বই পড়া : শিপা সুলতানার পালকের ব্লাউজ

সুমী সিকানদার
আমাকে অবাক করেছে ”পালকের ব্লাউজ” শিপা সুলতানার প্রথম গল্পগ্রন্থ। যত স্বতস্ফূর্ত তার লেখা তাতে করে সে লেগে থাকলে অনেক লেখা বইই তার কাছ থেকে পেতে পারতাম।সরাসরি সিলোটি ভাষায় লেখা বইটা পড়ার জন্য আমি আনন্দের সাথে অপেক্ষা করছিলাম । বেশী আগ্রহের চোটে দুইখানা কপি চলে এসেছিলো রকমারির তরফ থেকে —
”পালকের ব্লাউজ” প্রকাশ করেছে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন এবং প্রচ্ছদ করেছেন কাজী যুবাইর মাহমুদ। এই বইয়ে আছে নয়টা গল্প নয় রকমের আবহ।
শিপার কথা বলার স্টাইলটাই টানে।
”কিতা মিয়া… সারাদিন রইদো বোয়াইয়া রাখতায় নি ?”
মুই তুমার দেহত যামু …। মোরে তুমার দেহত নেও মনু। ‘ শাদা ফেনার নদীটার দিকে তাকিয়ে এভাবেই বলে মাঘাই।
”পত্রসখা” একটা চমৎকার গল্প। পাতা কুড়ানোর বাহানায় পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা।
”কী খুঁজেন?” বীনা প্রশ্ন করে।
যার কারণে এ জগতের সকল পাতার নাম রঙ আকার নিরাকার জানতে শুরু করেছে নেশা ধরে গেছে বীণার। অচেনা তাকে সাথে নিয়ে কোন কোন ঝোপ থেকে পাতা খুঁজে জমায়। কিন্তু যার জন্য পাতা চেনে সেই একসময় পাতা জমানো বন্ধ করে দেয়,।
সে বলে ”আমি আর পাতা জমাচ্ছিনা বীণা”
”কেন আপনি না বললেন সারাজীবন পাতা কুড়ানো সখ আপনার ?”
”মাঝে মাঝে সখ বিসর্জন দিতে হয়। প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলতে হয়,ইচ্ছে করে হারাতে হয়।”
একবার যে জড়িয়ে রাখা অভ্যাস করে ফেলেছে সে ইচ্ছে করে কিভাবে হারায়……। যেখানে নিষিদ্ধ , সেখানেই তো আকর্ষণ। বীণা না পাতা খোঁজা ছাড়ে না পত্রসখা। মন উদাস করা গল্পটা।
ভালো লেগেছে মধুবউ, উলুধবনি। বেশ কিছু আঞ্চলিক শব্দের অর্থ গল্পের শেষে টিকার মতো দেয়া থাকলে আরও ভালো হতো।
”কালঘুম” অনেক ভাবিয়েছে। মনোযোগ কেড়ে নেয়।
”বসে বসে কী করছি? রানীমাতার জন্য জাতিসাপের পোনা ভোনা হচ্ছে।”
এই পড়েই আৎকে উঠি । শিপার বর্ণনার মুন্সিয়ানাই তাকে অন্যের থেকে পৃথক করে।
আত্মহত্যার আগে মানুষ আসলে কি কি করতে চায় ! কাকে কাকে চায় । কি চলে তার মন জুড়ে …
” আমার বোনের ফোন এনগেজড ছিলো , আমার পুরোনো বন্ধু আমাকে আপনি আপনি করছিলো, আমার স্বামীর ফোন মিউট ছিলো ,লেখার কাগজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না, পাখিরা উড়ে উড়ে বিরক্ত করছিলো…”
শিপার একটানা বলে যাওয়ায় আছন্ন হয়ে থাকতে হয়। অপ্রচলিত অন্যমনস্কতা তার মাথায় সারাক্ষণ ঘোরে।
”সোনাই সাধু” গল্পে সোনাই আর সোনাভানের আজন্ম বিচ্ছেদ মন কুপি নিবিয়ে রাখে। জাত ধর্ম ব্যবচ্ছেদ করে তারা মিলতে পারে না।
পালকের ব্লাউজের সব চেয়ে মাৎ করা গল্পটি হলো ”পালকের ব্লাউজ। অর্থাৎ বইয়ের নামে নাম যার নাম। বিনা নোটিশেই হুট করে আফিয়া -কমলের দিন যাপনে ঢুকে যাই।
কমল, আফিয়ার জন্য মুনিয়া পাখির বুকের নরোম পালক যোগাড় করে কমোরের ভাঁজে লুকিয়ে রাখে।
”তুমি হাসর ফৈড় দিয়া কি করতায় আফিয়া?”
”জমাইতাম, জমাইয়া একটা ব্লাউজ বানাইতাম…….আর হুনো কমল ভাই , তুমার সবতাত কেনে এত আগ্রহ ? খালি বেটিনতর মাতো থাকো।বাড়িত যাও !”
কথাগুলো যেন লেখক তাঁর নিজমুখে বলছে বলে মনে হয় , যেন আফিয়ার মুখে শিপার মুখ বসে যায়।
আফিয়ার জন্য কমলের অসম্ভব টান। মন উজার করা তার কথায় আমি পিঙ্গল পাহাড়ের মাথায় চলে যাই। যেখানে কমল, আফিয়ার জন্য বটর ডালে কাঠর ঘর বানাতে চায়। আফিয়া এসব পাত্তাই দেয়না। মন থেকে নিজের মনের কথা আফিয়া জানান দেয় না।
এমন নাখারিস্তা প্রেম লিখে বোঝানো মুশকিল সিলেটী ভাষার গতিময়তা এই গল্প মন ভাঙ্গে। সিলেটে না যেয়েও নাবতার নদীটাকে কাছের মনে হতে থাকে । হাহাকার হয়ে বিধতে থাকে। ঘুমিয়ে থাকলে মনে হয় আফিয়া চুরি হয়ে যাবে , তাই উঠে গিয়ে তাদের বাড়ির সিড়ির নিচে বসে থাকে কমল।
”তুমি ভুলি গেছ আফিয়া” ?
‘আচ্ছা ভুলসি ।অখন ইখান থাকি যাও”
‘তুমি ব্লাউজ বানাইতায় নায়? কত পাহাড় থাকি তুকাইয়া আনলাম।”
”না বানাইতাম নায় । ”
কমলের যে রেখা ধরে চলে যাচ্ছে তার গন্তব্য নেই, তিন সাড়ে তিনশ ফুট এক গভীর খাদের অন্ধকার বুকের ভেতর গেঁথে যায়।
গল্পকার শিপা সুলতানার ‘পালকের ব্লাউজ” বইটা কিনে পড়ুন । সবার ভালো লাগুক। ভাল লাগার কোনও বাটখারা নেই আসলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *