অনুবাদের নির্জনতা : ডেইজি রকওয়েলের সঙ্গে কথোপকথন

অনুবাদক : ঋতো আহমেদ
সম্প্রতি হিন্দি লেখক গীতাঞ্জলী শ্রী’র উপন্যাস ‘রেত সমাধি’র ইংরেজি অনুবাদ [টম্ব অব স্যান্ড] করেছেন হিন্দি এবং উর্দু সাহিত্যের লেখক এবং অনুবাদক ডেইজি রকওয়েল। তাঁর এই অনুবাদবইটি [টম্ব অব স্যান্ড] এ বছর [২০২২] আন্তর্জাতিক ম্যান বুকার পুরস্কার জিতেছে। এটিই প্রথম হিন্দি ভাষার উপন্যাস যা বুকার শর্টলিস্টে অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছিল। উপন্যাসটিতে ৮০ বছর বয়স্ক এক নারীর অতীত রোমন্থনের গল্প আছে। যে গল্পে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বর্ণনা রয়েছে। রয়েছে ভারত থেকে পাকিস্তান যাত্রার গল্প। কিশোরী বয়সের, দেশভাগের সময় ফেলে আসা তাঁর স্মৃতি আর মানসিক সেইসব আঘাতের সঙ্গে এই গল্প আমাদের মুখোমুখি করে দেয়। উপন্যাসে বর্ণিত বিষয়বস্তুগুলো যথেষ্ট ওজনদার ও গুরুত্বপূর্ণ, এবং সেই সঙ্গে কৌতুকময় ও নিরীক্ষামূলক এর শৈলী। এই কৌশলই পাঠককে চরম ট্র্যাজেডির মুখেও বইয়ের পৃষ্ঠায় আশ্চর্যভাবে ধরে রাখে।

ডেইজি রকওয়েলের অন্যান্য অনুবাদের মধ্যে উপেন্দ্রনাথ অশোকের ফলিং ওয়ালস [পেঙ্গুইন, ২০১৫], ভীষম সাহনির তামাস [পেঙ্গুইন, ২০১৮], খাদিজা মাস্তুরের দ্য উইমেন কৌর্টইয়ার্ড [পেঙ্গুইন, ২০১৮] আর কৃষ্ণ সোবতির অ্যা গুজরাট হেয়ার, অ্যা গুজরাট দেয়ার [পেঙ্গুইন, ২০১৯] উল্লেখযোগ্য। তিনি উপেন্দ্রনাথ অশোকের একটি জীবনীও লিখেছেন উপেন্দ্রনাথ অশোক: অ্যা ক্রিটিক্যাল বাইওগ্রাফি[কথা, ২০০৪] শিরোনামে। টেস্ট [ফক্সহেড বুকস, ২০১৪] নামে তাঁর একটি উপন্যাস আর দ্য লিটিল বুক অব টেরর [ফক্সহেড বুকস, ২০১২] নামে রয়েছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্পর্কে কিছু চিত্রকর্ম আর প্রবন্ধের একটি সংগ্রহ। তিনি নিউ ইংল্যান্ডে থাকেন।
মনোনীত হওয়ার পর, কিন্তু পুরস্কার ঘোষণার পূর্বে, ডেইজি রকওয়েলের এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন CJLC এর সম্পাদক কেনা চাউয়া।
[২৪শে মার্চ, ২০২২]

কেনা চাউয়া : 
২০২২ সালের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন তাই প্রথমেই অভিনন্দন জানাচ্ছি আপনাকে। স্বীকৃতিটি কেমন লাগছে আপনার?
ডেইজি রকওয়েল : 
একেবারে আশ্চর্য হয়ে গেছি, কারণ অনুবাদ হচ্ছে নির্জন কাজ, আর এ পর্যন্ত ভারতের বাইরে আমার কোনও বইও প্রকাশিত হয়নি। তবে এই বইটা একটু আলাদা কারণ এই প্রোজেক্টটি উদ্ভূত হয়েছিল ডেবোরা স্মিথের সঙ্গে, যিনি টিল্টেড এক্সিস প্রেসের কর্তা। অনুবাদক হিসেবে তিনিই প্রথম আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার জিতেছিলেন। কোরীয় থেকে ইংরেজি অনুবাদক তিনি; তাঁর অনুবাদের মধ্যে রয়েছে দ্য ভেজেটরিয়ান [মূল হান ক্যাং], এবং তিনিই টিল্টেড এক্সিস প্রেসের কার্যক্রম শুরু করেন। দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে তাঁর অগাধ আগ্রহ, ভারতে সময়ও কাটিয়ে গেছেন অনেক, রেত সমাধির [টম্ব অব স্যান্ড এর হিন্দি নাম] ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ইংরেজিতে গীতাঞ্জলী শ্রী’র আগের কিছু বইও পড়েছিলেন, আর মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন এই প্রোজেক্টটি হোক। আমি সাধারণত সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে কাজ করি না। আমার উদ্ভব আসলে এক পান্ডিত্যপূর্ণ পটভূমি থেকে, তাই আমার সমস্ত আগ্রহ বলতে গেলে ওই তথাকথিত “ক্ল্যাসিক” সাহিত্যের দিকে। তবে এই প্রোজেক্টটি করতে রাজি হওয়ার পেছনের একটি কারণ ছিল ভারতের বাইরে আমার কোনও বই প্রকাশিত হবে এই আনন্দ! দক্ষিণএশিয়ার অনুবাদের প্রতি যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশকদের একেবারেই কোনও আগ্রহ নেই। বলা হয়ে থাকে, প্রতিনিয়ত কেউ না কেউ কিছু না কিছু পায়, কিন্তু আসলে এটা একটা কথার ছলনা মাত্র। তাই আমি এই কাজটা শুধু আমার কাজের জন্যই করিনি, করেছি আমাদের অন্য সব কাজের জন্যও। আর, যে ব্যক্তিটি পুরো বিষয়টিকে একত্রিত করতে সাহায্য করেছিলেন তিনি হলেন অরুণাভ সিংহ, একজন বাংলা অনুবাদক, যিনি সত্যিই অসাধারণ; এ পর্যন্ত প্রায় আশিটি বইয়ের মতো অনুবাদ করেছেন। তিনিই আমার এই কাজ সমন্বয় করেছেন। এটা শুধু আমার জন্য, কিংবা কেবল হিন্দির জন্য বড় ব্যাপারই নয়, বরং আমাদের সকল অনুবাদকের জন্য, যারা সচেতনতা বাড়াচ্ছেন যে দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য শুধুমাত্র ইংরেজিতেই লেখা হচ্ছে না।
কেনা চাউয়া : 
আমার মনে হয় বিশ্ব সাহিত্যের প্রান্তরে, দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যিকদের মধ্যে যারা ইংরেজিতে লেখেন তাঁরা অনেকটাই বিশিষ্ট, হোন তাঁরা ডায়াস্পোরিক কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার। কিন্তু আপনি যেমন বলেছেন, এখানকার অনুবাদ সাহিত্য তেমন মনোযোগ পাচ্ছে না।
ডেইজি রকওয়েল : 
আমার মনে হয় না লোকেরা এর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে। আর তুমি যেটা বললে, হয়তো ইংরেজিতে লেখার জন্যই তারা[ডায়াস্পোরিক লেখকেরা] আমাদের অনুবাদ সাহিত্যকে প্রকাশিত হবার স্তরের বলে মনে করে না। তাদের ভাবখানা এমন যে, “ওসবে আমাদের প্রয়োজন নেই! ভারতকে আমরা পেয়ে গেছি [ইংরেজিতেই]!”
কেনা চাউয়া : 
আপনার কী মনে হয়, প্রকাশনা ব্যবস্থাপনায় এমন কিছু কি আছে, কিংবা প্রকাশনার ক্ষেত্রটি যেভাবে গঠিত রয়েছে তা কি অনুবাদ সাহিত্যের জন্য উপযোগী নয়?
ডেইজি রকওয়েল : 
নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, অনুবাদকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রকাশকদের কাছে খুব বেশি অনূদিত কাজ নেই, আর সাধারণত যে ক’টা করে তারা, সেগুলোতেও নতুন করে বাজিমাত করার কিছু নেই, কারণ ওগুলো ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে বেস্টসেলার হয়েছে। আর রয়েছে বইয়ের কভারে অনুবাদকের নাম নিয়ে বিতর্ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টা আরও বাজে—কেবলমাত্র অনুবাদকের নাম কভারে থাকা না-থাকাটুকুই না, আরও আছে। কখনওকখনও তোমাকে সত্যি এর কপিরাইট-পৃষ্ঠা খুঁজে দেখতে হবে আগে কোনও অনুবাদ হয়েছে কিনা। এমনকি কিছু বলতেও পারবে না। তারা হয়তো মনে করে পাঠকের বিষয়টা পছন্দ না, কিংবা তারা ভয় পায়।
আবার, ইউরোপে একেবারে ভিন্ন চিত্র। ফরাসিতে, স্প্যানিশে কিংবা ইতালীয় ভাষার দিকে তাকালে দেখতে পাই এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায়, কিংবা ইংরেজি থেকে ইউরোপের অন্য ভাষাগুলোয় অনুবাদ করতে ওরা প্রচুর অর্থ খরচ করছে। তবু আমার মনে হয় ইংরেজির হামবড়া ভাবই একটা সমস্যা। তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে ইংরেজির পাঠকদের ওইসব ভাষার বইগুলোর প্রয়োজন নেই। আমার মনে হয়, অ্যামেরিকার পাঠকেরা বাকি বিশ্ব সম্পর্কে একেবারে অন্ধ রয়ে যাচ্ছে কারণ তারা মনে করে সবসময় কেবল অ্যামেরিকার লেখকদের পড়লেই চলবে তাদের। নিজের উপর নিজেরই সৃষ্ট সঙ্কীর্ণতা এটা।
কেনা চাউয়া : 
অ্যামেরিকা একেবারেই এক বহুজাতিক, বৈচিত্র্যময়, সমাজ, আর এ জন্যই এখানকার লোকেরা মনে করে না তাদের প্রসারিত হওয়ার প্রয়োজন আছে, তারা মনে করে এর মধ্যেই অন্য জাতির সাহিত্য বা সংস্কৃতি থেকে পড়তে পারছে। বিষয়টা সত্যি যে অ্যামেরিকার লেখকেরা বৈচিত্র্যময়, তবে—
ডেইজি রকওয়েল : 
তবে সবাই যেন একই রকম, ব্রুকলিনই তাদের জগৎ!
কেনা চাউয়া : 
ঠিক তাই। আসুন আমরা টম্ব অব স্যান্ড এর অনুবাদের কথায় ফিরে আসি। বইটা অনেক বড়ো—কতোদিন লেগেছিল আপনার—কাজটা করতে গিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ সমূহ আর এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে গিয়ে যে বিষয়গুলো আপনাকে বিস্মিত করেছিল, সেসব নিয়ে কিছু বলুন।
ডেইজি রকওয়েল : 
হিন্দিতে বইটি এর চেয়ে অর্ধেক! তখন ঠিক বুঝতে পারিনি কতোটা বড়ো ছিল। জনি যে এ ব্যাপারে বলাটা আজব শোনাবে। তবে একজন বাঙালি অনুবাদক আছেন আমার বন্ধু, তিনি বলেন তার ইংরেজি অনুবাদ সাধারণত মুলের চেয়ে ২০% বেশি বড় হয়ে যায়। হতে পারে তা শব্দের আকারের ফাংশন কিংবা কোনও রহস্যময় কিছু। আমারও কথাটা সত্যি মনে হয়েছে। আমিও ভেবেছিলাম ২০% বাড়বে। কিন্তু এটা বেড়ে প্রায় দুগুন হয়ে গেছে। অবশ্য আরও কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, হিন্দি প্রকাশকেরা কাগজ বাঁচাতে চেয়েছিলেন হয়তো, তারা সমস্ত পর্যায়গুলো যথেষ্ট স্পেস না রেখে একসঙ্গে ছেপে দিয়েছিলেন, কিংবা আলাদা অধ্যায়ের জন্য আলাদা পৃষ্ঠা ভাঙেন নি। আমি ওই সমস্ত কিছুই ব্যবহার করেছি; বইটা অনেক ঘন, তাই এর ভেতর শ্বাস নেয়ার জায়গা প্রয়োজন হয়েছিল। তারপরও আমার মনে হয় না এগুলোই শুধু কারণ, একরকম রহস্য তো রয়েছেই। আবার টিল্টেড এক্সিস প্রেসের পেজ ফরম্যাটও কিছুটা ছোট আকৃতির। তাদের সব বইয়ে একই উচ্চতার ডিজাইন পছন্দ। তাদের সব বই ছোট উপন্যাস আর ছোট গল্পের সংগ্রহ। তারা সত্যি এমন বড়ো বই করেনি। তাই বইটা এমন ফোনবুকের মতো দেখতে হয়ে গেছে। বোধ করি এটাই অধিকাংশ পাঠককে ভয় পাইয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। কারণ তুমি তো দেখতে পাচ্ছ ইটের মতো কিছু একটা আর ভাবছ, “ওহ, এটা একটা প্রতিশ্রুতি।”
হ্যাঁ, আমার অনেক সময় লেগেছিল। আমি আসলে জানতামও না কতোটা বড়। কারণ তখন প্যান্ডেমিকে চুবে ছিলাম, সময় সম্পর্কে একেবারেই সজাগ ছিলাম না। যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগেছে। যতটা কঠিন মনে করেছিলাম তার চেয়ে অনেক কঠিন ছিল এই কাজ। যখন বইটি আমার কাছে পাঠানো হয়েছিল আমি আসলে দেখে হতবাক হয়ে গেছিলাম— কারণ, পুরোটা সম্পাদনা করেছি ওয়ার্ড ফাইলে যেখানে হয়তো ৫০০ পৃষ্ঠার মতো ছিল—কিন্তু যখন পিডিএফ করে আমার কাছে পাঠাল ওরা, তখন ওটা ছিল ৭০০ পৃষ্ঠারও বেশি। একেবারে হতবাক হয়ে গেছিলাম। ভাবলাম, “কোনও সন্দেহ নেই যে কাজটা অনেক পরিশ্রমের ছিল!”
আরেকটা কারণ হচ্ছে বইটার হিন্দি গদ্যের ধরনটা খুবই নিরীক্ষামূলক এবং স্বকীয়, আর এর অধ্যায়গুলো প্লট-সম্পর্কিত নয়, বরং অনেকটাই কাব্যিক। কাজটায় হাঁট দিয়ে ধীরে ধীরে আমি অনুধাবন করলাম এ যেন গদ্য নয় অনেকটাই পদ্যের অনুবাদ করছি, বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত পদ্য। মনে হয়েছিল যেন জেমস জয়েসের ইউলিসিস অনুবাদের মতো, কিংবা সেইরকমই কিছু একটা, যেখানে মূল লেখক তাঁর আপন ভাষা তৈরি করে নিয়েছেন তাই অনুবাদেও তোমাকে আলাদা অনুবাদের ভাষা তৈরি করে নিতে হবে। আর সেটা করা স্পষ্টতই বেশ রুক্ষ ছিল।
কেনা চাউয়া : 
উপন্যাসের বিভিন্ন অধ্যায় অনুবাদের মাঝখানে কখনও কি মনে হয়েছে আপনার মেজাজ বদল হচ্ছে বারবার?
ডেইজি রকওয়েল
হ্যাঁ, অবশ্যই মনে হয়েছে। হিন্দিতে, বইটিতে যেভাবে ইটালিক ব্যাবহার করা হয়েছে, আমিও সেটা করেছি। হিন্দিতে, কাব্যিক অংশগুলো ইটালিক। তবে আমি ভাবনাগুলোকেও ইটালিক করেছি, কারণ আমার মনে হয়েছে এইরকম কিছু হস্তক্ষেপ করা দরকার। আমি এক ধরনের সমসাময়িক ইংরেজি উপন্যাস-লেখার প্রচলনে ইটালিক ব্যবহার করেছি। তারপর ডেবোরা [স্মিথ] সমস্ত ইটালিক গুলো হস্তক্ষেপ করা অধ্যায়গুলো থেকে সরিয়ে দেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল দুরকম উদ্দেশ্যে ইটালিক ব্যবহার পাঠককে বিভ্রান্ত করবে। আমার মতে, ইটালিক অধ্যায়গুলো কবিতার মতো সম্পূর্ণ আলাদা অনুবাদ অনুশীলন ছিল। ওখানে অনেকগুলো শব্দের খেলা রয়েছে। [গীতাঞ্জলী শ্রী] চেয়েছিলেন ওগুলো ইংরেজিতে আবৃত্তি করে তাঁকে শোনাই আমি—আক্ষরিকভাবে না, বরং তিনি যেভাবে ব্যবহার করেছেন ঠিক ওইভাবে। ওটাও ছিল আরেকটা চ্যালেঞ্জ। যেহেতু আমি মৃত কিংবা প্রায় মৃত মানুষদের অনুবাদ করে অভ্যস্ত ছিলাম।
কেনা চাউয়া : 
কতোটা পুনরাবৃত্তিমূলক ছিল? আপনি কি তাঁর সঙ্গে বারবার ওই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন?
ডেইজি রকওয়েল : 
প্রথমবার নিজ হাতে লিখি, এরপর টাইপ করি, তারপর পুরো প্রক্রিয়াটা আবার করি। কখনও কখনও মনে প্রশ্ন জাগে, কিন্তু একটু পরেই আবার তার উত্তর পাওয়া যায় লেখার ভেতরেই। দুই থেকে তিনবার পুরো অনুবাদ পুনঃপাঠ করি। প্রতিটি অধ্যায় ধরে ধরে পুনঃপাঠ করি আর তাঁর কাছে জানতে চাইতে কিছু প্রশ্ন টুকে নিই। এইভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলে বলে আগ-পিছ করে কাজ এগিয়ে নিই। হাস্যকর যে মাঝে মাঝে তাঁর লেখা অস্পষ্ট আর প্রভাববাদী মনে হয়। আর তখন তাঁকে খোঁচা মারতেও ভুলি না। আমিও অস্পষ্ট আর প্রভাববাদী অনুবাদই করি কিন্তু তারপরও তাঁর কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া আরকি। তিনিও ইংরেজিতে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে লিখে পাঠান যে ওটাও অস্পষ্ট আর প্রভাববাদীই মনে হয়। তখন আমার অবস্থাটা দাঁড়ায়, “এখনও বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা কী এখানে।”
সবচেয়ে কঠিন একটা অনুচ্ছেদ ছিল যেখানে তিনি মানুষের মস্তিস্ককে জিলেপির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ওখানে বারবার প্রত্যেকটা বাক্য, প্রত্যেকটা শব্দ ধরে ধরে আলোচনা করে বুঝে নিয়েছি আমরা। ওটা একপ্রকার রসিকতা ছিল বুঝতে পেরে নিজেকে বুদ্ধু মনে হয়েছে পরে। সত্যিই মজার এক তুলনা। তবে আমি আসলে ঠিকভাবে বুঝে নিতে চেয়েছিলাম কোন মেকানিজমে তিনি ওটা বর্ণনা করতে চেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারি যদি ভুল না করি ওটা ছিল ফুরফুরে মেজাজের আর মজার। তুমি যদি পড়, তোমার হাসি পাবে। ম্নেই হবে না ওটা অতো শক্ত কিছু ছিল।
কেনা চাউয়া : 
আপনার আগের অনুবাদগুলোর মতো, যেমন বলছিলেন, আপনি কি মনে করেন সবকিছুই আপনার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে?

ডেইজি রকওয়েল : 
আমার অনেক বন্ধু আর সহকর্মী আছে যাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা হয়। অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ আছে উত্তর জেনে নেয়ার। কিন্তু আমি প্রায়শই ভয়াবহরকম একা। কেউ আমার ভুলগুলো শুদ্ধ করে দেবে না। এমনকি ভারতীয় সম্পাদকেরাও খুব ভালো হিন্দি জানেন না। তাই আমার এমন কেউ নেই যে আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে, তাই সবসময়ই আমাকে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে চেক করে দেখে নিশ্চিত হয়ে হয় আমি সঠিক রাস্তায় আছি কিনা। আমি নিশ্চিত কিছু ব্যাপারে আমার ভুল আছে, তারপরও আমি মনে করি অনুবাদ কেবলমাত্র শুদ্ধতার বিষয়ই নয়। এই কথাটা মনে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ। শব্দের-পর-শব্দ ধরে ধরে শুদ্ধতা তো একপ্রকার সমীকরণমাত্র। অনুভূতি আর নান্দনিক অভিজ্ঞতার নির্ভুলতাও গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক অনুভূতিকে পেতে মাঝেমধ্যে এর শাব্দিক অর্থও পরিবর্তন করে নিতে হয়। তাই আমি ভুল নাকি নির্ভুল এ নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। একটা পর্যায় পর্যন্ত ভেবে দেখি, এরপর ছেড়ে দিই।
কেনা চাউয়া :

উর্দু আর হিন্দির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে যদি কিছু বলেন, আর কীভাবে আপনি একজন অনুবাদক হয়ে উঠলেন সেটাও?

ডেইজি রকওয়েল : 
আমার হিন্দি ভাষা শেখা শুরু হয় কলেজে পড়ার সময়। আমি ভাষা নিয়ে পড়ছিলাম। ফরাসি আর জর্মন আমার আগেই শেখা হয়েছিল। আমার মেজর ছিল ক্লাসিক্যাল সাহিত্য। তাই আমাকে প্রচুর ল্যাটিন পড়তে হয়েছে। এরপর গ্রিক পড়ছিলাম। তখন কিছু একটা ঘুরে গেল আমার মাথার মধ্যে। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে আমাকে সমাজ বিজ্ঞান নিতে হয়। প্রফেসর ছিলেন সুজান রুডল্‌ফ। তিনি আর তাঁর স্বামী[লয়েড রুডল্‌ফ] দক্ষিণ এশিয়ার বিখ্যাত রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ। তাঁদের সমস্ত বই তাঁরা যৌথভাবে লিখেছেন। গল্প করতে গিয়ে বলেছেন তিনি আর তাঁর স্বামী কীভাবে প্রত্যেক চতুর্থ বছর ভারতে কাটিয়েছেন। তিনিই এমন একটি জানালা খুলে দিয়েছিলেন আমার জন্য! আপনি যখন ক্ল্যাসিক নিয়ে পড়ছেন, সবকিছুই সেখানে বাছাই করা। মানুষ শুধু এগুলোর উচ্চারণ চিহ্নের ব্যবহার বিশ্লেষণ করে। এই ধারার পুরো পরিক্রমায় আমি এক ধরনের অস্বস্তি বোধ করছিলাম। হিন্দি তখন আমার সময়সূচিতে মানানসই হয়ে এলো। এভাবেই হিন্দির সঙ্গে শুরু। আমি সত্যি ভাগ্যবান, গ্র্যাজুয়েট স্কুলের শুরুতেই, এ.কে. রামানুজানের সঙ্গে একটি অনুবাদ সেমিনারে অংশ নিতে পেরেছিলেম। যার অব্যবহিত পরই তিনি মারা যান। মাত্র তিন মাসে আমি তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পেরেছিলাম। খুবই আন্তরিক সেমিনার ছিল। সবাই বিভিন্ন ভাষা নিয়ে কাজ করেছি সেখনে। তাঁর কথাগুলো ছিল অদ্ভুতরকম অর্থপূর্ণ, যা আমার মাথায় দীর্ঘদিন ঘুরপাক খেয়েছে।
কেনা চাউয়া : 
আর কী কী মনে করতে পারছেন?
ডেইজি রকওয়েল : 
ওর মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছে : প্রতিটি ফুটনোট একেকটি ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। এর আংশিক কারণ তিনি বেশিরভাগ সময় কবিতা অনুবাদ করতেন। তাই সুন্দর একটি কবিতার নীচের দিকে পাদটীকা থাকা মানে তো গরম এক দলা জগাখিচুড়ি থাকা। আসলে তিনি বলতে চাইছিলেন তুমি যা ব্যাখ্যা করে বলতে চাও তা যেন যথাযথ হয়। যদি রচনাটি পাঁচশ পৃষ্ঠারও হয়, তবু ব্যাখ্যা দাবী করে এমন, এখানে সেখানে, কিছু তো থাকবেই। যাতে তোমার পণ্ডিতি মার্কা জিনিস দিয়ে পাঠককে আচ্ছন্ন করে না রাখো। এটা ছিল তাঁর অর্থপূর্ণ, খুবই বড়ো একটা কথা। তিনি আরও বলেছেন যদি তুমি দীর্ঘ কোনও কাজ করো—যা আমি প্রায়শ করি—তবে তো পাঠককে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ শেখানোর অবকাশ তোমার থাকবেই। যেমন রুশ উপন্যাস পড়লে, বিভিন্ন খাবারের নাম শিখতে পারবে, আর ওগুলোর বারংবার ব্যাবহার ওইসব নামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়ে যাবে তোমার।
এ ব্যাপারে মনে মনে আমি একরকম অনুসিদ্ধান্ত তৈরি করে নিয়েছি, সেটা হল, তেমন সুযোগ থাকলেও তুমি তার মাত্রাটুকু অতিক্রম কর যেতে পারো না। পাঠক যদি সত্যিকারভাবে নাই জানে নিজেকে জলাবদ্ধ মনে করবে। কেবলমাত্র ভারতে প্রকাশিত হওয়ায় আমার একটা সমস্যাও আছে। অনেক ভারতীয়র খুব উঁচু মানের শব্দভান্ডার রয়েছে। আমি সেই লেভেলটা সাধারণ রাখতে চেষ্টা করি। কারণ আমি চাই যে পাঠক হিন্দি জানেন না তিনিও যেন স্বচ্ছন্দে পড়তে পারেন, পাঠের আনন্দ নিতে পারেন। বলতে পারো এটা ভারসাম্যমূলক কাজ। আমি মনে করি যে শব্দগুলো শেখাতে চাই ওগুলো ছোট সোনার একেকটা দলার মতোই। বইয়ের ভেতর দিয়ে পাঠককে যোগান দিতে চাই। তবে এমন নয় যে পাঠককে এইসব শিখতেই হবে।
টম্ব অব স্যান্ডে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি হল সমাধি। শিরোনামেই আছে শব্দটা। সমাধির হাজারও অর্থ হয়। গীতাঞ্জলী টম্ব অব স্যান্ড নামটি পছন্দ করেন নি। তাঁর মতে, “বালির আবার সমাধি হয় কীভাবে?” তিনি ভেবে রেখেছিলেন মার্বেল বা গ্রানাইট জাতীয় কিছু। বলেছিলাম, “হ্যাঁ, ওরকম হলেই ভালো শিরোনাম শোনাত।” তুমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে দ্যাখো না, কীভাবে একটা সমাধি বালির হতে পারে? তবে হ্যাঁ, এমন একটা প্রশ্ন, এমন একটা কৌতূহল থেকেই পাঠকের বইটা পড়ার আগ্রহ জন্মাবে। শিরোনাম লেখার কৌশল সত্যি অন্যরকম অনুশীলন। কারণ তুমি পাঠকদের স্বাগতম জানাতে চাও, তাদের ভেতর বইটি পাঠের কৌতূহল জাগাতে চাও।
এ ক্ষেত্রে বইয়ের শুরুতে শিরোনামের পৃষ্ঠার পরের পৃষ্ঠায় আমি সমাধির একটা সংজ্ঞা দেয়ার চেষ্টা করেছি। বইটিতে সমাধি নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। ওই অনুচ্ছেদগুলোর একটিতে যেখানে তিনি বর্ণনায় গভীর হয়ে ওঠেন, ওখানে আমি খুব ধীরে পাঠককে শব্দটিকে বোঝানোর চেষ্টা করি। সাধারণ ইংরেজি দিয়েই শুরু করি। এমন নয় যে সেখানে বহু অতিরিক্ত গদ্য ঢুকিয়ে দিয়েছি, তবে আমি এর সংজ্ঞাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছি। ওখানে পুরো একটা প্যারাই আছে যেখানে এই কাজটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে করেছি আমি। সম্ভবত দু’শ পৃষ্ঠার পর। পরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কেন তা করেছি। তাঁর আপত্তির একটা কারণ হয়তো ছিল তিনি চাননি অমন ভর সম্পন্ন শব্দকে হারাতে যেটা অনেক অর্থবহ। আমি তাঁকে দেখিয়েছি যে আমরা অর্থবহতাকে হারাচ্ছি না, আবার পাঠককেও ভেতরে টানছি।
কেনা চাউয়া : 
সমাধির প্রধান সংজ্ঞাগুলো কী আসলে?
ডেইজি রকওয়েল : 
এর অর্থ হতে পারে গভীর ধ্যানের কোনও অবস্থা, যোগ-এর[ইয়োগা] চরম পর্যায়ে যা হয়, কিংবা যেন বুদ্ধ সমাধিতে অবস্থান করছেন, যেন হাজার বছর ধরে ধ্যান করে যাচ্ছেন। আবার, যদি তুমি দিল্লি যাও, সেখানে মহাত্মা গান্ধীর একাটা বড় স্মৃতিসৌধ আছে, ওটাকে বলা হয় গান্ধী সমাধি। সমাধি হতে পারে কোনও কবর কিংবা শেষ আশ্রয়-স্থান। রেত সমাধি মানে হচ্ছে মনে করো কেউ মরুভূমির প্রান্তরে বসে ধ্যান করছে আর তার সমস্ত শরীর বালিতে ঢেকে গেছে এমন। এইরকমই কিছু একটা চিত্র স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অল্প কথায় কীভাবে তুমি এটা বোঝাতে পারবে? টম্ব অব স্যান্ড কথাটা তোমাকে এমন এক বিন্দুতে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে তুমি জানতে চাইবে। প্রশ্ন জাগবে তোমার মনে।
কেনা চাউয়া : 
একটু আগে বলছিলেন আপনি বিভিন্ন ভাষা শিখেছেন। হিন্দি ভাষা শেখার ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করবেন?
ডেইজি রকওয়েল : 
আমার কাছে ভাষা হচ্ছে অনেকটাই মানুষদের মতো। কাউকে ভালোবাসা যায়, কাউকে ঘৃণা করা যায় আবার কারও কারও সঙ্গ ঠিক ভালো লাগে না। আমার ব্যাকরণ শিখতে ভালো লাগে। এমন নয় যে অন্য ভাষার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শিখতে ভালোবাসি আমি, বরং আমার আগ্রহ ভাষার মোদ্দা কথায়। এজন্য আমার ক্ল্যাসিক্স পছন্দ। তাই ব্যাকরণের এই ধরনের শ্রমসাধ্য শব্দবিশ্লেষণ এবং এমন আরও কিছু বিষয় আমি খুব উপভোগ করেছি।
হিন্দি ভাষার যে ব্যাপারটি আমাকে টানে তা হলো এর বিশালতা। ইংরেজির মতো এটাও একটা ব্যাপক ভাষা, অনেক মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। এটা একটা বিগ ব্লাউজি ভাষা যার অনেকরকম প্রকাশ রয়েছে। ইংরেজি, ফারসি, পর্তুগিজ, সংস্কৃত থেকে শুরু করে অন্য অনেক ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করার ক্ষমতা এর আছে। ইংরেজির মতোই দারুণভাবে সব শুষে নিতে পারে নিজের ভেতর।
হিন্দি ভাষার সাহিত্য প্রচুর নিরীক্ষামূলক কারণ এটা উর্দুর থেকে বিচ্ছিন্ন খুব বেশি আগে হয়নি, এই ধর ১৯০০ সালের দিকে— উর্দু সাহিত্য অনেকটাই প্রমিত। উর্দু নয়, সবাই বুঝতে চাইছিল ভাষা হিসেবে হিন্দি আসলে কেমন। তারা ভোজপুরী, রাজস্থানী, বিহারী, পাঞ্জাবী সহ ভারতের বিভিন্ন ভাষা থেকে উপকরণ নিয়ে একটা আঞ্চলিক স্বাদ আনার চেষ্টা করছিলেন। প্রকাশভঙ্গিতে লোকজ ভাব আনার প্রচেষ্টা ছিল। হিন্দি সাহিত্যকে আয়ত্তে আনা বেশ শক্ত। এর জন্য চাই এই বিষম অঞ্চল সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান। ক্লাসে যা শেখা যায় তা খুবই সামান্য ‘খারি বলি হিন্দি’ [প্রমিত হিন্দি]।
মজার কথা হোলো আমি উর্দুর চেয়ে হিন্দি বেশি শিখেছি, কারণ উর্দু শেখা সহজতর ছিল, একদম পরিষ্কার মতো। ব্যাকরণ আর সমস্ত শব্দের অর্থ অভিধানে পাওয়া যায়। আমার অধ্যাপক বলতেন উর্দু অনেকটা ফরাসির মতো আর হিন্দি স্প্যানিশ। এর মানে হচ্ছে স্প্যানিশ ছড়িয়ে আছে পুরো ল্যাটিন অ্যামেরিকা জুড়ে, একে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, কারণ এর উন্মত্তরকম শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে ওই মহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শব্দের মাধ্যমে। অন্যদিকে ফরাসিদের আছে ফ্রেঞ্চ একাডেমি, যা ওই ভাষাটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
কেনা চাউয়া : 
উপভাষা এবং আপনার অনুবাদের পরিপ্রেক্ষিতে এমন কিছু কি আছে, যা শেষ করতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল আপনাকে?
ডেইজি রকওয়েল : 
অশোক, কৃষ্ণ সোবতি, ভীষম সাহনি এগুলো সব পাঞ্জাবী। অনেক পাঞ্জাবী অনুবাদ করতে ভালো লেগেছে আমার। এমন নয় যে আমি খুব পাঞ্জাবী জানি, তবে তালগোল পাকিয়েও আমি আমার পথ করে নিতে পেরেছি। তাদের কোনও বই পুরো পাঞ্জাবীতে নেই, তবে সেখানে কিছু বক্তব্য আর নির্দিষ্ট কিছু শব্দভাণ্ডার থাকে যা তারা পাঞ্জাবীতে লিখেছেন।
দেশভাগ নিয়ে সাহিত্যে আমার আগ্রহ সবসময়ই ছিল, কারণ সেখানে ওইসব অঞ্চলের ওই সময়কার সুস্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। হিন্দিতে প্রথম যে উপন্যাসটি পড়েছিলাম, ওর নাম ঝুটা সাঁচ, দেশভাগের গল্প। এর দুটো পর্ব। প্রথম পর্ব লাহোরের। তাই বইটিতে একদম বিলীন হয়ে গেছিলাম। লাহোরের রাস্তাগুলোরও পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা রয়েছে। বইটি পড়া শেষ করে নিজেকে সেই মানুষদের কাতারের মনে হয়েছে যারা কখনও প্যারিস না গিয়েও প্যারিসকে ভালো চেনেন। এখন আমি লাহোর গিয়েছি। কিন্তু আমার মনের মধ্যে সেই লাহোরই গেঁথে রয়েছে। হিন্দি আর উর্দুতে লাহোর নিয়ে অনেক বই আমি অনুবাদ করেছি। যেখানে রয়েছে আমার হৃদয়।
কেনা চাউয়া :
দেশভাগের কাল সম্পর্কে আপনার এতো আগ্রহ কেন?
ডেইজি রকওয়েল :
অনেকেরই ভালো লাগে না। তারা দেশভাগের সাহিত্যে বীতশ্রদ্ধ। কিন্তু এসব সাহিত্যর গঠনগত আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, এক আকস্মিক মুহূর্তে সবকিছু বদলে যায়। এতদিনের গড়ে ওঠা জগত্‌ যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। মানুষের শিকড় উপড়ে যায়। ভাগ্য বদলে যায়। পরিবার ভেঙে যায়। সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে, সম্পূর্ণ রূপান্তরের এমন এক মুহূর্তের দেখা পাওয়া যায় যেখানে চরিত্রগুলোর পুনর্গঠনের অফুরন্ত সম্ভাবনা থাকে। মজার ব্যাপার হল, অশকের বইগুলো দেশভাগের না, ওগুলো ত্রিশের দশকের। তবে আমার কাছে ওগুলো দেশভাগের বইয়ের মতোই। কারণ তিনি ওগুলো লিখেছিলেন উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে। তাই তাঁর লেখায় দেশভাগের ঠিক আগের জীবনের বিস্তারিত অবিশ্বাস্য চিত্রায়ন রয়েছে। সামান্য দূরত্বের জলন্ধর আর লাহোর ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে গেল। খুব সহজেই তখন ট্রেনে লাফিয়ে উঠে কিংবা বাসের পেছনে ঝুলে লাহোর যাওয়া আসা করা যেত। প্যারিসের মতো, লাহোরই ওদের জন্য বড় শহর ছিল। তখন ওখানে গিয়েই মানুষ কলেজে ভর্তি হোতো, শিল্প-সাহিত্যে ভালোবাসা জাগত। এমন এক হারানো শহর আর সেই ঐতিহাসিক সময়কে নিয়ে মুগ্ধ আমি।
কেনা চাউয়া : 
অনুবাদ নিয়ে আপনার একটা সিদ্ধান্ত ছিল, যেটা আপনি আগেও কয়েকবার বলেছিলেন, আপনি আরও অনেক নারী লেখকদের সাহিত্য অনুবাদ করতে চান। আপনার এমন সিদ্ধান্তের কারণ কি?
ডেইজি রকওয়েল : 
নারী লেখকদের বই পড়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ওই কথাটাও এসেছে। ডায়েট গ্রহণ করার মতোই আকর্ষণীয় ব্যাপারটা। প্রথমে মনে হয়েছিল তেমন করাটা কঠিন হবে, পড়ে দেখলাম না, তেমন শক্ত কিছু না। আগের কথা ভেবে দেখলে মনে হবে সব কিছু ছিল ধারাবাহিক। পুরুষের দৃষ্টি খুবই বাস্তবধর্মী। ওই দৃষ্টিকোণ কতোটা গ্রহণ করছি আমরা, বিরক্তিকর মনে হয়। পুরুষ লেখকদের লেখা এক বছর একেবারে না পড়ে হঠাত্‌ পড়তে নিলে তখন টের পাওয়া যায় আসলে এতদিন কী সহ্য করে আসছিলাম আমরা। বিস্ময় জাগে কীভাবে তা পারছিলাম। হ্যাঁ, আমি প্রায় এক বছর কঠোর ছিলাম। এরপর মুরাকামির একটা নতুন উপন্যাস পড়তে নিলাম, কারণ আগে মুরাকামি পড়তে সবসময় ভালো লাগতো। বইয়ের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ছিল সেই স্তন , নারী চরিত্রের প্রথম বৈশিষ্ট্য। তাঁর ব্যাপারে আগে কখনও এমনটা খেয়াল করিনি। মনে হল তিনিও অন্যদের মতোই বাজে।
কেনা চাউয়া : 
স্নাতক হওয়ার পর আমিও এমন করতে চেয়েছিলাম এবং কেউ আমাকে আর বই দিতে পারেনি।
ডেইজি রকওয়েল : 
পূর্বের কথা মনে করে বুঝতে পারি, কখনও ওসব ভালো লাগে নি আমার, শুধু সহ্য করতে হবে বলেই মেনে নিয়েছি। অনুবাদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। আমি একজনকে জানি, যিনি বাংলা থেকে অনুবাদ করেন, একজন নারী, তিনি তাঁর করা কিছু অনুবাদের কথা বলছিলেন। আমি খেয়াল করে দেখলাম তাঁর অধিকাংশ অনুবাদই নারী লেখকদের রচনা। আমি সবসময় নারীদের কথা নারীদের রচনা তুলে ধরতে চেয়েছি, কিন্তু যখন দেখলাম সেইভাবে নারী লেখকদের কোনও রচনাই অনুবাদ করা হয়নি আমার, তখন নিজেকেই আজব মনে হয়েছিল।
শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের দৃষ্টিভঙ্গির দিকে তাকানো সত্যিই আকর্ষণীয়। দ্য উইমেন কৌর্টইয়ার্ড এর উত্তরভাষে এ বিষয়ে লিখেছি আমি। কারণ ওটাই ছিল চূড়ান্ত উদাহরণ। সেখানে উপন্যাসটির ঘটনাচক্র কখনও নারীর আঙিনা ছেড়ে অন্য কিছুতে যায় না, যারে বলা হয় অঙ্গন। এভাবেই নারীরা সর্বসাধারণের জগত্‌ থেকে আলাদা। পুরুষেরা আসে যায়। এমনকি অন্য নারীরাও আসে যায়। কিন্তু ওর প্রধান চরিত্রকে কখনও অঙ্গন ছেড়ে বাইরে যেতে দেখা যায় না। এই উপন্যাসটি অন্যরকম এক নিরীক্ষা, যেখানে একটা প্রশ্ন প্রচ্ছন্ন রয়েছে যে যদি কেবল মহিলাদের জগতটাকেই উপস্থাপন করা হয় তবে কেমন হয় উপন্যাস? পশ্চিমে, নারীরা অনেক বেশি স্বাধীন হলেও, ফ্ল্যানিওর উপন্যাসটি নিয়ে একটি বড় বিতর্ক রয়েছে, যেখানে একজন যুবক রাতে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। তুমি একজন নারীকে নিয়ে অবশ্য এ ধরনের আখ্যান লিখতে পারবে না। এর বিভিন্ন মাত্রা আছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যে কিংবা এর বাইরেও এ বিষয় নিয়ে অন্বেষণ বেশ ইন্টারেস্টিং।
কেনা চাউয়া : 
মনে হচ্ছে এখন আর আপনি আগের মতো কঠোর অবস্থানে নেই আপনার পুরুষ-লেখক পলিসিতে? তবু, এখনও কি কম আকর্ষণ করেন ওঁরা আপনাকে?
ডেইজি রকওয়েল : 
মূলত, আমি আর তাঁদের পড়িই না। মাঝে মধ্যে কেবল একজনকেই পড়ি—ইশিগুরো, পছন্দ করি তাঁকে, তিনি দারুণ, তবে নারীবিদ্বেষী নন। তাঁর একটি বই পড়ে আমি কোনও অস্বস্তি বোধ করিনি। আর এখন, আমার কাছে পাঠের লম্বা এক তালিকা রয়েছে, তবু আমি ঠিক করেছি তাঁর অন্য বইগুলোও পড়ব। তবে সর্বপরি, পুরুষ লেখকদের লেখায় যৌনাচার নারী লেখকদের চেয়ে বেশি।
কেনা চাউয়া : 
জেন্ডার সীমাবদ্ধতাটুকু ছাড়া আপনি আর কী কী পড়তে চান?

ডেইজি রকওয়েল : 
সারা বিশ্বের নারী অনুবাদকদের অনুবাদ পড়তে চাই। চূড়ান্ত লকডাউনের সময় আমি খুব চাপে ছিলাম। একটা জিনিসই তখন স্বস্তির ছিল, ইংরেজ নারীদের রচনা—১৯৪০ এর দিকের, বারবারা পিম, রসকষহীন সামান্য ব্যাঙ্গাত্মক বর্ণনা, চরিত্ররা সেখানে চা পান করতে করতে একে অপরকে কটূক্তি করছে। সেই সময়, প্রচুর ইংরেজি হত্যারহস্যের বইও পড়েছি। ওই ব্রিটিশ নারী লেখকদের রচনায় প্রশান্তি খুঁজে পেয়ে আমার মানসিকতার কিছু অংশ যেন উন্মোচন করতে পেরেছিলাম মনে হয়। ওসব পাঠ এখন বন্ধ, একপ্রকার স্থিতাবস্থায় ফিরে এসেছি আবার।
কেনা চাউয়া : 
গতবছর বুকারের জন্য মনোনীত হয়েছিল অ্যা প্যাসেজ নর্থ বইটি, আমি এর লেখকের একটা সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম, অনুক অরুদপ্রগাসম, বলেছিলেন তিনি বছরে মাত্র একবার একটাই মূল ইংরেজির বই পড়েন। এ ছাড়া আর যা পড়েন সবই অনুবাদ। সেইরকমই আপনিও আপনার পাঠাভ্যাসে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।
ডেইজি রকওয়েল : 
হ্যাঁ, তেমন সীমারেখা আমারও আছে, কেবল ওই ব্রিটিশ নারী লেখকদের ব্যাপারটা ছাড়া। সাধারণত, আমি যখন কোনও বইয়ের দোকানে যাই, অনুবাদ বই একটু দেখেই নিজের বোঝার স্ক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করি যে ওটা মূলানুগ কিনা। প্রেসের নান্দনিকতা বলতেও এমন কিছু আছে যা কেবলমাত্র অনুবাদই করতে পারে, করে।
কেনা চাউয়া : 
আমার খুব সুন্দর লাগে।
ডেইজি রকওয়েল : 
হ্যাঁ, তবে বইয়ের দোকানগুলোয় সাধারণত অনুবাদবই আলাদা সাজিয়ে রাখে না। ওদের খুঁজে বের করতে হয়। আমি অনুবাদবই খুঁজে বেড়াই সবদিকে, বিশেষ করে আরও পড়তে চাই এশিয়ার বই।
কেনা চাউয়া : 
আমাদের সাময়িকীর এবারের থিম হচ্ছে—অনুবাদে নারী— আমার সতীর্থ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য থেকে অনুবাদ করতে খুবই আগ্রহী। কিন্তু আমার বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। আপনি কি কোনও পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন আদৌ— বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে না হোক, অন্তত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে?
ডেইজি রকওয়েল : 
আমি তো আমার অনুবাদ কর্মেই ডুবে আছি। তবে দেরীতে হলেও অনেকেই আমাকে বলতে শুরু করেছে। “অনুবাদের দিন খুলেছে। এখন শুধু অনুবাদ।” অনুবাদে অনেক সাহিত্য পুরস্কারের প্রচলন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বুকারের বর্তমান প্রকাশ তো মাত্র ছয়/সাত বছর ধরে। এর আগে কেবল একটাই পুরস্কার দেয়া হোতো বুকারে, সেটা হয় মূল সাহিত্য অথবা অনুবাদ। কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে। ইংরেজি আর অনুবাদের জন্য পুরস্কার ভাগাভাগির প্রচলন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার অনুবাদকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ পুরস্কার দুভাগে ভাগ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও একসময় একটাই পুরস্কারের প্রচলন ছিল। কিন্তু সেখানেও এখন নতুনভাবে বিগত চার বছর ধরে অনুবাদ সাহিত্যের জন্য জাতীয় গ্রন্থ পুরস্কারের প্রচলন হয়েছে। এখন সেখানে এই ধরনের পুরস্কারের পাশাপাশি বইয়ের মলাটেও অনুবাদকের নাম রাখার আন্দোলন শুরু হয়েছে। #TranslatorsOnTheCover হচ্ছে সেই হ্যাসট্যাগ।
জেনিফার ক্রফ্‌ট এই আন্দোলনে বেশ সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন। তিনি অউলগা টোউকারএ অনুবাদের জন্য ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক ম্যান বুকার জিতেছিলেন। তাঁর বড় একটা প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। তিনি সেটা ব্যবহার করছেন। প্রকাশকদের তীব্র ভর্ত্‌সনা করছেন। তাই এখন অনুবাদকের রয়্যালটি পাবার বিষয়টি গতি পেয়েছে। ভারতে সবসময়ই রয়্যালটি পাবার সক্ষমতা আমার আছে। তবে সেটা ভারতীয় রুপিতে। কিন্তু ওটাই যথেষ্ট নয়। আক্ষরিক অর্থে ওঁরা আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করেছেন।
কেনা চাউয়া : 
এটাই তো মূলনীতি!
ডেইজি রকওয়েল : 
হ্যাঁ, ঠিক তাই। এইরকম অনেক আন্দোলন এখন হচ্ছে—অনুবাদকেরা তাই মাথার উপর ছায়া খুঁজে পেয়ে আপন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও অনেকে একটিভ আছেন। আমি লক্ষ করেছি এই তালিকাটি এখন অনেক বড়। অনুবাদকদের অনেকগুলো কার্যকর গ্রুপ আছে সেখানে। একধরনের প্রকৃত’র প্রেম এখনও আছে, তবে এমন পাঠকও হয়তো কম না যারা অনুবাদ সাহিত্যকে পছন্দ করেন। ঠিক জানি না আমি।
বুকারে ছায়া কমিটিও আছেন। যারা ওই দীর্ঘ তালিকার সব খুঁটিয়ে পড়েন। সেখান থেকে নিজস্ব ছোট তালিকা করে নেন। এবং স্পষ্টতই, আমি শুনেছি তাঁরা পুরস্কার অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকেন। একজন প্রতিনিধি হিসেবে আসেন এবং বেছে নেয়া লেখকের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন।
কেনা চাউয়া :
 বিশেষ কেউ কি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন?
ডেইজি রকওয়েল : 
হ্যাঁ, অস্কারের মতো অনুষ্ঠানে যেমন হয়! এক অভিনব ভোজসভার আয়োজন, আর সেখানে সমস্ত তারকা সাহিত্যিকগণের উপস্থিতি। তাই তাঁদের অবশ্যই আমন্ত্রণ জানাতে হয়। প্রকৃত কমিটিকে দেখেছি ছায়া কমিটিকে এসব রিটুইট করতে।
কেনা চাউয়া : 
আচ্ছা, তাহলে একটা যোগসূত্র রয়েছে ওখানে।
ডেইজি রকওয়েল : 
হ্যাঁ, অনুবাদ সাহিত্যিকেরা খুবই সদাশয় হন। কারণ তাঁরা তারকা সাহিত্যিকদের মতো সিংহ সেলিব্রেটি নন।
অনুবাদক পরিচিতি
ঋতো আহমেদ
ঢাকায় থাকেন।
অনুবাদক। প্রবন্ধকার। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=