের চেয়ে সামান্য বেশি পছন্দ করতো। ওদের দু’বোনের মধ্যে আলগা একটা উত্তেজনার ভাব সবসময়ই দেখা যেত। মনে হতো যেন বিশেষ কিছু একটা নিয়ে ওদের মধ্যে শীতল লড়াই চলছে। দড়ি টানাটানি লেগেই আছে যেন। কখনো কখনো কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তাদের বন্ধুত্ব একটু দানা বাঁধে। কিন্তু মাছির ভনভনানির মতো সেই অজানা বিরক্তিটা আবার ফিরেফিরে ঘুরে আসে ওদের মগজের কাছে, মুখের ছাপে। ওদের শক্ত হয়ে-ওঠা মুখটায় তখন ঘৃণার ছায়ায় ঢেকে যেত। 

এক রবিবারের সকালে বেশ দেরিতেই ঘুম থেকে উঠলো কনি। ওদের কারোরই তাড়া থাকে না চার্চে যাবার। কনির হাতে আজ অনেক সময়- চুল ভিজিয়ে স্নান করে রোদে বসলো ও। রোদে দীর্ঘ চুলটা শুকাবে বলে। এক আত্মীয়ের বাড়িতে সারাদিনের বারবিকিউয়ের নেমন্তন্নে যাবার কথা জুন আর ওর মা-বাবার। কনি খুব একটা উৎসাহ দেখালো না যেতে। বললো, “তোমরা যাও। আমার ইচ্ছে করছে না।“ মা কনির মুখটায় চোখ বুলিয়ে কী বুঝলো, কে জানে! কর্কশ স্বরে বলে উঠলো, “থাকো তুমি একলা বাড়িতে।“সামনের উঠোনটায় বসে কনি দেখলো,ওরা সকলে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাবা বরাবরের মতই চুপচাপ, পেছনে তাকিয়ে গাড়িটা ঘুরানোর চেষ্টা করছিল। আর মায়ের রাগ তখনো পড়েনি। কাচের ওপাশ থেকেই রাগ-রাগ চোখে কনির দিকে তাকিয়ে থাকলো। আর বেচারা জুন! পেছনের সিটে সেজেগুজে মনমরা হয়ে বসে ছিল; বাচ্চাদের চেঁচামেচি ছাড়া বারবিকিউয়ের আর কোন আনন্দ সম্পর্কে যেন ও কিছু জানেই না।

একলা বাড়িটায় কনি বসেই রইলো চোখটা বুজে, আপনমনে। ভাবনার জগতে ভেসে যেতে থাকলো সে। আগের রাতে যে ছেলেটির সাথে ও ডেইটে গিয়েছিল, তার মুখটা মনে পড়তে থাকলো। আবেগে, ভালো লাগার আবেশে সে হারিয়ে যেতে থাকলো নিজের ভাবনায়। ছেলেটি কীভাবে কথা বলেছে, কীভাবে তারা আদর করেছিল, সে সব মনে হতেই ওর অন্যরকম এক ভালোবাসার অনুভূতি হচ্ছিল। সিনেমার চরিত্রের মানুষেরা যেমন, গানের লিরিকে যেমন ভালোবাসার মানুষের ছবি আঁকা থাকে, ছেলেটিকে ওরকম মনে হচ্ছিল। কনি যখন চোখ খুললো, ও কোথায় বসে আছে বাস্তবে, ঠিক ঠাহর করতে পারছিল না। ওর মনে হতে থাকলো, উঠোনটা ঘাস-লতাপাতায় ভরে গেছে, বেড়াগুলো সব গাছের সারিতে সেজে দাঁড়িয়ে আছে। আর তার ওপারে ওপরের আকাশটা বড্ড বেশি নীল। আর তিন বছরের পুরনো ওদের আসবেস্টসের বাড়িটাও চোখে যেন চমক লাগাচ্ছিল- যেন এইমাত্র ওর ঘুম ভাঙলো। 

সেদিন খুব গরম ছিল। বাইরে আর না বসে ঘরের ভেতরে গিয়ে রেডিয়োটা ছেড়ে দিল সে। ঘরের নৈঃশব্দ গানের সুরে সুরে ভরে উঠলো। খালি পায়ে বিছানার ধারটায় বসে কনি গানই শুনে যেতে লাগলো। একের পর এক, অবিরাম শুনে যেতে লাগলো। ঘন্টা পেরিয়ে গেল, কনির কোনো খেয়াল নেই। ও গান শুনছিল, আর সাথে সাথে গাইছিল- রেডিয়োতে তখন XYZ এর সানডে জাম্বুরি বাজছিল। “Bobby King” এর “An’ look here, you girls at Napoleon’s—Son and Charley want you to pay real close attention to this song coming up!” 

গান শুনতে শুনতে সে সঙ্গীতের সুরধারায় স্নান সেরে নিচ্ছিল যেন। তার ভেতরের মুগ্ধতা গানের লয়ে ঢেউয়ের মত দুলতে থাকলো। অলসভাবে নিজেকে এলিয়ে দিল গানের স্রোতে… ছোট ছোট শ্বাস-প্রশ্বাসে তাল মিলিয়ে তার বুকটাও ধীরলয়ে দুলছিল যেন। 

কয়েক মুহূর্ত পরে কনি শুনতে পেল, বাইরে একটা গাড়ি এসে থামলো। একটু চমকে উঠলো ও- না, তার বাবার তো এত তাড়াতাড়ি ফেরবার কথা নয়। অনেক দূর থেকে রাস্তার নুড়িগুলোর মচমচানি আওয়াজ ভেসে আসছিল, গাড়ির চাকার নিচে পড়ছিল তো ওগুলো। দৌড়ে গেল সে জানালায়। একটা গাড়ি এগিয়ে আসছে, দেখতে পেল, কিন্তু চেনা নয়। একটা সোনালী রঙের জেলোপি! সূর্যের আলো পড়ে তা আরো জ্বলজ্বল করছিল। উত্তেজনায় ওর হৃদকম্পন বেড়ে গেল গাড়িটা দেখতে পেয়ে! দু’হাতের আঙুল দিয়ে চুলের মধ্যে বিলি কাটতে শুরু করলো- ওহ! ঈশ্বর! ওহ! ঈশ্বর বলে বিড়বিড় করতে থাকলো। আর ঠিক তখুনি গাড়িটা এসে থামলো ওদের বাড়ির সামনে। যেন আগে থেকে জানা কোনো সংকেত- ঠিক এভাবেই চারটে হর্ন বাজালো ভেতর থেকে কেউ। 

কনি দৌড়ে গেল রান্নাঘরের দরজার ওদিকে! তারপর পর্দাঢাকা কাচের দরজাটা সরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতেই গাড়ির ভেতরের দুজন ছেলেকে দেখতে পেল। আরে! এদের একজন তো সেই ছেলেটা! সেদিন ওই রেস্তরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত চোখাচোখি হয়েছিল। ঝাকড়া কালো চুল ভর্তি মাথায়, মনে হচ্ছিল নকল চুল! আর ওর দিকে তাকিয়ে হাসছিল!  

“আমি নিশ্চয়ই দেরি করে ফেলিনি? নাকি দেরি হলো আসতে?” ছেলেটি বললো। 

“তুমি কে? তোমার পরিচয় কী?” 

“সে কি? আমি কি তোমাকে বলিনি আগে?” 

“আমি তোমাকে চিনিই না।“ কনি খুব বিষণ্ণ গলায় বলে উঠলো। খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করলো না তার কথায়। দেখতে চাইলো গাড়ির ভেতরের অন্য ছেলেটাকে। এক গোছা সোনালি চুলে তার কপাল ঢাকা, পাশ দিয়ে মুখের যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছিল, সে একটু বিব্রত। দুজনেই রোদচশমা পরা চোখে। যে ছেলেটা গাড়ি চালাচ্ছিল, তারটা মেটালিক। বাইরের সবকিছুই প্রতিফলিত হচ্ছিল সেই কাচে। 

“তুমি কি ঘুরতে যেতে চাও?” 

কনি একটু হাসলো এবার। হাত দিয়ে চুল সরালো ওর কাঁধের এক পাশ থেকে। 

“আমার গাড়িটা তোমার পছন্দ হলো না? রঙ করিয়েছি নতুন। এই, শুনতে পাচ্ছ তুমি?” ছেলেটা বললো। 

“কী?” 

“তোমাকে দেখতে না খুব মিষ্টি।“ 

শুনে কনি যেন একটু অস্বস্তিতে পড়লো। দৌড়ে ঘরে যাবার ভান করলো। 

“তোমার কি বিশ্বাস হচ্ছে না আমার কথা?” 

“দ্যাখো, সত্যিই আমি তোমাকে চিনি না।“ এবার একটু বিরক্ত হয়েই বললো কনি। 

“এই শোনো, এলির রেডিয়ো আছে সাথে। আমারটা ভেঙে গেছে।“ বলেই ছেলেটি হাতটা উঁচু করে ছোট্ট রেডিয়োটা দেখালো। ওখানে তখন গান বাজছিল। কনি শুনতে পেল, সেই গানের অনুষ্ঠানটাই রেডিয়োতে বাজছে, যা ও শুনছিল এতক্ষণ। 

“ববি কিং?” কনি জানতে চাইলো। 

“আমি একেই সারাক্ষণ শুনি। ওর মত কেউ গায় না আর।“ 

“হ্যাঁ। ও আসলেই দারুণ শিল্পী।“ একটু উদাস সুরে বললো কনি। 

“জানো তো, সে সত্যিই খুব ভাল শিল্পী। সে জানে গানে কোথায় কোন্‌ কাজটা করতে হয়।”

এবার কনি একটু উচ্ছ্বসিত হলো। তবে সে এখনো ঠিক বুঝতে পারছে না, ছেলেটাকে কি পছন্দ করা যায়, না কি, ফালতু। রোদচশমায় ছেলেটার চোখটা ঢাকা থাকায় সে ঠিক বুঝতে পারছিল না, ছেলেটা কী দেখছে। সে দৌড়ে সিড়ির গোড়ায় গিয়ে দাঁড়ালো এবার, তবে নিচেও নামলো না। আবার ঘরেও ঢুকলো না। 

“তোমার গাড়ির গায়ে এতসব কী আঁকা?” 

“তুমি পড়তে পারছো না?” বলে ছেলেটি আস্তে করে গাড়ির দরজাটা খুললো। এত কোমলভাবে খুললো যেন, জোরে খুললেই সব লেখা গা থেকে ঝরে পড়বে। গাড়ি থেকে নেমে, মাটিতে শক্ত করে পা-টা রেখে এবার রোদচশমাটা নামালো চোখ থেকে। এবং তাকালো কনির গায়ের সবুজ ব্লাউজটা বরাবর। 

“এটা আমার নাম লেখা।“ সে বললো। ‘আরনল্ড ফ্রেন্ড’। কালো কালিতে লেখা- পাশে কুমড়োর মত দেখতে একটা মুখ, হাসছে, তার চোখে কোনো রোদচশমা নেই। 

ছেলেটি বলতে শুরু করলো, “এবার তাহলে আমার পরিচয়টা দিই। আরনল্ড ফ্রেন্ড। এটাই আমার সত্যিকারের নাম। আর গাড়ির ভেতরে যে বসে আছে, ও এলি অস্কার। ও স্বভাবে একটি লাজুক ধরনের।“ 

এলি তার ছোট্ট রেডিয়োটা ঘাড়ের উপর রেখে একটু ঠিকঠাক জায়গায় বসাতে চাইলো। 

“এই যে গাড়ির গায়ে নাম্বারগুলো দেখছো, এটা একটা গোপন সংকেত।“ আরনল্ড ফ্রেন্ড ওকে সংখ্যাগুলো পড়ে শোনালো। ৩৩, ১৯, ১৭… ভুরুটা উঁচিয়ে বুঝতে চাইলো, কনি এই সংখ্যার মানে বুঝেছে কি না। কনির অবশ্য নাম্বারের দিকে অত মনযোগ দিল না। বাঁদিকের পেছনের বাম্পারটা ঘষা-লাগা আর ওখানে সোনালী রঙের উপর কালো রঙে লেখা, “DONE BY A CRAZY WAMAN DRIVER” ! এটা দেখে কনি সশব্দে হেসে উঠলো। ওর হাসি দেখে এবার আরনল্ড একটু সহজ হয়ে বললো, 

“এসো, দেখে যাও। গাড়ির এদিকটায় অনেক কিছু আঁকা আছে। তুমি দেখতে চাও?” 

“না।”

“কেন নয়?” 

“কেন দেখবো আমি?” 

“তুমি দেখতে চাও না গাড়িতে আর কী আছে? তুমি ঘুরতে যেতে চাও না?” 

“না, আমি জানি না।“ 

“কেন জানো না?” 

“ঘরে অনেক কাজ আছে আমার।“ 

“কী রকম কাজ?” 

“আছে। কাজ আছে।“ 

কনির কথা শুনে সে এমনভাবে হেসে উঠলো যেন ও খুব একটা মজার কথা বলেছে। ও উরু চাপড়ে হাসতে লাগলো। সে একটু অদ্ভুতভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন পড়ে না যায়- এরকম একটা ভঙ্গীতে গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অত লম্বা নয় নয় ছেলেটা দেখতে। কনি যদি পাশে এসে দাঁড়ায় তো ওর চেয়ে ইঞ্চিখানেক লম্বা হতে পারে। ছেলেটি যে বসনে সেজেছিল, কনির পছন্দ হলো। টাইট রঙ জ্বলে-যাওয়া জিন্স প্যান্ট, বুট, একটা মেটালের বেল্ট পরা- এমনভাবে পড়েছে যে, ওর কোমরটা চিকন সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সাদা একটা শার্ট, গায়ে চেপে বসে আছে এমন, আর তাতেই হাতের আর কাঁধের মাসলের আভাস বাইরে থেকে ফুটে উঠেছিল। ওকে দেখে মনে হতে পারে, সে খুব পরিশ্রমের কাজ করে, শক্ত-ভারী জিনিস ওঠানো-নামানোর কাজ। এমন কি তার গলাটাও শক্ত ভাজের। মুখটাও খানিকটাও ওরকম গোছের। চোয়ালের দিকটা একটা কালো লাইনের মত ফুটে উঠেছে, হয়তো গত দু একদিন দাড়ি কামায়নি। তার নাকটাও কেমন দাঁড় কাকের মত বাঁকানো। আর এমন ভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, যেন গন্ধ শুকছে- চারপেয়ে প্রাণীরা খাবার সামনে পেলে যেমনটা করে! 

“কনি, তুমি কিন্তু সত্যি কথা বলছো না। আজকের দিনটায় তুমি আমার সাথে বাইরে যাবে এমন প্রস্তুতিই নিয়েছিলে।“ ছেলেটি হাসতে হাসতে বললো। 

“আমার নাম তুমি কী করে জানলে?” সন্দেহভরা চোখে ও জানতে চাইলো। 

“আমি জানি। কনি।“ 

“হতেও পারে। নাও হতে পারে।“ 

“আমি আমার কনিকে চিনি।“ আঙুল দোলাতে দোলাতে সে বললো। কনির এবার ছেলেটাকে স্পষ্ট করে মনে পড়লো। ওই সেদিন রেস্তরাঁর পেছনে- কয়েক মুহূর্তমাত্র- তবুও, ও যখন ছেলেটাকে পাশ কাটিয়ে এগুলো, ওর চিবুকটা তপ্ত নিঃশ্বাসে কেমন ওম পেয়েছিল, ছেলেটার কথাই তো সেই মুহূর্তে ও ভাবছিল। আর ছেলেটিও এত গভীর দৃষ্টিতে ওকে দেখছিল! কনিকে তো তার মনে থাকারই কথা! 

“এলি আর আমি শুধু তোমার জন্যই এখানে এসেছি। এলি পেছনে বসবে। তুমি আমার পাশে বসে যাবে। কেমন হবে?”  

“কোথায়?” 

“কোথায় মানে?” 

“কোথায় মানে, আমরা কোথায় যাবো?” 

সে কনির দিকে তাকালো। রোদচশমাটা নামালো। কনি এবার পরিস্কার দেখতে পেল, ছেলেটার চোখের চারপাশটা কেমন ক্লান্ত, মলিন। ছায়ায় এতক্ষণ এতটা বোঝা যাচ্ছিল না। আলো পড়াতে সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার চোখটা ছোট্ট ছোট্ট কাচের টুকরোর মত, আলোটা খুব ঘন ঘন প্রতিফলিত হয় চোখে। সে হাসলো। যেন কোথায় যাবে কিছুই জানে না, এখুনি নতুন করে ভাবতে হবে। 

“আরে, বিশেষ কোনো জায়গায় নয়। শুধুই ঘুরবো আমরা, কনিসোনা।“

“আমার নাম যে কনি, একবারো কিন্তু তোমাকে বলিনি আমি।”

“কিন্তু আমি তো জানি তোমার নাম। শুধু নাম নয়। আমি অনেককিছু জানি। তোমার সবটা জানি আমি।“ সে কিন্তু একটুও নড়েনি। গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েই কথাগুলো বলছিল আরনল্ড। 

“তোমার জন্য আমি আলাদা করে সময় ব্যয় করেছি। এত সুন্দর দেখতে তুমি! তোমার সব খবর আমি নিয়েছি। আমি জানি তোমার বোন আর মা-বাবা আজ কোথায় গেছে, কতক্ষণ হলো গেছে। এ-ও জানি, কাল সন্ধ্যাতে কার সাথে কাটিয়েছ তুমি। আর তোমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর নামও জানি আমি। বেটি। ঠিক বলেছি না?” 

এমন ছন্দময় সুরে সে কথা বলছিল যেন কোনো গানের লাইন পড়ছে। মন্দ ভাবার মতো কিছুই চোখে পড়ছিল না কনির। আর ওদিকে গাড়ির মধ্যে বসে জোরে রেডিয়ো ছেড়ে গান শুনতেই থাকলো এলি। বাইরে তারা কী কথা বলছে, কোনো মনযোগই ছিল না ওর তাতে। 

“এলি পেছনেই বসতে পারবে।“ আরনল্ড ওর বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করাতে চাইলো কনিকে। 

“তুমি এত কিছু জেনেছ কেমন করে?” 

“শোনো, বেটি শুজ আর টনি ফিজ, তারপর জনি পেটিনজার আর ন্যান্সি পেটিনজার, এদিকে রেমন্ড স্ট্যানলি, বব হান্টার…” এক নিঃশ্বাসে সে বলে গেল। 

“তুমি এদের সক্কলকে চেন? আশ্চর্য!” 

“সব্বাইকে চিনি আমি।”

“ এটা কী করে সম্ভব? তুমি তো এখানের মানুষ নও। তুমি নিশ্চয়ই মজা করছো?” 

“নিশ্চয় আমি এখানের।”

“তাহলে এতদিনে একবারও কেন দেখিনি তোমাকে আগে?” 

“অবশ্যই তুমি আমাকে দেখেছ। মনে করতে পারছো না শুধু।” নিজের বুটের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললো সে। 

“আমার মনে হচ্ছে, মনে করতে পারবো।“ 

“ঠিক।“ তার মুখটা চকচক করে উঠলো। এবার সে যেন খুশি হয়ে উঠলো। এলির রেডিয়োতে বাজতে থাকা গানটা শুনতে শুনতে নিজের মুঠিতে টোকা দিতে থাকলো। আর কনির চোখ তার দিক সরে গাড়ির দিকে পড়লো। এত উজ্জ্বল রঙে আঁকা সব! ওর চোখ ঝলসে যাবার মত। নামটা আবার দেখলো, আরনল্ড ফ্রেন্ড। আর সামনের বাম্পারে লেখা ‘—MAN THE FLYING SAUCERS.’ এই কথাগুলো ছেলেমেয়েরা আগে বেশ ব্যবহার করতো। এখনকার দিনে ওভাবে আর করে না। সে এমনভাবে লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলো যেন এর অর্থ সে আগে কোনোদিন জানতোই না। 

“এই, তুমি কী এত ভাবছো?” আরনল্ড ফ্রেন্ড একটু জোরের সাথেই জিজ্ঞেস করলো। “হাওয়ায় তোমার চুল সব ওড়াউড়ি করবে, সেসব নিয়ে ভাবছো না কি?” 

“না।”

“তাহলে কী? ভাবছো, আমি ভালো গাড়ি চালাতে পারি না?” 

“সেটা আমি জানবো কী করে? আমার তো জানবার কথা নয়।“ 

“তোমাকে বোঝা বড় মুশকিল মনে হচ্ছে। তুমি কি দ্যাখোনি আমি যে একটা চিহ্ন উড়িয়েছিলাম হাওয়ায়, তুমি যখন যাচ্ছিলে পাশ দিয়ে।“ 

“চিহ্ন! কিসের চিহ্ন?” 

“আমার চিহ্ন।“ বলেই সে বাতাসে একটা X আঁকলো, কনির দিকে ফিরে। যদিও তারা প্রায় দশ ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে, তবু হাতটা নামিয়ে ফেলবার পরেও বাতাসে কনি সেই X চিহ্নর ছায়া দেখতে পেল। সে পর্দাটা টেনে দিয়ে দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে রইলো। তার ঘরে যে গান বাজছে আর এলির রেডিয়োতে- দুটো গানের সুর সে মেলাতে পারছিল। কনি আরনল্ড ফ্রেন্ডের দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে চাইলো। ছেলেটি এমন ভাব দেখাচ্ছে, সে খুব আরামে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, আদতে ওর ভেতরে একটা জড়তা কাজ করছিল। অনাবশ্যকভাবে সে গাড়ির হাতলটা ধরে ছিল, যেন ওখান থেকে সে আর নড়বেই না। কনি ওর দিকে তাকিয়ে ওর সমস্ত কিছু মেলাবার চেষ্টা করছিল। ওর টাইট জিন্স, যেটার উপর দিয়ে ওর উরু, নিতম্বের আকার সবই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, পায়ের চকচকে বুট, সাদা গায়ে লেগে-থাকা শার্টটা। সব, সব- কনি এক সুঁতোয় গাঁথতে চাইলো। ওর মোলায়েম স্বরে কবিতার সুরে কথা বলা, রগড় করা আবার গম্ভীর হয়ে যাওয়া। গান শুনবার সময়ে হাতের কব্জিকে টোকা দিয়ে তাল মেলানো- সবই সে মেলাতে চাইলো একত্রে, মানুষটার সাথে। কিন্তু কোথায় গিয়ে মিলছিল না যেন আর। 

“আচ্ছা,বলো তো, তোমার বয়স কত?” হঠাৎ জিজ্ঞেস করে উঠলো কনি।

এবার তার হাসিট মিলিয়ে গেল পলকে। একটু অপ্রস্তুত হলো সে ওর এই আকস্মিক প্রশ্নে। কনি ওর দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করলো, ওর বয়স তিরিশ হবে। হতে পারে তারও বেশি। এটা বুঝবার পর ওর বুকের স্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠলো। 

“একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসলে তুমি! এটা একটা প্রশ্ন হলো? দেখছো না, আমি তোমারই বয়সী।“

“ তুমি মোটেও তা নও।“ 

“তাহলে হয়তো আরো ক’টা বছর বড় হবো। আমি আঠেরো।“ 

“আঠারো!!” কনি বিস্ময়ভরা কন্ঠে বললো। 

ওকে আস্বস্ত করতে আরনল্ড হাসলো, মুখ প্রসারিত করে হাসি যাকে বলে। ওর ঠোঁটের পাশে চিকন চিকন দাগ দেখতে পেল কনি। বেশি হাসাতে ওর চোখটাও ছোট হয়ে এলো, কনি দেখলো ওর চোখের পাতাগুলো বেশ দীর্ঘ, কালো। আর মুখ হা করাতে দেখতে পেল বড় বড় সাদা দাঁত। এরমধ্যেই হঠাৎ আরনল্ড ওর কাঁধের পাশ দিয়ে তাকিয়ে দেখলো এলি উদ্ভ্রান্তের মত গান শুনেই চলেছে! বললো, “ওকে কি তোমার পাগল কিসিমের মনে হচ্ছে না? ও এরকম একটা আলাভোলা।” রোদচশমা পরে থাকায় ও কি ভাবছে আরনল্ড কিংবা কনি কারোরই বুঝবার পথ নেই। কোনোদিকেই তার কোনো খেয়াল নেই। কটকটে কমলা রঙের একটা বুকখোলা শার্ট পরেছিল সে। বোতাম অনেকটা খোলা থাকায় থাকায় অনাকর্ষণীয় বুকটা দেখা যাচ্ছিল। একেবারেই কোনো মাসলম্যানদের মত নয়। আর কলারটা বেখাপ্পারকম উপরের দিকে তুলে রাখা, একেবারে চিবুক ঢেকে যাচ্ছে, এরকম। তার রেডিয়োটা কানের কাছে চেপে ধরে সে কিন্তু গান ছেড়েই রেখেছিল। 

“ও আসলেই একটু অদ্ভুত রকমের মানুষ মনে হচ্ছে।“ কনি বললো। 

“হেই! শুনতে পাচ্ছ, কনি বলেছে তুমি সত্যিই একটা পাগল কিসিমের মানুষ!” বলতে বলতে সে গাড়ির ভেতরে মুখ বাড়িয়ে দিল। এই প্রথমবারের মত এলি মুখ বের করে চাইলো কনির দিকে। কনি তো ওকে দেখেই একটা ধাক্কা খেল, মনে হলো। সে তো মোটেও কোনো অল্প বয়সী ছেলে নয়। তার সাদা, ফ্যাকাশে, মুখটা দেখে বোঝাই যাচ্ছে, কমের পক্ষে চল্লিশ বছর বয়স হবে ওর। আর মুখের চামড়াটা এত পাতলা যে, শিরা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। কনির মাথাটায় যেন একটা চক্কর দিয়ে উঠলো ওকে দেখে। সে নিজেকে ধাতস্থ করবার জন্য আরো কিছুক্ষণ এলির মুখে তাকিয়ে রইলো। ও ভাবছিল, এটা যেন ওর চোখের ভুল হয়। আবার যেন তাকালে ওর বদলে যাওয়া মুখটা দেখতে পায়। এলি কিছু বলবার জন্য মুখ খুললো। কিন্তু কিছুই বলতে পারলো না। তোতলাতে থাকলো শুধু। 

“তোমরা দুজনে বরং ঘুরে এসো।“ কনি খানিকটা অবসন্ন গলায় বললো। 

“কি? কী বললে? এও হয় নাকি? তুমি জানো আজ রবিবার। আর আমরা এখানে এসেছিই শুধু তোমার জন্য।“ তার গলার স্বরটা এখন শোনাচ্ছে একদম রেডিয়োতে কথা বলা লোকটার গলার মত! “তুমি তো জানো আজ ছুটির দিন, রোববার। আর সোনা, তুমি কেন ভুলে যাচ্ছ, তুমি কার সাথে আছ এই মুহূর্তে! কাল রাতে কার সাথে ছিলে তুমি, সেটা কোনো বিষয়ই নয়। চলো, চলো, আমরা ঘুরে আসি।“ তার গলাটায় একটা আলগা আকুতি যোগ হলো, সাথে খানিকটা উত্তাপ। 

“না। বললাম তো, কাজ আছে আমার।“ 

“এই শোনো।“ 

“উহু। তোমরা দুজনে বরং যাও ঘুরতে।“ 

“তুমি সাথে না গেলে আমরা এখান থেকে নড়ছি না।“

“কিন্তু আমি তো মোটেও যাবো না।“ 

“কনি শোনো, লক্ষ্মীটি আমার, বোকামি কোরো না।“ মাথা নেড়ে নেড়ে বললো আরনল্ড ফ্রেন্ড। খুব হাসতে শুরু করলো সে। এরপর ওর রোদচশমাটা মাথার উপর তুললো ধীরেধীরে, মনে হচ্ছিল যে ও একটা নকল চুল লাগিয়েছে আর কানের গোড়া দিয়ে গাছের ঝুরির মতো ঝাকড়া চুল বেয়ে নামছে। কনি তার দিকে তাকিয়েই রইলো। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠলো, বিবশ লাগতে শুরু করলো ওর। লোকটা গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, তবে কনি তাকে দেখতে পাচ্ছিল ঝাপসা। সে কোথা থেকে এলো, কোথায়ই বা আছে, এতক্ষণ কানে বাজতে থাকা গানের সুর… সবই কেমন তালগোল পাকিয়ে যেতে থাকলো! 

“দ্যাখো, এখুনি যদি আমার বাবা চলে আসে তো তোমাদেরকে দেখবে।“ 

“তিনি এখন আসবে না, বারবিকিউ পার্টিতে আছে।“ 

“তুমি এটাও জানো? কীভাবে?” 

“তারা এই মুহূর্তে টিল আন্টির ওখানে আনন্দ করছে। উঠোনে বসে খাচ্ছে-দাচ্ছে পান করছে, নাচছে।“ ভাসাভাসা স্বরে সে বলতে থাকলো। “ওরা সকলেই এখন ওখানে বসে আছে। তোমার বোনটা! নীল একটা জামা পরে গেছে, পায়ে উঁচু হিল- কিন্তু কী বলবো? সে তোমার ধারে কাছেও না। তুমি এত সুন্দর! আর তোমার মা তো আরো ব্যস্ত। কতগুলো মোটা মহিলার সাথে মিলে ভুট্টা ছিলছে।“ এমনভাবে সে কথাগুলো বলছিল যে, এতটা পথ পেরিয়েও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ওখানের সব! 

“মোটা মহিলা কাকে বলছো?” প্রায় চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো কনি। 

“আশ্চর্য তো! মোটা মহিলাগুলো কে, তা আমি বলবো কী করে? আমি পৃথিবীর সমস্ত মোটা মহিলাকে চিনে রেখেছি না কি?” হাসতে হাসতে বললো সে। 

“ওহ! বুঝেছি। ওটা মিসেস হর্ন্সবি। ওকে ওখানে নেমন্তন্ন করলো কে?” কনির মাথাটা আবার ফাঁকা ফাঁকা লাগতে লাগলো। বুক ধড়ফড় করতে শুরু করলো। 

“ইশ, জানো তো, মোটা মহিলা আমার একেবারে পছন্দ নয়। কনি সোনা, আমার পছন্দ তোমার মত দেখতে মেয়েকে।“ ঘুমজড়ানো চোখে বলে উঠলো সে। দরজার কাছটাতে দাঁড়িয়েই কনি লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলো আরো বেশ কিছুক্ষণ। পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় হচ্ছিল, এর মধ্যেই আরনল্ড ফ্রেন্ড বলে উঠলো, “তো, তুমি কী করবে এখন? এসো। দরজার ওখান থেকে নেমে এসো। তুমি যাবে আমার সাথে ঘুরতে। গাড়ির সামনের সিটটায় তুমি বসবে আমার পাশে। এলির কথা মাথায় রেখো না। ও পেছনে বসে থাকবে। ও কোনো সমস্যা নয়। তুমি যাবে আমার সাথে। আমি তোমার প্রেমিক।“ 

“কি? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?”

“না। তোমার প্রেমিক আমি। তুমি যদি এখনো সেটা না জানো, তো জানবে একটু পরেই। আমিও জানবো। যদিও তোমার অনেককিছুই আমি জানি। শোনো কনি, আমার চেয়ে ভালো প্রেমিক তুমি আর পাবে না। এত আদর করে কেউ তোমাকে কথা বলবে না। আমি যা বলি তা করি- প্রতিজ্ঞা রাখি। দ্যাখো, আমি তোমার সাথে প্রথম দেখায় যেমন সুন্দর ছিলাম, এখন এই মুহূর্তে ঠিক তেমনই আছি। ভরসা রাখো। খুব ভালবাসবো আমি তোমাকে। এত প্রেমময় আলিঙ্গনে তোমাকে জড়াবো যে তুমি তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইবার ভাণ করবে, কিন্তু আদতে বেরোতে চাইবে না। তোমার এত গভীরে প্রবেশ করবো, তোমার সবটা গোপন আমি আবিষ্কার করবো- তুমিও তা খুব উপভোগ করবে, আমি বলছি। আমি জানি, তুমি তখন ভালোবাসতে শুরু করবে আমাকে।“ 

“চুপ করো। পাগলের মত বোকো না। তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।“ বলতে বলতে সে দরজা থেকে দূরে সরে এলো। দু’হাত দিয়ে নিজের কান চেপে রেখে সে বিড়বিড় করতে থাকলো। “তুমি এসব কী বলছো পাগলের মত। এভাবে কেউ বলে না।“ কনির হৃদস্পন্দন এত দ্রুত আর জোরে হতে থাকলো যেন ওত হৃদযন্ত্রটা ওর বুকের বাইরে বেরিয়ে আসবে এখুনি। ঘামে ওর শরীর ভিজতে লাগলো। ও এলোমেলো পা ফেলে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। কোনো রকমে চোখটা খুলে দেখতে চাইলো আরনল্ড ফ্রেন্ড তখন কী করছিল। কনি দেখলো, তখন নিজেকে সামলে নিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল লোকটা। বুট দিয়ে মাটিটাকে চাপ দিয়ে নিজের শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখছিল। 

“কনি, তুমি কি এখনো শুনতে পাচ্ছো আমাকে?” 

“তুমি এখুনি বেরিয়ে যাও এখান থেকে।“ 

“এভাবে রেগে যেয়ো না। প্লিজ, কনি, আমার কথা শোনো।“ 

“এবার কিন্তু আমি পুলিশ ডাকবো।“ 

আরনল্ড ফ্রেন্ড আবারো উত্তেজনায় কাঁপতে শুরু করলো। ওর মুখ দিয়ে থুতুর সাথে বেরিয়ে এলো একটা অভিশাপ- যদিও কনির উদ্দেশ্যে সে তা বলেনি। তবুও ‘হা ঈশ্বর’ শব্দটা সে একটু জোরেই বললো। এবং হাসতে শুরু করলো। লোকটাকে কনির তখন একেবারেই অচেনা মনে হচ্ছিল। ওর হাসিটাও যেন মুখ থেকে নয়, লোকটার মুখোশ থেকে বেরিয়ে আসছিল, মনে হলো। তার সম্পূর্ণটাই কি মুখোশে মোড়া? না তাও নয়। সে মুখটা মুখোশে ঢাকলেও গলার কাছটায় ঢাকতে ভুলে গেছে মনে হচ্ছে। 

“লক্ষ্মীটি, শোনো আমার কথা। আমি একটুও মিথ্যে বলছি না। আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে, এরপরে আর কখনোই আসবো না এখানে।“ 

“সেটাই তোমার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে। আমি পুলিশ ডাকবো এখুনি, তুমি যদি…” 

“সোনা, শোনো আমার কথা। ঠিক আছে, আমি ভেতরে আসবো না। কিন্তু তোমাকে তো বাইরে আসতে হবে। আর কেন হবে, তা তুমি জানো।“ 

কনি তখনো হাঁপাচ্ছিল। দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকলেও, জায়গাটা ওর অচেনা মনে হচ্ছিল। যেখানেই ও দৌড়ে যাচ্ছে, কোনোটাই যথেষ্ট মনে হচ্ছে না, যা ওকে সেই মুহূর্তে আশ্রয় দিতে পারে। ওদের রান্নাঘরের জানালায় কখনোই পর্দা ছিল না, সিংকটার ওপরে কতগুলো থালাবাসন, ধোবার জন্য জমানো। মনে হচ্ছে, ওগুলো যেন তিন বছর ধরে জমিয়ে রেখেছে কেউ ওর জন্য- আঙুল দিয়ে একটা দাগ কাটলে আঠাআঠা এঁটো লেগে যাবে ডগায়। 

“এই তুমি শুনছো? শুনতে পাচ্ছ, কনি? পুলিশকে ফোন করছো নাকি তুমি? শোনো, তুমি যেইমাত্র পুলিশ ডাকবে, আমি কিন্তু আমার প্রতিজ্ঞা ভুলে যাবো। ভেতরে চলে আসবো আমি। তুমি নিশ্চয়ই তা চাইবে না।“ 

কনি তড়িঘড়ি করে দরজাটা লক করতে চাইলো। হাত কাঁপছিল ওর। ঠিক ওর মুখের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে আরনল্ড ফ্রেন্ড বলে উঠলো, “দরজা কেন লক করছো? কী লাভ? এ তো শুধু একটা পর্দা দেয়া কাচের দরজা। কেউ যদি চায় এক নিমেষেই এটা ভেঙে ফেলতে পারবে। একটা পর্দা, কাচ, কাঠ কিংবা লোহার পাত- ভেঙে ফেলতে চাইলে এগুলো ভাঙা কোনো বড় সমস্যা নয়। বিশেষ করে আরনল্ড ফ্রেন্ড যদি চায়।“ সে যখন কথাগুলো বলছিল, ওর পায়ের বুটটা এমনভাবে রেখেছিল, যেন ওর মধ্যে ওর পা-টাই নেই। গোড়ালির ওপর ভর করে জুতার মুখটা একটু বামদিকে হেলিয়ে দরজামুখি হয়ে ছিল বুটটা। সে বলতেই থাকলো, “ধরো, এখন যদি এই বাড়িটায় আগুন লেগে যায়, তুমি তো দৌড়ে এসে আমার বাহুতেই আশ্রয় নেবে। এর চেয়ে নিশ্চিন্ত আশ্রয় তুমি আর পাবে না কোথাও। ভেবে দ্যাখো, কী করবে? বোকামী কোরো না, কনি। তোমার মতই একটু লাজুক মত মেয়ে আমি বরং পছন্দ করি, বোকাবোকা মেয়ের চাইতে।“ 

তার কথাগুলো কনির কানে শোনাচ্ছিল ছন্দবদ্ধ কবিতার মতো, গানের লিরিকের মতো। সে কথা বলছিলই সেভাবে। কনির খুব চেনা একটা গানের কলির যেন প্রতিধ্বনিত হলো আরনল্ডের কথায়- গত বছর শোনা গান- একটা মেয়ে তার প্রেমিকের আলিঙ্গনে ফেরবার জন্য আকুতি নিয়ে দৌড়ে আসছে, ঘরে ফিরছে…। 

খালিপায়ে ঘরের মেঝেতে দাঁড়িয়ে সে অস্ফুট স্বরে তাকে বললো, “তুমি আসলে কী চাও?” 

“তোমাকে চাই আমি।“ 

“কী বললে?” 

“প্রথম দিন দেখেই আমি ভেবেছি, একেই আমি চাই, আর কোনোদিকে তাকাবার দরকার নেই।“ 

“কিন্তু বাবা ফিরবে এখুনি। ফিরেই আমাকে খুঁজবে। আর আমার চুলগুলো ধুতে হবে আগে।“ সামান্য গলা উঁচিয়ে বললো কনি, যাতে আরনল্ডের কানে পৌঁছায়। 

“না। তোমার বাবার ফিরতে দেরি হবে। তবে হ্যাঁ, চুলগুলো তোমাকে ধুতে হবে। আর তা ধোবে তুমি আমার জন্য। এগুলো ধুলে আরো উজ্জ্বল, সুন্দর দেখাবে। আর সেটাও তুমি করবে আমার জন্য।“ নতজানু হবার ভঙ্গীমায় বলতে গিয়ে সে আবারো ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিল শরীরের। তার বুটটার ভেতরে এমন কোনো জিনিশ পুরে দেয়া যার জন্য ওর পায়ের পুরোটা ঠিকঠাক বসছিল না। তবে বোধহয় এটা করা হয়েছিল, ওকে আরেকটু লম্বা দেখাবার জন্য। 

কনি তার দিকে দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ গেল ওর পেছনে গাড়িতে বসা এলির দিকে। সে এতক্ষণ পর্যন্ত ওদের দিকে খেয়াল না করলেও এই মুহূর্তে যেন মনে হলো, কিছু একটা বলতে চাইছে গাড়ির ভেতর থেকে।

“তুমি কি চাও ফোনের লাইনটা ছিড়ে ফেলি?” 

“একদম মুখটা বন্ধ রাখো। এটা তোমার ভাববার বিষয় নয়।“ খুব রাগত স্বরে এলিকে বললো। আর এমনিতেই আরনল্ড ফ্রেন্ডের মুখটা লাল হয়ে উঠছিল একটা বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে। তার মনে হচ্ছিল, কনি বোধহয় বুটের দিকে তাকিয়ে আছে- যেটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। 

“তুমি কী করতে চাইছ? কী করবে? আমি এখন যদি পুলিশকে ফোন দিই, তারা এসে এখুনি তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে। তুমি জানো না তা?” 

“শোনো, কনিসোনা, ভেতরে না ঢুকবার প্রতিজ্ঞাটা আমি রাখবো, যতক্ষণ না তুমি ফোনে হাত দেবে। আমি প্রতিজ্ঞা রাখি।“ একটু শক্ত-সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, কাঁধ নেড়ে সে কথাটা বললো। তার বলার ভঙ্গীমায় ছিল নায়কোচিত একটা ভাব। খুব জোরে কথা বলছিল, যেন শুধু কনি নয়, ওর পেছনের কেউ একজনকেও সে শোনাচ্ছে। 

“এই বাড়িতে ঢুকবার কোনো পরিকল্পনা করে এখানে আসিনি আমি। দরকারও নেই আমার। আমি এসেছি শুধু তোমার জন্য। আমি চাই, তুমি বেরিয়ে এসো আমার কাছে। তুমি তো জানো, কে আমি!” 

“তুমি একটা পাগল।“ সে বিড়বিড়িয়ে বললো। দরজা থেকে পেছনে সরে এলো বটে, তবে অন্য ঘরের দিকেও সে যাচ্ছিল না। কনির মনে হলো, অন্য ঘরে সরে যাওয়া মানে তাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়াটা সহজ করে দেয়া হবে হয়তো। 

“কী সব বলছো তুমি, সোনা?” 

ওর চোখ রান্নাঘরের সবদিকে বুলিয়ে দেখছে। কিন্তু কোনোকিছুই চেনা লাগছিল না ওই মুহূর্তে। 

“সবচেয়ে ভালো হয় কী, তুমি জানো? বেরিয়ে এসো। আমরা গাড়িতে করে ঘুরতে বেরোই। আর তুমি যদি না বের হও, আমরা এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো, তোমার মা-বাবারা না ফেরা পর্যন্ত। আসুক, তারা ফিরে আমাদেরকে এভাবে দেখুক।“  

কী বুঝলো এলি, কে জানে! কানের কাছ থেকে রেডিয়োটা সরিয়ে, মুখ ভেঙচে সে তখন বলে উঠলো, “কী বলো, ফোনটা টেনে বের করে আনবো না কি?” 

“এই! তোমাকে চুপ থাকতে বলেছি, কানে যায়নি কথা তোমার? তুমি কি কালা? যাও কানে হেয়ারিং এইড পরে আসো, যাও। কনি তো সমস্যাই করছে না, করবেও না আমার সাথে। ও লক্ষ্মী মেয়ে।“ জোরে জোরে উদ্দেশ্যহীনভাবে বাতাসে গলা ছেড়ে বললো আরনল্ড। “ও আমার প্রেমিকা। তোমার নয়। তোমাকে এটা নিয়ে ভাবতে হবে না। এলি, তুমি আমাকে খোঁচাতে এসো না। শুয়োরের মতো কোরো না যেন। মুখ বন্ধ রাখো একদম।“ এবার ঘরের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো, “তুমি কিছু মনে কোরো না সোনা। ও একটা ফাজিল। ওর কথায় কান দিয়ো না। তুমি শুধু আমাতে মন দাও। বেরিয়ে এসে আমার হাতে হাত রাখো। কেউ তোমাকে কোনো কষ্ট দিতে পারবে না দেখো। শুনছো? এসো। খামোখা আমাদের মধ্যে তোমার টাক মাথা বাবা, ঘ্যানঘ্যানানি মা, হাইহিল পরা বোনটা কাউকে টেনো না।“ 

“একা ছেড়ে দাও আমাকে।“ কনি আলতো স্বরে বললো। 

“এই শোনো, তুমি কি রাস্তার শেষ মাথার ওই মহিলাটিকে চেনো? মুরগি-টুরগি নিয়ে থাকে?” 

“ও তো মারা গেছে।“ 

“সে কি? মারা গেছে? চেনো ওকে?” 

“বললাম তো, সে মারা গেছে।“

“তুমি কি তাকে পছন্দ করতে না? “ 

“সে আর নেই। মারা গেছে।“ 

“কিন্তু ওর সাথে কি তোমার কোনো রাগ ছিল?” রোদচশমাটায় হাত বুলাতে বুলাতে শীতল স্বরে সে বললো।

“আচ্ছা বাদ দাও। এবার তুমি ভালো মেয়েটি হয়ে যাও তো দেখি।“ 

“কেন? তুমি কী করতে চাইছ?” 

“সেরকম কিছু নয়। মাত্র দুটো বা তিনটে জিনিস করবো। তুমি শুধু বেরিয়ে এসো। আমি কথা দিচ্ছি, তোমার ভালো লাগবে। আমাকেও তোমার ভালো লাগবে যেমন অন্য কাছের মানুষদেরকে লাগে। বেশিক্ষণ সময় নেব না। বেরিয়ে এসো, সোনা। তুমি নিশ্চয়ই চাও না, তোমার পরিবারের কেউ ঝামেলায় জড়িয়ে যাক।“ 

দৌড়ে পেছনের রুমটায় চলে গেল কনি। যেতেই একটা টেবিল বা কিসের সাথে যেন জোরে ধাক্কা লাগলো। ফোনটা উঠাতেই কিসের একটা গর্জনের আওয়াজ শুনতে পেল কানের কাছে। আস্তে, আবার জোরে। কেমন অসুস্থ লাগতে লাগলো ওর। ফোনটা উঠালো ঠিকই কিন্তু এত ভারী লাগলো, ডায়াল ঘুরিয়ে ফোন করাবার মত শক্তিও যেন ওর মধ্যে বাকি নেই আর। সে চিৎকার দিতে লাগলো। কান্না শুরু করলো। মাকে ডাকতে লাগলো ও। বুকের মধ্যে এমন চাপ লাগতে লাগলো, হঠাৎ মনে হলো আরনল্ড ফ্রেন্ড ওকে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে চাইছে। বারবার, নির্মমভাবে। একটা চাপা কান্নার আওয়াজ ওর পুরোটা জুড়ে, ভেতরটা জুড়ে। ও যেন নিজের ভেতর বন্দী হয়ে রইলো, যেমনটা আটকে আছে এই ঘরটার মধ্যে। 

কিছুক্ষণ পরে ঘোর কাটলো ওর। ও অন্য বাইরের আওয়াজ শুনতে পেল। দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে বসা ও তখন- ঘাম বেয়ে পড়ছিল ওর পুরো পিঠটা জুড়ে। 

দরজার ওপাশ থেকে শোনা গেল আরনল্ড ফ্রেন্ডের গলা, “এই তো লক্ষ্মী মেয়ে। ফোনটা ঠিক করে রেখে দাও তো দেখি।” 

কনি লাথি দিয়ে ফোনটা দূরে সরিয়ে দিল। 

“ঊঁহু, না না। এভাবে নয়। ফোনটা তুলে ঠিক জায়গায় রাখো।“ 

সে আবার ফোনটা তুলে ক্রাডলে ঠিকঠাক রেখে দিল। এবার বন্ধ হলো ডায়াল টোনটা। 

“খুব ভালো মেয়ে তুমি। আসো। এবার বেরিয়ে এসো তো।“ 

এতক্ষণ ধরে যা ওর ভয় হয়ে কাজ করছিল সব যেন একটা বিশাল শূন্য গহবরের মধ্যে তলিয়ে যেতে থাকলো। কেমন সব শূন্য লাগতে লাগলো। কান্না হয়ে, চিৎকার হয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসলো। সে বসে রইলো নির্বাক। একটা পা ভাজ করে, তার ওপর ভর দিয়ে মেঝেতেই বসে রইলো। ওর মাথার মধ্যে একটা ছোট্ট আলোর বিন্দু ওকে তাড়া করছে- কিছুতেই স্থির হতে দিচ্ছিল না। কেবলই ওর মনে হতে থাকলো, ওর মাকে ও কখনো আর দেখবে না। ওর বিছানাটায় ও আর কখনো ঘুমাতে পারবে না। অজানা আশংকায় ওর উজ্জ্বল সবুজ ব্লাউজটা ভিজে যেতে থাকলো ঘামে। 

ঠিক তখুনি আবার শোনা গেল আরনল্ড ফ্রেন্ডের গলা। নাটকীয় স্বরে সে বললো, “যেখান থেকে তুমি এসেছিলে, সে জায়গাটা আর ফিরে পাবে না তুমি। সামনে যেখানে যাবে বলে ভাবছো, সেই ভাবনাটাও বাতিল করতে হবে তোমাকে। আর তুমি যেখানে রয়েছ এই মুহূর্তে- তোমার মা-বাবার বাড়িটায়, এটাও নিতান্তই একটা বোর্ডের বাক্সের মত। আমি চাইলেই মুহূর্তে ভেঙচুরে ফেলতে পারি। তুমি এটা জানো এবং আগেও জানতে। কি? শুনতে পাচ্ছ আমাকে?” 

কনি ভাবতে থাকলো, কী করা যায়! কী করা দরকার এখন? 

“চলো, দূরে একটা সুন্দর মাঠে আমরা যাই, যেখানে প্রচুর রোদের আলো, সুন্দর গন্ধ ভেসে আসে। তোমাকে আমি দু’হাত দিয়ে আলিঙ্গনে বেঁধে রাখবো। সেখান থেকে বেরিয়ে যাবার কোনো প্রয়োজনই হবে না তোমার। তুমি অনুভব করবে, ভালোবাসা দেখতে কেমন সুন্দর। এই ইটকাঠের বাড়িটা একটা যাচ্ছেতাই। ছাড়ো একে।“ বলতে বলতে আরনল্ড ফ্রেন্ড দরজার কাচে আঙুল দিয়ে দাগ টানলো। সেই আওয়াজে কনি এখন আর ভয়ে কেঁপে উঠলো না, একটু আগে যেমন উঠেছিল। 

“হাতটা তোমার বুকের ওপর রাখো। কী বুঝছো? সত্যটা অনুভব করো। আমার প্রতি তুমি সদয় হও, সোনা। লক্ষ্মী মেয়ের মত আমার সাথে চলো। তোমার মত সুন্দর, উজ্জ্বল একটা মেয়ের জন্য তো এটাই সবচেয়ে ভালো। চলো। বাড়ির লোকজন ফিরে আসবার আগেই চলো।“ 

ওর বুকের ভেতর জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে কী যেন। হৃদপিণ্ডটার উপরে হাতটা জড়ো করে রাখলো ও। এই প্রথমবার ও অনুভব করলো জীবনে, এই শরীরের কিছুই যেন ওর নয়। কিছুর ওপরেই ওর কোনো অধিকার নেই। হৃদস্পন্দন আরো দ্রুত থেকে দ্রুততর হলো। এমন কি এই স্পন্দনটাও যেন ওর নিজের নয়। 

“তুমি নিশ্চয়ই নিজেকে কষ্ট দিতে চাও না। প্লিজ সোনা, ওঠো। উঠে দাঁড়াও।“ 

ও উঠে দাঁড়ালো। 

“এবার ঘুরে দাঁড়াও। দরজার কাছে আসো। এই তো। এবার আমার কাছে আসো।“

ওর কথাগুলো রাগের নয়, কেমন পাগলাটে শোনাচ্ছে। “আসো। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আমার কাছে চলে এসো। তোমার হাসিটা আমাকে দেখতে দাও। তুমি তো মিষ্টি একটা সাহসী মেয়ে। এত ভাবছো কেন? ওরা এখন উঠোনটায় বসে হ্যামবার্গার আর ভুট্টাভাজি খাচ্ছে। তারা তোমাকে কোনোদিন জানেইনি, তুমি কত ভালো ওদের সকলের চেয়ে। আর জানো তো, তোমার জন্য এতটা আর কেউ কোনোদিন করবে না।“ 

কনি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। ঘরের মেঝের পিচ্ছিলতা ও অনুভব করলো পায়ের তলায়- কী শীতলতা সেখানে। কপালের ওপর থেকে চুলটা সরিয়ে চিরুনি বুলালো চুলে। আর এদিকে আরনল্ড ফ্রেণ্ড বারান্দার খাম্বাটাকে আড়াল করে যতটা সম্ভব নিজেকে সহজ করে দাঁড়ালো। দু’হাত এমনভাবে বাড়ালো, কব্জিটা নরম করে, যেন কনির কাছে মনে হয় ওর আলিঙ্গনটা সামান্য অপ্রতিভ- কনিও যেন নিজসচেতনতা নিয়ে অতটা ভাবিত না হয়।  

সে দরজাটার সামনে এসে দাঁড়ালো। কাচে নিজেকে দেখতে পেল। এরপর ধীরেধীরে হাত দিয়ে ঠেলে সামনে এগুলো। বাইরের রোদের আলোর আভা এসে তার শরীর, চুলে ছড়িয়ে পড়ছিল। ওখানেই অপেক্ষা করছিল আরনল্ড ফ্রেণ্ড।  

“আমার নীল-নয়না মিষ্টি মেয়েটি!” গানের কলির সাথে মিলিয়ে, ছোট ছোট শ্বাসের সাথে মিশিয়ে, বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে কথাটি- যদিও ওর খয়েরি রঙা চোখের সাথে তা যায় না। কিন্তু ও সেভাবেই নিলো কথাটা। সামনে তাকিয়ে রাস্তাঘাট, আশপাশে কিছুই আর দেখতে পেল না- সে শুধু দেখলো মানুষটার পেছনে, চারপাশে শুধু বিস্তীর্ণ মাঠ, প্রান্তর- রোদের আলোয় যা উদ্ভাসিত… এরকমটা ও আগে দেখেনি কখনো। ওর কাছে এই রোদেলা প্রান্তর চেনা না হলেও, ও বুঝে নিলো, এর মধ্যে দিয়ে ওকে এখন যেতে হবে।
 

লেখক পরিচিতি: জয়েস ক্যারল ওটস আমেরিকান লেখক, জন্ম ১৬ই জুন,
১৯৩৮। তার প্রথম গ্রন্থ ১৯৬৩তে প্রকাশিত হবার পরে এ পর্যন্ত ৫৮ টি উপন্যাস,
ছোটগল্প সংকলন, কবিতা আর প্রবন্ধের বই প্রকাশ পেয়েছে। ক্যারলের পাওয়া
অন্যান্য বহু পুরস্কারের মধ্যে ১৯৬৯ এ ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড, ও হেনরি
অ্যাওয়ার্ড আর ২০১৯ সালে জেরুজালেম পুরস্কার অন্যতম।

Where Are
You Going, Where Have You Been গল্পটি তিনি লিখেছেন ১৯৬৬ সালে এবং এটা
উৎসর্গ করেছিলেন বব ডিলানকে। এই গল্পটি মূলত কল্পনা আর বাস্তব জগতের
জটিলতার সংঘর্ষের ফলে একটা কিশোরীর মনস্তত্বে কী প্রভাব ফেলে, তাই বর্ণিত
হয়েছে। পুরুষতন্ত্রের জোরের কাছে একজন কিশোরীর প্রেমময় কল্পনার জগৎ কতটা
অসহায়, তার পরিণতি কতটা করুণ হতে পারে, সেই বর্ণনা আছে এ গল্পে।

 

অনুবাদক পরিচিতি:

ফারহানা আনন্দময়ী
কবি। অনুবাদক। গদ্যকার

চট্টগ্রামে থাকেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=