বিমল কর : লেখাই জীবন লেখাই জীবিকা

কেন লিখি—প্রশ্নটা সহজ। জবাব দেওয়াটা কিন্তু কঠিন। অন্তত আমার পক্ষে। একজন শিল্পী কেন ছবি আঁকেন, গায়ক কেন গান করেন—এমন কথা জানতে চাইলে তারা কতটা সঠিক উত্তর দিতে পারবেন জানি না। রসতত্ত্ব মান্য করলে বলতে হবে, সব রকম শিল্পে সৃষ্টির মানে রয়েছে, আনন্দ। আত্মতৃপ্তি। কথাটা অস্বীকার করা মুশকিল।
সামান্য লেখক হিসেবে আমিও মনে করি, ভালো লাগে বলেই লিখি । ভালোবাসি লিখতে তাই লিখি ; আনন্দ যে পাই তাও তো সত্যি। সরাসরি উত্তরটা এই রকমই হতে পারে। তবে যেহেতু আমি দীর্ঘকাল লেখালিখির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছি তাই অন্য কিছু কথাও বলতে হয়। 
কম বয়েসে যখন প্রথম লেখা নিয়ে মেতে উঠতে শুরু করেছি—তখন অতশত বুঝতাম না, অপরিণত বোধবুদ্ধির দরুণ মনে হত, দু চারটে লেখা যদি ছাপা হয় আমি কৃতার্থ হয়ে যাব। হয়ত পরিচিত হব লেখক হিসেবে, বাহবাও জুটতে পারে। অল্প বয়েসের সেই চঞ্চলতা, আবেগ, বাসনা স্বাভাবিক বলেই আমার মনে হয়। 
বয়েস যত বেড়েছে, লেখার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছি ততই মনে হয়েছে, আমি কেন লিখব? কী প্রয়োজন আমার লেখার? আর যথার্থভাবে আমি কী লিখতে পারি? অথবা চেষ্টা করতে পারি লেখার? 
চেহারার দিক থেকে সব মানুষই এক। হাত পা চোখ নাক—আলাদা কোথায়? এখানে কোনো তফাত নেই। কিন্তু মন? সে তো এক নয়। আমাদের পাঁচজনের মাথার ধাঁচ এক হলেও মন আলাদা, স্বতন্ত্র। আর মন আলাদা বলেই অনেক কিছুই ভিন্ন হয়ে যায়। 
বলতে আপত্তি নেই, আমি যে একজন আলাদা মানুষ, আমার জীবনের শুরু, বেড়ে ওঠা, পারিবারিক পৃষ্ঠপট বা ব্যাকগ্রাউণ্ড, শিক্ষা দীক্ষা, অভিজ্ঞতা, রুচি আমাকে শুধু স্বতন্ত্র করেনি, আমার মধ্যে নিজস্ব এক জগৎ সৃষ্টি করেছে, তৈরি করেছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। যদি লিখতে হয় তবে আমাকে আমার নিজের দিকেই তাকাতে হবে। 
লেখার বেলায় দশে মিলি করি কাজ হয় না। সৃষ্টির কাজটা ব্যক্তিগত। সংসারে আমরা দশজনে থাকি, কিন্তু সবাই কি লিখি না ছবি আঁকি? কেউ কেউ লেখেন, ছবি আঁকেন–কেন না তার নিজের কিছু বলার থাকে, তাগিদ থাকে অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার। এই আকুলতা ও মনোবাসনা থেকেই লেখা বা ছবি আঁকা। 
আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, এই জগৎ এবং জীবন সম্পর্কে যার যেমন ধারণা জন্মেছে সেটা প্রকাশ করার চেষ্টাতেই লেখক কলম ধরেন। তার এই ধারণার কোথায় কতটুকু সত্য কোথায় ভুল–সে-বিবেচনা অন্যে করতে পারেন, লেখকের তাতে হাত নেই। 
এখানে একটা কথা সবিনয়ে বলি। লেখার সময় অনেক ক্ষেত্রে আমি অতীতচারী হয়ে। পড়ি। এর একটা কারণ রয়েছে। আসলে, অতীতের প্রতি আমার এই টান অহেতুক নয়, আমার কাছে অর্থহীনও নয়। শুধুমাত্র কাল ও সময় নয়, যে সমাজ মানুষজন—তাঁদের বোধবিচার, ধ্যান-ধারণা, ভালোমন্দ আমি দেখেছি—সেই মানুষগুলিকে আর বড়ো দেখতে পাই না।বোধ হয় ‘লস্ট জেনারেশন’ বলতে যা বোঝায় এরা তাই। এদের জন্যে আমার একটা আক্ষেপ রয়েছে। কেমন করে তা মন থেকে মুছে ফেলব! অথচ এটা তো ঠিকই যে অতীত সূর্যাস্ত নয় যে আজ যা অস্ত গিয়েছে কাল সকালে আবার তার উদয় হবে। অতীত আর ফিরে আসে না। বর্তমানের মধ্যেই আমি বেঁচে আছি, কাজেই তাকে অবহেলা করার কথাই ওঠে না। লেখার মধ্যে ওটা তো থাকবেই। 
লেখক হিসেবে যখন দায়িত্বের কথা ওঠে তখন মুশকিল হয়। এক এক মুনির এক একরকম মত এখানে। তা নিয়ে তর্কেরও শেষ নেই। তর্কের মধ্যে আমি যাব না। আমার কাছে লেখকের দায়িত্ব বলতে তার সততা ও নিষ্ঠা। নিজের প্রতীতি ও উপলব্ধিকে যথাসম্ভব প্রকাশ করা। 
বাঙালি লেখকদের, বিশেষ করে যাঁরা গল্প উপন্যাস রচনা করেন তাদের কিছু অসুবিধেও। রয়েছে। লেখা যখন পেশা হয়ে দাঁড়ায়, অথবা বৃত্তি–তখন আমাদের লিখতেও হয় বেশি। অধিকাংশকেই। স্বীকার করি, এটা ভালো নয়। কিন্তু উপায় কী! তবে, বৃত্তি হিসেবে গ্রহণ করলেও যে লেখকের জাত চলে যাবে তা আমি মনে করি না। গ্রাহাম গ্রীনের মতন লেখকও স্বীকার করেছেন, লেখাটা তার জীবন ও জীবিকা। আমি আর নতুন করে কী বলতে পারি!

3 thoughts on “বিমল কর : লেখাই জীবন লেখাই জীবিকা

  • March 14, 2019 at 10:11 am
    Permalink

    ভালো লাগলো লেখাটি পড়ে…

    Reply
    • November 2, 2021 at 10:02 am
      Permalink

      লাগতেই হবে শাহেদ, বন্ধু, এ এক অসামান্য লেখকের বয়ান।

      Reply
  • March 27, 2019 at 11:58 am
    Permalink

    কেন লিখি শিরোনামে যে লেখাগুলো আছে তা সংকলন করে বই আকারে প্রকাশ করলে মনে হয় ভাল একটা কাজ হবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *