সৈয়দ শামসুল হকের মার্জিনে মন্তব্য : গল্পে ক্রিয়াপদের বিভিন্ন কালরূপ


গল্পের ক্রিয়াপদের বিভিন্ন কালরূপ
গল্প বলবার কৌশলের ভেতরে একটি বড় প্রশ্ন লুকিয়ে রয়েছে– ক্রিয়াপদের কোন্ রূপটি ব্যবহার করবো ? বাংলার আগে ইংরেজির দিকে তাকানো যাক। ইংরেজি ভাষায়— এই ভাষাটির সঙ্গে মাতৃভাষার পরেই আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পরিচয়– গল্প উপন্যাস লিখতে গিয়ে লেখকেরা ক্রিয়াপদের যে কালরূপটি ব্যবহার করেন তা হচ্ছে ‘পাস্ট ইনডেফিনিট’ অর্থাৎ সাধারণ অতীত– সিলভিয়া ঘরে ঢুকল, পিটার বলল, জেনি হাত থেকে রুমালটা ছিনিয়ে নিল; ইরেজি কথাসাহিত্যে ক্রিয়াপদের এই সাধারণ অতীত কালরূপটি সেই আদি থেকে প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বাংলাতেও ক্রিয়াপদের এই সাধারণ অতীতকাল রূপটি গল্প বলায় বারবার ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। লক্ষ না করে পারি না, মা যখন শিশুকে রূপকথা বলেন, সে রূপকথার ক্রিয়াপদগুলো সাধারণ অতীত– রাজপুত্র আস্তে করে দরোজা খুলল; দেখল সোনার খাটে শুয়ে আছে ঘুমন্ত রাজকন্যা। ভারতবর্ষের আদিকাব্য মহাভারত, যার ভেতরে এই ভূখণ্ডের বহু উপখ্যানের মূল কাঠামো আমরা আবিষ্কার করতে পারি, সেখানেও আদি কবি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস ক্রিয়াপদের এই সাধারণ অতীত কালরূপটি মূল কাঠামো হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন।
রাজ শেখর বসুর অনুবাদ থেকে–

কৃষ্ণ কুরুপাণ্ডব সেনার মধ্যে রথ নিয়ে গেলেন। দুই পক্ষেই পিতা ও পিতামহ স্থানীয় গুরুজন আচার্য মাতুল শ্বশুর ভ্রাতা পুত্র ও সুহৃদগণ রয়েছেন দেখে অর্জুন বললেন, কৃষ্ণ, এই যুদ্ধার্থী স্বজনবর্গকে দেখে আমার সর্বাঙ্গ অবসন্ন হচ্ছে, মুখ শুকোচ্ছে, শরীর কাঁপছে, রোমহর্ষ হচ্ছে, হাত থেকে গাণ্ডীব পড়ে যাচ্ছে।
কাহিনী বলতে গিয়ে ক্রিয়াপদের এই সাধারণ অতীতকাল রূপটিকে মূল বলে আশ্রয় করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ছুটি গল্প থেকে
এমন সময় ফটিকের মাতা ঝড়ের মতো ঘরে প্রবেশ করিয়াই উচ্চ কলরবে শোক করিতে লাগিলেন। বিশ্বম্ভর বহু কষ্টে শোকোজ্জ্বাস নিবৃত করিলে তিনি শয্যার উপর আছাড় খাইয়া পড়িয়া উচ্চস্বরে ডাকিলেন, ‘ফটিক, সোনা মানিক আমার।’ ফটিক যেন অতি সহজেই তাহার উত্তর দিয়া কহিল, ‘আঁ।’ মা আবার ডাকিলেন, ‘ওরে ফটিক, বাপধন রে।’ ফটিক আস্তে আস্তে পাশ ফিরিয়া কাহাকেও লক্ষ্য না করিয়া মৃদু স্বরে কহিল, ‘মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে মা, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি’।
আধুনিক বাংলা উপন্যাসের আদি স্থপতি বঙ্কিমচন্দ্রও ক্লান্তিহীনভাবে ব্যবহার। করেছেন ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীতকাল রূপ। তার চন্দ্রশেখর উপন্যাস থেকে

প্রতাপ ডাকিল, ‘শৈবলিনী শৈ।’ শৈবলিনী চমকিয়া উঠিল। হৃদয় কম্পিত হইল। বাল্যকালে প্রতাপ তাহাকে ‘শৈ’ অথবা ‘সই’ বলিয়া ডাকিত। আবার সেই প্রিয় সম্বোধন করিল। এখন শুনিয়া শৈবলিনী সেই অনন্ত জলরাশি মধ্যে চক্ষু মুদিল। মনে মনে চন্দ্রতারাকে সাক্ষী করিল। চক্ষু মুদিয়া বলিল, প্রতাপ, আজি এ মরা গঙ্গায় চাঁদের আলো কেন?
তারাশঙ্কর, তারও প্রিয় ক্রিয়াপদের এই সাধারণ অতীত কালরূপ। হাঁসুলীবাঁকের উপকথা থেকে
মুখ খুলেছিল পানু, কিন্তু তার আগেই একটা সুঁচালো বাঁশীর শব্দ বেজে উঠল। সেই শিসের শব্দ। শব্দটা আসছে বাঁশবাদি গায়ের দক্ষিণের বাঁশ বন থেকে। সকলে চকিত হয়ে কান খাড়া করে চুপ করে রইল। বনওয়ারি বসে ছিল উত্তর মুখ করে, বাঁ হাতে ছিল হুকো– সে ডান হাতটা কাঁধর উপর তুলে, পিছনে তর্জনীটা হেলিয়ে ইঙ্গিতে দক্ষিণ দিকটা দেখিয়ে দিলে সকলকে। পিছনে দক্ষিণ দিকে বাঁশ বেড়ের মধ্যে শিস বাজছে। আবার বেজে উঠল শিস। ওই ।
লক্ষ করে দেখবো আজও বাংলাদেশে বা পশ্চিমবঙ্গে যত গল্প উপন্যাস লেখা হচ্ছে তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখকরা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে– সন্দেহ হয়, রক্তেরই অন্তর্গত একটি বোধ দ্বারা চালিত হয়ে ব্যবহার করে চলেছেন ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত কালরূপ। গল্প লেখার মূল কালরূপ যে এটাই তা কি এই কারণে যে, আগুন যেমন উর্ধ্বগামী, জল যেমন নিম্নগামী, গল্পেও ক্রিয়াপদ তেমনি সাধারণ অতীত ভিন্ন আর কিছু হতে পারে না?
আমার সন্দেহ আছে। আমার পড়াশোনা আমাকে দেখিয়ে দিচ্ছে, ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপও অনেক লেখকই ব্যবহার করেছেন এবং অসামান্য প্রতিভা ও কল্পনামণ্ডিত সেই ব্যবহার কোনো লেখক তার কোনো কোনো রচনায়, আবার কোনো লেখক তার সব লেখাতেই। আমার নিজের লেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলা গল্প উপন্যাস বা কথকতায় ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত কালরূপ যেমন স্বাভাবিক, তেমনি স্বাভাবিক নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপটিও। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাঁদো নদী কাঁদো থেকে
কি কারণে তবারক ভুঁইয়া থামে। বাইরে, রাতের ঘনীভূত অন্ধকারের মধ্যে, নদীর বিক্ষুদ্ধ অশ্রান্ত পানি আর্তনাদ করে। সে-আওয়াজই সহসা কানে এসে লাগে। শ্রোতাদের মধ্যে একজনের চোখ নিমীলিত হয়ে পড়েছে, মুখটা ঈষৎ খুলে সোজা হয়ে বসে সে ঘুমায়। শান্ত মুখ, তাতে ঘুমের কোনো ছায়া নেই। তাই মনে হয় সে বুঝি জেগেই চোখ বুজে রয়েছে, অথবা সে অন্ধ। তারপর আবার তবারক ভুঁইয়ার কণ্ঠস্বর শোনা যায়।
ক্রিয়াপদের কালরূপে তৈরি হয় জাদু
বাংলাভাষায় গল্প উপন্যাসে ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত কালরূপ প্রধান; নিত্যবৃত্ত বর্তমান রূপটিও উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে; এছাড়া ইংরেজিতে যা দেখি না, বাংলায় আমরা পুরাঘটিত বর্তমান এবং পুরাঘটিত অতীত— অর্থাৎ সে বলেছে, সে করেছে এবং সে বলেছিলো, সে করেছিলো— এ দুটিও ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছি। কোনোটা কম কোনোটা বেশি লাগালেও গল্প বলায় যে ক্রিয়াপদের এতগুলো কালরূপ বাংলাভাষার লেখকদের হাতে রয়েছে। এর একটা মস্ত বড় লাভের দিক আছে।
আবার এই লাভের দিকটাতেই রয়েছে মেঘ ও ঝড়। অস্ত্র বিভিন্ন হলে তাদের প্রয়োগ পদ্ধতি তো বটেই, প্রয়োগের ক্ষেত্রও ভিন্ন হতে বাধ্য। ক্রিয়াপদের কোন কালরূপ ব্যবহার করবো, সচেতনভাবে বুঝে না নিলে এবং প্রতিভার আলোয় নির্ণয় করে নিতে না পারলে, বাংলা ভাষার ক্রিয়াপদের বিভিন্ন কালরূপের শক্তিকেই আমরা জং ধরিয়ে দেবো। তথ্যটি সাধারণ ও সরল, কিন্তু শুনে চমকে উঠতে হয় যে মানুষের হাজার হাজার ভাষার ভেতরে বহু ভাষা আছে যাদের কোনো লিপি নেই, অথচ এমন একটিও ভাষা নেই যার অস্তিত্ব কেবল লিপিতেই, মুখে নয়। এই থেকে এই কথাটিই কি আমাদের মনে আসে না যে, ভাষার এবং সেই কারণেই সাহিত্যিকের লেখা যে কোনো বাক্যের মূল আবেদন কানের কাছেই ?
গল্প-উপন্যাসে ক্রিয়াপদের কালরূপ বাংলাভাষায় যেগুলো ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তার ভেতরের শক্তি এবং রঙ বুঝতে হলে, আমি অনুরোধ করবো নিচের উদাহরণটি উচ্চারণ করে পড়ে দেখতে। আমি আরো যা করতে চাই, একই অংশ বিভিন্ন কালরূপে রচনা করে দেখবো এবং ধারণা নিতে চেষ্টা করবো যে, ওই বিভিন্নতার দরুণ শিল্পের দিক থেকে, মর্মের কাছে আবেদনের দিক থেকে, কীভাবে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে সচেতন এবং সবচেয়ে মৌলিক ঔপন্যাসিকদের একজন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর একটি ছোটগল্প স্তন, গল্পটি তিনি লিখেছেন তার প্রিয় কালরূপ নিত্যবৃত্ত বর্তমান ব্যবহার করে। এই গল্পের শেষ দিকের অংশ পড়া যাক
মাজেদা আর দেরী করে না। তার সময় নেই। দৃঢ় হাতে সে ব্লাউজের বোতাম খুলে প্রথমে ডান স্তন তারপর বাম স্তন উন্মুক্ত করে। এবার বালিশের নীচ থেকে একটু হাতড়ে একটি সরু দীর্ঘ মাথার কাঁটা তুলে নেয়, তারপর নিষ্কম্প হাতে সে কাটাটি কুচাগ্রের মুখে ধরে হঠাৎ ক্ষিপ্রভাবে বসিয়ে দেয়। তৎক্ষণাৎ একটি সুতীক্ষ্ম ব্যথা তীরের মতো ঝলক দিয়ে ওঠে। সহসা চতুর্দিক নিবিড় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়। তবে সে টু শব্দটি করে না। একটু অপেক্ষা করে পূর্ববৎ দৃঢ় নিষ্কম্প হাতে একবার শুধু স্পর্শের সাহায্যেই নিশানা ঠিক করে সে দ্বিতীয় কুচাগ্নেও কাটাটি বিদ্ধ করে। আবার সে মর্মান্তিক ব্যথাটি জাগে। ক্ষণকালের জন্যে তার মনে হয়, সে চেতনা হারাবে। কিন্তু অসীম শক্তিবলে সে নিজেকে সুস্থির করে। দেহে কোথাও মর্মান্তিক ব্যথা বোধ করলেও সে বুঝতে পারে, তার স্ফীত সুডৌল স্তন দুটি থেকে তরল পদার্থ ঝরতে শুরু করেছে। স্তনের নালায় যে বাধাটি ছিল সে বাধা দূর হয়েছে। স্তন থেকে দুধ সরতে আর বাধা নাই।
এবারে এই একই অংশ লিখে দেখা যাক ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত কালরূপ ব্যবহার করে– যে কালরূপ পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষাতেই, বাংলায় তো বটেই, লেখকদের এত প্রিয়: ব্যাসদেব, হোমার থেকে রবীন্দ্রনাথ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত। নিচের অংশটুকু উচ্চারণ করে পড়া যাক এবং ওপরে ওয়ালীউল্লাহর মূলের উচ্চারণ-বিভার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাক।
মাজেদা আর দেরী করল না। তার সময় নেই। দৃঢ় হাতে সে ব্লাউজের বোতাম খুলে প্রথমে ডান স্তন তারপর বাম স্তন উন্মুক্ত করল। বালিশের নীচ থেকে একটু হাতড়ে তুলে নিল মাথার সরু একটি দীর্ঘ কাঁটা। তারপর নিকম্প হাতে সে কাটাটি কুচাগ্রের মুখে ধরে হঠাৎ ক্ষিপ্রভাবে বসিয়ে দিল। তৎক্ষণাৎ তীরের মতো ঝলক দিয়েউঠল সুতীক্ষ্ম একটি ব্যথা। নিবিড় অন্ধকারে চতুর্দিক আচ্ছন্ন হয়ে গেল সহসা। তবে সে টু শব্দটি পর্যন্ত করল না। একটু অপেক্ষা করে পূর্ববৎ দৃঢ় নিষ্কম্প হাতে একবার শুধু স্পর্শের সাহায্যেই নিশানা ঠিক করে সে দ্বিতীয় কুচাগ্রেও কাঁটাটি বিদ্ধ করে দিল। আবার জেগে উঠল মর্মান্তিক সেই ব্যথা। ক্ষণকালের জন্যে তার মনে হল, সে চেতনা হারাবে। কিন্তু অসীম শক্তিবলে নিজেকে সে সুস্থির করল। দেহে কোথাও মর্মান্তিক ব্যথা করলেও সে বুঝতে পারল, তার স্ফীত সুডৌল স্তন দুটি থেকে তরল পদার্থ করতে শুরু হয়ে গেছে। স্তনের নালায় যে বাধাটি ছিল সে বাধা দূর হয়েছে। স্তন থেকে দুধ সরতে আর বাধা নাই।
লক্ষ করে দেখবো, ক্রিয়াপদের কালরূপ বদলাতে গিয়ে কিছু শব্দের অবস্থান বদলাতে হয়েছে– এটা করতেই হয়, কালরূপ কিছু দুরকম টুপি নয় যে একটা খুলে আরেকটা সহজেই পরে নেয়া যায়; ক্রিয়াপদের কালরূপ বাক্যের ভেতর থেকে কাজ করে, বাক্যের দোলা বদলে দেয়। আশা করি, উচ্চারণ করে পড়বার পর দোলার এই তফাৎ কানে ধরা পড়েছে।
একই অংশ এবার আরেকটি কালরূপ প্রয়োগ করে দেখা যাক– ক্রিয়াপদের পুরাঘটিত অতীত কালরূপ। এটিও আমাদের ভাষায় অনেক লেখকের কাছে প্রিয় একটি কালরূপ।
মাজেদা আর দেরী করেনি। তার সময় ছিল না। দৃঢ় হাতে সে ব্লাউজের বোতাম উন্মুক্ত করেছিল, প্রথমে ডান স্তন ভারপর বাম স্তন। তারপর বালিশের নীচ থেকে তুলে নিয়েছিল মাথার একটি সরুদীর্ঘ কাঁটা। এবং নিষ্কম্প হাতে ক্ষিপ্রভাবে কাটাটি সে বসিয়ে দিয়েছিল কুচাশ্নের মুখে। তৎক্ষণাৎ তীরের মতো ঝলক দিয়ে উঠেছিল সুতীক্ষ্ম একটি ব্যথা। নিবিড় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল সহসা চতুর্দিক। তবে সে টু শব্দটি করেনি। আরো একটু অপেক্ষা করে পূর্ববৎ দৃঢ় নিষ্কম্প হাতে একবার শুধু স্পর্শের সাহায্যেই নিশানা ঠিক করে দ্বিতীয় কুচাগ্রেও কাঁটাটি বিদ্ধ করে দিয়েছিল। আবার জেগে উঠেছিল মর্মান্তিক সেই ব্যথাটি। ক্ষণকালের জন্যে তার মনে হয়েছিল, সে চেতনা হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু অসীম শক্তিবলে নিজেকে সে সুস্থির করে রেখেছিল। দেহে কোথাও মর্মান্তিক ব্যথা বোধ করলেও সে বুঝতে পেরেছিল, তার স্ফীত সুডৌল স্তন দুটি থেকে তরল পদার্থ ঝরতে শুরু হয়েছে। স্তনের নালায় যে বাধাটি ছিল সে বাধা দূর হয়ে গেছে। স্তন থেকে দুধ সরতে তখন আর বাধা ছিল নাই।
আমার বিশ্বাস, যে-কোনো সতর্ক পাঠক প্রথমে মূল এবং পরে দুটি পাঠান্তর উচ্চারণ করে পড়বার পর অবশ্যই ধরতে পারবেন, ক্রিয়াপদের কালরূপের ভিন্ন প্রয়োগ ভিন্ন সুরের জন্ম দিচ্ছে, ঘটনা থেকে একেক দূরত্বে আমাদের স্থাপিত করছে, ঘটনার ব্যাপ্তিও কমে যাচ্ছে কি বেড়ে যাচ্ছে, বস্তুতপক্ষে নির্মিত বিশ্বটারই বর্ণবদল ঘটছে।
কালচেতনা ও কালরূপ
স্বীকার করতে লজ্জা নেই, লেখক জীবনের প্রথম প্রায় পনেরো বছর ক্রিয়াপদের কালরূপ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিলো না। সেই সময়ের গল্প-উপন্যাস যা আমার কলম লিখেছে, এখন সখেদে আবিষ্কার করি, তার ভেতরে, কখনো কখনো একই রচনায়, ক্রিয়াপদের অবিরাম কাল-অস্থিরতা। ছাপার অক্ষরের কালি বড় নির্মম; আমার সেই শিক্ষানবিশি কালের ক্রিয়া-কলংক মেখে পাতার পর পাতা এখনো লজ্জায় নুয়ে আছে। এখন আমি প্রধানত ব্যবহার করি ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্ত কালরূপ। অন্য রূপ যে ব্যবহার করি না, তা নয়; একই শিল্পী যেমন জলরঙেও ছবি আঁকেন, তেলরঙেও আঁকেন, একই হাতে দুই আঁকার ভেতরে পার্থক্য থাকে— মেজাজের ও দেখার এবং দেখাবার; সৃষ্টির এ এক সচেতন ভিন্নতা; লেখক কোন লেখায় ক্রিয়াপদের কোন রূপ ব্যবহার করবেন, সেটিও ঠিক ওই জল আর তেলরঙের ভেতরে প্রসঙ্গ বুঝে বাছাই করে নেবার ব্যাপার।
ভুলের অনেক মাশুল দেবার পর, লেখার এতগুলো বছর আর বর্তমান জীবন-বাস্তবতা দেখার পর আমার এখন এতটুকু বলবার মতো অভিজ্ঞতা হয়েছে– বাংলাভাষায় ক্রিয়াপদের যতগুলো কালরূপ আছে তার ভেতরে সাধারণ অতীত কালরূপটি সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেও, ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপটি চিন্তার জটিলতা যতখানি ধারণ করতে সক্ষম, সাধারণ অতীত কালরূপ তার ধারে কাছেও যেতে পারে না।
সত্য, রবীন্দ্রনাথের মতো বড় লেখক সাধারণ অতীত কালরূপ প্রায় আজীবন ব্যবহার করেছেন, অত্যন্ত সাফল্য এবং মৌলিকত্বের সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন, কিন্তু সেই তিনিও জীবনের শেষভাগে বহু রচনায়, বিশেষ করে নাতিদীর্ঘ কাহিনীগুলোতে, নিত্যবৃত্য বর্তমান কালরূপটিতেই বারে বারে ফিরে গেছেন; এবং অন্যত্র, যেখনে তিনি যান নি, সেখানেও ক্রিয়াপদের কালরূপে নিত্যবৃত্ত বর্তমানের সুর লেগেছে। এটা আকস্মিক নয়। আর ক’টা বছর তিনি বেঁচে থাকলে, আমরা হয়তো দেখতাম গল্প উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ সাধারণ অতীত একেবারেই বর্জন করেছেন।
আমার এই অনুমানের কারণ, চল্লিশ দশকেই বাঙলা গল্প উপন্যাস কিশোর এবং স্বল্পশিক্ষিত গৃহিনীদের পাঠ্যতালিকা ছাড়িয়ে সাবালকের মস্তিষ্কের দিকে যাত্রা শুরু করেছে; আর, এই আমাদের সময়ে যখন কাহিনী আর কোনো কথাই নয়, মনের ভেতরটাই হচ্ছে ক্ষেত্র, যখন মানুষ যাচ্ছে অনেক বেশি বর্জন আর গ্রহণের ভেতর দিয়ে, যখন মানুষ তার অস্তিত্বকে রাজনৈতিক এবং দার্শনিক দুই দিক থেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছে, তখন অনিবার্যভাবেই আমাদের এ অভিজ্ঞতা বহনের উপযোগী ভাষা এবং কাঠামোও তৈরি করে নিতে হচ্ছে বা নেয়া কর্তব্য। সেই কর্তব্যের একটা ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক ক্রিয়াপদের কালরূপ সম্পর্কে নতুন ভাবনা করা।
আমার মনে হয়, ঠিক এই ভাবনাটিই প্রয়াত কমলকুমার মজুমদারকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছিলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় তিনি মুখের ভাষার ভেতরে চিন্তা চেতনা ও অভিজ্ঞতার জটিলতা ধরে রাখবার উপায় হিসেবে মুখের ভাষাকেই বর্জন করে সাধু ভাষার আতিথ্য স্বীকার করেন। তা যদি তিনি না করতেন, যদি মুখের ভাষা থেকে সরে না আসতেন, আমার বিশ্বাস, তার কাছ থেকেই আমরা বাংলা ক্রিয়াপদের কালরূপের প্রতিভাময় ব্যবহার দেখতে পেতাম।
তবে এখানে এই কথাটিও বলে রাখবার যে, ক্রিয়াপদের কয়েকটি কালরূপের ভেতরে আমি যে নিত্যবৃত্তকেই আমার কলমে প্রায় প্রতিটি গল্প-উপন্যাসে ব্যবহার করে চলেছি, এটা আমার জন্যে সত্যি, অপর লেখকের জন্যে প্রস্তাবিত আদর্শ এটি নাও হতে পারে; না হওয়াটাই স্বাভাবিক। সব লেখককেই তাঁর নিজের মতো করে পথ বেছে নিতে হয়।
আমাদের সময়ের দেশ মানুষ ও জীবনের বর্তমানের কথা বলেছি, বলেছি এই বর্তমানে আমাদের অভিজ্ঞতা গল্প-উপন্যাসে ধরিয়ে দেবার উপায় আমি দেখি ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্তটি রূপটিতেই; বলবার পরও থমকে দাঁড়াচ্ছি, কারণ, আমি জানি, সৃষ্টিশীলতার ভেতরে অনেকটাই আছে মাতৃগর্ভের অন্ধকার; সে অন্ধকারে ভ্রুণ কীভাবে বেড়ে উঠবে তা জানে শরীর– আর লেখকের লেখার বেলায় সে শরীরটি হচ্ছে তারই কল্পনা-করোটি; আমি সেভাবেই ক্রিয়াপদের ওই রূপটিকে জেনেছি, সেভাবেই এখনকার আমার গল্প-লেখা আমার গড়ে উঠছে।
বাংলাভাষায় আছে ক্রিয়াপদের আরো তিনটি রূপ— ভবিষ্যতরূপ হিসেবে না এনেই। প্রতিভাবান লেখক ক্রিয়াপদের ভবিষ্যতরূপটিকেও যে কাজে লাগাতে পারেন অসামান্য বিভা সৃষ্টি করে, তার উদাহরণ প্রেমেন্দ্র মিত্রর ছোটগল্প তেলেনাপোতা আবিষ্কার। এ গল্পে কালচেতনার এক নতুন মাত্রা আমরা আবিষ্কার করি। এ চেতনার মূলেই আছে ক্রিয়াপদের বিশেষ রূপটি।
ক্রিয়াপদের কালরূপ নির্বাচন
ক্রিয়াপদের কালরূপ সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা এই যে, ওটা গল্পের সুর বেঁধে দেয়; লেখক ঠিক কীভাবে কোন পথে গল্পের অভিজ্ঞতার ভেতরে আমাদের নিয়ে যেতে চান এবং গল্প-বিষয়টি থেকে কোন দূরত্বে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিতে চান, ক্রিয়াপদের কালরূপ দেখেই তা সনাক্ত করা যায়।
লেখক ভিন্ন ভিন্ন গল্পে ভিন্ন ভিন্ন কালরূপ ব্যবহার করতে পারেন, সেটা তিনি করবেন লেখাটির সঙ্গে পাঠকের যে-সৃষ্টিশীল দূরত্ব তিনি নির্ধারণ করেছেন তার সঙ্গে সংগতি রেখে; আবার কোনো লেখক ক্রিয়াপদের একটি মাত্র কালরূপকেই তার সারাজীবনের জন্যে অবলম্বন করতে পারেন। যদি আমরা দেখি যে, কোনো লেখক গল্পের পর গল্পে ক্রিয়াপদের একটি বিশেষ কালরূপই ব্যবহার করে চলেছেন তাহলে তা থেকে আমরা তার বিশেষ একটি প্রবণতাই আবিষ্কার করে নিতে পারি, জীবন ও ঘটনা সম্পর্কে তার একটি দৃষ্টিভঙ্গিও আমরা সাধারণভাবে চিনি নিতে পারি।
ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত কালরূপটাই লেখকদের হাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে; যেমন— সে ঘরের ভেতর এলো। দেখলো ঘরে কেউ নেই। বারান্দায় গেলো, সেখানেও কেউ নেই। তার মনটা ভারী খারাপ হয়ে গেল। সে চুপ করে বিছানার ওপর বসে রইলো, যেন কারো জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো।
সাধারণ অতীত কালরূপ ব্যবহার করে লেখা এই অংশটি পড়ে আমরা বুঝতে পারি লেখক চান ‘সে’ চরিত্রটির সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘরে ঢুকি, ঢুকে চরিত্রটির সঙ্গেই আবিষ্কার করি যে ঘর শূন্য, তারই পাশাপাশি হেঁটে আমরা বারান্দায় যাই এবং ফিরে এসে তারই মতো কারো জন্যে অপেক্ষা করি। অর্থাৎ, ঘটনাটি আমাদের খুব কাছে এবং চোখের ওপরই ঘটছে, এবং এক্ষুনি, এই মাত্র তা ঘটে গেলো।
কিন্তু এই অংশটুকুই যদি ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপ ব্যবহার করে লেখা যায় তাহলে কী দাঁড়ায়? সে ঘরের ভেতরে যায়। দেখে ঘরে কেউ নেই। বারান্দায় যায়, সেখানেও কেউ নেই। তার মনটা ভারী খারাপ হয়ে যায়। সে চুপ করে বিছানার ওপর বসে থাকে, যেন কারো জন্যে অপেক্ষা করে।’ পড়বার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ যদি উচ্চারণ করে পড়ি, তাহলে দেখতে পাবো ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপ অর্থাৎ ‘যায়’, ‘দেখে’ করে’ আগেকার ‘গেলো’, ‘দেখলো’ ‘রইলো’ করলো’ এগুলোর তুলনায় অনেকদূর পর্যন্ত ধাবিত হচ্ছে, এর ভেতরে একটা দীর্ঘশ্বাস হাহা করছে, উচ্চারিত হয়েও যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে না, অনন্ত পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। আর এরই ফলে আমরা আবিষ্কার করছি, চরিত্রটির শূন্যতা এবং এমনও আমাদের অনিবার্যভাবে মনে হচ্ছে যে, এ ঘটনা শুধু এখনই ঘটলো বা ঘটছে তা নয়, আগেও ঘটে গেছে, এখন ঘটছে এবং আগামীতেও ঘটতে পারে কিংবা ঘটবে।
তবে কি ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত রূপের শক্তি নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপের চেয়ে কম? তাও তো নয়। ধরা যাক রবীন্দ্রনাথের স্বর্ণমৃগ ছোটগল্পটি— সেই যেগল্পে বৈদ্যনাথ নামে গরীব এক গ্রামবাসী স্ত্রীর তাড়নায় গুপ্তধনের আশায় কাশী পর্যন্ত। গিয়েছিলো, তারপর প্রতারিত হয়ে ফিরে এসেছিলো; এর শেষ অংশটি পড়ে দেখা যাক; ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত ব্যবহার করে লেখা-
রাত হইতে লাগিল কিন্তু দু’জনের মুখে একটি কথা নাই। বাড়ির মধ্যে কী একটা যেন ছম ছম করিতে লাগিল। এবং মোক্ষদার ঠোঁটদুটি ক্রমশই বজ্রের মতো আঁটিয়া আসিল। অনেকক্ষণ পরে মোক্ষদা কোনো কথা না বলিয়া ধীরে ধীরে শয়নগৃহের মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং ভিতর হইতে দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিলেন। বৈদ্যনাথ চুপ করিয়া বাহিরে দাঁড়াইয়া রহিলেন। চৌকিদার প্রহর হাঁকিয়া গেল। শ্রান্ত পৃথিবী অকাতর নিদ্রায় মগ্ন হইয়া রহিল। আপনার আত্মীয় হইতে আরম্ভ করিয়া অনন্ত আকাশের নক্ষত্র পর্যন্ত কেহই এই লাঞ্ছিত ভগ্ননিদ্র বৈদ্যনাথকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করিল না। অনেক রাত্রে, বোধ করি কোনো স্বপ্ন হইতে জাগিয়া বৈদ্যনাথের বড়ো ছেলেটি শয্যা ছাড়িয়া আস্তে আস্তে বারান্দায় আসিয়া ডাকিল, ‘বাবা।’ তখন তাহার বাবা সেখানে নাই। অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে রুদ্ধদ্বারের বাহির হইতে ডাকিল, ‘বাবা।’ কিন্তু কোনো উত্তর পাইল না। আবার ভয়ে বিছানায় গিয়া শয়ন করিল। পূর্বপ্রথানুসারে ঝি সকালবেলায় তামাক সাজিয়া তাঁহাকে খুঁজিল, কোথাও দেখিতে পাইল না। বেলা হইলে প্রতিবেশিগণ গৃহপ্রত্যাগত বান্ধবের খোঁজ লইতে আসিল, কিন্তু বৈদ্যনাথের সহিত সাক্ষাত হইল না।।
নিশ্চয়ই আমরা অনুভব করতে পেরেছি ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত কালরূপ ব্যবহার করে লেখা এই অংশটি পড়বার সঙ্গে সঙ্গে যে, আমরাও যেন হতভাগ্য বৈদ্যনাথের সঙ্গে নিঃশব্দে গ্রাম থেকে মাঝরাতে বিদায় নিলাম, আমরাও একটি ছোট, ব্যক্তিগত, কিন্তু ভয়াবহ রকমে সর্বগ্রাসী একটি অভিযোগ অনন্ত এবং উদাসীন পৃথিবীর কাছে রেখে গেলাম যে– পৃথিবীর কিছুই আসে যায় না এক বৈদ্যনাথের কী হলো না হলো, তাতে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর প্রধান লেখাগুলো লিখে গেছেন ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপ ব্যবহার করে। তিনি যে ক্রিয়াপদের বিশেষ এই কালরূপটি— ‘যায়’, ‘খায়’, ‘করে’, ‘দেখে’-র মতো অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত একই সঙ্গে আলিঙ্গন করা বেছে নিয়েছেন তা আকস্মিক নয়; তিনি সর্বাংশে সচেতন শিল্পী। তাঁর উপন্যাস কাঁদো নদী কাঁদো ধরা যাক। আমরা একটু মনোযোগী হলেই আবিষ্কার করি, এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্রটির নাম মুহম্মদ মুস্তফা, অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তকের যে নাম সেই নাম; আরো যখন দেখি যে মুস্তাফার স্ত্রীর নাম খোদেজা, যে-নাম ইসলাম ধর্মের প্রবর্তকের প্রথম স্ত্রীর নাম, তখন আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অত্যন্ত সচেতনভাবেই নদীর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে একটি প্রতীক রচনা করতে চেয়েছেন; আর সেই প্রতীকটিকে নির্দিষ্ট কোনো অতীত বা বর্তমান বা ভবিষ্যতে না রেখে সর্বকালে তা ছড়িয়ে দেবার জন্যেই ক্রিয়াপদের এই কালরূপ তিনি বেছে নিয়েছেন– অন্য কালরূপ দিয়ে তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হতো না; তা যে হতো সেটা বোঝা যাবে এ বই থেকে যে-কোনো একটি অংশ পড়লে। যেমন এটুকুই পড়ি না কেন?–
নিঃসন্দেহে কোথাও কে যেন কাঁদে– তা কি আর বিশ্বাস করা যায়? অবিশ্বাসটি ধীরে ধীরে কমজোর হয়ে ওঠে, অবিশ্বাসীদের কণ্ঠস্বর সন্দেহের দোলায় দুর্বল হয়ে পড়ে, কেউ কেউ আবার তা নীরবেই সহ্য করতে শুরু করে, যেমন দুঃখ কষ্টে মতিভ্রষ্ট মানুষের যুক্তিহীন বিলাপ অসহ্য মনে হলেও অনেকে নীরবে সহ্য না করে পারে না। হয়তো তাদের মনে হয় রহস্যময় দুনিয়ার সবকিছু তারা জানে না। হয়তো সমস্ত যুক্তির বিরুদ্ধে সব মানুষের মনে একটি আশা লুকিয়ে থাকে যে হঠাৎ একদিন অলৌকিক কিছু দেখতে বা শুনতে পাবে, সে-আশাটিই হঠাৎ জেগে ওঠে। কাল্পনিক খাদ্যে মানুষের যেমন পেট ভরে না, তেমন যা ধরতে পারে না ছুঁতে পারে না, চোখ দিয়ে দেখতে সক্ষম হয় না– তাতে বিশ্বাস রেখেও মানুষের চিত্ত ভরে না। যে-কান্না এত মানুষ শুনতে পায় সে-কান্নার কথা সত্যি অবিশ্বাস করা আর সম্ভব নয়; সে-কান্না সত্যের রূপই গ্রহণ করে– এমন একটি সত্য যা ব্যাখ্যা করা যায় না। অবিশ্বাস করা যায় না বলে ভয়টিও বাড়ে, মনের গভীর আশঙ্কাটি ঘনীভূত হয়। কে কাঁদে। মোক্তার মোছলেহ উদ্দিনের মেয়ে সকিনা খাতুন যে বিস্ময়কর কথাটি বলেছিলো তা সবাই যথাসময়ে শুনতে পেয়েছিল কিন্তু তা কি করে সম্ভব হয়, নদী কি করে কাঁদে।
একই লেখায় যখন ক্রিয়াপদের একাধিক কালরূপ
গল্প-উপন্যাসে ক্রিয়াপদের কালরূপ নিয়ে আলোচনা করে যাবার কালে আমার ছোট্ট একটি আশঙ্কা ছিলো; সেটা এই যে, কেউ মনে করে বসতে পারেন আমি একটি গল্পে ক্রিয়াপদের একটিই মাত্র কালরূপ দেখতে চাই– মিশ্রণ ঘটলে তা দোষের হবে। আশঙ্কাটি সত্যি হয়েছে। একজন জানতে চেয়েছেন, একই লেখায় ক্রিয়াপদের বিভিন্ন কালরূপ ব্যবহার করা কি সম্ভব ? অথবা উচিত ?
অবশ্যই সম্ভব এবং প্রয়োজনের ওপরেই এর ঔচিত্য নির্ভর করছে। এই প্রয়োজনটা যদি ঠিক মতো আমরা সনাক্ত করতে না পারি তাহলে লেখাটিই গন্তব্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।
আসলে– ক্রিয়াপদের একটা মূল কাঠামো ঠিক করে নিতে হয়; কাহিনীটি নিত্যবৃত্ত বর্তমান কিংবা সাধারণ অতীত অথবা অন্য কোনো একটি কালরূপে বর্ণনা করবো, বক্তব্যের সুর, ভঙ্গি এবং দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সেটি নির্ধারণ করাটাই হচ্ছে কাঠামোর কাজ; তারপর সেই কাঠামোর ভেতরে থেকে গল্পটি বলে যাবার জন্যে আমাকে অবশ্যই কখনো এগিয়ে যেতে হবে, কখনো পিছিয়ে আসতে হবে, কখনো বা দূরে দাঁড়িয়ে নিরীক্ষণ করতে হবে ঘটনা প্রবাহ, আর এইসব মুহূর্তে মূল কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়েই আমাকে বেছে নিতে হবে একই লেখায় ক্রিয়াপদের অন্যতর কালরূপ।
দেখা যাক রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা গল্পটি। এর মূল কাঠামো ক্রিয়াপদের সাধারণ কালরূপ। কিন্তু গল্পটি শুরু হয়েছে নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপ দিয়ে। যেমন—
আমার পাঁচ বছর বয়সের ছোট মেয়ে মিনি এক দণ্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না। পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া ভাষা শিক্ষা করিতে সে কেবল একটি বৎসর কাল ব্যয় করিয়াছিল, তাহার পর হইতে যতক্ষণ সে জাগিয়া থাকে এক মুহূর্ত মৌনভাবে নষ্ট করে না। তাহার মা অনেক সময় ধমক দিয়া তাহার মুখ বন্ধ করিয়া দেয়, কিন্তু আমি তাহা পারি না।
কিছুদূর এগোবার পর দেখি রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করছেন, এই একই গল্পে, ক্রিয়াপদের ঘটমান বর্তমান কালরূপ। যেমন—
কিছুদিন পরে একদিন সকাল বেলা আবশ্যকবশতঃ বাড়ি হইতে বাহির হইবার সময় দেখি, আমার দুহিতাটি দ্বারের সমীপন্থ বেঞ্চির উপর বসিয়া অনর্গল কথা কহিয়া যাইতেছে এবং কাবুলিওয়ালা তাহার পদতলে বসিয়া সহাস্যমুখে শুনিতেছে এবং মধ্যে মধ্যে প্রসঙ্গক্রমে নিজের মতামতও দো-আঁশলা বাংলায় ব্যক্ত করিতেছে।
বেশিদূর যেতে হবে না, এই একই গল্পে এরপর আমরা দেখব ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্ত অতীত কালরূপটিকেও কাজে লাগানো হয়েছে।
রহমতকে দেখিবামাত্র আমার কন্যা হাসিতে হাসিতে জিজ্ঞাসা করিত, ‘কাবুলিওয়ালা ও কাবুলিওয়ালা তোমার ও ঝুলির ভিতর কি ?’ রহমত একটা অনাবশ্যক চন্দ্রবিন্দু যোগ করিয়া হাসিতে হাসিতে উত্তর করিত, ‘হাতি।’
লক্ষ করবার মতো, ক্রিয়াপদের বিভিন্ন এই কালরূপগুলো ব্যবহার করা হয়েছে গল্পটির মূল কাঠামো সাধারণ অতীতেরই ভেতরে; আর এই মূল কাঠামো আমরা অচিরেই দেখতে পাই যখন আমরা পড়তে থাকি
আমি প্রথমে তাহাকে চিনিতে পারিলাম না। তাহার সে ঝুলি নাই। তাহার সে লম্বা চুল নাই । তাহার শরীরে পূর্বের মতো সে তেজ নাই । অবশেষে তাহার হাসি দেখিয়া তাহাকে চিনিলাম। কহিলাম, ‘কিরে রহমত, কবে আসিলি।’
এবং মর্মস্পশী শেষ দু’টি অনুচ্ছেদ–
আমি একখানি নোট লইয়া তাহাকে দিলাম। বলিলাম, ‘রহমত, তুমি দেশে তোমার মেয়ের কাছে ফিরিয়া যাও; তোমাদের মিলন-সুখে আমার মিনির কল্যাণ হউক।’ এই টাকাটা দান করিয়া হিসাব হইতে উৎসব-সমারোহের দুটো-একটা অঙ্গ ছাটিয়া দিতে হইল। যেমন মনে করিয়াছিলাম তেমন করিয়া ইলেকট্রিক আলো জ্বালাইতে পারিলাম না, গড়ের বাদ্যও আসিল না, অন্তঃপুরে মেয়েরা অত্যন্ত অসন্তোষ প্রকাশ করিতে লাগিলেন, কিন্তু মঙ্গল-আলোকে আমার শুভ উৎসব উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
গল্প উপন্যাস যারা পড়েন তাদের কাছে ক্রিয়াপদের কালরূপ কতটা ধরা পড়ে– আমি অর্ধমনষ্ক পাঠকদের কথা এখন ভাবছি– সে বিষয়ে নিশ্চিত নই। কিন্তু লেখককে নিশ্চিত না হলে চলে না। কারণ, আমার অভিজ্ঞতা বলে, বক্তব্যের এবং দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেই গ্রথিত হয়ে আছে ক্রিয়াপদের কালরূপ। কালরূপটি ঠিক লাগসই হলে কথার ধার অনেকখানি ক্ষয়ে যায়– সাহিত্যের যে অপরপক্ষ, অর্থাৎ পাঠক, তার মনে লেখক যে-তরঙ্গ সৃষ্টি করতে চান সেই তরঙ্গের আকার এবং প্রকার দুইই এতে করে অনভিপ্রেত রকমে ভিন্ন হয়ে যায়। আর তাই, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি-র মূল কাঠামো সাধারণ অতীত বা নিত্যবৃত্ত বর্তমান হলে পদ্মানদীর মাঝি বলতে যা বুঝি তা আর হতো না; এমন আরেকটি উদাহরণ দিই— সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাঁদো নদী কাঁদো হয়তো নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপের কাঠামোয় না লিখে সাধারণ অতীত ব্যবহার করে লেখা যেতো, কিন্তু আর সেই বাকাল নদীর মৃত্যু যে-কোনো মানুষের মৃত্যুর মতোই জীবনের সকল প্রদীপ নেভানো অন্ধকার ডেকে আনতে পারতো না।
লেখকের দক্ষতা বা মিস্তিরির নিপুণ হাত এখানেই যে, তিনি তার মনোনীত কালরূপের কাঠামোর ভেতরে ভিন্নতর কালরূপ অনায়াসে নির্ধারণ করে নিতে পারেন; বাংলা ভাষার বহু লেখকই অনেক সময় এমনকি তাদের প্রধান রচনাতেও তা পারেন নি। নাম করে রোষ কুড়োতে চাই না। সচেতন পাঠক ও লেখক নিজেরাই বইয়ের পাতা উলটে এমন ব্যর্থতার নজির খুঁজে পাবেন। এই খোঁজাটাও আমাদের লেখা-শেখার একটি উপায় বৈকি!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=