মাহরীন ফেরদৌসের গল্পঃ তাহের ফিরে এসেছিল

তাহের ফিরে এসেছিল এক বিকেলে। দুপুরের রোদ তখন লুকিয়ে গিয়েছে আকাশে উড়তে থাকা পাখির পালকে। আকাশের ক্যানভাস অদল-বদল খেলছিল অনেকটাক্ষণ ধরেই। বাড়ির নিচে কোন পাহারাদার ছিল না। সিঁড়িতে জমে ছিল শুকনা ধুলা আর কিছু চুয়িংগামের প্যাকেট। তাহের কলাপসিবল গেট খুলে হালকা পায়ে দোতলায় উঠতে শুরু করল। সেদিন বাসায় ওর আপা বাদে কেউ ছিল না। দুলাভাই অফিসে। কলিং বেল বাজিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো ও বেশ কিছুক্ষণ। আপা তখন বারান্দায় বসে চা পান করছিলেন। শব্দ শুনে কাপ হাতেই দরজা খুলতে এলেন তিনি। তারপর তাহেরকে দেখেই তিনি, ‘আল্লাহ’! বলে আর্তনাদ করে সশব্দে চাসহ কাপ মেঝেতে ফেলে দিয়েছিলেন। সেই সময়টুকুকে আমরা যদি ধীর করে দেই তাহলে তাহেরের বোনের অভিব্যক্তিগুলো আরও নিদারুনভাবে দেখতে পাব। ম্যাক্সি আর ওড়না পরিহিত এলোচুলের এক মাঝবয়সী মহিলা একটা নির্জন দিনে খুব আলস্য নিয়ে দরজা খুললেন।দরজার ওপাশের ব্যক্তিকে দেখে চোখ বড় বড় করে ফেললেন, হাত দিয়ে দরজার হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরলেন, চায়ের কাপটা হাত থেকে পড়ে যেতে থাকল। পাশ দিয়ে একটা মাছি এই সুযোগে তার ঘরে ঢুকে পড়ল। চায়ের কাপটা মোজাইকের মেঝেতে পড়ে চৌচির হয়ে গেল আর সেই চা ছলকে তার ম্যাক্সির নীচটুকু ভিজিয়ে দিল। আর তার কণ্ঠ পাল্টে গেল আর্তনাদে।
তাহের পুরোটা সময়ই চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর অবসন্ন ভঙ্গিতে আপার পাশ কাটিয়ে নিজের ছোট্ট ঘরে ঢুকে গেল। যেন এতদিন পর ফিরে আসা খুব স্বাভাবিক। পরে বেশ অনেকবার আপা জিজ্ঞেস করেছিলেন যে এতদিন ও কোথায় ছিল। তাহের বলেনি। চুপ করে ছিল। এটাই প্রথম নয়। এর আগেও এমন হয়েছে। তাহের কোথাও চলে গিয়েছিল, কিংবা ওর কিছু হয়েছিল। খুঁজে পাওয়া যায়নি দীর্ঘদিন। প্রথমবার তাহের এমন করেছিল ঢাকা থেকে যশোর যাওয়ার সময়। গাবতলির বাস টার্মিনাল থেকে আর মাত্র দশ মিনিট পর বাস ছাড়বে এমন সময় হুট করে ‘একটু আসছি’ বলে তাহের বাস থেকে নেমে গেল। তারপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। সারা বাস টার্মিনাল তন্ন তন্ন করে খোঁজা হল। থানায় জিডি করা হল। পত্রিকায় ছবি দেওয়া হলো। তবুও তার কোন খবর পাওয়া গেলো না। মাসখানেক পর ঢাকা গাজীপুর হাইওয়েতে ঘটে যাওয়া এক সড়ক দুর্ঘটনায় হাসতাপালে বেশ কিছু নিহত ও আহত মানুষদের নিয়ে আসা হয়েছিল। সেখান থেকে একটা লাশের উচ্চতা, স্বাস্থ্য আর গায়ের রঙ দেখে ধারণা করা হল ছেলেটি তাহেরই ছিল। চেহারা দেখে অবশ্য চেনা যায়নি। চেনার উপায়ও ছিল না। কারণ, মুখ থেঁতলে গিয়েছিল ভয়ংকরভাবে। তবে সেবার তাহের ফিরে এসেছিল। ফিরে এসে বলেছিল কীভাবে সে বাস মিস করে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। আমরা তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও কি কোন বিপদে পড়েছিল? উত্তরে ও বলেছিল, একটা গাড়ি ওকে ধাক্কা দিয়েছিল বটে তবে অল্প স্বল্প ব্যথা আর ছড়ে যাওয়া বাদে কিছুই হয়নি। এরপর সে তার চিরাচরিত অভ্যাসে মুখে কুলুপ এঁটে চুপ মেরে গিয়েছিল।
তাহের আর আমি দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিলাম। একসাথে সিগারেট খেয়ে ক্ষয় হয়ে যাবার মত বন্ধু। চায়ের সাথে ক্রিম বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়ার মত বন্ধু। একজনের পকেট খালি থাকলে অন্যজনের থেকে টাকা নিয়ে চলার মত বন্ধু।
তাহেরের দ্বিতীয়বার ফিরে আসার ঘটনা ছিল অনেকটা এরকম,
ওকে নিয়ে আমি সেবার বড় মামার অফিসে গিয়েছিলাম। আঠারতলা ভবনে ছিল মামার অফিস। একতলা থেকে লাইনে অপেক্ষা করে লিফট দিয়ে উপরে যেতেই বেশ লম্বা সময় চলে যায়। মামার অফিস চকচকে, ঝকঝকে। টাইলস দেওয়া, কাচ বসানো। দেয়ালে দেয়ালে নানা রকম পেইন্টিং ফ্রেম করে রাখা। এখানে সেখানে বাহারি টবে রাখা গাছ-গাছালি। আর পুরো অফিস জুড়ে হালকা কচি লেবুর ঘ্রাণ।খুব দামী কোন এয়ার ফ্রেশনার হয়ত। কিন্তু ঘ্রাণটা এত সতেজ যে মনে হয় প্রতিটি বন্ধ দরজার পেছনে একটা করে লেবু বাগান আছে। এমন জায়গায় এসে নিজেদের বড় বেমানান লাগে। প্রায় এক ঘণ্টা পর মামার রুম থেকে ডাক আসল। তাহেরকে ওয়েটিং রুমে রেখে আমি মামার সাথে দেখা করতে গেলাম। মিনিট পনের পর যখন ফিরে আসলাম তখন দেখতে পেলাম তারেক একটা এন্ড টেবিলে রাখা ছোট্ট বনসাই গাছ দেখছে খুব মনোযোগ দিয়ে। অথচ এত মন দিয়ে গাছটি দেখার কী আছে আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল বনসাই গাছটির হাত পা আছে। গাছটি হাত পা নেড়ে নেড়ে ওর সাথে খুব কথা বলছে আর ও শান্ত হয়ে শুনছে। আমি তাহেরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তাহের ঝট করে উঠে বলল,
‘দোস্ত। খুব তেষ্টা পেয়েছে। সিগারেট খাব।’
মামার অফিসের সবচেয়ে উপরের তলায় চা-সিগারেট খাওয়ার একটা ছোট্ট কর্নার ছিল। দুপুরের খাবারের পর জায়গাটা জমজমাট থাকত। তারপর ঝিমিয়ে পড়ত ঘন্টাকয়েকের জন্য। তাহেরকে নিয়ে সেখানে যাওয়ার পর ও একটা বেনসন ধরিয়ে ছাদের দিকে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছিল। ছাদের একটা অংশ ছিল পরিচ্ছন্ন আর অন্য অংশে কিছু কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছিল। ডাঁই করে রাখা ইট, সিমেন্ট আর বালি। কোন রেলিং বা দেয়াল ছিল না ওদিকে। তাহের সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে চলে গিয়েছিল সেদিকে। তারপর সিগারেটে শেষ টান দিয়ে আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আচমকা নিচে লাফ দিল। ঘটনাটা ঘটেছিল পলকে। এতই দ্রুত ও নিমিষে যেন আসলে ঘটনাটা ঘটেইনি। আর সবকিছু ঠিক যেমন ছিল তেমনি। আমি কয়েক মুহূর্ত ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। গলা দিয়ে কোন শব্দ আসছিল না আমার। কাউকে ডাকতে চেয়েও পারছিলাম না। অথচ ভেতরে ভেতরে কই মাছের মত খলবল খলবল করছিল হৃৎপিণ্ডটা। ঘোর ঘোর ভাব নিয়ে টলতে টলতে চলে গিয়েছিলাম ছাদের কিনারে। নিচে তাকিয়ে সবকিছু কাল্পনিক মনে হচ্ছিল। যেন কোন নাটকের শ্যুটিং চলছে। অফিসের নীচে বড় বড় গাছ থাকায় ছাদ থেকে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না ভালোভাবে। শুধু বুঝতে পারছিলাম নিচে অজস্র মানুষ এসে জড়ো হয়েছে একটা জায়গায়। গোল করে। যেন মিষ্টির এক ফোঁটা রস পড়েছে মেঝেতে আর পিঁপড়ার দল বৈঠক শুরু করে দিয়েছে সেটা নিয়ে। কাউকে না ডেকে, কারও সাথে কথা না বলে এমনকি মামাকেও কিছু না জানিয়ে অপরাধীর মত নিচে নেমে এসেছিলাম আমি। স্থবির লাগছিল সবকিছু। গলার ভেতর দলা পাকানো অস্বস্তি যেন বমি করে উগড়ে দিতে পারলে ভালো হত। মনে হতে থাকল আমার দিকে কয়েকটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন বন্দুকের নলের মত তাক করে রাখা হয়েছে। মনে হতে থাকল, তাহের যেন নিজ থেকে লাফ দেয়নি। আমিই ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছি। ভেতরে ভেতরে কেমন যেন ভয় কাজ করল। তিরতির করে কাঁপতে কাঁপতে বাসায় ফিরে এসেছিলাম আমি। তারপর টানা পাঁচদিন আর ঘর থেকে বের হলাম না।
মুঠোফোনটা মৃত করে রেখেছিলাম অন্তহীন সময়ের জন্য। ষষ্ঠ দিন সকালে বাসার ল্যান্ডফোনে একটা কল এল। আম্মা ডেকে বললেন, ‘তাহের ফোন করেছে।’ আমি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম। অতি আতংকে কোন বিস্ময়ও তৈরি হচ্ছিলো না। আম্মা কলটা ধরার জন্য তাড়া দিলেন। আমি যন্ত্রের মত উঠে রিসিভার কানে ঠেকালাম। যেন রিসিভার নয় রিভলভার কানে দিয়েছি। আমাকে হতবিহবল করে দিয়ে ওপাশ থেকে তাহেরের শান্ত অথচ জীবন্ত কণ্ঠ ভেসে এল, ‘দোস্ত, পাঁচশ টাকা ধার দিতে পারবি? তোর বাসার নিচেই আছি আমি। পারলে টাকাটা নিয়ে এখনই নেমে আয়।’ 
ফোনের লাইন কেটে আমি ধীরপায়ে বারান্দায় গিয়ে নিচে তাকালাম। দেখলাম, সাদাকালো চেক শার্ট আর ফ্যাকাসে জিনসের প্যান্ট পরা তাহের নিচে পায়চারি করছে সিগারেট হাতে। দেখে মনে হচ্ছিল, সিগারেটের ছোট্ট আগুনটা জ্বালিয়ে ফেলছে ওকেও।
দেখা হবার পর সেদিন তাহের খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছিল। মামার অফিসের ছাদে কী হয়েছিল আমি জিজ্ঞেস করতে গিয়েও তাই জিজ্ঞেস করিনি। আমার মনে হচ্ছিল সবই হয়ত আমার কল্পনা। হয়ত হ্যালুশিনেশন হয়েছিল। মনে মনে খুব সুন্দর একটা ব্যাখ্যা সাজিয়ে নিয়েছিলাম আমি। হয়ত সেদিন তাহের ছাদে হেঁটে হেঁটে সিগারেট খেয়ে বেড়াচ্ছিল। এরমাঝে আমি অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম বলে অতিকাল্পনিক ঘটনা চিন্তা করে ফেলেছি। আমার অবচেতন মন আমাকে বুঝিয়েছে তাহের ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে। আসলে ও দেয়নি। আর ছাদের উপর থেকে এত নীচে কিছুই তো আর দেখা যায়নি। অফিসের নিজে যে কোন কারণেই তো মানুষ ভিড় করতে পারে তাই না? বাঙালি জাতি হল গ্যাঞ্জামের জাতি। কোথাও কিছু হোক বা না হোক ঠিকই জড়ো হয়ে গালগল্প শুরু করবে। তাহের সত্যি লাফ দিয়ে থাকলে সেইদিনে নিশ্চয়ই ওর বাসা থেকে কেউ না কেউ খবর দিত। নিশ্চয়ই ওর আপা আমাকে ডেকে পাঠাত। কিংবা কেউ হয়ত পুলিশ কেস ঠুকে দিয়ে বলত, আমিই তাহেরকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছি। পরের দিন পত্রিকায় শিরোনাম আসত, ‘বন্ধুর ধাক্কায় মেধাবী তরুণের করুণ মৃত্যু।’
যেহেতু এমন কিছুই হয়নি তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে তাহের ঠিক আছে। দিব্যি আছে। আর যত কিছুই হোক কেউ তো জেনে বুঝে সাধের প্রাণটাকে হারাতে চায় না। তাহের মুখে যতই বলুক না কেন জীবনের একঘেয়েমি আর নিত্যতায় ও আটকা পড়তে চায় না, তাই বলে কি প্রাণের টান নেই? ও কি জানে না পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মায়া প্রেমিকার ভালোবাসার মাঝে নয় বরং নিজেকে ভালোবাসায়!
যাই হোক, এরপরও তাহেরকে নিয়ে আমার মনে বহু প্রশ্ন ঘূর্ণিপাক খায়। কিন্তু আমি ওকে কিছুই বলি না। তাহের বেঁচে আছে আর ফিরে এসেছে এটা ভাবতেই আমার বড় ভালোলাগে।
সব ভালোই চলছিল। সময় ঝড়ের মত না হলেও মত স্বাভাবিক গতিতে চলে যাচ্ছিল দ্রুত। কিন্তু বছরখানেকের মাথায় তাহের একদিন দুম করে বিয়ে করে ফেললো আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে। মেয়েটির নাম নিশা। কবিরের ছোট বোন। তাহেরর মত আগাগোড়া মুখচোরা ছেলে নিশাকে বিয়ের জন্য পটিয়ে ফেলতে পারে এটা কারও দুঃস্বপ্নেও আসার কথা না। অথচ এটাই বাস্তব হয়েছিল। কেউ জানে না, কাউকে বলিনি কিন্তু নিশাকে মনে মনে আসলে আমি চাইতাম। খুব চাইতাম। বন্ধুর বোনকে কিছু বলতে ভয় লাগত বলে কখনও বলা হয়নি। ভাবতাম প্রেমের কাছে বন্ধুত্ব বিসর্জন দিতে হলে নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়ে যাব হয়ত। কিন্তু নিশার প্রতি আমার আবেগ বিশুদ্ধ ছিল। কতদিন যে ওদের বাড়ির সামনে এক পলক ওকে দেখার জন্য হেঁটেএসেছিলাম তার ইয়াত্তা নেই। কতদিন যে ডায়েরীতে নিশা, নিশা লিখে পাতার পর পাতা শেষ করেছিলাম তা কেউ দেখেনি। আমি যেখানে এক পা আগাতে পারলাম না তাহের সেখানে নিশাকে চিরদিনের মতো ঘরেই তুলে ফেলল! বিয়ের আগে আমাকে জানাল না পর্যন্ত। কাউকেই জানাল না। এতই সহজ সবকিছু? অভিমানে আর ব্যর্থ প্রেমের গ্লানিতে আমি ভেতরে ভেতরে নীল হতে থাকলাম। মনে হল, কেন গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে তাহের ফিরে এসেছিল? কেনই বা মামার অফিসের ছাদ থেকে ও সত্যিকারভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়ে মরে যায়নি? তাহলে আমাকে এমন দিন দেখতে হতো না। তাহলে হয়ত নিশাও আমার হতো। খুব বিষণ্ণ লাগত সময়ে সময়ে। উদ্ভ্রান্তের মত পথে পথে হেঁটে বেড়াতাম বহুক্ষণ। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতাম, দূরে কোথাও ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির দল উড়ে যাচ্ছে। শূন্যে। মহাশূন্যে। আমারও ওদের সাথে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করত।
সেই থেকে নিজেকে আমি তাহেরের কাছ থেকে গুটিয়ে আনলাম। ওর রোজকার আচরণের মত আমিও আবিকল নীরবে, গোপনে, নিঃশব্দে ওর জীবন থেকে সরে গেলাম। এরপর লম্বা সময় চলে গেল। মামার বদৌলতে আমার বেশ ভালো একটা চাকরি হল।
প্রথম বছর পোস্টিং হয়েছিল সিলেটে।
দ্বিতীয় বছর বদলি হয়ে যেতে হয়েছিল কুষ্টিয়া।
তৃতীয় বছরে পদোন্নতি নিয়ে আবার ঢাকা ফিরে এলাম।
বাস থেকে নেমে দেখলাম মাথার উপর পূর্ণ চাঁদ। কালো আকাশে বকপাখির মত বিচ্ছিন্ন কিছু সাদা মেঘ। চারদিকে ফুরফুরে বাতাস। মন হালকা হয়ে উঠেছিল। আহ! চিরচেনা প্রাণের ঢাকা। গানের ভাষায় সবাই বলে ‘জাদুর শহর’।
এই ক’বছর তাহের কিংবা নিশা কারোই খবর নেওয়া হয়নি। নতুন চাকরি, পরিবেশ, মানুষজনের সাথে নিজেকে বেঁধে ফেলেছিলাম প্রচণ্ড। আগের ফোন নাম্বারটাও রাখিনি। এমনকি মাঝে মাঝে ওদের কথা মনে হলেও মুছে ফেলতে চেষ্টা করেছি তৎক্ষণাৎ। কিন্তু এবার ঢাকা ফিরে এসে কেন যেন অতিরিক্ত স্মৃতিকাতরতায় আক্রান্ত হলাম। নিশার চেয়ে তাহেরকে বেশি মনে পড়তে শুরু করল। ওর সাথে নিকোটিনের ধোঁয়ার হারিয়ে যাওয়ার জন্য মন উথালপাথাল শুরু করে দিল। নিজেকে বেশ কয়েকবার বোঝালাম, ‘সব ভুলে যা’। কিন্তু পারলাম না। সন্ধ্যা নামলে ছোটলোকের মতো ঠিকই তাহেরের বোনের বাসার দিকে রওনা হয়ে গেলাম। নিশা আর তাহের কি এখন এই বাসাতেই থাকে নাকি নিজেরা আলাদা বাসা নিয়ে সংসার সাজিয়েছে আমার জানা নেই। ওদের কি কোন সন্তান হয়েছে? সেটাও আমার জানা নেই। মনে মনে ভাবলাম, আজ না হয় সব একবারেই জানব।
তাহেরের বোনের বাসায় গিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম। জানতে পারলাম তাহের নেই। প্রায় দেড় বছর হল নিখোঁজ। সবাই ধারণা করে নিয়েছে ও আর বেঁচে নেই। তাহেরের বোন আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় সমুদ্র বানিয়ে ফেললেন। চোখের পানিতে হাত রীতিমত লবণাক্ত করে ছাড়লেন। ও বাড়ি থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি কবিরদের বাড়ির পথ ধরলাম। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই নিশার সাথে দেখা হয়ে গেল। নিশা সাদা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের নীচে কালির আস্তর। মুখের চোয়াল উঁচু হয়ে গিয়েছে। দৃষ্টি মাছের মত ভাবলেশহীন। আমাকে দেখে সে তোতা পাখির মুখস্থ বুলির মতো বলল,
‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
আমি কী উত্তর দেব ভাবতে ভাবতেই দ্বিতীয় প্রশ্ন এলো।
‘আপনি আমাকে ভালোবাসতেন আগে কেন বলেননি?’
‘তোমাকে এই কথা কে বলল?’
বহুকষ্টে জিজ্ঞেস করলাম আমি। শব্দগুলো পুরোপুরি বের হল না। কিছুটা জড়িয়ে গেল।
‘তাহের বলেছে। আর এটাও বলেছে ওর কিছু হলে আপনি আমাকে বিয়ে করবেন।’
‘মানে?’ এবার কথা এক লাফ দিয়ে আমার মুখ থেকে বের হয়ে গেল। এই মেয়ে বলে কি?
‘জ্বি। আপনি আমাকে বিয়ে করবেন। দুই বছর হলোতাহের নেই। এদিকে আপনারও কোন খোঁজ খবর নেই। কতদিন ধরে অপেক্ষা করছি। আসুন, বাসার ভেতরে চলুন। বাড়িতে এখন কেউ নেই। আজ আমাকে একটু ছুঁয়ে দেখুন।’
নিশা কথা বলতে বলতে আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমার মধ্যে কেন যেন কোন আবেগ বা প্রেম কাজ করল না। কাজ করল আতংক। ও কয়েক কদম এগিয়ে আসতেই বুঝতে পারলাম, ও স্বাভাবিক নেই। পরনে সাদা শাড়ি অথচ ঠোঁটে কটকটে লাল লিপস্টিক। এতক্ষণ কেন এটা আমার চোখে পড়েনি? নিশাকে কেমন যেন হিংস্র আর অতিপ্রাকৃতিক লাগতে লাগল। এক পা, দুই পা করে পেছনে যেতে থাকলাম আমি। তারপর রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে শুরু করে দিলাম। পেছন থেকে নিশা চিৎকার করে ডাকতে থাকল। তাকালাম না আমি। প্রচণ্ড অশ্লীল সব গালিগালাজ দিতে শুরু করল নিশা। আমি তাও সবকিছু উপেক্ষা করে দৌড়াতে লাগলাম। পৃথিবী ভরা-মৌসুমের নৌকার মত দুলতে লাগল ডামে বামে, বামে ডানে। আমি দৌড়ানো থামালাম না। মনে হল, অজস্র কবুতর খোপ ছেড়ে বের হয়ে একসাথে আমার বুকের উপর ডানা ঝাপটাচ্ছে। মনে হল, পৃথিবীর সমস্ত প্রেম চলে যাচ্ছে অন্তরালে। বিদগ্ধ অভিশাপের মত। নিজেকে একই সাথে এত ভারি আর খণ্ডিত আগে কোনদিন মনে হয়নি আমার।
এবার বর্তমানে ফিরে আসি।
তাহেরের বোন বলেছিল তাহের দেড় বছর ধরে নিখোঁজ কিংবা মৃত। নিশা বলেছিল দু বছর। আমি নিশাকে ভালোবাসতাম তা আমি কোনদিন তাহেরকে বলিনি। তাহেরের জানার কথাও নয়। কিন্তু নিশা বলেছিল তাহের সব জানে। নিশাকে পাওয়ার জন্য আমি যেই তাহেরের মৃত্যু কামনা করেছি সেই তাহেরকে মৃত জেনে আমি নিশাকে জীবনে আনতে পারিনি। ইচ্ছেও করেনি। তাই, সবদিক চিন্তা করে তাহেরকে একটা অসমাপ্ত অধ্যায় হিসেবেই রেখে দিতাম বাকি জীবন। যদি না কিছুদিন আগে সেই দুপুরে ও আবার না ফিরে আসত।
এবার ফিরে এসে ও আরও প্রশান্ত রূপ নিয়েছে। ওর চলাফেরায়, কাজে, দৃষ্টিতে আরও তীব্র নৈঃশব্দ্য। তাহেরের বোন কিছুদিন আগে জানিয়েছেন, এবার তিনি সত্য কথা বলতে চান। আর সত্যটা হল, দুই বছর আগে তাহের এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসবে বলে আর ফিরে আসেনি। তাহের নিখোঁজ হবার আগের দিন থেকেই আলমারির সিন্ধুক থেকে উনার বিয়ের বিশাল বড় সোনার হার চুরি হয়েছে। সেই হারের বাজার মূল্য বেশ কয়েক লাখ টাকা।
তাহেরের দুলাভাই বললেন, বছর দুয়েক আগে তার অফিসের এক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে কিছু উপরি আয় আনার জন্য তাহেরকে পাঠিয়েছিলেন। পথিমধ্যে কিছু ছিনতাইকারী ওর থেকে সেই টাকা নিতে চায়, তাহেরের সাথে এক পর্যায়ে ওদের বেশ ধস্তাধস্তি হয়। এরপর ওরা তাহেরের পেটে ছুরি মেরে ওকে হত্যা করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। এই দৃশ্য দেখে অফিসের এক পিওন। সে দেখামাত্রই তাহেরকে চিনতে পারে। প্রচণ্ড ভীত হয়ে সে দ্রুত দুলাভাইকে ফোন করে এই ঘটনা জানায়। আর উনি খবর পাওয়া মাত্র ঘটনাস্থলে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে আর কাউকে পাওয়া যায় না। তাহের, ছুরি কিংবা রক্তের কোন চিহ্নই সেখানে ছিল না।
নিশা জানায়, বিয়ের পরপর তাহের আর ওর সবুজ পাতার মত স্নিগ্ধ জীবন শুরু হয়েছিল। দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসত। তাহের ওর পূর্ব জীবনের দর্শন ভুলে নতুন করে বাঁচতে শুরু করেছিল নিশাকে নিয়ে। সিগারেট ছেড়ে দিয়েছিল। সন্ধ্যা হলেই সব কাজ শেষ করে ফিরে আসত ঘরে। গভীর রাতে চুলে বিলি কেটে দিত। হাওয়ায় হাওয়ায় লিখে দিত নিশার নাম। আলোর ওমে ডুবিয়ে ওকে আদর করত। কিন্তু ঠিক এক বছর পর তাহের কেমন যেন বদলে গিয়েছিল। বারবার বলত, ওর কিছু হলে নিশাকে দেখে রাখব আমি। বিয়ে করব আমি। তারপর একদিন নামহীন এক ডায়েরির পাতা খুলে রেখে দিয়েছিল ওর সামনে। যেখানে অজস্রবার নিশার নাম লেখা ছিল। নিশা এসব দেখে ভেতরে ভেতরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেও বাইরে কিছু প্রকাশ করছিল না। সেবার তাহেরকে নিয়ে ঈদের পর পর ওর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। রাতের বেলা বাড়ির বৈঠকখানায় বসে সবাই যখন টিভিতে সিরিয়াল দেখছিল, হঠাৎ খবর এলো পেছনের দুটো ঘরে আগুন লেগেছে। সবাই ছুটে গিয়ে দেখল দাউদাউ করে জ্বলছে কমলা আগুন। যেন কোন অশুভ প্রেত নাচছে। ওই দুটো ঘরের একটিতেই তাহের সন্ধ্যা থেকে ঘুমিয়ে ছিল। আগুন নেভানো সম্ভব হয়েছিল প্রায় ঘণ্টাখানেক পর। ছাইয়ের স্তুপে আলাদা করে প্রায় কিছুই চেনা যাচ্ছিলো না। শুধু অল্প কিছু জিনিস বাদে। যেমন তাহেরকে আর পাওয়া যায়নি, কিন্তু তাহেরের বিয়ের আংটিটা পাওয়া গিয়েছিল।
তাহেরের বোন বললেন, হয়ত তাহের হার চুরি করে পালিয়ে গিয়েছিল। আমরা ভেবেছি মরে গিয়েছে। এখন ও হয়তো ভেবেছে এতদিন পর কেউ হারের কথা মনে রাখবে না। তাই ফিরে এসেছে।
দুলাভাই বললেন, হয়ত ছুরির আঘাতে তাহের আহত হয়েছিল। নিহত হয়নি। কেউ ওকে সাহায্য করতে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। ছিনতাই বা ঘুষ নেওয়া নিয়ে যদি পুলিশ কেস হয় সেই ভয়ে তাহের এতদিন গা ঢাকা দিয়েছিল। এখন ওর মনে হয়েছে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হয়েছে তাই ফিরে এসেছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারাও তো এমন করেই ফিরে আসেন। তাহলে তাহের ফিরে আসলে সমস্যা কোথায়?
নিশা বলল, তাহের হয়ত বিয়ের পর কোনভাবে জানতে পেরেছিল নিশার প্রতি আমার দুর্বলতার কথা। এটা তাকে নিয়ত দগ্ধ করত। তাই সে চাইত আমি নিশাকে যেন আপন করে নেই। মনে মনে দীর্ঘ দিন ধরে ও পরিকল্পনা করছিল কীভাবে নিজেকে নিশার জীবন থেকে সরিয়ে নিবে। সব সময় সুযোগের অপেক্ষা করত। গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পর তার সেই সুযোগ মিলেছিল। ও আসলে ইচ্ছে করেই ঘরে আগুন লাগিয়েছিল। তারপর সিনেমার মত প্লট সাজিয়ে নিজেকে মৃত বানিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল নিশাকে আমার জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। এখন হয়ত ভেবেছে এতদিনে আমার আর নিশার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আমরা সুখে শান্তিতে সংসার করছি তাই ও ফিরে এসেছে।
সবাই কত কিছু বলে। কত যুক্তি দেয়। গল্প বলে। আমি কিছুই বলতে পারি না। ভাবতে পারি না। সত্যমিথ্যা মিলিয়ে ফেলি কেন জানি। তাহের কী পৃথিবীর কোন পুরানো শহরের প্রাচীন ঘড়ি? যে ঘড়ির অচল ব্যাটারি থেকে থেকে হঠাৎ করে খুব অল্প দিনের জন্য সচল হয়ে যায়, তারপর আবার অচল হয়ে পড়ে? সেই প্রাচীন ঘড়ির মতই কি তাহের হারিয়ে যায় আবার ফিরে আসে? ফিরে আসে আবার হারায়? গল্প হয়ে যায় আবার জীবন্ত হয়ে হাজির হয়? তাহের আসলে কী? তাহের আসলে কে?
আমি কোন উত্তর খুঁজে পাই না। মানুষ শুনলে বলবে অবিশ্বাস্য ঘটনা কিংবা গাঁজাখুরি। কিন্তু আমি কীভাবে বোঝাই এই স্বচ্ছ জলের মত টলটলে অনুভব আমাকে দিন দিন কতটা নির্বোধ করে দিচ্ছে?
এক সকালে তাই আর থাকতে না পেরে তাহেরকেই জিজ্ঞেস করি,
‘তোর আসলে কী হয়েছিল? তুই কীভাবে ফিরে এলি?’
তাহেরের ঠোঁটের কোন মৃদু হাসি খেলে যায়। খুব আলগোছে কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়,
‘তোর কাছে তো গল্পের অনেকগুলো পরিণতি আছে। তারই যে কোন একটা বেছে নে। সেটাই হবে সত্যি।’ 
লেখক পরিচিতিঃ
মাহরীন ফেরদৌস
গল্পকার
আমেরিকাতে থাকেন

One thought on “মাহরীন ফেরদৌসের গল্পঃ তাহের ফিরে এসেছিল

  • June 21, 2022 at 10:51 am
    Permalink

    তোমার গল্পগুলোই অন্যরকম… ভালো লাগল.. 💕

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=