ডেফনি প্যালাসি অ্যান্ড্রিয়েডেসের গল্প : খয়েরী মেয়েরা

ও’হেনরি পুরস্কারপ্রাপ্ত গল্প :
অনুবাদ : রঞ্জনা ব্যানার্জী
লেখক পরিচিতি
ডেফনি প্যালাসি অ্যান্ড্রিয়েডিসের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা নিউইয়র্ক শহরের কুইন্সে এলাকায়। ২০২১ এ ও’হেনরি পুরস্কার বিজয়ী ব্রাউন গার্লস (খয়েরি মেয়েরা)গল্পটি অভিবাসী মেয়েদের গল্প। এই গল্পটি পরবর্তীতে তাঁর সদ্য প্রকাশিত (জানুয়ারি, ২০২২) প্রথম উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । উপন্যাসের নামটিও গল্পের শিরোনামেই। অভিবাসী পিতামাতার সন্তান ডেফনি দারুণ মুন্সিয়ানায় তাঁর চারপাশে দেখা গাঢ় কিংবা ফিকে নানা বর্ণের খয়েরি অভিবাসী মেয়েদের নারী হয়ে ওঠার যাত্রাকে এই গল্পে ছেঁকে তুলেছেন। প্রথম পুরুষে বলা গল্পটির মূল চরিত্রের এই বহুস্বরে কথা বলার শৈলীটিই গল্পটিকে অভিনব করেছে।
খয়েরী মেয়েরা
অনুবাদ: রঞ্জনা ব্যানার্জী
খয়েরি মেয়েরা
নিউইয়র্কের কুইন্সের সবচেয়ে গুরুত্ত্বহীন এলাকাতে আমাদের বাস, যেখানে উড়োজাহাজ এতটাই নিচুতে ওড়ে যে মনে হয় ওরা আমাদের নির্ঘাত পিষে মারবে। আমাদের মহল্লায় একটা একলা গাছ বাড়ছে। ওর ডালপালা বিদ্যুতের তারে জট পাকিয়েছে। আমাদের সাইকেলগুলো চুরি যাবার আগে আমরা যে ফুটপাথ ধরে তাদের চড়ে বেড়াই গাছটার শিকড় মাটি ছেড়ে সেই ফুটপাতেরও দখল নিয়েছে। আঁকাবাঁকা দাঁতের সারির মতো উজিয়ে তারা কংক্রিটের চাঁইগুলোর মসৃণতা হাপিস করেছে। বাড়ির সামনের আঙিনায় আমাদের নানীদাদীরা কাপড় শুকানোর দড়ি টাঙিয়ে তাতে বিছানার চাদর, আমাদের ভাইদের হাফপ্যান্ট ঝোলান এবং আমাদের স্নিকারগুলোও ঘষেমেজে আনকোরা করে সেইখানেই রাখেন। ওগুলো নামান! আমাদের মায়েরা চাপা গলায় হিসহিসিয়ে ওঠে। এটা বাড়ি নয়। আমাদের আঙিনাগুলো তথাকথিত লনের সঙ্গে গুলিয়ে না-ফেলার জন্যেই যেন তাতে টমেটোর চাষ হয়, যারা নিজেরাই শক্ত মাটি ফুঁড়ে বেরোনোর রাস্তা খুঁজে নেয়।
আমাদের নানীদাদীরা ছড়ি ছাড়াই চলেন। আমাদের ভাইয়েরা বগলকাটা গেঞ্জি পরে। আমরা সকলেই ইটের দাওয়ার উপরেই বসি। ন্যাড়া মাথা ইতালিয়ান ছেলেগুলো সাইকেলে চেপে আমাদের দেখতে দেখতে সাঁই করে পেরিয়ে যায়, ওদের হাসি ওদের সোনার হারের মতোই আমাদের ঝলসে দিয়ে যায়। আমাদের দাদাদাদীরা বাগানের আগাছা সাফ করেন আর আমাদের ভাইয়েরা সিগারেট ফোঁকে এবং কখনোসখনো ঝাঁঝালো আরও কিছু যা আমরা সনাক্ত করতে পারি না। এই গন্ধ আমাদের মগজে অনুরণন তোলে। আমাদের ভাইয়েরা, যারা সাইকেল চালায়, তারা তাদের সাইকেলের সামনের চাকাগুলো অনেক উঁচুতে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখে।
খয়েরি
তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও, আমরা হলাম 7-ইলেভেন১ রুট বিয়ারের মতো রঙিন। রকওয়ে সৈকতের যে বালি রোদে তেতে আমাদের পায়ের তলায় ফোস্কা ধরায় আমরা ঠিক সেই বালির রঙের। মাটির রঙটিও আমাদের। কাঠকয়লার পেন্সিল যা দিয়ে আমাদের বোনেরা চোখের সীমানা রাঙায়, তার রঙের। আমাদের মায়েদের সুইঁয়ের ফোকরে গলানো সবচেয়ে গাঢ় সুতোটির রঙের। বাদামের তৈরি মাখনের রঙের। ব্যতিক্রমী জিন যার অনিবার্যতায় আমরা যাকে বলে সেই তার মতো তুষার-ধবল হই, কীযেননাম, স্নো-হোয়াইট কি? (গুলিয়ে ফেলো না, তারপরেও আমরা কিন্তু খয়েরি-ই)। সন্ধে সাতটার ধূসরতার মতোই অন্ধকার আমরা, মায়েরা যে সময় ফাঁকা ঘরে আলো জ্বালান। এবং চমকে বলেন, ওহ্‌! তুমি এখানে!
খয়েরি ছেলেরা
খয়েরি ছেলেগুলোর ওপর থেকে আমাদের চোখ সরে না, আগ্নেয়শিলার মতো ওদের চকচকে চুল,ওদের আঙুল, গালের হাড় এবং আমরা ভাবি, ও ঠিক আমার ভাইয়ের মতো দেখতে। কিংবা রেস্তোরাঁর সেই ছেলেটার মতো যে রেস্তোরাঁ থেকে আমরা কাবাব, লেচন২, ঝলসানো মুরগি কিংবা কাঁচা-কলা ভাজা কিনি। ও দেখতে ঠিক সেই ছেলেটার মতো যে আমাদের চাহিদামাফিক বারবিকিউ চিপ্স আর নিয়ানব্বই সেন্টের আইস-টি পরিবেশন করেছিল। দেখতে কী দারুণ, আমরা ভাবি, কিন্তু আমরা ওর সঙ্গে কখনোই বেড়াতে যাব না। অভিসারেও নয়। কেন? কেননা কীভাবে বলি- ও দেখতে ঠিক তেমন নয়- তুমি জানো আমি কী বোঝাতে চাইছি। কেননা ওকে দেখতে – বাদ দাও তাছাড়া, আমরা ওকে বলতে শুনেছি যে ও কেবল ঐ ভেনিসা ক্লিনবার্গের মতো মেয়েদেরই সঙ্গী হয়। আমরা খয়েরি ছেলেদের চোখে চাখি, কান পেতে শুনি ওরা কীভাবে ‘লাইবেরি’ উচ্চারণ করে। ওরা আমাদের মুগ্ধ করে কিন্তু আমরা তাদের পাত্তা দিই না। কেবলমাত্র সেই একদিনই, যেদিন আমরা ক্লাসের সকলে মিলে লাইব্রেরি দেখতে গিয়েছিলাম- সেইদিন বইয়ের তাকগুলোর আড়ালে আমরা কেবল এই খয়েরি ছেলেদের সঙ্গেই স্বর মিলিয়েছিলাম লাই-ব্রে-রি। আমার ঠোঁট লক্ষ কর। এই ভাবে বলো।
সীমানা
দারুণ মজা হবে, বলি আমরা এবং আমাদের সাদা-সঙ্গীদের কুইন্সে বেড়াতে নিয়ে যাই। সাবওয়ে থেকেই আমরা লক্ষ করি আকাশছোঁয়া বাড়িগুলো ক্রমশ হাঁটুমুড়ে ছোট হচ্ছে একইভাবে বোডেগাগুলিও৩। আমরা সেই হাসপাতালগুলো খুঁজে বার করি যেখানে আমরা জন্মেছি, যেখানে আমাদের কারো কারো বাবা-মা পরিষ্কারকর্মী, নার্স, সমাজকর্মী, নথিরক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এটি হলো আমাদের খেলাধুলোর জায়গা এখানে ভাই-বোনদের সঙ্গে আমরা সময় কাটাই, জানাই আমরা। বাচ্চাদের হাতের ঘষায় জৌলুসহীন বাঁদর-ঝোলার ডান্ডাগুলো হাত দিয়ে স্পর্শ করি। আমাদের চারপাশে স্প্যানিশ আর ম্যান্ডারিন, উর্দু এবং টোগালোগ আর ভিয়েতনামী ভাষার হট্টগোল। আমাদের কান এদের আলাদা করতে শিখেছে। জায়গাটা দেখ! ওরা বলে। আমরা আমাদের সাদা-বন্ধুদের হাত ধরে ফুটপাতে হাঁটি (অথবা ওরাই কি আমাদের জড়িয়ে চলে?)। একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখি, হ্যালোউইন নয় তারপরেও সে স্পাইডারম্যানের বেশ পরে ওর দাদীর হাত যাচ্ছে কোথাও।
খয়েরি বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের স্নিকারের শাঁশাঁ আওয়াজ আমাদের কানে আসে। ওদের পা দুরন্ত হাওয়ার গতিতে ঝাপ্সা ছোটে। খয়েরি ছেলেগুলো বলে, হেই-কী খবর? আমাদের সাদা-সঙ্গীদের ওরা দেখেও দেখে না। ওদের চিবুক আমাদের দিকেই তাক করা থাকে। ওদের চোখ বলে, তোমায় দারুণ দেখাচ্ছে, ভীষণ সতেজ। আমাদের চলে যেতে দেখে ওদের কেউ কেউ হাতে বল নিয়ে থামে। ইয়ো! ওর সংগে কাজ শেষ হলে তুমি জানো কোথায় আমাকে পাবে! বন্ধুদের সংগে ওদের হাসির শব্দ আমাদের কানে আসে, আমরা রাঙা হই এবং আমাদের সাদা-সঙ্গীদের হাত টেনে এগোতে থাকি। ‘নারকেল’ আমাদের পেছনে ওরা আওয়াজ দেয়। ছিনাল! আমাদের মূল্যবান অর্জন আগলে ওদের পাশ কাটি – মনে মনে বলি, কিচ্ছু যায় আসে না। শালা, আমাদের সাদা সঙ্গীরা বিরক্ত হয়, এইসবের মানে কী?
খয়েরি ছেলেদের কেউ কেউ ওদের পেরিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের নাম ধরে ডাক পাড়ে। আমাদের অ্যামেরিকান নাম নয়, যে নামে সেই গাদাগাদির ঘরের ভেতর দাদীনানীরা আমাদের ঝাঁকিয়ে ঘুম থেকে তোলে- সেই নামে। ওরা আমাদের সেইসব খুদে ফুলের নামের মতো নামগুলো ধরে ডাকে, আর যখনই সেই নামটি শুনি আমরা জানি ওখান থেকে দ্রুত সরতে হবে আমাদেরকে।
ছায়া
আমাদের সাদা-সঙ্গীরা, আমাদের সাদাসঙ্গী যারা আজ আমাদের স্বামী এবং আধখানা চাঁদ আড়াল হলে যারা আমাদের শরীরের দখল নেয়। যারা আমাদের স্তন এবং উরু আঙুলে পেঁচিয়ে আমাদের নাম উচ্চারণ করে। আরও, আমরা মিনতি করি। জোরে। তুমিই আমার সব। আমাদের হাত ওদের সোঁদা শরীরের পেছনে পিছলে নামে। কেউ বলতে পারবে না যে আমরা আমাদের স্বামীদের সোহাগ করি না, কেননা আমরা তা করি। আমরা আদর্শ স্ত্রী। চোখ বন্ধ কর, আমাদের স্বামীরা বলে। আমরা তাদের বাধ্য। গ্রীবায়, পেটে, কোমরে, উরুসন্ধিতে আমরা ওদের ঠোঁটের স্পর্শ অনুভব করি। কিন্তু চোখ বুজলে যে মুখটি চোখের পেছনে ভাসে, সেটি আমাদের স্বামীদের নয়। তার মুখ। খয়েরি ছেলেদের কারো, যাদের একদা চিনতাম, যাদের আমরা কোনো এক গতকালে ছেড়ে এসেছি। সেইসব খোদাই করা মুখেরা। ধড়ফড়িয়ে উঠি- চোখ খোল, এক্ষুনি! আদর্শ স্ত্রী আমরা আওড়াই মনে মনে । আমরা আদর্শ স্ত্রী।
কোনো এক মেঘলা দিনে চেলসিয়ার নির্মাণ এলাকা পেরোনোর সময় ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। থমকে দাঁড়াই। আরে তুমি? খয়েরি ছেলেটি উজ্জ্বল কমলা ভেস্ট পরা পূর্ণবয়স্ক মানুষ, জানতে চায়। ওর মুখের দিকে তাকাতেই আমরা রাঙা হই, আমাদের বয়ঃসন্ধির কামনার কথা মনে পড়ে, খোলামেলা এবং নিঃসঙ্কোচ সেই কামনা, ওর জন্যে। লোয়ার ইস্ট সাইড ৪। আনন্দ উদ্‌যাপনের জন্যে বন্ধুরা মিলেছি, বিশ ডলারের নোট বারটেন্ডারকে দিতেই জোর ধাক্কা খাই, এত বছর পরেও হুইস্কির সঙ্গে কোক? আমরা ভালো করে তাকাই, চিনে ফেলি সেই খয়েরি ছেলেটি যার বাহুলগ্ন হয়ে রিচমন্ড হিলের নিচের তলায় ঘুরেছিলাম একদা। রেডিওতে আলিয়াহ্‌ তখন গাইছে মৃদুস্বরে। কী কাণ্ড! কেমন আছ তুমি? সারা রাত ওর ওপর থেকে আমাদের চোখ সরে না। ন্যাপকিনের গায়ে আমাদের ফোন নম্বর লিখে দিই। বেরিয়ে আসি, ভেতরের কাঁপন থামে না। বাউয়ারির প্রদর্শনীতে খয়েরি ছেলেটির ছবি দেখি, ওয়াল স্ট্রিটে ওকে দেখি নীল স্যুট পরে হেঁটে যাচ্ছে, দেখি চায়নাটাউনে ডাম্লপিং এর অর্ডার দিচ্ছে, সোহোতে সুশি। না-তাকানোর চেষ্টা করি, এবং সেইসব নারীদেরও নয়, যাদের গায়ের রঙ সাদা এবং খয়েরি ছেলেগুলোর বাহুসংল্গনা, যাদের মাথার ওপর ছাতা ধরে রাখে এই খয়েরি ছেলেরা, কংক্রিটের ফুটপাতে যাদের ওরা চুমু খায়।
নিউ অর্লিন্সে এক বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষ্যে ভ্রমণ করছিলাম আমরা। ‘দুই সহোদরার দরবার’ নামের সেই পানশালায় একজনের দেখা পাই, সে ড্রাম বাজাচ্ছিল। ড্রামের আওয়াজ যেন দেশলাইয়ের আগুন নেভার মতো হিসিহিসিয়ে ঘুর্ণি তুলছে চূর্ণ হবে বলে। আবছা আলোয় কক্ষটি কাঁপছিল। লুইজিয়ানার ভাষা নিউইয়র্কের প্রতি মাইলে পাল্‌টে যাওয়া বাচনভঙ্গির মতো নয়, গলানো চিনির মতোই মোলায়েম। মানুষটি আমাদের রাশ টেনে ধীর করেছিল। অস্থির, অস্থিরমতির নারীদের। সে বাতি নিভাতেই আমরা কামাতুর হই। বাড়ি ফিরি, সেই মানুষটি এবং সেই রাতটি স্বপ্নে চিরস্থায়ী হয়ে রয়। স্বামীদের কাছ থেকে আমরা পালাই। সেই খয়েরি ছেলেটি যে এখন সমর্থ পুরুষ তার জন্যে সমস্ত কিছু ত্যাগ করি। চোখ খোলো, এক্ষুনি।
নোট
১। 7-ইলেভেন: নর্থ আমেরিকার নাম করা চেইনস্টোর।
২। লেচন: শূকরের পেটের দিকের মাংসে নানা ধরনের সুগন্ধি-লতাগুল্ম এবং মশলা পুরে গড়া রোস্ট বিশেষ।
৩। বোডেগা: নিউইয়র্কের স্প্যানিশ অধ্যুষিত এলাকার ছোট পরিসরের মুদিখানা।
৪। লোয়ার ইস্ট সাইড: নিউইয়র্ক শহরের উপকণ্ঠের এলাকার নাম।
৫। বাউয়ারি: নিউইয়র্ক শহরের রাস্তার নাম।

        

   

অনুবাদক পরিচিতি:

রঞ্জনা ব্যানার্জী
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক

কানাডায় থাকেন।

One thought on “ডেফনি প্যালাসি অ্যান্ড্রিয়েডেসের গল্প : খয়েরী মেয়েরা

  • June 15, 2022 at 11:05 am
    Permalink

    ভালো লাগলো।- সমরেন্দ্র বিশ্বাস

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=