কাজী লাবণ্যের গল্প: হাজারমুখি রোদসী

মাটির মালসার উপরে ভাতের হাঁড়ি কায়দামত মাড় গালতে বসিয়ে দিয়ে কড়াইয়ের ভাঙা খোলাটা চুলার আঁচে বসিয়ে দেয় ময়না। খোসা ছাড়ানো রসুনের কোয়াগুলি খোলায় দিয়ে দুটো পাটখড়ি দিয়ে নাড়তে থাকে আর মুখে গজগজ করতে থাকে। যতটা হাত চলে তার চেয়ে দ্রুতগতিতে চলে মুখ। মুখ চালাতে চালাতে রসুনের সাথে একমুঠো শুকনো লংকা ফেলে দিয়ে দ্রুত নাড়তে থাকে। কড়াইয়ের ভাঙা খোলা বড্ড পাতলা, মরিচ দ্রুত কালচে লাল হয়ে আসে, মরিচ ভাজার তীব্র গন্ধে ময়নার কাশি ওঠে খকর খক। এই কাশির ফাঁকে, বন্ধ হয়ে ধরে আসা দমের ভেতরও ফাঁকেও ওর গজগজানি বন্ধ হয় না। বছরের তিন’শ পঁয়ষট্টি দিনই ময়নার গজগজানি চলে। পেটের সন্তান, প্রতিবেশি, বাড়ির হাসমুরগি, আকাশের কাক চিল এমনকি ওই আসমানের উপর, আসমানে থাকা আল্লাহর সাথেও ওর গজগজানি চলে।আজকের গজগজানি চলছে অটো রাইসমিলের বিরুদ্ধে। মিল অটো হওয়াতে ওদের সবার কাজ চলে গেছে। আগে দল বেঁধে সবাই চাতালে যেত। ধান চালের কাজ করত, সেটা এখন বন্ধ।
 
-ধনী মাইনষের টাকার গরম। চাতাল থাকলে এতলা হামরা গরীব মানুষ খায়াপরি বাঁচি থাকি, তা সেটা হবার ন্যায়। মিলটাক অটো বানবার নাগবে। আরে তোমার ইলার দেলত কি আল্লাহ খোদার রহম নাই! এতলা মাইনষের প্যাটের খোরাকী মেশিনের ভেতর ঢুকি দেনেন, ওজ হাশরের ময়দানত তোমার বিচার হইবে না! এই এক হাত মাতার উপ্রে বেলা আসি মাতার মগজ গলে দেবে। আরে হামরা কি তোমার ধানগুলা চাউল করি দেই নাই! সেই চাউল দিয়া তোমরা ব্যবসা বাণিজ্য করি তালেবর হন নাই! মেশিনে তোমার সউগ হল! এতলা মাইনষের কতা ভাবনেন না! হামার এলা দিন চলে ক্যাংকা করি! প্যাটের ভেতর আক্কশ খাওয়া ভোক। পেন্দনের কাপড়া ছিঁড়ি যাওচে। মুই এলা কি করো! কার গোরত যাও! বেরহম ধনীরা ভাল হইবে না। এই ময়না, তোমাক শাঁও দেওচো, ওই আসমান থাকি আল্লা সউগ দ্যাকোচে।
 
এসব ক্ষোভ ঝাড়তে ঝাড়তে সে ভাজা রসুন, ভাজা মরিচ, নুন দিয়ে ডলে ফেলে। বেশ লাল লাল এক ধরনের ভর্তা তৈরি হলে, সে দুটো সানকিতে ভাত বাড়ে আর পাশে ভর্তা দিয়ে গলা ছেড়ে হাঁক পারে-
 
-অই মন্দেল, রব্বানী! কোটেরে! এই ভাত জুরি যাওচে টপ করি আইসো। এরপর বিয়েতে বাপের দেওয়া কাঁসার থালা যেটিকে সে মেঝেঘষে সোনার মত ঝকঝকে করে রাখে, তাতে ধোঁয়া ওঠা দু’হাতা ভাত, ভর্তা নিয়ে খেতে শুরু করে দেয়। এই ভর্তা দিয়ে, গরম ভাত ছাড়া খাওন যায় না।
 
অটো রাইসমিলগুলোর দাপটে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মিল চাতালগুলো। রাইসমিলগুলোর সঙ্গে ধান ক্রয়ে টিকতে না পেরে, উৎপাদন খরচ বেশি হওয়াতে, শ্রমিক সংকটসহ নানা কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এসব মিল চাতাল। ফলে চাতালগুলো এখন অতীত হতে বসেছে আর এর সঙ্গে জড়িত শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়ছে। এই বেকারদের মধ্যে ময়না একজন। ওর এক ছেলে ছাড়া সংসারে কেউ নাই। সে পুত্র আবার ময়নার ভাষায় ‘হুজুর’ হইচে। মা যতটা মুখরা, চালাক, কর্মঠ, পুত্র ততটাই ধীর, অলস, আর ধর্মান্ধ। ময়না ওকে মাদ্রাসায় পড়িয়েছে বেশ ক’বছর।
 
-এই হাটখোলা পাড়ার তামান ছইলেই তো মাদেছাত পড়ে, তোর মোতন অত হুজুর কায় হইচে রে হারামজাদা! প্যাটের ভাত যোগের পায় না, আর হুজুরগিরি! ভাত কি আসমান থাকি ধপ করি পড়বে রে! কাম কর! কাম কর! মাওয়ের ভাত কাপড়ার উদ্দিশ কর। বাপ তো মরি বাঁচি গেইচে, মোরে হইচে যত মরণ। পুত্র মন্দেলের উদ্দেশ্যে ময়নার এসব বাক্য নিত্যদিনের। ছেলে অবশ্য মুখে কিছু বলে না, চুপ করে থাকে।

ময়নার বয়স কত? চল্লিশ বা পঁয়তাল্লিশের এধার ওধার। শরীরে মাংসের অভাব। নাক, চোখ, মুখের গড়নে চাকমা ভাব প্রবল। বুক, কোমর, নিতম্ব যথেষ্ট দরিদ্র। তবে কাম কাজে সে একেবারে চৌকশ। আর মুখের তো কোন লাগাম নাই। লোকে বলে সে নাকি ঘুমের মধ্যেও কথা বলে। এই এক বিষয়ে ওর কোন অলসতা, অরুচি, সময়ের অভাব কোনটাই হয় না। কথা বলাই ওর জন্মগত বৈশিষ্ট। এমন বাচালতার জন্য মাঝে মাঝে যে বিপাকে পড়ে না তা নয়, কিন্তু কথায় আছে না- ‘স্বভাব যায় না ম’লে’। সে আবার গিদালিও।

পাড়ার যে কোনো বিয়েতে ওকে ডাকুক না ডাকুক সে গিয়ে দিনভর গীত গাইতে থাকে। কেউ কেউ আনন্দ পায়, কিছু খাওয়ায়, যাদের অবস্থা ভালো তারা হাতে কিছু টাকাপয়সা ধরিয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ খুব বিরক্ত হয়। পাড়ায় অনেকেই মনে করে বিয়েতে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান করা, গীত গাওয়া বেদাত কাজ। কিছু গ্রামবাসী এসব বেদাত কাজ থেকে দূরে থাকে এবং তারা এসব ব্যাপারে বিপজ্জনকভাবে সোচ্চার। সোচ্চার লোকজনের মধ্যে একজন ময়নাপুত্র মন্দেল। সে মাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। বিভিন্ন সময় মাকে বলে,
 

-মা, মৌলদ পড়া বেদাত কাম। মরি গেলে যে মাইকিং হয় তা কেবল মর্দ মানুষ মরি গেলে করা যাইবে। মহিলারা মরি গেলে মাইকিং করা যাইবে না। শবেবরাত আইলে তুই যে রুটি বানবার বাদে পাগলা হয়া যাইস, কোন হালুয়া রুটি করা যাইবে না, এটাও বেদাত। মহিলাদের শাড়ি পরা যাইবে না, সুন্নতী পোশাক পরতে হইবে, শাড়ি পরা বেদাত।
 
আর এসব বেদাতের পক্ষে ওর অবস্থান খুব শক্ত সেটাও সে সুযোগ পেলেই সবাইকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু সে মায়ের সাথে পেরে ওঠে না। সে অসংখ্যবার মাকে অনুরোধ করে এসব কাজ ছেড়ে দিতে। কিন্তু মা শুনলে তো!
 
ময়না এসবের ধারও ধারে না। নিজ ইচ্ছেমত চলে। নিজের পেটের ভাত যেমন নিজে কামাই করে আনে তেমনি নিজ ইচ্ছের নাটাই সে কারো হাতেই তুলে দেয় না। ছেলেকে তো নয়ই, স্বামী বেঁচে থাকতে তাকেও না। অবশ্য স্বামী ওর এই চঞ্চলতা বা বাচালতা যাই হোক না কেন পছন্দ করত। বউ এই হাটখোলা পাড়ার নামকরা গিদালি সুর করে সে নানা গীত গাইতে পারে। কত শত গীত যে ওর মুখস্ত! এসবের জন্য একধরনের সন্তুষ্টি নিয়ে চুপচাপ উপভোগ করত।
 
আরেকটি ব্যাপার আছে ময়নার মধ্যে। আত্মীয়, পরিজন, পাড়া প্রতিবেশি যে কেউ মারা যাক সে হাজির হয়ে এক কোনে গুছিয়ে বসে শুরু করে বিলাপময় কান্না। সে বিলাপে এক ধরনের করুণ সুর, নিপুণ বয়ান মানুষের হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তোলে। আর মানুষ সেই মৃত ব্যক্তির মরণের ঘটনাটাও জেনে যায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। এই বিলাপের ব্যাপারেও মানুষ দুভাগে বিভক্ত। কেউ কেউ ময়নার আশপাশে বসে ওর বিলাপ শোনে মন দিয়ে, তাদের চোখের জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে আবার কিছু মানুষ একদম পছন্দ করে না। অবশ্য, পাড়ার সব বাড়িতে ময়না কাঁদতে যায় না। ও জানে কোন কোন বাড়িতে যাওয়া যাবে।
 
এমনসব বিচিত্র স্বভাবের জন্য গ্রামবাসী ময়নার নাম দিয়েছে ‘হাজারমুখী’। আড়ালে আবডালে এমনকি সামনাসামনিও আজকাল সকলেই হাজারমুখী বলে ডাকে ওকে।

হাঁক ডাকের মধ্যেই রব্বানী হাতের চেটোয় মুখ মুছতে মুছতে এসে ভাতের সানকি নিয়ে খেতে শুরু করে।
 

-কিরে, তোর হুজুর ভাই ফির কোনটে? ভাত যে জুরি যাউচে! মুখভর্তি ভাত নিয়ে রব্বানী উত্তর দেয়-
 
-খালা মিয়াভাই খলিল মুন্সির সাতে কতা কয়চে। মনটা কয় ওরা ফির চিল্লাত যাইবে, তারবাদে বুদ্ধি পরামশ, গোছাগাছ চলোচে বুজি। শোনার সাথে সাথে ময়নার মাথা গরম হয়ে যায়।
 
-নেমকহারাম শয়তান। অক হাজারবার করি কও, বাপরে! এই চিল্লাত যাইস না। তুই গেইলে মোর আর কায় আচে! মাওক একলায় থুইয়া চিল্লাত যায়া তুই কেসের সওয়াব কামাই করিস! মোর কি আরো ব্যাটাপুত্র আচে যে মোক দেকপে! মুই একটা বিদুয়া মানুষ, তোর বাপ বাঁচি নাই এটা তোর ক্যামন আক্কেল বাহে, এ্যা!
 
কুরিয়া! আলসিয়া! কামাই কইরবার মুরাদ নাই খালি ধান্দাবাজি! তুই কোন্টেকার বিরাট আওলিয়া হচিস রে! আর এই হইচে পর খাওইয়া নয়া নয়া মলবিগুলা এরা খালি এই চ্যাংড়া গুলাক ওই চিল্লাত নিয়া যায়। আসল কতা, গুয়ের মাছিতে ভরি গেইচে দুনিয়াটা।
 
রব্বানী ভাত চিবায়, ঝালে হু হা করে আর মাঝে মধ্যে বদন ভ্যাটকানো হাসি নিয়ে খালার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে খালাকে খুব ভয় পায়। খালা অবশ্য মা মরা বোনপো এই রব্বানীকে নিজ পুত্রের মত স্নেহ করে। ওর পুত্র তো বিরাট আওলিয়া দরবেশ, দিনরাত ধর্ম কর্ম করে বেড়ায় তার মাদ্রাসার শিক্ষকদের সাথে। পুত্রের শূন্যতা পুরন করার চেষ্টা করে রব্বানী। সে এই বয়সেই খালার গরুর ঘাস কেটে আনা থেকে গরুর দেখাশোনা, খাবার দেওয়া, ঘরে তোলা সবই করে।
আবার মাঝে মাঝে খাল বিল থেকে মাছ ধরে আনে, মাছ আনলে খালা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। খালার হাসিমুখ দেখতে রব্বানীর বড্ড ভালো লাগে। মনে কয় নিত্য দিন যদি মাছ ধরে আনতে পারত! কিন্তু আজকাল খালবিলে মাছ পাওয়া যায় না। রব্বানী পৌঁছানোর আগেই সেগুলি কেউ না কেউ ধরে নিয়ে যায়। মাছ আনলে খালা বটি ছাই নিয়ে, কাঁঠালতলায় কলপারের একপাশে বসে দ্রুত হাতে কুটতে থাকে, তখন খালার কাছে বসে, পুটুস পুটুস করে নানা গল্প করতে ওর খুব ভালো লাগে। শুনেছে, ওর জন্মের সময় মা মারা গেছে। নানীর কাছে ছিল, সেও মারা গেলে এই খালাই ওকে কাছে নিয়ে এসেছে।
 
সারাদিন সে হাসি মুখে নানান কাজ করে, ওর বয়সি ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করে, মারামারিও করে কিন্তু ওর খুব গোপন একটি দুঃখ আছে। কেউ জানে না। সে কাউকে বলতে পারে না। ওর নিজের কচি বোধ বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারে ব্যাপারটি খুব মন্দ আর লজ্জার। কাউকে বলা যায় না। খালাকে বলতে চায়, কিন্তু ভয়ে বলে না।
এজন্যে মিয়াভাই চিল্লায় গেলে সে খুব খুশি হয়। মনে মনে ভাবে-
 
-যাউক যাউক, চিল্লা ফিল্লা কি আচে অত্তি যায়া থাকুক। আর য্যান না আইসে বাড়িত। আইতোত মুই আরামে নিন পারিম।

২.

ময়নার ঘরের বিভিন্ন হাড়িতে সঞ্চিত চাল, ডাল, কাঁঠালের বিচি, শিকায় ঝুলানো সাদা চালকুমড়া সব একে একে নিঃশেষ হয়ে আসে। হাতের শেষ টাকাটাও চাল আনতে ফুরিয়ে যায়।
 

এমন মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থায় সে কাজ পেয়ে যায়।
 
কয়’দিন হয় ময়না মাটিকাটার কাজ পেয়েছে। সকাল সকাল খেয়েদেয়ে চলে যায় রাস্তায় মাটি কাটতে। সেখানে দল বেঁধে মহিলারা এই কাজ করে। সারাদিন কেটে গেছে। বাড়ি যাওয়ার সময় হয়েছে। এমন সময় বাতাসের বেগে রব্বানী ছুটে আসে;
 
-খালা! খালা! বাড়ি হাটেক বুড়িমাও মরি গেইচে। হাতের কোদাল ফেলে একরকম ছুটে আসে ময়না ওর চাচী শাশুড়ির মৃত্যু সংবাদ পেয়ে। তার বয়স হয়েছে, বার্ধক্যজনিত কারণে বিছানায় পড়ে আছে অনেকদিন ধরে, সবাই তার মৃত্যুই কামনা করে।
 
ময়না দ্রুত বাড়ি ফিরে গোসল সেরে তোরঙ্গ খুলে সাদা পরিষ্কার শাড়িটি বের করে পরে নেয়। আঁচল তুলে মাথা, গা, হাত ঘিরে নিয়ে ও বাড়ি গিয়ে স্বভাবমত বিলাপ শুরু করে। মৃত্যুবাড়ির মানুষরা মনে হয় ওর জন্যই অপেক্ষা করছিল। একজন মানুষ যতই অপাংতেয় হোক চিরদিনের জন্য চলে গেছে কিন্তু বাড়িতে কোন কান্নাকাটি নেই এটা কেমন কথা! এরকমই তাদের মনোভাব। ময়নার কান্নার অভিঘাতে মরাবাড়িটিতে যেন মৃত্যুগন্ধী শোক ফিরে আসে। সকলেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আবার তাদের চোখও ভিজে ওঠে।
 
যদিও রাতের খাবারের সময় মন্দেল মাকে আবার সেই অনুরোধ করে এই কান্নাকাটি, গীত গাওয়া, শাড়ি পরা এসব বাদ দিতে। বলে-
 
-মা, তুই ভালো হয়া যা মা। মাইনষে খারাপ কয়, এগলা ভালো নোয়ায়। এগলা বেদাত কাম করা হামার ধর্মে নিষেদ আচে, আর না করিস। পরকালের কতা চিন্তা কর মা…
 
-আইচ্চা, আইচ্চা, হউক, নে এলা ভাত খা। জানি থো, তোর মাও কোন খারাপ কাম করে না।

তিনদিনের দিন ময়না ঘর, আঙিনা কাদামাটি গুলিয়ে লেপে নেয়। লেপতে লেপতে ও রব্বানীকে পানি খাওয়াতে বলে। পানির মগটা নিয়ে ও ঢক ঢক করে খেতে থাকে। তৃষ্ণায় ভেতরটা ফেটে যাচ্ছিল। এমন সময় খলিল মুন্সি এসে বাড়ির দেউড়িতে দাঁড়ায়, বলে ওঠে-
 

আরে! আরে! বাম হাত দিয়া পানি খাওয়া নাজায়েজ, ডাইন হাতে পানি খাওয়া জায়েজ। ময়না কিছুক্ষণ মুন্সির দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর নিজের কাঁদা মাখা ডান হাতের দিকে তাকিয়ে শ্লেষের সাথে বলে ওঠে-
 
-তা মুই আর কি করিম হুজুর কন, মোর ত দোনোখানে ন্যারা হাত। এই খলিল মুন্সিই মন্দেলকে চিল্লায় নিয়ে যাচ্ছে, তাই মুন্সির উপর ময়নার মেজাজ খারাপ।
 
-আহাম্মক হয়া গেনু বাহে, এগলা কি কতা কন! ভালো কতা শোনেন না… বলতে বলতে মুন্সি পেছন ফিরে হাঁটতে থাকে দ্রুত।
দাওয়ায় বসা রব্বানী খলবল করে হেসে ওঠে-
 
-কি খালা, তোর দোনোখানে ন্যারা হাত?
 
-হয়রে বাপ, বলে সেও হাসতে থাকে। এর সাতদিন পরে ময়নার ছেলের দল চিল্লায় চলে যায়। যাবার আগে আবার মাকে হেদায়েত করতে গিয়ে মা ছেলের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।
 
টলটলা জলের মস্তবড় একটা দীঘি। দীঘির কিনারজুড়ে ময়ুরপুচ্ছের মতো অপুর্ব কচুরিপানা ফুল ফুটে আছে। রব্বানীর মা দাঁড়িয়ে আছে দীঘির পাড়ে, ফুলের পাশে। হাত ইশারায় ছেলেকে ডাকছে। রব্বানী এক ছুটে মায়ের কাছে যায়। রব্বানী ওর গোপন কষ্টের কথা মাকে জানাবে। সব কথা মাকে বলে দেবে সে, কিন্তু মা কই! এ তো খালা দাঁড়িয়ে আছে। রব্বানীর কষ্টের কথা আর বলা হয়ে উঠে না। খালা রব্বানীর হাত ধরে দীঘিতে নামতে থাকে। রব্বানী ভয়ে ভয়ে বলতে থাকে;
 
-খালা, মুই সাঁতার কাটির পাও না খালা। খালা যেন রব্বানীর কথা শুনতেই পায় না। অভয়ের হাসি হেসে রব্বানীকে নিয়ে জলে নেমে পড়ে। খালা ওর কানে ফিসফিস করে বলে-
 
-এই দীঘির মাঝখানে সোনার চাইলন বাতি আছে। আয় বাবা তোক দেখাও। মুখের দিকে তাকিয়ে রব্বানী দেখে আরে! এতো মা। খুশি মনে মায়ের পাশাপাশি রব্বানী হাঁসের ছানার মত সাঁতরাতে থাকে। রব্বানীর ভীষণ আনন্দ হয়। মা দীঘির চারপাশে ওকে নিয়ে সাঁতরাতে থাকে। অনেকটা সময় সাঁতার দিয়ে জলের মাঝখানে গিয়ে বলে
 
-তুই এটে থাক, তোর বাদে সোনার চাইলোন বাতি আনির যাও বাবা। বলেই মা ডুব দেয়। রব্বানী ভয় পেয়ে আর্তনাদ করে ওঠে-
 
-মা, মা, ওমা… কিন্তু মা আর আসে না। রব্বানী কাঁদতে শুরু করে। মায়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে ঘুমের মধ্যেই জেগে উঠে, আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। এরপরে ছোট্ট রব্বানীর জীবনে একটি ভোর আসে, মুক্তির ভোর।আনন্দের ভোর।
কিন্তু এমন মুক্তি রব্বানী চায়নি।
 
ভোর আসে রব্বানীর খালা হাজারমুখী বা ময়নার জীবনেও। ভোরের নির্মল আলো পুব আকাশে ছড়িয়ে পড়ে রঙয়ের বাহার নিয়ে, সোনার আভা নিয়ে। ওই দূরে চাতালের চিমনীর উপর দিয়ে, গাছাগাছালীর ফাঁকফোকর দিয়ে আলো এসে পড়ে হাজারমুখীর নিকানো আঙিনাজুড়ে। কিন্তু সে আলো ওর আঙিনাকে আলোকিত করতে পারে কি! ওর আজন্মের স্বভাবের উপর, ওর অস্তিত্বের উপর সে আলো একদলা অন্ধকার ঢেলে দেয়।
 
৩.

সুন্নি এবং শিয়া উভয় সম্পদ্রায়ের মূল ধর্মবিশ্বাস ও রীতিনীতি অভিন্ন হলেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মতত্ব, আচার-আচরণ, আইন এবং ধর্মীয় সংগঠনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু তফাত আছে। নেতাদের মধ্যে দেখা যায় একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা।
 

ধর্মীয় লড়াইয়ে বাঁচলে গাজী মরলে শহীদ। আর শহীদের জন্য নির্ধারিত আছে বেহেশত এবং হুর। এই বিশ্বাস নেতারা নির্ধারিত ছেলেদের মাথায় ঢুকিয়ে খোদাই করে দেয় ধিরে ধিরে, খুব যত্নের সাথে।
 
নেতাদের এমন প্রাধান্য বিস্তারের এক গোপন লড়াইয়ে একজন শহীদ হয়ে যায়।

গ্রাম গঞ্জ সব জায়গাই এখন নেটওয়ার্কের আওতায়। আর মোবাইল ফোন প্রায় সকলের হাতে হাতে। হাটখোলা পাড়ায় খবর পৌঁছাতে সময় লাগে না। মুহূর্তের মধ্যেই পাড়ার সকলেই জেনে যায় একটা ঘটনা ঘটেছে।
 

পাড়ার সবাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে কখন আসবে হামার পাড়ার ছেলে?

বেলাটা যখন হাজারমুখীর মাটি কাটতে যাওয়ার সময়, যখন পাড়ার সকলের সকাল বেলার নাস্তাপানি খাওয়ার সময়, গোয়ালের গরু মাঠে নেবার সময়, বাজারের দোকানগুলোর ঝাপ খোলার সময় ঠিক সেই সময় অকল্পনীয় ভারী একটা ভ্যান চলে আসে। ভ্যানটি এসে থামে বাজারের মাঝখানে বড় বটতলায়। মুহূর্তে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে
 

-‘আলচে’ ‘আলচে’।
 
সকল কাজ কর্ম ফেলে ভ্যান ঘিরে পাড়ার নারী পুরুষের জমায়েত বাড়তে থাকে। সকলের চোখে মুখে জিজ্ঞাসা-
 
-ঘটনা কি?
 
-কি হইচিল? ক্যাংকা করি এমতোন হইল?
 
ভিড়ের মধ্যে অনেকেই পরস্পরকে বলতে লাগলো-
 
-আরে বাহে, এনা সবুর কর, আপনে এলা হাজারমুখীর কান্দনের কিসসায় সউগ জানা যাইবে এলা।
 
-হাজারমুখী খবর পাইচে?
 
-আরে, ক্যাংকা কতা কন বাহে, খবর পাবান্যায়? পাইচে।বটতলার জমায়েতের চোখ অদুরের হাজারমুখীর বাড়ির। দিকেকখন আসেবে সে? কখন সবাই ওর বিলাপের ভেতর দিয়ে জানতে পারবে ঘটনার আদ্যোপান্ত বিবরণ। ওর করুণ সুরে আলোড়িত হবার জন্য সবাই ব্যাকুল অপেক্ষায় অধীর হয়ে ওঠে। কান্না নাকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ‘মিউজিক’ সেজন্যই কি এদের এই ব্যাকুলতা!

হাটখোলা পাড়ার সমস্ত মানুষের অপেক্ষার অবসান হয়। হাজারমুখীকে আসতে দেখা যায়। পাশে হাপুস চোখে কাঁদতে থাকা ছোট্ট রব্বানীও আছে। দেখে সকলের কপালে ভাঁজের উপর ভাঁজ পড়ে। চিনতে না পারলে ভাঁজ তো পড়বেই।
-কায় ওটা! ওংকা ধির পায়ে কায় আইসোচে!
-অয় ফির ওগলা কি পিন্দিচে? অর মুক বন ক্যানে?
-অর চউকোত পানি কোটে!
-আমা, অয় কান্দে না ক্যানে!
 

বিভিন্ন মানুষের এক একটি প্রশ্ন বুদবুদের মতো বাতাসে ভাসতে থাকে।
 
আছাড়ি বিছাড়ি করে, ছিল্লানী পাগলির আর্তনাদ আহাজারিতে হাটখোলা পাড়ার আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ছুটে আসবে তা নয় যেন এক পাষাণ প্রতিমা পায়ে পায়ে ভ্যানের দিকে এগিয়ে আসছে। তার পরনে লম্বা ঘেরের গোল জামা, পাজামা, হিজাব যাকে নাকি সুন্নতি পোশাক বলে। অনেক আগে ছেলে এনে দিয়েছিল। কিন্তু মা তা পরেনি, পরার কথা ভাবেওনি। ও নিজে যা পরত, দাদী, নানী, মা চাচীকে যা পরতে দেখেছে তা নিয়ে ওর মনে কোনো সংশয় ছিল না, তাই শাড়ি ছেড়ে এ পোশাকের কথা কোনোদিন ভাবেনি।
 
ছেলের আনা সেই সুন্নতি পোশাক পরে হাজারমুখী ছেলের ভ্যানের পাশে এসে নির্বিকার, নিথর দাঁড়িয়ে যায়। ওর মুখ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে, ওর দৃষ্টি নিবদ্ধ পায়ের কাছে মাটির দিকে। শুকনো তৃষ্ণার্ত মাটি যেন সব কিছু শুষে নিয়েও সব চিহ্ন মুছে ফেলতে পারেনি।
 
কী যেন একটা রয়ে গেছে।

লেখক পরিচিতি:

কাজী লাবণ্য
গল্পকার। কবি
ঢাকায় থাকেন।

One thought on “কাজী লাবণ্যের গল্প: হাজারমুখি রোদসী

  • March 29, 2022 at 9:05 am
    Permalink

    আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার গল্পটিকে মিষ্টি করেছে যদিও বড়ো বেদনার ভার বহন করেছে হাজারমুখী।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *