ময়ূরী মিত্রের গল্প : দেখেছি আঁধারে

ছেলেবেলায় খুব মন লাগতাম ভাইফোঁটার উপোষে | মন লাগাতাম মানে ধরুন বেলা নটা কি দশটা পর্যন্ত পেট শুকতাম | সেসময় এত কম সময়ের ব্যবধানে খাওয়ার আগ্রহ তৈরি হতো যে সামান্য সময় না খেয়ে থাকলেই মনে হত পেট শুকিয়ে মাঠ হয়ে যাচ্ছে | তখন আমার কোনো ভাইরা জন্মাননি | ফলে ফোঁটা দিতাম ঠাকুরদাকে | নটা বাজামাত্তর মনে হতো –এবার ঠাকুরদা বড় দেরি করছেন ফোঁটা নিতে |
উফ কখন খাওয়াবেন আমায় ? কথাটা শুনে খুব অবাক হচ্ছেন নিশ্চয় | ভাইফোঁটায় ভাই খাওয়াচ্ছে বোনকে | এমনটাই ছিল আমার ঠাকুরদার স্টাইল | আমার কাছ থেকে তাঁর ফোঁটা নেয়ার দস্তুর | আসনে বসে সুন্দর এক লাল চেলিতে আমাকে পুরো পাকিয়ে নিয়ে খাওয়াতে বসতেন ঠাকুরদা | খিদেতে লুচি মিষ্টি কোনটা কখন কীভাবে খাবো প্রতিবারই গুলিয়ে ফেলতাম | হাসতে হাসতে লাল দৈ এ গরম লুচি চুবিয়ে জিভের ডগায় ধরতেন ঠাকুরদা | উত্তেজনায় চেলি বেনারসিখানি কতবার যে খুলে ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়েছে ! ইজের আর টেপ ফ্রকেই চালিয়ে যেতাম লুচির লুঠতরাজ | একবার ভাইফোঁটায় এলো না আমার লাল চেলি | প্রবল অভিমানে ঠাকুরদার থেকে সামান্য দূরে বসে আছি | এখানে একটা কথা বলে নি, খুব রাগ হলেও ঠাকুরদা অশোকের থেকে কখনো বেশি দূর যাইনি | জীবনভোর যাইনি | তাঁর মৃত্যুর পরেও না | বলতে পারেন যাওয়ার সাহসই হয় নি আমার | খালি মনে হতো , প্রিয় অশোকের থেকে দূরে গেলেই গাছবিহীন তপ্ত মাঠে হেঁটে মরতে হবে আমায় | —তো যেকথা হচ্ছিল | সেদিন ঐ সামান্য দূরে বসেই দেখলাম, গুটিগুটি ঠিক আমারই মতো করে ঠাকুরদার পাশে এসে বসেছে আমাদের কাজের মাসির দুই মেয়ে | শান্তি আর সুধা | তারাও আজ ঠাকুর্দাকে ভাইফোঁটা দেবে | মানে ঠাকুরদার ভাইফোঁটা খাবে | হিংসেতে চুরচুর হতে হতে দেখছিলাম ঠাকুরদার হাত থেকে ঠিক আমারই মতো করে গোগ্রাসে লুচি দই খেতে শুরু করেছে মেয়ে দুটো | গুম খেয়ে আমি | ফোঁটা শেষে ঠাকুরদা আমাদের তিনজনকে দিলেন তিনটে টেপ ফ্রক | সাদা জামায় তিনটে নীল সুতোর হাঁস | তিনটেতেই একরকম পাখি | ফ্রকের জমিন থেকে একই উচ্চতায় উড়ছে তারা | বুঝলাম আমার লাল চেলির টাকায় কেনা | একটার টাকায় তিনটে | লালজরি বদলে তাই তিন নীল হাঁস | হেসে মরছি | তিনজনেই হাসছি তখন | খিলখিলিয়ে | দৌড়োতে দৌড়োতে সোজা মাঠে | মাঠ দাপায় ঠাকুরদাদার তিনবোন | তিন সখী তো ! Sorry ! অশোক মার্ক্সবাদ পড়েননি | না কোনো স্টাম্পড মর্ক্সিস্ট লিটারেচার | নব্য জাতিতোষণ বা জাতিখেদানোয় ( দুটোই এক তো নাকি ? ) কীভাবে react করতেন তা নিয়ে আমি sure | 100 পার্সেন্ট

নিকষ আঁধারে নয় —ছোটবেলায় ভয় পেতাম শেষ বিকেলে | বিকেল যখন সন্ধ্যের গড়ন নিত ধীরগতিতে | রাত নেমে গেল তো নেমেই গেলো | এবার তাতে ঝুপসি হয়ে থাক বসে | থাকতেই হবে তোমায় | অন্যরকম কিছু ভাবারই উপায় নেই তোমার | কিন্তু এই রে ! এ যে শালা ভূষকালি হয়ে যাচছে এবার গোটা দুনিয়াটা —দুনিয়ার যত গাছপালা ক্ষেতখামার —এই হবে হবে ভাবটাতেই ভয় খেতাম | শুধু ভয় নয় আলো ফুরোনোটা কিছুতে মানতে পারতাম না | দমাদম রাগ হত | রাগ একবারে গা মনের ছাল ছাড়িয়ে নিত | আর ভয় খেয়ে যেতে পারি এরকম মনে হলেই একা ফাঁকা হয়ে যেতাম | যাতে আমার ভয় পাওয়াটা কারোর চোখে না পড়ে | মেজাজি বদখত এবং যখন তখন এক হাত নিয়ে নেয়া মেয়ে হিসেবে গাঁ ঘরে যে সোশ্যাল স্টাটাস ছিল আমার , লোকের চোখে সেটি খোয়াতে রাজি ছিলাম না মোটেই | তাই ভয় পেলেই টপ করে সেটি গিলে ফেলতাম | গেলার ফলে ভয় যে আরো ক বিঘত বাইরে বেরিয়ে আসত তা কে বোঝে ! ফাইভ সিক্সের পরীক্ষা দিয়ে গেছি দেশের বাড়িতে | গাছ পাখিতে ভরা আমাদের সেই বাড়িটার পিছনে ছিল এক প্রকাণ্ড প্রান্তর | আমরা ছোটরা বলতাম দৈত্য -দানো প্রান্তর | দৈত্য মাঠের ওপরে এক রেল লাইন | তখন সে লাইন ঝড়তিপড়তি | গাড়ি চলত না তাতে –পড়েই থাকত কেবল | অবশ হতে হতে লাইন মিশে যাচ্ছিল মাঠের সাথে | আমার ছোট ঠাকুরদা তারাপদ কেবল দেখাতেন দুটোকে আলাদা করে | মাথা ঝাঁকাতাম –কই গেল তোমার রেললাইন ? খালি তুমিই দ্যাখো ছোটদাদু ? আর কেউ দেখি না কেন ? বাড়ন্ত ফসল চোখের আড়ালে নিয়ে যাচ্ছে লাইনটাকে –তবু সেটা তোমার দেখা চাইই ? তারাপদ হা হা হাসেন | বোধহয় বলেন —” যা দেখা যায় কেবল তাই কি ঠিক রে ? ” বিরক্ত হতে গিয়েও ভালোবেসে ফেলি তারাপদকে | রোজ রোজ ভালোবাসি | তারাপদ সন্ধের উদ্ভিদ হয়ে অভয় দেন | সাহসী করেন আমায় | সাহস নিয়ে সে সন্ধেতে বসে আছি বাগানের পিছন সীমানায় | ক্ষেতের পাশে গাছের গুড়িতে মাথা সেট করে | বসেই আছি — হঠাৎ দেখি দূরের লাইন টপকে আসছে এক আবছা মূর্তি | একদম sure আমি –নয় ভুত নয় চোট্টা | determined — ভয় পাব না এবং গায়ের লোম একচুলও খাড়া করব না | মূর্তি কাছে চলে এল | আসামাত্তর মূর্তির চুলের মুঠি ধরে ঘোরাতে লেগেছি | আচমকা মারে বেশি চেঁচাতেও পারেনি বুড়ি | কাতরাচ্ছে কেবল। দুখে রুখু বুড়িমা | না খেয়ে খেয়ে আরো রোগভোগা হয়ে যাবে এমনই পণ তার | খাবার টাবার খোঁজাখুঁজি করতে গিয়েছিল লাইনের ওপারে | এখন তারাপদর কাছে এসেছে খিদে কমাবার ওষুধ নিতে | বলতে ভুলেছি –আমার ছোটঠাকুরদা ছিলেন ডাক্তার | তবে ওষুধের সাথে পথ্য বিনা পয়সায় বিলোনো ছিল তাঁর নেশা | বকুনি খেতেন সবার কাছে তবু বোকা বোকা হাসতেন –ফের বিলোতেন খাদ্য | সে রাতে বুড়িটাকে প্রচুর বকে তারাপদ তাকে চারটে ডিম দিয়েছিলেন | বুড়ি ফাটিয়ে কাঁচা খেতে যাচ্ছিল | গম্ভীর গলায় তাকে সংযত করলেন চিকিৎসক ঠাকুরদা –” খিদে পেটে অত দ্রুত খেও না | আগে আমার ওষুধটুকু খাও –তারপর এস -আমি সেদ্ধ বানিয়ে দিচ্ছি |” তখন চাঁদ উঠে গেছে | আমার দেখা আবছা প্রেত মানুষের মত ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে | হাতের ডিমগুলো দেখছে আর বড্ড কাঁদছে গো | জোছনা লেগে আরো সাদা দেখাচ্ছে ডিমের খোলা | কটকটে সাদা | তারাপদর চোখে শ্বেত স্রোত — ” ওরে যা চোখে দেখা যায় তাই কি কেবল —? “– হে তারাপদ ! আপনি বোধহয় জেনে গেলেন না সেরাতে কত ভালোবেসেছিল আপনাকে ময়ূরাবতী | please –আমায় দিয়ে যান আপনার সেই দুটো চোখ ! যা দিয়ে আপনিই কেবল দেখতে পান দেশের অমোঘ সত্যকে !
লাভলী | লাভলী | আমার স্কুলের ছাত্রী | এই ডাউন সিনড্রোম বাচ্চাটি তার স্বাভাবিক স্বভাব মাধুর্যে অচেনাকে কাছে টানতে পারে মাত্তর পাঁচ মিনিটের মধ্যে | স্বল্প বুদ্ধি –হৃদয় পর্বত | কী বলব আপনাদের —স্রেফ এনতার চুমু মেরে মেরেই এই কাজটি করে ফেলে সে | নিজে ফতুর হয় , ভরপুর করে উল্টোদিকের চুমু ভর্তি গাল নিয়ে বসে থাকা মানুষগুলোকে | কাল লাভলী ক্লাসে খেলছিল আরেকটি বাচ্চার সাথে | ও হ্যাঁ ,এখানে বলে রাখি ক্লাসে লাভলীর খেলে বেড়ানো ,দিদিমনিদের কাপে ফুড়ুক ফুড়ুক চা খাওয়া আজকাল আর কোনো খবর নয় | বরং সে যেদিন সামান্য পরিমানে খাতাবইয়ে মনযোগী হয় ,সেদিন লাভলী খবর হয় সারা স্কুলপাড়ায় | তো কাল তুমুল বাঁদরামোর “মোমেন্ট এন্ড মুডে ” সহপাঠীকে নিয়ে দুম করে মাটিতে পড়ে গেল লাভলী | পড়ে গিয়ে তার ঝাক্কাস চোখদুটো আরো ডাগর হয়ে উঠলো | বুঝলাম , প্রচন্ড লেগেছে লাভলীর | লাভলী ভাই এমনই | যন্ত্রনায় আনন্দে ফেস কাটিং সেম রেখে দেবে একদম | মিষ্টতায় বহর তার এমনই বেশি যে আপনি ধরতেই পারবেন না কোনটায় লাভলী লুব্ধ বেশি ? বা কোনটা লাভলীর কাছে বেশি লোভনীয় ? সুখ না দুখ ? কালও পড়ে গিয়ে নিজে এত ব্যাথা পেলো ! অথচ উঠে পড়ল ঝটপট | যেন আঘাত ভোলার বিরাট তাড়া আছে তার | ড্যাম স্মার্ট ভঙ্গিতে জাস্ট দুবার ছোট্ট হাতদুটো ঝাঁকাল | মনে হলো , সকালের প্রথম রোদ্দুরে ছাদের আলসের পায়রা নাচল | আর তারপরই হেসে জড়িয়ে ধরলো তার সহপাঠীকে ,মানে যাকে নিয়ে সে পড়ে গেছিল | তাকে কত কত আদর করে চলল লাভলী | হাসলো | তার চুল ঘেঁটে দিলো | নিজে নিজে গল্প বানিয়ে ভোলাল তার বন্ধুকে | সবচেয়ে হতবাক হলাম যখন দেখলাম, লাভলীর আদর পেয়ে অন্য বাচ্চাটা কেমন আঁকড়ে ধরেছে তার বন্ধুকে | একটুও কাঁদছে না ,একটুও চেঁচাচ্ছে না সেই অন্য হাইপার একটিভ ছেলেটা | অনেকটা ক্ষন দুজনে দুজনকে জড়িয়ে বসে রইল লাভলী আর লাভলী-সখা | দুজনের কেউই মাকে বা আমাদেরকে ডাকলো না | ভ্রূক্ষেপই করল না | ছাদটা এখন রোদে ভরা | তাতে খেলছে শত পায়রা |
ইদানিং আমার দিনগুলো চলছে , অনেকটা ভাদ্রের বাদলবেলার মত | এই বৃষ্টি তো এই রোদ | এই বিষাদ তো এই হর্ষ | উল্লাস আর উল্লাস | বলতেই পারেন ,ওহে ময়ূরা এ আর নতুন কী ? কী এমন নতুন ঘটল তোমার জীবনে ? সোনা আর লোহার পরতে পরতে মোড়া এ জীবন তো আমাদের সবারই | তা হবে ! হবে তাই | —-তাই আজ দিনটা আচনক কেমন ভালোবাসায় গামাখামাখি হয়ে গেল | সকালটায় অবসাদে ভরে ছিলাম | ভালো লাগছিলো না | মোটেও ভালো লাগছিলো না আমার | অনেকক্ষন ধরে দাঁত মেজে আর একফোঁটা চান না করে গেলাম স্কুলে | মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম ,পড়া না পারলেই সের দরে কিলোবো সবকটাকে | ক্লাসে ঢুকলো অর্পিতা | ডাক্তারি মতে intellectually challenged এবং ডাউন সিনড্রোম | ঢুকে সে নিজের নির্দিষ্ট টুলে বসলো আর আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসলো | বিরক্ত হয়ে মুখ ঘোরালাম | আজই এত হাসতে হবে তোকে ? দেখছিস মনমগজ কিচ্ছু ঠিক নেই আমার ! মনে মনে যখন এসব বকছিলাম ,দেখি দূর থেকে মন দিয়ে আমাকে দেখে যাচ্ছে সে | ফট করে উঠে এসে আমার গালে দুটো চুম্মা দিয়ে ফের নিজের সিটে ফিরল | অন্যদিন দেয় না ,আজ দিলো চুমুগুলো | তারপর ব্যাগ থেকে দুটো বিস্কুটের প্যাকেট খুলে সবাইকে দিতে লাগলো | দিদিমণিদেরও | খিঁচিয়ে বললাম –” জন্মদিন” ? বললে –“-না সবাইকে নিয়ে আজ খাব |” কথাগুলো শুনে অবাক হলাম | ‘সবাইকে দিয়ে ‘ বলার পরিবর্তে কেমন মিষ্টি করে বললে ” সবাইকে নিয়ে ” | ছেলেমানুষ তো | সবাইকে নিয়ে খাবে বলেছে বটে কিন্তু সবাইয়ের মধ্যে ভাগের হিসেব ঠিক করতে পারেনি বেচারা | নিজের জন্য কেবল একটি কমলা ক্রিম বিস্কুট রেখে সব বিলিয়ে দিলো সাথীদের | এই রে ! বেলা বারোটায় ঢুকলো দুটো লেট লতিফ ছাত্র | রাবণের হাসি হেসে বললাম –” এবার কী করবি রে অর্পি ?” নিমেষে নিজের বিস্কুটটা ডেস্কে ফেলে স্কেল মেরে দুই টুকরো করে ফেলল সে | দিয়ে দিলো তার শেষ দুই সাথীকে | ছোট আঙুলের ফাঁকে লেগে থাকা কমলা ক্রীমটুকু মাত্র নিজের জন্য রাখলো সে | সব দিয়ে দিলো রে আমার মেয়েটা | দিয়ে আরো জোর জোর হাসতে লাগল | হাসতেই লাগলো | মেয়েটা যে আমার দুপুরটাকে চিটেগুড় বানিয়ে ছাড়লো রে |পাল্লা দিয়ে চুমু খাই তোকে !
এক মানুষ দুখ দেয় | অন্য মানুষ জল মোছে | দৃঢ় হাতে ঘষে ঘষে তুলে ফেলে জলছবি | উজ্বল হয় নতুন হর্ষ | কাল রাতভোর বিচ্ছিরি কান্নার কিরিকিরি চলছিল আমার | কান্নার কিরিকিরি –এ শব্দ আমার | কান্না থেকে বেরোতে না পারলেই এই সব পিকুইলিয়ার শব্দ বুনি আমি | নিজের শব্দে নিজেকে গাল পাড়ি | তো আজ সকাল অব্দি চলল সে গ্লানি | বেশ খানিকটা বেলা গেলে প্রিয় মানুষের নতুন সম্বোধন এল | সাজলাম | গহনায় নয় | আনন্দে | সাজতে সাজতে মনে হল —-” ওহ ! দুদিন বাদে সরস্বতী পুজো | আজই তো স্কুলের পুজোর বাজার সারতে হবে | বাচ্চাদের বেখাপ্পা পছন্দের মিষ্টান্ন –কদমা , রঙিন মঠ , তিলের নাড়ু বেশি বেশি করে কিনতে হবে | শসা , আপেল ইত্যাদি ফালতু ( শিশুর মতামতে ) পুষ্টিকর ফল কম | আর একটি মায়াময় দেবীমূর্তি — যে কিনা তার নরম দুটো নয়নে চেয়ে থাকে শিশুর পাঠবইয়ে | কতকাল ধরে যে সে চেয়ে আছে শিক্ষরত মানুষের পানে ! হাঁটছি বাজারে | হঠাৎ —–| অদূরে অপূর্ব এক মূর্তি | মহানাস্তিকও যাকে পুতুল না ভেবে দেবী ভেবে সুখ পায় | ঠোঁট দুটো কী আদুরে কী আদুরে ! সবুজ আর হলদে আভায় কী সপ্রতিভ দেবীর মুখ ! দর শুরু হল | সাতশো টাকা | সঠিক দামই বলেছেন দোকানি | আর সঠিক বলছেন বলেই দাম কমাবার ব্যাপারে একেবারেই রাজি হলেন না | বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও না | শেষে |একবার কেবল বললাম —” ভাই এটা একটা প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের স্কুল | আমাদের অত টাকার বাজেট নয় |” —” অন্য ঠাকুর নিন ” | বললাম —” এই ঠাকুরটার দুরকম রঙের মিশেল ওরা খুব ভালোবাসবে | জানেন ভাই , এ সব বাচ্চা রঙের রকমারি খুব ভালোবাসে |” ঘন ঘন মাথা নাড়া চলছে দোকানির | রাফ টাফ কথাও বলে চলেছেন | যতদুর মনে হয় –শেষ কথাগুলো নিজের মনেই বলতে বলতে চলে যাচ্ছিলাম | চলে যাচ্ছিলাম দেবীকে ছেড়ে | বিক্রেতাকেও ছেড়ে অনেকটা দূরে যখন —দেখি মাথা নাড়া বন্ধ করে স্থির চোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন | দৌড়ে এসে আমার হাতটা চেপে ধরলেন |—-” দিদি আমার বাচ্চাটাও তো এরকম হতে পারত ! আপনি ওই দামেই নিয়ে যান | এই মুর্তিটাই নিয়ে যান | দাঁড়ান –সাজগুলো পরিয়ে দি ! ” দেখলাম — নারাজ দোকানি উত্তেজনায় থরথর | কমকরে শ চারেক লোকসান দিয়ে কাঁপা হাতে আরো আরো রঙের গয়না পরিয়ে দিচ্ছেন | বাচ্চারা রঙ ভালোবাসে কিনা | ঠাকুর নিয়ে রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে ফল কিনছি | –কে যেন দেখছে আমায় ! চোখ তুলে দেখি —ওপারে দোকানি | পথের অগুনতি মানুষের ফাঁক দিয়ে দুই চোখ তাঁর হাসছে | রাফটাফ চোখে এখন খুব প্রীতি ! খুব | আমার দেবতা হাসে | ভক্ত দেখে | হাঁ হয়ে দেখে | ময়ূরা এতো ক্যালাস তুই ? একটা নমস্কার করে আসবি তো | — বাক্সে তোল আজকের পাঠ | ভাগ যা ইঁদুরের পাল | 
মলটোভা গোলা হালকা গরম দুধের মতো সামান্য হলকা | সাথে ত্যাদোড় হাওয়া | বড় মিঠাই বাতাস | ছোটবেলায় এমন হাওয়া উঠলে বলতাম –” মা কী হাবা গো ! ” 
টাকিতে থিয়েটার ক্যাম্প ও ওয়ার্কশপে এসেছি | থিয়েটারে নির্জনতা কল্পনা তৈরিতে সাহায্য করে — এমন এক বিশ্বাস নিয়ে এসেছি আমি ও নোটো থিয়েটারের সব কর্মীরা |দুপুরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি এপার নদীতে | ইছামতীর ওপারে বাংলাদেশের ঝালমিঠে জঙ্গল। | এপারে ভেসে আসছে ওপরের সুফিগান | কীর্তনের সামান্য প্রভাব ছিল তাতে | মায়া জাগছিল শুনতে শুনতে | অমরদাকে বললাম — ” এপারে সুর পৌঁছয় | তবু দেশটায় যেতে পারব না ?” অমর চট্টপাধ্যায়ের কাঠখোট্টা উত্তর —” বেড়াতে যাবে | তারপর ফিরে আসবে |” নোটো থিয়েটারের যুগমনির্দেশক অমর মাঝে মাঝে এমন বিরক্তিকর সত্য বলেন | গান ছেড়ে পিছু ফিরলাম | ভারতের দিকে | বিকেলে দিপানজন জিজ্ঞেস করলে মাঝিকে –নদীর মাঝ অব্দি গিয়ে কেন নৌকা ফেরাচ্ছেন ভারতের দিকে ? আরেকটু চলুন please |” ——– ” আর তো যাওয়া যাবে না দাদা | হাফ জল ওদের |” অবাক আমাদের সবচেয়ে যুক্তিবাদী কর্মী — ” মাটি ভাগ জানি জলভুমিও ভাগ ? আমরা তো ওদের বন্ধু দেশ —তাও আরেকটু এগোনো যাবে না ? নিশ্চয় আরেকটু এগোনো যাবে — ! ” স্বপন দেখা যুবকটিকে তখন কে বোঝায় –” ওরে দিপাজন মাঝি ভাগ | হাল ভাগ | দাঁড় ভাগ | সব পাউরুটির স্লাইস | —–? ” ফেরার পথটা টাকির হোটেলগুলোর দিকে মুখ করে বসে রইল দিপানজন | হোটেল নৌকার দূরত্ব কমে নিঃশেষ হল | তাও ঐভাবেই রইল | ওই সেই ভারতের উৎকট রঙিন হোটেলগুলোর দিকে তাকিয়ে | অভিমান না হতাশা তা বুঝিনি | নাকি দুইয়ে মিলে তিননম্বর কোনো অনুভূতি ? সন্ধেরাতের আকাশতল | ছাদে নোটোর ক্যাম্প চলছে | একটা গোটা চাঁদ । ওমা কী হাবা কী হাবা ! পূর্ণ শ্বাস নেয়া শেখাতে লাগলেন অমর চট্টপাধ্যায় | প্রশ্বাস পরিপূর্ণ | সত্য স্বদেশ | ছাদে দাঁড়িয়ে নদীর ধারের দেশের মানুষগুলোকে পুতুল পুতুল লাগছিল | মনে হল — নদীর ধারে শ্যামল ঘাসে পুতুল ফেঁদেছে কোনো আরেক থিয়েটার | লোভ বললে : একটা ছবি নে মনে|
লেখক পরিচিত
ডঃ ময়ূরী মিত্র
শিশুশিক্ষিকা ,নাট্যনির্দেশক , অভিনেত্রী এবং প্রাবন্ধিক| নাট্য গবেষক। কোলকাতায় থাকেন।
অধ্যাপক পবিত্র সরকারের তত্বাবধানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 2009 এ Phd ডিগ্রি লাভ | গবেষণার বিষয় —” ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালি মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক উত্তরণ ও নাটকে রাজনীতি ” –সিপাহী বিদ্রোহ থেকে স্বদেশী আন্দোলন।

14 thoughts on “ময়ূরী মিত্রের গল্প : দেখেছি আঁধারে

  • April 2, 2020 at 3:01 pm
    Permalink

    চমৎকার লিখেছেন।

    Reply
  • April 2, 2020 at 3:05 pm
    Permalink

    চমৎকার লেখা। ওর লেখায় গুণ আছে।

    Reply
  • April 3, 2020 at 4:23 am
    Permalink

    টুকরো টুকরো ছবি, শব্দ দিয়ে গড়া!
    কখন যে সেটা একটা পূর্ণাঙ্গ চালচিত্র হয়ে গেল!
    একটা মন কেমন করা গন্ধ চারদিকে, অনেকটা নেশা ধরিয়ে দেবার মতন!

    Reply
  • April 3, 2020 at 1:00 pm
    Permalink

    নিকষ আঁধার,হতাশা,অভিমান, ভালোবাসা,যন্ত্রণা সবকিছুকেই অবলীলায় গেঁথে রাখে তার লিখন শৈলীতে। ফুটিয়ে তোলে জীবনের নানা আঙ্গিক, মনের দ্বৈত স্বত্ত্বা। পড়ার পর ভাবতে শেখায় ।

    Reply
  • April 3, 2020 at 4:46 pm
    Permalink

    ভালো হচ্ছে প্রত্যেকটা। তবে আমার মনে হয় তুই বলতে বলতে হাঁসফাঁস করে দৌড়চ্ছিস। মাজে মাঝে প্যারাগ্রাফ করিস, যদি সম্ভব। আমরা বুড়োরা তোর সঙ্গে দৌড়িয়ে পারি না। কিন্তু এত তোর শৈলী, ফলে আমার এভাবে বলা উচিত নয়। তোর লেখা হবে, হচ্ছে। থামিস না।

    Reply
  • April 3, 2020 at 4:55 pm
    Permalink

    সহজ ভাবে সহজ কথা সবাই বলতে পারে না। আর জীবনটাকেও সহজ সরল স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। জীবনের ছোটখাটো অভিজ্ঞতার স্বাদ পূর্ণভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারলে জীবনের সার সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারা যায়। তোমার লেখা পাঠে যেন বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন হল। পড়তে পড়তে মুগ্ধ হয়েছি আর তোমার প্রতি শ্রদ্ধা ততই বেড়ে চলেছে। অনবদ্য

    Reply
  • April 3, 2020 at 4:57 pm
    Permalink

    এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    Reply
  • April 4, 2020 at 8:51 am
    Permalink

    The plethora of different stories makes a kaleidoscope that touches different strings of our heart .through multitude of activities Dr. Mayuri has come into contact with different people from different stratas of society and experienced broadness of their minds and that enriched her and made her a woman of substance .All of the depicted characters are of different ages but they are connected in a string of pearls through their fabulous and unique nature.The depiction in these stories of the experiences has reallly touched my heart and kudos to Mayuri for such wonderful articulation .

    Reply
  • April 4, 2020 at 11:58 am
    Permalink

    খুবই সুন্দর

    Reply
  • April 4, 2020 at 12:11 pm
    Permalink

    গল্পগুলি পড়ে একটা সুন্দর অনুভুতি হলো। রেশ রয়ে গাছে।তোমার সঙ্গে সেই বেথুন কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের পরে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ভালো থেকো । আরও লেখো।

    Reply
  • April 4, 2020 at 2:13 pm
    Permalink

    হাঁসের নীল সুতোটা খুব শক্ত।পাক দিয়ে বেঁধেছে।টেনে নিয়ে আসতে আসতে বলেছে…. দ‍্যাখ হৃদয় দিয়ে।সেই অনুভবে দেখতে দেখতে নিজের ভেতর পেয়ে গেছো সেই "অশোক-নিলয়"বরাবরের জন্যে।কঠিন দাবদাহে ঠান্ডা হাওয়ার মত।।

    Reply
  • April 4, 2020 at 3:43 pm
    Permalink

    তোমায় দিলাম একজোড়া নীল আকাশ। একজোড়া কেন? একটা পৃথিবী মাটির ওপর, আমাদের কান্না হাসি মায়ায় তৈরি, আরেকটা থাকে জলের গহীনে, মনের অন্তরে। একলা হাওয়ায় টুপ করে ভেসে ওঠে আবার ডুব দেয়। এই দুটোই তোমায় দিলাম। যখন যেমন ইচ্ছে সেই নীলে মন ডুবিয়ে লিখে ফেলো পাতার পর পাতা। সেই পাতায় আমার শৈশব থাকবে, গাল ফোলানো আবদার থাকবে,বুড়ো ঠাকুরদা থাকবে ,ফেলে আসা কৈশোরের দুপুর থাকবে, যৌবন থাকবে একটু আধটু। আমি শুধু এ ঘর ও ঘর, ইচ্ছে হলেই টোকা দেবো তোমার দরোজায়। ভালো থেকো দিদি, এমন করেই অনেক লেখা লিখে যাও। তোমার কর্ম শক্তি যেন অক্ষয় হয়।

    Reply
  • April 5, 2020 at 10:39 pm
    Permalink

    Boddo bhalo laga..boddo akul kora
    Tor lekhay sudhu benche thakai boddo sundhor…
    Likhe ja Mayuri

    Reply
  • May 12, 2020 at 5:41 pm
    Permalink

    দিদি খুব সুন্দর লেখা গুলো।।পড়ে ভালো লাগলো।।শেষ অবধি না পড়ে থাকতে পারলাম না।।আরো নতুন গল্প পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *