সাদিক হোসেনের গল্প : জ্বর

বাচ্চারা জ্বরে ভুগলে দার্শনিক হয়ে যায়; যেমন অমল। বাবারা তখন মাধব দত্ত। এই দুই জনের বার্তালাপ চলে বেশ।

দুই দিনের জ্বরে কাবু। সারারাত আধোঘুমে স্নানযাত্রার বিবরণ দিল। মাঝখানে ফাটা বাঁশে পা আটকে রক্তারক্তি। অমলা না থাকলে বুঝি সে-যাত্রায় আঙুলটাই কাটা পড়ত। অমলা তাকে কোলে তুলে নিয়েছিল। পাথরকুচির পাতা বেটে তা ক্ষতস্থানে বেঁধে দিয়েছিল। আঙুলটা এই ঘুমেও তাই ভিজে ভিজে লাগে তার। পাতার গন্ধ নাকে এলে খানিক হয়তো তাকায়। বাবাকে দেখে না। যেন কোথায় রয়েছে – এইটুকু নিশ্চিত হতে চায়।
কোথায় রয়েছে মেয়ে – বাবারা জানে। আসলে এখন ‘পথের পাঁচালি’ চলছে। জ্বর যদি এই বিকৃতি আনে, তবে আসুক জ্বর।
ভোরের বেলা সূর্য উঠেছে। সকালে সারা ঘর ভরে গেল স্টীম ইঞ্জিনের ধোঁয়ায়। হাল্কা ধোঁয়া। প্রেশারকুকারে ভাত চাপালে এমনি তো হয়। ধোঁয়া ধোঁয়া রান্নাঘর। সাদা। হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন চলে এলো প্রবল গতিতে। এরপর নিশ্চিত কাশবন।
কিন্তু সেই কাশবন পেরনোর আগে, সে কি জানে, এক মানবশূণ্য গ্রাম পড়ে রয়েছে? ঐ তিত্তিরাজ গাছের তলা দিয়ে যে পথ গিয়েছে, ঐ মোটা গুলঞ্চলতা যেখানে দুলছে, থলো-থলো বন-চালতার ফল, বন-ধুঁধুলের লতা, প্রাচীন শিরীষ গাছের তলা দিয়ে যে হাওয়া বইছে, যেখানে পরগাছার ঝাড় হাওয়ায় দোলে, কাঁপে, একজনের গায়ের উপর আরেকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে, সেইখানে, ঐ ত্রিশূণ্যে ভাসমান স্বচ্ছ পর্দার মতো বাঙলার সেই গ্রাম মানবশূণ্য হয়েছে এতোদিনে!
রাতে ঘুম হয়নি। ভোরের দিকে চোখ জুড়িয়ে এসেছিল খানিক। এখন, পুনরায় চোখ মেলে দেখল, টেলিগিরাপের তারে অফুরন্ত ইশারা বয়ে চলেছে সশব্দে। যেমন, কান পাতলে, শঙ্খের পূর্বস্মৃতি কানে ভাসে, তেমনি। তারপর সৈকতে নতমুখী ঢেউ, টলোমলো পা কিংবা লাল কাঁকড়ার দূরে সরে যাওয়া সে দেখেছিল কী না তা জনবো কোন্‌ উপায়ে?
মেয়েটি চোখ মেলল। ঠোঁট দুটো শুকনো খটখটে। জল খাবে? কপালে হাত বুলালে বিছানায় মিশে যাবে? চাদরে হরিণ ছাপা। দু-ঢোক জলও খেতে পারল না। শুধু বলতে পারল, বমি।
ধরবার আগে নিজেই উঠে বসলো। পেটে তো কিছু নেই, ওগড়াবে কী? শুধু তেঁতো থুতু উঠে এলো। ঠোঁটের পাশ দিয়ে কষ নামল। নিজেই চাদর সরিয়ে দিল। এইবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়বে বোধহয়। তার আগে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাকি দিবসের খেলা এইখানে স্থির হবে। আমরা তটস্থ হয়ে থাকি। সে মাকে জড়িয়ে বাথরুমে যাবে। বাবারা অতদূর যায় না।
জ্বরের রঙ সাদা। একবালতি জলে একছিপি ডেটল ফেলে দিলে যেন শরতের মেঘ ঘুলিয়ে ওঠে। কিংবা সাদা ছত্রাক – হিরোসিমায় যেভাবে ফুটেছিল। তখন বাথরুমের ভেতর শুধু তাপের গন্ধ। সাদা তোয়ালে বুঝি দুর্বল হয়েছে। জলে ভেজালে মনখারাপের মত ঝুলে থাকে। তবু তো বালতির ভেতর সাদা মেঘ এমনভাবে ঘোরে যেন আকাশ। টুকরো নয়; অনন্ত। তাই ঘুরছে প্লাস্টিকের আধারে। মগ থেকে খানিকটা তুলে নিলেও এতটুকু কম পড়ে না।
মেঘ, না ছত্রাক অনায়াসে ছড়িয়ে পড়েছিল মেয়েটির উপর! আয়নায় তার গতরখানি কাঁপছে। যেন সে নিজেই গুলঞ্চলতা। ঐদিকে হুইসেল বেজে উঠলে, হয়তো বা, কাশবনে আমরা দুইজনে ছুটব।
জ্বর, সাদা। উথলে ওঠা দুধের মতো তার চোখদুটো ছলছল করছে। ফু দিলে খানিক হাসে। আবার উথলে ওঠে। তারপর মুখে সরের মতো লেগে থাকে ক্লান্তি।
– কী খাবি?
যেন যা বলবে তা-ই দিতে প্রস্তুত। সে দুইদিকে মাথা নাড়ল। কিছুই খাবে না। কিন্তু মা তো এতো সহজে হার মানবে না। গরম দুধের গ্লাসটিতে ফু দিয়ে টেবিলে রাখল। সঙ্গে টোস্ট। মেয়ের কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, এখন তো জ্বর নেই। খেয়ে নে’।
মেয়েটি আমার দিকে তাকালো। সে খেতে চাইছে না – এই কথাটা তার মাকে জানিয়ে দিতে হবে। তার কথা শোনা হলো না। বললাম, খেয়ে নে’। যা হোক একটু খেয়ে নে’। না খেলে সারবে কীভাবে?
– বমি হয়ে যাবে।
– বমি হবে না। বমি বন্ধের ওষুধ রয়েছে। খেয়ে নে’।
– পারবো না।
– একটুখানি খা। চান করবার পর খালি পেটে থাকতে নেই।
এতো জোর করবার পরও দু-চুমুক মাত্র দুধ খেল। টোস্টে একবার মাত্র কামড় দিল। শুতে শুতে বলল, মা, মাথাটা ঘুরছে।
তার মাথার পাশের জানালাটা খোলা। ঘোরো ঘোরো হাওয়া নেই এখন। গাছপালা যে-কটি দেখা যায় – দুটো নারকেল, দুই জোড়া সুপুরি একেবারে স্থির। শুধু পালঙ্কটুকু ঘুরছে বোধহয়। পাশাপাশি, উপরনিচ ঘুরছে। টেবিলে ফুলদানি – পড়ে যাচ্ছে না। কাশির সিরাপ অর্ধেক খালি হয়েছে। তার পাশে প্যারাসিটামল, টেবিলক্লক… রয়েছে এমনি, নিয়মে আবদ্ধ, মেয়েটির ঘুর্ণনে সাড়া দিচ্ছে না।
পুনরায় কাঁপুনি এলো। বলল, শীত করছে। তড়িঘড়ি কাঁথা চাপানো হলো। পায়ের নিচে বালিশ দেওয়া হলো। মুখখানি এবার লাল হলো বোধহয়। বলল, যাব না।
– কোথায় যাবি?
আর কোনো উত্তর নেই। সে অমলের মতো রাজার কাছ থেকে চিঠি চাইছে না। তার দৃষ্টিসীমানায় যা আছে তা কেবলই একঘেয়ে পাশের বাড়ি, পাশের বাড়ির বাসিন্দা, রাস্তা, মোটোরবাইকের শব্দ; পাহাড় নেই, ঝর্না নেই, জলের কলকলের মধ্যে সুনিপুণ কৌম সমাজের ইঙ্গিত নেই। ছাপোষা মানুষের ছাপোষা চলন, বলন, ক্লান্তিকর কথন – তবু বলছে, যাব না!
– কোথায় যাবি?
সে চোখ বুজিয়েই থাকে। জিভে ঘা হয়েছে। মাঝেমাঝে গলা খাঁকারি দেয়। উত্তর করে না।
অগত্যা আমরাই বলে ফেলি, এইবার পাহাড়ে যাব। তবে সবাই যেখানে যায়, সেইখানে নয়। একদম অন্য জায়গায়। সেখানে ট্যুরিস্টের ভিড় নেই। সপ্তাহে একদিন হাট বসে। আর পাহাড় ঘেরা যে জঙ্গল…
কথা শেষ হলো না। তার মা জলপট্টি দিতে শুরু করেছে। থার্মোমিটারে শরীরের তাপমাত্রা ১০২ ছাড়িয়ে গেছে।
– মা, মা… এইটুকুই বলেছে সে।
আমরা ঘড়ির দিকে তাকাই।
তারপর একসময় সে থেমে যায়। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। জ্বর ছাড়ছে। পোশাক ভিজে যাচ্ছে ঘামে। ভেজানো গামছায় সারা গা মুছিয়ে নতুন জামা পরানো হলো। নিজেই বলল, এবার খিদে পাচ্ছে।
সে দুধ খাবে না। বলল, আপেল খাব।
একখানা আপেল প্রায় গোগ্রাসে খেয়ে নিল।
– আর খাবি?
সে মাথা নাড়ল। খাবে না। জল খেল একগ্লাস। বলল, কোমরে খুব ব্যথা।
– সারাক্ষণ শুয়ে আছিস তো, তাই। বারান্দায় গিয়ে বসবি?
তাকে ধরে ধরে বারান্দায় নিয়ে আসা হল। চেয়ারে বসতে বসতে বলল, এবার পাহাড়ে যাব?
– হ্যাঁ। পাহাড়ে।
– কিন্তু আমি কি যেতে পারব?
– কেন যেতে পারবি না?
– অতদূরে যেতে পারব?
– নিশ্চয় যেতে পারবি।
– পাহাড় খুব ঠান্ডা তো।
– হ্যাঁ। জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়।
– ওখানে ঝর্না আছে?
– আছে তো।
– পাহাড়ের গা দিয়ে ঝর্না নামে?
– হ্যাঁ। পাহাড়টাকে ঘিরে রয়েছে জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমরা হাঁটব। মাঝে মাঝে ঝর্না।
– সেই ঝর্নায় হরিণেরা জল খেতে আসে বুঝি?
– ওখানে কি হরিণ আছে? নেই বোধহয়।
– তাহলে কী আছে?
– খরগোস আছে। কিছু সাপ আছে। সন্ধে নামলে মাঝে মাঝে চিতা বেরোয়।
– চিতা?
– হ্যাঁ তো।
– তাহলে যাব না।
– কেন?
– চিতা খুব হিংস্র। আমি জানি।
– কিন্তু জঙ্গল পেরিয়ে আমরা যে অনেক দূর যেতে পারতাম, সেটা যাওয়া হবে না।
– কোথায় যেতাম আমরা?
– সেই আর একটা নতুন পাহাড়ি গ্রামে।
– ওখানে বুঝি ট্যুরিস্টরা যায় না।
– না।
– তাহলে ভিড় নেই নিশ্চয়।
– না, ভিড় নেই।
– সপ্তাহে একদিন হাট বসে?
– প্রতি বুধবার।
– বুধবার কেন?
– ওটাই ওখানকার নিয়ম।
মেয়েটি আমার কথা শুনে হাসল। বলল, বাবা, তুমি মিথ্যা বলো, আমি জানি।
সে জিরাফের মতো গলা বাড়িয়ে আমার কাঁধে মাথা রাখল। তার নিঃশ্বাসে গরম হাওয়া। চুলে তেল দেওয়া হয়নি। জট পাকিয়ে রয়েছে। চুলের ভেতর বিলি কেটে দিলে সে আরামে আমার ভেতর গুটিয়ে আসে। কথা বলে না আর। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না। আদর করলে সাড়া মেলে না।
মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়ল দুপুরের আগেই।
এখন আর স্নানযাত্রার বিবরণ নেই। হয়তো সে পুরনো কোঠাবাড়ির কথা ভাবছে। অনেকদিনের পুরনো কোঠাবাড়ি। জিনিপত্রে ঝুল জমেছে। আলমারির কাচ ভাঙা। সেইখানে একটা মাকড়সা জাল বুনছে। তাছাড়া কাঠের সেকালের সিন্দুক, কটা রঙের সেকালের বেতের পেঁটরা, কড়ির আলনা। তার চোখ আটকে গেল একখানা জলচৌকির উপর। পাশেই কতরকমের বাক্স, হাঁড়ি-কলসি! সহজেই বোঝা যায় এইখানে সংসার চলে ছিল বহুদিন। এখন সেই মানুষগুলো নেই। তাদের ওঠা-পড়া, হাসি, ঘুম, খাওয়া, তাকানো সবই লুপ্ত হয়েছে। তবু কী এক গন্ধ যেন ছড়িয়ে রয়েছে চারধারে। পুরাতন জিনিসের গন্ধ, সে ভেবে দেখল, পুরাতন সময়ের গন্ধের মতোই। যে-সময়ে সে ছিল না, সেই সময়ের গন্ধ তার নাকে আসছে। সে জানালার বাইরে তাকাল। ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপটা আছে কী নেই, সোঁদালি গাছের মাথাটা বনের মধ্যে থেকে বার হতে পেরেছে কী পারেনি, কিংবা সেই যে দাদাঠাকুর, না জ্যাঠামশাই, কিংবা সেই দীনু চাটুয্যের আচমকা চেঁচিয়ে ওঠা… সেইসব কবেকার পাড়া-গাঁর মানুষ, তারা নেই, ছিল যে কখনো তাও যেন বোঝা যায় না, শুধু পুরনো গন্ধ আসে এখন… সে পুনরায় জানালার দিকে তাকাল। এইবার স্পষ্ট দেখতে পেল বুনো কুলগাছটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। যদিও বাদামী রঙের ডানাওয়ালা তেড়োপাখির উড়ে যাবার কোনো চিহ্ন নেই। খঞ্জন পাখিটিও নাচল না!
বাচ্চারা জ্বরে ভুগলে দার্শনিক হয়ে যায় – এইটুকু কল্পনা বাবারা না করতে পারলে জ্বরে ভোগা বাচ্চাটিকে নেহাতই অসহায় লাগে। বাবাদের তখন পিতার মতো বলিষ্ঠ চরিত্রে আর মানায় না। তারা বিকেলের ম্রিয়মাণ আলোর মতো অল্প হলুদ হয়ে যায়। যেমন, মাধব দত্তের স্ত্রী। তিনিই তো বাপ-মা মরা অমলকে সংসারে নিয়ে এলেন। সন্তান স্নেহে তাকে আঁকড়ে ধরলেন। কিন্তু নাটকে তার ভূমিকা কতটুকু?
অমলের জানালা সভ্যতার সংকটকে ফুটিয়ে তুলেছে। কৌম সমাজের ইঙ্গিত ঝর্নার জলের মতো কুলকুল বাজনা বাজায়, কাঁসর ঘন্টাই হয়তো-বা। জীবন, মৃত্যু, মৃত্যুবোধের সঙ্গে জুড়ে যায় ছিকল ছেঁড়ার আহুতি। কোথাও দূরে যেন মুক্তির মালা গাঁথছে একজন কিশোরী! তার নামটিও সুধা! এতো রূপক, রূপকের এতো টান যে আমরা অভিভূত হয়ে পড়ি। মৃত্যুকে মনে হয় এ-এক নতুন যাত্রার সূচনা। ঐ দীর্ঘ কালোর মাঝে অমল চলেছে নব প্রান্তরে…
সবই ছিল। আশপাশে শুধু অমলের মা ছিল না। রূপকের টান একমাত্র তাকেই স্পষ্ট করেনি।
বাচ্চারা জ্বরে ভুগলে মায়েরা পাথর হয়ে যায়!
হ্যাঁ, পাথরই তো। নড়ে না, চড়ে না, স্থবির; ক্ষয়চিহ্ন মুখে লেগে আছে যেন। তার দৃষ্টি আমার গ্রীবার দিকে। মেয়েটি ঐখানে মুখ রেখে শুয়েছিল। এখন রক্ত লেগে রয়েছে। মুছলেও মোছে না।
ডাক্তারকে ফোন করা হলো। নতুন ওষুধ দিলেন তিনি। বাড়িতে কি রাখা যাবে? আবার যদি রক্ত ওঠে? তিনি রাতটুকু অপেক্ষা করতে বললেন।
পাথর, পাথরের মতোই। এতো কঠিন যে যৎসামান্য সিঁদুরের ছোঁয়াতেই দেবী হয়ে যেতে পারতেন! পরিবর্তে তিনি বিছানার চাদর পাল্টালেন। রান্নাঘর সাফ করলেন। দুপুরের ভাত বাড়লেন। মুখে কোনো কথা নেই। নিজে খেলেন। আমাকে তাগাদা দিলেন।
দুপুর কাটতেই চায় না। বাবারা যখন দোকানফেরত, মায়েরা তখন মেয়েটিকে খাইয়ে দিয়েছে।
শিঙি মাছ বাজারে বিরল। ক্রমাগত তিমি হয়েছে। পাঁকাল সে মুখে তোলে না। ফলে তেলাপিয়ার পাতলা ঝোলের সঙ্গে কাদার মতো ভাতের মাখামাখি হলো। এবার প্রতিমা নির্মাণ। তবু সে সমস্ত সরঞ্জাম বিসর্জন দিয়েছিল।
– খেয়েছে কি?
পাথর জানাল, সামান্য। ওষুধ?
ওষুধ অমিল। তবে বুঝেছিল ব্যবস্থা নিশ্চয় কিছু করা যাবে। তাই মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে দিল। এখন মেয়েটির মুখ ভরাট। ক্লান্তির সরটুকু কেটে গেলেও চোখদুটো ছলছল করছে।
বিকেলের দিকে ঠাকুরদা এসেছিলেন। নামেই ঠাকুরদা, কারণ ইদানীং তিনি লাঠি নিয়ে চলেন। সম্পর্কে পাশেরবাড়ি। ওষুধখানা দিয়ে সোজা মেয়েটির কাছে চলে গেলেন।
কি যে কথা হয় তাদের, তা কে-ই বা জানে। তবে পাহাড়ের কথা না। ঝর্নার কুলকুল শব্দ শোনা যায়নি।
পুতুলের বাক্সে লোকানো পয়সার গল্প হচ্ছিল কী? অনুমানে বেশিদূর যাওয়া যায় না। কতদূর গেলে সিঁদুরের মতো রাঙা লিচুর হদিস মিলতে পারে, তা কয়েকজনে জানে। বাকিরা বোষ্টমদের বাগান দেখেছে। ওখানে মাচা বেঁধে লিচু পাড়ার ঢঙ ধ্রপদী নৃত্যের সঙ্গে তুলনীয় নয়। তা লৌকিক, তাই সাধন কিনতে পেরেছিল।
অর্থাৎ, কম হলুদ আলোয় মেয়েটা পুনরায় অমল হলো। বলছিল না তেমন কোনো কথা। কাঁপছিল। তবে বলতে পারত, সূর্য ডোবার সময় কেমন শব্দ হয়?
সূর্য সত্যিই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু অমলকে ছাদে নিয়ে যাবার সাহস ছিল না কারো। ঠাকুরদার সঙ্গে রয়েছে নতুন মোবাইল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছাদে গিয়ে ফিরে এলেন পাখির শব্দ নিয়ে।
মেয়েটির তা পছন্দ হলো না। বলল, অত বড়ো একটা জিনিস ডুবছে, তার নিজস্ব কোনো শব্দ নেই?
এরপর কতো গাছের পাতা নড়ল, পাশের বাড়ির ডিশ এন্টেনায় ঘুড়ি আটকেছে, কার জলের ট্যাঙ্কি থেকে জল পড়ছে, একজন কাশছিলেন – তার কাশির শব্দের সঙ্গে মিশে গেল কুকুরের ভৌ, সাইকেলের ঘটাংঘট, বিড়ালের মিআআও…
মেয়েটি বলল, এগুলোর মধ্যে সূর্যের ডুবে যাওয়া কোথায়?
মানুষ হাঁটছে – মাইল মাইল, মুনাষ তর্ক করছে – ঘন্টা ঘন্টা, আকাশের রঙ গোলাপি – তাতে কাক উড়ছে, কা কা, নারকেল গাছে নারকেল, সুপুরি গাছগুলো দুলছিল, পুকুরে ঢিল ছুড়লো বালক – তিরতির, টিভিতে খবর, খবরে মানুষ, তর্ক, ঘন্টা ঘণ্টা… এইসব শব্দ পাওয়া গিয়েছিল।
ঠাকুরদা চলে গেলেন লাঠি নিয়ে। বাবারা ক্লান্ত।
সূর্য ডোবার শব্দ পাওয়া মামুলি ব্যাপার না। আমরা বুঝেছিলাম। পাথর ছিল পাথরের মতো।
শরীর সাদাটে হয়ে যাওয়া, কিংবা চোখের তলার কালি ছাড়া অমলের অসুখের আর তো তেমন বিবরণ নেই। সে দুর্বল। দুর্বলতা আমাদের দেশে তো অভিমানের মতো, সকলেরই থাকে। তবু সে পলকা ছিল না। থাকলে অত কথা বলত কীভাবে? সে কথা বলছিল, আর আশপাশের সকলকে মোহিত করে তুলছিল। তার কথা, তাই, শুধুমাত্র কথা নয় – কথার অধিক। তার অসুখ, আসলে ভালো থাকা। তার সম্পর্কে যাবতীয় হাহাকার বা উদ্বেগ সেইকারণে আরোপিত। সে, অমল, যেন আন্তর্জাতিক বালক, এইখানে থেকেছিল কিছুদিন, তার আসল বাসা সমগ্র পৃথিবীটা – এখন অন্য দেশে যাবার আগে কিছু প্রয়োজনীয় বার্তালাপ সেরে নিতে চাইছে। যেন বৈদেশিক নীতি নিয়ে জটিল আলোচনা চলছে। রূপকের আদান এবং প্রদান চলছে। দরকারি ইঙ্গিতগুলো জানিয়ে রাখতে চাইছে। এই ইঙ্গিতগুলোর হদিস একমাত্র তার কাছেই ছিল। অন্য কেউ তা জানত না।
সন্ধের দিকে আবার বমি করল মেয়েটি। বমির পর সাধারণত জ্বর ছাড়ে। এবার সেটাও হলো না। ধুম জ্বর এলো। কাশি থামলো না। কাশির সঙ্গে রক্ত এলো। ফুসফুস ফেটে রক্ত পড়ল পাথরে। পাথর দেবী হলেন। বাবারা বাতাসা।
মেয়েটি অমল হলো। ইশারা দিল। বাঙলার কোন্‌ আদি গাঁয়ের মেঠো পথ এখানে অন্তর্মুখী। শুধুই নিজের মধ্যে ঢুকে যাওয়া। তার হাঁপ ধরে যাওয়া বক্ষভাঁজ, যন্ত্রণায় ধনুক হয়ে যাওয়া দেহরেখা – কোনো ধ্রপদী নৃত্যের মুদ্রা হলো না। বাবারা জানে, তাদের অমলেরা এতোই কৃপণ, যে অন্য ভাষায়, অন্যের সমস্যায় তারা অনূদিত হতে পারবে না কখনো। তার জ্বর, অসুখই। তার বমি, অপাচ্যই। কোনো বৃহতের মায়া নেই। পাশের বাড়ির মতোই স্বার্থপর। বজ্রপাত হলে বিদ্যুতের সংযোগ ছিন্ন হয় এখানে।
রাতটুকু অপেক্ষা করতে বলেছিলেন ডাক্তার। তার আগে বেশ কয়েকটি ফোন করা হলো। ফোন এলো গুটিকয়েক। কাশির দমক খানিক কমলেও ধুম জ্বর কমে না কিছুতেই। জলপট্টিতে কাজ হচ্ছে না। একবার কাশতে গিয়ে মাকে খামছে ধরেছিল। এখন ঘুমোচ্ছে। সাড়াশব্দ নেই।
জানালাটা খুলে দাও পাথর। আমাদের নিজস্ব রূপকেরা জ্যোৎস্না হয়ে গলে পড়ুক। সেই গুলঞ্চলতা, বন-চাতাল, ছায়া ছায়া মেঠো পথ, সেই ত্রিশূণ্যে ভাসমান স্বচ্ছ পর্দার মতো যা-কিছু – বন-ধুঁধুল, শিরীষ কিংবা কোঠাবাড়ি, তিত্তিরাজ গাছের দোলন বা স্নানযাত্রার বিবরণ – যা-কিছু পিতার কল্পনাকে বলিষ্ঠ করতে পারে – নেমে আসুক। মেয়েটি আড়াল হোক। অপাঠ্য হোক।
জানালায় পাপিয়া ডেকে উঠেছিল ভোররাতে। তখন আমরা যন্ত্রণায় কাতর। সেদিকে তাকাতে পারিনি।
লেখক পরিচিতি
সাদিক হোসেন
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন। গল্পকার। ঔপন্যাসিক। কবি।

2 thoughts on “সাদিক হোসেনের গল্প : জ্বর

  • June 18, 2022 at 9:19 pm
    Permalink

    আজকাল শারদীয়া 2021এ প্রকাশিত , পূর্বপ্রকাশিত হলে অনুগ্রহ করে উল্লেখ করবেন

    Reply
  • June 24, 2022 at 6:28 am
    Permalink

    সাদিক হোসেনের স্বপ্নসম ভাষ্য এক কঠিন বাস্তবে রক্তাক্ত হয়। জ্বরাক্রান্ত হয়ে ঠোঁটের কোণে রক্ত নিয়ে পড়ে থাকে। ফ্যাসিজমের জ্বর।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=