হামীম কামরুল হকের গল্প : নিরাকার বন্দুক

ছুটির সময় গ্রামের বাড়ি ফিরে এই বারান্দায় বসে, দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকার সুখের সঙ্গে আর কোনো কিছুর তুলনা চলে না, যদিও এবার কোনো সুখের চোখ নিয়ে তাকাতে পারেননি তিনি। কদিন আগে দুর্ঘটনাটা হলো। লোকজনের বাঁ হাত ভাঙে, তার ডান হাতটা ভেঙেছে। বাঁ হাত ভাঙলেই বরং বিপদ আরো বেশি হতো। তিনি ন্যাটা, বাঁহাতি, এটাই আশ্চর্য! বলেন, ‘খোদাতালায় তো বিশ্বাস করি না, তাও দেখো তিনি কত ন্যায়পরায়ণ।’
–এখন থেকে ডেইলি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বেন।
–ইনশাল্লাহ!… কী শাস্তি আল্লায় দিসে দেখছ! নইলে বয়সকালে এমন বিপত্তি ঘটতে পারে? কল্পনাও করা যায় না! ইয়া মাবুদ রক্ষা করো।
তিনি ঢং করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। অভিনয়টা ভালোই হয়।
তার সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের প্রায় দশ বছর হয়ে গেছে। তার ব্যাপারে কোনোকিছুই তো কল্পনা করা যায় না।
–জীবন আমার উড়ালপঙ্খির জীবন।
একেবারে জোয়ান বয়সে দুম করে মায়মুনার, যাকে তিনি মুনা বলতেন, তার চলে যাওয়া, কেউ কেউ বলে, সিতারাকে ছেড়ে দেওয়ার পাপে বা অভিশাপেই এটা হয়েছে। পাপে-অভিপাশে তার বিশ্বাস না হলেও দেখেছেন, তার জীবনটা আগুনের নদীর ওপর দিয়ে ভেসে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ও পাশ করা নিয়ে তার বিশেষ গর্ব ছিল। সদ্য পরিচিত কাউকে কিছু ক্ষণের মধ্যে এই কথাটা জিজ্ঞসা না করা পর্যন্ত বুকের ভেতর খচ খচ করতেই থাকত– প্রবল জানার আগ্রহ হতো: ওই সদ্য পরিচিত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে? তার ধারণা হলো: বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পড়েনি, সে তারচেয়ে নিম্ন বা তার স্তরের নয়। ফলে কোটিপতি-লাখপতি বা যত বড় প্রতিভাবানই হোক না কেন– বিশ্ববিদ্যালয়ে না-পড়া মানুষ তার কাছে গণ্য কেউ নয়।
তাকে এটা তার এক সহকর্মী ধরিয়ে দিয়েছিল, এবং বলেছিল, তিনি যেন এটা যতটা পারেন কম করেন। আপনি কোন এলাকার? কোন স্কুলে পড়েছেন? কলেজ কোনটা ছিল? এই ধারায় তার চূড়ান্ত প্রশ্ন: ‘‘আপনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন?’’ এছাড়াও তার আরেকটা খাইসলত: কখনো স্বর্ণালী নাজনিন, কখনো তারানা প্রভাবতী, কখনো রুখসানা জয়তী ইত্যাদি মেয়ের নাম দিয়ে দিয়ে অত্যন্ত রূপসী মেয়েদের ছবি দেখিয়ে দেখিয়ে বলা: এই চির-অতৃপ্ত ও বিবাহিত নারীদের তিনি চরমসুখ দিয়ে আসমানে তুলে দিয়েছেন, আর মেয়েগুলিও পারে বাব্বা, যে খাঁই একেকটার, বলে খিক খিক হো হো হাসি তিনি হাসেন। ফেসবুক থেকে ছবিগুলি তিনি ডাউনলোড করে রাখেন।
কেউ কেউ ধরে ফেলতে পারে এর সবই বানানো গল্প। এইসব গল্প বলে তিনি আজব এক পুলক বোধ করেন, সেটাকে বিকৃতও কি বলা যায়? যেমন তুমি তার এধরনের সব গল্প, মজা করে শোনো, তারপর মনে মনে হাসতে হাসতে নিজের বাসায় ফিরে আসো।
অথচ তার মূল যে-গল্প, জোহরা পারভিন সিতারাকে নিয়ে, সেই গল্পটা তিনি প্রায় কখনোই বলেন না, বরং মুনার গল্প ও তার জন্য বেদনার কথাই তিনি ঘুরে ফিরে বার বার বলেন। মুনা বলে মীণাক্ষি শেষাদ্রীর মতো দেখতে ছিল। এটা তিনি বহুবার বলেছেন। মুনা ও তার একটিই সন্তান: ছেলে। মুনার মৃত্যুর পর পরই মুনার পরিবার সেই ছেলেটাকে নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে। তার মতো উড়নণ্ডী, চালচুলো ঠিক নাই, মানুষের কাছে একে রাখলে বারোটা বেজে যাবে।
তিনি ওপরে ওপরে দেখিয়েছিলেন, তার এতে দীর্ঘশ্বাস নেমেছিল বুক জুড়ে, বড় একটা বেদনার ক্ষত তৈরি হয়েছিল, আসলে তিনি নিজের কানেই চুপি চুপি বলেছিলেন, ‘যাক বাবা বাঁচা গেছে’। সেই ছেলে এখন চাকরি করছে, বাপের সঙ্গে দেখা করতে আসে গাড়ি নিয়ে।
এ এক অদ্ভুত ছেলে, বাপের সম্পর্কে হাজার গ্যালন বিষ ঢেলেও মুনার পরিবার বাপের প্রতি তেমন কোনো ঘেন্না তৈরি করতে পারেনি– দেখে তিনি আশ্চর্য হয়েছেন। ছেলেটার বাপের জন্য আবার অত আহ্লাদও নেই। সব কিছুর সঙ্গে একটা দূরত্ব রেখে সে চলে। বিরাট বড় চাকরি করে। সেই চাকরির জন্য, তাকে যোগ্য করে তোলার জন্য, মুনার পরিবারের প্রতি তিনি সারা জীবনের জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে আছেন বলেই, তাদের প্রতি, তার পুত্রকে ছিনিয়ে নেওয়া, আর কখনোই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়ার বিষয়টি– তার কাছে তত অমানবিক বলেও মনে হয় না। তিনি হলে পুত্রকে ঢাকার সবচেয়ে ভালো স্কুলে পড়িয়ে এভাবে এক বড় করতে পারতেন না।
দেখে বোঝারও কোনো উপায় নেই যে, এ তার ছেলে। ঠিক মুনার মুখের আদলে পুরোটা তৈরি, মুখ, চোখ; তাই বলে একদমই মেয়েলি নয়, পুরো পুরুষালী, একটু বেশিই পুরুষালি বরং, লম্বায় পাঁচ ফুট দশ, চওড়া কাঁধ, চেতানো বুক, দিঘল বাহু, ভারী কব্জি, বলিষ্ঠ ঊরু-জঙ্গাওয়ালা– তিনি নিজের পুত্রকে দেখে তার নিজের বীজের না মুনার গর্ভের প্রশংসা করবেন বুঝতে পারেন না।
মুনা দুম করে লিউকেমিয়ার মারা না গেলে তার সঙ্গে এতদিনে ত্রিশ বছরের সংসার হয়ে যেত। আর সিতারা? সিতারা তার জন্য পাগল ছিল, কিন্তু বিয়ের শুরুর কটা দিন বাদে, সিতারার প্রতি তার কোনো টান তৈরি হয়নি। আর সেজন্য তাকে ছাড়তে তাকে তেমন কষ্ট হয়নি। তবুও সিতারা তার জীবনের বড় একটা ‘কিন্তু’ হয়ে রয়ে গেছে।
তোমাকে বা কাউকে না বললেও, তিনি বার বার সিতারার সেই দৃশ্যটি দেখতে পান: যেদিন তিনি সিতারাকে খবরটা দিয়েছিলেন… সিতিরা তখন ক্লাস টেনে উঠেছে, তিনি সেই সময়ে ঢাকার একটা বেসরকারি কলেজে দারুণ ভালো বেতনে চাকরি করেন। ওই চাকরি যুগপৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষক হতে না পারার আফসোস দূর করে দিয়েছিল, আবার তার সব রকমের সর্বনাশ ঘটিয়েছিল।
সিতারাকে খবর দিয়ে আনিয়েছিলেন। স্কুলের আকার ছিল ইংরেজি ইউ-র মতো, মাঝে বিরাট একটা মাঠ, সেই মাঠের মাঝের ওপরের বিন্দুতে তিনি দাঁড়িয়ে, সিতারা তার দিকে এগিয়ে আসছে, কী উচ্ছল, চোখ মুখ আনন্দে ঝিলমিল, দেখে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ঠিক ওই দিন, ওই সময়ে, ওইভাবে তিনি কেন সেটা বলে দিয়েছিলেন, যে সিতারার সঙ্গে তার আর থাকা সম্ভব হবে না, কারণ তিনি আরেক জনকে বিয়ে করতে চলেছেন, ফলে তিনি তালাক দিতে চান– এই কথা শুনেই সিতারা এক আকাশফাটানো চিৎকার দেয়, ‘‘ইয়া আল্লাহ!’’ নিজের বুক খামচে ধরে সে মাটিতে পড়ে যায়, তারপর তার স্কুলের তার প্রিয় শিক্ষিকা জেবুন্নেসা আখতার এসে তাকে সামলাতে না আসা অব্দি সে মাটিতে একবার ডানে কয়েক গড়ান দিয়েই চলে, আর সঙ্গে চিল চিৎকার আর কান্না। একবার বাঁ দিকে কয়েক গড়ান দিয়ে, আবার ডানে, এভাবে গড়ানোর কাজটা করেই চলছিল। তার স্কুলের সাদা পোষাক ধুলায়-মাটিতে মেখে একাকার।
তিনি কথাটা বলেই দাঁড় করানো রিক্সায় উঠে চলে গিয়েছিলেন।
২.
তুমি তার কাছে কেন আসো? তার মতো অমানুষের কাছে?–এই প্রশ্ন তিনি তোমাকে প্রায়ই করতেন।
–কেন আসো আমার কাছে? আমি একজন ব্যর্থলোক। তার ওপর আস্ত অমানুষ। আমার কাছে তোমার কী? এসো না আর আমার কাছে। কিছু প্রমাণ করতে পারলে তবে এসো আবার। তার আগে নয়।
তিনি তোমাকে তোমার নিজের কাজ করতে বলতেন। ‘সময় গেলে সাধন কি আর হবে?বীজের জোরে গাছ যদি হয়, ফল কি ধরে?’ তুমি তাকে বল, সফল মানুষদের কাছে তোমার কিছু শেখার নেই, ব্যর্থ মানুষেরাই তোমার আদর্শ। তিনি চারটি বিয়ে করেছেন, একজনের সঙ্গে তালাক, একজন স্ত্রীর মৃত্যু, আরেকজনের ভয়াবহভাবে অসুস্থতায় অকেজো অক্ষম হয়ে যাওয়া, আর এখন যে তার সঙ্গে আছে, তাকে তিনি নিজের গ্রামের বাড়িতে অনেকদিন নিয়ে আসতে পারেননি, মেয়েটি একটু বেশিই অল্প বয়সি। ওই মেয়ের মা বাড়ি বাড়ি ধাত্রীর কাজ করতেন। এই মেয়ের একবার বিয়ে হয়েছিল, বাবা নেই। এই মেয়ের মা বিয়েতে বরের বাড়ির আবদার চাহিদা, সোজা কথায় যৌতুক/পণ না দিতে পারায়, ওই স্বামী তাকে ছেড়ে দিয়েছে, এখন মেয়েটির সঙ্গে তিনি আছেন, বিয়েও করে নিয়েছেন। কচিমেয়ে, কিন্তু ভরাট শরীর।
এক রাজনৈতিক নেতার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার অভিযোগে ঢাকার ওই কলেজ থেকে তাকে পদত্যাগ, আদতে বরখাস্ত করা হয়। ছাত্রীদের সঙ্গে প্রেমের অসংখ্য অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল, তিনি কোনোদিন একটিও স্বীকার করেননি। মুনা মারা যাওয়ার পর তিনি জীবনের সিংহভাগ সেখানে কাটিয়েছিলেন। বিরাট বেতনের বড় অংশ শেরাটন বা সোনারগায়ে নিজের ও বন্ধুদের, মদ খেতে ও খাওয়াতে খাওয়াতে গেছে। চাকরি চলে যাওয়ার পর তিনি দেখেন: ওই বন্ধুরা সব হাওয়া হয়ে গেছে। কেউ তার ফোন ধরে না, দেখা হলে এড়িয়ে চলে, দেখা করতে চাইলে, পরে আসতে বা বলে; বলে, ব্যস্ত। থাকার মধ্যে গ্রামের কিছু জমিজমা করেছিলেন, তাও তার এক চাচাতো ভাইয়ের বুদ্ধিতে, নইলে কিছুই থাকত না।
সিতারাকে বিয়ে করার কারণ: শ্বশুর তার পড়ালেখার ভার নেবেন, ফলে কলেজে পড়ার সময় সিতারার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সিতারার সঙ্গেই কাটে। তখন সিতারা বলতে গেলে বাচ্চা মেয়ে, কেবল ক্লাস সিক্সে পড়ছিল, আর সেই মেয়ে ক্লাস টেনে পড়ার সময় তার কাছ থেকে তালাক পায়। মুনা বিয়ের তিন বছরের মধ্যে মারা যায় দুম করে। তারপর তার জীবনটা ছন্নছাড়া হয়ে যায়, আর ওমন নামিদামি কলেজে এত বেতনের চাকরি চলে যাওয়ায় তিনি অতল গহŸরে পড়েন, অথচ দেশের সব নামিদামি লোকের সঙ্গে তার চেনাজানা ছিল। পরিচয় শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে। কেবল নামিদামি লোকই নয়, সমাজের নানান স্তরের প্রভাবশালী লোকের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল আগাগোড়া। তিনি এঁদের একজনকেও নিজের কাজে কোনোদিন ব্যবহার করেননি। একটা ভালো কায়দার চাকরি জোটানো, তোমার ভাষায় ছিল তার জন্য ছিল ‘ওয়ান-টু ব্যাপার’, সেটা তিনি করেননি। বলেন, ‘কোনো হালারে নিজের জন্য খরচ করি নাই!’
তিনি নিজের জন্য অদ্ভুত একটা জুয়ার খেলার বোর্ড সাজিয়েছিলেন। জীবন তাকে কোথা থেকে কোথায় নেয়– দেখার জন্য গুটি চালতে শুরু করলেন। গুটি মানে বেঁচে থাকার চেষ্টা, চাকরির চেষ্টা। এদিকে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হচ্ছিল না, কয়েক মাস বকেয়া পড়ে যায়। এক ছাত্রের বাড়িতে ভাড়া ছিলেন বলে রক্ষা। কোনোমতে বুয়ার মাসের পাওনা টাকা আর খাওয়াটা চালিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো গতি করতে পারছিলেন না। শেষে অতি সামান্য বেতনে, যা কলেজের চাকরির চারভাগের একভাগও নয়, তাতেই বাধ্য হয়ে একটি দৈনিক পত্রিকায় ঢুকে পড়েন, তারপর এই দৈনিকম, সেই দৈনিক; দু-দুটো সাপ্তাহিক পার হয়ে, ফের তিনি ফিরে আসেন মাস্টারির কাজে। নিজের জেলায়, একটা আধাসরকারি ধরনের কলেজে, ততদিন চাকরির জীবন অবসরের সীমান্তে এসে ঠেকেছে।
তোমার সঙ্গে তার দেখা পত্রিকা অফিসেই। তুমিও তখন জীবনের বিচিত্র তলে-অবতলে সুর খুঁজতে ও মেলাতে চেয়ে বার বার হোঁচট খাচ্ছিলে। বেশ কদিন বেকারও ছিলে। ওইসময়ে একদিন বলেছিলেন, ‘একটা ঠিকানা দিই। সেখানে গিয়ে আমার কথা বললেই হবে। যাবে?’ তুমি তৎক্ষণাৎ দ্বিধাহীনভাবে ‘না’ বলেছিলে। শুনে বলেছিলেন,‘তোমার অহংকারও কম না। তুমিও আমার মতো কোনো বালও ছিঁড়তে পারবা না!’
বিদ্যুতের মতো এই কথাটা, সেদিন থেকে, তোমার মাথায় সারা জীবনের জন্য ঢুকে পড়ে। এই কথাটা যেন তোমার পিঠে একটা বন্দুকের নল হয়ে ঠেঁসে বসে। তুমিও ঠিক করো: সমস্ত পতনের ভেতরেও যেকোনোভাবে হোক উঠে আসতেই হবে। জীবনে জেতা-হারা বড় নয়, হাল ছাড়া যাবে না। কীসের সে হাল? তুমি জানো, তিনিও জানতেন, কিন্তু সময় লেগে যায় আরো, তিনি বলেছিলেন,‘রাজাকারের ক্র্যাচ বগলে থাকা সরকার ও এর গং, তোমাকে তোমার চাওয়া জায়গাটায় পৌঁছানোর কোনোমাত্র সুযোগ দিত না।’ তাও তুমি জানতে: আগুন হয় নিভে যাবে, নয় জ্বলবে। আগুন কখনো ঠান্ডা হবে না। ফলে নিভে যাওয়ার আগে বার বার জ্বলে উঠতে হবে! আর মনের আকাশে হরদম তারার মতো জ্বলতে-নিভতে থাকে তার ওই কথাটা। একটি অতি সামান্য কথা, তাও অশ্লীল-অকথ্য, সবার সামনে বলার যোগ্যও নয়, আগে হলে মুদ্রণ অযোগ্য বলেও বিবেচিত হতো– এমন একটা কথা তোমার পথ দেখানোর মন্ত্র হয়ে উঠেছিল দেখে তুমি একসঙ্গে চমৎকৃত ও বিরক্ত হয়ে ছিলে নিজের প্রতি।
একটা বাজে কথাই তোমাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। বাজি ধরার মতো করে তোমাকে তুমি বলে গিয়েছ: অহংকার যতই হোক বা না হোক, তুমি তোমার জায়গায় পৌঁছে তবে তার কাছে যাবে। তিনি যখন চাকরির অন্তিমে, তুমি ঠিক তখন তোমার জায়গায় ঈপ্সিত জায়গায় পৌঁছে তার সঙ্গে দেখা করতে যাও। সেদিন কাকতালীয়ভাবে তার পুত্রটিও বাপকে দেখতে এসেছিল। তিনি ছেলেকে তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন: ‘এই যে, এই হলো– আমার আয়রনম্যান। আর এ হচ্ছে ব্যাটম্যান(তোমাকে দেখিয়ে বলেন)।’ হা হা হা হো হো করে হেসে ওঠেন, তার সঙ্গে তুমিও হেসে ওঠো।
ছেলে বলে, ‘নতুন আখ্যা দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ আব্বু।’
তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ‘এই যে তুমি তোমার এই অযোগ্য বাপকে আব্বু বলে ডাকতে পারো, এইটাই তোমার আয়রনম্যানশিপ।’
কথাটা বলতে গিয়ে তার চোখে জল ঝিঁকিয়ে ওঠে, মুখে আবার হাসিতে ভরা, কিন্তু কথাটা বলা শেষ হতেই তিনি ওপরের পাটির দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরেন। তার চোয়াল ও ঠোঁটের জায়গায়টা থিরথির করে কাঁপতে থাকে। ছেলেটিকে তুমি দেখতে থাকো। সে কোথাও প্রথম এসেছে এমন করে এদিকে ওদিকে কী একটা খোঁজার জন্য ডানে বাঁয়ে ওপরে নিচে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেই যাচ্ছে।
— কী নাম যেন ওর?
–সৌম্য সুদীপ্ত রহমান। ওর জীবনে আমার একমাত্র অবদান। ওর নামটা।
বেশ একটা গর্বের আভাস ছিল তাঁর কণ্ঠে। ‘একদম ওর মায়ের মতো সব।’ বলে, তিনি আবার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরেন। এবার মনে হলো কেঁদেই ফেলবেন।
সৌম্য সুদীপ্তের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ছেলের জন্য ভেতর-বাড়িতে তার সর্বশেষ স্ত্রী ভুনা খিচুড়ি করছে। সেদিন সকাল থেকেই কেমনধারা বৃষ্টি বৃষ্টি চলছিল। হয়, থামে। আবার শুরু হয়। আবার থেমে আবার। দিনটা খিচুড়ি খাওয়ারই দিনই। তুমি আধাভিজে তার বাড়িতে বেলা বারোটা কি সাড়ে বারোটার দিকে গিয়েছিলে। ছুটির দিন। শুক্রবার। জুমার সময়।
ছেলে জুমার নামাজ পড়তে যায়। একটা ছাইরঙা পাঞ্জাবি পরেই এসেছিল। টুপি মাথায় বেরিয়ে পড়ার সময় বাপ ও ছেলের দিকে তুমি তাকিয়ে, তাদের ভাবভঙ্গি দেখার চেষ্টা করো। সৌম্যের মধ্যে কোনো বিকার তো নেই, একদম স্বাভাবিক ভঙ্গি নিয়ে সে চলে যায়। আর তিনি সেদিকে তাকিয়ে প্রথমে মিটিমিটি হাসতে থাকেন, পরে এই মিটিমিটি হাসি বাড়তে বাড়তে হো হো হাসি হয়ে ওঠে। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি চলে আসে। প্ল্যাস্টার করা ডান হাতটা বাঁ কাঁধের সঙ্গে ঝোলানো। তিনি বাঁ হাত দিয়ে সেই দড়িটা নামিয়ে হাতটা চেয়ারে রাখেন, হাসতে হাসতে তিনি ক্লান্ত হয়ে গেছেন। তুমি তার এই কাণ্ডের ভেতরে আগুপিছু করে তার জীবনের সব ছবি দেখতে থাকো।
তিনি একদিন বলেছিলেন, শুধু এই রূপ, এই প্রেমের টান– তার সারাজীবনটা ছ্যাড়াব্যাড়া করে দিয়েছে, নইলে কী ছিল না তার? ইংরেজি পড়েছেন, তাও বিশ্ববিদ্যালয়ে! বাংলাদেশে তার আমলের ইংরেজি-পড়া ছাত্ররা কোথায় কী অবস্থায় আছে, খোঁজ নিলেই তুমি জানতে পারবে, তারা কোথায়, আর তিনি কোথায়, অথচ তাদের অনেকেই স্বয়ং তাকে গুরু বলে মনে করতেন, মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যিই– সিতারার অভিশাপে কিনা…।
তিনি তেমন করে কোনোদিন সিতারার কথা বলেননি: কোথায় আছে? কেমন আছে? ভাগ্যিস তাদের কোনো সন্তান ওই সময়ে হয়নি। ঘটনাচক্রে সিতারার প্রিয় শিক্ষিকা, ওই জেবুন্নেসা আপার সঙ্গে তোমার একদিন দেখা হয়ে যায়। আলাপের সূত্রে জানতে পারো: সিতারা দারুণ সংসার করছে, খুব ভালো একজন স্বামী পেয়েছে, কোনো একটা সরকারি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করছে। সিতারা মাঝে মাঝেই ওই শিক্ষিকার সঙ্গে দেখা করে। এসে যা বলেছে, তাতে তিনি বুঝেছেন, সে তার আগের স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ভুলতে পারেনি, তাকে সে ক্ষমা করেছে ঠিক– তা নয়, সে ছিল তার কাছে সুরোলোকের দেবতার মতো, সেই দেবতা যখন অসুর হয়ে গিয়েছিল, তাও সিতারা তাকে কোনো অভিশাপ দেয়নি, কিন্তু জেবুন্নেসা বলেছিলেন, ‘মানুষের মনের কথা কে বলতে পারে? কারো মনের সত্যিকারের কষ্ট আর কেউ না হোক, আল্লাহতালা তো জানেন, আর তিনি তো বলেইছেন: আমার সঙ্গে করা তোমাদের সকল অন্যায় আমি ক্ষমা করতে পারি, কিন্তু মানুষের সঙ্গে করা অন্যায়– তারা ক্ষমা না করলে আমি ক্ষমা করতে পারি না। সিতারা ক্ষমা যদি পুরো করে না থাকে, তাহলে ক্ষমা আসলে হয়ওনি। আর আদতে দারা যে অন্যায় করেছে, তুমি বলো তার কি কোনো ক্ষমা হয়? যে-মেয়েটা তাকে এত ভালোবাসতো, তাকে দেবতার মতো দেখত, তার সঙ্গে বেঈমানি করে দারা কোনো কালে সুখী হতে পারে না। তাহলে আসমান-জমিন সব মিথ্যা হয়ে যেত, ইনসাফ বলে জগতে আর কিছু থাকত না।’
২.
বারান্দায় বসে থেকে, একটা চেয়ারে, সামনে একটা টুলে পা রেখে বেশ আয়েশে, তিনি বলছিলেন, ‘এই যে সামনে দেখো, আগামী তিন হাজার বছরে এখানে কিছু হবে না। এই মাঠ এই বিল সামনে, তাই না! আমার ঠিক মনের মতো জায়গা হলো এই বারান্দাটা। এখানে বসলে আমি ভুলে যাই যে, আমি একুশ শতকের কোনো মানুষ। মনে হয় আদিম যুগের কেউ। আর আদতে তো মানুষ তো কোনোদিন সভ্য হতে পারে না। সে কেবল বাইরের পোষাক বদল করেছে, ভেতরে ভেতরে তো সেই পশুটাই রয়ে গেছে। কী বলো সদ্য মাস্টার হওয়া রাশেদ আন্দালিব ওরফে শিশ্ন, সরি শীর্ষ?’ এভাবেই তিনি তোমার নাম আগেও বহুবার বলেছেন। আর আশ্চর্য তোমার তখন হো হো করে পেটে ফেটে হাসি আসে।
তিনি বলেন, ‘হেসো না হে বালক। আজকাল পুরো দেশের মানুষ পার্টসলেস-গাটসলেস হয়ে গেছে। আমি পার্টসের জন্য একটার পর একটা বিয়ে করলাম, আর গাটসের জন্য কেবলই ব্যর্থ হয়ে গেলাম।’ উদ্দাত্ত কণ্ঠে তিনি আবৃত্তির মতো করে বলেন:‘‘মানুষের লালসার শেষ নেই;/উত্তেজনা ছাড়া কোনো দিন ঋতু-ক্ষণ/ অবৈধ সংগম ছাড়া সুখ/অপরের মুখ ¤øান করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ/ নেই।’’ ‘এই সব দিনরাত্রি’, শ্রেষ্ঠকবিতা, জীবনানন্দ দাশ, পড়েছো?
–না।
–তা পড়বে কেন? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবা, প্লেটোর মতো কবিদের খেদায় দিবা, তাতে রাষ্ট্রও হবে না, বিজ্ঞান তো কোন ছার। দুটো এটম বোমা ফাটিয়েছে, আবার মানুষের সঙ্গে মানুষের মনের দূরত্ব বাড়িয়েছে: ‘‘বিজ্ঞান তো সংকলিত জিনিসের ভিড় শুধু– বেড়ে যায় শুধু;/তবুও কোথাও তার প্রাণ নেই বলে অর্থময়/জ্ঞান নেই আজ এই পৃথিবীতে; জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই।’’– এটা ‘১৯৪৬-৪৭’, একই বইতে আছে, পড়ো এসব! নইলে মরো। শালা! আমি শালা একটা হেরো অকেজো লোক, আর তুমি… না, তোমাকে আর কী বলব?’
তুমি বল,‘জগতে কেউ কি আসলে পুরোপুরি ব্যর্থ বা সফল হয়? একটার ভেতরে আরেকটা ঢোকানো থাকে, তাই না?’
তিনি বলেন,‘সেই জ্ঞান তুমি আমারে দিও না বালক! চারদিকে লোভের লক লকে ফণা। তোমার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপনা, আর আমার জন্য মাইয়ামানুষের রূপযৌবনের ডানা। বুড়া হইয়া গেলাম, শালার খায়েস মিটল না। আখেরে সব শূন্য, তুমিও যে লাউ, আমিও সেই কদু। বুঝলে চাঁদু?’ বলে তিনি একটু হাসেন।
হঠাৎ কী মনে হলে তুমি বলো,‘ছেলেকে বিয়ে দেবেন না?’
–সে লায়েক হইছে। বিয়ে করবে না শুধু ফাকিয়ে বেড়াবে, সে জানে। আমি বলার কে? বিয়ে দেওয়ার আমি কে? সময় বলে দেবে: কী করিতে হইবে? লেনিনের বই না পড়িলেও, কিছু মানুষ যার যার জীবনে টের পেয়ে যায় কী করতে হবে। তুমি যেমন পেয়েছ। তুমি এখন ভাগ্যবান। আমি চিরদিনের কপালপোড়া।
–আপনার তো সব ছিল। কিন্তু কেবল জুয়া খেলে গেলেন। জুয়ারও কিন্তু জ্যামিতি আছে, এত খেলেও সেটা বুঝলেন না?
–বাহ, আজকের দিনের সেরা কথা কইলা– ‘জুয়ার জ্যামিতি’– বাহ! জীবনানন্দ দাশে মনে হয় না শব্দটা আছে। সব তো আর পড়ি নাই। নাই বোধ হয়। দেখুমনে পরে।
তিনিও বার বার যেটা বলেন, সেটা আজকেও বললেন, ‘আচ্ছা তুমি আমার কাছে কেন আসো কও তো?’
তুমিও উত্তর বার বার যেটা দিয়ে আসো এবারও সেটা দাও,‘একজন ব্যর্থ মানুষকে দেখতে।’
–দেখে কী লাভ হয়?
–অনেক লাভ হয়।
–যেমন?
–এই যে আমি। আজকের আমি। এটা হতো না– আপনার সঙ্গে দেখা না হলে।
–তাইলে তো আমি তোমার গুরু। আমার গুরুদক্ষিণা কোথায়?
–ব্যাগের ভেতরে আছে।
–পাইলা কই?
–এক বন্ধু দিসে। কাস্টমসের বন্ধু।
–বাহ।
–তাড়াতাড়ি বাইর করো। গুল্লি শুরু হোক। জয় গুরু। এনজয় গুরু।
ষাট পার হওয়া লোকটা নিমেষে ছেলে মানুষ হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=