দীপেন ভট্টাচার্য’এর গল্প : বেলা ও রেশমী

আমার পেছনে একটা পাহাড়, খুব উঁচু নয়, সেখানে একটা গুহা। আমি কি সেই গুহা থেকে বের হয়েছি? মনে করতে পারি না। মাথার ভেতর মনে হয় ধোঁয়া উড়ছে। আকাশ এখনো কালো, শুধু একদিকে দিগন্তে ঘেঁষে অল্প আলো আছে মনে হল। ভোর হচ্ছে? বাতাস বইছে, খুব ঠাণ্ডা না, শরতের শেষ রাতে যেরকম ঠাণ্ডা পড়ে। সামনে উঁচু নিচু বিস্তৃত মরুভূমি, বালির মরুভূমি নয়, রুক্ষ মাটি, তাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে উদ্ভিদ।
অল্প আলোয় দেখলাম দূরে, দিগন্তের প্রান্তে একটা ধুলোর রেখা, মাটি থেকে আকাশে উঠছে। ধুলোর নিচে কিছু একটা নড়ছে, আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। কী হতে পারে সেটা? চোখ কুঁচকে ভালোভাবে দেখতে গিয়ে মাথা ঘোরে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না, মাটিতে বসে পড়ি। শরীরটাও বেশ ভারি লাগে। তখনই খেয়াল করি আমার জলপাই রঙের পোষাকটি, বুকপকেট যেখানে থাকে সেখানে একটা স্টিকার, কিন্তু নিচু হয়ে সেটা পড়তে পারলাম না, যে অক্ষরে লেখা সেগুলো আমার অজানা। আমার জানার কথা এই অক্ষরগুলো, তাই না? ভাবি আমি। আমার অতীতকে যেমন মনে করতে পারছি না, সেরকম এই অক্ষরগুলোও বিস্মৃত হয়েছি। শেষ কবে খেয়েছি মনে করতে চাইলাম।
ধুলোর রেখাটা আরো এগিয়ে আসে, সাথে একটা শব্দ হতে থাকে। এই শব্দটা আমার পরিচিত, কী হতে পারে সেটা? মাটিতে বসেই দেখি ধুলোর নিচে একটা জীব বেশ গতিতে এগিয়ে আসছে, সেই জীবের পিঠে মন হল আর একটি জীব। আমার কি এখান থেকে পালানো দরকার? দাঁড়িয়ে উঠে দেখতে চাই কী এগিয়ে আসছে। হঠাৎ মনে পড়ল অনেক কিছু। জীবদুটিকে চিনলাম, একটি ঘোড়া ও তার ওপর একজন মানুষ সওয়ারী। এখানে কী ঘোড়া আর ঘোড়সওয়ার থাকার কথা? এই চিত্রটা কেন জানি মিলছে না, কিন্তু কেন মিলছে না সেটার ব্যাখ্যাও নিজের কাছে দিতে পারলাম না।
আমার কী এখন ভয় পাওয়া উচিত? গুহার মধ্যে আবার ঢুকে যাওয়া উচিত? কিন্তু সেখানেই বা কী আছে? নাকি পেছনের পাহাড়টা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করব, কিন্তু বসে থাকা থেকে দাঁড়াতেই শরীরতা গুলিয়ে উঠল। বুঝলাম এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে আমার এই ঘোড়া আর ঘোড়সওয়ারের সম্মুখীন হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ভাবতেই ঘোড়া আমার সামনে উপস্থিত। এমন রঙের ঘোড়া কখনো দেখিনি, এক ধরণের হাল্কা বেগুনি। স্ফীত নাসারন্ধ্র, লম্বা মুখমণ্ডলের ওপরে কালো মায়াবী দুটি চোখ, চোখ দুটির মধ্যে সাদা তিলক, ঘাড়ে গাঢ় কালো কেশর, সুগঠিত গলার নিচে সবল মাংসপেশী। চারটি পা নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত সাদা লোমে ঢাকা যেন সাদা মোজা পরা। ঘোড়সওয়ার একজন নারী, তার বয়স চল্লিশ হতে পারে, কালো চুল কাঁধের দু-পাশে ছড়ানো, এত দূর থেকেও তীক্ষ্ণ নাকের দুপাশে উজ্জ্বল কালো চোখের মণি আমার দৃষ্টি এড়ালো না। হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ছড়ানো একটা স্কার্ট, সেই সাদা স্কার্ট লাল নীল ফুলের নক্সায় ভরা।
সেই নারী ঘোড়া থেকে অনায়াসে নামে। 
ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়েই বলে, “আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
মরুভুমির বাতাস তার দৃঢ় উচ্চারণকে অস্পষ্ট করতে পারল না, বরং মনে হল ওই শব্দগুলোকে বিশেষ অর্থ দিল।
আশ্চর্য যে হলাম তা বলাই বাহুল্য, বললাম, “আপনি আমাকে চেনেন?”
নারী স্মিত হাসে, বলে, “আপনাকে কে না চেনে! সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আমাদের যেতে হবে।”
যেতে হবে? কোথায় যেতে হবে?
সে বলল, “আপনার কাছে অনেক কিছুই এখন বোধগম্য হবে না। এর জন্য সময় দিতে হবে। এখন আমার পেছনে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ুন।”
ঘোড়ার পিঠে উঠব, আমি কোনোদিন ঘোড়ায় চড়ি নি, এ’টুকু মনে করতে পারলাম। হাতির পিঠে চড়েছি, উটের পিঠেও, কিন্তু ঘোড়ায় চড়ি নি। কিন্তু কোথায় হাতি বা উটে চড়েছি মনে করতে পারলাম না। “আমরা মোটর গাড়ি পাঠাতে পারতাম,” নারী বলে, “কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানী থেকে আমরা দূরে থাকতে চাই। গ্রহের জন্য সেটা ভাল নয় তা তো জানেনই। উড়ন্ত যন্ত্রও পাঠানো যেত, কিন্তু একেবারে জরুরী জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন না হলে সেগুলো আমরা ব্যবহার করি না। তবে এগুলোর কোনোটাই কিন্তু ঘোড়া নিয়ে আসার কারণ নয়, আসল কারণটি আজই পরে জানবেন। এখন আপনি যদি ঘোড়ায় উঠতে জোড়ালোভাবে আপত্তি করেন তবে উড়ন্ত যন্ত্র আনা ছাড়া আমাদের উপায় থাকবে না।”
উড়ন্ত যন্ত্র? বিমানের কথা বলছে সে, বিমানকে বহু আগে মানুষ ‘উড়ন্ত যন্ত্র’ বলত।“এই ঘোড়াটি আমার খুব প্রিয়,” সে বলতে থাকে, “দেড় বছর মাত্র বয়স, নাম রেশমী। অনেকে বলে নামটা খুব পুরোনো, কিন্তু আমার এটাই পছন্দ।” এই বলে নারী ডান হাত দিয়ে রেশমীর বুকের পাশে স্নেহভরে হাত বোলায়, মরুভূমির বাতাসে তার চুল উড়তে থাকে, রোদে-পোড়া বাদামী মুখে ধুলোমাটি এসে লাগে।
নারীটির বাঁ হাতের অনামিকায় একটা নীল পাথরের আংটি। রোদ না থাকলেও সেটি ঝলকায়, সেই ঝলকানিতে আমার অনেক কিছু মনে পড়ে। এটা আমার সময় নয়।“আপনি পেছনে উঠে পড়ুন।”
আমি ধীর পায়ে ঘোড়াটির দিকে এগোলাম, হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল, টাল সামলাতে পারছিলাম না। মাটিতে পড়ে যাবার আগে সে আমাকে ধরে ফেলল। তার এক হাতে একটা ফ্লাস্ক, আমার হাতে দিয়ে বলল, “এটা খেয়ে নিন।”
যন্ত্রচালিতর মত ফ্লাস্কটা তুলে আমার মুখ খুললাম, মনে হল ফ্লাস্কের ভেতরের তরল স্বতঃউৎসারিত হয়ে আমার মুখে ও গলায় চালিত হল। সেটির ঠাণ্ডা স্পর্শ কন্ঠনালী বেয়ে পাকস্থলী পর্যন্ত পৌঁছাল এবং যাদুর মত কাজ করল, মুহূর্তের মধ্যেই বল ফিরে পেলাম। আশ্চর্য হয়ে তাকালাম আমার উদ্ধারকর্ত্রীর দিকে, সে মৃদু হাসল। দেখলাম তার থুতনিতে একটা টোল, আর হাসলে গালে আর একটা টোল পড়ে। সে বলল, “আমার নাম বেলা, আপনি কি আপনার নাম জানেন?”
অনেকটা অচেতনভাবেই আমার জামার পকেটের দিকে তাকাই, যে লেখাটা একটু আগে পড়তে পারছিলাম না, এখন সেটা পড়তে পারি। লেখা আছে – “কম্যান্ডার অ.”। একটু আগে কেন সেটা পড়তে পারছিলাম না? নিজের নামটা চিহ্নিত করতে পারি, আরো কিছু স্মৃতি অবচেতন থেকে উঠে আসে। বলি, “গুহার মধ্যে আমার কিছু জিনিস রয়েছে।” বেলা বলল, “ওই নিয়ে ভাববেন না। ওখানে এমন কিছু নেই যা আপনার কাজে লাগবে। আর যদি মনে হয় লাগবে সেটা পরে এসে নিয়ে যাওয়া যাবে। আর আমরা মিনিট কুড়ি পরেই থামব, সেখানে স্নানের ব্যবস্থা আছে। আর এটা কানে লাগিয়ে নিন, আমার কথা ভাল শুনতে পাবেন, আপনার কথাও আমি শুনতে পাব।” একটা ছোট বোতামের মত জিনিস, সেটা কানে গুঁজে নিলাম।
রেশমীর লম্বা পিঠে দুটো জিন। বেলা রেকাবে পা দিয়ে বলে, “দেখুন আমি কেমন করে উঠছি। আপনার জিনের সাথে আলাদা রেকাব লাগানো আছে।” আমি রেকাবে বাঁ পা রাখি, বেলা ওপরে উঠে বাঁ হাত দিয়ে আমাকে ধরে টানে, ডান পা টা কোনরকমে ছেঁচড়ে ঘোড়ার অপরদিকে নিতে পারি। বেলা বলল, “বাহ, এবার আপনার জিনের সামনে উঁচু জায়গাটা ভাল করে ধরে রাখুন। রেশমী আবার ভাল দৌড়ায়।”
মরুভূমি বলছি, কিন্তু তার মধ্যেও নানান উদ্ভিদ ছিল। রকমারি রঙের নাম না জানা ফুলের বাহার। সূর্য হয়তো উঠছে, হয়তো মেঘের পেছনে, খেয়াল করি আকাশটা আগের থেকে লাল হয়ে উঠেছে। উঁচু-নিচু পাহাড়ের মধ্য দিয়ে রেশমী এমনভাবে হাঁটে যাতে মনে হয় ও জানে আমি ঘোড়ায় চড়তে অভ্যস্থ নই। মাঝে মধ্যে অবশ্য দুলকি চালেও চলে, সেটাও উপভোগ করি। এই সময়টা জুড়ে ধীরে ধীরে আরো অনেক কিছু আমার মনে পরিষ্কার হতে থাকে। ঠিক মিনিট পনেরো বাদে একটা উঁচু জায়গায় থামলে বেলা নিচের দিকে আঙুল দিয়ে দেখায় একটা ছোট জলাশয়, তার চারদিকে কিছু সবুজ গাছের সমারোহ। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা সেখানে উপস্থিত হই। ওপর থেকে বোঝা যাচ্ছিল না, গাছের আড়ালে সেখানে ছিল একটা ছোট ঘর। সেটার সামনে দুজনে ঘোড়া থেকে নামি। রেশমী আমাদের রেখে জলাশয়ের দিকে হেঁটে যায়। 
বাইরে থেকে ঘরটার বড় পরিসর বোঝার উপায় ছিল না, ভেতরে ঢুকে দেখি খুব সৌখিনভাবে সাজানো একটি জায়গা। বেলা পেছনের একটা দরজা দেখিয়ে বলল, ওই দিকে স্নানঘর। আমি বললাম, “অনেক স্মৃতি ফিরে আসছে। আমি এরকম কিছু আশা করি নি।” বেলা হাসল, বলল, “আপনি যা ভাবছেন তার চেয়েও ব্যাপারটা অন্যরকম। জটিলই বলতে পারেন। আগে গায়ে জল ঢেলে একটু ধাতস্থ হয়ে নিন, আমাদের অনেক সময় আছে সামনে। ওহ, আর ওখানে আপনার জন্য নতুন জামা কাপড় রাখা আছে।”
স্নানঘরে ঢুকে দেখি এলাহি ব্যাপার। অত্যাধুনিক সব ব্যবস্থা, অনেক কিছুই আমার কাছে অপরিচিত। গায়ে জল দেয়া মাত্র মনে হল আমার শরীর নতুন জীবন পেল। নতুন কাপড় পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি বেলা কিছু খাবার রেখেছে ঘরের মাঝখানে টেবিলের ওপর।
আমি বললাম, “আমাকে ২৫০১ সনে একটা ক্রায়োজেনিক শীতল বাক্সে রেখে দেয়া হয়। আমার জেগে ওঠার বছরটি ঠিক করা হয়েছিল ৩০০১ সন, ঠিক পাঁচ শ বছর পরে। যে দালানটিতে আমাকে রাখা হয়েছিল সেটা ছিল একটি বিশাল শহরের প্রায় কেন্দ্রে। সেই শহর কোথায় গেল?”
বেলা হাসে, মৃদু বিষন্ন হাসি। বলে, “আপনি এই উত্তরের জন্য এখনো প্রস্তুত নন। খেয়ে নিন। আমাদের আরো ঘন্টাখানেক পথ পার হতে হবে। এই খাবারগুলো আমি জানিনা আপনি খেতে পারবেন কিনা, আপনার সময়কার খাবারের রেকর্ড আমাদের কাছে নেই।”
পাঁচ শ বছর আগে মানুষ কী খেত সেই রেকর্ড নেই? পৃথিবীতে কী হয়েছে তাহলে এর মধ্যে? উল্কাপিণ্ডের আঘাত, পারমাণবিক যুদ্ধ, জীবাণুর ধ্বংসলীলা, জলবায়ুর আমূল পরিবর্তন, শ্রেণী সংগ্রাম? মানব সভ্যতার সব খতিয়ান মুছে গেছে, সেই জন্যই কি বেলা আমাকে এখনো কিছু বলছে না?
একটা চামচে যে খাবার মুখে তুললাম সেটার রূপ, স্বাদ, গন্ধ কোনোটাই চেনা লাগল না, কিন্তু খেতে বেশ লাগল। মাংস অথচ মাংস নয়। বেলা বলে, “এই বিশ্রামের জায়গাটা আপনি যে গুহা থেকে বের হয়েছেন সেখানেই করা যেত। কিন্তু তাহলে প্রাকৃতিকভাবে ওই গুহা এবং পাহাড়ের অংশটার ক্ষতি হত। আমাদের শক্তির ভাণ্ডার অফুরন্ত নয় আবার অপ্রতুলও নয়, কিন্তু পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখতে অনেক ভাবনা চিন্তা করতে হয়।”
“আমার জন্য এত ভাবনা চিন্তা করেছেন? আমি কি এতই গুরুত্বপূর্ণ? আমাদের সাথে তো আরো দশজন ক্রায়োজেনিক আধারে ঘুমিয়েছিল। তাদের বেশিরভাগেরই অবশ্য আমার অনেক আগেই ঘুম ভাঙার কথা, তবে আমার সাথে তো আরো দুজনের জেগে ওঠার কথা। তারা কোথায়?” বেলা হঠাৎ যেন আনমনা হয়ে যায়। বলে, “আমি ঠিক বলতে পারব না। না, আসলে আমি জানি না। আমার জানার কথাও না।” বুঝতে পারি না কেন সেটা বেলা জানবে না। আজকে যে আমার জেগে ওঠার কথা সেটা তো সে ভালভাবেই জানত। বললাম, “তারা তো সবাই একই দালানের বিভিন্ন ঘরে ছিল। আর আমার ঘরে তো সেই দুজনও ছিল যাদের আমার সঙ্গে জেগে উঠবার কথা। তাদের আধারগুলো কোথায় গেল? সেই দালান যদি ধ্বংস হয়ে থাকে আমার বাক্সটা তো সেখানে থেকে উদ্ধার করা গেছে, তাদেরগুলো কি করা যায় নি?” 
“আমি কেন জানি না, সেটা জানতে চান?” বেলার যেন কষ্ট হয় কথাগুলো বলতে। “তাহলে আমাকে আর একটু সময় দিন। বেশি নয়, এক ঘন্টা।”
আমি কম্যান্ডার অ.। আমাকে ২৫০১ সনে প্রায় এক লক্ষ লোকের মধ্য থেকে বাছাই করা হয়েছিল ভবিষ্যতের কাছে অতীতের প্রতিনিধি হিসেবে। আমার ধৈর্য ও স্থিত বিচারবুদ্ধিই আমাকে নির্বাচিত করেছিল। আমি পাঁচ শ বছর অপেক্ষা করেছি, আর এক ঘন্টা অপেক্ষা করা আমার জন্য কিছু নয়।
রেশমীর পিঠে চড়ে আমরা মরুদ্যান থেকে বের হয়ে আসি। পরবর্তী আধ ঘন্টা কেউই বিশেষ কথা বলি না। আমি ভাবি এই মরুভূমিটা মেক্সিকোর উত্তরে কোনো জায়গা হতে পারে, অথচ আমাদের ক্রায়োজেনিক আধার ছিল মিউনিখে। কিন্তু এই মরুভূমির কোনো উদ্ভিদকেই চিনতে পারি না। আকাশে কোনো বিমানের ধোঁয়ার রেখা চোখে পড়ে না, দিগন্ত পর্যন্ত কোনো মানব স্থাপনাও দেখি না। বাতাস কিছুটা গরম হয়ে ওঠে, আকাশ ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়, ভাবলাম সূর্য উঠতে তো এত দেরি হবার কথা নয়। অবশেষে চড়াই উৎরাই পার হয়ে একটা উঁচু জায়গায় পৌঁছলাম, সামনে বিরাট উপত্যকা। সেখানে একটা বেঞ্চ।
বেলা বলল, “আমাদের গ্রাম এখান থেকে মিনিট পাঁচেক দূরে, এই উঁচু ভূমিতেই, আমরা উঁচু বাড়ি তৈরি করি না, তাই এখান থেকে দেখতে পাচ্ছেন না। সেখানে আপনার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে। কিন্তু তার আগে এখানে বসে আমরা সূর্যোদয়টা দেখব। আপনি তো বহুদিন সূর্যোদয় দেখেন নি।”
সূর্যকে শেষবার দেখার পরে পাঁচ শ বছর কেটে গেছে। রেশমীর পিঠ থেকে নেমে বেলা আর আমি বেঞ্চটাতে বসি। 
আমাদের নিচে উপত্যকা, সেটা পার হয়ে পাহাড় শ্রেণী, তার পেছনে আরো পাহাড়। তাদের প্রতিলেখ প্রথমে স্পষ্ট হলেও উদীয়মান সূর্যের আলোচ্ছটায় তা হারিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু আকাশ নীল হবার বদলে দ্রুত কমলা হতে থাকে। সূর্য আসলে উঠে গিয়েছিল অনেক আগেই, দিগন্তে মেঘের জন্য দেখা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মেঘের ওপরে সে যখন উঠল তাকে দেখাল অসম্ভব রকমের কমলা আর বেশ বড়। মনে হল আমার পাঁচ শ বছর আগের সূর্য বদলে গেছে। না, পাঁচ শ বছরে সূর্যের বদলে যাবার কোনো সম্ভাবনাই নেই, আমিই আসলে সূর্যোদয় কেমন ছিল মনে করতে পারছি না। কিন্তু আকাশ নীল হল না, বরং হাল্কা লাল যাকে কমলা বলা চলে সেরকমই হতে থাকলে। আর মনে হল পুরো দিকচক্রবালে দাবানল চলছে। “কী হচ্ছে এটা?” আমি বিড়বিড় করে বলি। বেলা আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনার এই সূর্যকে চেনার কথা নয়।”
“চেনার কথা নয়?”
“না, আপনি এই সূর্যকে চেনেন না। এটা পৃথিবীর সূর্য না। আর এটা পৃথিবী নয়।”
বেলার কথার কোনো অর্থই করতে পারি না। কিন্তু আমি অতীতের প্রতিনিধি, সেই অতীতকে ভবিষ্যতের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপনা করাই আমার কাজ। এই নতুন জগৎটাকে বোঝা আমার দরকার। এই নতুন জগৎ বেলাকে তাদের প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছে। তাকে আমি অবিশ্বাস করি না। আমি বলি, “তাহলে আমি ক্রায়োজেনিক আধারে ঢোকার পরে মাত্র পাঁচ শ বছর যায় নি, আরো অনেক বছর চলে গেছে।”
“ঠিক,” বেলা বলে, “মাত্র পাঁচ শ বছরে আমরা আর একটা সৌরজগতে যেতে পারতাম না। আপনি ঘুমিয়ে পড়ার পর পৃথিবীর রাজনৈতিক পরিস্থিতির মনে হয় খুবই অবনতি হয়। আপনার আধারটা তখন সরিয়ে কোনো গোপন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং নতুন করে ভবিষ্যতের আর একটা তারিখ নির্ধারিত হয় আপনাকে জাগাবার।”
“আপনি ‘মনে হয়’ বলছেন কেন? নিশ্চয় সেই সময়কার ইতিহাসের খতিয়ান আছে আপনার কাছে?”
আমার প্রশ্নটা মনে হয় বেলাকে খুব বিচলিত করে। বলে, “আপনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন আপনার সাথে আর দু’জন যারা ছিল তাদের কী হল। আমি বলেছিলাম জানি না। কেন জানি না, জানেন? কারণ ২৫০১ সনের পরে পাঁচ শ বছর নয়, পয়তাল্লিশ হাজার বছর কেটে গেছে। পয়তাল্লিশ হাজার বছর আগে আর একটি গ্রহে কী হয়েছিল সেটা জানা সহজ নয় বুঝতেই পারছেন।”
বেলার কথায় আমার মাথা ঘোরে, সকালের দুর্বলতা ফিরে আসে, বেলা বেঞ্চ থেকে উঠে সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আমার দুই বাহু ধরে আমাকে সামলায়। আমার মনে হয় আমার শরীর জ্বরে কাঁপছে, বিড়বিড় করে বলি, “সৌরজগতের বাইরে আর একটি গ্রহে যেতে তো এত বছর লাগবেই। কিন্তু কেন? আমাকে অনেক আগেই তো জাগানোর কথা ছিল।” 
বেলা সামনে বসেই বলে, “আমি যা শুনেছি তা হল যতবার আপনাকে জাগাবার চেষ্টা করা হয় ততবার হয় কোনো যুদ্ধ, সন্ত্রাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী কি রাজনীতি বাধ সাধে। এর মধ্যে বিজ্ঞানেরও অগ্রগতি হয়। আপনাকে সেজন্য হাজার হাজার বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখা গেছে।”
“পয়তাল্লিশ হাজার বছর! আমার পুরোনো যা কেনা ছিল তার সবকিছুই কালের গর্ভে বিলীন। কিন্তু আমরা এখন কোথায়?”
“আমরা পৃথিবী থেকে ১০ আলোকবর্ষ দূরে । ওই তারাটির নাম এপসিলন এরিদানি। এটি K বর্ণালীর একটি তারা, এর পিঠের তাপমাত্রা সূর্যের চেয়ে কম। আমাদের পূর্বপুরুষদের পঁচিশ হাজার বছর লেগেছে এই পথটা পারি দিতে।”
“পঁচিশ হাজার বছর? সেই মহাকাশযান আমার ক্রায়োজেনিক আধার বহন করেছে অতদিন ধরে?”
বেলা উঠে পাশে বসে, বলে, “হ্যাঁ, বংশ থেকে বংশান্তরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আপনাকে তারা সুরক্ষা করেছে, কারণ আপনি ছিলেন আমাদের অতীতের সাথে একমাত্র সূত্র। কী কারণে আমরা পৃথিবী ত্যাগ করেছিলাম আর কী কারণে এতদিন পরে আপনাকে জাগানো হল সেটাও জানবেন। শুধু বলে রাখি সেখানকার ধ্বংসলীলা থেকে বাঁচতেই আমাদের পূর্বপুরুষরা পৃথিবী ছেড়ে দূর নক্ষত্রের উদ্দেশ্য রওনা দেয়। তারা ছিল বিজ্ঞানী, আর্টিস্ট, দার্শনিক। যারা তখন পৃথিবীর নেতা ছিল তারা পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান ধ্বংস করে দেয়, কেন তারা এই কাজ করেছিল আমি তা বলতে পারব না, সেই সময়ের ইতিহাসের সবকিছু আমাদের এই সময় পর্যন্ত পৌঁছায় নি।”
“কতদিন আগে আমরা এই গ্রহে এসেছি?”
“পাঁচ হাজার বছর।”
“পাঁচ হাজার?” এই সংখ্যাটা আবার আমি এতক্ষণ যা সাজিয়েছিলাম সব ধ্বংস করে দেয়।
বেলা বলে, “আপনি যে সভ্যতার প্রতিনিধি সেই সভ্যতায় পুনরায় পৌঁছাতে পৃথিবীর মানুষের পঁচিশ হাজার বছর লেগেছে। দু হাজার বছর আগে তাদের সঙ্গে আমরা আবার যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হই। পৃথিবী এখান থেকে দশ আলোকবর্ষ দূরে, সেখান থেকে বেতার সংকেত আসতে দশটি বছরে লেগে যায়, বুঝতেই পারছেন একটি প্রশ্নের উত্তরের জন্য কুড়িটি বছর অপেক্ষা করতে হয়। সেটা আমাদের জন্য হতাশার কারণ।” 
বলি, “পয়তাল্লিশ হাজার বছরে মানুষ নিশ্চয় শারীরিক ও মানসিকভাবে বদলেছে। আর এই গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর মত নয়। মানুষের শরীর নিশ্চয় বদলেছে এই গ্রহের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে।”
“বদলেছে। অবশ্যই বদলেছে। বদলানোটা না হয় বাকিটা পথ যেতে যেতে শুনবেন। সূর্য মাথার ওপরে উঠলে এক্স-রশ্মির পরিমাণ বেড়ে যায়, সেজন্য ঘরে থাকাই শ্রেয় ­– অন্তত আমাদের তিনজনের জন্য। বাদবাকিদের অবশ্য ওই ঝামেলা নেই।”
কেন এক্স-রশ্মি বাদবাকিদের জন্য ঝামেলা নয় ভাবতে ভাবতে রেশমীর ওপর চড়লাম। বেলা বলল, “আমাদের বেশী দূর যেতে হবে না।”
পাহাড়ের ধার ছেড়ে আমরা মালভূমির ভেতর দিকে যেতে থাকি। কিছু দূরে গাছের ঝোপ দেখা যায়। ওদিকে হাত তুলে বেলা বলে, “ওখানেই আমাদের গ্রাম।” তারপর বলে, “সবাই আপনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ওদের দেখা ঘাবড়াবেন না। গত কয়েক হাজার বছর ধরে আমাদের সূর্যের এক্স ও গামা রশ্মি এবং নানাবিধ কণা বিকিরণ থেকে বাঁচতে আমরা জৈবিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বদলে অজৈবিক ধাতব মিশেল, কিংবা কার্বন যৌগ ইত্যাদি ব্যবহার করা শুরু করি। পরে মস্তিষ্কের নিউরন কোষ থেকে আরম্ভ করে আরো নানাবিধ কোষের কাজকেও ইলেকট্রনিক গেট দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়। তাতে আমরা আর পৃথিবীর মানুষের মত দেখতে হই না। এতে আমরা শুধু যে আমাদের সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে বাঁচি তাই নয়, আমাদের জীবনকেও তা দীর্ঘায়ু করে। এই আমার বয়সই ধরুন না, তা পাঁচশ বছর হবে।”
বেলার কথা আর বিশ্বাসযোগ্য মনে হল না।
বেলা বলতে থাকে, “তো আজ সকালে আপনার জেগে ওঠার কথা। গত দশ বছর ধরে আমরা এটার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, এই জগতে আপনাকে অভ্যর্থনা যেন আপনার পৃথিবীর মানুষই করে। পয়তাল্লিশ হাজার বছর পুরোনো একজন চল্লিশ বছরের মানব নারী কীরকম দেখতে হতে পারে সেই গবেষণা করে আমার ধাতব যৌগ কাঠামোর ওপর জৈবস্তর স্থাপন করা হয়েছে। আমাদের প্রকৌশলীরা খুব ভাল কাজ করেছে তাই না? আর আপনার ভাষাটাকে রপ্ত করতে বছর দশেক সময় লেগেছে আমার, আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্র হারিয়ে যাওয়া ভাষাটাকে পৃথিবী থেকে আনা সেই ত্রিশ হাজার বছর আগে আনা তথ্য থেকে পুনরুদ্ধার করতে পারে।”
আমি শক্ত করে জিনের ওপরের অংশ ধরে থাকি। বেলাকে বহুদূরের কোনো একটা জিনিস মনে হয়। বিড়বিড় করে বলি, “আর রেশমী?”
বেলা বলে, “রেশমীর ঘটনাও তাই। এই গ্রহে তো আর ঘোড়া নেই। রেশমীকে তৈরি করতে বহু বছর লেগেছে। আসল ব্যাপার কী জানেন? আমরা ধারনা করতে পারছিলাম না আপানাদের সময়ে আপনারা ঠিক কী যান ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ তখন কি যান্ত্রিক গাড়ি বা উড়ন্ত যন্ত্র এসে গিয়েছিল সেটা আমরা জানতাম না। শেষ পর্যন্ত ঘোড়াই ঠিক হল, ঘোড়া সম্বন্ধে আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য ছিল।”
“তাই বলছিলাম,” বেলা বলতে থাকে, “এক্স রশ্মি আপনার, আমার আর রেশমীর ত্বকের, ভ্তেরের জৈব কোষের ক্ষতি করতে পারে। বাদবাকিদের অজৈব কাঠামোয় এক্স-রশ্মি কোনো সমস্যা নয়।”
আমি রেশমীর বেগুনী লোমের ত্বকে হাত বোলাই, সেই ত্বকের নিচে অজৈব যৌগ, বিশ্বাস হয় না বেলার কথা। হাত বাড়িয়ে জামার নিচে বেলার স্কন্ধফলক স্পর্শ করতে চাই, ফুল ফুল জামার ওপরে বেলার ঘাড়ে ঘামের বিন্দু খুঁজি। তখনই মনে হল এপসিলন এরিদানির উদীয়মান আলোয় বেলার শরীরের ভেতর থেকে একটা লাল আভা বের হচ্ছে। 
বেলা বলে, “তবে ‘বেলা’ আর ‘রেশমী’ নামদুটো কিন্তু আমি খুঁজে বের করেছি। আপনার সময়ের নাম, তাই না? ভাল লেগেছে নাকি বলুন?”
আমি চুপ করে থাকি। গ্রামের ভেতর ঢোকে রেশমী, আমাকে অভ্যর্থনা করতে ওরা বেরিয়ে আসে ছোট একতলা বাড়িগুলো থেকে, তাদের শরীরের লাল আভা দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল। আমি ডান হাত তুলে তাদের অভিবাদন করতে যাই, লক্ষ করি আমার করতলের পেছন দিক সেই অধিবাসীদের মতই লাল রঙে উজ্জ্বল। বুঝতে পারি কেন আমি “কম্যান্ডার অ.” লেখাটি প্রথমে পড়তে পারি নি, কিন্তু বেলা আসবার পরে পড়তে পেরেছিলাম। হাত দিয়ে আমার মাথা ছুঁই, ভাবি এর ভেতরে কী আছে? বুঝলাম বহু আগেই আমার শরীরের কাঠামো রূপান্তরিত হয়েছে অজৈব যৌগে। বিড়বিড় করে বলি, “কোনো মানুষ কি পয়তাল্লিশ হাজার বছর বেঁচে থাকে?” আমার কথা বেলা শুনতে পেয়েছে নিশ্চয়, তার মুখাবয়ব না দেখতে পেলেও কল্পনা করি তার মৃদু হাসি, সেই হাসিতে গালে টোল পড়ে। ততক্ষণে আমাদের পেছনে এপসিলন এরিদানি আকাশের অনেক ওপরে উঠে গেছে। 
———————————————————- 

3 thoughts on “দীপেন ভট্টাচার্য’এর গল্প : বেলা ও রেশমী

  • June 8, 2020 at 12:28 pm
    Permalink

    চমৎকার একটি গল্প। বাংলা ভাষায় কল্প বিজ্ঞান চর্চা সীমিত। দীপেনবাবুর গল্প সেই কারণে আমার কাছে অতি আগ্রহের। এখন যে সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, সেই সময়ে মনে হয়, এই গল্পই একদিন সত্য হয়ে উঠবে, পৃথিবীর কিছু মানুষ, শিল্প সাহিত্য জ্ঞান নিয়ে দূর আকাশের নতুন কোনো পৃথিবীর দিকে যাত্রা করবে। গল্পটি সকলের পড়া উচিত। উল্লেখ্য যে এই অদ্ভুত সময়ে কল্পবিজ্ঞানের গল্প আমাকে বারবার টানছে। এই গ্রহের ভবিষ্যৎ কী ?

    Reply
  • August 10, 2020 at 3:46 am
    Permalink

    কল্প বিজ্ঞানের গল্প আমার ভীষণ প্রিয়।মানুষ দিনে দিনে কেমন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে।মনের সুকুমার প্রবৃত্তি গুলো হারিয়ে যাচ্ছে।বিজ্ঞান কি মানুষ কে একটু একটু করে যান্ত্রিক মানুষ বানিয়ে দিচ্ছে আর সে কারণেই কি এগুলো ঘটছে।জানিনা।অদূর ভবিষ্যতে কল্প বিজ্ঞান হয়তো আর কল্প বিজ্ঞান থাকবে না।হয়তো সেদিকেই এগুচ্ছি আমরা।
    দীপেন বাবুকে ধন্যবাদ এরকম একটা অসাধারণ গল্প উপহার দেবার জন্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *