রিপন হালদার ‘এর গল্প : গার্ড

সোমবার। এপ্রিলের ঠিক এক তারিখে কাজে যোগ দিল বিমল। সানরাইজ সিকিউরিটি সার্ভিস অফিসের ছোট্ট এই ঘরটায় বাইরের আলো বাতাস কিছুই ঢোকে না। পুরনো একটা সিলিং ফ্যান বহু কষ্টে ঘুরিয়ে চলেছে তার ডানা তিনটি। বিয়ারিঙের করুন আর্তনাদ বোধ হয় অফিসের কারো কানেই কোন বেদনা উদ্রেক করে না।

যাই হোক। তিন হাজার পঁচিশ টাকা জমা রেখে বিমল চাকরিটা পেল। কিসব সিকিউরিটি মানি না কিসের জন্য নিল টাকাটা। মধ্যবয়স্ক একজন ভদ্রলোক টেবিলের ওপাশে বসে আছেন। বুকের দিকে দুটো বোতাম খোলা। সেখানে পশমে আচ্ছাদিত এক সাদা-কালো ঘাস জমি।

ঘাড়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন- “জানেন তো! শিফটিং ডিউটি। দশ ঘন্টা করে। কখনো বারো ঘন্টাও হয়ে যেতে পারে। টাইম ডিপেন্ড করবে পরের জন আসার উপর।“

– “হ্যাঁ জানি। গম্ভীর ভাবে জানায় বিমল।

-“ভেরি গুড। আপনি আজ থেকেই জয়েন করুন তাহলে! এই নিন ঠিকানা! মালতীবালা গার্লস হোস্টেল। এখান থেকে বেশি দূরে নয়। সামনের অটো স্ট্যান্ডে গিয়ে বললেই নিয়ে যাবে। আর হ্যাঁ! ইউনিফর্ম ছাড়া কখনই ডিউটি করবেন না! সঙ্গে নিয়েছেন তো প্যাকেটটা! বাদবাকি ডিটেইলস হোস্টেলের অফিসার আপনাকে বুঝিয়ে দেবে। ওকে, কাজে লেগে পড়ুন! গুড ডে।“

এতক্ষণ অফিসের সব কিছু, মানে আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দেয়ালের ক্যালেন্ডার, সব কিছু কি সাদা-কালো ছিল! নাকি, সাদা-কালো পোশাক পরা অফিসারটি ছাড়া বিমল অন্যদিকে নজরই দেয় নি! পাখার রঙ! হ্যাঁ, মনে পড়েছে। পাখার রঙ সাদাই ছিল। দেয়াল! তাও সাদা ছিল! কিন্তু বাড়ি থেকে ও যে কালো রঙের প্যান্ট আর নীল রঙের জামা পরেছিল! অফিসের ভিতরে লক্ষ্য করেনি ও কোন রঙ পালটানোর দরকার ছিল কি না!

সমস্যা হচ্ছে এখন। হলুদ-সবুজ অটোটার রঙ ওর একদম ভালো লাগছে না। কোনো ব্যাপার না। বিমল পালটে দিল রঙ। হলদের জায়গায় চকলেট আর সবুজকে করে দিল কমলা। বাহ্‌! বেশ মানিয়েছে। রাস্তাটা কালোতেই ভালো মানাচ্ছে। কিন্তু দুই পাশের বর্ডারগুলো সাদা রঙে একদম মানাচ্ছে না। ওটা পালটে বিমল গেরুয়া করে দিল। রাস্তার দুই পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে দু-একটা গাছ পাস করছে। প্রথমগুলো ভালো করে লক্ষ্য করে নি। পরের গুলো এলে দেখবে ভালো করে। পছন্দ না হলে পালটে দেবে রঙ।

সুরজ তিওয়ারি। বিহারী ছেলে। বিমলকে আর সমস্ত ডিটেইলস বুঝিয়ে দিল। এখন বাজে সকাল দশটা। তার মানে বিমলের ছুটি হবে রাত আটটায়। -“ কিন্তু এতক্ষণ কি শুধু দাঁড়িয়েই থাকতে হবে?” ভয়ে ভয়ে প্রশ্নটা করেই ফেলল বিমল। -“ তো ক্যা! আপকা থোবরা দিখাইকে তংখা মিলেগা?” সুরজের গলায় তাচ্ছিল্যের সুর। দমে যায় বিমল। তোয়ালেটা বেড় দিয়ে নিজের পোশাক খুলে পরে নিল ইউনিফর্ম। জলপাই রঙের প্যান্ট শার্ট। রংটা ভালো লাগল বিমলের। তাহলে এটা আর পাল্টানোর দরকার নেই!

প্রথম দিন তো! তাই কেমন লজ্জা লজ্জা করছে। মাথায় টুপি আর জলপাই রঙের ইউনিফর্ম পরে ও যেন যুদ্ধে নেমেছে। বাড়িতে একটা ফোন করে দেয়। কিন্তু না। গার্ডের চাকরির কথা বলেনি। বললে ওর বাবা হয়ত করতে দিতেন না। হালিসহরের হুকুমচাঁদ জুট মিলে ওর বাবার এখনও দুই বছর চাকরি বাকি আছে। পার্মানেন্ট লেবার। তাই রিটায়ারের পর খারাপ কিছু পাবেন না। কিন্তু না। সব টাকা হাতে পাবেন না। মেয়ের বিয়ের জন্য মোটা টাকা লোন নিতে হয়েছিল। এখনো অনেক টাকা বাকি। সেগুলো বাদ যাবে। কিন্ত ছয় মাস ধরে কারখানার আবস্থা নিভু নিভু। এই খোলে, এই বন্ধ হয়। তা সত্ত্বেও ছেলেকে তিনি সাধারণ কোন কাজে দেখতে চান না। বিমলের মা বছর খানেক আগে ক্যান্সারে মারা যাবার পর প্রায় নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল ওদের পরিবার। বিমল বাধ্য হয়েই কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস বাঙ্ক করে চাকরি খুঁজতে বেরিয়েছিল।

কে দেবে ওকে চাকরি! কম্পিউটার জ্ঞান সামান্য। টাইপিং স্পিডও নেই। ইংরেজিতে কথা বলাটাও সেভাবে আয়ত্তে আসে নি। তাহলে কর্পোরেট সেক্টর নামের এই এই কঠিন রূপালি জগতে ও কী করে ঢুকবে!

মায়ের মুখাগ্নি করতে করতে ও ভেবেছিল- ক্যান্সারের জীবানু দেখতে কেমন! অনু হলেও ওরাও তো জীব! তাহলে ওর মায়ের জীবনের সঙ্গে ওদের কিসের দ্বন্দ্ব! এভাবে ফাঁপা করে দিল সব কিছু! আচ্ছা, পালটে দেওয়া যায় না ওদের রং! কিন্তু রঙ পাল্টালেও ওদের কার্যপ্রণালী কীভাবে পালটাবে!

আটটায় ছুটির পর বিমল শান্তিপুর লোকালে বাড়ি ফিরছে। প্রচন্ড ভিড়। বসা তো দূরের কথা, দাঁড়ানো পর্যন্ত যাচ্ছে না। একটা বস্তায় আলু ঢোকানোর হয়ত পরিমাণ বা ওজন আছে। কিন্তু এখানে কৌশলে তা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। একের পর এক স্টেশন আসে আর রাশি রাশি পতঙ্গের মত ঢুকতে থাকে মানুষ। এর মধ্যেও বিমল কিন্তু ওর উদ্দেশ্য ভুলে যায় না। রঙ পাল্টানোর খেলাটা চালিয়েই যেতে থাকে। ট্রেনের ভিতরের বিবর্ণ ময়লা রংকে ও নীল করে দিল। কিছু মানুষের পোশাকের রঙ করে দিল সবুজ। কিছু হলুদ। কারোর বা কমলা। পোশাকের একেক অংশ একেক রকম রঙে ছোপিয়ে দিতে থাকল। নস্যি রঙ লেপে দিল কয়েকটি মেয়ের জিন্সে। টপ করল সাদা অথবা আকাশী। কারো কারো চুলে আবার কয়েকটা জোনাকি রঙের ক্লিপও বসিয়ে দিল। নিভছে, জ্বলছে।

অপূর্ব মায়াবি এক জগত বিমল এখন রচনা করে ফেলেছে। যেন একুয়ারিয়াম। স্বপ্নের দেশ। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়ল বিমল। হাত দুটো দিয়ে ঊপর দিকে ধরে রেখেছে দুটো লোহার হাতল। যেন ক্রুশবিদ্ধ যিশু। মাথাটা নুইয়ে পড়েছে নিচের দিকে।

নৈহাটি এসে ঘুম ভাঙল। এখানে মিনিট তিনেক দাঁড়ায় ট্রেনটা। স্টেশনে নেমে এক ভাড় চা কিনল। লাল চা। এই রঙটা আর পালটালো না।

চাকরির খুশিতে বিমলের বাবা ডগোমগো। টিভিতে চলতে থাকা অমিতাভ সংলাপের ভলিউম দিলেন বাড়িয়ে। -“তেরে পাস ক্যা হ্যায়, হাহ্‌!”

–“মেরে পাস মা হ্যায়।“ বিমল এক পলকেই শশী কাপুরের পোশাকটা জলপাই রঙের করে দিল। মাথায় লাগালো টুপি।

পরদিন আবার মালতীবালা গার্লস হোস্টেলের গেট। গার্ডের পোশাকে বিমল দাঁড়িয়ে। একদম সোজা ভাবে। মেয়েরা বেরিয়ে যাচ্ছে। পাশেই আর্ট কলেজ। মেয়েদের পোশাকের রঙ ও ইচ্ছে মত পালটে নিতে থাকে।

তারপর দূর থেকে দেখতে পায় আর্ট কলেজের মেইন গেট। কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় ঢাকা রাস্তার উপর লাল ফুলগুলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে।

এক ঝলক মেঘ হঠাৎ কালো হয়ে আসছিল। বিমল সাদা করে দিল। মাঠের সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে একটি মেয়ে এগিয়ে আসছিল হোস্টেলের দিকে। পিছনে মেঘমুক্ত আকাশের নীল ক্যানভাস। মনে মনে এডিট করে বিমল জিন্সের রঙ করলো ডেনিম আর টপ হলুদ। রঙ দুটোর প্রবল আগ্রাসন বিমলকে ঝাপটা মেরে গেট দিয়ে ঢুকে গেল।

একমাস পর। রাত প্রায় একটার সময় বিমল ওর আঁকার ঘরে। আলমারীতে টুলের ঊপর দাঁড়িয়ে সবুজ রঙের টিউবটা খুঁজছিল। পেল অবশেষে। ক্যানভাসে আঁকা গার্ডটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সবুজ মাঠের উপর দিয়ে আগত মেয়েটিতে থাকল ডেনিম-হলুদের কন্ট্রাস্ট। পিছনে আকাশ ঘন নীল। একটু দূরে আর্ট কলেজ। সামনে পিচরাস্তা। ছায়া। ডার্ক। তার উপর চুঁইয়ে পড়া কৃষ্ণচুড়ার লাল। থাকল।

সকালে বাড়ির মেইল বক্সে একটা গেরুয়া খাম। জলের বোতল আর খামটাকে বাঁ হাতে ধরে বারমুডা, সাদা টি-শার্ট আর চপ্পল পায়ে দেহের পিছনটা আঁকার ঘরের দরজা পেরোল। অনেকটা জল মুখে ঢালার পর খামটার মুখ ছিঁড়ে বের হলো একটা চেক। সানরাইজ সিকিউরিটি সার্ভিস অফিসের। লেখা- নয় হাজার পঁচিশ টাকা।

কী যেন ভেবে বিমল ক্যানভাসে আঁকা গার্ডটাকে গাছ করে দিল। এবার দেখল চেকে টাকার অংকটা যেন পালটে গেল।

তার মানে, আগে কী ভুল দেখেছিল! এখন সেখানে লেখা আছে – তিন হাজার পঁচিশ টাকা!

লেখক পরিচিতি
রিপন হালদার
জন্ম স্থান- পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
জন্ম সাল- ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ
বাসস্থান- গয়েশপুর পৌরসভা, থানা- কল্যাণী, জেলা- নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
পেশা- গৃহ শিক্ষকতা
লেখালেখি- কবিতা, গল্প
পত্রিকা- কবি সম্মেলন, মধ্যবর্তী, নতুন কবিতা, বৈখরী ভাষ্য, শব্দযান, বৃষ্টিদিন, বাক্‌ ওয়েবজিন ইত্যাদি।
প্রকাশিত গ্রন্থ- “বৃষ্টির কথা হচ্ছে” (কবিতা, ২০১৪)

ই-মেইল – mathurajhil12@gmail.com

5 thoughts on “রিপন হালদার ‘এর গল্প : গার্ড

  • December 16, 2016 at 3:13 am
    Permalink

    এই প্রথম তোমার গল্প পড়লাম, রিপনদা। অসাধারণ এই রঙ পাল্টানোর খেলাটা ..
    শেষটা রঙ যেন ধূসর

    Reply
  • December 16, 2016 at 6:43 am
    Permalink

    বাহ্‍ রিপন। দারুণ লিখেছ। এর মধ্যেও তোমার কবিতা লুকিয়ে আছে। মুগ্ধতা জানিয়ে রাখলাম।

    Reply
  • December 16, 2016 at 4:36 pm
    Permalink

    দারুন।।।

    Reply
  • December 22, 2016 at 7:21 am
    Permalink

    Durdanto ekta rongin lekha.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *