স্যালি রুনি’র গল্প : আলো ছায়া

ও’ হেনরি পুরস্কারপ্রাপ্ত গল্প:

অনুবাদ: এলহাম হোসেন

র ভাইয়ের গাড়িতে যখন উঠছিল তখন ও তাকে প্রথমবার দেখে। ও বসেছে পেছনের সিটে। আর সামনে সে উঠে বসে পড়ে সামনের সিটে। তারপর দরজাটা লাগিয়ে দেয়। এরপর সে ওকে দেখতে পায়। মাথাটা চারপাশে ঘুরিয়ে, ভ্রু উঁচিয়ে দেখে নেয়, তারপর ডিক্ল্যানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “ও কে?”

“ও তো অ্যাইডান। আমার ভাই,” ডিক্ল্যান বলে।

“আমি তো জানতাম না যে, তোমার ভাই আছে,: সে মৃদু স্বরে বলে।

যেন কথা বলতে বাধ্য হয়েই ওর দিকে ঘোরে। তারপর জিজ্ঞেস করে, বড়, না—কি ছোট?

আমি? আমি ছোট।

গাড়ির ভেতরটা অন্ধকার। চোখ দু’টো ছোট করে নিয়ে উপসংহার টেনে বলে, ওহ, আচ্ছা।

ও আমার মাত্র এক বছরের ছোট, ডিক্ল্যান বলে।

জানালার কাচ নামানোর জন্য মহিলা একটু ঘুরলো। দরজার ছোট লিভারটি ব্যবহার করে তাকে কাচটি নামাতে হলো।

তোমাদের বাবা—মা বেশ তাড়াহুড়ো করেছেন, সে মন্তব্য করে।

তোমাদের ছাড়াও আর ক’জন আছে?

শুধু আমরাই, ডিক্ল্যান বলে।

তাহলে তাঁরা তো খুব তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফেলেছেন, সে বলে। সমঝদার।

পার্কিং স্পেস থেকে বেরিয়ে ডিক্ল্যান মূল সড়ক ধরে এগোতে লাগলো। রাতের ঠান্ডা বাতাস জানালা ঠেলে হু হু করে ভেতরে ঢুকছিল। মহিলাটি একটি সিগারেট ধরায়। এইড্যান শুধু তার মাথার পেছনের অংশ, বাম বাহু আর বাঁকা কনুই দেখতে পায়।

আমি একে বাসায় নামিয়ে দিয়ে তোমার সঙ্গে ড্রাইভে যাব, ডিক্ল্যান বলে।

তোমার কথা শুনে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল, মহিলা বলে।

ওদের ডান দিকটায় বাড়িঘর আর দোকানপাট। ওরা শহরের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছলে ওগুলো দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। এরপর ক্যারাভান পার্ক এবং গলফ লিংক। মহিলা কি ইতোমধ্যে জেনে গেছে যে, অ্যাইডানকোথায় থাকে? ওখানে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে, সে—ব্যাপারেও মনে হয় ওর কোন কৌতুহল নেই। সে জানালার বাইরে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে থাকে। অন্ধকারে গলফ মাঠটি ঝলমল করতে থাকে।

অ্যাইডান, তুমি কী কর? দুই—এক মিনিট পরে সে জিজ্ঞেস করে।

আমি হোটেলে কাজ করি।

ওহ, তাই নাকি? তুমি ওখানে কত দিন কাজ করছ?

অল্প কয়েক বছর, ও বলে।

ওখানে কাজ করতে ভালো লাগে?

সবঠিক আছে।

সিগারেটের শেষাংশ সে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর জানালার কাচ তুলে দেয়। গাড়ির ভেতরটা বেশ সুনসান, নিস্তব্ধ। কারও কোন সাড়া—শব্দ নেই। ডিক্ল্যান কিছুই বলে না। অ্যাইডান ওর বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের অমসৃণ অংশে মৃদু কামড় দেয়। ও কি জানতে চাইবে, সে আসলে অর্থ উপার্জনের জন্য কি কাজ করে? কিন্তু সে তো ওর নাম পর্যন্ত জানে না। ডিক্ল্যান সম্ভবত বিষয়টি আঁচ করতে পারে। বলে, পলিন একজন লেখিকা।

ও আচ্ছা, অ্যাইডান বলে। আপনি কী লেখেন?

সিনেমার স্ক্রীপ্ট, সে উত্তর দেয়।

কতিপয় কারণে অ্যাইডান অবাক হয় না। যদিও ওর মনে পড়ে না আগে কখনও কোন স্ক্রীপ্ট রাইটারের সঙ্গে একই গাড়িতে ভ্রমণ করেছে কিনা। ও শুধু বলে, ‘হুম’। সে যেন বলে ওঠে, ওহ এই সেই তুমি। পলিন অভাবে ওর দিকে তাকায়। ও দেখে, পলিনের চুল সামনের দিক থেকে একটি মখমলের ব্যাণ্ড দিয়ে টেনে পেছনের দিকে এনে সাজানো হয়েছে। তার চোখে—মুখে অদ্ভূত এক হাসির স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে।

কী? পলিন প্রশ্ন করে। তুমি আমাকে বিশ্বাস করছ না।

পলিনকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে কিনা, তা ভেবে ও ঘাবড়ে গেল। ভাবল, ডিক্ল্যান হয়তো পরে ওর সঙ্গে রাগারাগি করবে।

অবশ্যই আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, সে বলে। কেন করব না?

কয়েক সেকেন্ড সে কিছুই বলল না, তবে গাড়ির ভেতরের নীরবতা আর অন্ধকার ভেদ করে সে ওর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। আসলে সে ওর ঠিক চোখে চোখে তাকিয়ে রইল। দুই, তিন অথবা চার সেকেন্ড হতে পারে। বেশ অনেক লম্বা সময়। এভাবে সে কেন ওর দিকে তাকিয়ে আছে? ওর মুখমণ্ডলে বিশেষ কোন অভিব্যক্তি নেই। পলিনের কপালটা ফ্যাকাশে। ঠোঁট দুটোও। কাজেই ওর মুখটি সুক্ষ্ম রেখার মতো দেখায়। সে কি তাহলে তাকে তার মুখটি দেখানোর জন্য, অর্থাৎ একজন স্ক্রীপ্ট রাইটারের মুখ দেখানোর জন্য তাকিয়ে আছে? সে যখন কথা বলে তখন তার কণ্ঠ পুরোই আলাদা মনে হয়। সে শুধু বলে, ঠিক আছে। আবার ওর দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়।

যাত্রার বাকি পথে সে আর ওর সঙ্গে কথা বলে না। পলিন আর ডিক্ল্যান যেসব লোকজন ও ব্যাপার—স্যাপার নিয়ে কথপোকথন আরম্ভ করে সেসববিষয়ের সঙ্গে অ্যাইডানের তেমন কোন যোগাযোগ নেই। ওর কাছে মনে হয়, ওরা যেন নাটক করছে। আর ও হলো সেখানে একমাত্র শ্রোতা। ডিক্ল্যান পলিনের কাছে জানতে চায়, ও কবে প্যারিসে যাচ্ছে। সেও জানায়। ফোনটা বের করে। ওকে দেখানোর জন্য একটি ছবি খুঁজতে থাকে। ডিক্ল্যান বলে, মাইকেল নামের কেউ একজন আর ফিরে আসবে না। পলিন আশ্বস্ত করে বলে, ওহ, মাইকেল আসবে। চিন্তা করো না। বাইরের অন্ধকারে শুধু গাড়ির হেডলাইটগুলো কালো লেখার মাঝে যতিচিহ্নের মতো। দূরে পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে আছে। সেই পাহাড়গুলোর গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলো থেকে আলো ঠিকরে বের হয়ে গাছের পাতার আড়ালে লুকোচুরি খেলছে। অ্যাইডানের মনে কী এক গোপন আবেগের খেলা চলতে থাকে। কিন্তু সে জানে না কী সেই আবেগ। ও কি বিরক্ত? কেন সে বিরক্ত হবে?

ডিক্ল্যান বাম পাশের পথ ধরলো। রাস্তার আলোগুলো উজ্জ্বলতর হতে লাগলো। পৃথিবীটা আবার জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে সেখানে ছড়ানো বাড়িঘর, চাকাওয়ালা ডাস্টবিন আর পার্ক করে রাখা গাড়িতে ভরে উঠতে শুরু করে। অ্যাইডানের বাড়ির সামনে ডিক্ল্যান গাড়ি থামায়।

লিফ্ট দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, অ্যাইডান বলে। ভালো একটা ঘুম দাও।

পলিন ফোন থেকে মুখ তোলে না।

*

কয়েক সপ্তাহ পর অ্যাইডানপলিনকে আবার তার হোটেলে দেখতে পায়। এক রাতে সে একদল লোক সঙ্গে করে নিয়ে ডিনার করতে আসে হোটেলে। আগে সে ওদের কখনও দেখেনি। এবার আর ওর মাথায় হেয়ারব্যান্ড নেই। চুলগুলো উঁচু করে মাথার ওপর একটা ব্যান্ড দিয়ে আটকানো। তবে সে নিশ্চিত, এটি সেই মহিলা। এইড্যান টেবিলে এক বোতল পানি পরিবেশন করে। পলিন কথা বলছে, আর সবাই ওর কথা শুনছে। শ্রোতাদের মধ্যে তার চাইতে বেশী বয়সী স্যুট পরা লোকও আছে। সবাই ওর কথায় মুগ্ধ হয়ে গেছে বলে মনে হয়। এমন একরত্তি একটি মেয়ের কথা বয়স্ক লোকেরা এভাবে শুনছে দেখে এইড্যানের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হয়। সে কি বিখ্যাত, নাকি গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি ভেবে সে ধন্দে পড়ে গেল। পলিনের গ্লাসে জল ভরিয়ে দিতে দিতে সে বলে, ধন্যবাদ।

তারপর ভ্রু কুচকায়।

আমি কি তোমাকে চিনি? পলিন বলে।

টেবিলে বসা সবাই এইড্যানের দিকে তাকায়। সে বিস্ময় বোধ করে। আমার মনে হয় আপনি আমার ভাই ডিক্ল্যানকে চেনেন। কথাটা শুনে সে এমনভাবে হাসে যেন এইড্যান মজার কিছু একটা বলেছে।

ওহ, তুমিতাহলে ডিক্ল্যান কিয়ার্নির ভাই, সে বলে।

এবার সে তার বন্ধুদের দিকে ঘুরে বলে, আমি তো আপনাদের আগেই বলেছিলাম যে, আমি স্থানীয় সবাইকে চিনি।

ওরা সম্মতিসূচক হাসি দেয়। সে আর এইড্যানের দিকে তাকালো না। অ্যাইডান গ্লাসগুলো পূর্ণ করে বারে চলে গেল।

রাতের শেষ প্রহরে সে পলিনের পার্টির সবাইকে পোশাক রুম থেকে কোট নিতে সাহায্য করে। মধ্যরাতের পর। সবাই তখন কিছুটা মদের নেশায় বুদ হয়ে আছে। অ্যাইডান এখনও বুঝতে পারে না, এরা বন্ধু নাকি সহকর্মী, নাকি একই পরিবারের সদস্য। পুরুষরা সবাই পলিনের দিকে তাকিয়ে আছে। আর মহিলারা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছে। পলিন ওকে কয়েকটা ট্যাক্সি ডাকতে বলে। ডেস্ক—এর পেছনে গিয়ে অ্যাইডান ফোনটা তোলে। পলিন কাউন্টারেবেলের পাশে আলতোভাবে হাতটা রেখে দাঁড়ায়।

আমরা সবাই আমার বাসায় গিয়ে ড্রিংক্স করব, সে বলে। তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে?

ওহ, না। আমি পারব না, অ্যাইডান বলে।

সে একটা স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে তার বন্ধুদের দিকে তাকায়। অ্যাইডান ফোনটা তার কানের সাথে এতটাই শক্ত করে ধরে ট্যাক্সির নাম্বারে ডায়াল করতে থাকে যেন রিংটোন ওর কানের কাছে চিৎকার করেবাজে। ওর কমপক্ষে ‘ধন্যবাদ’ বলা উচিৎ ছিল। তাহলে কেন বলল না? ওর বাড়ি কোথায় সে ভাবনাটা ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। ও এই শহরে থাকে না। থাকলে তো সে ওকে চিনতো। সম্ভবত ও সম্প্রতি শহরে এসেছে। অথবা সম্ভবত ও নতুন কোন সিনেমা নিয়ে কাজ করছে। সত্যি সত্যিই যদি ও সিনেমা নিয়ে কাজ করে থাকে, তবে একথা ঠিক। ওর প্রশ্ন নিয়ে দু—এক সেকেন্ড অপেক্ষা করে তবেই প্রশ্ন করতে হতো। তারপর ওকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ ছিল। ফোনে সে দু’টি ট্যাক্সির বুকিং দিয়ে কাজে মনোনিবেশ করে।

খুব তাড়াতাড়িই ট্যাক্সি এসে পড়বে, সে বলে। তার দিকে না তাকিয়েই পলিন সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। অ্যাইডানের ব্যবহারের কারণে পলিন এখন তাকে অপছন্দ করতে শুরু করেছে।

আমি জানতাম না যে, আপনি এখানে কোথাও থাকেন, সে বলে।

আবার সে শুধু মাথা নাড়লো। গত সপ্তাহে ওকে গাড়িতে যেভাবে দেখেছিল এখনও অ্যাইডান ওকে ঠিক এভাবেই দেখছে। মাথার পেছনের অংশ। ওর গলা, কাঁধ।

ট্যাক্সি যখন বাইরে এসে পৌঁছল তখন অ্যাইডানের দিকে না তাকিয়েই পলিন বলে, ডিক্ল্যানকে আমার শুভেচ্ছা জানাবে। এরপর সবাই চলে যায়। যে ওয়েটার টেবিল পরিষ্কার করেছিল সে অ্যাইডানকে জানিয়েছিল যে, ওরা যাওয়ার সময় বেশ মোটা অংকের বকশিস দিয়ে গেছে।

*

কয়েকদিন পর বিকেলে ও ফ্রন্ট ডেস্কে কাজ করছে। যখন ফোনে কথা বলছিল তখন একটি লাইন দাঁড়িয়ে যায়। কাজে মনযোগ দিয়ে সবাইকে অপেক্ষমান রাখার জন্য ক্ষমা চায়। চেক করে অতিথিদের হোটেল থেকে ছেড়ে দেয়। চাবির কার্ডগুলো বুঝে নেয়। এরপর চাকাওয়ালা চেয়ারে বসে পড়ে। অতিথিদের চেক আউটের জন্য অপেক্ষমান থাকার কথা নয়। তারা শুধু চাবিটা ডেস্কে রেখে চলে যাবেন। আনুষ্ঠানিক বিদায়ের দরকার নেই। কিন্তু অ্যাইডান মনে করে, অতিথিরা হোটেল ত্যাগ করার জন্য আনুষ্ঠানিক সম্মতি চান। হয়ত তাঁরা জানেন না যে, হোটেল ত্যাগ করার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমতির প্রয়োজন নেই। সর্বোপরি, মানুষ তো আনুগত্যশীল প্রাণীই। অন্যমনস্ক হয়ে অ্যাইডান ডেস্কে হাতের আঙ্গুল দিয়ে ঠকঠক শব্দ করতে থাকে।

ডিক্ল্যান আর অ্যাইডান ওদের মা’র বাড়িটা বিক্রি করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ডিক্ল্যান ইতোমধ্যে একটি বাড়ি কিনে ফেলেছে। ছোট। শহরতলীতে। বাড়িটি বিশ বছরের জন্য বন্ধক দেওয়া আছে। লোকজন মনে করে, অ্যাইডান পুরাতন বাড়িতে ফিরবে। অ্যাইডান শহরের বাইরে থাকে। ভাড়া বাসায়। না চাইলেও বাড়ির অন্য সব সদস্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে থাকে। সে এই অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। ওদের মা অনেক দিন অসুস্থ ছিলেন। বয়স খুব একটা বেশি ছিল না। ও মাকে খুব ভালোবাসত। এখন মা’র কথা ভাবলে ওর খুব কষ্ট হয়। আসলে ও আর মা’র কথা চিন্তা করতে চায় না। চিন্তাটা ওর মধ্যে একটি অনুভূতির জন্ম দেয়। প্রথম দিকে এই ভাবনাটা ছিল শুধুই একটি বিমূর্ত ধারণা বা স্মৃতি। কিন্তু এর উপর ওর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। মাকে নিয়ে আবার ভাবতে চায়, কারণ মা ছিলেন পৃথিবীর একমাত্র ব্যক্তি যিনি ওকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। কিন্তু মা’র কথা ভাবলেই ওর খুব কষ্ট হয়। সম্ভবত এই কষ্ট কখনও দূর হবে না। এটি এ রকম কোন কষ্ট নয় যে, তার কথা না ভাবলে আর এটি হবে না। এটি এমন একটি ব্যথা যা গিলতে চাইলে আরও অসহনীয়ভাবে তীব্র হয়ে ওঠে। এর মানে এই নয় যে, যখন গিলছেন না তখন নেই। হ্যাঁ, জীবন দুঃখ—যাতনায় ভরা এবং এসব থেকে কোন মুক্তি নেই। যাই হোক, বাড়িটা বিক্রি করা হলে অ্যাইডান কিছু অর্থ পাবে। তবে এই অংকটি খুব একটা বেশি নয়।

 

সেরাতে ডিক্ল্যান বেশ দেরি করে ওকেনিতে এলো। রাত দু’টার পর। পলিন কারের পেছনের সিটে শুয়ে আছে। পুরোপুরি মাতাল। ওকে পাত্তা দিও না, ডিক্ল্যান বলে।

আমাকে অবজ্ঞা করোনা বলছি, পলিন বলে। সাহস কত?

কাজ কেমন হলো? ডিক্ল্যান জিজ্ঞেস করে।

গাড়িতে উঠে দরজা লাগিয়ে দিয়ে অ্যাইডান পায়ের কাছে ব্যাগ রাখে। তারপর বলে, ঠিকঠাকই চলছে। গোটা গাড়িতে অ্যালকোহলের গন্ধ। এখনও অ্যাইডানের মনে হচ্ছে যে, সে আসলে জানে না এই মহিলাটি কে, পেছনের সিটে শুয়ে থাকা মহিলা। তাকে সে এই জায়গাতেই বেশ প্রায়ই দেখেছে। কিন্তু সে আসলে কে? প্রথমে ভাবলো, ও ডিক্ল্যানের মেয়ে বন্ধু। বা কমপক্ষে ওরকমের কিছু একটা হবে। কিন্তু রাতে হোটেলে ওকে অন্য রকম মনে হচ্ছিল। জাকজমকপূর্ণ। আর ওর সঙ্গের সবাই ওর দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে ছিল। ডিক্ল্যান অবশ্য সেখানে ছিল না। পরে সে অ্যাইডানকে পর্যন্ত মদ্যপানের আহ্বান জানিয়েছিল। সে ওর ভাইকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল, তুমি কিভাবে মেয়েটিকে চেন? তোমার কি ওর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক আছে?

কিন্তু ডিক্ল্যান এ ধরনের প্রশ্নে আহত হতে পারে।

লিফট না পেলে তুমি কিভাবে বাড়ি ফিরতে? পলিন জিজ্ঞিস করে।

হেঁটে, অ্যাইডান উত্তর দেয়।

কতক্ষণ লাগত?

প্রায় একঘন্টা।

হেঁটে যাওয়া কি নিরাপদ?

কী? অ্যাইডান জিজ্ঞেস করে। না, অনিরাপদ নয়।

কোন দিকদিয়ে অনিরাপদ?

ওর কথা বাদ দাও, ডিক্ল্যান বলে

অ্যাইডান আমার ভালো বন্ধু, পলিন বলে। ও আমাকে অবজ্ঞা করবে না। আমি তো ওকে বেশ মোটা অংকের বকশিস দিয়ে এসেছি, তাই না?

সেকথা আমি শুনেছি। এ আপনার বদান্যতা।

আমি ওকে আমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিলাম, পলিন বলে চলল। অথচ সে নিষ্ঠুরভাবে এটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

তুমি ওকে তোমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছ, এর দ্বারা তুমি কী বুঝাতে চাচ্ছ? কখন?

হোটেলে ডিনার সারার পর, পলিন বলে। ও আমার নিমন্ত্রণ নিষ্ঠুরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

অ্যাইডান রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে। বেশ আপনি বিষয়টি এভাবে নিয়েছেন জেনে আমি দুঃখিত, সে বলে। কেউ আমাকে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলেই আমি কাজ রেখে সেখানে যেতে পারি না।

আমি কিন্তু কোন নিমন্ত্রণ পাই না, ডিক্ল্যান বলে।

তুমি ব্যস্ত ছিলে, পলিন বলে। তোমার ভাইও অবশ্য ব্যস্ত। অ্যাইডান, আমি কি তোমার চাকুরির ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারি?

কী? সে বলে।

তুমি কি কখনও হোটেলের কোন গেস্টের সঙ্গে ঘুমিয়েছ?

দোহাই পলিন, তুমি এবার থামো, ডিক্ল্যান বলে।

এখন ওদেও গাড়ি ক্যারাভান পার্কের পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে। চাঁদের আলোয় ক্যারাভানগুলোর ছাদগুলো চকচক করছে। হাতের নখের মতো সাদা। অ্যাইডান জানে, পার্কের ওপারে সমূদ্র। কিন্তু এখন যখন সে গাড়িতে পলিনের সঙ্গে আটকা পড়েছে এবং পুরো গাড়ি যখন অ্যালকোহলের গন্ধে ভরে গেছে, তখন সে সমূদ্র দেখতেও পায় না, শব্দও শোনে না, এর গন্ধও পায় না। পলিন কি জানে না যে, ডিক্ল্যান এ ধরনের ফাজলামি পছন্দ করে না? সে যে জানে, সেটাও হতে পারে। জানতেও পারে। সে হয়ত কোন কারণে ডিক্ল্যানকে পাত্তা দিচ্ছে না, যে কারণ অ্যাইডানজানে না।

ওর কথা শুনো না, ডিক্ল্যান বলে।

একটা গাড়ি ওদের গাড়ির পাশ দিয়ে চলে গেল। অদৃশ্য হয়ে গেল। অ্যাইডান পলিনের দিকে ঘুরে তাকালো। এ পাশ থেকে ওর মুখটার একপাশ দেখা যায়। মুখটা বেশ লম্বা, ডিম্বাকৃতির। মাথাব্যথার বড়ির মতো।

তুমি আমাকে বলতে পার, সে বলে। ফিসফিস করেও বলতে পার।

তুমি ওর সঙ্গে ছেনালি করছ, ডিক্ল্যান বলে।

আমার সামনেই তুমি আমার ভাইয়ের সঙ্গে ছেনালি করছ। আমারই গাড়িতে বসে! সে অ্যাইডানের বাহুতে একটা ঘুষি মারলো। ওর দিকে আর তাকাবে না, ডিক্ল্যান বলে।

এখনও ওদিকে ঘোর। তুমি সব শেষ করে ফেলছো। আমি তো এসব পছন্দ করি না।

সেদিন হোটেলে ঐ লোকগুলো কারা ছিল?

অ্যাইডান জানতে চায়। ওরা কি আপনার বন্ধু?

‘পরিচিত’।

ওদের দেখে আমার মনে হয়েছিল, ওরা আপনার বড় ভক্ত।

যখন তোমার কাছ থেকে কিছু চাইবে তখন লোকজন তোমার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করবে, পলিন বলে।

পলিন ওকে ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার সুযোগ দেয়। ওর চাহুনি ধরে রেখে সে ওখানে শুয়ে রইলো। অস্ফুটভাবে হাসতে থাকে। ডিক্ল্যান ওকে আবারও ঘুসি মারে। এবার অ্যাইডান ঘোরে। গাড়ির জানালার কাচ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া বন্ধ কম্পিউটারের স্ক্রিনের মতো দেখাচ্ছিল।

গেস্টদের সঙ্গে আমাদের ঘুমানোর কোন অনুমতি নেই, অ্যাইডান বলে।

নাহ, অবশ্যই না। তবে আমি বাজি ধরে বলতে পারি, তুমি নিশ্চয় কোন প্রস্তাব পেয়েছিলে?

হ্যাঁ, বেশিরভাগই পেয়েছি পুরুষদের কাছ থেকে।

ডিক্ল্যানকে বিস্মিত মনে হলো।

তাই নাকি? সে বলে।

অ্যাইডান শুধু মাথা নাড়ে।

ডিক্ল্যান কখনও হোটেল বা বারে কাজ করেনি। ব্যবসায় শিক্ষায় ডিগ্রি নিয়ে সে এখন অফিস ম্যানেজারের চাকুরি করছে।

তুমি কি কখনও কোনকিছুতে প্রলুব্ধ হয়েছ? পলিন জিজ্ঞেস করে।

সচরাচর না।

অ্যাইডান জানালার হাতলে হাত দিয়ে শুধু শুধুই নাড়াচাড়া করতে থাকে।

একদিন আমাদের হোটেলে একজন লেখিকা এসেছিলেন। তিনি তাঁর বাড়িতে আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, সে বলে।

“তিনি কি সুন্দরী ছিলেন?”

পলিন, ডিক্ল্যান বলে। তুমি কিন্তু আমাকে এখন আর পাত্তা দিচ্ছ না। এ প্রসঙ্গ বাদ দাও, ঠিক আছে? ও যিশু। বলে দিচ্ছি, এই শেষ বারের মতো আমি তোমার প্রতি আনুকূল্য দেখাচ্ছি।

অ্যাইডান বলতে পারছে না, ঠিক এই মুহূর্তে ডিক্ল্যান তার সঙ্গে, নাকি পলিনের সঙ্গে কথা বলছে। মনে হচ্ছে, সে পলিনকে বলছে।কিন্তু গাড়ীতে লিফ্ট নিয়ে আসলে সেই তো আনুকূল্য গ্রহণ করছে।

এবার সবাই চুপ। অ্যাইডান ওর কর্মস্থলের কাপড়চোপড় রাখার ঘরের কথা মনে করলো। ওখানে খাটের তক্তার চাপ দিয়ে শক্ত করে পরিষ্কার বিছানার চাদরগুলো ভাঁজ করে রাখা হয়। সেখানকার নীলাভ সফেদ রঙের পাউডার ও সাবানের গন্ধ ওর নাকে আসতে লাগলো। বাড়ির বাইরে গাড়ি থামলো। অ্যাইডান গাড়ি থেকে নেমে লিফ্টের জন্য ডিক্ল্যানকে ধন্যবাদ দেয়।

ডিক্ল্যান হাত নেড়ে বিদায় জানায়। এসব নিয়ে কিছু ভেব না, সে বলে। পেছনের জানালা দিয়ে পলিনের মুখমন্ডল দেখা যায়। কিন্তু সে ওর দিকে তাকিয়ে আছে নাকি নেই, তা বলতে পারে না।

*

দুই সপ্তাহ পরে শহরে আর্ট ফেস্টিভাল শুরু হয়। ওর হোটেল ব্যস্ত। হোটেলের ম্যানেজার অ্যাইডানকে শুক্রবারেও অতিরিক্ত শিফ্টে কাজ করার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে। কারণ, এক নারী কর্মচারীর গলায় সংক্রমণ হয়েছে। শনিবার রাত দশটায় ও কাজ শেষ করে। ফেস্টিভালের সমাপনী অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য ও সমূদ্র সৈকতে যায়। প্রতি বছর একইভাবে চলে এই অনুষ্ঠান। সমূদ্রে নামার সিঁড়ির শেষ প্রান্তে আতশবাজির আয়োজন করা হয়। এবার নিয়ে সে দশবার এই অনুষ্ঠান দেখেছে। যদিও অনেক বছর ধরে এই ফেস্টিভাল চলছে। প্রথমবার যখন সে এই ফেস্টিভাল দেখেছিল তখন সে কিশোর এবং স্কুলে পড়ত। ওই সময় ও ভেবেছিল যে, ওর জীবন সবে মাত্র শুরু হলো। তখন ভেবেছিল, ও সবে মাত্র তাল সামলে চলতে শুরু করেছে এবং যেকোন দিন যেকোন মুহূর্তে ওর অপেক্ষার প্রহর শেষ হবে এবং আসল ব্যাপার শুরু হবে।

সৈকতে নেমে একেবারে চিবুক পর্যন্ত জ্যাকেটের চেইন টেনে লাগালো। স্থানটি ইতোমধ্যে লোকে লোকরণ্য। রাস্তার বাতিগুলোর আলো ধূসর ধূলির ওপর আছড়ে পড়ছে। অনেকেই পরিবারের সদস্যরা মিলে ঘোড়ার গাড়িভাড়া করে ঘুরছে। কেউ কেউ আবার গুরুত্বহীন বিষয়—আশয় নিয়ে বিতন্ডা করছে। হাসি—তামাশা করছে। কূলে ভিড়িয়ে রাখা নৌকাগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে টুংটাং শব্দ করছে। যেন ঘন্টা বাজানো হচ্ছে। তবে এই শব্দ খাপছাড়া, অসংলগ্ন। কিশোর—কিশোরীরা সিঁড়িতে বসে আছে। ক্যান থেকে পানীয় পান করছে। ভিডিও দেখে হাসি—তামাশা করছে। ফেস্টিভালের লোকজন কানে ওয়াকিটকি ধরে হন্তদন্ত হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। অ্যাইডান তার ফোনের দিকে তাকালো। ভাবলো, ডিক্ল্যান আশেপাশে নেই তো। রিচিও আসতে পারে। বিশেষ করে কোন দলও আসতে পারে। কিন্তু গ্রুপ চ্যাটে সে কাউকে পেল না। এ বছর আবারও বেশ শীত পড়েছে। ফোনটা সরিয়ে রেখে সে দু’হাত ঘষলো।

যখন ও পলিনকে দেখে ততক্ষণে পলিন ওর দিকে আসতে শুরু করেছে। তার মানে হলো সেই প্রথম ওকে দেখেছে। সে একটা সাধারণ মাপের চাইতে বড় সাইজের লোমের তৈরি জ্যাকেট পরেছে। এটি প্রায় পলিনের হাঁটু ছুয়েছে। একটা হেয়ারব্যান্ড দিয়ে চুলগুলো কপালের দিক থেকে টেনে নিয়ে পেছনের দিকে সেঁটে বেঁধেছে।

ওহ, তাহলে আজ তোমার ছুটি, পলিন বলে।

এই মাত্র কাজ শেষ করে এসেছি, অ্যাইডান বলে। তবে কাল আমার ছুটি।

আমি কি তোমার সঙ্গে আতশবাজি দেখতে পারি, নাকি তোমার সঙ্গে অন্য কেউ আছে?

প্রশ্নটি সঙ্গে সঙ্গে অ্যাইডানের মনে ধরে। যেন মনের গভীরে লুক্কায়িত নতুন এক দিগন্তের উন্মোচন হয়।

নাহ, আমি একাই আছি, অ্যাইডান বলে। আমরা একসঙ্গেই আতশবাজি দেখতে পারি। পলিন ওর পাশে দাঁড়ায়। ঠান্ডা হাতদু’টো একে অপরের সঙ্গে ঘষতে থাকে। মুকাভিনয়ের ভঙ্গিতে। অ্যাইডান বুঝতে পারে না, তার এই মুকাভিনয় আসলে ওর কাছে কী চায়।

আমি দুঃখিত। সেরাতে আমি আসলে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলাম, পলিন বলে।

কবে?

গত সপ্তাহে বা ঐরকম একটা সময়েই হবে। আমার মনে হয়, ডিক্ল্যান বিরক্ত হয়েছিল।

তাই নাকি?

সে তোমাকে এব্যাপারে কিছু বলেনি?

আমাকে? নাহ, অ্যাইডান বলে আমরা আসলে এসব ব্যাপার নিয়ে কথাবার্তা বলি না।

এবার সব বাতি নিভে গেল। সৈকতটি অন্ধকারে ডুবে গেল।

ওদের আশেপাশে লোকজন ঠাসাঠাসি করে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে লাগলো। কেউ কেউ গল্পগুজব করছে। কেউ আবার ফোন বের করে টর্চটা জ্বালাচ্ছে। এরপর সিঁড়ির শেষ প্রান্তে আতশবাজি শুরু হলো। স্বর্ণালি আলোর রেখা আকাশে উঠে যায়। শেষ হয় বর্ণিল আভা দিয়ে। প্রথমে গোলাপি তারপর নীল। এর সংক্ষিপ্ত মনোমুগ্ধকর আলো বালি ও পানিতে প্রতিফলিত হয়। তারপর ধীর নিঃশ্বাসের মতো সোঁ সোঁ শব্দ। আকাশে গিয়ে এগুলো ফেটে যায়। লাল পুষ্পমঞ্জুরীর মতো আভা ছড়িয়ে রেখে ওরা নিভে যায়। আতশ যখন ফেটে যায় তখন প্রথমে দেখা যায় এর শব্দহীন রং আর আলো, তারপর এক সেকেন্ড পরেই প্রচণ্ড শব্দ। কোন কিছু ফেটে যাওয়ার বিকট শব্দের মতো। দুম করে গভীর চাপা শব্দ বুকে এসে লাগে। অ্যাইডান সিঁড়ির শেষ প্রান্ত থেকে সোঁ সোঁ শব্দ করে ছোট ছোট মিশাইলগুলোকে উপরের দিকে উঠতে দেখে। প্রায় অদৃশ্য অবস্থায় উপরে উঠে ছোট ছোট আলোর টুকরোয় বিদীর্ণ হয়ে ফেটে পড়ে। আলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার মতো চক চক করে। উজ্জ্বল সাদা। ফ্যাকাশে হতে হতে হলুদ হয়ে আসে। তারপর গাঢ় সোনালী। এরপর অন্ধকারে হারিয়ে যায়।অন্ধকারে হারানোর পূর্বে গভীর সোনালী রং ধারণ করে। এটিই অ্যাইডানের সবচেয়ে সুন্দর লাগে। ফিকে চাপা লাল রং। গণগনে কয়লার চাইতে আর একটু ফিকে। অবশেষে ওদের উপরের দিকে গলা বাড়িয়ে দেখতে হয়। তিনটি জ্বলজ্বলে আতশ পুরো আকাশকে গিলে ফেলে। পুরো আকাশের সব অন্ধকার খেয়ে ফেলে। তারপর সব শেষ। রাস্তার পাশের বাতিগুলো আবার জ্বলে ওঠে।

ওর পাশে দাঁড়িয়ে পলিন হাত দিয়ে নিজের মুখ আর নাক ঘষে। আবার শীত করে। অ্যাইডান অস্পষ্টভাবে বুঝতে পারে, পলিন আতশবাজি উপভোগ করেছে কিনা, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। অর্থাৎ, সে যদি ওগুলো উপভোগ না করে; যদি সে মনে করে যে, ওগুলো বিরক্তিকর, তাহলে শুধু যে সে তাকে পছন্দ করবে না, তাই নয়, বরং এই আতশবাজিও সে আর পছন্দ করবে না। এভাবে ভালো একটা কিছুর সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটবে। অ্যাইডান কিছুই বলে না। সবার সঙ্গে ওরাও ঘরে ফিরতে শুরু করে। সমূদ্র সৈকত ত্যাগ করে। এখন শুধু একই গতিতে হাটতে হচ্ছে। জনতার গতি। সবচেয়ে ধীর গতি। সবচেয়ে কম স্বস্তিদায়ক। যে গতিতে মানুষ সচরাচর হাটতে পারে। এই গতিতে চলতে গিয়ে অ্যাইডান লোকজনের সঙ্গে ধাক্কা খায়। বাচ্চারা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তার আগে আগে ছোটাছুটি করে। বাচ্চাদের নিয়ে চলা হাতে ঠেলা গাড়ি এবং হুইলচেয়ারগুলোকে ওদের সাইড দিতে হচ্ছে। পলিন ওর গা ঘেষে চলতে থাকে। পায়েচলা পথের শেষ মাথায় এসে সে জানতে চায়, অ্যাইডান তার বাসা পর্যন্ত হাঁটবে কিনা। অ্যাইডান বলে, অবশ্যই।

সমূদ্র সৈকতের পাশেই একটি বাড়িতে থাকে পলিন। অ্যাইডান রাস্তা চেনে। এখানে অবকাশ যাপনের উদ্দেশে বানানো সব বাড়িগুলো অবস্থিত। বাড়িগুলোর কাচের দেয়ালগুলো সমূদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা হাটতে থাকলে সব জনতা পেছনে পড়ে গেল। যখন ওরা পলিনের বাড়ির রাস্তায় এসে পড়লো তখন আর কেউ নেই। শুধু ওরা দু’জন আর চারপাশের নিস্তব্ধতা।

পলিনের ব্যাপারে সে অনেক কিছুই জানে না। অনেক কিছু। আলাদা অথচ অবাক করার মত একটা কিছু তাকে নাড়া দেয়। সে জানতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন করতে শুরু করা অসম্ভব। সে পলিনের জাত—কূল কিছুই জানে না। সে কোত্থেকে এসেছে, সারাদিন কী করে, তার পরিবারে কে কে আছে এসব ব্যাপারে সে কিছুই জানে না। সে জানে না, পলিনের বয়সই বা কত। অথবা ডিক্ল্যানের সঙ্গে কিভাবে ওর পরিচয় হলো অথবা ডিক্ল্যানকে সে কতটাই বা চেনে এসব ব্যাপারেও সে কিছইু জানে না।

শুনুন, ঐ যে সে রাতে যে বলেছিলেন, অ্যাইডান বলে, একবার আমি হোটেলে একজন গেস্টের সঙ্গে ঘুমিয়েছিলাম। ডিক্ল্যানকে আমি এ ব্যাপারে কিছু বলিনি, কারণ এমন ব্যাপার সে সমর্থন করবে না। পলিনের চোখ ওর দিকে তাকিয়ে বড় বড় হয়ে গেল। কোন গেস্ট, সে জানতে চায়।

জানি না। মহিলা একাই থাকেন। একটু বয়স্ক। তিরিশ টিরিশ হবে হয়তো।

অভিজ্ঞতা কি ভালো ছিল? নাকি খারাপ?

আহামরি কিছু ছিল না, অ্যাইডান বলল। সেক্সকে আমি খারাপ বলছি না। কিন্তু আমার খারাপ লেগেছিল। মনে হয় কাজটা ঠিক হয়নি।

কিন্তু সেক্স তো ভালো।

ঠিকই ছিল। নিশ্চিত করে বলছি, ভালোই ছিল। এতদিনে আমার ব্যাপারটা ঠিকমতো মনেও নেই। সেসময় আমার মনে হয়েছিল যে, মহিলা বিবাহিত। তবে সত্যি কী, তা আমি জানি না। সেই সময় আমার অবশ্য এমনটা মনে হয়েছিল।

তুমি তাহলে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলে কেন? পলিন জিজ্ঞেস করে।

কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে অ্যাইডান বলে, জানি না। আমি আশা করি আপনি আর এ ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করবেন না।

তুমি কী বলতে চাইছ?

আপনি অন্য সবার মতই এই ব্যাপারগুলো বোঝেন। কিন্তু আপনার প্রশ্ন শুনলে আমার মনে হয় আমি বাজে কিছু একটা করে ফেলেছি।

হাঁটতে হাঁটতে পলিন থামে। দরজার কাছে। এটি তার বাড়ির দরজাই হবে। ওর পেছনে বিশাল এক বাড়ি। বড় বড় জানালা। বাগানের পাশে বাড়ির সবগুলো বাতি নেভানো।

আমার মনে হয় না ব্যাপারটা বাজে কিছু, পলিন বলে। আমার একটা বিবাহিত ছেলেবন্ধু ছিল। আমি ওর বউকে চিনতাম, তবে খুব ভালোভাবে নয়। আমি জানতে চাইব না কেন তুমি একাজ করেছ, কারণ আমার মনে হয়, যেকোন বিবাহিত মহিলার সঙ্গে ঘুমানো এক ধরনের অসুস্থতা। আমার ভেবে অবাক লাগে, আমরা যে কাজগুলো করতে চাই না সেগুলো কেন করি? তবে আমার মনে হয়, তুমি এর উত্তর পেয়ে গেছ। না পেলেও ঠিক আছে। আমিও পাইনি।

ঠিকই। এখন বেশ ভালো লাগছে। এই নয় যে, তুমি খারাপ পরিস্থিতিতে আছো বলে তা দেখে আমার ভালো লাগছে। বরং এই ভেবে ভালো লাগছে যে, আমিই একমাত্র এমন লোক নই।

তুমি কি এখন খারাপ পরিস্থিতিতে আছো?

নাহ, অ্যাইডান বলে। আমি আসলে এখন কোন পরিস্থিতিতেই নেই।আমার জীবন চলছে বলে মনে হয় না। আমার মনে হয়, আমি যদি মরে পড়েও থাকি তবুও যারা আমার শিফট কভার করতে আসবে তারা ছাড়া আর কেউ আমাকে পাত্তা দেবে না। ওরা কষ্টও পাবে না। শুধু বিরক্ত হবে।

পলিন ভ্রু কুচকালো। বাড়ির ফটকে হাত রাখলো। যেন কিছু একটা ভাবছে।

বেশ, আমার অবশ্য ঐ সমস্যা নেই, পলিন বলে। আমার মনে হয়, আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটে চলেছে। এই পর্যায়ে সবাই আমার কাছ থেকে কিছু না কিছু চায়। তাই এখন আমি মরে গেলে ওরা সবাই আমার শরীরটা টুকরো টুকরো করে কেটে নিলামে তুলবে।

আপনি হোটেলের ঐ লোকগুলোর কথা বলছেন।

পলিন মাথা নাড়লো। দরজা খুলল। অ্যাইডান ভেতরে আসবে কিনা তা জানতে চায়। ও উত্তরে বলে, হ্যাঁ।

বাড়িটা বিশাল। গোছানো দেয়ালের তাকগুলো খালি। ছাদ বেশ উঁচু। পলিন ড্রয়িং রুমের টেবিলে চাবিটা রাখলো। তারপর যত্রতত্রভাবে এখানে সেখানে সুইচ টিপে বাতি জ্বালালো। ড্রয়িং রুমের কোণে একটি সবুজ রংয়ের বিশাল সোফায় বসে পড়লো। বিশাল মসৃণ মেঝেতে এটিকে বিছানার মতো দেখাচ্ছে। বাড়িতে কোন টেলিভিশন নেই। বইয়ের তাকগুলো ফাঁকা। অ্যাইডানও সোফায় বসলো। তবে পলিনের পাশে নয়।

আপনি কি এ বাড়িতে একা থাকেন? অ্যাইডান জিজ্ঞেস করে।

পলিন নির্লিপ্তভাবে চারপাশে তাকায়। এমন এক অভিব্যক্তি প্রকাশ করে যেন সে জানে না, অ্যাইডান ‘এই বাড়িতে’ বলতে কী বুঝিয়েছে।

ওহ, হ্যাঁ। শুধু এখনকার মতো।

‘এখন’ মানে কতদিন ধরে?

সবাই এরকম প্রশ্ন করে। তুমি এমন প্রশ্ন করো না। সবাই জানতে চায় আমি কী কাজ করছি; কতদিন ধরে করছি। আমি শুধু কিছুদিন একা থাকতে চাই। আমি চাই না, কেউ জানুক যে, আমি কোথায় আছি এবং কবে ফিরব। হতে পারে, আমি হয়ত কখনই ফিরব না।

সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পলিন জানতে চায়, সে মদ পান করতে চায় কিনা। অ্যাইডান পলিনের কথা শুনে অর্থাৎ ‘কোথাও একা চলে যাওয়া’ এবং ‘কখনও ফিরে না আসা’এসব শুনে অ্যাইডান হতভম্ব হয়ে শুধু সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকায়।

আমার কাছে এক বোতল হুইস্কি আছে, পলিন বলে। কিন্তু তুমি আবার মনে করো না যে, আমি পানাসক্ত। কেউ একজন আমাকে এটি গিফ্ট দিয়েছিল। নিজে কিনিনি। ছোট্ট এক গ্লাসের অর্ধেকটা খাবে কি? তাহলে আমিও খাব। তুমি না খেলে আমি খাব না।

এক গ্লাস খাব, অ্যাইডান বলে।

সে ঘরের বাইরে চলে গেল। তবে দরজা দিয়ে নয়।

আর্চওয়ে দিয়ে। বাড়িটাই এক গোলকধাঁধা। কাজেই, অ্যাইডান বলতে পারছে না, ও কোথায় চলে গেল আর কতদূরই বা গেল।

আপনি একা থাকতে চাইলে আমি চলে যাই, সে উচ্চস্বরে বলল।

পলিন সঙ্গে সঙ্গে আর্চওয়েতে এসে হাজির। কী বলছো? সে জানতে চায়।

নাহ, মানে যেমনটা আপনি আগে বললেন। আপনি একা থাকতে চাইলে আমি আর অনুপ্রবেশ করতে চাইব না।

আরে না, না। আমি তো সেকথা দার্শনিকের মতো করে বলেছি, সে বলে। তুমি কি আমার কথা শুনছো? ওটা তাহলে তোমার প্রথম ভুল। আমি যাই কিছু বলি, তার কোন অর্থ নেই। তোমার ভাই অবশ্য জানে, আমার সঙ্গে কিভাবে চলতে হয়। ও তো আমার কথায় পাত্তাই দেয় না। দাঁড়াও, এক সেকেন্ডের মধ্যে ফিরে আসছি।

সে আবার চলে গেল। “ডিক্ল্যান জানে কিভাবে তার সঙ্গে চলতে হয়” এ কথার অর্থ কী? অ্যাইডান কি জানতে চাইবে? হতে পারে, এই প্রশ্ন দিয়ে সে গৌরচন্দ্রিকা করতে পারে।

হাতল বিহীন দু’টি গ্লাসের অর্ধেক করে ভরিয়ে নিয়ে সে ফিরে এলো। একটা অ্যাইডানের হাতে দিলো। আর একটা নিজে নিয়ে সোফায় ওর পাশে, তবে গা ঘেষে নয়, বসে পড়ল। আগের চাইতে আর একটু ঘনিষ্টভাবে বসলো। ওরা হুইস্কিতে চুমুক দেয়। অ্যাইডান কখনও স্বেচ্ছায় এমন পাণীয় পান করে না।

যাই হোক, এর স্বাদ কিন্তু বেশ।

তোমার মা’র ব্যাপারে আমি দুঃখিত, পলিন বলে। ডিক্ল্যান আমাকে বলেছে। উনি মারা গেছেন।

হ্যাঁ, ধন্যবাদ।

ওরা একটু থামে। অ্যাইডান হুইস্কিতে আর একটা বড় চুমুক দেয়। আপনি তো দেখছি ডিক্ল্যানের ব্যাপারে অনেক কিছু জানেন? সে বলে।

সে আমার এক ধরনের গাড়িওয়ালা বন্ধু। আমি আসলে বলতে চাচ্ছি, আমার বন্ধুদের মধ্যে শুধুমাত্র ওরই গাড়ি আছে। ও খুব ভালো। ও প্রায়ই গাড়িতে করে আমাকে এখানে সেখানে ঘুরতে নিয়ে যায়। আমি হালকা কিছু বললে ও আমাকে পাত্তা দেয় না। আমার মনে হয়, ও আমাকে একজন রাশভারী মহিলা মনে করে। ঐ যে যে রাতে তোমাকে যখন কিছু আজেবাজে প্রশ্ন করলাম, সেরাতে মনে হয় ও আমার ওপর খুশি হয়নি। কিন্তু তুমি তো তার ছোট্ট আদরের ভাই। ও মনে করে, তুমি কিছুই বোঝ না।

পলিন যখন ‘বন্ধু’ শব্দটি উচ্চারণ করে তখন অ্যাইডান এই শব্দটির প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়। ডিক্ল্যানের সঙ্গে সম্পর্ক বর্ণনায় এই শব্দটি সে একাধিকবার ব্যবহার করে। সে ভাবে, এর শুধু একটাই অর্থ থাকতে পারে। এটা ভেবে তার ভালো লাগে।

সে কি তোমার উপর বিরক্ত হয়েছিল? সে উত্তরে জানতে চায়। আমি জানি না, ও আমাকে নিয়ে কি ভাবে? ও আমাকে বলেছিল, ও জানে না তুমি আসলে সমকামী নাকি সমকামী নও।

আহ, বেশ। আমি তো আগেই বলেছি। এরূপ ব্যাপার—স্যাপার নিয়ে ওর সঙ্গে আমার কোন আলাপ—আলোচনা হয় না। তুমি তো বাসায় কখনও কোন মেয়ে বন্ধু নিয়ে আসোনি।

আপনি দেখছি আমাকে এখানে পেয়ে বসেছেন, অ্যাইডান বলে। আমার সম্বন্ধে ডিক্ল্যান আপনাকে সব কিছু বলেছে। অথচ আমি এসবের কিছুই জানিই না।

পলিন হাসে। ওর দাঁতগুলো অত্যন্ত সাদা ও সুগঠিত। দেখতে কৃত্রিম। নীলচে।

তুমি কী জানতে চাও? পলিন জিজ্ঞেস করে। বেশ, আপনি এখানে কেন এসেছেন,

সে ব্যাপারটি জানতে আমি উৎসুক। মনে তো হয় না যে, আপনি এখানকার স্থানীয়।

এই ব্যাপারেই কি তুমি কৌতুহলী? হায় হায়! আমি তো ভাবতে শুরু করেছিলাম যে, তুমি নিরীহ, অবোধ।

সেটা খুব একটা ভালোকথা নয়, অ্যাইডান বলে। তাকে মুহূর্তের জন্য আহত দেখায়। গ্লাসের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর বিষন্নভাবে বলে, কী দেখে বুঝলে যে, আমি ভালো? সে মনে করেনা যে, পলিন এই প্রশ্নের উত্তর জানে। আসল কথা হলো সে তাকে বিশেষ ভালো মনে করে না। তার কাছে ভালত্ব একটা গড়পরতা গুণ যা মোটামুটি সবারই আছে।

খালি গ্লাসটা পলিন টেবিলের ওপর রাখে। এরপর আবার সোফায় বসে পড়ে। তুমি যতটা মনে কর তোমার জীবন আসলে ততোটা খারাপ নয়, পলিন বলে।

বেশ, তোমার জীবনও নয়, অ্যাইডান উত্তরে বলে।

কীভাবে জানবে?

সবাই সবসময় আপনার মনোযোগ চায়। কেন? অ্যাইডান জিজ্ঞেস করে। আপনি যদি ব্যাপারটি অপছন্দ করেন তবে যেখানে খুশি সেখানে চলে যেতে পারেন। কে আপনাকে আটকাবে?

গালে হাত দিয়ে মাথাটা একদিকে কাত করে বসেছে পলিন।

তুমি সমূদ্রের ধারে কোন এক শহরে চলে যাবার কথা বলছো তো? পলিন বলে। অর্থাৎ, নীরবে নিভৃতে বাস করা, গ্রামের সুন্দর একটি ছেলেকে বিয়ে করা যে জীবন—জীবিকার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে এ কথাই তো তুমি বলতে চাচ্ছ তাই না?

ওহ, আপনি চলে যান।

পলিন বিরক্ত হয়ে একটি হালকা, নান্দনিক হাসি দেয়।

আমি আপনারকাছ থেকে কিছুই চাই না, অ্যাইডান বলে।

তাহলে এখানে কী করছ?

অ্যাইডান তার হাতের গ্লাসটা নামিয়ে রাখে। আপনি আমাকে আসতে বলেছেন, তাই। আপনিই বলেছিলেন, আমরা কি একসঙ্গে আতশবাজী দেখতে পারি? মনে পড়ে? আমাকে একসঙ্গে হেঁটে বাড়ি ফেরার প্রস্তাব দিলেন। এরপর ভেতরে আসতে বললেন। আর এখন বলছেন, আমি আপনার বিষয়ে নাক গলাচ্ছি, তাই না? আমি আপনার কাছ থেকে কখনই কিছু চাইনি।

মনে হলো, কথাগুলো চিন্তা করে পলিন গম্ভীর হয়ে গেল। শেষে বলল, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে পছন্দ কর। এর মানে কী? আপনাকে যদি পছন্দ করি তবে কি সেটা আমার জন্য খারাপ কিছু?

মনে হয় কিছুই শোনেনি এমন একটি ভাব দেখিয়ে পলিন বলে, আমি তোমাকে আমার ভাল লেগেছিল।

কেন তারা তর্ক করছে এটি ভেবেএতক্ষণে অ্যাইডান পুরোপুরি ধন্দে পড়ে গেল। হঠাৎ হতাশায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেল। ঠিক আছে, অ্যাইডান বলে। বেশ জোর করেই বলে, এবার তাহলে উঠি।

পলিনের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার অভিজ্ঞতা,তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার স্বতস্ফুর্ত ঘোষণা অত্যন্ত কষ্টকর ও বাজে অভিজ্ঞতা মনে হলো অ্যাইডানের। প্রায় গায়ে—গতরে কষ্টটা অনুভব করল। ওর বিশ্বাসই হচ্ছে না যে, এমনটা লাগবে। বিশেষ থেকে সোফা থেকে দাঁড়িয়ে এবং যে দরজা দিয়ে ঢুকেছিল সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া তার কাছে অদ্ভুত কষ্টের অভিজ্ঞতা মনে হচ্ছে। সবকিছুকে কেন এখন অদ্ভুত ঠেকছে? কোন পর্যায়ে এসে পলিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক সামাজিক যোগাযোগের সাধারণ নিয়মকানুন ভেঙ্গেছে? এটা তো যথেষ্ঠস্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছিল, তাই না? অ্যাইডান এখনও জানে না, পলিন তার ভাইয়ের মেয়ে বন্ধু কিনা।

অ্যাইডান বের হয়ে গেলেও পলিন সোফা থেকে ওঠে না।

আধো আলো আধো ছায়ায় ঢাকা গুহাসদৃশ বাড়ির অন্ধকার পথ হাতড়ে উজ্জ্বল আলোর ডাইনিং রুমে আসে। এর সামনেই দরজা। কেন পলিন ‘একটি সুন্দর, গ্রামের ছেলের সঙ্গে’ থিতু হওয়ার কথা বলল। সে তাকে খোঁচানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু কেন? সে তো তার জীবন সম্বন্ধে কিছুই জানে না। তাহলে সে পলিনের ব্যাপারে ভাবছে কেন? ঠিক সেই মুহূর্তে পলিনের বাসার সামনের দরজায় পৌঁছলে চকচকে কাচে তারই এক অচেনা প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে। অ্যাইডান জানে, এটি তারই মুখায়বের প্রতিবিম্ব। এটি একটি উত্তরবিহীন প্রশ্নের মতো অ্যাইডানকে বিদ্ধকরে।

*

কয়েক সপ্তাহ পরে পেছনের ঘরে যখন সে উপর তলার একজন অতিথির জন্য কন্টিনেন্টাল পাওয়ার অ্যাডাপ্টার খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল তখন লিডিয়া এসে জানালো, ওর জন্য কেউ একজন ডেস্কে অপেক্ষা করছে। কী? অ্যাইডান জিজ্ঞেস করে।

ওরা তোমার কথা জিজ্ঞেস করলো।

অ্যাইডান অ্যাডাপটারের ড্রয়ার এমনভাবে বন্ধ করে যেন পৃথিবীর বাইরের কোন শক্তি ওকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এরপর উঠে দাঁড়ালো। লিডিয়ার পেছন পেছন ঘর থেকে বের হয়ে ফ্রন্ট ডেস্কের দিকে গেল। না দেখে বা না শুনেই সে ইতোমধ্যে বুঝে গেছে, ওখানে পলিন ওর জন্য অপেক্ষা করছে। ব্যাপারটা সত্যিই তাই। সে একটা নরম, মসৃণ পোশাক পড়ে আছে। একজন বয়স্ক মানুষ ওর কোমরটা হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অ্যাইডান সবকিছু নিরাসক্তভাবে পর্যবেক্ষণ করে। পলিনের ব্যাপারে ওর ধারণা এতটাই ধোঁয়াশাপূর্ণ যে, ওকে এই অবস্থায় দেখা অ্যাইডানের জন্য নতুন কিছু নয়।

ঠিক আছে, অ্যাইডান বলে। বলুন, কীভাবে সাহায্য করতে পারি?

আমরা একটা রুম খুঁজছি, লোকটি বলল।

পলিন আঙ্গুলের ডগা দিয়ে ওর নাকটা চেপে ধরে আছে। লোকটা ওর হাতে চাপড় দিয়ে বলে, তুমি আরও খারাপ করছ। দেখ, আবার কিন্তু রক্ত ঝরছে, পলিন বলে।

পলিনের কথা শুনে মনে হয় ও যেন নেশার ঘোরে আছে। মুখ থেকে হাতটা সরালে অ্যাইডান দেখে, ওর আঙ্গুলগুলো রক্তে ভেজা। অ্যাইডান তার ডেস্কে কম্পিউটারের উপর ঝুঁকে কাজ করছে। তবে তাড়াতাড়ি রুম রিজার্ভের ফাইলটা খুলতে পারে না। কোন একটা কিছুতে ক্লিক করার ভান করে। আদতে সে কোন কিছুতেই ক্লিক করছে না। লিডিয়া তাকে দেখে ফেলছে না তো? সেও ডেস্কে বসা। সামান্য ডানে। তবে সে বলতে পারবে না যে, লিডিয়া তাকে দেখছে কিনা।

কয় রাতের জন্য? অ্যাইডান জানতে চায়। একরাত, লোকটি বলে। আজকের রাতের জন্য। এত কম সময়ের মধ্যে বললে ওরা আসলে কিছু করতে পারবে না, পলিন বলে।

বেশ, দেখা যাক, লোকটি বলে।

যদি আগেভাগে বলতে যে, ‘তুমি আসছো, তবে তো আমি সবকিছুর ব্যবস্থা করে রাখতাম, পলিন বলে।

তুমি থামো, লোকটি বলে।

অ্যাইডান আবার ঢোক গেলে। ওর মাথার মধ্যে চলা ধুকপুক সম্বন্ধে ও জানে। যেন আলো একবার জ্বলছে একবার নিভছে। দক্ষতা প্রকাশের ভান করে সে মাউসটা স্ক্রিনের চারদিকে ঘুরায়। বেশ আন্তরিকভাবে। ভান করে কিছু একটা টাইপ করার যদিও স্ক্রিনের সাথে কীবোর্ডের সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ও নিশ্চিত যে, লিডিয়া ওকে দেখছে। অবশেষে কম্পিউটার থেকে উঠে সে লোকটির দিকে তাকায়।

নাহ্ আমি দুঃখিত, সে বলে। আজ রাতে আমাদের এখানে কোন রুম খালি নেই।

লোকটি ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। লিডিয়াও লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকে। আপনাদের কোন রুমই খালি নেই? লোকটি জিজ্ঞেস করে। সব রুম ভাড়া হয়ে গেছে? তাও আবার এই এপ্রিলের মাঝামাঝিতে?

আমি তো তোমাকে বলেছিলাম, পলিন বলে।

দুঃখিত, অ্যাইডান বলে। আপনারা চাইলে আগামী সপ্তাহে ব্যবস্থা করতে পারি।

লোকটি হাসবেন বলে মুখভঙ্গি করতে চাইলেন। কিন্তু হাসি এলো না। তিনি পলিনের কোমর থেকে হাতটা সরিয়ে নিলেন। উপরের দিকে উঁচিয়ে আবার নিজের শরীরেই তা নিক্ষেপ করলেন। অ্যাইডান সতর্ক। সে আর পলিন বা লিডিয়া কেউ কারও দিকেই তাকাচ্ছে না।

কোন রুম খালি নেই, লোকটি আবার বললেন। সব রুম বুক্ড হয়ে গেছে। পুরো হোটেল বুক্ড হয়ে গেছে। দুঃখিত। আপনাদের সাহায্য করতে পারছি না, অ্যাইডান বলে।

লোকটি পলিনের দিকে তাকান।

বেশ, তুমি আমাকে কী করতে বল? পলিন বলে। প্রত্যুত্তরে লোকটি আঙ্গুল উঁচিয়ে অ্যাইডানের দিকে তাক করে বলেন, এটাই কি তোমার ছেলেবন্ধু?

ওহ, আজেবাজে কথা বলো না তো, পলিন বলে।

আজকাল কি তুমি সবকিছু নিয়ে মানসিক বৈকল্যে ভোগো?

তুমি ওকে চেন, লোকটি বলে। তুমি ওর কথাই জিজ্ঞেস করেছিলে।

পলিন মাথা নাড়ে। আলতোভাবে ওর নাকটা নাড়তে থাকে। তারপর অ্যাইডান আর লিডিয়ার দিকে ক্ষমা প্রার্থনা করার ভঙ্গিতে তাকায়। আমি দুঃখিত, পলিন বলে। আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি। আমি কি তোমাকে একজোড়া ট্যাক্সি ডাকার জন্য অনুরোধ করতে পারি! এ কাজটা করলে আমি খুব খুশি হবো।

ওহ, আমরা কি ট্যাক্সি শেয়ার করতে পারি না? লোকটি বলে।

নিরাসক্তভাবে পলিন বলে, আমরা দু’জন দু’দিকে চলে যাব। এক রকম দম বন্ধ করে চোখে মুখে কাষ্ট হাসি হেসে লোকটি বলে, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। এরপর ঘুরে হোটেলের ডবল প্রবেশদ্বারের দিকে চলে যায়। লিডিয়া ট্যাক্সি কোম্পানীকে ফোন দেওয়ার জন্য রিসিভার তুলে নেয়। পলিনের আচার—আচরণে কোনরূপ পরিবর্তন নেই। হোটল থেকে কলম আর প্যাড নিয়ে তাতে খচখচ করে কী সব লিখে পলিন কাগজটি ছিঁড়ে নেয়। তারপর কিছু টাকা বের করে তা এই কাগজে মুড়িয়ে অ্যাইডানের দিকে এগিয়ে দেয়। লিডিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। বলে, অনেক ধন্যবাদ। এবার লোকটি যে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে সেই দরজা দিয়ে সেও বেরিয়ে যায়।

দরজাটি ঘুরে যখন আবার বন্ধ হয়ে গেল তখনও লিডিয়া ফোনে কথা বলেই চলল। অ্যাইডান বসে শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে লিডিয়াকে ‘গুডবাই’ বলতে শোনে। তারপর ফোনের রিসিভার রাখার ক্ষীণ শব্দ শোনে। অ্যাইডান বসেই থাকে। লিডিয়া ডেস্কের ওপর রেখে যাওয়া নোটটি দেখে। কলমের আগা দিয়ে এমনভাবে এটিকে ঠেলে দেয় অ্যাইডানের দিকে যেন সে এটিকে স্পর্শ করতে চায় না।

ও এটা তোমার জন্য রেখে গেছে, লিডিয়া বলে।

আমার এটার দরকার নেই।

লিডিয়া কলমের আগা দিয়ে নোটটি খোলে। এখানে তো একশ ইউরো রয়েছে, সে বলে।

ঠিক আছে। এটা তুমি নাও।

কয়েক সেকেন্ড লিডিয়া কিছুই বলল না। অ্যাইডান তার চেয়ারে বসে নিস্পৃহভাবে শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ যেন লিডিয়া মনস্থির করে ফেলেছে এমন ভঙ্গিতে বলে, আমি এই টাকা বকশিসের আরও টাকার সঙ্গে রেখে দেব। সে তো তোমাকে একটি নোট লিখেছে। সেটাও কি পড়বে না? আমার মনে হয় এতে শুধু ‘ধন্যবাদ’ শব্দটি লেখা আছে।

বাদ দাও। না হলে আমাকে দাও, অ্যাইডান বলে। লিডিয়া নোটটি তাকে দেয়। ভালো করে না দেখে সে এটা পকেটে ভরে। এবার উপরের তলার অতিথির জন্য পাওয়ার অ্যাডাপটার খুঁজতে সে পেছনের রুমে যায়। কয়েক দিনের মধ্যে পলিন শহর ছাড়বে। আর সে ওর সঙ্গে দেখা করবে না।

 

মূলগল্প: Color and Light by Sally Rooney

লেখক পরিচিতি: স্যালি রুনি আয়ারল্যান্ডের লেখিকা। জন্ম ১৯৯১ সালে। ইতোমধ্যে তিনটি
উপন্যাস লিখেছেন। কনভারসেশন উইথ ফ্রেন্ড্স, নর্মাল পিপল এবং বিউটিফুল
ওয়ার্ল্ড হয়ার আর ইউ উপন্যাস তিনটি পাঠকমহলে বেশ সমাদৃত। ২০১৭ সালে সানডে
টাইম্স ইয়াং রাইটার অব দ্য ইয়ার পুরষ্কার জিতেছেন। এই গল্পটি তার কালার
অ্যান্ড লাইট ছোটগল্পের বঙ্গানুবাদ।

অনুবাদক পরিচিতি:

এলহাম হোসেন
ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি
পেশা অধ্যাপনা
অনুবাদক। প্রাবন্ধিক।
ঢাকায় থাকেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=