অমর মিত্রের উপন্যাস : করোনার কালবেলা চিহ্নিত এক আখ্যান

পুরুষোত্তম সিংহ
পন্যাসকে আজ কালচারাল টেক্সট হিসেবে দেখতে বড় পছন্দ করি। এই উপমহাদেশের চলমান সংস্কৃতি, প্রবাহিত সময় সরণির সোজা-গলিপথের সাংকেতিক চিহ্ন, রাষ্ট্রের বিভাজিকা, ধর্মের বৈষম্যকে সামনে রেখে যে বৃহত্তর পুঁজিবাদ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে তার সমস্তটাই বয়ানে স্পষ্ট হয়ে উঠুক। স্পষ্ট হয়ে উঠুক ব্যক্তি-সমষ্টির দ্বন্দ্ব, পঙ্ক কালচারের হেজিমনির মধ্যে সচেতন ব্যক্তির দ্বিরালাপ। যে ধর্মমোহ টনিক হিসেবে, সংস্কৃতিক পরিসর হিসেবে, ব্যক্তির আইডেনটিটি হিসেবে মানুষের মধ্যে চাপিয়ে দেওয়ার কায়দা-কৌশল রাষ্ট্রশক্তি (ছোটো-বড়) ক্রমেই প্রয়োগ করে যাচ্ছে, যে জোলো সত্যকে জ্ঞানলিপ্সার সত্য হিসেবে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সাধারণ মানুষ বুঝেই উঠে পারছে না তা গ্রহণ উচিত না অনুচিত, এ থেকে মানুষের মুক্তি কীভাবে? আজকের আখ্যান থেকে এই সত্যগুলি বুঝে নিতে চাইছি। সময়ের সন্তান হিসেবে একজন লেখকও তো এই নষ্ট সময়ের কাছে দায়বদ্ধ। ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে মহাকালের বিবিধ রহস্য, প্রকরণ, সিস্টেমের কারখানার যাবতীয় নাট বল্টু, স্ক্রু বোধহয় উপলব্ধি সম্ভব নয়। ফলে বহু ক্ষেত্রেই উপন্যাসের পরিসর ছোটো হয়ে আসে। আবার এও সত্য একাধিক বয়ানকে সামনে রেখে লেখকও পাঠকের মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করতে চান না। এই এলোমেলো আভাস, আকার ইঙ্গিতকে সামনে রেখে আসলে একটি আখ্যানকে(মার্কো পোলোর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ২০২২/অমর মিত্র) বুঝতে চেয়েছি।
করোনা আমাদের এ শতকের একটা বৃহত্তর মহামারি। সময় পরিসরে স্বল্প হলেও গোটা বিশ্বের মানুষের রুদ্ধশ্বাস ওষ্ঠাগত করে ছেড়েছিল। প্রযুক্তির মানুষ যখন ভয় ভীতি দূর করে ল্যাপটপে ঈশ্বর, ভূত গড়তে সক্ষম সেই সময়ে আবারও মানুষকে ভীত করে তুলতে সফল হয়েছিল। পৃথিবীনামক বন্দিশালায় আমরা স্বাধীন হলেও মৃত্যুর কাছে পরাধীন, এমনকি সে মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে, সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেও, বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করেও গরিব-বড়লোকের কোনো তফাত নেই তা আরও একবার জানান দিয়ে গেল। বোধের উন্মোচন হল কিনা জানি না, লোভ হিংসার বিসর্জন ঘটল কিনা তাও অজ্ঞাত, কিন্তু এও জ্ঞাত একটা স্থির সত্য মানুষকে স্পর্শ করে গিয়েছিল। মৃত্যু। একটি কালকে, একটি মহাকালের বিরাট পরিসরকে ধরা একজন লেখকের পক্ষে অসম্ভব। তেমনি মহামারিকে উপলক্ষ করে আমরা যখন সকলেই গৃহবন্দি তখন পৃথিবীর আনাচে-কানাচে বিবিধ সত্য-মিথ্যের রহস্য উন্মোচন হল। বিপন্ন মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা ও পার্টি সর্বস্ব দলদাস রাষ্ট্রের ক্রিয়াকর্ম, সভ্য দেশের অসভ্য বিবেক, মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠল। আয়তনে স্বল্প হলেও এই বিরাট সময়কে একজন লেখক কীভাবে ধরবেন? শ্রীমিত্র বয়ানের নতুন টেকনিক আয়ত্ত করলেন। যা বিকল্প আধুনিকতার সন্ধান দিচ্ছে। বহু মানুষের বয়ান, বহু লেখকের স্টেটমেন্টকে সামনে রেখে আখ্যান উপস্থাপন করলেন। আসলে তিনি সময়কে লিখছেন, সময়ের চালক হিসেবে আমরা সকলেই যেন আখ্যানে প্রবেশ করে যাচ্ছি। নিজেদের অভিজ্ঞতা, লেখকের বক্তব্য, টুকরো সংবাদ, বাস্তবের আড়াল খুঁজতে অতীতের রহস্য, মরীচিকা উন্মোচন করে দিতে অতীত থেকে বাস্তবে প্রবেশের মধ্য দিয়ে যে আখ্যান নির্মিত হল তা যথার্থ অর্থেই আধুনিক। দক্ষিণী আধুনিকতার (পড়ুন উত্তর) প্রচলিত বয়ানকে পাশ কাটিয়ে গিয়েও যে নিজস্ব আধুনিকতা সৃষ্টি করা যায় তা শ্রীমিত্র আবারও দেখালেন। শ্রীমিত্রের আখ্যানভুবন সম্পর্কে অজ্ঞাত (জ্ঞাত পাঠক লাইনটি স্টেপ জাম্প করে পরবর্তী পরিচ্ছেদে ঢুকে পড়ুন) পাঠকের উদ্দেশে বলা যেতে পারে ফর্ম নিয়ে লম্পঝম্প না করেও আধুনিক বয়ান কীভাবে নির্মাণ করতে হয় তা তিনি ‘নিসর্গের শোকগাথা’, ‘ধনপতির চর’, ‘অশ্বচরিত’, ‘জননী সমুদ্র’ উপন্যাসে বহু আগেই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।

জনজীবন, শহর-প্রান্ত আপনতালেই চলছিল। নিজস্ব ছন্দেই মাতোয়ারা ছিল। গোটা বিশ্বকে একদিন গ্রাস করল করোনা নামক মহামারি। লেখক অতীতকে সামনে রেখে বাস্তবের চিহ্নমালা গেঁথে দিতে চাইলেন। অতীতের মহামারি থেকে আজকের মহামারির ইতিবৃত্ত স্পষ্ট করে কখনও আড়াল খুঁজতে অতীত রোমন্থনে প্রবেশ করেছেন। বাস্তব-অবাস্তবের দোলায় এক মায়াময় রাজ্য সৃষ্টি করে আখ্যানকে দুলিয়ে আমাদের দৈন্যতার সারসত্য, রাষ্ট্রের চরিত্র স্পষ্ট করে যে আখ্যান রচনা করেন তা সময়ের মাপকাঠি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ধরা রইল। ভূ-পর্যটক মার্কো পোলো, সেযান শহরের মেয়র, জয়িত্রী, খবরিয়া, টুকরো টুকরো বয়ান, লেখকের বক্তব্য, আত্মগত সত্য, দিনলিপি, বিবিধ মানুষের নানা উপলব্ধি ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আখ্যান মহাকালের খণ্ড সত্য থেকে বৃহৎ সত্যের খোঁজে অগ্রসর হয়েছে। হিস্টোরিক্যাল কনসেপ্টকে স্মৃতি রোমন্থনে এনে অতীত-বর্তমান এক করে একটা আপত কুজ্ঝটিকা নির্মাণ করেন, যা আপাতভাবে অবাস্তব মনে হলেও গভীর বাস্তবের কথা বলে যায়। ২০২০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মার্চ থেকে মেলামেশা প্রায় বন্ধ। ১৭ মার্চ চলে গেলেন লেখক সুব্রত মুখোপাধ্যায়। এখনও কলকাতা মহানগরীতে করোনা গ্রাস করেনি, লকডাউন হয়নি। মাস্ক ব্যবহার চলছে, বিধিনিষেধ প্রখর হয়নি। মার্কো পোলোকে সামনে রেখে লেখক যেন বিশ্ব পর্যটনে বের হলেন। আসলে মহামারিকে কেন্দ্র করে গোটা বিশ্বের খবর দিতে প্রস্তুত হলেন। বাংলা উপন্যাসে একলহমায় আন্তর্জাতিক জীবনচিত্র উপস্থিত হল।

গোটা সিস্টেমে, রাষ্ট্রের মার্জিনে মন্তব্যে সাধারণ মানুষ নাজেহাল হল। রাষ্ট্র দেশের নাগরিকের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতাই পালন করল না। বরং রাষ্ট্রীয় উর্দিধারীদের দিয়ে মানুষকে নারকীয় অত্যাচারে ছয়লাপ করে দিল। শ্রীমিত্র সেই শোষণ, শাসনের ইতিবৃত্ত ধরে রাখতে চাইলেন। ইতিহাসের পাতায় ধরা থাক রাষ্ট্রের বিবেক বর্জিত চরিত্র। যে মুহূর্তে মানুষকে আরও বেশি বিজ্ঞান সচেতন করে তোলার প্রয়োজন ছিল তখন মানুষকে মূর্খ, ধর্মবিশ্বাসী ও কুসংস্কারে আচ্ছান্ন রাখার যে ভণ্ডামি প্রকাশ পেল তা গোটা বিশ্বের কাছে সুমহান দেশের ঐতিহ্যকে প্রবলভাবে ধাক্কা খাওয়ালো। কেউ কেউ প্রতিবাদ করলেন, মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করলেন, কিন্তু মানুষকে সচেতন করা গেল না। মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে গেল মহামারি। আমাদের প্রচলিত শ্রেণি ব্যবস্থার সমস্ত সারসত্য বেরিয়ে এল। বলা ভালো লেখক টেনে হিঁচড়ে বের করে দিলেন। যদিও আক্রমণের ভাষা মিহি, মৃদু। ক্ষমতা সব তছনছ করে দেয়। আইন গড়াই হয় গরিবদের জন্য। বড়লোক আইন ভাঙল। দোষ গিয়ে পড়ল গরিব মানুষের উপর। গরিব মানুষকে নাস্তানুবাদ করে জেরবার করে দেওয়া হল। সকল শ্রমিক স্বভূমিতে ফিরতে উদ্যত হল কাজ হারিয়ে, বাসস্থান হারিয়ে, তেমনি মার্কো ফিরতে চেয়েছে স্বভূমি ভেনিসে। আমাদের শ্রমিকরা ক্ষুধা নিবারণে, কর্মের সন্ধানে, জীবিকার প্রয়োজনে ভিনরাজ্যে গিয়ে পরিযায়ী তকমা অর্জন করেছে সংস্কৃতিবান মানুষের অভিধানে, আর মার্কো পোলো নির্বাসিত হয়েছিল।
শুধু গল্প বলা আজকের আখ্যানের কাজ নয়। গল্পের মধ্যে বিশ্লেষণ এনে পাঠকের কাছে শাসকের চরিত্র উদ্‌ঘাটন সহ গোটা ব্যবস্থটাই যে চালাকিবাজির উপর দাঁড়িয়ে আছে, প্রতি মুহূর্তে মানুষকে ঠকানোর কায়দা-কৌশলের টেকনিক, পাবলিক পা দেওয়া মাত্রই পরাজিত করা হবে সেই ঘূর্ণন প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা। রাষ্ট্র সমস্ত মানুষকে ঘরে থাকতে বলেছে। শ্রমিক, মজুর, রিকশাওয়ালাদের ঘর কোথায়? তৃতীয় বিশ্বের ঘরহীন মানুষ কোথায় যাবে? করোনা আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, জীবনযাত্রার মান উলঙ্গ করে দিয়েছে। কয়েকদশক আগে যে কবি লিখেছিলেন—‘ফুটপাত বদল হয় মধ্যরাতে’ সে চিত্র দূর করতে রাষ্ট্র কোনোদিন কি অগ্রসর হয়েছিল? না কবি বচন মাত্রই মায়া, কল্পনা বলে উড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিল। আবার ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের ঘরে ফিরতে দেওয়া হল কোথায়? ঘণ্টায় ঘণ্টায় আটকে, নিপীড়ন করে পুলিশ যে ছবি স্পষ্ট করল তা বিবেকে বড় ক্ষত সৃষ্টি করে গেল। হ্যাঁ আমার দেশ, আমাদের দেশের উদারতা, কৃতিত্ব, দায়িত্ব চাক্ষুস প্রত্যক্ষ করে যেন ঘৃণা জন্মে গেল। ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে’ গান গাইতে গিয়ে যেন গলায় ঘৃণার কাঁটা ফুটে গেল। আখ্যান হয়ে উঠল মহামারির ডায়েরি। নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার কথা লেখক লিখে রাখতে চাইলেন। তথ্য ও সত্যকে সামনে রেখে আখ্যান হয়ে উঠল বাস্তবের বিশ্লেষণ ও ব্যবচ্ছেদক। স্প্যানিশ ফ্লু থেকে এশিয়ান ফ্লুর কথা এসেছে। মহামারিতে মানুষ মৃত্যুবরণ করেও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে। গরিব মানুষ আশা নিয়ে ঘর বাঁধছে। পেটে ক্ষুধা, অন্যদিকে ‘আমাদের কিছু হবে না’ এই ধ্রুব সত্যকে অবলম্বন করে মহামারির মৃত্যুরেখা অতিক্রম করার জেহাদ ঘোষণা করেছে।
মার্কো পোলো যেন প্রবাহিত সময়ের একক। মহাকালের একক। কাল থেকে মহাকালে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাসকেই সে যেন আবার জানিয়ে দিতে চাইছে। আমাদের আবহমান কালের যে ইতিহাসে পলি পরে গেছে তাই যেন খুঁড়ে জাগিয়ে তুলতে চাইছে। কেন সভ্যতার বিবর্তন, কেন সভ্যতা পালটে গেল? ভোগবাদ, স্বার্থপরতা, আত্মস্বার্থ মানুষের পতনকে অবিনার্য করে তুলেছে। সকলে মিলে এই আখ্যান রচিত হচ্ছে। আসলে মহকালই যেন আড়ালে সমায়ের বয়ান লিপিবদ্ধ করে রাখছে। এ আখ্যান আধুনিক কেননা এর চলনটা একেবারেই নতুন। বাস্তব-অতিবাস্তব-মায়াবাস্তব-ঘটনমানবাস্তব-অলীকবাস্তবকেও যে এই ফর্মে ধরা যায় তা শ্রীমিত্র ভালোই জানেন। শুধু এই উপন্যাসেই নয় ‘নিসর্গের শোকগাথা’ থেকে ‘নিরুদ্দিষ্টের উপাখ্যান’, ‘ধনপতির চর’ এ তিনি তা ধরেছেন। হ্যাঁ এইভাবে বিকল্প আধুনিকতা গড়ে উঠতে পারে এবং গড়ে ওঠা সম্ভব। আধুনিকতাও তো ভাঙছে। উত্তর আধুনিকতাও ভাঙবে। বিকল্প বয়ান দ্বারাই গড়ে উঠতে পারে সাহিত্যের নতুন পরিসর।
উচ্চবিত্ত পরিসর থেকে নিম্নবিত্ত জীবন ক্যানভাস, বিদেশের বিলাসবহুল জীবন থেকে আমাদের দেশের দরিদ্র জীবন এক লহমায় পিঠোপিঠি উপস্থিত হয়েছে। সমগ্র পৃথিবী পথহীন। এমন একজন আদর্শ সচেতন ব্যক্তি নেই যে পৃথিবীকে পথ দেখাবে। মূল্যবোধের অবক্ষয়ে, টুকরো টুকরো বিশ্বে, নিজেকেই শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করার ভাবনাবলয়ে, অপরকে প্রতি মুহূর্তে হেয় করার মানসিকতায় আমরা ভুলে গেছি মানুষের দায়িত্ব, কর্তব্যের কথা। এসে উপস্থিত হল লকডাউন। মানুষের রুজি রোজগারের সাড়ে সর্বনাশ করে রাষ্ট্র ঘোষণা করল ঘরে ঢুকতে। যদিও রাষ্ট্র নিজেই বেকায়দায়। সতর্কতাহীন, আগাম অনুমানহীন এই ব্যাধির জন্য কোনো দেশেই প্রস্তুত ছিল না। লেখকও জানিয়ে দিলেন কেন লকডাউন—
“লক ডাউনের কারণ এইটা যে সংক্রমণটা ধীর করে দেয়া।…কারণ দুনিয়ায় যে পরিমাণ রোগী এইমুহূর্তে করোনা ভাইরাসের সাথে ফাইট করছেন তাদের অর্ধেকের বেশিকে মেডিক্যাল সাপোর্ট দেয়ার ক্ষমতা দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রেরই নাই। যেটা আছে সেইটা হচ্ছে নাগরিকদের কাছে ক্ষমা চাওয়া আর মেডিকেল সাপোর্ট বানানো। ভ্যাক্সিন বানানো। গবেষণায় টাকা ঢালা।” (মার্কো পোলোর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ২০২০, প্রতিভাস, কলকাতা ০২, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ২০২২, পৃ. ৪৭)
ভোগবাদী সমাজ সমস্ত গ্রাস করে নিজেই নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে অগ্রসর হয়েছে। তবুও আমাদের চেতনার রুপালি পর্দা উন্মোচিত হয়নি। চেতনায় পাথর দিয়ে আঘাত করলেও বুঝি বিবেকের দরজা খুলবে না। উটপাখির মতো নিজস্ব সুখে আত্মমগ্ন থাকলে শতাব্দী শতাব্দীতে এমন মহামারি বা বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় বন্দি করে আমাদের অতিরিক্ত এই যে ভোগবাদী জীবনযাত্রা তা নিশ্চিত নয় জেনেও যে অতিবাহিত করে চলেছি, ভবিষ্যতকে ক্রমেই বিপদ থেকে বিপদের পাহাড়ে পর্যবসিত করে দিচ্ছি সেখান থেকে শুভ মূল্যবোধের সূর্য উঠবে কবে? ভাবনাহীন, চিন্তাহীন, পরিবেশকে জাহান্নামে পাঠিয়ে, নাগরিক ভোগবিলাসে, শপিংয়ে, উৎসব-মোচ্ছবে যে মেতে আছি সেখান থেকে প্রকৃত পথের দিশা দেখাতে না পারলে সভ্যতার অবসান ঘটবেই। যেমনভাবে সিন্ধু সহ বহু সভ্যতা হারিয়ে গেছে। ঘটমান বর্তমানই উঠে আসে সাহিত্যে, আর এই ঘটমান বর্তমানই পঞ্চাশ বছর পর হয়ে উঠবে ইতিহাস। সাহিত্যই তো হয়ে ওঠে ইতিহাসের নির্দেশিকা। মহামারি অতিক্রম করে আখ্যান সময়ের দিনলিপি হয়ে ওঠে।
বাবু অমর মিত্রের কলমটি বড় মায়াবী, ভারি বিষাদকান্ত। মানুষের স্মৃতিকে খুব সহজেই বিষাদময় করে দেবার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। তেমনি ব্যঙ্গের পারদ চড়াতেও সিদ্ধহস্ত। বিশ্ব সংকট, পুঁজিবাদ, সিস্টেমের ধান্দাবাজি, ব্যবসাবাজি একে একে উন্মোচন করে দেন। আখ্যানের প্রয়োজনে সেই সত্য উন্মোচন জরুরি হয়ে পরে। ধর্মীয় ভারতের চিত্র সামনে আসে। ধর্মের সেন্টিমেন্টকে সামনে রেখে সম্প্রদায় বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলভাঙা, রাজনীতির দাসত্ব ধরে রাখতে কেউ সত্য বলে না। মিথ্যের আড়ালে যদিও সব চাপা থাকে না। ঘোমটার আড়াল থেকে খেমটা বের হয়ে আসে। সত্যের জেহাদ পরাজিত হতে থাকে, বিক্রিত হতে থাকে। বর্তমানের চালিকা শক্তি যে অতীত, যে অতীতের ভিত্তিভূমির উপর দাঁড়িয়ে আছে বর্তমানের সোপান সেই অতীতের সিঁড়ি ধরে সমস্ত টেনে আনেন। কথোপকথনের ঢঙে, ব্যক্তি মানুষের চালচিত্রের খোঁজ দিতে দিতে এ আখ্যান শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাষ্য। গোটা বিশ্বকে গ্রাস করেছে ভয়। ভয় থেকেই বিশ্বাস জন্মে। বাঁচার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়। মৃত্যুমুখে পতিত মানুষ যা পায় তাই আঁকড়ে ধরতে চায়। জন্ম নেয় অন্ধবিশ্বাস। কেন্দ্র ও রাজ্যের যে ভেকধারী নিয়মনীতি, মানুষকে অশিক্ষিত করে তোলার যে গোপন রহস্য তৈরি করেছিল সব বয়ানে ধরা রইল। আমাদের রাষ্ট্রের মূর্খামি, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা সব আগামীর জন্য বুনে দিলেন। এই জটাজালে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। একাকিত্ব বৃদ্ধি পায়। অসহায়তা গ্রাস করতে থাকে।
গণতন্ত্রের অষ্টম আশ্চর্য হিসেবে মিডিয়া মানুষকে শুধু বিভ্রান্ত করতে থাকে। নিউজ পোর্টালগুলিতে খবরের কোনো সারসত্য নেই। কিন্তু চটকদারি নামকরণ করে আপনাকে মূর্খ ভেবে পড়িয়ে নিতে চাইছে। পড়ার শেষে আপনি কিছুই জানতে বা বুঝতে পারবেন না। আসলে স্থির সত্য বলে কোনো সত্যই তাদের কাছে নেই। মানুষকে বুদ্ধিহীন বানরের উত্তরপুরুষ ভেবে নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। কেউ কেউ বিভ্রান্ত হচ্ছে। বাবু অমর মিত্র সরাসরি সংবাদপত্র বা মিডিয়া না এনে এনেছেন খবরিয়াকে। আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চেয়েছেন। এই খবরিয়া বৃত্তান্ত শ্রীমিত্রের নিজস্ব সৃষ্টি। যদিও আগেই ‘মোমেনশাহী উপাখ্যান’ উপন্যাসে খবরিয়াকে উপস্থিত করেছিলেন। করোনাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্ত খবর আকাশে বাতাসে ঘুরে চলেছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। সংবাদপত্রের খবরের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ভুল খবর, অনুমাননির্ভর খবর মানুষকে ক্রমেই পানাপুকুরে নামিয়ে আনছে, সে সম্পর্কে রাষ্ট্র নির্বিকার। প্লেগ সহ মহামারির ইতিহাসে লেখককে নজর দিতে হয়। কেন ভাইরাস? কেন প্লেগ? কেন বিশ্বযুদ্ধ? যুদ্ধশেষ হয়ে আবার যুদ্ধ কেন? কে দায়ী? অবধারিত উত্তর আসে মানুষ ও তার কার্যকলাপ। স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্য পরিসেবা, স্বাস্থ্য আইন সব ঘুঘুর বাসা। নির্মমভাবেই একাধিক সত্যের দরজা খুলে দিয়ে লেখক দেখিয়ে দেন আমাদের প্রকৃত অবস্থা।
করোনাকে কেন্দ্র করে সরকারের অপদার্থতা, ব্যবসা, সেন্টিগ্রেড, ডেমোক্রেসি, দালালি, ইনকামের গলিপথ থেকে মূল সড়কের নীতিহীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। করোনা মধ্যবিত্তের পাঁজর ভেঙে দিয়েছে। বাংলা প্রকাশন শিল্পের সাড়ে সর্বনাশ হয়েছে। অগুণতি মানুষ কাঠ বেকার হয়ে গিয়েছে। বিপন্ন থিয়েটার, সিনেমা হল। টোটাল সিস্টেমকেই এলোমেলো করে দিয়েছিল। লেখক নিপুণ বিশ্লেষণে আমাদের চেতনার সংকট, আর্থিক শূন্যতা, সামাজিক অবস্থানের বিবিধ বয়ান এনে আখ্যানকে চলমান জীবনের মুখপত্র করে তোলেন। একদিকে খাদ্যের সংকটে বাইরে আসা অতি সাধারণ মানুষ, ফল-মাছ-সবজি বিক্রেতা, অন্যদিকে পুলিশি অত্যাচার, হিংস্রতা। বিপরীত চিত্রও আছে, পুলিশও মার খাচ্ছে। পার্টি রাজনীতি সর্বস্ব রাষ্ট্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো নির্দেশ কোনো কালেই জারি করেনি। ফলে ব্যক্তি মানুষের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিজে বাঁচলে বাবার নাম গোত্রভুক্ত মানুষ মৃত পিতাকে স্পর্শ করতেও অস্বীকার করছে ভয়ে, তেমনি মৃত্যু নিয়ে হাসপাতাল, নার্সিংহোম ছিনিমিনি খেলেছে। পরিবার জানতেই পারেনি মৃত্যুর খবর। তবে গরিব মানুষের করোনা নিয়ে ভয় নেই, গরিব মানুষের বড় ভয় ক্ষুধার ভয়। বস্তির মানুষ জেনে গেছে বাঁচতে পারলে ইমিউনিটিই বাঁচাতে পারবে।
এ আখ্যান যেন মৃত্যুর দিনলিপি। বিমর্ষ হয়ে আসা পৃথিবীর দিনলিপি। চলমান জীবনকে স্তিমিত করে দিয়ে যে অস্থির বিষাদমালার ঢেকুর ওঠে তাই বর্ণিত হয়েছে। জীবন-মৃত্যুর দোলায় যে জীবন পরিসর তাই এ আখ্যানের কেন্দ্রীয় সত্য। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুভয়, কেউ কেউ বিদায়ও নিচ্ছে, তবুও মানুষ জীবনের স্বপ্ন দেখছে। মানুষ মানুষের জন্য। মানুষের পাশে দাঁড়াও। সম্মিলিত প্রচেষ্টাই যেন মানুষকে জয়ী করেছে করোনা থেকে। করোনাকে কেন্দ্র করে ধ্রুব সত্য কিছু নেই। কেন এই ভাইরাস, কোথা থেকে উৎপত্তি কেউ ঠিক জানে না। লেখকও নানা মত, নানাজনের বয়ানকে সামনে রেখে করোনা সম্পর্কে জনগণের ভাবনা, চিন্তা, উৎপত্তি লিখে চলেছেন। বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সাধারণ মানুষ, দোকানদার সকলেই বয়ানে প্রবেশ করে যাচ্ছে। আসলে মানুষই তো ইতিহাস লেখে, সত্য আবিষ্কার করে। যে সত্য আবিষ্কৃত হয়নি অথচ একদিন হবে তা নিয়ে চলছে বিবিধ মত বিনিময়। মহামারি কেটে যাবেই কালের নিয়মে। কিন্তু আমরা কীভাবে প্রবেশ করব নতুন পৃথিবীতে? সেই প্রাচীন মূল্যবোধ নিয়ে না স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নব্য চিন্তা চেতনা আদর্শ নিয়ে? শুনে নেওয়া যাক আখ্যানের ধারাভাষ্য—
“আমারা আমাদের পিছু পিছু আমাদের ভেদবুদ্ধি আর ঘৃণা, অর্থের লোভ, তথ্যের পাহাড় আর বস্তাপচা ভাবনা, আমাদের মৃত নদী আর ধূসর আকাশের গলিত মৃতদেহগুলো টানতে টানতে প্রবেশ করতে পারি। অথবা আমরা প্রবেশ করতে পারি হাল্কা পায়ে, যৎসামান্য মানসিক ভার সাথে নিয়ে, নতুন একটা পৃথিবীকে কল্পনা করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে। আর হ্যাঁ, সেই নতুন পৃথিবীর জন্য লড়াই করবার প্রস্তুতিও থাকা চাই।” (তদেব, পৃ. ১১০)
২৪X৭ রাজনীতির কোলাহলের বিষবাস্পে মানুষের জীবন যখন তেজপাতা, দালাল মিডিয়া বড়াই বুড়ির ভূমিকা পালন করে নিভন্ত চুল্লিতে আরেকটু আগুন দিয়ে, আরেকটু চলুকানি দিয়ে জিইয়ে জিইয়ে পরিবেশকে উত্তাল করে রাখতে চাইছে তখন আর করোনাও তো বাদ যেতে পারে না। করোনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষই নিজের ফুটেজ তৈরি করতে প্রস্তুত। সরকার নিজের দক্ষতা, কর্মের ফর্দনামা জানিয়ে দিচ্ছে, বিরোধী পক্ষ সরকারের পোঁদে কাটি দিয়ে গর্তকে মহাগর্ত করে মানুষের কাছে অপদার্থতা প্রমাণে বদ্ধপরিকর। শাসক-বিরোধী পক্ষের আদা কাঁচাকলা সম্পর্কে মানুষের প্রাপ্তির খাতা বহুক্ষেত্রেই শূন্য থেকে যায়। কেন্দ্র-রাজ্যের সংঘাত লেগেই আছে। সত্য-মিথ্যার চক্রান্তে মানুষ নাজেহাল। রাজ্যপালও পক্ষ নিয়ে সেই সংঘাতকে পানাপুকুরে নামিয়ে এনেছেন। রাজনীতিতে প্রবেশ করে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব লোপ পেয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাণিজ্যকরণ ঘটে গেছে। কর্পোরেট পুঁজি, আল্টা আধুনিকতার স্রোতে, নিত্য দিনের জীবিকার তাগিদে যে খাবারগুলো নাগরিক মানুষ বেছে নিয়েছে তা বহু ক্ষেত্রেই শরীরের পক্ষে অনুপযোগী।
সূত্রধরের ভূমিকায় যেন মার্কো পোলো ও জয়িত্রী। ক্রমাগত অবসাদ, মৃত্যু, যন্ত্রণা, বেদনা, অসহয়তা থেকে পাঠককে মুক্তি দিতেই যেন মার্কো-জয়িত্রীর আখ্যান ঢুকে যায়। সেখান থেকে পাঠককে প্রস্তুত করে আবার বাস্তবের মাটিতে নিয়ে আসেন। কথার পিঠে কথা বসিয়ে যেমন আখ্যান গড়ে ওঠে তেমনি বেদনার পিঠে বেদনা, দুঃখের পিঠে দুঃখ, অবসাদের পিঠে অবসাদ, ক্লান্তির পিঠে ক্লান্তির মালা বসিয়ে তিনি বেদনাগাথা নির্মাণ করে চলেন। তেমনি ভারতীয় সিস্টেম লেখকের কাছে অবোধ্য! শিক্ষিত সচেতন মানুষ, প্রশাসন এ কেমন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে! যেখানে মানুষকে সুরক্ষা, ক্ষুধা, ভাতের সংস্থান দেওয়াই বড় কর্তব্য হয়ে পড়েছে সেখানে পুলিশি নির্যাতন সহ নানা ভূমিকা বেশ হতাশজনক। বয়ানের মধ্য দিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, কর্মহীনতা, বেকারত্ব, সরকার-পার্টি-প্রশাসনের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসে। দলাদলি, সংঘর্ষ, পক্ষ-বিপক্ষ, কায়দা-কৌশলে দেশের মৃত্যুঘণ্টা বেজে চলেছে। মানুষকে শোষণ করার নিত্য নৈমিত্তিক পথে শাসক-বিরোধী পক্ষের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
“শ্রমিক মানে গুরগাঁও, দিল্লি, মুম্বই, সুরাত, বাঙ্গালুরুতে যারা রাস্তা বানায়, অট্টালিকা নির্মাণ করে, গয়নার কাজ করে, হিরের কাজ করে। তাদের করোনা টেস্ট করতেও নাকি ৪০০ টাকা দিতে হবে, নইলে ট্রেনে নেবে না। তখন কংগ্রেস দল বলল এই শ্রমিকদের ভাড়া তারা দেবে। রাজনৈতিক বিপদ বুঝে ভারতীয় রেল শতকরা ৮৫ ভাগ ভাড়া মকুব করে দিল। সরকার আর পার্টিতে এদেশে কোনো তফাৎ নেই। রেল পার্টির না সরকারের? বড় কষ্ট হলো এই তর্জা দেখে।” (তদেব, পৃ. ১৩৩)
ধ্বংসবেলায় মৃত্যুর পরিণাম কত অস্বাভাবিক হতে পারে করোনা আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেল। রাষ্ট্রের ধরি মাছ না ছুঁই পানি মনোভাবে জনগণকে পিষে মারতে যে চক্রান্ত আবিষ্কার করেছে তা সাধারণ মানুষের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেল। জননী-জন্মভূমি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পবিত্র অনুভূতিতে বড় আঘাত এল। দেশ সম্পর্কে মজুর-শ্রমিকের যাবতীয় স্বচ্ছ, মহৎ ধারণা ভেঙে গেল, রাষ্ট্র শোষকেরই যে উচ্চ আদালত তা প্রমাণ হয়ে গেল। ‘দেবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে’র বাণী দেশ যে অন্তর থেকে গ্রহণ করেনি, মানুষকে ত্যাগ করে, মানুষকে হনন করে, মানুষের উপরই সভ্যতার এলিট শ্রেণি গড়ে উঠবে, উঠেছে তার জ্যা-জ্যামিতি বেরিয়ে এসেছে। এরই মধ্যে এসে গেল আমফানের বিপর্যয়। লণ্ডভণ্ড করে দিল কলকাতা সহ দুই চব্বিশ পরগনা। তবে সব নষ্ট হয়ে যায়নি, কেউ কেউ স্রোতের বিরুদ্ধে জেগে আছে। সাম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পোস্ট, কান্তি গাঙ্গুলির কর্মকাণ্ড থেকে মানুষ দেখেছে। অভদ্র মানুষের লাজ-লজ্জার লেশহীন সীমা-পরিসীমাহীন ভণ্ডামি, চালাকিবাজি ও স্বার্থপরতা সভ্যতার সর্বনাশ ডেকে এনেছে। খুন, জখম, সংঘর্ষ, অস্ত্র, কর্পোরেট পুঁজি, দালালি, মুনাফার বন্যা একজন সুস্থ সচেতন দায়িত্ববান নাগরিকের বাঁচার নিঃশ্বাসও কেড়ে নেয়। ধ্বংসলীলার মাঝখানে সচেতন ব্যক্তি একা হয়ে যায়। আগুন জ্বালানো কলম থেমে যায়। সত্য হারিয়ে যায়। সত্যকে অবলম্বন করে বাঁচার পথ দ্বিধাভক্ত হয়ে যায়। তবে ভাইরাসের চরিত্র বদল ঘটেছে। জীবন মেরামতির কাজ চলছে। প্রতি মুহূর্তে মানুষকে নতুন পরিসরে নতুন চেতনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হবে। তাই হচ্ছে। শুভ বোধ বিনষ্ট হলেই অশুভ বোধ জেগে ওঠে। তাই অশুভ বোধের বিপরীতে সর্বদা শুভ বোধকে জাগিয়ে রাখতে হবে। এ বৃত্তান্ত শেষ হবার নয়। অনন্তকাল ধরে এই সত্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত নিতাই সামন্তরা হয়ে ওঠে মানবতার প্রতীক। মানবতাই মানুষকে সুস্থ পৃথিবীর সন্ধান দিতে পারে।
সময়ের নথি নক্ষত্র চিহ্নিতকরণের মধ্য দিয়েই কালবেলার কথকতা মহাকালের তরণীতে ধাবিত হয়। বাস্তববিমুখ না হয়ে তথ্য ও সত্যের রোমন্থনে ঘটমান বাস্তবের যে দিনলিপি আখ্যানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা সময়ের জরুরি পাঠ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। সত্য-আংশিক সত্য-মানুষের বোধের বিবিধ সত্যের পরম্পরা নিয়ে যে সত্যের মালা তিনি গেঁথে চললেন তা উপন্যাসের ধর্মকে অতিক্রম করে বাস্তবের শিল্পনির্মাণে কার্যকারী ভূমিকা পালন করেছে। টেকনিক ও বয়ানে প্রচলিত আখ্যানের যাবতীয় ধারাবিবরণীকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব পথে বিকল্প আধুনিকতার যে সন্ধান দিয়েছে তা একুশ শতকের উপন্যাসকে নতুন পথ দেখাতে পারে।

লেখক পরিচিতি

পুরুষোত্তম সিংহ। 

রায়গঞ্জ। পশ্চিমবঙ্গ।
প্রবন্ধকার। 
গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=