শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের গল্প : বাগান ও দেবদূত বিষয়ক

তারপর বহু বছর কেটে গিয়েছে, যখন সিলিংফ্যানের গায়ে ধুলোর পরত যেরকম প্রকৃত রঙ ঢেকে দেয় সেভাবে একটা একটা করে নতুন দিন স্মৃতিগুলোকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেছে ক্রমাগত অন্ধকারে, আর আমি বড় হয়ে ওঠবার সংগে চোখের কোণায় হাঁসের পায়ের দাগ অনুভবের পরমুহূর্তে ভেবেছি মা তাহলে কতটা বুড়ো হল, শনের মত সাদা চুলের চৌকাঠে পায়ের বুড়ো আঙুল রেখে ইতস্তত করছে কী না তার বয়েস, কিন্তু অতগুলো বছর পরেও সেই কথাটা আমি কাউকে বলিনি, না বাবাকে, না অন্যদের। মা কিন্তু কখনো বারণ করেনি, সত্যি বলতে কী সে নিয়ে আর কখনো কথা হয়নি আমাদের মধ্যে কোনওদিন। অস্ফুট নিষেধ ছুঁয়ে দেখেছিলাম, তবু।
তখন প্রতি বছর দুইবার নিয়ম করে মায়ের সংগে মামার বাড়ি যেতাম, যাকে বড়রা বলত সাঁওতাল পরগণা। ছোট্ট স্টেশনটির প্ল্যাটফর্ম আর জমি ছিল সমতলে, আর সিগনাল পোস্টগুলো লাফাতে লাফাতে দূরের শালজংগলে হারিয়ে গিয়েছিল। স্টেশন থেকে নেমেই টাঙা। অন্ধকার গা জড়ামড়ি করে হুড়মুড় ভেঙে পড়তে চাইছে শীতের রাস্তার ওপর, তখন টাঙায় যেতে যেতে দূরের পাহাড় দেখে শিউরে উঠতাম, যেহেতু স্তব্ধ নিঃসঙ্গ, তাকে বেহালার দুই কামরার ফ্ল্যাটে ধরা যায় না। কিন্তু ভয়ের পিঠেই আবার মনে পড়ত, ওহো হাট ! আমাদের যাত্রাপথে একটা হাট বসত সপ্তাহে তিনদিন। শাকসবজি থেকে শুরু করে মোরগ পায়রা ছাগল, মনিহারি, চিরুনি আয়না থেকে শাড়ি চাদর, এক কোনে জমে উঠেছে মহুয়ার আসর, শালপাতা কি খবরের কাগজে ছোলা পেঁয়াজ লেবুর চাট, প্লাস্টিকের গ্লাস আর কাঁচের অস্বচ্ছ বোতলে মহুয়া। উঁচু গলার চিৎকার চেঁচামেচিতে অস্থির লাগত, হাট পেরিয়ে যেতে দেখি গরীব ক্রিশ্চান মেয়ের মহুয়ার গ্লাস রঙিন হয়ে উঠেছে, তাদের কৌতূহলী চোখ উচ্ছ্বাস আর হিহি হাসি আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিল আর টাঙার চাকায় ধাক্কা খেয়ে গড়াতে গড়াতে ধুলোমাখা সে কলরব অনেকটুকু অবশেষ গায়ে মেখে আমাকে নিয়ে সটান মামার বাড়ির দোরগোড়া। তাই পাহাড়ের ভয় আমাকে অবধারিত মনে পড়াবেই, ওহো হাট !
আর ছিল হলুদ মাঠ ও মহুয়ার বন, ছাদে উঠলে চ্যাটালো নীল আকাশ কাঁধে হাহা অন্তরঙ্গে ছুটে আসত, বুকের ঠিক মাঝখানে প্রকাণ্ড রক্তক্ষতের মত সূর্য, সূর্য ঝরে যায়। দীর্ঘ গোলাপের অবসানের মত সে পেছনে চলে গেলে শালমহুয়ার জংগল, শুকনো নালা, জমজমে মাঠে আগুন জ্বলে ওঠে, ছাদে নিজের মনে ঘুরতে থাকা মায়ের হাত দগ্ধে দেয়। নিচের ঘর থেকে রিটায়ার্ড স্টেশনমাস্টার দাদু একটানা স্বরে ডাকতে থাকে, ‘সতী, অপর্ণা, চায়ের জল বসানো হল?’ মা আলতা পরতে ভালবাসত।
টাউনটা ছিল রম্য ও পতনোন্মুখ। স্বাধীনতার আগে ক্রিশ্চান সেটলমেন্ট হয়েছিল অনেকটা, কিন্তু তখন তাদের ছেলেমেয়েরা আমেরিকা কানাডাতে উড়াল জমিয়েছে। আমার ছোটবেলায় দুটি চার্চ ও সান্ধ্য রবিবারিক সামগান সমেত যে কিছু মধ্যবিত্ত ক্রিশ্চান ছিল, তারাও অধিকাংশই বয়েসের বিপজ্জনক গ্যালারি থেকে ঝুলছে, যখন প্রেমের চেয়ে বেশি একপ্রকার উদাসীনতার সম্বলে মরা টাউনকে নিয়তি ভাবতে হয়। তবু শহর শরীরের ভাঁজ খুলে আমাকে চিনিয়েছিল গাছের ডালে আশ্চর্য হরিয়াল পাখিদের কোলাহল, আদিবাসী হাটের জেগে থাকা দপদপে, চিনিয়েছিল। জংগলের ভেতর ক্ষীণ জলের শব্দ খুঁজতে খুঁজতে যাকে পাওয়া যায়, ভারী পাথরের নিচে সেই কৃশ স্রোতকে ঝর্ণা বলে ডাকতে নেই, যে, কারণ শ্রাবণের কারুণ্যে মাটি উলটে দেবে, জানিয়েছিল তাও। মাঝেমধ্যে বুনো টিয়া, ছাতারে ,বটের, বুলবুলির দেখা মেলে। বনমোরগ, ভাগ্য প্রসন্ন থাকলে, আর ঢাব পাখি।
সেই পাঁচ ছয় সাত বছর বয়েসে আমার খেলার সংগী ছিল মামাতো বোন পিকু, আর আশেপাশের সাঁওতাল ছেলেমেয়েদের দল। তাদের সংগে গুলিখেলা, ফুটবল, নয়ত হাঁটতে হাঁটতে স্টেশন চলে যাওয়া যায়, স্টেশনের পাশে পোস্টঅফিস, কখনো খোলা দেখিনি। ঝিমধরা প্ল্যাটফর্মে, যার অর্ধেকটা জংগলের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে, সেখানে বসে বসে লাইনের গায়ে নুড়ি ছুঁড়ে মারা, ঠং শব্দে কখনো ফুলকি ছিটকে যেতেও দেখেছি বা, আর মালগাড়ি গেলে তার বগি গোনা, ফিসপ্লেট, নাটবল্টূ ও পিস্টনের চাপে ঝনঝন বাজে স্টেশনমাষ্টারের ছোট্ট ঘরের জানালা, চাকাগুলো নুড়িপাথরে দাঁত কামড়ে ধরে, গম্ভীর শবযাত্রার ঢঙে বগিগুলো অনুগমন করে এঞ্জিনের, এবং চলতেই থাকে গুনতে গুণতে হাঁফিয়ে না যাওয়া অবধি। ঘুমের মধ্যে মনে হয় অন্তহীন রাতের রেললাইন ধরে মালগাড়ির বগিগুলো একটার পর একটা চলে যাচ্ছে, আর ঝকমকে আলোর ধীর উত্থান পতন মাথা সেঁধিয়ে দিচ্ছে কালো চাদরের ভেতর। ধড়মড়িয়ে ঘুম ভেঙে দেখি পাশে নিঃসাড়ে মা ও অবোধ পিকু, তাদের ঘুমন্ত ঠোঁটের আরামের নিচে লালাভেজা বালিশ বোকা পিঁপড়ের দলকে লোভ দেখাচ্ছে।
তো, সেদিন আমি দুপুরবেলা ছাদে বসে একমনে আঙ্গুলের চাপে কাঁচের গুলি ছিটকানো প্র্যাকটিস করছিলাম। পিকুর জ্বর বলে তাকে ঘরে শুইয়ে রাখা হয়েছে, আর দুপুর হলে বাড়িটা নির্জন হয়ে যায়, তাই একঘেয়ে লাগছিল। একটা ছাতারে পাখি নিজের মনে ছাদের ওপর ঝুঁকে আসা বিশাল বাদাম গাছের ভেতর লুকিয়ে টি টি ডেকে চলেছে, তখন একটু করে রোদ ধেয়ে এল, আর মা ছাদে উঠে বলল, ‘টুবলু, একটু ঘুরে আসি চল তো !’ কাল ভোরবেলা আমাদের কলকাতা ফিরে যাওয়া। সাদার ওপর কালো বুটি তোলা একটা তাঁতের শাড়ি পরেছিল, অনেক হিমের ভেতর থেকে কিছু অন্ধকার ইতিউতি মাথা তুলছে। বাগানের গেটের শেকল তুলে দিতে দিতে হাসল, ‘যখন ছোট ছিলাম, ডাফরিনপাড়ার গির্জা আর পেছনের মাঠে পিকনিক করতাম খুব। অনেকদিন যাইনি ওদিকে।’
তা, ধরা যাক আমি যদি মায়ের ছাব্বিশ বছরে হয়ে থাকি, তাহলে তখন তার তেত্রিশ চৌত্রিশ তো হবেই। যেতেই পারত, আজকের হিসেবে পরিপূর্ন যুবতী ভাবা, তবুও সময়ের নিজস্ব হিসেব থাকে, দৌড়ের তারতম্য । আজ যে সুস্থির যৌবন ক্লান্ত ভঙ্গীতে চৌত্রিশের মুঠিকে ডিসকাউন্ট দিচ্ছে, তিরিশ বছর আগে সে ছটফটে লাল ঝুঁটি মোরগের মত পিছলে যেত, মহিলা বলতে হত ত্রিশোর্ধ্বাকে। নাকের পাশ থেকে শুরু হওয়া অবধারিত ভাঁজ, দুই একটা পাকা চুল আর ঈষৎ ভারী শরীর, মাত্র তো এই কটা ! তাতেই সতীর পাশে দেবী, অথবা দিদি সম্বোধন ঢোঁক গিলে পিসি উগরে দেওয়া, এভাবেই অভ্যস্ত হয়েছি আমরাও। তবুও মা যে তরুণীই ছিল তা তো সত্যি, তার মাথার ঘনবুনোট থাক চুল কেনই বা জামের পাতলা ত্বক মনে করাবে না? অথবা লাল টুকটুকে ঠোঁট, পান খেত না কিন্তু ! আশেপাশের সকলে মা-কে জানত লাহিড়িবাবুর সুন্দরী মেয়ে হিসেবেই। আর কলকাতায় হলে, বেহালা পাঠকপাড়ার সুন্দরী, কী অসহ্য, মহিলা !
‘ডাফরিনপাড়া কোন দিকে?’
‘হাটের রাস্তায় পড়বে। আসার সময় দেখিসনি? একটা বড় চার্চ, পেছনে ঝাঁটিফুলের মাঠ। আমাদের স্কুলবাড়ি ছিল সেখানে।’
হাঁটতে হাঁটতে উঁচু নিচু পথ ধরে অনেক দূর, তখনও হলুদ রোদ মিঠে উষ্ণতা দিচ্ছিল। একটা বেকারির দোকান থেকে কেক কিনে দিল মা, তার রঙিন কাগজে ফ্রকপরা মেয়ের ছবি, মিষ্টি ফলের গন্ধ সারা মুখে ছড়িয়ে গেল। অবাক হয়ে দেখলাম, সাইকেলে চেপে পিওন বেরিয়েছে বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করতে। ‘পোস্টাপিস তো বন্ধ থাকে।’
‘থাকুক না। তাতে কি চিঠি আসা আটকায়?’
‘তুই ছোটবেলাতে চিঠি পেতিস?’
‘কত ! মিসেস গ্রিনের মেয়ে আমার বন্ধু ছিল। তারপর দশ বছর বয়েসে অস্ট্রেলিয়া চলে যায় বাবা মায়ের সংগে। নিয়ম করে ওখান থেকে পাঠাত চিঠি। কী সুন্দর কাগজ ছিল, খুললে চকলেটের গন্ধ বেরত।’ মা লাফাতে লাফাতে খানাখন্দ পেরিয়ে গেল, শাড়ীটা উঁচু করে কোমরের কাছে বাঁধা, আঁচল গাছকোমর। রাস্তার দুইধার দিয়ে দুজন হাঁটছি, আর মায়ের হাতে একটা ছোট বেতের ডাল, তা দিয়ে দুমদাম ঝোপঝাড়ের গায়ে পেটাচ্ছে। হেঁকে উঠলাম, ‘গাছকে মারিস না। ব্যাথা পাবে।’
‘কে বলল তোকে?’
‘ইশকুলেই তো পড়িয়েছে।’
‘বাজে কথা। গাছেদের ফুর্তি হয়।’
একটা পোড়োবাড়ি চোখে পড়ল। লতাপাতায় ঢাকা, কালো হয়ে উঠছে রঙ। ‘দেখেছিস টুবলু? ছোটবেলা থেকেই এমন হয়ে আছে। ভূত থাকে এখানে।’ ফলসা গাছ অন্ধকার ঝেঁপে এল ভাঙা টালির ওপর, বাগানের জংগলে একটা ছাগল চরছে, আমাদের শব্দ পেয়ে চারপা তুলে লাফিয়ে পাঁচিল টপকে গেল।
‘মামণি?’
‘কী?’
‘হিসু পেয়েছে।’
‘এখানে কর, কেউ দেখবে না।’
লজ্জা লাগল, ‘তুই সরে দাঁড়া।’
হি হি হাসল মা, ‘ওরে বোকারাম ! ভাব দেখো ছেলের !’ ঠোঁটে রহস্য লেগে। যেটুকু গাম্ভীর্য অভিপ্রেত ছিল, তখনো ভাঁড়ারে আসেনি।
কুলগাছের গুঁড়িতে হাত মুছে বেরিয়ে এলাম, হাফপ্যান্টের নিচ থেকে হাঁটু ছড়ে গেছে কাঁটাঝোপে ধাক্কা খেয়ে, কিন্তু মা ফিরে তাকাল না। নিজের মনে বলছে, ‘ছোটবেলায় বাড়িটায় তখনো কারেন্ট ছিল। আমরা কলিংবেল বাজিয়ে পালিয়ে যেতাম, কেউ দরজা খোলেনি।’ সবে আলতা লাগিয়েছে, হাওয়াই চটিতে রক্তের মত দাগ। ধুলেও তুলতে পারবে না, মা। মোড় ঘুরতেই বিশাল গির্জা। থমথমে তার কারুকার্য, ভারী কাঠের বন্ধ দরজার নকশাতে মাতা মেরি, নির্জনতার মধ্যে কাঠপোকা কির কির করে যাচ্ছে । ক্রশের মাথায় কাক বসে। মা ঠোঁট ওলটাল, ‘বিকেলের আগে তালা খোলে না। ফেরার পথে আসব।’
জায়গাটা জনহীন, কাছে পিঠে কয়েকটা বাড়ি। আমরা একটা কাঠের গেটের সামনে দাঁড়ালাম। অল্প বাগান, শীতের সবজি ফলফলাচ্ছে। আম আর লিচুগাছ একদিকে হেলে, ছায়ায় কয়েকটা মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে। একতলা পোড়া ইটরঙের বাড়ি, তার বারান্দায় মন দিয়ে দুটো পাখি খড়কুটো জোগাড় করছিল, উড়ে গেল অচেনা শব্দে। একটা ভাঙা দোলনা, বারান্দায় দুটো চেয়ার, তাদের ভেলভেটের গদিতে ময়লা ছোপ। মা চেঁচিয়ে ডাকল, ‘স্যাম ! স্যামুয়েল!’
‘স্যাম কে?’
‘দাঁড়া না, দেখবি।’
দুই তিনবার ডাকাডাকির পর খুলে গেল দরজা, এক মোটাসোটা মধ্যবয়স্ক মহিলা বেরিয়ে এসে চোখের ওপর হাতের পাতা মেলে বোঝার চেষ্টা করলেন। ‘কে গো?’ কৃষ্ণবর্ণ, শাড়ি কিছুটা অগোছালো, বোঝাই যায় ঘুমোচ্ছিলেন। উচ্চারণে কিছুটা অবাঙালী টান।
মা এগিয়ে গেল, ‘আমি সতী। কিটিদি, চিনতে পারো? অনেককাল পর।’
‘সতী?’ বিভ্রান্ত স্বর।
‘লাহিড়ীদের মেয়ে। স্যামের বন্ধু ছিলাম।’
‘সো-ও-তী !’ বিস্ময়ে মহিলার ভুরু ওপরে উঠে গেল। ‘কতদ্দিন পরে দেখলাম তোকে ! কোথায় থাকিস? কলকাতায় তো? কতকাল আসিস না তোরা !’ বলতে বলতে আমার দিকে তাকালেন, ‘তোর ছেলে তো? পুরো তোর মুখ কেটে বসানো রে !’
‘গুবলু, নাম বল। তোর কিটিপিসি।’
আমার হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে এল কিটিপিসি। ‘কী সুন্দর হয়েছ তুমি ! আগে তো দেখিনি কখনো। তুমি জ্যাম ভালোবাসো গুবলু? তোমার জন্য জ্যাম আর স্ক্র্যাম্বলড এগ আনি দাঁড়াও।’
‘বসো তো ! একটু গল্প করি। স্যাম নেই?’
‘আছে তো। ঘুমোচ্ছে। তোকে দেখে যা অবাক হবে না !’ কিটিপিসি বকেই চলেছে। বাগানের মুরগিদের মত হেলে দুলে ঘরে ঢুকছে আর বেরচ্ছে, মুখে ফ্যালফ্যালে খুশি। মা আমার দিকে তাকিয়ে অনিশ্চিত হাসল। তখন বেরিয়ে এল একটা লোক, যার গায়ের রঙ আব্লুশ কাঠের মত চকচকে কালো। মায়েরই বয়েসি, বা একটু বড়। লোকটা ছয়ফুটের ওপর লম্বা, পেটানো চেহারা। কোঁকড়া চুল থেকে অনাঘ্রাত সুবাস আসছে, চোখদুটো নরম। বড় বড় পাতা ছিল, মনে আছে এখনো। পাজামার ওপর শার্ট পরেছিল, হাসল তখন, আর চোখ পর্যন্ত কোঁচকানো চাদরের মত হাসির ভাঁজ ছড়িয়ে গেল, ‘সতী, কেমন আছ? অনেকদিন পর দেখা হল’।
‘কিন্তু তুমি পাল্টাওনি এতদিনেও। এখনও দুপুরবেলা পড়ে পড়ে ঘুমাও।’ হাসল মা-ও।
‘আর বলিস না, কী যে বাজে স্বভাব ধরেছে ওর ! রেডিও চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মর্নিং স্কুলটাই কাল হয়েছে, বুঝলি? দুপুরের মধ্যে ফিরে এসে একপেট ভাত খেয়ে ভোঁসভোঁস করে ঘুমাবে।’ কলকলিয়ে উঠল কিটিপিসি, ‘রবিবারের মাসেও যায় না। সকাল থেকে আলস্যি। দেখ না কেমন বিশ্রী ভুঁড়ি বাগিয়েছে।’
‘ওহ দিদি, থামো না ! সতীকে কফি দাও, আমাকেও দিও।’ আমার দিকে ফিরল এবার, ‘আর এই যে, তোমার নাম কী? কী খাবে বলো। আমি তোমার স্যাম আংকেল। শুধু স্যাম বলেও ডাকতে পারো।’
‘ওগুলো এখানে থাকে?’ মুরগিদের দিকে আঙুল তুললাম।
‘থাকে তো ! ওদের বাচ্চাকাচ্চা দাদু দিদা সবাই মিলে। যাও না, গিয়ে ভাব করে আসো। কিচ্ছু বলবে না, খুব নিরীহ।’
অতঃপর একলাফে গাছের নিচে, আর আমাকে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে কঁকর কঁ শব্দে মুরগিগুলো এদিক ওদিক ছিটকে গেল। তখন দূর পাহাড়ের ঢালে ঢালে শস্য সব সবুজ থেকে হালকা হলুদ, গাঢ় হলুদ থেকে সোনালি রং ধরেছে, পিঁপড়ের মত এদিক সেদিক মানুষের চলাচল বেশ দেখতে পাচ্ছিলাম। বাজরা ও ধান কাটার ভিড়। আমগাছের ছায়া শীতল, এখানে মাদুর বিছিয়ে ঘুমিয়ে নেওয়া যেত। পেছনের পাঁচিল পড়ে গেছে, জায়গাটায় বুনোঝোপের বেড়া। একপাশে মুরগির ঘর, কয়েকটা ছানাপোনা অন্ধকার থেকে ভ্যাবলা চোখে তাকিয়ে। পেছন থেকে স্যাম চেঁচাল, “ওদের গায়ে তা বলে হাত দিতে যেও না। ঠোক্কর মারবে।’
পিছু না ফিরেও বুঝলাম, মা আর স্যাম পাশাপাশি বসেছে বারান্দার চেয়ারে। নিঃশব্দ হাসিকে ছোঁয়া যায়, আমার পিঠ ঘেঁসে বয়ে যাচ্ছিল কুলকুল। মা বলল, ‘সত্যিই তুমি মোটা হয়েছ।’
‘বাদ দাও ওসব। তোমার হাজব্যান্ড এলেন না?’
‘তার ডাক্তারিতে তো ছুটি মেলাই ভার। তুমি এখনো ক্যাম্বেলদের স্কুলেই পড়াচ্ছ?’
‘আবার কী ! সুখের চাকরি। ছেলেপুলেও ভাল। খুব বেশি কাজের চাপ নেই।’
‘কী অলস তুমি !’
এবারে স্যাম শব্দ করে হাসল, ‘তুমিও পাল্টাওনি সতী। কিচ্ছু না।’
‘মনে আছে, শেষবার দেখা হল, আমার বিয়ের পরপরেই। তুমি কলকাতায় কার একটা চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলে।’
‘হ্যাঁ, স্কুলের এক টিচার। স্যাড, বাঁচলেন না। তাও তো বছর দশেক হয়েই গেল, না?’
‘তারপর আর যোগাযোগ রাখোনি। কেন?’
উত্তর এল না এবার। আমি নিবিষ্ট ঝুঁকে মুরগিদের দিকে দানা ছুঁড়ে দিচ্ছি, তারা সাহস পেয়ে পালক ফোলাচ্ছে আবার। তখন আলো মরে এল, গোলাপের আকার নিয়ে সূর্য এবার পাহাড়ের এক চুড়ো থেকে অন্য মাথায় লাফাতে লাফাতে ছুটবে। আর ছিল ফুলের কারুকার্য, সামান্য ঝড়ে গোটা বাগান মৃত পাপড়িতে ভরে যাবার ক্ষমতা রাখে। বাড়ির একপাশের দেওয়াল, বাইরের দিকে তাও, শ্যাওলা জমেছে, কিন্তু ওপরে ঝুলছে চকচকে ক্রশ। তার ঝিলিক চোখে ধাক্কা মারে। নিচে সুন্দর হস্তাক্ষরে গোটা গোটা ‘জগতের পিতা’। আরও কিছু ছিল, যা লুপ্ত। বিকেলের মালগাড়ি যাচ্ছে, তার গম্ভীর ইঞ্জিনের পিছনে শবানুগমন করছে বগির দল, বহুদূর থেকে আর্ত হাহাকার ভেসে আসে। মনে হয়, আদিম রোদছবি ভেঙে পড়বে ধকধক উত্থানপতনে। বাগান কাঁপতে ভালবাসে, তবু পেছনের বারান্দা নিশ্চল।
‘কলেজের দিনগুলো থেকেই তোমাকে বলেছি, কলকাতা এসো।’ মা আবার বলল। ‘অনেক সুযোগ এখানে।’
‘তুমি আবার কবে থেকে এত সুযোগসন্ধানী হলে !’ স্যামের স্বর কোমল ফ্রুটকেকের মত।
অনেকটা সময় কেটে গেল, অন্তর্বর্তী শূন্যতাকে টুকরো টুকরো কথার গুঁড়ো বুনতে পারছিল না। খাপছাড়া শব্দের সোয়েটার বাগান জুড়ে ছড়িয়ে আছে, তার ফাঁকফোকর জুড়ে নৈঃশব্দ। নিজের মনে বকবক করতে করতে কিটিপিসি কফি নিয়ে এল, আমার জন্য জ্যাম, গরম টাটকা ব্রেড। মুরগির দল মাথা নিচু ঢুকে গেল ঘরের ভেতর, হালকা কুয়াশা। কয়েকটা মিটমিটে আলো জ্বলছে কাছে দূরে, সন্ধে অস্তগামী। মা আর স্যাম কথা থামিয়ে চুপচাপ বসে, আর বারান্দার হলুদ বাল্বের আলো ঘিরে পোকাদের দল ভিড় জমাচ্ছে। মায়ের ঠোঁট স্থির, তবু চূর্ণ হবার আগের মুহূর্ত অবধি ফুলে ওঠা জলস্তম্ভের মত শব্দের ভিড় চরাচরে ভেঙে পড়তে চায়।
স্যাম বলল, ‘ওয়াইন খাও সতী।’
‘কী সর্বনাশ’, আঁতকে উঠল মা, ‘ওসব চলে না !’
‘তা বললে হয়? শুধু কফিতে মানায় না। আজ তো আমাদের উৎসব !’ স্যাম অনাবিল হাসল। কিটিপিসি খুশিতে ফেটে পড়তে চায়, ‘কতদিন বাদে কেউ এল এ বাড়িতে। হ্যাঁ রে স্যাম, পুরনো ইতালিয়ান মদটা বার করবি?’
‘আমি খাই না যে ! মাথা ঘোরে যদি?’ মা বিব্রতভাবে হাসল।
‘কেন, আগে তো কয়েকবার খেয়েছ বেশ, এ বাড়িতেই ! মনে আছে, ক্যারলের পর আমরা সবাই মিলে?’
‘বয়েস হয়েছে স্যাম। এক বাচ্চার মা আমি।’ মায়ের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না, আবছায়াতে ঢাকা। চকচকে ক্রশের নিচে ‘জগতের পিতা’ খড়খড়ে অক্ষরমালার বেশি কিছু লাগে না, তাকে স্পর্শ করলে সমূল নিষেধের অববাহিকা যেভাবে শিরদাঁড়ার শেকড় পর্যন্ত চারিয়ে যায়, সেই স্রোত অর্থহীন মনে হয়।
কিটিপিসি ঘর থেকে বোতল আর গ্লাস নিয়ে এল। আমি ভেবলে গেলাম, ‘মামণি, তুই খাবি?’ জানতাম, খারাপ লোকেরা এগুলো খায়।
স্যাম আমার মাথার চুল ঘেঁটে দিল, ‘তোমার জন্য খুব ভাল চকলেট আছে। দিচ্ছি দাঁড়াও।’
গ্লাস হাতে ইতস্তত করে মা চুমুক দিল। এক, দুই, নামিয়ে রেখে আবার তুলে, নিশ্চিত তিন। শ্বাস ফেলে স্যামের দিকে তাকাল চোখ বড় করে। স্যাম ঘাড় কাত করে একদৃষ্টে দেখছে। কিটিপিসি গ্লাস শেষ করে আলুথালু হাসল, ‘আবার সেরকম ক্যারল হবে রে সতী? আগেকার মত?’
‘কী যে বলো না ! আমাদের কি সে বয়েস আছে?’
পরের গ্লাস শেষ করার আগেই কিটিপিসি কাঁদতে শুরু করল, ‘কেউ আসে না। সবাই চলে গেল, ফেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কীরকম খাঁ খাঁ লাগে, তোরা বুঝবি না কেউ।’ থেমে থেমে, মাতালের ফোঁপানি, আমি এককোণায় মন দিয়ে চকলেট খাচ্ছিলাম, কান্না স্পর্শ করছিল না। দেখলাম, মা আর স্যাম একে অপরের দিকে তাকিয়ে। দুজনের হাতে আধখালি গ্লাস, এবং দুজনেরই আঙুল প্রবলভাবে ঠাণ্ডা কাঁচের গায়ে চেপে বসেছে। তবুও চুমুক দিচ্ছে না, হিম কাঁচকে জাপটে ধরতে চায় অঞ্জলিবদ্ধ আঙুল। স্যামের কালো মুখ প্রশান্ত, গিলোটিনে কাটা মুণ্ডু লাফিয়ে উঠে স্থির হয়ে যাবার আগে একলহমা তাকিয়ে দেখে তার বিচ্ছিন্ন ধড়কে, সেরকম নিশ্চল, বাঙময় তবু। কিটিপিসি ফোঁপাচ্ছে, ‘আমার আবার টার্কি রোস্ট করতে ইচ্ছে করে ! তুই আর স্যাম দুপাশে, আমাকে জড়িয়ে ধরে নাচছিস, চার্চ থেকে বড়দিনের ঘণ্টা বাজছে, আর তোরা জোর করে নিজেদের গ্লাস থেকে ওয়াইন খাইয়ে দিচ্ছিস আমাকে। আবার কবে হবে রে এমন?’
বেশ খানিকটা সময় পর, যখন অন্ধকার জেঁকে বসেছে, মা নিঃশ্বাস ফেলল, ‘যেতে হবে এবার।’
‘পৌঁছে দিই চলো।’
‘আজ থাক’, মাথা নাড়ল মা। স্যাম জোর করল না।
‘আবার আসবি তো?’ কিটিপিসি আমার হাত আঁকড়ে ধরল। মা উত্তর দিল না।
অন্ধকার রাস্তার দুপাশে জোনাকির দল উড়ছে। কুয়াশার সর আমার গালে মাখামাখি। বাজরা ঝরে গেলে শীতের পাহাড় শূন্য হয়, দেখে ভয় লাগে, মনে পড়ে না আরেকটু এগিয়ে হাটের রাস্তা। চার্চে যাবার কথা ছিল ফেরার পথে, হল না। কিছুটা রাস্তা কিটিপিসি এসেছিল বকবক করতে করতে, মা তারপর ফেরত পাঠায়। পেছন ফিরে দেখেছিলাম, বারান্দায় হলুদ বাল্ব ঘিরে পোকাদের ভিড়, স্যাম দাঁড়িয়ে তার নিচে, আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মা অসম্ভব চুপচাপ। কিটিপিসি পুরনো অ্যালবাম খুলে ছবি দেখিয়েছিল। স্কার্ট পরা মা-কে চেনাই যেত না, যদি না পানপাতার মত ঘন চুলের থাক খুঁজে পেতাম। তখন আবার হিসি পেল। মা-কে সেকথা বলতে, দাঁড়িয়ে পড়ে হেসে চুল ঘেঁটে দিল আমার।
মা নিষেধ করেনি, কিন্তু কেন জানি না আমি বুঝেছিলাম, আজকের দিনটার কথা কাউকে বলা যাবে না। বাবাকে নয়, দাদুকে নয়, কাউকে নয়। আরও দুইবার এই টাউনে এসেছি, তারপর মামারা বাড়ি বিক্রি করে পাট গুটিয়ে কলকাতা চলে আসে। স্যামদের সংগে দেখা হয়নি, ওই একদিনের পর। মা কখনো এ প্রসঙ্গ তোলেনি। আমিও বলিনি কাউকে। অবশেষে মা বুড়ো হয়েছে, কুঁচকেছে গালের চামড়া, সুচে সুতো পরাতে গেলে চশমা লেগেছে। কোনও এক খাপছাড়া সোয়েটারে ‘জগতের পিতা’ লিখে বাগানময় মেলে দেবার বাসনা তার মধ্যে দেখিনি।
তবু, কাউকে কখনো না বললেও, আমি ভুলতে পারিনি। হিম গ্লাসের কাঁচে আঙুল জড়ো করে মুখোমুখি স্যাম আর সতী বসেছিল। অন্ধকারে মাথা নিচু মুরগির দল ঘরে ফিরেছিল যখন, কোলাহল নিভে গিয়েছিল। নক্ষত্রহারা, গ্রহহীন আকাশের নিচে আমাদের আদিকবিতার প্রথম বাক্য ‘না’ দিয়ে শুরু হয়েছিল।

One thought on “শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের গল্প : বাগান ও দেবদূত বিষয়ক

  • July 17, 2022 at 4:56 am
    Permalink

    আশ্চর্য আখ্যান। বিষাদের রং গোধূলির কমলা থেকে সন্ধ্যার বেগুনীর দিকে গড়িয়ে গিয়ে গল্পটিকে ঘিরে রাখল, আখ্যানের পরিধি আবছা ও মায়াময় আগাগোড়া।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *