মিলু শামসের গল্প : কালো মেঘ অথবা খুনে ডাকাতের বাঁশি

ভিনব ঘটনাটি শেষ বিকেলের একটু আগের। হঠাৎই আকাশ থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে নেমে আসে পাহাড় সমান গুমোট অন্ধকার। শহরের একদল মানুষ তাকিয়েছিল ধেয়ে আসা কালো মেঘ বা অন্ধকারের দিকে। আরেক দল ছুটছিল সুনামি আতঙ্কে নদী পার হয়ে শহরতলির লোকালয়ের দিকে। কে বা কারা গুজব ছড়িয়েছে– সন্ধ্যায় সুনামি হবে, কালো মেঘ নামার পর।
আকাশে তাকিয়েছিল যারা কিছুক্ষণের মধ্যে তারা একযোগে অভিন্ন এক অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়ে খেয়াল করে তাদের সম্মিলিত মাথা পরিণত হয়েছে একটি একক শস্যক্ষেত্রে। নিবিষ্ট চাষীরা সেখানে বীজ বপন করছে, সেচ ও সার দিয়ে নিবিড় পরিচর্যায় গজিয়ে তুলছে ফসলের গাছ। গাছগুলো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এর বীজতলা তৈরি হয়েছে এমনভাবে যাতে সব চারা হবে এক মাপের, একই আকারের। বাইরে থেকে কোনো কোনোটাকে আলাদা মনে হলেও অন্তর্গতভাবে তারা এক ও অবিচ্ছিন্ন। এ ঘটনার পরপর ডাকসাইটে এক খুনে ডাকাতের গায়ে তিনটি তারা খসে পড়লে শহর তোলপাড় করে পিলপিল পায়ে হেঁটে আসে চৌকস চাষীদের বোনা চারাগুলো। ততক্ষণে তারা বেশ পরিণত। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ডাকাতের একার মাথায় ছিল সম্মিলিত মাথার চেয়ে দৈর্ঘ্য প্রস্থে বড় একটি শস্যক্ষেত্র। এবং তা ছিল অন্যদের চেয়ে আরও বেশি উর্বর, পরিণত ও সুবিন্যস্ত। কথিত আছে, বিশেষ ঢঙে বাঁশি বাজাতে পারে সে। বাঁশিতে ফুঁ দিলেই শহরের মানুষ ভেড়ার পাল হয়ে যেত। আর ডাকাত হতো রাখাল। ভেড়াদের এক ঘাটে পানি খাওয়াত, এক খামারের ঘাস খাওয়াত আর গোপনে খিল খিল করে হাসত ওদের ভেড়াপনা দেখে। এ হাসি শেয়ার করার জন্য সে স্কাইপ, ভাইবার, ইমো ইত্যাদিতে সংযুক্ত হতো তার ভিনদেশী ওস্তাতদের সঙ্গে। যারা তাকে ডাকাতিতে হাত পাকাতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে জাদুকরী বাঁশি বাজাতে, মানুষকে ভেড়া বানানোর কৌশল রপ্ত করতে। মার্ক জাকারবার্গের সঙ্গে তার দহরম মহরম সম্পর্কের জন্য নাকি এটা সম্ভব হতো।
সে সংযুক্ত হতো কেননা শহরে হাসি শেয়ার করার জন্য কোন বুদ্ধিমান প্রাণী ছিল না। ভেড়ারা এবং গাছেরা নিজেদের ভাষায় কথাবার্তা, গালগল্প করে সময় কাটালেও ডাকাতের মস্তিষ্কের উর্বরতা ছুঁতে পারত না। এতটাই উন্নত ও সমৃদ্ধ ছিল তা। তারা বরং তাকে একটি আইকনে পরিণত করেছিল। তার মুখ নিঃসৃত কথাকে পয়গম্বরের বাণীর মতো মান্য করত। কেউ কেউ দেবতা জ্ঞানে পূজাও করত। রূপকথার সাপের মাথায় মণি যেমন জ্বল জ্বল করে তেমনি তাকে মাথায় করে রাখত তারা। তার গায়ে তারা খসার ঘটনা তাই বিরল ও বিস্ময়কর।
নিবিড় পরিচর্যিত গাছেরা এবং ভেড়ারা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন, আতঙ্কগ্রস্ত। গাছেরা ঘন ঘন পাতা নেড়ে এবং ভেড়ারা ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে এ নিয়ে আলোচনা করে। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মুক্ত আলোচনা ইত্যাদিতে মুখর থাকে। নিজেদের মধ্যে কথা বলে তারা উচ্চৈঃস্বরে, কখনও ফিসফিসিয়ে। আকাশ থেকে কালো মেঘের মতো ধোঁয়ার কু-লী নেমে আসার ঘটনা তাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে ভেবে তারা শঙ্কিত হয়। 
যদিও ঘটনার মধ্যেই তাদের বসবাস। বলা যায়, ঘটনার ঘনঘটায় কাটে বলে শিউরে ওঠার মতো কিছু ঘটলেও সহসা তারা তা বুঝে উঠতে পারে না। অথবা যা বোঝা প্রয়োজন তার গুরুত্ব অনুধাবন না করে ডাকাতের সুরে সুর তোলে ভৈরবী, বাগেশ্রী, আশাবরি বা অন্য কোন রাগে। যেমন ডাকাতের গায়ে তারা খসা নিয়ে তাদের মাথা না ঘামালেও চলত। কেননা ওটা ঘটনার মূল নয়, লক্ষণ মাত্র। কোন কোন জ্বর যেমন রোগ নয়, রোগের লক্ষণ– সে রকম। অথচ এ নিয়েই মেতে রইল তারা। এদিকে আকাশ থেকে ধেয়ে আসা কালো মেঘ বা ধোঁয়ার কুণ্ডলী নিচে নেমে ছড়িয়ে পড়েছে শহরের প্রাসাদতুল্য বড় বড় ভবনে। এক্কাদোক্কা খেলার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে একতলা-দোতলায় উঠতে উঠতে দ্রুতই রং ও রূপ বদলায় তা। রাংতা মোড়া ফলস সিলিংয়ে পৌঁছে গুচ্ছ গুচ্ছ লোভনীয় ফল হয়ে ঝুলতে থাকে। কোথাও কোথাও লাবণ্যময় সুললিত ফুলও হয়। চূড়ায় জাতীয় পতাকা ওড়া ওসব ভবনের কিছু চক্ষুস্মান কালো ধোঁয়ার এ রং বদল পরিষ্কার দেখেন এবং উপভোগ করেন। তাদের রয়েছে নিজ নিজ বিষয়ে দীর্ঘ দিনের পেশাগত বিশেষজ্ঞ সনদ। তাজ্জব বিষয় হলো, রং বদল যারা দেখেন তাদের নিজেদের রংও সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। তখন নির্দ্বিধায় তারা হয়ে যান বহুরূপী প্রাণী বিশেষ এবং প্রয়োজনমতো যখন তখন যেখানে সেখানে রং ও রূপ বদলের সক্ষমতা অর্জন করেন। এ জন্য তাদের লজ্জাজনিত ব্যক্তিগত প্রাইভেসির প্রয়োজন পড়ে না। জনসমক্ষেই বদলের কাজটি করতে পারেন। যেমন এতকাল যিনি নিজের ফ্যাশন ট্রেন্ড সেট করেছিলেন পাজামা-পাঞ্জাবিতে এবং এর পক্ষে গুণগান করে এসেছেন; পাঞ্জাবির জন্য কোথায় ভাল আদ্দি, খদ্দর কিংবা সিল্কের কাপড় পাওয়া যায়– তা নিয়ে তন্তুবায়ের অভিজ্ঞতাজনিত সূক্ষ্মতার মর্মে গিয়ে বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য রেখে এ বিষয়ে উপমহাদেশের একজন অন্যতম বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজের ইমেজ প্রতিষ্ঠিত করেছেন; ধোঁয়ার কুণ্ডলীজনিত বাতাসের প্রবাহের প্রভাবে হঠাৎ জনসমক্ষে তিনি তা খুলে ফেলে সাফারি বা ইংলিশ স্যুট পরে ফেলেন এবং এর সপক্ষে এমন নিগূঢ় তত্ত্ব উপস্থাপন করতে থাকেন যে মনে হবে পাজামা-পাঞ্জাবি নামের কোন বস্তুর সঙ্গে তার পূর্ব পরিচয় ছিল না বা এ সম্পর্কে কখনও তার জানা শোনাই ছিল না। এর ক্ষতির দিক নিয়ে তিনি এত বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এত অনর্গল বলে চলেন যে মনে হয় সমাজ-সভ্যতা অধপতনে যাওয়ার একমাত্র কারণ পাজামা-পাঞ্জাবি এবং এ বিষয়ে বক্তার জ্ঞানই চূড়ান্ত। বক্তব্য উপস্থাপনের কৌশল ও দক্ষতা দেখে মনে হবে এ বিষয়ে তার কমপক্ষে দু’তিনটা পিএইচডি ডিগ্রী রয়েছে। পক্ষে যখন বলতেন তখনও ঠিক এমনই বিশেষজ্ঞের দৃঢ়তা নিয়ে বলতেন।
রং পরিবর্তনের বিষয়টাও এ রকমই। যান চলাচলের সুবিধার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যেমন লাল, নীল, হলুদ সিগন্যাল আলো জ্বলে তেমনি এরাও বায়ু প্রবাহের সুবিধার দিক অনুধাবন করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাল সাদা কালো এবং বর্ণিল নানা রঙে পরিণত হতে পারেন। ধোঁয়ার কুণ্ডলী কোন্ দিকে মোড় নেবে, দক্ষ আবহাওয়াবিদের মতো তাদের মস্তিষ্কের রাডারে তা আগেই ধরা পড়ে। খুনে ডাকাতের গায়ে তারা খসা এবং আকাশ থেকে কালো ধোঁয়া নেমে আসা যে একই ঘটনার দুই প্রতিরূপ তাও তারা জানতেন। আকাশে তাকিয়ে থাকা চোখগুলো ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়েই থাকে। ঘটনার সঙ্গে ঘটনার সূত্র সংযোগ তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ডাকাতের বাঁশি এবং জাতীয় পতাকা ওড়া বহুতল ভবনগুলোর চক্ষুষ্মান চৌকসদের পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের ঝড়ে তারা ঝরা পাতার মতো এদিক ওদিক গড়াগড়ি করে। মাটির গভীরে শেকড় প্রোথিত নয় বলে সহজে এদের চোখে বিভ্রমের কাজল এঁকে ফলস সিলিংয়ে ঝুলে থাকা ফল খেয়ে এবং ফুলের গন্ধ শুঁকে শুধু শহর নয়, শহরের পর শহর, উপশহর, থানা, ইউনিয়ন, গ্রাম সব অচেনা এমন কি ভস্ম করে দেয়া তাদের কাছে শিশুদের ভার্চুয়াল গেম ‘টিক ট্যাক টো’র মতো মজার খেলা অথবা সহজাত অভ্যাসের মতো হয়ে গেছে। 
এ রকম হাজারও খেলার সূত্র আছে তাদের পোর্ট ফোলিওতে। একেক খেলার একেক চাল। তারা চাল চালেন আর খুনে ডাকাত বাঁশিতে ভাইরো, আহীর ভাইরো, দরবার-এ –কানাড়া ইত্যাদি মজলিশি রাগে সুর তুলে ভেড়ার পালকে সম্মোহিত করে রাখে। ডাকাতের যোগ্য কিছু সাঙাত আছে, তারা সবাই উঁচু মার্গ সঙ্গীতের তাল লয় সব সময় ধরতে না পারলেও সারিন্দা বাজাতে পারে ভাল এবং তা তারা মন খুলে বাজায়। সারিন্দার সুরে ভেড়ারা আরও উদ্বেল হয়ে সুরাসক্ত জমিদারের মতো থেকে থেকে ‘আহা’ ‘মারহাবা’ রব তুলে বেহুঁশ হয়। সেই ফাঁকে বিশেষজ্ঞ-সনদধারীরা ফলস সিলিংয়ের সুস্বাদু ফলের সঙ্গে একটি একটি করে বিশেষায়িত ভবন ভক্ষণ করেন। সেখানে জাতীয় পতাকার চিহ্ন মাত্রও আর অবশিষ্ট থাকে না। ভক্ষণ এবং হজম প্রক্রিয়ার নান্দনিকতাও দেখার মতো। কোন কোন কবি ও কথা সাহিত্যিক বিশেষণের পর বিশেষণ বসিয়ে এ নিয়ে মোটা ভলিউমের বই লেখেন। কোন কোন ভাস্কর এবং চিত্রশিল্পী এদের কৃতিত্ব অমর করে রাখতে মূর্তি গড়েন; ক্যানভাসে তেল রং, জলরঙে ছবি আঁকেন। 
এ রকম সিরিজ ঘটনার শুরুর কথা প্রতিবারই সবাই ভুলে যায়। যেমন এবার আকাশ থেকে কালো মেঘ বা ধোঁয়ার কু-লী নেমে আসার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে বাঁশি ও সারিন্দার সুরে বিবশ হয়ে আছে। শেষ বিকেলের আগের সে ঘটনায় তাদের মধ্যে যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল তাও তারা ভুলে যায়। 
॥ দুই ॥
সুনামি আতঙ্কে শহরতলির দিকে যাওয়া দলটি নদী পার হয়ে গোলক ধাঁধায় পথ হারায়। কিছুতেই মনে করতে পারে না কোত্থেকে এসেছে, কোথায় যাবে। চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। এক সময় নদীর জলে নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখতে পায় তারা। প্রত্যেক মানুষ জন্মগতভাবে নার্সিসিস্ট– এমন ধারণা বদ্ধমূল থাকলেও বিম্বিত প্রতিচ্ছবি তাদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া জাগায় না। আসলে নিজেদের মুখাবয়বও ভুলে গেছে তারা। বিস্মৃতি এতটাই গ্রাস করেছে। নদীর ওপারে শহর থেকে খুনে ডাকাতের গায়ে তারা খসা এবং আকাশ থেকে কালো ধোঁয়া নেমে আসার খবর কানে এলেও তাই তারা বিচলিত বা উল্লসিত কোনটাই বোধ করে না। তারা ঘুরপাক খেতেই থাকে। হঠাৎ ত্রিকালদর্শী এক বয়োবৃদ্ধ পা পিছলে জলে পড়ে গেলে আরেক ঘটনার সূত্রপাত হয়।
পড়িমড়ি করে তাকে উদ্ধার করতে নামে উপস্থিত জনতা। এদিকে তলিয়ে যেতে যেতে তিনি খুঁজে পান ত্রিমাত্রিক এক আয়না। সবাই অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে অচেনা এক দেশের প্রতিবিম্ব দেখতে পায়। কৃত্রিম জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে শহরের পথঘাট, মানচিত্র। অনেকক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেও এমন কোন ল্যান্ডমার্ক তারা আবিষ্কার করতে পারে না যা দেখে শহরের সঙ্গে নিজেদের পরিচয়ের সূত্র খুঁজে পায়। এমনই এক বিহ্বল মুহূর্তে দূর থেকে ভেসে আসে ডাকাতের বাঁশির সুর। তারা উৎকর্ণ হয়। কোন্ দিক থেকে সুর আসছে তা নির্ণয় করে আয়না এবং বয়োবৃদ্ধকে ফেলে রেখে নিশি পাওয়া মানুষের মতো এক পা দু’পা করে এগোয়। যেন এক দঙ্গল মানুষ গণসম্মোহনে আচ্ছন্ন হয়ে অচেনা শহরের দিকে পথ হাতড়ে চলছে। বাঁশির সুর আরও নিকটবর্তী হলে তাদের সম্মোহন বেড়ে দ্বিগুণ, চতুর্গুণ, দশগুণ এমনকি শতগুণে পৌঁছায়।
হঠাৎই সবাইকে অবাক করে জলমগ্ন বয়োবৃদ্ধ আকাশ ফাটিয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন। আয়নায় নিবদ্ধ দু’চোখে ঝলসে ওঠে আনন্দের আভা– ‘পেয়েছি, চিনেছি… এই তো আমার বাড়ি। এই আমার শহর। এই যে ঘরদোর, শেকড় আছে মাটির গভীরে। এই তো আমার…।’ আরও জোরে, দশটি মাইক্রোফোনের আওয়াজের দৈর্ঘ্য কণ্ঠে এনে ফিরতে বলেন তিনি সম্মোহিত জনদঙ্গলটিকে। কিন্তু কোন আওয়াজই তাদের আর ফেরাতে পারে না। তাদের সম্মিলিত কান এখন ভরে আছে ডাকাতের সুললিত রাগে বাজানো বাঁশির সুরে। তাদের সম্মিলিত মাথা এখন পরিণত হয়েছে একটি একক শস্যক্ষেত্রে। চৌকস চাষীরা সেখানে বীজ বপন করে সেচ ও সার দিয়ে ফলিয়ে তুলছে একই মাপ ও আকারের তরতাজা চারা। তারা এখন পরিণত হয়েছে একটি ভেড়ার পালে। 
সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেন যে বয়োবৃদ্ধের ছেলেবেলায় পড়া একটি তর্জমার কথা মনে পড়ে! ‘পুতুলের চোখ আছে, দেখতে পায় না। কান আছে, শুনতে পায় না। হাত আছে, ধরতে পারে না। পা আছে চলতে পারে না।’ ওদের চলা দেখে বয়সজনিত অভিজ্ঞতায় কেমন সন্দেহ হয় তার– ‘ওরা কি চলছে আসলে?’ স্বগতোক্তি করেন বিড়বিড়িয়ে। একটু আগের আনন্দে উদ্ভাসিত মুখ ম্লান হয়ে আসে। গোলক ধাঁধার ঘোর কেটে গেছে। স্মৃতি ফিরেছে পুরোপুরি। আয়নায় বিম্বিত হচ্ছে অতীতের সব। দৃশ্যের পর দৃশ্যে পরিষ্কার ধরা পড়ছে একশ’ দুশো তিনশ বছর আগের ঘটনাসমূহ। তার ভূমি জমি বসতবাড়ি বেদখল হওয়ার দৃশ্য। বহুকাল পর উদ্ধার হয়েছিল তা। কিন্তু স্বত্ব ফিরে আসেনি পুরোপুরি। অপেক্ষায় দিন কাটে। হয়ত একদিন পরিপূর্ণ অধিকার নিয়ে বাস করবেন নিজ ভিটায়। কিন্তু না, সেদিন আর আসে না। বরং অবস্থা এমন হয় যে, তার মনে হয় ক্রমশ নিজ ভিটায় আগন্তুক হয়ে পড়ছেন। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে একসময় লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্ধার করেন তা। ফিরে পান পূর্ণ দখলি স্বত্ব।
একের পর এক সে সব দৃশ্য ভেসে উঠছে ত্রিমাত্রিক আয়নায়। কিন্তু দখলি স্বত্ব ফিরে পাওয়ার পরের দৃশ্যগুলো কেমন ঝাপসা হয়ে আসে। কিছুই বোঝা যায় না পরিষ্কার। নিজ ভূমে থেকেও যেন তিনি নেই। এমন এক বিমূর্ত বোধে আচ্ছন্ন হয়ে একটু আগের আনন্দে উদ্ভাসিত মুখ ম্লান হয়ে আসে।
লেখক পরিচিতি
মিলু শামস
গল্পকার। কবি। প্রবন্ধকার। 
বরিশালে বাড়ি। ঢাকায় থাকেন। 
প্রকাশিত বই–
গল্প:
অমরলোকের প্রত‍্যাগত।
প্রকাশক: কাকলী প্রকাশনী।
কবিতা: 
১.নিরুপায় বৃত্ত
২.দীর্ঘায়িত দুঃখগুলো
৩.আলোয় নাচে তিমিরের হিম
প্রবন্ধ 
১.আতঙ্কের পৃথিবীতে এক চক্কর
২.আবদ্ধ সময় এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা
আত্মজৈবনিক:
অতসীর স্কুল
জার্নাল:
স্ন‍্যাপশট:টুকরো কথার চিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=