ডরোথি পার্কারের গল্প: জীবনযাত্রা

অনুবাদ: মাজহার জীবন

নাবেল আর মিজ ধীরে সুস্থে আয়েশি ভঙ্গিতে চায়ের দোকান থেকে বের হলো। তাদের সামনে এখন সপ্তান্তের শনিবারের বৈকালিক অফুরন্ত অলস সময়। প্রতিদিনের মতো ওরা আজও দুপুরের খাওয়া সেরেছে যাতে ছিল চিনি, ময়দা, তেল আর মাখন। সাধারণত ওরা মাখন ও মেয়োনেজ মাখানো নতুন স্পঞ্জি হোয়াইট ব্রেড স্যান্ডউইচ কিংবা আইসক্রিমের তলায় ভিজে থকথকে মোটা কেক খায় যার উপর ছড়ানো থাকে গলানো চকলেটের সাথে শক্ত হয়ে জমাট বাধা বাদাম গুঁড়োর আস্তর। এছাড়া এসব খাবারের বিকল্প হিসেবে তারা কখনও কখনও প্যাটিস খায় যাতে থাকে নিম্নমানের তেলে ডোবানো নানা উপকরণ আর শক্ত সসের ভেতর ডুবে থাকা ফ্যাকাসে স্বাদহীন মাংসের টুকরো। না হয় তারা প্যাস্ট্রি খায় যা শক্ত বরফের নিচে নমনীয় একটা খাবার যার ভেতর পুর হিসেবে থাকে অচেনা এক ধরনের হলুদ মিষ্টি কিছু যা আবার শক্তও না তরলও না – বলা যায় অনেকক্ষণ রোদে রাখা মলমের মতো একটা বস্তু। এর বাইরে ওরা কোনো খাবার খায় না এমনকি খাওয়ার চিন্তাও করে না। ওদের গায়ের রং বুনো এনিমন ফুলের পাপড়ির মতো সাদা, পেট আর শরীরের পার্শ্বদেশ আমেরিকার ইন্ডিয়ান তরুণ সৈন্যদের মতো মেদহীন আর পাতলা।

আনাবেল যে ফার্মে চাকরি করে সে ফার্মে মিজ স্টেনোগ্রাফার হিসেবে যোগদানের পর থেকেই তারা দুজন সবচেয়ে কাছের বন্ধু। স্টেনোগ্রাফিক বিভাগে দু’ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা বেশি থাকার কারণে এখন পর্যন্ত আনাবেল সপ্তাহে সাড়ে আঠারো ডলার মজুরি পায়, যদিও মিজের মজুরি এখনও ষোল ডলার। তারা নিজ নিজ পরিবারের সাথে থাকে। তাদের মজুরির অর্ধেক সংসার চালনার জন্য তারা পরিবারকে দিয়ে দেয়।

অফিসে দু’জন পাশাপাশি ডেস্কে বসে। প্রতিদিন এক সাথে দুপুরের আহার করে। দিনের কাজ শেষ হলে এক সাথে তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। অনেক সন্ধ্যা আর প্রায় প্রতি রবিবারের দিনগুলো তারা একসাথে কাটায়। প্রায়ই তারা দু’জন যুবকের সাথে সময় কাটায় কিন্তু তাদের চারজনের রসায়ন বেশি দিন টিকে না। কোনো দু’জন যুবকের স্থান হয়তো তারা পরিতাপহীনভাবে নতুন দু’জনকে অবলীলায় দিয়ে দেয়। মূলত পরিতাপ তাদের কাছে অর্থহীন কারণ নতুন দু’জনের সাথে আগের দুজনের খুব কম মিলই ওরা দেখতে পায়। কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া গরম আবহাওয়ার শনিবারের অলস সুন্দর সন্ধ্যাগুলো একসাথে কাটায়। সব সময় এক সাথে থাকলেও আজও তাদের সম্পর্কের সুতোয় চিড় ধরেনি।

তারা দু’জন দেখতেও এক রকম যদিও তা তাদের চেহারায় মিল নেই। তাদের শরীরের গঠন, চলন, স্টাইল এবং পোশাক-আশাক একই রকম। আনাবেল আর মিজ যা করে, বলাই যায়, অফিসের অন্য উঠতি বয়সি কর্মীরা তা করে না। ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়, নেইলপালিশ করে, আইভ্রুতে গাঢ় রং মাখে, চুল হালকা করে আর সুগন্ধি মাখে। এসব কারণে তারা অন্যদের থেকে আলাদা। রংচঙ্গা, পাতলা পোশাক পরে ওরা। বক্ষ আটোসাটো রাখে, পায়ের উপর পর্যন্ত খোলা রাখে, জরিদার সুন্দর বেল্টের স্যানডেল পায়ে দেয়। তাদের গর্বিত, হালকামেজাজি আর প্রাণোচ্ছল দেখায়।

এখন তারা ফিফ্থ এভিনিউ ধরে এগিয়ে চলেছে। গরম হাওয়ায় তাদের স্কার্ট ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশংসাসূচক বাক্য তাদের কানে ভেসে আসে। নিউজস্ট্যান্ডের পাশে অলস যুবকদের ফিসফিসানি বা জোর চিৎকার এমনকি শেষ পর্যন্ত সিটিমারাও শুনতে পায় তারা। আনাবেল আর মিজ সৌজন্য প্রকাশ না করে জোরে হেঁটে যায়। মাথা উঁচু করে অসম্ভব নিখুঁতভাবে তারা পা ফেলতে থাকে যেমন করে গেঁয়ো লোক ঘাড় উঁচিয়ে হেঁটে যায়।

তাদের ছুটির বিকেলগুলোতে সব সময় তারা ফিফ্থ এভিনিউতে হাঁটতে বের হয় কারণ এটি হলো তাদের প্রিয় খেলাটি খেলবার উপযুক্ত জায়গা। অবশ্য এ খেলা যেকোনো জায়গায় খেলা যায়। তবে আসল কথা হলো বড় বড় দোকানের জানালাগুলো খেলোয়াড় দুজনকে তাদের সর্বোচ্চ ভাল খেলার উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে।

আনাবেল এ খেলা আবিষ্কার করেছে কিংবা বলা যায় কোনো বয়স্ক ব্যক্তির কাছ থেকে শিখে সে নিজের মতো করে বানিয়ে নিয়েছে। আসলে খেলাটা আগের জমানার ‘এক মিলিয়ন ডলার পেলে কী করবে’ খেলার মতোই। কিন্তু এটি খেলার জন্য নতুন একগুচ্ছ নিয়ম বানিয়েছে আনাবেল। ফলে সে খেলাটিকে সীমিত আর সুনির্দিষ্ট করে তা কঠিন করে ফেলেছে। অন্যান্য খেলায় যেমনটি হয়, খেলার নিয়ম কঠিন হওয়ায় এটি আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়েছে।

খেলাটির আনাবলের ভার্সন এ রকম: আপনাকে অবশ্যই ভেবে নিতে হবে যে, কোনো একজন মারা গেছেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, মৃত্যুকালে তিনি এক মিলিয়ন ডলার রেখে গেছেন। আর এ অর্থ তিনি উইল করে গেছেন। উইলে বলা হয়েছে, এ অর্থের প্রতিটি কড়ি নিজ হাতে খরচ করতে হবে। এখানেই খেলাটার যত ঝক্কি। যেমন খেলার সময় আপনি যদি অন্যান্য খরচের সাথে আপনার পরিবারের বসবাসের জন্য নতুন একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া করেন তাহলে আপনি হেরে যাবেন তখন অন্যজন খেলার সুযোগ পাবে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, অনেকেই এমনকি অভিজ্ঞরাও এ ধরনের টুকটাক ভুল করে খেলা থেকে বাদ পড়ে যায়।

ভীষণ একাগ্রতা নিয়ে খেলাটি খেলা আবশ্যকীয়। প্রতিটি কেনাকাটা অবশ্যই খুব সর্তকতার সাথে বিবেচনা করতে হয়। প্রয়োজন হলে তার পক্ষে যুক্তিও দেওয়া লাগে। যেনতেন করে খেলার সুযোগ নাই কোনভাবেই। একবার আনাবেল সিলভিয়াকে খেলাটির সাথে পরিচয় করিয়েছিল। সিলভিয়া অফিসের আরেকজন কর্মচারী। সে সিলভিয়ার কাছে খেলার নিয়ম ব্যাখ্যা করে। তারপর তাকে খেলার আমন্ত্রণ জানায়। “সর্ব প্রথম তুমি কি করবে? ” কোনরকমের সৌজন্যতা না দেখিয়ে এবং কোনো ধরনের ইতস্ততা না করে সিলভিয়া উত্তর দিয়েছিল। “তাহলে,” সে বলেছিল, “প্রথম যে কাজটা আমি করবো, বাইরে গিয়ে মিস গ্যারি কুপারকে হত্যার জন্য একজনকে ভাড়া করবো আর তারপর—”। ফলে দেখা গেল যে, খেলাটা আর মজার পর্যায়ে থাকেনি।

তবে এটা বলা যায়, আনাবেল আর মিজ যেন একে অপরের জন্যই জন্মেছে। মিজ যেদিন খেলাটি শিখেছে সেদিন থেকেই যেন সে এই খেলার একজন ওস্তাদ। সে-ই খেলাটির সাথে স্পর্শকাতরতা যোগ করেছে যার ফলে পুরো বিষয়টি হয়েছে আরো আকর্ষণীয়। মিজের অভিনবত্ব অনুযায়ী, টাকা রেখে যাওয়া মৃত খেয়ালি ব্যক্তিটি এমন কেউ নন যাকে সে ভালবাসতো। কিংবা এমন ব্যক্তিও হতে পারে – এমনকি সে তাকে চেনেই না। তিনি এমন এক ব্যক্তি যে তোমাকে কোথাও দেখেছে এবং তার মনে হয়েছে, “এই মেয়েটির অনেক ভালো কিছু করার আছে। মৃত্যুর সময় আমি মেয়েটির জন্য এক মিলিয়ন ডলার রেখে যাবো।” আর তার মৃত্যুও আকস্মিক না এমনকি বেদনাদায়কও না। উপকার করা এই ব্যক্তি, পূর্ণ জীবন পেয়েছেন এবং তিনি আরামের সাথে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন – তিনি ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং মৃত্যুর পর তিনি স্বর্গে যাবেন। এ রকম সুন্দর কল্পনা নিয়ে আনাবেল আর মিজ শান্তিপূর্ণ বিবেকবোধ নিয়ে তাদের খেলা শুরু করে।

মিজ এমন আন্তরিকতার সাথে খেলে তা শুধু নির্ভুলই না বরং তা বাড়াবাড়িই বলা যেতে পারে। আনাবেল একবার তার মিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রথমে একটা সিলভার-ফক্স কোট কেনার ঘোষণা দেয়। এই ঘটনা তাদের দু’জনের বন্ধুত্বে প্রথমবারের মতো চিড় ধরায়। এটা যেন মিজের মুখে চড় মারার মতো ব্যাপার। মিজ যখন পরিস্থিতি সামলে পুনরায় নিঃশ্বাস নিতে সক্ষম হয়, তখন সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সে চিন্তাও করতে পারে না, আনাবেল কীভাবে এমন একটা পোশাক কেনার সিদ্ধান্ত নিল। কারণ সিলভার-ফক্স কোট একটা সাধারণ পোশাক! আনাবেল তার পছন্দের পক্ষে যুক্তি দেয় এবং বলে যে এগুলো সাধারণ পোশাক না। মিজ তখন বলে, এগুলো সাধারণ পোশাক। সে আরো যোগ করে প্রত্যেকে সিলভার ফক্স কোট পরে। সম্ভবত কিছুটা মাথা গরম করে, ঘোষণা দেয় সে নিজে কখনই সিলভার ফক্স পছন্দ করবে না।

এরপর বেশ কয়েকদিন সবসময় তারা একে অপরকে দেখে এবং তাদের আলাপচারিতা মাপা ও অনিয়মিত হয়। এবং তারা আর খেলেও না। এরপর একদিন সকালে আনাবেল অফিসে ঢুকেই মিজের কাছে যায় এবং বলে, সে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। তার মিলিয়ন ডলারের কোনো অংশ দিয়েই সে সিলভার ফক্স কোট কিনবে না। তবে ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য সে সাথে সাথে মিনকের কোট কেনার কথা বলে।

মিজ হেসে উঠে। তার চোখ আনন্দে ছলছল করে উঠে। “আমার মনে হয়,” সে বলে উঠে, “তুমি একদম ঠিক বলেছ।”

এখন ফিফ্থ এভিনিউ দিয়ে তারা দুজন হাঁটছে। নতুন করে খেলাটা শুরু করে। সেপ্টেম্বর মাস। গরম এবং চোখ ঝলসানো আবহাওয়া। সাথে বাতাসে কাঠের গুড়োতে ভরা ধুলো। এ যেন এক অভিশপ্ত সময়। এমন অবস্থায় মানুষজন দুর্বল আর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা সোজা হয়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে যেন তরুণী উত্তরাধিকারী বৈকালিক বিহারে বেরিয়েছে। খেলা শুরু করার জন্য তাদের কোনো আনুষ্ঠানিকতার দরকার পড়ে না। আনাবেল সরাসরি খেলার মধ্যে ঢুকে পড়ে।

“আচ্ছা” সে বলে, “তাহলে তুমি এই এক মিলিয়ন ডলার পেয়েছ। এটা নিয়ে তুমি সর্ব প্রথম কী করবে?”

“প্রথমে আমি যেটা করবো, ” মিজ বলে, “মিনকের চামড়া দিয়ে বানানো একটা কোট কিনবো।” কিন্তু এটা সে এমন ভাবলেশহীনভাবে বলে যেন জানা প্রশ্নের মুখস্থ উত্তর দিল।

“আচ্ছা, ” আনাবেল বলে, “আমার মনে হয় তুমি ওটা কিনতে পারো। মিনকের চামড়ায় তৈরি ভীষণ কালো।” কিন্তু তার কথাও যেন যন্ত্রের মতো লাগে। প্রচণ্ড গরমের সময়; তাই কতটা কালো, মসৃণ কোমল পশম তাতে কিছু আসে যায় না। চিন্তা করাটাই ভয়ানক।

তারা নীরবে কিছুক্ষণ হাঁটতে থাকলো। এমন সময় একটা দোকানের জানালার দিকে মিজের নজর গেল। আহ দারুণ! মার্জিত আর আভিজাত্যে ভরা আলোআধারিতে চমৎকার লাগছে দোকানটা।

“না”, মিজ বললো, “আমি কথা ফিরিয়ে নিচ্ছি। আগে আমি মিনক-কোট কিনবো না। ভাবো তো কি কিনবো? একটা মুক্তার মালা কিনবো। আসল মুক্তার।”

আনাবেল মিজির দিকে চোখ ফেরালো তাকে বুঝতে।

“অবশ্যই”, সে বললো, “আমার মনে হচ্ছে এটা একটা ভালো আইডিয়া। এটা অর্থপূর্ণও বটে। যে কোনো কিছুর সাথেই তুমি মুক্তোর মালা পরতে পারবে।”

তারা দু’জন মিলে একটা দোকনের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরে শুধুই একটা আইটেম- দু’পরতের বড় বড় মুক্তার মালা। মালাগুলো গাঢ় পান্না তার চারপাশে হালকা গোলাপী মখমল দিয়ে জড়িয়ে রাখা।

“এর দাম কত হতে পারে তার কোনো আন্দাজ আছে?” আনাবেল বলল।

“ধুর আমি কি করে জানবো।” মিজ বলে, “আমার ধারণা অনেক দাম হবে।”

“হাজারখানেক ডলার হতে পারে কি? ” আনাবেল বলল।

“আমার ধারণা আরো বেশি হবে,” মিজ বলল, “পান্নার দামটাও তো বিবেচনায় আনতে হবে।”

“তাহলে কি দশ হাজার ডলারের মত হতে পারে?” আনাবেল জিগ্যেস করে।

“আরে আমি কী জানি! আমার কোনো ধারণাই নাই”, মিজ উত্তর করলো।

আনাবেলের মনে দুষ্টু বুদ্ধি চাপলো। “ভেতরে গিয়ে তোমার দাম করার সাহস হবে?” সে বলল।

“মজা করার জন্য” মিজ জানতে চাইলো।

“সাহস করে দেখাও তো, ” আনাবেল বললো।

“এ ধরনের দোকান এই বিকেলেও খোলেনি কেন কে জানে, ” মিজ বলে।

“এটা তুমি ঠিকই বলেছ,” আনাবেল বলে, “মানুষজন কেবল আসা শুরু করেছে। একজন দারোয়ানকে দেখতে পাচ্ছি। সাহস করে যাও”।

“ঠিক আছে, ” মিজ বলে, “তবে তোমাকেও সাথে যেতে হবে। ”

ভেতরে ঢুকতে দেওয়ার জন্য তারা দারোয়ানকে মৃদু আর উদাসীনভাবে ধন্যবাদ জানালো। রুমের ভেতরটা ঠান্ডা আর নিরিবিলি। বিশাল ও শোভন। প্যানেল দেয়াল। নরম কার্পেট। কিন্তু তারা এমন এক অস্বস্তির ভাব দেখালো যেন তারা শুকরের খোয়াড়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পাতলা পরিপাটি একজন ক্লার্ক তাদের কাছে এগিয়ে এসে অভিবাদন জানালো। তাদের উপস্থিতি তার পরিষ্কার মুখমণ্ডলে কোনোরকম বিস্ময়ের ছাপ ফেললো না।

“শুভ বিকেল,” সে বললো। কথাগুলো এমনভাবে বলল যেন যদি তারা তার অতি ভদ্র অভিবাদন গ্রহণ করে তাহলে সে জীবনে তা ভুলবে না।

“শুভ বিকেল,” একধরনের নিরস কণ্ঠে আনাবেল আর মিজ একসাথে বলে উঠলো।

“কিছু কি চায় আপনাদের-” ক্লার্ক জানতে চাইলো।

“আরে না। আমরা কেবল দেখছিলাম,” আনাবেল বলল। কথাগুলো এমনভাবে বলল যেন তা কোনো মঞ্চ থেকে ভেসে এলো।

ক্লার্ক প্রীতিসম্ভাষণ জানালো।

“আমি আর আমার বন্ধু কদাচিৎ এ দিক দিয়ে যাই, ” মিজ বলে এবং থামে যেন তা শোনা যায়, “আমার এই বন্ধু আর আমি”, সে বলতে থাকে, “কদাচিৎ ভাবি জানালার ঐ মুক্তার মালার দাম কত।”

“ও, ” ক্লার্ক বলে, “ঐ ডাবল ফিতাওয়ালাটার দাম ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার, ম্যাম।”

“ও আচ্ছা, ” মিজ বলে।

ক্লার্ক ভদ্রতাসূচক প্রীতিসম্ভাষণ জানায়। “অবিশ্বাস্য সুন্দর নেকলেস,” সে বলে, “এটা কি আপনাদের দেখাবো? ”

“না, ধন্যবাদ” আনাবেল বলে।

“আমি আর আমার বন্ধু কদাচিৎ এদিক দিয়ে যাই, ” মিজ বলে।

তারা বের হওয়ার জন্য ফেরে। যেতে উদ্যত হয়। তারা এমন ভঙ্গিমা করে যেন বধ্যভূমিতে যাওয়ার জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। ক্লার্ক সামনের দিকে ছুটে আসে। দরজা খুলে দেয়। তারা যখন বের হয় তখন সে বিদায় সম্ভাষণ জানায়।

তারা দুজন এভ্যিনিউ ধরে এগুতে থাকে। তাদের চোখেমুখে তখনো ঘৃণা ভাব ফুটে আছে।

“সত্যি সত্যি!” আনাবেল বিস্মিত হয়ে বলে, “এ রকম একটা জিনিসের এতো দাম ভাবা যায়?”

“দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার ডলার!” মিজ বলল, “আরেব্বাশ, এতো এক মিলিয়নের ডলারের তিন ভাগের এক ভাগ দেখছি!”

“বেচারার যা অবস্থা!” আনাবেল বলে।

তারা হাঁটতে শুরু করে। ধীরে ধীরে অপমানবোধটা কেটে যেতে থাকে। এক সময় তা পুরোপুরি চলে যায় – যেন তাদের কাছ থেকে সব ধুয়েমুছে গেছে। রাজসিক ভঙ্গিতে পা ফেলে চলতে থাকে তারা। তাদের কাধে ক্লান্তি আর পা টালমাটাল হয়ে হেঁচড়ে এগুতে থাকে। একে অপরের সাথে তারা ধাক্কা খায় কিন্তু তারা তা খেয়ালও করে না এবং তার জন্য কোনো ধরনের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ও ঘটে না। এমনটি বারবার ঘটতে থাকে। তারা নীরব থাকে এবং তাদের চোখ তখন ঝাপসা।

মিজ হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালো। মাথা উচুঁ করে স্পষ্ট এবং ভারী গলায় বলা শুরু করলো। “ শোন আনাবেল ” সে বলল, “খুবই এক ধনী এক ব্যক্তির কথা চিন্তা করি। বুঝলে? তুমি তাকে চেন না। কিন্তু তিনি তোমাকে কোনোভাবে দেখেছেন। তিনি তোমার জন্য কিছু করতে চান। ধরে নাও তিনি অতি বৃদ্ধ। ঠিক আছে? তিনি ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মারা গেলেন। তোমার জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার রেখে গেলেন। এখন বলো এই ডলার দিয়ে তুমি কি করবে? ”

লেখক পরিচিতি: ডরোথি পার্কার (১৮৯৩-১৯৬৭) আমেরিকার একজন কবি, সমালোচক ও সাহিত্যিক। জন্ম নিউ ইয়র্কে। আমেরিকার Algonquin Round Table লিটারারি সার্কেলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯২৯ সালে তিনি আত্মজীবনীমূলক Big Blonde ছোটগল্পের জন্য O. Henry Award পান। কাজ করেছেন New Yorker এবং হলিউডে স্ক্রিপ্টরাইটার হিসেবে যদিও বামপন্থী হওয়ায় সেখানে তিনি কালোতালিকাভুক্ত হন। তার ছোটগল্প সংকলনগুলোর মধ্যে রয়েছে Laments for the Living, After Such Pleasures, Here Lies: The Collected Stories of Dorothy Parker

কৃতজ্ঞতা: লুনা রাহনুমা

 

অনুবাদক পরিচিতি:

মাজহার জীবন
সম্পাদক
লেখালেখির উঠান সাহিত্যপত্রিকা, অনুবাদ: হাওয়ার্ড জিনের
নাটক এমা এবং কবিতার বই আমিরি বারাকা’র কেউ আমেরিকা উড়িয়ে দিয়েছে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.