অনিন্দিতা গোস্বামী’র গল্প : মোচ্ছব

অজয়ের দুহাত ধরে টানতে টানতে বারান্দায় নিয়ে এসে লতা বলল–দ্যাখো কী সুন্দর। অজয় তখন সবে অফিস থেকে ফিরেছে, পোশাকও বদলায়নি। উর্দি পরে বসে বসেই একটু টিভি দেখছিল।
হাবিলদার থেকে সদ্য এস.আই-এ পদোন্নতি পাওয়া অজয়ের অফিস থেকে ফিরে সঙ্গে সঙ্গেই পোশাক বদলাতে ইচ্ছে করে না আজকাল। খাঁকি রঙের ফুলপ্যান্ট, খাঁকি শার্ট, কাঁধের ওপর জুলজুল করছে রুপোলী তারা। লতার সামনে এ পোশাক পরে কেমন একটা আত্মশ্লাঘা অনুভব করে সে। লতার টানাটানিতে অজয় বারান্দায় এসে দেখলো চারিদিকে চকচকে রোদ, অথচ ফুই ফুই করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। লতা বলল– ইল্‌শেগুড়ি’। অজয়ের হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে উঠোনে নামিয়ে এনে বলল– এই বৃষ্টিতে ভিজতে না দারুণ মজা। অজয় আঙুলের টোকাতে জামা থেকে জল ঝাড়তে ঝাড়তে বলল–বৃষ্টির জল জামায় লাগলে তিলে পড়ে যায়, দিলে তো আমার উর্দিটা নষ্ট করে। লতার অলকদামে তখন চূর্ণ চূর্ণ হিরের কণা, আঁখি পল্লবে ঘোর, বলল– ‘সাধে কি আর লোকে বলে বুড়ো বর মানে জীবনই বৃথা’। অজয় লতার গাল টিপে দিয়ে বলল–‘হুঁ তাই বুঝি, আজ রাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে আমি কতটা বুড়ো।’

গ্যাস জ্বেলে চা বসাল লতা, বলল–পাঁপড় ভাজছি, খাবে তো? অজয় বলল ‘আজ মনে হচ্ছে মহারানির মুড খুব ভালো’। লতা জলে দু-চামচ চিনি আর এক চামচ চা দিয়ে সস্‌প্যানের মুখে ঢাকা চাপিয়ে বলল, আচ্ছা এই বৃষ্টির নাম ইলশেগুড়ি কেন গো, ইলিশ মাছ খুব ভালো পাওয়া যায় বুঝি এখন?
কী জানি, হবে হয়তো, তোমার খেতে ইচ্ছে হয়েছে তো বল কাল নিয়ে আসব।
আঁচলে সস্‌প্যানের হাতল চেপে ধরে চা ছাঁকতে ছাঁকতে লতা বলল– খুব দাম না?
দাম তো কী? তোমার বর এখন সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ, বাজারে গিয়ে একটা মাছ চাইলে লোকে পাঁচটা মাচ দেবে। 
উর্দি ছেড়ে অজয় লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরেছে এখন। দুবার উর্দিটা খুব জোরে জোরে ঝাড়া দিয়েও শান্তি হয়নি তার। ইস্ত্রি গরম করে চালাতে চালাতে বলল–তোমার ওই ইলিশেগুড়ি, না কি বৃষ্টি দিলো আমার ড্রেসটাকে শেষ করে। এবার অত্যন্ত রেগে গিয়ে লতা বল্ল–ঘাট হয়েছে আমার তোমাকে বৃষ্টি দেখানো। এবার উর্দি নিয়ে তোমার আদিখ্যেতা বন্ধ করো। 
অজয় খুব গভীর হয়ে বলল–যে পোশাক তোমার অন্ন জোগাচ্ছে তাকে অবহেলা করো না লতা। 
পরদিন সকালে অজয় বাজার থেকে একটা মস্ত বড় দেড় কেজির ইলিশ এনে ফেলল লতার সামনে। 
বলল–কী খুশি তো? 
লতা লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল–এ বাবা এত বড় মাছ, কারো গাঁট কাটোনি তো? 
অজয় বললো–এই মাছ দেখেই চমকাচ্ছ, সে যদি বল আমি দেখেছি ইলিশ। মাঠ ভর্তি ইলিশ। সে কী আশ্চর্য সকাল, তুমি হলে বলতে ইলিশ ভাঙা রোদ। 
ভ্রূযুগল ধনুকের মতো বাঁকিয়ে লতা বলল–সে কী রকম? 
অজয় বলল–সে এক গল্প। 
লতা বলল–রক্ষে করো। তোমার গল্প মানে তো চুরি, রাহাজানি, খুন, জখম। ও আমার শুনতে মোটেই ভালো লাগে না।
দু’বছর হয়ে গেল ওদের বিয়ে হয়েছে, এখনও কোনও সন্তান আসেনি ওদের। ডাক্তার বলেছেন কোনও অসুবিধা নেই। কারও কারও একটু দেরি হয়। এখনও চিন্তা করার সময় হয়নি। লতার কেমন ভয় হয়। মনে হয় কোনও নিরপরাধীকে কোনওদিন বা অজয় অপরাধী বানিয়ে আসবে। সেই পাপ এসে লাগবে ওদের সংসারে। 
অজয় বলল–এ আর ছুটকো ছাটকা চুরি নয়। একেবারে ট্রেন ডাকাতি। আর এ আমার চাকরি জীবনের ঘটনাও নয়, বাল্যকালের ঘটনা। 
মাছ কাটতে পারে না লতা, অজয়ই বসেছে মাছ কাটতে। বলল– কী মোটা তেল দেখ! খুব ভালো দিয়েছে মাছটা। 
লতা বল্ল–হ্যাঁ তাতো দিয়েছে, কিন্তু কি যেন একটা গাঁজাখুরি গল্প বলছিলে–মাঠভর্তি মাছ, কই, বললে নাতো গল্পটা। 
মাছ ধুয়ে মাছে নুন-হলুদ মাখিয়ে, অজয় বলল নাও মহারানি, এত ভালো মাছ, বেগুন কেটে শুধু কাঁচালঙ্কা আর কালো জিরে ফোঁড়ন দিয়ে পাতলা ঝোল করো। তবে মাছ দেখেছিলাম সেদিন, জীবনের স্বাদ পূর্ণ হয়ে গেছিল। 
লতা বলল–সেই থেকে ভনিতাই তো করে যাচ্ছ। গল্প তো আর তোমার শুরু হল না। অজয় টুল নিয়ে এসে রান্নাঘরের দরজার সামনে বসল, বলল–গল্প কি আর শুধু বলা যায় একটু চা না পেলে। চা চাপালো লতা। বলল–এত ভালো মাছ তবু কেমন যেন আঁশটে গন্ধ লাগছে কেন বলত? 
অজয় বলল–বা রে, ইলিশ মাছে আঁশটে গন্ধ উঠবে না তো কি পোনা মাছে উঠবে? 
একটা মাছভাজা প্লেটে করে অজয়ের সামনে ধরে লতা বলল–নাও চাও দিলাম, টাও দিলাম। এবার শুরু করো। 
অজয় মাছে একটা কামড় বসিয়ে বলতে শুরু করল। 
সে প্রায় ত্রিশ বছর আগেকার কথা। মাত্র কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ থেকে অজয়রা এসেছে ভারতে। অনেক ধরাধরি করে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তরের কল্যাণে এক টুকরো জমি মিলেছে বারোহাত কলোনির পূর্ব সীমানায়। তিন ভাই নিয়ে মা-বাবার সংসার তখন চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। চোখের জল ছিল নিত্যসঙ্গী। অর্ধহার, অনাহারে থাকা এমনই স্বাভাবিক ছিল যে তাই নিয়ে আর অভিযোগ ছিল না কারোর। তবু যে তারা লড়াই করার শক্তি হারিয়ে ফেলেনি তার কারণ ছিল চারপাশের বস্তিবাড়িগুলোর সংগ্রাম। 
তবে মা ভয় পেত খুব। যখন দেখত বাড়ির পিছনে বসে কেউ কেউ বারুদ, নারকোল দড়ি আর সব নানারকম জিনিস দিয়ে বোমা বানাচ্ছে কিংবা রাতের অন্ধকারে মোটা লোহার শিকল হাতে জড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে কোনও অজানা ঠিকানায়। তিন ভাইকে বুকে চেপে ধরে মা খুব জোরে জোরে আদর্শের কথা শোনাত। বলত–চুরি করা মহাপাপ। কারোর ওপরে হিংসা করো না বাবা। কারো বেশি আছে। ওরা ওদের ভাগ্যে পেয়েছে, কারোর নেই তাও তাদের ভাগ্যে। অন্যায় দেখলে পুলিশ ডাকবে, নিজে কখনও দাঙ্গাহাঙ্গামায় জড়াবে না। 
তাও কি শেষ রক্ষা হল? অজয়ের দাদা বিজয় জড়িয়ে গেল ওই সঙ্গেই। বোমা তৈরিতে সে হয়ে উঠল পাক্কা ওস্তাদ। স্কুল পালিয়ে সারা দুপুর বিড়ি ফুঁকে কাটিয়ে দিত গাছের তলায় বসে। কখনও মদের গন্ধও নাকে ঠেকত মায়ের। অবরুদ্ধ কান্নার বেগ আঁচলে চেপে ভাত বেড়ে দিত মা। বিজয় অতি উৎসাহে বিজয়ী বীরের মতো গল্প করত ভাইদের–শালা, আজ একটা আদলা ইট ছুঁড়ে দিয়েছি একটা ট্যাক্সির কাচ ফাটিয়ে। মিঞাবিবি গিয়েছিল হলে। এই ফাঁকে বুঝলি। উঃ গাড়ি চড়বেন! আমরা না খেতে পেয়ে মরছি, ওনারা ফুর্তি মারাচ্ছেন। অজয় মাকে অনুসরণ করে বলত–‘ওরা নিজের পরিশ্রমে করেছে দাদা, ওদের ওপর হিংসা করো কেন? বরং তুমিও চেষ্টা করো না ওদের মতো হতে।’ 
বিজয় রেগে যেত। বলত– ‘চুপ কর, মার মতো কথা বলিস না, বাবা কি পরিশ্রম করে না? আমরা ভিটেমাটি ছেড়ে এসেছি, ওরা কেউ আমাদের কিছু দেবে না, সব কেড়ে নিতে হবে।’ 
ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি, টানা বৃষ্টি নেমেছে দশ বারো দিন ধরে। থামার আর নামই নেই। সূর্যের মুখ যে শেষ কবে কে দেখেছে, তা আর মনে করতে পারছে না কেউ। রেডিওতে খবর পড়ছে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অমুক বাঁধের অবস্থা ভালো না, তমুক নদীর জল বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। উৎকণ্ঠায় ঘুম আসছে না কারোর। প্লাবিত হচ্ছে একের পর এক গ্রাম। খবর এসেছে জল ঢুকে পড়েছে পিকনিক গার্ডেন পর্যন্ত। তবু মানুষ ঘর ছাড়ছে না। আশা, যদি আর জল না বাড়ে, যদি বন্ধ হয় বৃষ্টি। পোঁটলায় যেটুকু বাঁধাছাঁদা করা সম্ভব বাঁধাছাঁদা করে চুপ করে বসে আছে সবাই বিপদ সঙ্কেতের অপেক্ষায়। 
শেষ পর্যন্ত ঢুকেই পড়ল জল কলোনির রাস্তায়। দেখতে দেখতে উঠোনের জল পায়ের পাতা ছেড়ে হাঁটু, হাঁটু ছেড়ে কোমর–দৌড়, দৌড়। পাড়ার মাতব্বররা জোগাড়যন্ত্র কিছু করেই রেখেছিল। রেললাইনের উঁচু ধার ঘেঁষে রেলগেট থেকে সাহেব বাগান পর্যন্ত খটাখট খটাখট পড়ে গেল তাঁবু। চারিদিকে শুধু জল আর জল। সাদা হয়ে আছে মাঠঘাট। কলার ভেলায় চেপে সারতে যেতে হচ্ছে প্রাতঃকৃত্য, জলের ঘূর্ণিতে ভেসে বেড়াচ্ছে শহরের বর্জ্যপদার্থ। 
ত্রাণ আর আসে না। দু-একদিন হেলিকপ্টার থেকে দু-চারটে চিঁড়ে মুড়ির প্যাকেট এসে পড়ছে লাইনের ওপরে, কিন্তু তা নিয়ে শত লোকের এমনই কাড়াকাড়ি যে তার অর্ধেকই ফেটে গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। ঘরের ভাঁড়ারও শূন্য হয়েছে সবার। আশেপাশের টিউবওয়েলগুলো পর্যন্ত গেছে ডুবে। খিদে তেষ্টায় দিশাহারা অবস্থা তখন মানুষের। গত রাত থেকে পিত্তি বমি করছে অজয়। বাবার কাপড়ের দোকানের সামনে একহাঁটু জল। দোকান বন্ধ করে এক সপ্তাহ হল মালিক চলে গেছে শ্বশুরবাড়ি। গত মাসের মাইনে পর্যন্ত দিয়ে যায়নি হাতে। 
বস্তিতে বেশিরভাগই জনমজুর, মাঠেঘাটে জল উঠে যাওয়ায় কাজ নেই কারোর। বস্তিতে দুই মস্তান কালু আর বঙ্কা। বঙ্কা সবাইকে ডেকে বলেছে, দুধের শিশুগুলো চিল্লাচ্ছে আর চুপ করে থাকা যায় না। কাল সকালের মধ্যে আমি সবার নুন-ভাতের ব্যবস্থা করব। রাতের অন্ধকারে লোহার শিকল শূন্যে ঘোরাতে ঘোরাতে বেরিয়ে গেল কালু আর তার সাঙ্গোপাঙ্গ। বিজয়ও গেল ওদের সঙ্গে। 
বঙ্কার মান যায় না। কালু যদি সবার পাতে নুন-ভাত তুলে দেয়, বঙ্কা তবে কী করবে? বসে বসে আঙুল চুষবে? ঘট্‌ ঘটাং ঘট্‌ ভোররাতে পার হয় মালগাড়ি। বারোহাত কলোনির বঙ্কা মেশিন বার করে ধরল কেবিনম্যানের মাথায়। কী যায়? থরথর করে কাঁপছে কেবিনম্যান। বলল–আমি জানি না, গার্ডসাহেব জানেন। বঙ্কা বলল–দাঁড় করা, শিগগির দাঁড় করা গাড়ি। লাল পতাকা উড়িয়ে কেবিনম্যান দাঁড় করাল গাড়ি। জানা গেল ভেন্ডার বোঝাই পদ্মার ইলিশে। 
উফ! খুশিতে লাফ দিয়ে উঠল বঙ্কা। এমনও হয়! মাছভাতের স্বপ্নে চক্‌চক্‌ করে উঠল তার সাঙ্গোপাঙ্গদের চোখ। রেলগেট থেকে সাহেববাগান ক্ষুধার্ত মুখে লকলক করে উঠল অনাস্বাদিত ঝোল। উত্তেজনায় ভোর হবার আগেই আঁচ পড়ে গেল তাঁবুতে তাঁবুতে। গরমভাত আর ইলিশ মাছের ঝোল পরিপাটি ভুলে যাওয়া সুখস্বপ্নের মতো আবিষ্ট করল বাতাস। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল ক্ষুধা। পিঠে চালের বস্তা নিয়ে সার সার ঢুকছিল কালুর সাঙ্গোপাঙ্গ। এলাকায় ঢুকতেই খবর পেল ইলিশ আসছে; পদ্মার ইলিশ। কোনও দিন পাতে পড়েনি সেই অসাধারণ বস্তু। সমস্ত পুরনো ঝগড়া ভুলে কালু জড়িয়ে ধরল বঙ্কাকে। বলল–ইলিশ মাছের ঝোল আর ভাত খাবরে বঙ্কা। আমরাও হাত লাগাব তোর অপারেশনে। লুঠতেই হবে মাল, যা থাকে কপালে। 
লাইনের ওপর আড়াআড়ি করে গজাল ঠুকে পোঁতা হল মোটা মোটা লোহার শিকল। তার নিচে মানুষে মানুষে ধরাধরি করে অভেদ্য প্রাচীর। ভোর হচ্ছে তখন। আলো ফুটছে ধীরে ধীরে। বিপদ বুঝে ড্রাইভার ট্রেন রেখে ঝাঁপ দিল জঙ্গলে। 
লাফিয়ে লাফিয়ে ওয়াগনে উঠে পড়ল জনাকুড়ি ছেলেপুলে। শাবল গাঁইতি দিয়ে ঠুকে ঠুকে ভাঙা হল লোহার দরজা। রেললাইনের ধার জুড়ে তখন লোকে লোকারণ্য। ছেলেরা ট্রেন থেকে ঝুড়ি উপুড় করে ফেলতে লাগল চকচকে রুপোলি ইলিশ আর সাদা বরফ। দেখতে দেখতে মাছে মাছে ঢেকে গেল উঁচু রেলবাঁধ। চকচকে সাদা গলানো রূপো ঝকঝকি করছে রোদে। হাঁ করে দাঁড়িয়েছিল মেয়ে বউ, বাচ্চা বুড়ো সবাই। ইলিশ ভাঙা রোদ। রেলগেট থেকে সাহেব বাগান যেন স্বপ্নপুরী। 
ঘোর ভাঙতেই শুরু হয়ে গেল কাড়াকড়ি। দুহাত ভরে পয়সার মতো কেউ কেউ তুলছে আর ফেলছে। কেউ হাত বুলাচ্ছে রুপোর চাদরে। কেউ বঁটি নিয়ে গিয়ে কাটতে বসে গেছে। ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে কানকো, নাড়িভুঁড়ি, পটকা। কেউ শামুকখোলের খোঁচায় আঁশ ছড়াচ্ছে দ্রুত। তেল খরচ করে রান্না করার মতো ঘরে কিছু ছিল না অনেক দিন। তাই গেরস্থের ভাণ্ডারে তেল ছিল ধরাই। কড়াইয়ে তেল ঢালা হয়েছে। বন্যার জলেই ধোয়া হচ্ছে মাছ। নাড়িভুঁড়ির গন্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে এসেছে কাক, চিল। ক্ষুধা তৃপ্তির উল্লাসে আজ কাক, চিল, মানুষ সবাই সমান। সবাই চিল্লাচ্ছে সমান উৎসাহে।
অজয়ের বাবা সংকোচে চেয়ে এনেছেন এক ব্যাগ চাল, মাঠের কোণ থেকে তুলে এনেছেন একটা ইলিশ। লজ্জায় মা যেন মরে যাচ্ছেন, অথচ দু’গ্রাস ভাত মুখে তুলে না দিতে পারলে অজয়টা বাঁচবে না। বিজয় বলল– মা, এখনও তোমার লজ্জা! মা বললেন– লজ্জা নয়, এ লুঠের ধন পেটে সইবে না দেখিস। বিজয় চোখ দিয়ে যেন একরাশ ঘৃণা ছিটকে দিল মাকে, বলল– খেয়ো না তোমরা কেউ এই ভাত। এই মাছ খেয়ো না। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকো, কখন চিঁড়ের ঝুলি নামে। একদিক দিয়ে ভালোই হল, এখন অন্তত আর চিঁড়ের ঠোঙা নিয়ে টানাটানি হবে না। তোমাদের সবার পেট বেশ ভালোভাবে ভরে যাবে। মা বললেন–রাগ করিস কোন বাবা, আমারও কি ভালো লাগছে না! কলোনির সবাই আজ ইলিশ মাছ ভাত খাবে, তবু বড় ভয় হয়। 
উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে শিকল। ছোট ছোট ঝুড়িতে বিশ-পাঁচিশখানা মাছ উঠিয়ে নিয়ে কেউ কেউ ছুটেছে শহরের দিকে। যারা আসে এই দুর্দিনে। 
গরমভাত আর টাটকা মাছের গন্ধে ম ম করছে চারিধার। ইতিমধ্যে কোনও কোনও বাড়িতে নেমেও গেছে কড়াই। বাচ্চাগুলো পারলে দু’হাতে খায় ভাত। আহা কী স্বাদ। মুখোমুখি খেতে বসেছে কালু আর বঙ্কা। পাড়ার মেয়ে বৌরা সব আদর করে খাওয়াচ্ছে ওদের। ওদের জন্যেই না এতদিন পরে ক্ষুধার অন্ন জুটেছে আজ সবার মুখে। বঙ্কা বলল–বুঝলি কালু আর মস্তানি করব না, মাছের ব্যবসাই শুরু করব ভাবছি। কালু বলল–সেই ভালো। চল দুজনে একসঙ্গে শুরু করি, মাছের মতো নোলা বাঙালির আর কিছুতেই নেই। দুই মস্তানের ভাব জমে যাওয়ায় খুব খুশি হয়েছে কলোনির লোক। দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করছে ওদের। দুজনের রেষারেষিতে কী অশান্তিই না ছিল কলোনিতে। 
পোঁ পোঁ শব্দে ঢুকল পুলিশের গাড়ি। তাদের লাঠির ঘায়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল হাঁড়ি, কড়াই। ভেঙে গেল উনুন, ছিটকে পড়ল মাছ, কাঁটা। পুলিশের খাতায় নাম ওঠা দুই মস্তান বঙ্কা আর কালুকে একসঙ্গে পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠল ইন্সপেক্টর। দুহাতে দু-জনার কলার চেপে ধরে বলল, উঃ মাছ খাওয়া হচ্ছে। চল্‌ ওঠ । বঙ্কা দু’হাত জোড় করে বলল–স্যার আর কোনও দিন এ জিনিস খেতে পাব না স্যার, খাওয়াটা সেরে নিতে দিন স্যার। কর্ণপাত করলেন না এস আই। সব মেয়ে বউরা জোড় হাত করে বলল–ওদের খেয়ে নিতে দিন স্যার। স্যার বুটের লাথিতে উলটে দিলেন থালা। অজয় দেখল উর্দির কী মাহাত্ম্য। কালু বঙ্কার মতো মস্তানও যেন কেঁচো। ইন্সপেক্টর গলা ধাক্কা দিয়ে দুটোকে ধরে উঠিয়ে দিলেন প্রিজন ভ্যানে। যাকে হাতের কাছে পেলেন তাকেই পুরলেন ভ্যানে। বিজয়ও পড়ল ধরা।
একদমে এতগুলো কথা বলে থামল অজয়। বলল–দাও, খেতে দাও। লতা বলল, গল্প শুনতে শুনতেই তো বেলা গড়াল, স্নান সেরে আসি।
স্নান সেরে ভিজে চুল পিঠে ফেলে লতা খেতে দিল অজয়কে। বলল–দাদা কবে ছাড়া পেয়েছিল? অজয় বলল–দিনদুয়েক বাদেই, তবে পড়াশোনাটা দাদার আর হল না। এখন তো ও ভালোই আছে বল? রীতিমতো ছোটখাটো একটা হোটেলের মালিক। ওর দৌলতে ভাইটারও হিল্লে হয়ে গেল। ওই এখন আবার ওর কর্মচারীদের বলে, কোনো জিনিস দরকার থাকলে হাত পেতে চেয়ে নিবি। কিন্তু চুরি করবি না বা কেড়ে নিবি না। বলে হা হা করে দুলে দুলে হাসতে লাগল অজয়।
ইলিশের বাটিটা পাতের উপর উপুড় করেই গা’টা গুলিয়ে উঠল লতার। মনে হল বঙ্কা যেন হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে পাতের সামনে। বলছে জীবনে একবার অন্তত খেতে দিন তৃপ্তি করে। অজয় তার লাঠির আঘাতে শুইয়ে ফেলেছে বঙ্কাকে। বলছে, যা ওঠ্‌ শালা বস্তির বাচ্চা, আবার পদ্মার ইলিশ খাবে, শখ কত! জানিস এর দাম? পাঁচশো টাকা কিলো। 
হর্‌ হর্‌ করে বমি করছিল লতা, ইলিশ মাছভাতে ভোরে যাচ্ছিল কলতলা। এককণা মাছের টুকরোও আর থাকতে চাইছিল না পেটে। উঠোনের কোণে সপ্তপর্ণী গাছের পাতার ফাঁক থেকে পাখিটা ডাকছিল– ‘খোঁকা হোক, খোঁকা হোক’। 

2 thoughts on “অনিন্দিতা গোস্বামী’র গল্প : মোচ্ছব

  • February 11, 2018 at 4:53 am
    Permalink

    খুব ভালো লিখেছেন অনিন্দিতা গোস্বামী। আপনাকে শুভেচ্ছা।

    Reply
  • February 11, 2018 at 5:26 am
    Permalink

    খুব ভালো।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *