সাদিয়া সুলতানা’র গল্প : ঘুমপুতুলের মৃত্যু

ওখানে যেতে হলে অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হয়। জলা-জঙ্গলের পথ না। গলি ঘুপচি, মুখ বোঁজানো নালা আর বর্জ্য উপচানো সরু পথ পেরিয়ে সামনে একটা শ্মশান ডিঙাতে হয়।
শ্মশান গেট পর্যন্ত এগিয়ে গেলে দেখা যায় অবশিষ্ট পথটুকু বেশ মসৃণ। অবশ্য শুরুতে নবনির্মিত গেটের দিকে চোখ পড়লে হৃদপিণ্ড ধুকধুক করে ওঠে। এত চওড়া পরিসরের লাল ইটের প্রবেশদ্বার, সারাক্ষণ কারও না কারও দেহ চুল্লিতে ঢুকানোর জন্য হাঁ করে আছে। আজ কার পালা কে জানে!
অতশত ভাবলে হবে না। এখানে মড়া পোড়ানো চলতেই থাকে একের পর এক। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে টানা পাঁচ ছয় ঘন্টা নাকে মড়া পোড়ানোর গন্ধ লাগে। এই গন্ধ এড়ানোর জন্য সকাল সকাল শ্মশানের উল্টোদিকের রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে তড়িঘড়ি একটা অটোরিকশায় উঠলেও হয়, পাঁচ টাকাই ভাড়া লাগে মোটে। আবার নাকমুখকে খানিকটা পেরেশানিতে ফেলে শ্মশানের নতুন সাজসজ্জা মুফতে দেখা যাবে সেই লক্ষ্যে এই পথ দিয়ে একবার হেঁটে গেলেও মন্দ হয় না।
ঘুমপুতুলের গল্প শুনতে চাইলে পথের কষ্ট তো সহ্য করতেই হবে। কষ্ট সহ্য করেও লোকে বার বার সেই গল্প শুনতে চায়। গল্পকথক গল্পটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বলুক আর না বলুক, তার ঠোঁটের ভাঁজ সম্পূর্ণ খুলুক আর না খুলুক; কালে কালে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা গল্পটায় নিজেদের মতো সমাপ্তি টেনে শ্রোতারা এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে দেয়।
যাহোক গল্পটা এর, ওর কিংবা তার আগে ধরতে গেলে কার্তিকের কুয়াশা দলবদ্ধ হবার আগেই কিন্তু আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে।
সবে পূজার ক্ষণ পার হলো। বাতাসে হিম মিশে আছে। কুয়াশা ঘন হতে হতে বিজন পথ ক্রমে নিথর হচ্ছে। দুদিন আগেও এ পথে হাঁটতে গেলে লোকে শিউরে উঠতো। না, শ্মশানের দেয়াল ঘেঁষা শ্যাওড়া গাছে ঘাপটি মেরে থাকা ভূত-পেত্নির জন্য না। দশমীর দিন সেই যে মন্ডপে মন্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর হলো, সেই সময়ে এই এলাকায় কোনো হামলা-হাঙ্গামা না হলেও পরিবেশ বেশ থমথমে হয়ে উঠেছিল। উঠতি বয়সী মেয়েদের লুকিয়ে ফেলেছিল অভিভাবকেরা। টাকা-পয়সা, গহনাপত্র, দলিল-দস্তাবেজও সরিয়ে ফেলেছিল। রাত জেগে পাড়া-মহল্লার গলিতে গলিতে যুবকেরা টহলও দিয়েছিল। মন্ডপসহ বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশী প্রহরা বসানো হয়েছিল। এই শ্মশানেও। অদূরেই অর্পণ সংঘের উদ্যোগে এখানকার সবচেয়ে বড় মন্ডপে পূজা-অর্চনার আয়োজন হয়েছিল কিনা। আড়ম্বরের সঙ্গে পূজার সমাপ্তি ঘটলেও বিসর্জনের দিন থেকে সমগ্র এলাকায় শ্মশানের নির্জনতা নেমে এসেছে। যেন শেষ হয়নি কিছুই, ভেতরে ভেতরে কিছু ঘটার প্রস্তুতি চলছে।
নিকট ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা না ভেবে শ্মশানের পেছনের পকেট গেট দিয়ে বের হয়ে পঞ্চাশ গজ এগোলেই দেখা যাবে হঠাৎ পথ ফুরিয়ে গেছে, একটা পলেস্তরা খসা লাল ইটের এক তলা ভবনও দেখা যাচ্ছে। হ্যাঁ, ঠিক ঐখানেই গল্পকথকের আবাসস্থল।
শেষবার যারা গল্প শুনতে এসেছিল গল্পকথক তাদের জানিয়েছিল, গল্পের সমাপ্তিটা এখনো বলা হয়নি। কী হলো শেষটায় তা জানার আগ্রহেই আবার সকলে এখানে এসেছে।
এই তল্লাটে একমাত্র সে-ই ঘুমপুতুলের গল্পটা জানে। এই গল্পটা জানতে হলে মৃত্যুর মুখ থেকে তার ফিরে আসার গল্পটাও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কেউ কেউ ভ্রুকুটি করে। বলে, গল্পকথকের মুখের গল্পের চেয়ে লোকজনের প্রচার করা গল্প অনেক বেশি চমকপ্রদ।
ঘুমপুতুলের গল্প শুরু হওয়ার আগে তাই গল্পকথকের বেঁচে ফেরা বিষয়ক প্রচলিত গল্পটা শুনে নেওয়া যাক।
গল্পের প্রথম অংশে জানা যায়, পিঠের দিকে টেনে হাত বাঁধা, চোখে পট্টি লাগানো জনাবিশেক মানুষ আগ্নেয় অস্ত্রের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেবল একজনের হাত বাঁধা হয়নি, অস্ত্রের বাঁটের ঘায়ে তার এক হাত ভেঙে গেছে। ভাঙা ডান হাতটি পতাকার মতো দুলছে। আর একজনের চোখও পট্টিহীন। তার ওপড়ানো চোখের ক্ষত থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। তবু এদের প্রত্যেকের দেহভঙ্গি টান টান। এরা জানে ক্ষণিকের মধ্যে হায়েনার দল এদের দুমড়ানো মুচড়ানো শরীরের ওপরে নিজেদের শরীরের বর্জ্য নিক্ষেপ করতে পারে, তবু মাথা নত করছে না কেউই। কী শৌর্য, কী ঔদ্ধত্য এদের! এত বছর পর সেই গল্প আওড়ালেও শরীরের রোমে রোমে শিহরণ জাগে।
গল্পকথক বিস্তারিত বলতে পারুক আর না পারুক এর পরের অংশটুকু সবাই আন্দাজ করে নেয়।
বুকের পাটাতন গুলিতে ঝাঝরা হবার আগে এরা প্রত্যেকেই ঘুমপুতুলের নাম ধরে ডেকেছে। অদৃষ্টের ফেরে বুকে গুলি বিঁধবার আগেই গল্পকথক মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে। বাতাসের তোড়ে শুন্যে ওড়া শুকনো কাপড়ের মতো টান খাওয়ায় গুলিটা জায়গামতো লাগেনি।
এভাবেই বেঁচে ফিরেছে সে।
প্রকৃতপক্ষে সে বিশদে বলে না কিছুই। মুখটা শুধু ফাঁক করে জানায়, সেদিন তার মুখভর্তি থুতু ছিল, থুতুর রং লাল ছিল কিনা মনে নেই। সেদিন গগনচুম্বী আগুনও ছিল, জল ছিল কিনা তার মনে নেই।
নিজের বেঁচে ফেরার গল্পের বদলে এরপর সে আরেকজনের বেঁচে থাকার গল্প শোনায়। ফেসবুকে ঘুমপুতুলের ঘুম বিষয়ক স্ট্যাটাস দেওয়ার পরও সে বেঁচে আছে। হাত, চোখ, মুখ ছাড়াও দিব্যি বেঁচে থাকা যায়। বেঁচে থাকার জন্য শ্রবণযন্ত্রেরও কোনো আবশ্যকতা নেই।
শ্রোতারা তবু নিজেদের শ্রবণেন্দ্রীয় সজাগ করে। গল্পটা আজ পুরোপুরি না শুনলেই নয়।
গল্পের মূল অংশে ঢোকার বদলে সে জানায় বেঁচে থাকার জন্য ইন্দ্রিয়সমূহের কার্যকারিতা যে ফুরিয়ে এসেছে, সেই বিষয়ে কর্মশালায় অংশগ্রহণ করতে রাজধানীতে ভিড় করছে মানুষ। অংশগ্রহণকারীদের বিদেশ সফরের বিষয়টি কর্মশালার সফলতার উপর নির্ভর করছে।
সে নিজেও একদিন বিদেশে ছিল। ঐদেশের গল্প শোনানোর প্রারম্ভে তার মুখে পাতলা একটা হাসি ফুটে ওঠে। ঠোঁটজোড়াকে আলগাভাবে দুইপাশে প্রসারিত করে সে আশ্চর্যরকম শান্ত ভঙ্গিতে শ্রোতাদের দিকে তাকায়। তারপর হা হা স্বরে অট্টহাসিতে ডুবে যেতে যেতে বলে, ‘একটা জলকাটা যান চলছে…চলছে…পথ জানা নেই…চলছে… ’
সবাই নড়েচড়ে বসে, এইবার রহস্য উন্মোচন হবে। জলের তরঙ্গ ঠেলে পৌঁছানো যাবে তীরে।
কিন্তু গল্পকথক চুপ করে যায়। বোঝা যায় কিছু হাতড়ে বেড়াচ্ছে। খুঁজে পেলেই পুনরায় গল্প শুরু হবে।
একজন সাগ্রহে খাপছাড়া সব প্রশ্ন করে, ‘এরপর কী হলো? ওটা কি জাহাজ? না নৌকা? নূহের নৌকা? নৌকা থেকে নামিয়ে দিলো সবাইকে? তীরে পৌঁছাতে পারল?’
একটা দুটা প্রশ্ন না করলে হয়তো কথক রুষ্ট হবেন, নিজের মতো বুঝে নেবেন তার গল্পে কারও কোনো আগ্রহ নেই। আর কে না জানে একবার প্রশ্ন শুরু হলে উত্তর পাওয়া যাক বা না যাক প্রশ্নের ডালপালা গজাবেই।
‘কোথায় যাচ্ছিল ওরা?’
‘যেতে যেতে কি শ্লোগান দিচ্ছিল?’
‘ওরা কি সবাইকে মেরে ফেলেছে?’
‘না নিজেরাই মারামারি করে মরেছে?’
‘ঘুমপুতুল তখন কী করছিল?’
এবার গল্পকথক নিজেই যেন ঘুমপুতুল হয়ে ওঠে। অগুনতি প্রশ্ন শোনে কিন্তু কোনো উত্তর দেয় না। এত পথ ঘুরে যারা গল্প শুনতে এসেছে, তারা ক্রমে অধৈর্য হয়ে পড়ে। সবাই বুঝে যায় গল্পকথকের স্মৃতি ক্রমে বিস্মৃতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
হঠাৎ হাওয়ার সঙ্গে গরম ভাপ উঠে আসে। শ্রোতারা উসখুস করে ওঠে, এখানে আগুন কোথায়? হোম-যজ্ঞ তো ফুরিয়েছে। সপ্তমীর হোমের আগুন নিভে গেছে নবমীর দক্ষিণান্তেই। তবু এত ওম কোথা থেকে আসছে?
হাওয়ার ওম ওম ভাবটা ক্রমশ তেতে ওঠে। ধোঁয়ার গন্ধ লাগে নাকে। চোখেও ঝাঁঝ লাগে। কেবল জেলে পাড়ার ঘরপোড়া মানুষের হাহাকার এদের কারও কান অব্দি পৌঁছায় না।
তাপ ফের ওমে রূপান্তরিত হয়। শ্রোতারা ওমের আরামে নড়েচড়ে বসে গল্পের শেষটা শোনানোর জন্য গল্পকথককে চাপ দেয়।
অসহিষ্ণু শ্রোতাদের দিকে ডান হাত তুলে ইশারা করে গল্পকথক জানায়, ঘুমপুতুলের গল্পটা সে আর বলবে না। ঘুমপুতুলের মৃত্যু ঘটেছে।

3 thoughts on “সাদিয়া সুলতানা’র গল্প : ঘুমপুতুলের মৃত্যু

  • June 16, 2022 at 5:46 pm
    Permalink

    লেখকের কলম অক্ষয় হোক। গভীর ভাবনার যোগান দেয় এমন লেখা।

    Reply
    • July 4, 2022 at 12:35 am
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ

      Reply
  • June 27, 2022 at 3:05 pm
    Permalink

    সাদিয়া সুলতানা একজন পরিনত লেখক… তার গল্প কেবলমাত্র গল্প নয়, মন ও মগজে তুমুল আলোড়ন তোলা শব্দের ঝঙ্কার! অনেক অনেক শুভকামনা সাদিয়ার জন্য 🌸

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=