প্রতিভা সরকারের গল্প : কুয়াশার পাখি

প্রতিভা সরকারের গল্প : কুয়াশার পাখি

এইখানে শীতকালে এমন কুয়াশা পড়ে যেন সাদাটে পর্দা ঝুলিয়ে দিয়েছে কেউ। গুঁড়ি গুঁড়ি জলকণা জড়ামড়ি করে ভেসে ভেসে যায়, নাকের ডগাটুকু ঠান্ডা হয়ে আসে, নিজের হাত ছড়ালেও কনুইয়ের পর থেকে আর কিছু দেখতে পাবে না। তার মধ্যেই মোরগ ডাকে কর্কশ স্বরে। পায়ে মোজা পরা পায়রারা ঝোলানো খোপ থেকে বেরোনোর আগেই গলা ফুলিয়ে বকাবকি করে পরস্পরকে—
 
“রকমসকম, রকমসকম দ্যাখ/বক্কাবকম বিয়াক!” 
 
ওদের খোপের ঢাকনা খুলে দিয়ে নতুনঠাকুমা লক্ষ্মীদিকে জিজ্ঞাসা করে, “গোবরছড়া দিছস নি?” 
লাল মোটা লেপে সাদা ওয়ার পরানো, তার নীচে থেকে শুধু সাদা পাথর-পরা নাকটুকু বের করে রাখে রিনি, মন দিয়ে টিনের চালে টুপ টুপ শব্দ শোনে। নারকেল পাতা চুঁইয়ে শিশিরের জল ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা। ঘাস, পাতা, ধানের শিষ, গাছের ডাল, চালার খাঁজ, সর্বত্র শিশিরকণাগুলি রোদ না ওঠা অবধি অসহায় ঝুলে থাকবে। হলদে রোদ এসে পড়বে গোয়ালঘরের চালায়, গোরুগুলো খাবার চেয়ে ডাকাডাকি করবে, মুরগিরা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সারা উঠোনে সাবধানী লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘুরবে, যত্রতত্র নোংরা করবে— তবে মোটা কার্ডিগানে নিজেকে মুড়ে রিনি উঠবে। আদরের নাতনি, ক্লাস টেনের পরীক্ষা দিয়ে, নতুনদাদুর খামারবাড়িতে বেড়াতে এসেছে, তার খাতির আলাদা।
 
সেই খাতিরদারির কারণে কেউ হাঁস-মুরগির খোপ থেকে ডিম তোলে না। রিনি উঠবে, তার পর একটা একটা করে গুনে ঝুড়িতে তুলবে। বড় বড় ডিমের গায়ে বিষ্ঠার কালো কালো ছোপ। তবু হাত দিয়ে ধরতে ঘেন্না করে না। এখানে সকলই নবীন, সকলই শোভন। সকাল থেকেই গানের সুর মনের মধ্যে কুয়াশার মতোই পাক খায়। কখনও সখনও গলায় উঠে আসে, কিন্তু পাকলে ধরো, মুঠো গলে বেরিয়ে যাবে। নতুনঠাকুমা মাঝে মাঝেই বলে, “গলা খুইল্যা গায় না ক্যান মাইয়াডা!”
 
রিনি বলে, “ধুসস, ছাড়ো তো!”
 
ঠান্ডা কনকনে খেজুর রস তাকেই প্রথমে হাঁড়ি থেকে ঢেলে দেবে বাচ্চাদা, আসলে যে একজন আধবুড়ো মুনিষ। তার পর অন্যরা পাবে। দাঁত শিরশির করবে, জানান দিয়ে গলা থেকে পাকস্থলী অবধি নামবে অতিশীতল হালকা সোনালি রসের প্রবাহ, তবু কী আনন্দ, কী তৃপ্তি! রিনি এঁটো না করে কাঁসার গ্লাস থেকে সরু ধারায় রস ঢালে মুখে, মাথা পেছনে হেলায়, আর তার মোটা লম্বা বিনুনি নীচে নামতে নামতে হাঁটুর পিছনটা প্রায় ছুঁয়ে ফেলে আর কী! আগাটুকু একটা রাবার ব্যান্ডে পেঁচানো, খরগোশের লেজের মতো।
 
নতুনদাদুর একটা চোখ পাথরের। আর একটা চোখ থেকে অনবরত জল পড়ে, শোকে, দুঃখে আনন্দে, সবসময় লোকটা কাঁদছে মনে হয়। কিন্তু যে চোখটা জ্যান্ত তাতে অনেক মায়া মাখানো। পাউরুটির পিসে লাগানো মাখনের মতো। নরম আর গভীর সেই চোখটা দিয়ে দাদু অনুনয় করে মাকে বলেছিল, “অনু, দিদিভাইকে নিয়ে যাই, কতদিন যায় না, এবার এত যেতে চাইছে, মাত্র তো একটা সপ্তাহ! তার পর তো তোমরা বিয়ের জন্য এসেই পড়ছ, একসঙ্গে ফিরে আসবে না হয়।”
 
নতুনদাদু তো নিজের দাদু নয় রিনির। নিজের ঠাকুমার নিজের ছোট বোন নতুনঠাকুমা, তার হাজব্যান্ড। এই নিজের অথবা দূরসম্পর্কের শব্দগুলোও কুয়াশার মতোই বায়বীয়। সে নিজের ঠাকুমার থেকে নতুনঠাকুমাকে বেশি ভালবাসে। তবু মা বলে, এত দূরসম্পর্কের আত্মীয়, তাদের বাড়িতে গিয়ে এতদিন থাকার কী আছে ধাড়ি মেয়ের!
 
বিয়েটা অবশ্য নিজের কাকার। নিজের ঠাকুরদার বাড়িতে, জেলাশহরে। সবাই সেখানে জড়ো হবে। তার আগে এই আলগা মুক্তি! এক হপ্তা তো কম দিন নয়! রিনি মনে মনে হাততালি দেয়। শেকলে বাঁধা পশু যেমন ছাড়া পেলে দিগ্‌বিদিকশূন্য ছোটে, তেমনই সে একা পালং খেতে ঘুরে বেড়ায়, আলের ওপর দু হাত ছড়িয়ে ব্যালেন্স করে হাঁটে, গাছের তলে ছানা পড়ে গেছে বলে শালিকের চেঁচানিতে কাতর হয়ে মুনিষদের গাছে চড়ায়। এখানে খেজুর গাছের নীচে দিয়ে সুরকি ফেলা রাস্তায় একটু নেচে নিলেও কেউ কিছু বলবে না। পুকুরে মুড়ি ফেলে অনন্তকাল তাকিয়ে দেখা যায় অগুনতি মাছের বুড়বুড়ি। আর শীতকাল বলে বেলা চারটে বাজতে না বাজতেই দিগন্তবিস্তৃত ধানখেতের ওপাশে সূর্যাস্তের নানা রঙে তার তাক লেগে যায়। কলকাতার জল-জমা, কুকুরের বিষ্ঠামাখা সরু গলির বাইরে এইরকম একটা স্বপ্নের মতো জগত আছে অথচ সেখানে তার প্রবেশাধিকার অল্প দিনের জন্য, এ কথা ভেবে রিনির কান্না পায়। 
 
শহরে নিজের বাড়ি ভাড়া দিয়ে কেন খামারবাড়িতে পড়ে আছে নিঃসন্তান নতুনদাদুরা, রিনি জানে না। এখানে টিমটিমে হলদে বাল্‌ব জ্বলে বাঁশের মাথায়, অতবড় উঠোনের অন্ধকার তাতে কাটে না। সেই অভাব কমাতে যত হ্যারিকেন, কুপি জ্বলে তত আনাচকানাচ থেকে লাফ দিয়ে সামনে এসে পড়ে অন্ধকার। অনেকটা এলাকা জুড়ে কাঠের বাড়ি, দুটো ধানের গোলা। এগুলোকে প্ল্যাঙ্ক হাউস বলে, রিনি জানে। মেঝের গোটা প্ল্যাটফর্মটাই মোটা শালবল্লার খুঁটির ওপর মাটি থেকে নিদেনপক্ষে পাঁচ-ছ’হাত ওপরে তোলা। তার পর মোটা তক্তা দিয়ে দেওয়াল তৈরি, জানলা-দরজা সব কাঠের। এইসব, কারণ আগে হাতির উপদ্রব ছিল। এখনও দূরের জঙ্গল থেকে তাদের বৃংহণ ভেসে আসে।
 
এইরকম একটা জঙ্গল-ঘেঁষা বাড়িতে থাকতে যে কী আনন্দ! রিনি পূর্ণিমা রাত্তিরে নিজের চোখে দেখেছে কুয়াশার মধ্যে বিশাল ডানা মুড়ে সাদা পেঁচা এসে বসল বড় গোলাটার ওপর। নতুনঠাকুমাকে বলতে জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে বিড়বিড় মন্ত্র পড়তে থাকে বুড়ি। শুভ লক্ষণকে শুভ বললে যদি অশুভের বাতাস লাগে, তাই কক্ষনও খুশি হয়েছে এমন ভাব দেখাবে না। ভাল করে তাকিয়ে রিনির মনে হয় সবসময় বেজারমুখো নতুনঠাকুমা তারই মতো দেখতে, অনেক মিল ছড়ানো নাকের খাড়াই আর বড় বড় চোখে। ঠোঁটের ভাঁজের অনেক ভেতরে লুকিয়ে থাকা চিলতে হাসিতে। সিঁদুর টিপ ধ্যাবড়ানো ঠাকুমাকে দেখলেই মনে হয় একে কোথাও আগে দেখেছি। আয়নাতে কি?
 
লক্ষ্মীদি বলছিল বাড়ির পেছনের বাঁশঝাড়ে রোজ ভোরবেলা আশ্চর্য এক পাখি এসে বসে। সেও নিজে দেখেনি কিন্তু অনেকের মুখে শুনেছে। তার গলা ও ডানায় রামধনুর সবক’টা রং আছে। লাল ঠোঁট ফাঁক করে সে পূবে সূর্যের দিকে তাকিয়ে তিন বার ডাক ছাড়ে। চেহারার মতো সুন্দর নয় সে ডাক, ময়ূরের মতো কর্কশ, হাড়গিলের মতো অশ্রাব্য। তার পর তিন হাত ডানা মেলে জলার ওপর দিয়ে উড়ে যায় কোথায়, কেউ তাকে ফিরতে দেখে না। কিন্তু পরদিন আবার সেই একই জায়গা থেকে উড়ান দেয় সে। বাচ্চাদা, খামারবাড়ির হেড মুনিষ, হাতে কাটারি নিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজেছে বাঁশঝাড়ের গোড়া থেকে আগা কিন্তু কোথাও সেই পাখির একটা পালকও পড়ে নেই, বাসা কী ডিম তো দূরের কথা!
 
নতুনদাদু এসব গালগল্প পাত্তা দেয় না। বলে, “ওই একজাতের ময়ূর হবে বা। ওরা ওইরকম বাড়িয়ে-তাড়িয়ে বলে। পাখি ফেরে তো নিশ্চয়ই, না হলে রোজ সকালে ডাক শোনা যাবে কী করে!”
 
এখানে আসার দু’দিন পরে খুব সকালে একটা কীরকম আওয়াজে রিনির ঘুম ভেঙে গেল। লক্ষ্মীদি যেমন বলেছিল তেমন কুৎসিত না হলেও, কেমন যেন, মনে হয় একটা মাটির হাঁড়ির ভেতর থেকে খুব সরু তীক্ষ্ণ গলায় কেউ আর্তনাদ করছে। তীক্ষ্ণতা ভোঁতা হয়ে যেন চারদিক গমগম করছে সেই ডাকে। হাই পিচ আর বেসের গাম্ভীর্য মিলে খুব অদ্ভুত ব্যাপারটা। রিনির মনে হল, এ নিশ্চয়ই সেই বাঁশবাগানের আশ্চর্য পাখি। সে তড়িঘড়ি উঠে পড়ল। কার্ডিগানের ওপর চাদর জড়িয়ে দরজা খুলল। লক্ষ্মীদি উঠোন ঝাড় দিচ্ছিল, নতুনঠাকুমা স্নানের ঘরে। সঙ্গে যেতে পারবে না, গাইবাছুরগুলো খিদেয় খুব চেঁচাচ্ছে, তাই লক্ষ্মীদি রিনিকে বার বার করে সাবধান করে দিল, “কুঁড়ায় যাইও না য্যান, ওইদিকের বাতাস কইলাম খুব খারাপ।”
 
রিনি জানে, এই এলাকায় বদ্ধ জলাভূমিকে কুঁড়া বলে। কিন্তু একটু যেতে না যেতেই কুঁড়ার সেই খারাপ বাতাস এসে রিনির পা জড়িয়ে ধরল। তার ফ্রক ফুলেফেঁপে তাকে নিয়ে উড়ে যেতে চায়, ভাগ্যিস নীচে সালোয়ার পরা, না হলে হিম বাতাসে জমে যেত পা-দুটো। অনেক দূরে চকচক করছে বিশাল জলের বিস্তার। এতদূর থেকেও বোঝা যায় বাতাসের তোড়ে ছোট ছোট ঢেউয়ে কুঁচকে আছে বিস্তীর্ণ জলা, যেন সারাদিন শুয়ে গল্পের বই পড়ার পর রিনির ঘরের বিছানার নীল চাদর। বাঁশবন আর জলার মাঝামাঝি জায়গায় হঠাৎ কাঠের খুঁটির ওপর একটিই ঘর দাঁড়িয়ে। সেই একইভাবে প্ল্যাঙ্কিং করা। বাঁশবনের দিকে মুখ করা একটা জানলা খোলা, বাদবাকি আর কিছু দেখা যাচ্ছে না এতদূর থেকে। সেই রহস্যময় পাখির টিকিটি নেই কিন্তু ছাতারে-শালিক-চড়ুই-কাকের মিলিত সিম্ফনির মধ্য দিয়ে রিনি ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল। এতদূরে এই ঘর কার, কে থাকে এখানে! কেউ যদি নাই-ই থাকে, রিনি এখানে দুপুরবেলাগুলো কাটাতে চায়। কী অসাধারণ জায়গাটা! নিস্তব্ধ, বাতাসিয়া আর সবুজে ভরা। আশ্চর্য, দাদু-ঠাকুমা কেউই তাকে এই জায়গাটার কথা বলেনি!
 
ভাবতে ভাবতে ঘরটার দিকে আরও কিছুটা এগোয় রিনি। নজরে আসে ঘরের চারদিকে ঘিরে রেলিং দেওয়া কাঠের বারান্দা, তার ওপরে লতিয়ে ওঠা ফুলগাছের ঝাড় অনেকটাই আড়াল করেছে চোখকে। ওপাশে জানলা-দরজা নিশ্চয়ই আছে, তবে এপাশে ওই একটিই জানলা, বেশ লম্বা আর লোহার শিক দিয়ে সুরক্ষিত। খড়খড়ি দেওয়া পাল্লা সকালের রোদকে খোলা দাওয়াত দিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে দু’ধারে। লতিয়ে ওঠা গাছটি মাধবীলতা বলে মনে হয় এতদূর থেকে, অজস্র লালচে ফুলের ভারে একমাত্র জানলাটির অর্ধেকটাই ঢাকা। তবু দেখতে ভুল হয় না রিনির— একটা বাদামি বলিষ্ঠ হাত জানলার শিকের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এসেছে পুরোটা, আর ওপরে-নীচে আন্দোলিত হয়ে সে কাকে যেন ডাকছে! সামনে পেছনে তাকায় রিনি, কেউ তো নেই। তার পিছনে বাঁশবন, সামনে অনেক দূরে জলা। মাঝে এই একলা ঘরটা আর সে।
 
হাতটাই শুধু দেখা যাচ্ছে, ঘরের ভেতরে অন্ধকার, হাতের মালিককে দেখা সম্ভব নয়। রিনি ধরে নেয় হাতটি তাকেই ডাকছে। সে ছাড়া ধারেকাছে কেউ নেই। সেও নিছক কৌতূহলে হাত নাড়ে একইরকম ছন্দে, আর তাতে জানলার হাতটি যেন আনন্দে উলসে ওঠে। এবার শিকের ফাঁকে দুটো হাতই বেরিয়ে আসে। শুধু হাতছানি দেওয়া নয়, চরম উল্লাসে তারা একবার আকাশের দিকে ওঠে, আবার নীচে নামে লতাপাতার ভেতরে। যেন প্রবল আনন্দে ফেটে পড়ে জাপানি কায়দায় কেউ অভিবাদন জানাচ্ছে। তার মানে হাতের মালিক তাকেই ডাকছিল!
 
দুটো বাদামি হাত আর হাওয়া, পাখির ডাক, পাতার ওড়াউড়ি। তবু রিনি আর এগোতে ভয় পায়। এত জনমানববর্জিত জায়গা, কে যে ওই হাতের মালিক, কেনই বা তার এই অদ্ভুত ইশারা, কে জানে!
 
কাউকে কিছুই বলেনি রিনি। রহস্যভেদ সে একাই করবে, পাণ্ডব গোয়েন্দা পড়ে পড়ে তার মুখস্থ। কিন্তু খেতে বসে নতুনদাদু তাকে বলল, “দিদিভাই, একা একা অনেক দূরে চলে যেয়ো না যেন, ভয় পেতে পার, এতবড় জোত, হারিয়ে যেতে পার। অবশ্য হারালে নরেশ নিয়োগীর খামারবাড়ি শুনলে লোকে বাড়ি বয়ে ফেরত দিয়ে যাবে। তবু সাবধানের মার নেই।”
 রিনি একবার ভাবল ওই ঘর আর হাতের কথা দাদুকে জিজ্ঞাসা করে কিন্তু ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি বন্ধ হয়ে যাবার ভয়ে সব চেপে গেল। 
 
এখানে সব আশ্চর্য স্বাদের রান্না হয়। কাঁঠালবিচি দিয়ে মুগডাল, কলমি শাক, কাঁকরোল ভাজা আর পুকুরের মাছের ঝোল। খাওয়া শেষ হবার আগে নতুনঠাকুমা ঘরের গোরুর দুধে তৈরি এক বাটি নতুন গুড়ের পায়েস এনে সামনে রাখল। লক্ষ্মী মেয়ের মতো চেটেপুটে খেয়ে নিল রিনি।  মা দেখলে মুখ ঝামটাত— পরের বাড়ির পিঠে/খেতে তো ভারি মিঠে! 
 
পরদিন ভোরে যখন সে বেরোচ্ছে, একেবারে নতুনদাদুর মুখোমুখি, “কোথায় যাচ্ছ, দিদিভাই?”
 
রিনি ঘুরে আসা-টাসার কথা বলে কাটিয়ে দেয়। দাদুও আর কথা বাড়াল না। শুধু বলল, “জলার দিকে যেয়ো না। বরং টমেটো খেত থেকে টমেটো তুলে এনে নতুনঠাকুমাকে দাও। আজ চাটনি করে দেবে।”
 ফেরার পথে টমেটো তুলবে, এই ভেবে রিনি হনহনিয়ে এগোয়। কেন যে সবাই জলার দিকে যেতে বারণ করে! একজোড়া শক্তপোক্ত হাতের টান, অ্যাডভেঞ্চারের নেশা, কৌতূহল, সব মিলে সে যেন ছিপে আটকানো মাছ। খাবি খাচ্ছে।
 
আজ সে ঘরটার অনেক কাছাকাছি। না হলে কুয়াশার দাপটে কিছুই দেখতে পাবে না। যদিও আজ মন ভাল করে দেওয়া ঝকঝকে রোদ উঠেছে সকাল থেকেই। অজস্র পাখির ডাকাডাকি ছাপিয়ে একটা ভারী শেকল নাড়াচাড়ার শব্দ কানে আসছে তার। কী আশ্চর্য, এখানে শেকল আসবে কোথা থেকে!
 
নতুনঠাকুমা সেদিন রাতে একটা গা ছমছমে গল্প বলছিল। শেকল-রাক্ষসের গল্প। শেকলের রূপ ধরে দিঘির মাঝখানে চুপচাপ পড়ে থাকত, কেউ জলে নামলেই ঢেউয়ের তলা দিয়ে সরসর করে এগিয়ে আসত লোহার শেকল, জলে নামা লোকটা যে কীভাবে খাবি খেতে খেতে তলিয়ে গেল, কেউ বুঝতেই পারত না।
 
একবার হল কী, শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এক নতুন বউ তেষ্টায় ছটফট করছিল দেখে পালকি বেহারারা সেই দিঘির ধারে পালকি নামাল। আর আঁজলাভরে জল খাবার সময়ই শেকল-রাক্ষস তাকে জলের নীচে থেকে সবার চোখের সামনে দিয়ে টেনে নিয়ে গেল। সবার মনে হল বউটি যেন পা হড়কে পড়ে গেল, আসলে নিঃশব্দে রাক্ষস এসে জড়িয়ে ধরেছিল তার আলতাপরা পায়ে। তার পর এক হেঁচকায় কাজ শেষ। বেহারারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বটে কিন্তু বউ চোখের নিমেষে তলিয়ে গেলে তারা আর কী-ই বা করে! তারা যে নিরাপদে উঠে আসতে পারল, তার কারণ, এই রাক্ষস বনের বাঘ-সিংহের মতো। পেট ভরা থাকলে কাউকে কিছু বলে না।
 
এইখানে উথালপাথাল হাওয়ার মাঝখানে শেকলের শব্দ কানে আসতেই রিনির গল্পটা মনে পড়ে যায়। সে একটা ছোট বাঁশঝাড়ের পেছনে থমকে দাঁড়ায়। সরু চোখের মতো পাতা হাওয়ায় নাচে, অনেক ফাঁকফোকর, দূরে নজর চালাতে কোনও অসুবিধে হয় না। কাউকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু কেউ ঘরটার কাঠের মেঝের ওপর ভারী শেকল টানাটানি করছে। আর এগোবে কী এগোবে না ভাবতে ভাবতেই মাধবীলতা গাছের ওপর কার ছায়া পড়ল। রিনি দেখে, একটি ছেলে, তার দাদার মতো বছর কুড়ির যুবক হয়তো, পায়ের ভারী শেকল টানতে টানতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বাদাম তেলের মতো স্বচ্ছ তার গায়ের রং। একমাথা কালো চুল-দাড়ি- গোঁফে তাকে হয়তো বনমানুষ মনে হত কিন্তু তার চোখদুটো একেবারে আলাদারকম! পৃথিবীর যাবতীয় স্বপ্ন, ভালবাসা, সারল্য যদি কোথাও পাখির বাসার মতো জমাট বেঁধে থাকে তা এই ছেলের দুই চোখে। রিনির দিকে সে চোখ পড়তেই তা আলো-ভাসা জলের মতো ঝলমলে হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে আবাহন। আজ স্পষ্ট দেখছে বলে দেখা যাচ্ছে ঠোঁটও নড়ছে। অস্ফুটে সে বোধহয় বলছে, “আয় আয়, আয়।”
 
কিন্তু যাবে কী, রিনি ততক্ষণে দেখে নিয়েছে, সটান দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির শরীরে একটি সুতোও নেই কোথাও। অথচ চোখ তো বটেই, সারা শরীর দিয়ে রিনিকে ডেকে চলেছে সে। যুবক শরীরের সমস্ত পেশিময়তার সঙ্গে চোখ আর হাত নাড়ার ভঙ্গির আশ্চর্য কোমলতা মিলেমিশে সে এক এমন সৌন্দর্য, রিনি চোখ ফেরাতে পারে না। কিন্তু তার কানের লতি গরম হয়ে উঠতে থাকে। এই আশ্চর্য ঘটনার প্রথম অভিঘাতে রিনির চোখ আছড়ে পড়ে বাঁশগাছের গোড়ায়, কিন্তু শেকড়ের বিন্যাস, শুকনো পাতার পুরু গালিচা, কোনওটাই সে দেখে না। সাময়িক অন্ধত্ব গ্রাস করে তাকে, নাকি তার চোখ আলতো করে এইসব ছুঁয়ে চলে যায়, চোখের পাতা পিটপিট করে, নামানো চোখের ভেতরটা জুড়ে চঞ্চল কালো মণিদুটি এমন ছুটোছুটি করে যে বোঝাই যায় ঊর্ধ্বচারী হবার অপেক্ষা তাদের সইছে না। না চাইলেও তাকে ওপরে তাকাতেই হয়। শেকল-রাজপুত্র হাত নেড়ে তাকেই ডাকছে যে! মাধবীলতার ফুল ছুঁয়ে তার চোখ আছড়ে পড়ে ছেলেটির শরীরে, অথচ রিনির আর কোনও পাপবোধ হয় না অপাঙ্গে তাকিয়ে থাকতে। বরং বিনবিনে একটা ভাললাগা মাথার ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে তার মনে হয় এই কি সেই জলাজঙ্গলের রহস্যময় পাখি যার খোঁজে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়েছিল সে! যেমন সে অচেনা বৃক্ষ দেখে, তার খাঁজখোঁজ, কাঠঠোকরার ঠোঁটের গর্ত, নতুন পাতা, ঝড়ে মুচড়ে যাওয়া ডাল, মুকুলের মধ্যে লুকোনো ফল, তেমনই ছেলেটিকে দেখে রিনি। তার ছড়ানো কাঁধ, দরাজ কপাটের মতো বুক, বুকের ওপর দুর্বাঝাড়, সরু কোমর, গভীর নাভি, ঈষৎ উদ্ভিন্ন অথচ মাধবীলতার মতো নুয়ে পড়া কোমল ঘাসে ঘেরা লিঙ্গ বেয়ে তার নজর এসে পড়ে মেহগনি গাছের কাণ্ডের মতো দুই পায়ে। আহা রে, সেখানে ঝোলে এক মোটা ভারী শেকল!
 
আবার সেই অদেখা পাখির কথা মনে হয় রিনির। এমন শেকলে বাঁধে তাকে কেউ পাছে, তাই বুঝি সে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিরাট পাখার ছায়া ফেলে উড়ে যায়। ছেলেটা হাত নেড়ে ডাকে, লালচে ঠোঁট নড়ে, চোখ চঞ্চল হয়, যেন এই প্রথম সে কোনও মানুষ দেখল! রিনির চোখে জল এসে যায়। এই আদিম শাশ্বত সৌন্দর্যের কাছে কী করে যাওয়া যায়! পুড়ে যাবে জেনেও তবু আগুনে পা দিতে যাচ্ছে এইভাবে সে এক পা বাড়ায়। তক্ষুনি পিছিয়ে আসে, যেন ছ্যাঁকা লাগল। দু-এক বার এইরকমই দোলাচল। কে জানে কতটুকু সময় গেছে। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে চেনা চেহারার একজন ঘাড় মুচড়ে ধরে ছেলেটার। নিষ্ঠুরের মতো মারতে থাকে, এই অঞ্চলের ভাষায় চিৎকার করে— “ঢোক শালা, ঘরত ঢোক, তোক কতদিন কইছু না, ন্যাংটা হোয়া বাহিরে আসিবি না। হারামজাদা! শরমহীন তুই একটা কুত্তা। তোর হাগামোতা পরিষ্কার করি করি মোর জনমটাই চলি গেইল!”
 
বাচ্চাদা! রিনি অবাক হয়ে দেখে, বেদম মার খায় ছেলেটা, টেনেহিঁচড়ে তাকে ঘরে ঢোকানোর চেষ্টা করে বাচ্চাদা, মুখে অকথ্য গালাগাল। দেখেনি সে মনিবের নাতনিকে, তাহলে হয়তো মুখে কিছুটা লাগাম পড়ত। ছেলেটাও বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া পশুর মতো চেঁচায়, সেই বেসের গাম্ভীর্যে মিশে যাওয়া তীক্ষ্ণ আর্তস্বরের তীব্রতা। এই, এইটাই শুনেছিল রিনি সেদিন ভোরে। বাধা দেবার চেষ্টা করেও ছেলেটা পেরে ওঠে না, পায়ের শেকল তাকে খুব বেকায়দায় রেখে দেয়। তবে মার খাবার ফাঁকে ফাঁকেও সারাক্ষণ তার চোখ একদম স্থির থাকে রিনির ওপরে। কার্ডিগান আর চাদরের নীচে যে তখন কাঁপছিল পুকুরপাড়ের গাছের মগডালে শুকনো তেজপাতাটার মতো। পাছে সেই চোখজোড়া অনুসরণ করে বাচ্চাদা দেখে ফেলে তাকে, ছুটে ফিরে আসতে গিয়ে রিনি হোঁচট খায়, পড়ে যায়, হাঁপায়, আবার উঠে ছোটে। ওই আর্তচিৎকারের সীমানার বাইরে তাকে যেতেই হবে।
 
কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করে না রিণি। খুঁজেপেতে ডেটল লাগায় রক্তাক্ত হাঁটু, ছড়ে যাওয়া কনুইতে। আশ্চর্য সুন্দর ওই ছেলে। অনাথ ছেলে, না নতুনদাদুর কোনও আত্মীয়, বাচ্চাদার জমির শরিক, না কি মরে যাওয়া কোনও প্রজার বেপথু সন্তান! ও কেন অমন, ওর কি কখনও কোনও চিকিৎসা হয়েছে, ও কি কখনও ভাল হবে— এইসব প্রশ্নের হাত থেকে নিজেকেই নিজে মুক্তি দেবে বলে রিনি রাতে নতুনদাদুকে বলে, আমাকে বিয়েবাড়ি রেখে এসো। ওখানে তো বড়কাকু, কাকিমা এসে গেছে।
 
নতুনঠাকুমা অবধি অবাক হয়ে যায়। কী রে, তুই না এই খামারে থাকতে এত ভালবাসিস!
 
লক্ষ্মীদি শুধু গালে হাত দিয়ে রিনিকে জরিপ করে, “ও ধন, চোখ-মুখ এমন কাইলচা কইরা ফ্যালাইলা কেমনে? তুমি কি বাঁশঝাড়ের রংদার পক্ষীটারে দেইখা ফ্যালাইছ? শুনি তারে দ্যাখলে নাকি মানুষ অশান্তিতে বিবাগী হইয়া যায়!”
প্রতিভা সরকার

প্রতিভা সরকার

গল্পকার। ঔপন্যাসিক। অনুবাদক।
কলকাতায় থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=