বিস্মৃতির গোলকধাঁধা – বিপ্লব বিশ্বাস

আমি এখন ভালোই জানি  – এমনকি আগেও জানতাম – একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর মানুষ কয়েক হাজার, বাস্তবিকই কয়েকশো হাজার বিষয় প্রতিদিন ভুলতে শুরু করে, কিন্তু তার স্মৃতির কিছুটা যে হারিয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়। কেননা স্মৃতির ভাণ্ডার এতটাই বড়, এমনকি তা থেকে মধ্যেমাঝে যে হাজার হাজার বিষয় উধাও হয়ে যাচ্ছে তা তার সন্দেহের মধ্যে আসেই না প্রায়, অন্ততপক্ষে মুহূর্তখানেকের জন্য, যে এটা একটা বোধগম্যসাপেক্ষ ক্ষতি। আর তাই আমার চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার বেশ কিছুকাল আগে আমি মেনেই নিয়েছিলাম, যদিও আমি এ ব্যাপারে সচেতন ছিলাম না, যে আমি রোজই বেশ কিছু বিষয় ভুলে যাব। তারপর, একই রকম মূর্খামির প্রকোপে, আমি রোজ যা ভুলে যাচ্ছিলাম তা মনে করার নিষ্ফল প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে প্রচুর সময় ব্যয় করে ফেললাম। তারপর এক পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালিয়ে আমি কোনওক্রমে সেই প্রকোপ থেকে বেরিয়ে এলাম। তার খুব বেশিদিন পরে নয়, মূর্খামির অন্য এক প্রকোপ,আগের থেকেও বিশালাকার, আমাকে পেড়ে ফেলল যখন আমি স্মৃতিতে যা তখনও স্পষ্ট ছিল সেগুলোকে মনে করার কাজে সময়ের অপচয় করলাম। এই চেষ্টা নিষ্ফল ছিল না, তবুও তা বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুর জন্ম দিল না।

     এমনতরো কাজে জড়িয়ে থাকতে থাকতেই আমার চাকরির মেয়াদ ফুরিয়ে গেল, আমার হাতে তখন নষ্ট করার জন্য অফুরন্ত সময়। এই চেষ্টায় অবাধ সময় একটু একটু করে নষ্ট করার পর আমার পরিষ্কার মাথায় এল, যে পরিমাণ বিষয় স্মৃতিতে তখনও ধরে রেখেছিলাম তার সীমা  নির্ধারণ করাও অসম্ভব। অনেক কিছুই স্মৃতিতে ভিড় করে এল, ক্বচিৎ এক দুটি হয়তো বিশেষ  কিছু। এমনকি সেই কতিপয় বিশেষ বিষয়ও আমার ক্লান্তির পর্যায়ে যা আমাকে গ্রাস করেছিল, খুবই সাধারণ মনে হতে লাগল। শেষ অবধি আমি এই বিনোদনের খেলাও সর্বতোভাবে পরিত্যাগ করলাম।
পরের দিকে আমার স্মৃতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ল। যা কিছু ভুলে যাচ্ছিলাম তা মনে করার আর প্রয়োজনই বোধ করলাম না। যে সব বিষয়আশয় ঠিকঠাক মনে পড়ত যেমন মানুষের নাম, তাদের চেহারা, অতীতের পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘটনা, আরও অনেক ছোটোবড় বিষয় – এগুলোর কোনওটাই স্মৃতিতে চাপ দিয়েও মনে করতে পারছিলাম না। ঠিক সেই সময়ে কিংবা তার কিছুটা পরে – নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না – আমার স্মৃতি তালগোল পাকাতে শুরু করল। কোনও বন্ধুকে অন্য বন্ধুর নাম ধরে ডাকলাম, বা কিছুদিন বাদে পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলে, মনে হল সে যেন ভিন্ন কেউ বা কোনও ঘটনার বিশদ বর্ণনার সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার বিবরণ গুলিয়ে ফেললাম। প্রায়ই এতে নানান বিপত্তি দেখা দিত কিন্তু তাতে আমার কিছু যেত-আসত না। এমন যে ঘটবে তা তো আমি আশাই করেছিলাম এবং তাকে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলাম।
    কিন্তু এমনকি সেই সব দিনে আমার শৈশব ও কৈশোরের অজস্র স্মৃতি মনের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ছিল। আমার জীবনের সেই সময়কার গল্প যা স্মৃতি হাতড়ে বলতাম তা হাঁ করে শুনত আমাদের বাড়ির ছোটোরা এবং অবাক হয়ে ভাবত কীভাবে এতকাল আগের কথা ঠিকঠাক আমি মনে রেখেছি। আমি জানতাম, জীবনের ভাটির কালে যখন দুদিন আগের ঘটনাও ভুলে যাওয়ার প্রবণতা আসে তখনও কিন্তু মানুষ শৈশবের স্মৃতি যথাযথ ধরে রাখে।
মোটামুটি এই সময়ে ঋতু পরিবর্তনকালে একবার অসুখে পড়েছিলাম। কদিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর আর ছোটোদের আমার কাছে ঘেঁষতে মানা ছিল। সেরে ওঠার পর আমাকে সবাই বলল কীভাবে আমি জ্বরের ঘোরে নাগাড়ে অসংলগ্ন প্রলাপ বকে গিয়েছি ওই কদিন। আমাকে এও বলল আমি নাকি চোখ বুজে আমার শৈশবের সেই সব কথাই বলে গিয়েছি যা ছোটোরা শোনার জন্য পীড়াপীড়ি করত, শুধু সেই সব কাহিনি ছাড়া যা অনেকটা  বিশদে তাদের শোনাতাম যেভাবে  আগে কখনও বলিনি।
    সেই মুহূর্তে আমি আবিষ্কার করলাম যে আমিও আর ছোটোবেলার কথা কিছু মনে করছি না।
     আর সেটা আমি মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলাম না। তাই আমি মূর্খামির তৃতীয় প্রকোপের মাঝ দিয়ে গেলাম : আমি চাইলাম ছোটোদের যে সমস্ত গল্প শুনিয়েছিলাম তা তারা আমাকে বলুক। এতে যখন কোনও কাজ হল না, আমার শৈশবের কথাসব মনে করতে স্মৃতিতে প্রচণ্ড চাপ দিতে চেষ্টা করলাম। যখন তাতেও তেমন কোনও কাজ হল না, আমার মাথায় আর একটি উপায় খেলে গেল। অসুস্থ হওয়ার আগে এটাওটা কিছু দৃশ্যপট মধ্যেমাঝে আমার মনে ঝলকে উঠত এবং এর সঙ্গে আমার ছোটোবেলার কোন স্মৃতি জড়িত তা মনে করতে খুব বেশি সময় লাগত না। সুতরাং তখন রাত্রে ঘুমোনোর আগে বিছানায় চোখ বন্ধ করে, মনকে ক্ষমতা অনুযায়ী যতটা সম্ভব চিন্তামুক্ত করে শুয়ে থাকতাম। তারপর বন্ধ চোখের অন্ধকারমাঝে কিছু একটা দেখতে চেষ্টা করতাম। প্রায়শই এতে কোনও কাজ হত না আর আমি এই  চর্চা করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়তাম। কিন্তু কখনও কখনও একটা মৃদু ঝাপসা আলো সেই অন্ধকারে কোথাও যেন দেখা দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য কিছু স্থিরচিত্র প্রকাশ করত। আমি নিশ্চিত এই ছবিগুলো আমার শৈশবের স্মৃতির অঙ্গ। এই প্রত্যয় ছাড়া আমি এই অবসর- খেলার মাঝ থেকে আর কিছু পেতে সক্ষম হতাম না, তা যতই কঠিন চেষ্টা করি না কেন, এইসব ছবির কোনোটাকেই সংশ্লিষ্ট স্মৃতির সঙ্গে মেলাতে পারছিলাম না। এরপর বলতে গেলে ছবিগুলো ছিল অদ্ভুতভাবে অস্পষ্ট : কখনও তা গাছের রাশিরাশি পাতার নিচে রাখা একটা গো-গাড়ির ছবি যা বৃষ্টির জলে তৈরি কাদাভরা ডোবায় যেন ঢেউ খেলছে ; কখনও দেখছি এক ফকির আর তার হাতে একটা ছোট্ট নাকাড়া ; আবার কখনও তামার ফলকে মোড়া রান্নার পাত্র,ক্যানভাস তাঁবুঘেরা অর্ধেক রোদে থাকা শান বাঁধানো নয় এমন উঠোনে রাখা ইটের উনুনে চাপানো। স্ত্রী -পুরুষ নির্বিশেষে নানান ফ্যাশনের পোশাকের প্রচুর ছবি কিন্তু যারা সে সব পরে আছে তাদের মুখগুলো দেখা যাচ্ছে না অথবা হয়তো আমার দৃষ্টি তাদের কাছে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই তারা সব অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। এইসব পুরনো দিনের পোশাক রীতি ও আকারে অত্যন্ত সম্ভ্রমপূর্ণ, আর সাধারণত সে সবে উজ্জ্বল হালকা লাল, আসমানি, হলুদ, রক্তবর্ণের প্রাধান্য কিন্তু কখনোই কালো নয়।
    যাই হোক, এক রাতে এক টুকরো কালো কাপড়ের দৃশ্য-ছবি দেখলাম যা আস্তে আস্তে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া রঙিন পোশাকের ওপরে দ্রুত মিলিয়ে গেল। সেই রাত্রে এই ছবি আমার সামনে বারকয়েক ফিরে এল এবং আবার পরের রাতেও যদিও পরবর্তী সময়ে ওই কালো কাপড়ের টুকরোটা খানিক বেশিক্ষণের জন্য দৃশ্যমান ছিল এবং তা আমি চিনতে পেরেছিলাম। এটা দেড় হাত লম্বা করে চেরা সেলাইবিহীন কাপড় ছিঁড়ে বানানো একটা পোশাক। পোশাকটা চেরা কাপড়ের টুকরো  দিয়ে মাথা গলিয়ে পরা যার এক প্রান্ত সামনের দিকে আর অপর প্রান্ত পেছনের দিকে ঝুলছে। দুদিকেই খোলা, হাতাবিহীন এই পোশাক সাধারণত শাদা রঙের হয় যা পরলে কাফনের মতো লাগে যা দিয়ে শব ঢাকা হয়। একে কাফনি বলা হত – যদিও যারা এটা পরতো তারা যথেষ্ট জীবন্ত ছিল – এবং তা খুব কমই দেখা যেত।
    ওই কালো কাফনিটা মিলিয়ে গিয়ে আবার দেখা দিল। এবারে আমি এর মধ্যে সামান্য নড়াচড়া লক্ষ করলাম যা অন্যান্য পোশাকের ক্ষেত্রে দেখিনি ; মনে হচ্ছিল যেন এটা পরিহিত কোনও শরীর কাঁপছে। তারপর মৃদু হওয়ার আগেই ছবিটি পুরো মিলিয়ে গেল এবং একই সময়ে আমার শরীরও কাঁপতে শুরু করল। কাফনিটার পুনরায় ফিরে আসার অপেক্ষায় অনেকক্ষণ থাকলাম কিন্তু তা আর ফিরে এল না, অন্য কোনও ধরনের পোশাকও দেখা দিল না।
    এরপর থেকে এই চিত্র-দৃশ্যের দেখা পাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তখন চোখ বন্ধ করেও আমি কোনও ফাঁকা জায়গা দেখতে পেতাম না। আর তাই কয়েক রাত ধরে দৃশ্য- দর্শনের যে খেলায় আমি মেতে ছিলাম তা শেষ হয়ে গেল আর পুনরায় নিবিড় ঘুম আমার চোখকে পুরো বিবশ করার পরেই আমি বিছানার আশ্রয় নিতাম।
      ঘরে বসে সময় কাটানোর আমার আর উপায় ছিল না, তাই আবার বাইরে বেরিয়ে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগলাম বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে এটা-ওটা নিয়ে বকবক করতে থাকলাম। এটাই আমার রোজকার, প্রায় রোজকার রুটিন হয়ে দাঁড়াল, কিন্তু যখন থেকে আমার স্মৃতির এই শোচনীয় খেয়ালি আচরণ শুরু হল – যা প্রায়ই আমার বন্ধুদের অসন্তুষ্ট করত এবং পরিচিতদের সামনে আমার নিজেকেই হতবিহ্বল লাগত ও কখনও কখনও তাদের উপহাসের পাত্র করে তুলত – আমি তা থামিয়ে দিলাম। যাই হোক, আমার অসুস্থতার পর যখন ফের তাদের সঙ্গে সামাজিকভাবে মিশতে লাগলাম তারা তখন তাদের স্মৃতির ত্রুটিবিচ্যুতি সম্পর্কে আমাকে গল্প শোনাতে শুরু করল।
   একদিন বন্ধুদের সঙ্গে বসে আছি, আমরা মানুষ চিনতে যে সব ভুল করছিলাম সে ব্যাপারে কথা চালাচালি করছি। মধ্যেমাঝেই দিলখোলা হেসে গড়িয়ে পড়ছিলাম আমরা। তখনই এক বন্ধু বলল,’ ঠিক আছে, কোনও চেনা মানুষকে অচেনা লাগলে আমার তেমন কিছু আসে যায় না। প্রায়ই ক্ষমাটমা চেয়ে সামলে দিই। কিন্তু যখন কোনও অচেনাজনকে চেনা বলে ভুল করে ফেলি…।’
      সুতরাং এরপর আমরা এই নিয়ে কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম। প্রত্যেকেই এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজের নিজের গল্প বলল। কিছু গল্প তো বেশ বড় আর প্রকৃতই মনোগ্রাহী।
      ‘ হ্যাঁ, আজকাল প্রায়ই আমার ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটতে শুরু করেছে ‘, এতক্ষণ চুপ করে থাকা এক বন্ধু বলে উঠল, ‘ কিন্তু  গত সপ্তাহেই আমার এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। ‘ এই বলে থেমে আবার শুরু করল, ‘ এই চমৎকার লোকটিকে পুরনো বাজারে দূর থেকে দেখতে পেলাম, ‘ বলেই উপস্থিত এক বন্ধুর দিকে ইশারা করে বলল, ‘ কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলাম এ নয়, অন্য কেউ…। ‘
  ‘ তারপর কী ঘটল আমাকে বলতে দাও, ‘ যে বন্ধুটির দিকে ইশারা করা হয়েছিল সে বলল, ‘ সেই অপরিচিত লোকটা তোমাকে তার এক চেনা বন্ধু ভেবে বসল আর দীর্ঘ সময় ধরে তোমরা দুজনে…।’
     ‘ আমাকে অন্তত শেষ করতে দাও, ‘ প্রথম বন্ধুটি বলল, ‘ যাই হোক, কাছাকাছি এসে আমি বুঝলাম যে সে তুমি নও কিন্তু কয়েক পা হেঁটে যাওয়ার পর দেখলাম যে আসল তুমিই এগিয়ে আসছ – একদম রক্তমাংসের শরীর নিয়ে, এই একই গোবেচারা মুখ করে। ‘
      হঠাৎই আমার মনে হল এমনই যুগপৎ ঘটনা বহুবার আমার ক্ষেত্রে ঘটেছে, এতবার যে সেগুলোকে ঠিক সমাপতন বলা যায় না ; কার্যত এমনটা কখনোই ঘটেনি যে আমি অচেনা মানুষকে পরিচিত ভেবে বসেছি আর কিছুক্ষণ পর একই পরিচিত লোককে দেখতে পাইনি। তার দেখা পেতে যদি খানিক দেরি হত আমি ছটফট করতে লাগতাম, কিন্তু শেষ অবধি আমি নিশ্চিতভাবেই তার দেখা পেতাম। এটা আমার জীবনে সবচাইতে অস্বাভাবিক বিষয় যদিও যখন আমার স্মৃতিতে পরিষ্কার বিষয়গুলো তখনও টাটকা ছিল এবং  তা যখন হিসেব করতাম তখনও এটা আমি স্মরণে আনিনি।
    বন্ধুরা তখনও কথা বলে যাচ্ছে। প্রত্যেকেই নিজেদের এমন অভিজ্ঞতার কথা বলছে যদিও একবারের বেশি কারও এমন হয়নি।
    ‘ হ্যাঁ, ‘ তাদের সব কাহিনি শোনার পর আমি বললাম, ‘ এইরকমটা আমার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। ‘
     কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার নিখুঁত বর্ণনা দিইনি। এক দিক দিয়ে বিচার করলে, এই একইরকম অভিজ্ঞতা যে তাদেরও হয়েছিল তা জেনে আমি, সত্যি কথা, দুঃখ প্রকাশই করেছিলাম যদিও তা একবারই ঘটেছিল।
    এরপর আমাদের আলোচনা ভিন্ন বিষয়ের দিকে বাঁক নিল।
   এক সপ্তাহ পর একটা পুরনো বাজারে ঘোরাঘুরি করছিলাম যাকে বড় বাজার বলা হত, সঙ্গে এক ছোটোবেলার খেলার সঙ্গী ছিল। কয়েকদিনের গুমোট বর্ষাকালীন আবহাওয়ার পর উজ্জ্বল সূর্যের দেখা মিলেছে, আকাশ পুরো পরিষ্কার। ঠিক যখনই এই আবহাওয়া পরিবর্তনের ব্যাপারে আমরা বলাবলি করছিলাম অথবা বলা যায় পরিবর্তনের আগের আবহাওয়া নিয়ে, তখনই সূর্যের আলো মিইয়ে যেতে শুরু করল আর চারদিকের পরিবেশ গত কয়েকদিনের চাইতে অনেক বেশি বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। বিরসবদনে আমার বন্ধুটি বলল, ‘ বুঝতে পারছি না কীভাবে হঠাৎ  এইসব মেঘের দল এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়। ‘
    ‘ অথবা এটা কেন নয় যে ওরা হঠাৎ কোথায় হারিয়ে যায়, ‘ আমি বললাম।
      ঠিক তখনই দেখলাম,  কালো পোশাক পরা  এক দেড়েল লোক দূর থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। চট করে আমার মাথায় কী একটা খেলে গেল আর ‘ আলম ‘ শব্দটা আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল।
  আমি হাসিতে ফেটে পড়লাম।
  ‘ আলম ? ‘, আমার বন্ধু জিজ্ঞেস করল।
  ‘ কী – তুই আলমকে ভুলে গেছিস? ‘ আমি জানতে চাইলাম যদিও ঘটনা হল তখনই তার কথা আমার মনে পড়েছিল।
   ‘ আলমকে কে ভুলতে পারে? ‘, বন্ধুটি বলল, ‘ যাই হোক, হঠাৎ তোর ওই বেচারার কথা মনে হল কেন?’
   লোকটা আরও কাছে এগিয়ে এল। যখন মাত্র কয়েক পা দূরে, আমি খুঁটিয়ে তাকে নিরীক্ষণ করলাম। সে আদৌ আলমের মতো দেখতে নয়। প্রায় কাঁধের ওপর জড়িয়ে থাকা তার লম্বা ঢিলেঢালা কালো জামার হাতা আর তার বড় বড় সুর্মা -লেপা চোখ – তাকে মনে হচ্ছিল কোনও পবিত্র স্থানের দেখভাল করে। সে দ্রুত আমাদের পেরিয়ে গেল। আমার বন্ধুটি কিছু একটা বলছিল আর আমি তার কথায় মনোযোগ দিলাম। সে একই কথা আবার বলল, ‘ কে ভুলতে পারে আলমকে?’
    ‘ আমি তাকে ভুলে গেছিলাম ‘, আমি বললাম।
   ‘ এ কথা বলিস না যে তুই তার ছোট্ট ছোঁড়াটাকেও ভুলে গেছিস। ‘
    ‘ তার ছেলে? ওহ্, সেই নেকড়েটা? হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ব্যাটা তোকে কামড়ে দিয়েছিল।’
   ‘ কার্যত সে আমার দেহের মাংসও খানিকটা খাবলে নিয়েছিল – জঘন্য শয়তানটা! এই দেখ, ‘ বলে সে তার ডান হাতের কবজিতে একটা ক্ষতচিহ্ন দেখাল।
   আমরা আলমকে নিয়ে কথা চালাতে লাগলাম। তার সম্পর্কে বেশ কিছু বিষয় আমার মনে পড়ল আর অন্যদের সম্পর্কে যা আমার বন্ধু স্মৃতি ঝাঁকিয়ে মনে করিয়ে দিল। কিন্তু একটা বিষয় আমি তাকে মনে করিয়ে দিলাম যে আলমকে সব সময় কালো কাপড়ের তৈরি কাফনি পরে থাকতে দেখা যেত।
    সে প্রায়ই আমার আব্বার সঙ্গে দেখা করতে আসত। আমাদের বাড়ির সদর দরজার কাছাকাছি আমাকে খেলতে দেখলে সে দূর থেকে আমাকে লক্ষ করে হাঁক পাড়ত, ‘ এই যে বাচ্চা মালিক, দয়া করে ডেপুটি সাহেবকে গিয়ে বলো যে বদমাইশ আলম তাঁকে পেন্নাম ঠুকতে এসেছে। ‘
    আমার আব্বা আদৌ কোনও ধরনেরই ‘ডেপুটি’ ছিলেন না। তিনি শহরের সবচাইতে বড় স্কুলে পড়াতেন। স্কুলের জাঁকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিকের আদবকেতা বজায় রেখে চলতেন আর সব সময় নিজের গাড়িতে যাওয়া – আসা করতেন। সেই কারণেই আমাদের পড়শিরা – বেশির ভাগেরই পরিমিত আর্থিক সংস্থান আর শিক্ষাদীক্ষাও কম – আব্বাকে ‘ ডেপুটি সাহেব ‘ বলে ডাকত। আমি যখন ভিতরে গিয়ে আলমের আসার কথা তাকে বলতাম, তিনি বেরিয়ে বারান্দায় এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সঙ্গে কথা বলতেন, হয় সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই নয়তো তাকে বৈঠকখানায় ডেকে নিয়ে। আব্বা আমাদের পরিবারের সকলের কাছে আলমের নাম উল্লেখ করে বলতেন যে সে তার ছেলেবেলার বন্ধু আর কিছুদিন স্কুলে সহপাঠীও ছিল। আব্বার কাছ থেকেই জেনেছিলাম, আলম ছিল শহরের এক বিখ্যাত ও সম্ভ্রান্ত ধার্মিক পরিবারের বংশধর এবং পড়ালেখাতেও বেশ চালাকচতুর ছিল কিন্তু সে অসৎসঙ্গে পড়ে গিয়েছিল। তার অবিরাম অবাধ্যতা আর একগুঁয়েমি ঘটনাক্রমে তার আব্বাকে বাধ্য করেছিল তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে আর পরে জনসমক্ষে তাকে ত্যাজ্যপুত্র করতে। এরপর তার গুণ্ডামি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল এবং তাকে প্রায়ই শহরের কুখ্যাত  জোচ্চরদের দলে দেখা যেত। ওইসব আইনভঙ্গকারীরা মহিলাদের কিডন্যাপ করতে পটু ছিল ; আর আলম যেহেতু সেই দৌরাত্ম্যপূর্ণ সংসর্গে সামিল ছিল তাই কখনও কখনও পুলিশ তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে লক-আপে ভরত। সে কোনও না কোনও ভাবে এই খবর আমাদের কানে দিত আর আমার আব্বা নিজস্ব মুচলেকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনত। ছাড়া পেয়ে সে সোজা আমাদের বাড়ি আসত আর আমাকে সদর দরজায় খেলতে দেখে ওই একইভাবে বলত : এই যে বাচ্চা মালিক, দয়া করে ডেপুটি সাহেবকে গিয়ে বলো যে বদমাশ আলম তাঁকে পেন্নাম ঠুকতে এসেছে। ‘
   তার সম্পর্কে বেখাপ্পা ব্যাপারটা ছিল, তাকে দেখতে মোটেও বদমাশ বা পাজি মনে হত না। তাকে কেবল রহস্যময় মনে হত, অন্তত আমার কাছে। তার পরনের কালো কাফনি, কালো সারং (বগলের নিচ থেকে ঝুলওয়ালা পোশাক), ও তার গোলাকার ঘন কালো দাড়ি তার সম্পর্কে সঠিক মতামত গড়ে তোলায় বাধা তৈরি করেছিল। তাকে দেখতে যেমন তাতে সহজেই ক্ষতিকারক মনে করার কোনও কারণ ছিল না, শুধু যদি না সে সব সময় একটা ছোট্ট কুড়ুল নিয়ে বেড়াত যার প্রান্ত কালো কাপড়ের তৈরি খাপের মধ্যে ভরা থাকত।  কেউ খাপখোলা অবস্থায় সেই কুড়ুলের ফলা কখনও দেখেনি, কিন্তু সবাই জানত যে আলম এটা সঙ্গে নিয়ে বেড়াত জঙ্গলের প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং এই সূত্রেই আমি নির্দিষ্টভাবে জানলাম যে শহরের চারপাশে জঙ্গল আছে।
      এই জঙ্গল থেকে সমস্ত ধরনের জীবজন্তু ধরে বাজারে নিয়ে আসত সে। হয়তো জীবিকার জন্যই এটা করত, বাজারের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম, হাতে থাকত একটা দড়ি যা কোনও ঝিমোনো প্রাণীর গলায় কিংবা কোমরে বাঁধা থাকত আর চারদিকে লোকজন ভিড় করে থাকত। আমি সেই ভিড়ে মিশে গিয়ে প্রতিটি জন্তুর দিকে বোকার মতো একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম। একদিন তার সঙ্গে একটা ভোঁদড় দেখলাম – লোকে বলে, টাটকা কবর খুঁড়ে এরা মড়ার মাংস খায় আর তাই এদের কবর- ভোঁদড়ও বলা হয়। একইভাবে আমি জীবনে প্রথম কাঁটাচুয়া দেখলাম, যেমনটি ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক ছোটো। তার আগে পর্যন্ত আমি তাদের কাঁটাই দেখেছিলাম যা রাস্তার ধারে ওষুধবিক্রেতারা জাদু আর তাবিজে ব্যবহারের জন্য নিয়ে বসত। এ ছাড়া আরও অনেক প্রাণী দেখেছিলাম যাদের কিছু নাম শুনেছিলাম আর কিছু নাম কখনও শুনিনি ; আবার এমন প্রাণীও ছিল যাদের নাম আলমও জানত না।
    একদিন দেখলাম সে তার নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে, একটা বিশাল দড়ি গলায় পেঁচানো আর তার দুই প্রান্ত বুকের ওপর দোল খাচ্ছে। দেখলাম তার হাতজুড়ে লম্বা সব আঁচড়ের দাগ আর তার কাফনিও কয়েক জায়গায় ছেঁড়া। তাকে বেশ প্রাণচঞ্চল দেখাচ্ছিল যখন সে তাকে ঘিরে থাকা জনতার সামনে বর্ণনা দিচ্ছিল কীভাবে গভীর জঙ্গলের এক গুহার মধ্যে হালকা নড়াচড়ার শব্দ পেয়ে সেখানে নির্ভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সে যখন অন্ধকারে কিছু দেখতে চেষ্টা করছিল তখন হঠাৎ কোনও জন্তু তার ওপর ঝাঁপিয়ে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে গুহার ভিতরেই এক বাঁকের পেছনে সটকে যায়।
    ‘ তাই আমিও বাড়ি ফিরে এলাম ‘, তার কুড়ুলে  আলতো টোকা মেরে সে বলল, ‘ কিন্তু সেখান থেকে আসার পথে তাকে বলে এলাম, ‘ ঠিকাছে বাছাধন, আজ তুমি আমাকে বাগে পেয়েছিলে, কিন্তু মনে রেখো এরমধ্যেই একদিন আমি এসে তোমাকে কবজা করব। আপাতত তুমি তোমার আরাম- কুঠুরিতে মস্তি করো।’
    আর নিশ্চিতভাবেই ঠিক পরের সপ্তাহে দেখা গেল আগের চাইতেও অনেক বেশি জনতা তাকে ঘিরে আছে। সেখানে লোকেরা যা বলাবলি করছিল তা থেকে আমি বুঝলাম বাস্তবিকই সে ‘ সেই ‘ জন্তুটাকে ধরে সটান নিয়ে এসেছে। ভিড়ের লোকেরা জন্তুটা ঠিক কী তা বুঝতে চাইছিল। আমি যখন ভিড়ের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করলাম, আমাকে আটকে দিল আর অন্যান্য বাচ্চাদেরও একইভাবে কাছে যেতে দিল না। একপাশে সরে গিয়ে আমিও লোকজনের কথাবার্তা শুনে আঁচ করতে চেষ্টা করলাম কীরকম দেখতে ওই জন্তুটা। যেটুকু বুঝতে পারলাম তা হল : এর নখগুলো অদ্ভুত, অন্য প্রাণীদের মতো ঝিমুচ্ছিল যাদের আলম আগে ধরে এনেছে আর এই জন্তুটা নারী। হঠাৎই জোর চিৎকার কানে এল। ভিড়ের লোকজন একে অপরের ওপর পড়ছে আর সেই ছত্রভঙ্গ অবস্থার মাঝ থেকে আলম চেঁচিয়ে বলছে, ‘ কুড়ুল কই… আমার কুড়ুলটা! ‘
    এই ছত্রভঙ্গ অবস্থা আর তার চাইতেও বেশি এই দানবীয় চিৎকার আমাকে এতটাই ভয় পাইয়ে দিয়েছিল যে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে পড়লাম।
সেটাই হয়তো শেষবারের মতো আলম জঙ্গল থেকে কোনও জন্তু ধরে বাজারে এনেছিল। এরপর দীর্ঘদিন বাদে বাদে তাকে দেখেছিলাম একা একাই ঘুরে বেড়াতে। এই সময়ের শেষের দিকে আলমের ঘন দাড়ি লিকলিকে হয়ে এল, চেহারাতেও কুৎসিত ভাব আর সে খানিক টাল খেয়ে হাঁটত। আমাদের বাড়িতেও আর আসত না। এরপর নতুন আর মজার সব মানুষ বড়বাজারে আমার মনোযোগ কেড়ে নিল। এই সময় পথে কখনও যখন আলমের ছেলেকে দেখতে পেতাম তখনই আলমের কথা মনে হত। সে তখন এক বলবান যুবক, ঠিক তার আব্বার মতো।
    সে ছিল আমারই বয়সী আর ছেলেবেলায় যাদের সঙ্গে খেলতাম মধ্যেমাঝেই তাদের সঙ্গে যোগ দিত। যাই হোক, আমাদের দলের ছেলেরা তার থেকে দূরে দূরে থাকত কেননা সে দুম করে রেগেমেগে যেত এবং সেই রাগের মাথায় তার বিরোধীদের কামড়েও দিত। আল্লাহ জানেন, কীভাবে যেন আমাদের মতো ছেলেছোকরাদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে গিয়েছিল যে তার জন্মের কিছু পরেই নেকড়ের দল তাকে নিয়ে যায় আর আলম বছরকয় ধরে জঙ্গলে খোঁজাখুঁজির পর তাকে উদ্ধার করে। আমাদের দলের খানিক বড় ছেলেরা এমনও বলত, বা তারা প্রকৃতই দাবি করত, তারা স্বচক্ষে দেখেছে বাড়ি ফিরে আসার পর বেশ কিছুদিন আলমের ছেলে চার হাত-পায়ে হাঁটত আর শুধু কাঁচা মাংস খেত। আর এক ছোকরা বলেছিল, এই সময় নাগাদ নেকড়ের থাবার ছাপ আলমের বাড়ির কাছাকাছি দেখা গিয়েছিল আর তখন থেকেই আলম সব সময় একটা কুড়ুল সঙ্গে নিয়ে ঘোরা শুরু করল। এইসব কথা সত্য বলে মেনে নিয়ে আমরা আলমের ছেলেকে ভয় পেতে শুরু করলাম। যাই হোক, আমার সঙ্গে কখনও তার বিবাদ হয়নি। সে নিজে থেকেই আমার সঙ্গে ঝগড়ায় বিরত থাকত, হয়তো তা এই কারণেই যে সে কখনও কখনও তার আব্বার সঙ্গে আমাদের বাড়ি আসত। কখনও আবার একাই এসে কেঁদে কেঁদে আমার আব্বাকে বলত, ‘ আব্বুকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে।’
    যৌবনে পা রাখার কয়েক বছরের মধ্যে তার দাড়িও ঘন আর গোলগাল হল আর সেও মধ্যেমাঝে কালো কাফনি পরত। তাকে দেখে মনে হত আলমই যুবক হয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু তখন দেখা হলেও সে ক্বচিৎ আমাকে শুভেচ্ছা জানাত; হয়তো আমার পাশ দিয়ে চলে গেলেও আমাকে চিনতে পারত না।
    এরপর আমার মাথায় বেশ কয়েকবার চকিত ভাবনা খেলে গেছে যে এমনকি আমিও বেশ কিছুদিন আলমের ছেলেকে কোথাও দেখিনি।
      স্মৃতির কিছুটা অংশ ফিরে এসেছে ভেবে আমি সন্তুষ্টি বোধ করছিলাম। সেই সময়কার অন্যান্য আরও বিষয় মনে করার চেষ্টা করলাম এবং অবশ্যই বলব, আমার চেষ্টায় নামমাত্র হলেও সফল হলাম। ঠিক তখনই হঠাৎ বুঝতে পারলাম রাস্তার কোনও এক বাঁকে আমার বন্ধু আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। অনেকটা আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। তৎক্ষনাৎ ফেরার পথ ধরলাম খানিকটা এই ভাবনায় যে আমার দীর্ঘ অনুপস্থিতি ঘরের সবাইকে চিন্তায় ফেলে দেবে আর খানিকটা এই কারণে যে অন্ধকার গাঢ় হলে দূরের জিনিস পরিষ্কার দেখা আমার পক্ষে কঠিন হবে। বাড়ির কাছাকাছি যেখানে দুটো রাস্তা পরস্পরকে ছেদ করেছে ঠিক সেই জায়গা পেরিয়ে যাওয়ার পরই সেই লোকটাকে দেখলাম যাকে পবিত্র স্থানের দেখভালের লোক মনে হল কিংবা বলা উচিত আমি তার সাজসজ্জা দেখলাম – রাস্তার অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে। ফের আমার মনে হল, লোকটা আলম আর ফের এমনিতেই জোর হেসে উঠলাম। আলমের ছেলের কথা তারপর মনে পড়ল আর দ্রুত হাসি মিলিয়ে গেল।
     পরদিন ফের তাকে ওই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। যদিও আমি ছিলাম রাস্তার উলটোদিকে রোদের আলোয় তাকে আরও কাছ থেকে দেখতে চেষ্টা করলাম। সে ওই একই ব্যক্তি নয় যার পরনে কালো পোশাক ছিল আর চোখে ছিল সুর্মা যা আমি আগের দিন বড়বাজারে দেখেছিলাম। পরবর্তী দিনকয় ধরে তাকে বারকয়েক দেখলাম। একই জায়গায় শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আর পথচলতি লোকজনের দিকে তাকিয়ে। এটাও লক্ষ করলাম যে তার পরনে কাফনি। কিন্তু তার কাছ ঘেঁষে যখন বারকয়েক যাতায়াত করলাম সে আমার দিকে উদাসীনভাবে তাকাল যেমনটা অন্যদের দেখে করছিল।
        ঠিক তখনই আমাদের বাড়ির বাচ্চাদের একজন আমাকে বলল যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি নাকি নিজের সঙ্গেই বকে যাচ্ছিলাম। এটা দুখ-খবর আর হয়তো জেনে-বুঝেই পরিবারের লোকজন এটা আমার কাছ থেকে গোপন রেখেছিল। যারা আপন মনে  নিজেদের সঙ্গে বকে যায় আমি তাদের খামখেয়ালি এবং তাকে ছাড়িয়েও বিচারশক্তিহীন ভাবতাম। তাই ঘনঘন বাইরে বেরুনো বন্ধ করলাম আর যখন বেরুতাম সারাটা পথ থমকে থাকতাম যে আমি নিজের সঙ্গে কথা বলছি কি না। তা করতে গিয়ে প্রায়ই এলাকার পথঘাট হারিয়ে ফেলতাম।
     একদিন ঘরে ফেরার পথে আগে বলা সেই ক্রসিং পেরিয়ে খানিকটা এগোতেই অলক্ষে যেন মনে হল আমি নিজের সঙ্গে কিছু বললাম। দুম করে থেমে গিয়ে ভাবতে লাগলাম, কী বলেছিলাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে শুনতে পেলাম, ‘ সাবধানে থাকো! নিরাপদে থাকো!’
      তারপর কাঠজাতীয় কিছু পড়ার শব্দ পেলাম। দেখার জন্য পেছন ফিরলাম। কাফনি পরা লোকটা দুহাত বাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। কিন্তু কয়েক পা এগোবার পর সে টলতে লাগল এবং মনে হল সে যেন ওই একই সময়ে অন্য দিকে যেতে চেষ্টা করছে। তারপর রাস্তার ওপর পড়ে গেল। বেশ কিছু পথচলতি মানুষ তার দিকে ছুটে গেল, আমিও গেলাম। তাকে কোনওমতে দাঁড় করালাম কিন্তু তার পুরো শরীর কাঁপছিল আর ওই অবস্থায় সে বিড়বিড়িয়ে কিছু বলল, যেন নিজেকেই, ‘ হাঁটতে পারছি না। শুধু দাঁড়াতে পারছি। ‘ মনে হল সে অচেতন হয়ে পড়ছে।
   পথচারীদের কেউ তাকে চিনত না আর কেউই, মনে হচ্ছিল, কী করতে হবে বুঝতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত আমি বললাম, ‘ আমি ওকে চিনি, দয়া করে ওকে আমার বাড়িতে নিয়ে চলুন।’
    ওই লোকগুলো আমাকে চিনত। তাদের কয়েকজন তাকে আমাদের বাড়ি অবধি বয়ে নিয়ে গেল আর আমি তাদের সাহায্যে তাকে একটা চেয়ারে বসালাম।
    লোকজন সব চলে গেলে তাকে কিছু বলার কথা ভাবছিলাম যখন চেয়ারে বসা অবস্থাতেই সে এমনভাবে একপাশে পড়ে যেতে থাকল যে চেয়ারের দুটো পায়া মেঝে থেকে খানিকটা উঠে গেল। সে ধপ করে পড়ে যাওয়ার আগেই ঝাঁপিয়ে তাকে ধরে ফেললাম। সে নিজেও দাঁড়াবার চেষ্টা করে বলল, ‘ আমি বসতেও পারছি না, শুধু দাঁড়িয়ে বা শুয়ে পড়তে পারি।’
    ঘরে তখন এমন কিছু ছিল না যার ওপর সে শুতে পারে। বাড়ির ভিতর থেকে কাউকে দিয়ে একটা খাটিয়া আনানোর বা সেখানেই মেঝেতে বিছানা পেতে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম। এরমধ্যেই আমাতে ভর দিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। সে খাড়িয়ে বলল, ‘ এখন যেতে দাও।’
    তার দেহটা সামান্য কাঁপছিল, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ আপনি পড়ে যাবেন না? ‘
  ‘ না, আমি ঠিক দাঁড়িয়ে থাকব।’
   ‘ যদি শুতে চান, একটা বিছানার ব্যবস্থা করতে পারি… ‘
 ‘ না, আমি দাঁড়িয়ে থাকব।’
     আস্তে আস্তে আমি তাকে যেতে দিলাম। বাস্তবিকই সে টাল না খেয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর গলায় খানিক অহংকারের ঝাঁঝ এনে বলল, ‘ আমি এভাবেই সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। ‘
   অন্যদিকে আমার সমস্যা হল আমি দাঁড়ানো অবস্থায় হাঁপিয়ে গেলেও হাঁটাতে কোনও ক্লান্তি লাগত না কিন্তু চেয়ারে বসার ইচ্ছেকে চেপে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ আপনার এই অসুখটা কদ্দিনের? ‘
  ‘ ওহ্, তা অনেক বছরের, ‘ সে উদাসীন ঢঙে বলল।
  এরপর টেরাচোখে কিছুক্ষণের জন্য সে ঘরের এদিক ওদিক দেখতে লাগল। শেষ পর্যন্ত বলল, ‘ ঘরটা পালটে গেছে। ‘
  ‘ সময়ও তো পালটেছে, ‘ আমি বললাম আর তারপর জিজ্ঞেস করলাম, ‘ তোমার আব্বা কেমন আছেন? ‘
‘ আমার আব্বু, ওহ্, তিনি তো অনেকদিন হল ইন্তেকাল করেছেন। ‘
‘ কী হয়েছিল? ‘
‘ বয়স হয়েছিল, আর কী?’ সে একই উদাসীন ঢঙে উত্তর করল। আরও একবার ঘরময় ত্বরিত দৃষ্টি ফেলে বলল, ‘ বেশ খানিকটা বদলে গেছে। যখন এখানে আসতাম…’ এই বলে প্রসঙ্গ পালটে আমাকে জানাল, ‘ আমি চোখেও ভালো দেখি না।’
     ‘লোকটা কি হাল ছেড়ে সবকিছুর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছে? ‘ আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম তার প্রতি খানিক ঈর্ষাবশত। এরপর জানতে চাইলাম, ‘ ওই ক্রসিং – এ কার সঙ্গে এসেছিলে?’
‘ ও, হ্যাঁ ‘, হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে এমন চমক লাগিয়ে সে বলল, ‘ মেয়েটি অবশ্যই আমাকে নিতে এসেছিল। সম্ভবত সে ভয়ানক চিন্তায় ছিল। ‘
    ‘ তাকে খুঁজে পেতে কাউকে কি পাঠাব? ‘
   ঠিক তখনই বারান্দায় পায়ের শব্দ পেলাম, দেখলাম পাড়ারই একটা ছেলে দরজা থেকে উঁকি মেরে কাউকে বলছে, ‘ এখানে উনি ঠিক আছেন। ওই যে দাঁড়িয়ে। ‘
   ছেলেটির ঠিক পেছনে এক বোরখাপরা মহিলা দাঁড়িয়ে। এরপর ছেলেটি চলে গেল। ইতস্ততভাবে মহিলা ঘরের ভিতর পা রাখল। যে মুহূর্তে সে আমার হঠাৎ অতিথিকে শনাক্ত করতে পারল, তীক্ষ্ণ গলায় বলল, ‘ চিন্তায় চিন্তায় আমি মরে যাচ্ছিলাম। এখন থেকে তোমার বাড়ির মধ্যে থাকাই ঠিক হবে। ‘
  ‘ কী সমস্যা?’, লোকটা অবিচল ঢঙে বলল, ‘ এটাও আমাদের ঘর। ‘ তারপর আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘ ওর অশেষ অনুগ্রহের জন্য আমি ঋণী। তোমার সঙ্গে এই ব্যবসায় আমাকে যখন পুলিশ ধরে নিয়ে যায় একমাত্র এ-ই আমাকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনে। ‘ এ কথা শোনার পর মহিলা আমাকে অভ্যর্থনা জানাল।
   আবারও বারান্দায় পায়ের শব্দ শোনা গেল। সেই ছেলেটি এল, হাতে একটা কুড়ুল, খাপে ঢাকা। ‘ এটা রাস্তায় পড়ে ছিল ‘, এই বলে সে মহিলার হাতে সেটা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
    কিছুক্ষণের জন্য আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। লোকটাও মাথা নুইয়ে, চোখ বুজে চুপচাপ খাড়িয়ে ছিল। তার দিকে গভীরভাবে তাকালাম আর তারপর শুনতে পেলাম মহিলা বলছে, ‘ দয়া করে ওকে জাগান। ও এভাবেই দাঁড়ানো অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ছে। ‘
    আমি অবাক হলাম না। আমাদের এলাকার এক পাহাড়ি পাহারাদারও এভাবেই পায়ে খাড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমোত। সে প্রায়ই বলত এভাবে বারকয়েকের চটজলদি ঘুম দিয়ে সারা রাতের ঘুমকে সে পুষিয়ে নিত। আমি মহিলার দিকে তাকালাম। মনে হল সে চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছে ; তবুও তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ আজকাল এর ছেলে কোথায় থাকে? ‘
    ‘ সেটাই তো সমস্ত ঝামেলার মূল ‘, মহিলা বলল। ‘ ও এক রাতে বিছানায় শুয়েছিল, সকালে উঠে দেখে বিছানা খালি। তখন থেকেই প্রতিদিন ছেলেকে খুঁজতে বেরিয়ে যায়। হাঁটতে পারে না, আমিই ধরে বাইরে নিয়ে আসি। ঘন্টার পর ঘন্টা পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনও এই রাস্তায়, কখনও ওই রাস্তায়। এমনকি জঙ্গলে যাওয়ার জন্যও পীড়াপীড়ি করে। এখন দয়া করে আমাকে বলুন, তার জন্য জঙ্গল কোথায় পাই। বহুদিন আগে ও জঙ্গলে যেত আর জীবজন্তু ধরে আনত। একবার কোনও এক জন্তু…’
   লোকটা তখনও ঝিমুচ্ছে কিন্তু চকিতে ঝিমুনি কাটিয়ে মহিলার প্রতি ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘ ওকে কী সব বলছ? ও কি এ সব জানে না? ‘
     মহিলা চুপ মেরে গেল। আমি জানতে চাইলাম, ‘ ও কোথায় থাকে? ‘
    সে বলল যে তার বাড়ি আমাদের বাড়ির পেছনের এক গলিতে আর সেই বাড়ির অর্ধেকের বেশি ভেঙে পড়েছে। বেশ কিছু সরু গলি পেরিয়ে সেখানে পৌঁছনো যায়। মহিলা নিখুঁতভাবে সেই জায়গার বর্ণনা দিল কিন্তু স্মরণে আনার আগেই আমি ভুলে গেলাম। আমাদের বাড়ির পেছনে ঠিকই কিছু সরু, সামান্য – আলোকিত গলির জাল বিছানো আছে, তার কিছু কিছুতে ছাদ আছে। খোলা বা ঢাকা, এইসব গলিগুলোর নামই শুনেছিলাম মাত্র আবার কোনও কোনওটার নামও শুনিনি। আব্বা যা প্রায়ই বলত মনে করতে পারলাম : আমাদের আশপাশের গলিপথগুলো মাথার খুলির মধ্যেকার মস্তিষ্কের মতো মোচড়ানো আর কোনও অচেনা লোক এই গোলকধাঁধায় আটকে গেলে নিজে থেকে সেখান থেকে বেরোতে পারবে সে আশা কম। আমার যেন সে রকমই বোধ হতে লাগল ; কিংবা বলা যায়, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার আমার চেষ্টাসব বিফল প্রমাণিত হল। ঠিক সেই মুহূর্তে মহিলা আমাকে বলল, ‘ ঠিকাছে, আপনি কি এখন আসবেন? দেখছেন না, আপনার কারণে ও দীর্ঘক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে আছে? ‘
    ‘ আপনার দয়ালু আচরণের জন্য ধন্যবাদ, অশেষ ধন্যবাদ ‘, দুই হাত জোড় করে বিদায় নেওয়ার ভঙ্গিতে লোকটা বলল আর তারপর মহিলাকে ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘরের বাইরে যেতে লাগল। তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে নিজের গায়ে হাত বুলিয়ে কিছু খোঁজার চেষ্টা করে উদ্বেগের সঙ্গে বলল, ‘ আমার কুড়ুল… আমার কুড়ুল। ‘
   ‘ এইতো, আমার হাতে ‘, এ কথা বলে মহিলা  কুড়ুলটি তার হাতে ধরিয়ে দিল।
    বাড়ির সদরদোর অবধি আমি ওদের সঙ্গে গেলাম। যাওয়ার সময় লোকটা কিছু বলছিল কিন্তু তার গলা চাপা মনে হচ্ছিল। হয়তো সে আমাকেও আশীর্বাদ করছিল। গেটের মুখে পৌঁছে সে যা বলেছিল সেটুকুই আমার মনে আছে : ‘ সেই বাচ্চা মালিককে দেখতে পেলাম না। সে অবশ্যই অ্যাদ্দিনে বেশ বড় হয়ে গেছে, আল্লাহকে ধন্যবাদ। ‘

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=