মৃণাল শতপথী’র গল্প : বীতংস

মৃণাল শতপথী'র গল্প : বীতংস


ঝুনা ফৌদার, বউ আর দুটো বাচ্চা নিয়ে গ্রাম ছাড়ল একদিন ।  

  শীতকাল । পউষ সংক্রান্তির মাস । পশ্চিমে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যায় শালের বন। সবুজ শালপাতায় শেষ বিকেলের লাল আলো লেগে থাকে । গুড়েহাড়ার জঙ্গলে শুকনো শালপাতা মাড়িয়ে তখন এসে পৌঁছেছে হাতির দল । আশি নব্বইটা দাঁতালের একটা পাল । বনবাবুদের কাছে খবর ছিল, আড়াবাড়ির জঙ্গলে তাদের দেখা গিয়েছে দিন দশ আগে। সেখান থেকে সাতশোল, উড়াসাই, মাণিকবাঁধ হয়ে তারা ঢোকে দক্ষিণশোলের  জঙ্গলে । তারপর পঁয়ত্রিশ-চল্লিশের একটা একটা দলে বিভিন্ন দিকে ভাগ হয়ে যায় । জঙ্গলঘেরা প্রায় গোটা তিরিশেক গ্রাম চঞ্চল হয়ে ওঠে ।   
  লোছনগড়ে শ’দেড়েক ঘর । কয়েক ঘর বামুন, কায়েত, তেলি-তামলিরা আছে । বাকি প্রায় সমস্ত এস সি,এস টি ।   আর আছে লায়েকরা । একসময় পুরুলিয়ার কাশীপুর রাজবাড়ির ঘনিষ্ঠ ছিল শোনা যায় । রাজাদের কাছে দরকারি জিনিসপত্র পৌঁছে দেবার কাজ ছিল তাদের ।  এমনকি রাজভোগ্য নারীও ! কথিত আছে, প্রয়োজনে নিজের স্ত্রীকেও তুলে দিতে হয়েছে রাজার হাতে ! রাজার লোক হওয়ার সুবাদে কিছু জমি জমা বাগিয়ে নিতে পেরেছিল তাদের একটা অংশ । সেই উত্তর পুরুষরা এখন নিজেদের উচ্চবর্ণের দাবী করে থাকে । বাকি এক বিশাল অংশ অন্ত্যজ হয়ে পড়ে আছে প্রান্তে প্রান্তে । পরিচয়হীন, অজ্ঞাতনামা । ইদানীং তারা তফসিলি জাতি বা এস সি পরিচয় নেবার লড়াই লড়ে যাচ্ছে । শালবনি, গড়বেতা, বাঁকুড়া পুরুলিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই লায়েকরা একজোট হয়ে দিল্লিতে সম্মেলন করে এসেছে জানা যায় । তবু সরকারের কাছে তার স্বীকৃতি নেই, যেন অদৃশ্য তারা ! অথচ তাদেরও আছে লড়াইয়ের ইতিহাস, এ অঞ্চলে প্রবল নীলকরদের বিরুদ্ধে মরণপণ প্রতিরোধ, যা লায়েক বিদ্রোহ নামে খ্যাত ।
  জঙ্গল ঘেঁষা আদিবাসী পাড়া থেকে বুধা মান্ডির ক্লাস ফোরে পড়া ছেলেটা ছুটে এসে খবর দেয়, দুটো সর্দার-দাঁতাল গ্রাম রেকি করে গেছে । কোথায় জল, কার জমিতে কী ফসল । ইয়া লম্বা দাঁত তাদের ! গোটা গায়ে মেখে থাকে বনের মাটি । গ্রামের বউরা জঙ্গলে পাতা আর শুকনো কাঠ কুড়োতে গিয়ে দেখেছে, জায়গায় জায়গায় ঢিপির মত হাতির ন্যাদা ।  যে কোন রাতে হাতির দল ঢুকবে গ্রামে । ইতিউতি খবর উড়তে থাকে । গোপীনাথপুরে মা-মেয়ে জঙ্গলে হাগতে গিয়ে হাতির সামনে পড়ে যায় । সদ্য বিয়ে হওয়া ষোল বছরের মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে মায়ের কাছে এসে ছিল ক’দিন । মেয়েটাকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে আছাড় মারবার আগেই তার মা এক দুঃসাহসিক কাজ করে বসে । ছুটে গিয়ে হাতির পায়ে হুমড়ি খেয়ে পা জড়িয়ে কাঁদতে থাকে !
“হাতিবাবা আমাকেও মেইরে দও গো, জামাই যে উকে আমার কাছে রেইখে গেচে, মুক দেখাবো কেমনে গো !”
 হাতি কী বুঝেছিল কে জানে, আছাড় না মেরে মেয়েটাকে দূরে ছিটিয়ে দিয়ে আর মা’টাকে ফুটবলে টোকা দেবার মত এক শটে ছিটকে ফেলে চলে যায় । গোপীনাথপুরের অসম সাহসী বউ শবরী দিগারের নাম ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের গ্রামে । যাবার আগে হাতি নাকি শুঁড় বুলিয়ে যায় শবরীর মাথায় ! শবরী এখন থুতনি উঁচু করে শোনায়,

 “হাতি দেব্ তার আশীব্বাদ পাওয়া মুকের কথা লয় !”

 রটতে রটতে আসলে ঠিক কী ঘটেছিল সেটাই বোঝা যায় না । এদিকে সমানে ক্ষয়ক্ষতির খবর আসতে থাকে ।   দক্ষিণশোলের গ্রামে আলু আর বাঁধাকপির ক্ষেত তছনছ করে গেছে হাতিরা, ইচ্ছে মতন আলু খেয়েছে, ছড়িয়েছে, ঘেঁটে চটকে একাকার করে গেছে । কিছু জমিতে ধান কেটে ফেলে রাখা ছিল, উদরসাৎ করেছে । হাতির হামলায় দুজনের মৃত্যুর খবর বেরিয়েছে কাগজে । বন দপ্তর ঘেরাও হয়েছে । বিক্ষোভ হচ্ছে বিট অফিসে । টানা দু’দিন বাস রাস্তা অবরুদ্ধ হয়ে ছিল । 

 রণসাজ নিতে থাকে গ্রামগুলি । হাতির সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ প্রস্তুতি ।   

  লোছনগড়ের জঙ্গলে হাতিরা পৌঁছল তখন সন্ধে । রাত আটটার সময় চাদর মুড়ি দিয়ে তপন ঘোষের এইটে পড়া মেয়ে প্রাইভেট থেকে ঘরে ফেরার সময় বাঁধের দিকে যাচ্ছিল । হাবু সামন্তর ছোট ছেলেটার সঙ্গে সে লুকিয়ে দেখা করে  সেখানে । যমুনা বুড়ির খড়ের চালে খস খস শব্দে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে । একফালি ঠাণ্ডা চাঁদ আকাশে । আবছা জ্যোৎস্নায় হাতির অতিকায় ছায়া চালের খড় চিবোচ্ছে ! হয়তো গা চুলকোচ্ছিল, মাটির দেওয়ালে গা’টা ঘষে নেয় একটু, তাতেই যমুনা বুড়ির ঘরের দেওয়াল হুড়মুড় ভেঙে পড়ে । রাত গভীরে দূর জঙ্গলে হাতিদের সমবেত চিৎকার ।   চমকে ওঠে ঘুমন্ত গ্রাম । 
  রসবাদাম জঙ্গলের মাঠে হুলা পার্টির জমায়েত হল এক সন্ধ্যায় । বিকেলে রেঞ্জার সাহেবের গাড়ি পেট্রলিং-এ ছিল ।   গাড়ি ঘিরে ধরে সব কালোকুলো মানুষগুলো । বনবিভাগের নিজস্ব হুলা দলে নাম লেখানো হয় ফি বছর । অনেকেই এবার সুযোগ পায়নি, সাহেবকে ধরে যদি কিছু হয় । দুশো টাকা মজুরি জোটে । গাড়িতে বসেই দক্ষিণশোল বিটের রেঞ্জার মিটিং সেরে নেন । হাত তুলে বলেন,
“ঝামেলা বাড়াস না, এত লোক নেবার ক্ষমতা সরকারের নেই । যে যার গ্রামে দল বানা । হুলার জন্য পোড়া মোবিল, এক জ্যারিকেন ডিজেল যা লাগে বন অফিস থেকে পাবি । আর বেশি করে লোক ভিড়া । যত বেশি হুলা জ্বলবে হাতি ভয় পাবে ততো ।”
“সিগনাল গাড়ি দিবনি সার ?”
 হাতি তাড়াতে বিটকেল শব্দ করা একটা হুটার গাড়ি ঘোরায় বন দপ্তর । 
“আচ্ছা এদিকে রাউন্ডে পাঠিয়ে দেব ।”
  লায়েকরা এসেছিল । তাদের কেউ বলল,
“সার,বক্ষতিপূরণটা ? ইবারে কি দিয়া হবে ?”
“লিস্ট করে রাখ, অফিস থেকে ফর্ম নিয়ে কার কী ক্ষতি হয়েছে লিখে জমা দে ।”
“গেলবারের টাকাও ত পেলম নি সার ? আমার পেরায় দশ কাঠার মতন মাইড়েচিল হাতি । ফরম ত জমা করলম সেবার ।”
“চাষ করবি খাস জমিনে, টাকাও নিবি, ভালো । সরকারের মর্জি, কোনবার দেবে না দেবে বলি কী    করে ? এলে পাবি খন ।”
  লাল মোরাম ধুলো উড়িয়ে সাদা বোলেরো জঙ্গলের ভেতর হারিয়ে যায় । 
  দুটো হুলা জ্বালিয়ে মাটিতে পুঁতে দাঁড় করানো । সার দিয়ে শোয়ানো দশ ফুট, বারো ফুটের  মরচে ধরা লোহার রড, লাঠি ।   ঘর ঘর থেকে লুকনো তরবারির মত সব বের হয়ে জড়ো হয়েছে জঙ্গল মাঠে । স্তূপীকৃত চটের বস্তা ছিঁড়ে রডে গোল্লা পাকানো চলছে । প্রস্তুত হচ্ছে হুলা । পোড়া মবিলে ভিজিয়ে আগুন ধরানো হবে । লোহার মুখটা বেরিয়ে থাকে ।   আগুনে তেতে থাকে সেটা । হাতি একেবারে সামনে পড়ে গেলে তপ্ত শিকের ছ্যাঁকায় হঠিয়ে দেওয়া যায় । ভিতর গ্রাম, আশপাশের গাঁ থেকে লোক আসছে হুলা পার্টির সঙ্গে যাবে বলে । মালপাড়া থেকে, লায়েকপাড়া থেকে, তামলিরা কয়েকজন, সামন্তরা । তির-কাঁড়, গুলতি নিয়ে এসেছে সাঁওতালরা । সবাই মশাল ধরবে না । সাহসী জনা পনেরো হুলা ধরে, বাকিরা সঙ্গে থাকে । হাতি তাড়াতে ভিড় দরকার ।   
  মাঠের একদিকে কাজুর জঙ্গল, আরেকপাশে পটাশের বন পেরিয়ে মোটা ঋজু শাল ক্রমে গভীর হয়েছে । হাতিরা আপাতত ঠাঁই গেড়েছে সেখানে । গোটা চল্লিশ । গেলবার টানা একুশ দিন হাতিরা ছিল এখানে । সর্দার-হাতিটা গাছের সবুজে মিশে ধূসর পাহাড়ের মত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা । চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর তার । পিরীত-বাঁধের কাছে পঞ্চায়েতের পাথর কেটে তৈরি বড় আয়তকার পুকুর । একেবারে বনের মধ্যিখানে । পুকুরের চারপাশে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শাল । কিছু হাতি যায় কাশমউলি গাছের খোঁজে । কাশমউলির বাখরে-শেকড়ে জল থাকে । হাতিদের প্রিয় গাছ, জঙ্গলে প্রচুর হয় । মানুষ সমান গাছ উপড়ে তার ছাল, শেকড় চিবোতে থাকে । বাকিরা পুকুরে যায় ।   দুপুরবেলা জলে গা ডুবিয়ে বসে থাকে । একসঙ্গে বিশ পঁচিশটা জলে নেমে দামাল হয়ে ওঠে । ঘেঁটে, সারা পুকুরে আলোড়ন তুলে কাদাজল একেবারে দই করে রেখে যায় । সাঁওতালপাড়া পুকুর ব্যবহার করতে পারে না । বোটকা, কেমন হাতি হাতি গন্ধ জলে !
 জঙ্গল লাগোয়া জমিগুলোতে কম বেশি পোখরাজ ফলেছিল, যারা কিছুটা সচ্ছল তারা শীত শেষ হবার মুখে আরেকবার জ্যোতি আলুটাও বোনে ।   পোখরাজ আর আস্ত নেই । আট দশটা হাতি দু’পায়ে মাটি আঁচড়ে, আলু খুঁড়ে তুলে শুঁড়ে করে মুখে পুরেছে, বাকি থেঁৎলে গেছে । গতবার সারা শীতে বৃষ্টি ছিল না । আলুর ফলন হয়েছে প্রচুর ।   জলের দরে বস্তা ছেড়ে দিতে হয়েছে । বিঘা পিছু জমিতে হাজার বারো খরচ । পাওয়ার টিলার চলে, রোটারি মেসিন, ঝোর টানা মেসিন ।  আর আলু বস্তা গিয়েছে আশি টাকা,নব্বই টাকা করে ! যাদের তিন কাঠা, চার কাঠা জমি, হাতি ক্ষেত মাড়ালে লোকসান বেশি  তাদের । প্রায় পুরোটাই মহাজনের ধারে । সার থেকে কীটনাশক, বীজ আলু, মায় চটের বস্তার দামও মহাজনের । জমি তৈরি হয় । সারি দিয়ে লম্বা মাটির নালা । সেই নালাতে একটু একটু তফাতে বীজ বোনা চলে । গাঢ় সবুজ আলুপাতায় ভরে থাকে মাইলের পর মাইল জমি । মাটির তলায় একেকটা গাছে চার-পাঁচটা করে আলু ধরে । সেই আলু তোলার হিড়িকে ঘর ঘর বাচ্চারা, বউরা, জমিনে যেন মেলা বসিয়ে দেয় । দাম হিসেবে মহাজন অধিকাংশ বস্তাই তুলে নেয় । তবু, আলুর রেট চড়লে কিছু পয়সার মুখ দেখে চাষিরা । আর রাতের অন্ধকারে হাতিরা যখন সব তছনছ করে চলে যায়, সকালে ধর্ষিতার মত পড়ে থাকে ক্ষেত । লণ্ডভণ্ড । দলা, মোচড়া সবুজ আলু   পাতারা ।   বুকের ভেতরটা হায় হায় করে ওঠে । জমির আলে বসে কপাল চাপড়ায় বিশু মাল । বহু টাকা ধার পড়ে আছে মহাজনের ।  
  পোড়া মবিলে ভিজিয়ে নেওয়া হয়েছে হুলাগুলো । আগুন দেওয়া হয়নি । হাতির কাছাকাছি পৌঁছে একসঙ্গে জ্বলে উঠবে । মবিলের তীব্র কটু গন্ধে ভরে উঠেছে জঙ্গলের হিম বাতাস । সস্তা উলের সোয়েটার গায়ে ক’জন, আর সব চাদরমুড়ি । আগুন জ্বললে তাপে শীত কম লাগে । হুলা হাতে সামনে রয়েছে জনা বারো । পেছনে জনা কুড়ি-বাইশ ।   জঙ্গলের মোরাম রাস্তাটা ধরেনি । হাতি টের পেয়ে যায় । বন বাদাড় সরিয়ে ভেতর দিয়েই নিশ্চুপে এগোচ্ছে দলটা ।   শিশিরে ভিজে থাকা শুকনো পাতায় পায়ের চাপে মৃদু শব্দ হয় । কারও হাতে পাঁচসেলি টর্চ, একটু একটু জ্বলে উঠছে ।   শীত বলে সাপের ভয় কম । কাঁটাঝোপে লুঙ্গি আটকে যায় । কারও হাঁটু অব্দি গোটানো প্যান্ট, কাঁটা লেগে ছড়ে যাচ্ছে পা । 
  পিরীত-বাঁধের কাছে পৌঁছে মানুষের দলটা দাঁড়ায় । জঙ্গল এখানে কমে গিয়ে উঁচু নিচু লাল পাথুরে খাদান । পুকুরের জলে পাতলা সরের মত ভেসে আছে জ্যোৎস্না । গাছের পাতা চুঁইয়ে পড়া মৃদু আলোয় নিঝুম দাঁড়িয়ে একপাল মানুষের ছায়া । রাম মান্ডি গুলতি বাগিয়ে আছে । ভগা সরেনের হাতে তির কাঁড়, তিরে লোহার তীক্ষ্ণ ফলা ।   জগা সামন্ত চ্যাপ্টা বোতল থেকে এক ঢোঁক দিশি গলায় ঢেলে নেয় । বিজন দিগার প্যান্টের পকেটে চকলেট বোম আর একজোড়া গাছবোমা হাতে দাঁড়িয়ে । বেশিক্ষণ থাকলে ঠাণ্ডায় স্যাঁতা পড়ে যায় বোমার  বারুদ । বটু সিং এগিয়ে এসে সবাইকে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে চলে যেতে বলে । হাতি চটকানো একটা আলুর ক্ষেত পেরিয়ে ওধারের জঙ্গলে ঢুকে পড়ে এক দল, আরেক দল পুকুরের লাগোয়া গাছগুলির আড়ালে, বাকিরা বাঁধের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকে । তিন দিক থেকে ঘিরে খেদিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে । চালঘোরির জঙ্গলের রাস্তাটা খোলা । সারসা, পাণিকোটর হয়ে রসকুণ্ডুর জঙ্গলের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ।   
লাল পিঁপড়ের একটা ঢিপির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল বিজন । উহুহু করে লাফিয়ে ওঠে ।   
“চুপ মার !”
“পিঁপড়া গো !”
“মহারাজ সব বেরিইচে !”
  বিজন তাকিয়ে দেখে । মোরাম রাস্তাটার বাম পাশের জঙ্গল থেকে পর্বত প্রমাণ ছায়ারা রাস্তা পেরিয়ে একে একে ওধারের জঙ্গলে  ঢুকছে । ফ্যাঁস ফ্যাঁস ফ্যাতের তাদের শ্বাস ছাড়ার শব্দ । সর্দার-দাঁতালটা কি আছে সঙ্গে? পেছনে থাকে সে ।  বড় খতরনাক ! তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তরবারির মত লম্বা দাঁত ফুঁড়ে দিয়ে এসপার ওসপার করে ফেলবে একেবারে । রাস্তা পেরিয়ে সবকটা এক জায়গায় হলে তবেই হামলা, ততক্ষণ টুঁ শব্দটি বের করছে না কেউ । চাঁদের আলোয় সার দিয়ে হাতিরা রাস্তা পেরোচ্ছে ।  মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ে থাকে বিজন । হঠাৎ পুকুরের ওপাশের জঙ্গল থেকে হাতির গগন বিদারী ডাক কানে আসে । সে চমকে ওঠে । পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যতীন মাল বিড়িতে শেষ টান মেরে ধোঁয়া ছেড়ে ফিস ফিস করে,
“হা মাইরেচে !”
“কী গো কাকা ?”
“মাদী আছে একটা উধারে, উয়ার ডাক । বাচ্চা হবে মনে লয়, পসব বেদনা উইঠেচে !”
   বউ-এর কথা মনে পড়ে যায় বিজনের । ঘরে একা । রাগ করে শুয়ে আছে হয়তো । 
  হাতিরা রাস্তা পেরিয়ে যেতেই ওধারের জঙ্গলে হুলাগুলো দপ দপ জ্বলে উঠতে থাকে । পর পর জ্বলে ওঠে   এপাশেও । ভাঙা টিন পেটার তুমুল শব্দে, তিন দিক থেকে হা-রেরেরেরে, হো হো হো হো, হ্যাট হ্যাট হ্যাট চিৎকারে হুলা ঘোরাতে ঘোরাতে সব ছুটে যায় । সাঁওতালরা মুখে তালি মেরে মেরে আবা আবা আবা আবা কুলকুলি দিতে   দিতে । রাশি রাশি জ্বলন্ত মশাল ছুটছে । গল গল করে উড়ছে ধোঁয়া, আগুনের ফুলকি ছিটকে ছিটকে পড়ছে ।   অরণ্যের জমাট আঁধার চমকে উঠে ভয়ে তছনছ হতে থাকে । বিজন ছুটে গিয়ে হুলার আগুন থেকে পর পর কয়েকটা চকলেট বোমা ধরিয়ে ছুঁড়ে দেয়, সশব্দে ফাটতে থাকে সেগুলো । গাছবোমার সলতেয় আগুন দিয়ে ডালে ডালে আটকে দেয় । কিছুটা দেরি করে এ বোমা ফাটতে ।   
 দুলকি চালে নিশ্চুপে হাঁটতে থাকা হাতিরা এবার অস্থির হয়ে পড়ে । ঠেলাঠেলি করে কিছুটা পিছিয়ে যায় । কয়েকটা হাতি অন্যদিকে ছুটতে গেলে ভাঙা টিন বাজিয়ে আরেক দল খেদিয়ে আসে । ফাঁদে পড়া হাতিরা এবার পিছু হঠতে থাকে । হাতির পাল আর মানুষের দলের মধ্যে দূরত্ব এখন একশ মিটার মতো । বিজন দেখে হাতিগুলোর কয়েকটার সাদা লম্বা দাঁতে মাটি লেগে আছে । দাঁত দিয়ে বাঁধে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গর্ত করে ফেলে একেবারে, তার মাটি । সামনে স্থির চেয়ে থাকা হাতিদের চোখে কাঁপছে হুলার আগুন । এরই মধ্যে একটা হাতি তেড়ে আসতেই কয়েকজন ভয়ে হুড়মুড়িয়ে পেছন ফিরে পালাতে যায় । আলে হোঁচট খেয়ে জমিতে গড়িয়ে পড়ে । জগা সামন্তর পেটে দিশি পড়েছে, তার সাহস বেড়েছে ঢের । হুলাটা ধরে মেজাজে দাঁতালটার সামনে চলে যায় । আতঙ্কে হৈ হৈ করে ওঠে সব । রাম মান্ডি গুলতিতে মাটির গুলি ভরে হাতির কান লক্ষ্য করে ফটাস করে চালিয়ে দেয় । সেটা কিছুটা দূরে হাতিটার সামনে গিয়ে পড়ে । আমশোলের হাট থেকে সে এবার দু’ডজন মাটির গুলি এনেছে । ভগা সরেন তির উঁচিয়ে থাকে, প্রাণের দায় না পড়লে তির মারা বারণ । জগা বাম হাতের তর্জনী নাড়িয়ে হাতিকে আহ্বান জানায়,
“আও শালা আও ! হুলা দি এমন কিলাব…”
  কথাটা শেষ হয়নি, কিছু বুঝবার আগেই হাতিটা ছুটে এসে জগাকে সপাটে শুঁড়ে তুলে নেয় ! হাত থেকে ছিটকে পড়ে হুলা, শুঁড়ে প্যাঁচানো জগা শূন্যে হাত পা ছুঁড়তে থাকে । কিছুজন হুলা ফেলে দৌড় দেয় । সেগুলো মাটিতে পড়ে হুফ হুফ জ্বলতে থাকে । রাম মান্ডি তির চালিয়ে দিয়েছে । লোহার ফলা সোজা গিয়ে বিদ্ধ করেছে হাতির পেট । জগাকে ফেলে দিয়ে শুঁড় তুলে আর্তনাদ করে ওঠে প্রচণ্ড দাঁতাল । জগা নিচে পড়েই খোঁড়াতে খোঁড়াতে এঁকেবেঁকে ছুটতে থাকে । হাতি সোজা তেড়ে এলে এভাবে ছুটতে হয় । ছুটতে ছুটতেই জগা গায়ের জামাটা খুলে মাটিতে ফেলে দেয় । বেঁধা তির নিয়ে কিছুটা তেড়ে আসে দাঁতাল, তারপর অন্ধ আক্রোশে পড়ে থাকা জামাটা কুটি কুটি করে পা দিয়ে ঠাসতে থাকে । ফেলে যাওয়া জ্বলন্ত একটা হুলা ঘিরে দাঁড়িয়ে যায় কয়েকটা হাতি । 
  পর পর গাছবোমাগুলো ফাটতে থাকে এবার । হাতিরা আর এগোয় না, ক্রমে জঙ্গলের গভীরে যেতে থাকে । প্রায় তিনশ মিটার পিছিয়ে যাওয়া ভিড়টা সাবধানে এগিয়ে আসে । তারপর আবার হ্যাট হ্যাট হ্যাট করে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়ে । পেছনে থাকা বিজন সামনে চলে এসেছে । কিছুটা এগিয়েই স্তব্ধ হয়ে যায় সে । কাছেই জলাশয় । গাছ কম । খানিকটা বুনো ঘাসে ঢাকা প্রশস্ত জায়গা । হুলার আলোতে দেখে, ফুট পঞ্চাশের মধ্যেই হাতিরা ! কিছু ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে তারা । আর সেই চক্রব্যুহের ভেতর থেকে উঠে আসছে এক হাতির আর্তনাদ । বিজন বুঝতে পারে, মা হাতিটাকে ঘিরে রেখেছে, বাচ্চা হবে । একসঙ্গে, এক জায়গায় এত হাতি  প্রথম দেখল বিজন । আটটা হাতি তার দিকে মুখ করে রুখে দাঁড়িয়ে আছে । ভাবখানা এই, পারলে আয় এগিয়ে ! মশাল হাতে দলটাও গেছে থমকে । প্রায় সমস্ত হাতি তাদের শুঁড়গুলো মুখে পুরে অদ্ভুত কুলকুলকুল ডাকে বিদীর্ণ করে চরাচর । রণহুঙ্কার ! বিজনের পা দুটো থরথরিয়ে ওঠে । হাতির এমন হাড়কাঁপানো ডাক শোনেনি আগে ! মুহূর্তে শরীরের সমস্ত রক্ত শুকিয়ে যায় ।   হাতিরা এখন আর আগুন মানবে না, মানুষের ভিড় মানবে না, সবাই মিলে ছুটে আসার প্রস্তুতি । এক হস্তি শাবকের জন্ম হচ্ছে আজ রাতে । বটু সিং চিৎকার করে পালাতে বলে । রণে ভঙ্গ দিয়ে ছুটতে থাকে মানুষের পাল ।   দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ছোটে বিজন ।  

  জলাশয়টার পাড় ধরে ছোটার সময় চমকে দিয়ে কে ডাকে,
“বিজা, ইদিকপানে রে, গাছের উপর !”
 শ্যাওড়া গাছের ডালে ভূতের মত বসে যতীন মাল বিড়ি ফুঁকে যাচ্ছে ! বিজন চটপট গাছে উঠে পড়ে, হাঁফায় ।   পুকুরের এই পাড়টায় আসতে গেলে হাতিদের জল পেরোতে হবে । রাত এখন গভীর হয়ে ভোরের দিকে চলেছে ।   জঙ্গলের হাওয়ায় ক্রমে জাঁকিয়ে বসছে শীত ।  
“ছুটে ছুটে আলা হয়ে গেলম কাকা !”
  যতীন আঙুল তুলে দেখায় । পুকুরের ওপারে মাটিতে পড়ে আছে কতকগুলো হুলা, জ্বলছে এখনো । সেই আগুনে  মাটিতে শুয়ে থাকা বিশাল মাদিটাকে দেখতে পায় । বাচ্চার দেহ অর্ধেক বেরিয়ে এসেছে, থেকে থেকে আর্তনাদ করে উঠছে মা-হাতিটা । কিছুটা দূরে স্থির দাঁড়িয়ে আছে তির বেঁধা দাঁতাল । বিজন দেখে, রক্ত গড়িয়ে নামছে তার গা   বেয়ে । ওটা বাঁচবে না, ফলার ঘা-টায় ইনফেকশন হয়ে মরবে । যতীন হঠাৎ জিগ্যেস করে,

“তোর বউ-এর ক’মাস হল ইটা ?”

“ল’য়ে পইড়েচে ।  “

  এখানে আসার সময় বারণ করেছিল বউ । পেটে বাচ্চা এলে মেয়েদের ভয় বাড়ে । 

“কাকা, উয়াদের দেখলে মনে লয় মানুষের মতন, লয় ?”

“হুঁ, হাতির বুদ্ধি খুব বটে !”
  বিজন লুকিয়ে দেখেছে, দুপুরবেলায় কেমন দু’পা মুড়ে শুয়ে ভোঁস ভোঁস ঘুমোয় হাতিরা । দুটো কি তিনটে হাতি থাকে সজাগ পাহারায়, চারদিকে তাদের নজর । কোথাও মৃদু আওয়াজ পেলেও পা দিয়ে ঠেলে তোলে ঘুম   কাতুরেদের । আবার কোন মদ্দা যখন মাদির পিঠে উঠতে চায়, তাদের যৌনক্রীড়ার দাপাদাপিতে জঙ্গলে ঝড় ওঠে ! গাছের মাথা থেকে সভয়ে উড়ে যায় পাখিরা…। তবে বিজনের মন ভরে যায় বাচ্চা হাতি দেখে । ছটফটে, দুরন্ত, মায়ের সঙ্গে ল্যাকপ্যাক করে চলে । শিশুটাকে মাঝে রেখে হাতিরা পথ হাঁটে মাইলের পর মাইল । বিপদ এলে শিশুকে শুঁড়ে জড়িয়ে পেটের কাছে লুকিয়ে নিয়ে ছোটে । একবার দেখেছিল, হাতিরা ছুটে পালাচ্ছে, বাচ্চাটা নড়বড় করতে করতে ছুটছে তার মায়ের সঙ্গে । জমির আল এলেই বার বার শুঁড়ে তুলে আল পের করে দিচ্ছে মা-টা । দৃশ্যটা মনে করেই ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে ওঠে তার । 
“আচ্ছা কাকা, উয়াদের এত বুদ্ধি, ইটা বুঝে নাই মহাজনের ঋণে আমাদের চাষ বাস হয়? ঝোর মেসিন নাই, পাবার টিলার নাই, কদাল দি লালা টেইনে টেইনে আলু বুনি । আলু একটুন উইঠেচে ত সব বস্তা মহাজনকেই দি দিতে হয় ।   কত্টুকু টাকা হাতে থাকে বল ?”
  ধোঁয়া ছাড়ে যতীন,
“জঙ্গলে খাবার কুথা ? নাই রে ভাইপো ! সাদ কইরে কি গাঁয়ে এইসে ঢুকে এরা ? সেপাশে খেদালে এপাশে আসে, এপাশে হড়পালে সেধারে যায় !”
  জঙ্গলে খাবার নেই । গ্রামে আছে ? পোয়াতি বউটাকে একটু ভালো মন্দ খাওয়াতে ইচ্ছে করে । লোকের বাড়িতে দিন মানে মুনিষ খেটে সংসার চলে না । গাঁয়ে ঘরে কাজ নেই । বেশিরভাগেরই জমি নেই নিজেদের । ভাগে পাঁচ-ছ কাঠা বড়জোর । জঙ্গলের যেটুকু খাস জমি তাতে ফসল হতে চায় না । কর্কশ, লাল পাথুরে মালভূমি । যে বার ভালো বৃষ্টি হয়, বড়জোর একটাই চাষ হয় তখন । সারাবছর হাঁ করে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে ।  

  গ্রাম থেকে একটি একটি ঘর চলে যাচ্ছে বাইরে, কাজের খোঁজে । বহু বছর পর কেউ ফিরে আসে, কেউ আর ফেরে না । একটা একটা পরিবার যখন তখন বেমালুম উপে যাচ্ছে, নিঃশব্দে । তায় বিজনরা আবার লায়েক ! সরকারের খাতায় শধু নয়, গোটা দেশে একেবারে নেই হয়ে আছে জলজ্যান্ত মানুষগুলো !
 আর পারে না বিজন ।  বাচ্চাটা হওয়ার অপেক্ষা । পালাবে সেও । ঝুনা ফৌদার যেমন পালিয়েছে । তার প্রাণের বন্ধু ঝুনা, বউ বাচ্চা নিয়ে চলে গেছে ভিন রাজ্যে । সোনার কাজ, জরির কাজে । ঝুনা তখন বিজনকেও বলেছিল যেতে ।   বিজন যায়নি । তার সুন্দর গাঁ ছেড়ে যেতে মন সরেনি । ছেলেবেলার কত স্মৃতি এখানে । বিকেলবেলা পাতায় পাতায় আলো পড়ে সুন্দর হয়ে থাকে কাজুর বন । বর্ষায় খালের জলে রুপোলি মাছ সাঁতার কেটে যায় । বন-ছাতুতে ভরে ওঠে জঙ্গল ।   চাষের সময় মাইলের পর মাইল সবুজ হয়ে থাকে মাটি, হোক সে অন্যের, দু’চোখ ভরে দেখতে ভালো লাগে, কেমন বৃষ্টি ঝরে পড়ে দুলতে থাকা কচি ধানের মাথায়…। ভিন দেশে টাকা পাওয়া যায় ? কত টাকা ? এই তার গ্রাম । মা তাকে এখানে জন্ম দিয়ে মরেছে । যেদিকে দু’চোখ চায়, সর্ষেফুলে হলুদ হয়ে থাকা ক্ষেত, ধুধু খামার, জল ভরা খালের বাঁক, আর মানুষ, চেনা মানুষ, আপন মানুষ । অস্থির, বড় অস্থির লাগে তার ।   
“কেমন ফাঁদে পইড়ে গেলম মনে লয় গো কাকা…”
 কথাটা নিজের কানেই কেমনধারা ঠেকে । যতীন কিছু বলে না, হয়তো তার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারে । বিজন স্থির তাকিয়ে থাকে জলাশয়টার ওপারে । হস্তি শাবক ভূমিষ্ঠ হয়েছে । কিছুদিন এই জায়গা থেকে আর নড়বে না হাতিরা ।   তারপর একসময় ফিরবে আস্তে আস্তে । আমশোলের বন হয়ে রসকুণ্ডু দিয়ে বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়ার জঙ্গলের দিকে । সে যেন দেখতে পায়, মাঝে শাবকটিকে রেখে সার দিয়ে চলেছে হাতিরা । খাবারের খোঁজে । এ জঙ্গল পেরিয়ে অন্য  জঙ্গলে । শেষ নেই, চলার শেষ নেই…

বিজন দিগার শুনেছে, মানুষও একদিন যাযাবর ছিল ।  

মৃণাল শতপথী

মৃণাল শতপথী

গল্পকার
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=