সাদাত হাসান মন্টো-এর গল্প নচ্ছার ফাউজা’র বাংলা অনুবাদঃ বিপ্লব বিশ্বাস

চা- বাড়িতে বসে আলোচনার বিষয় যখন জারজ আর নচ্ছার চরিত্রের দিকে মোড় নিল,তা চলল দীর্ঘক্ষণ। উপস্থিত প্রত্যেকে অন্তত একটি এমন চরিত্র নিয়ে নিজ নিজ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিল। কেউ যদি হয় জলন্ধরের তবে অন্যরা শিয়ালকোট, লুধিয়ানা কিংবা লাহোরের। প্রায় সমস্ত কাহিনিই তাদের স্কুল অথবা কলেজ জীবনের অভিজ্ঞতার ফসল।

মেহর ফিরোজ সাহেব বললেন সবশেষে। তার কথায়, ‘ অমৃতসরে এমন কোনও মানুষ ছিল না যে ফাউজা অর্থাৎ হারামজাদা ফাউজার নামটা জানত না। যদিও শহরে তখন আরও অনেক বদমাস বিরাজ করত কিন্তু তাদের কেউই ফাউজার মাপ বা নামডাকের ধারেকাছে আসত না। সে ছিল নচ্ছার নং এক। তার স্কুলের সব মাস্টারমশাই তাকে নিয়ে সত্যিই হাঁফিয়ে উঠেছিল। এমন কি প্রচণ্ড শৃঙখলাপরায়ণ হিসাবে খ্যাত প্রধানশিক্ষক, যাকে দেখলে স্কুলের সবচেয়ে বদমাস ছেলেটাও ভয়ে কাঁপত, কেমন যেন ঘাবড়ে হকচকিয়ে যেতেন যদি ফাউজা সেই শয়তানির সঙ্গে যুক্ত থাকত কেননা সেক্ষেত্রে তার দুর্দান্ত চাবুকটিও অকেজো হয়ে পড়ত। আর এই হতাশার কারণেই তিনি ফাউজাকে বেতানো ছেড়ে দিয়েছিলেন।
‘ যে ঘটনার কথা এখন বলব তা ঘটেছিল আমরা যখন দশ ক্লাসে পড়ি। একদিন ফাউজার জনাকয় সঙ্গী তার সামনে চ্যালেঞ্জ রাখল, যদি সে পুরো ন্যাংটো হয়ে গোটা স্কুল চত্বর ঘুরতে পারে তবে পুরস্কার হিসেবে একটি টাকা পাবে। ফাউজা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাতে ওরা এক টাকার একটি নতুন নোট ওকে দিল। নোটটি ভাঁজ করে কানে গুঁজে ফাউজা পরনের জামাকাপড় খুলে ছোট্ট স্কুলব্যাগটিতে ঠেসে দিল আর সব্বাইকে দেখিয়ে পুরো উলঙ্গ হয়ে হাঁটা শুরু করল। এ ক্লাস থেকে ও ক্লাসে সে যখন ঘুরছিল, ছাত্ররা উৎসুক হয়ে দেখতে লাগল যতক্ষণ না ফাউজা হেডমাস্টারের অফিসের কাছে পৌঁছয়। সে সাহসের সঙ্গে অফিসের নলখাগড়ার তৈরি পর্দার চিক তুলে সদর্পে ঢুকে গেল। এই অবস্থায় ওকে দেখে হেডমাস্টারমশাই হতভম্ব হয়ে গেলেন। ঝটিতি অফিস থেকে বেরিয়ে এক পিওনকে হুকুম দিলেন তাড়াতাড়ি ফাউজার বাড়ি থেকে ওর এক সেট জামাকাপড় আনতে। তিনি আরও যোগ করলেন, ” ফাউজার অভিযোগ মসজিদের জলাশয়ে সে যখন স্নানে নেমেছিল তখন কেউ তার জামাপ্যান্ট সরিয়ে দিয়েছে। ”
স্কুলে যিনি ধর্ম ও ঈশ্বরতত্ত্ব বিষয়টি পড়াতেন, ছাত্ররা তাকে মৌলবি আলু বা আলু মৌলবি বলে ডাকত। কেউই জানত না কীভাবে মৌলবি সাহেবের উপনাম আলু হয়ে গেল কেননা আলুর তো দাড়ি থাকে না। ফাউজা এই শিক্ষকের সামনে খানিক নত হয়ে থাকত। একদিন হল কি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের সামনে মৌলবি সাহেব ফাউজাকে পবিত্র কুরআন থেকে একটি বয়েত তরজমা করতে বললেন। ফাউজার চুপ করে থাকাই উচিত ছিল কিন্তু এমন সুযোগ সে কি ছাড়তে পারে? তাকে তো প্রমাণ করতেই হবে যে সে একটা জাত নচ্ছার। জিভের ডগায় যা কিছু বোকা বোকা কথা এল সে মুখ ফসকে বলে দিল। মৌলবি সাহেব ঘামতে লাগলেন। কিন্তু যেইমাত্র মাননীয় সদস্যগণ বিদায় নিলেন, তিনি বেতটি তুলে ফাউজাকে শপাৎ শপাৎ বসাতে শুরু করলেন। ফাউজা কুঁকড়ে যেতে যেতে অনুনয়ের সুরে বলতে লাগল, ” আমার কী দোষ মৌলবি সাহেব… আপনি তো ভালোই জানেন আমি কলমাও পড়তে জানি না ; আর আপনি পবিত্র কুরআন থেকে আমাকে একটি পুরো স্তবক অনুবাদ করতে বললেন। ”
কিন্তু ফাউজাকে চরম পিটিয়েও মৌলবি আলু সাহেবের মন ঠান্ডা মারল না। তিনি সোজা ফাউজার আব্বার কাছে গিয়ে ওর বিরুদ্ধে নালিশ জানালেন। তার যা কিছু বলার ছিল সব ধৈর্য ধরে শুনল ফাউজার আব্বা।
উত্তরে বিনয়ের সঙ্গে সে বলল, ” মৌলবি সাহেব, আমি নিজেই তো ওকে নিয়ে হয়রান। জানি না কীভাবে ওর মাথায় কিছু বাস্তব বুদ্ধি ফুঁড়ে দেওয়া যায়। এইতো গতকাল আমি যখন গোসলখানায়, ও বাইরে থেকে খিল লাগিয়ে দিল। ভেতর থেকে জোর চিৎকারে ওকে নানাভাবে বকাঝকা করতে লাগলাম, কিন্তু কীসের কী, সেও চিৎকার করে জানিয়ে দিল, মাত্র আট আনা পয়সা না দিতে চাইলে সে খিল খুলবে না। সে এও জানিয়ে দিল যে আমি যদি তা না দিই তাহলে এরপর সে শুধু খিলই আটকাবে না, দরজায় তালাও মেরে দেবে। অসহায় অবস্থায় আমাকে কথা দিতে হল। ওকে আট আনা দিলাম। এইবার দয়া করে আমাকে বলুন এই হতচ্ছাড়া ছেলেকে নিয়ে আমি কী করব?… একমাত্র আল্লাহই জানেন ভবিষ্যতে ওর কী হবে! বইপত্র ছুঁয়ে দেখে না একদম। সবাই নিশ্চিত ছিল, বোর্ডের প্রবেশিকা পরীক্ষায় ও নির্ঘাত ফেল করবে ; কিন্তু ফল বেরুলে দেখা গেল ও সর্বোচ্চ মার্কস পেয়েছে। “
‘ফাউজা কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিল কিন্তু ওর আব্বুর ইচ্ছা, ও কোনও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিক। কিন্তু ফাউজা পরের দু বছর শহরের পথে ভবঘুরের মতো কাটিয়ে দিল, সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘায়িত হল তার দুষ্টুবুদ্ধি আর কুকর্মের তালিকাটি। উপায়ান্তর না দেখে আব্বু শেষ অব্দি তাকে কলেজেই ভর্তি করে দিল। কিন্তু প্রথম দিনেই অঙ্কের প্রফেসরের সাইকেলটি গাছের মগডালে ঝুলিয়ে দিয়ে ফাউজা তার হাজিরা জানান দিল। অবাক সবাই ভেবে পেল না কীভাবে ওই উঁচুতে সে সাইকেলটি তুলল! কিন্তু স্কুল থেকে যে সব ছেলেরা ওকে জানত তারা বলল, ” ফাউজা ছাড়া এই কৌশল আর কারও জানা নেই। ” এই একটিমাত্র দুষ্টুবুদ্ধির পরিচয় দিয়েই ফাউজা গোটা কলেজে পরিচিত হয়ে গেল।
‘স্কুলে তার এই অকাজ – কুকাজের সুযোগ অনেক কম ছিল কিন্তু কলেজে এসে তার এই কুকর্মের মাত্রা অনেক বেড়ে গেল। কলেজের নানান ক্রিয়াকলাপ যথা শিক্ষামূলক, খেলা, কবি- সম্মেলন, বিতর্কসভা এবং সবার উপরে তার দুষ্টু চাল — এইসব কাজে যুক্ত থাকায় ফাউজা সুপরিচিত হয়ে গেল। অল্প সময়েই সে কুখ্যাত হয়ে শহরময় ‘ বদমাইশ ‘ হিসাবে এতটাই স্বীকৃতি পেল যে শহরের কলঙ্কিত গুন্ডাদের সঙ্গে লড়বার জায়গায় পৌঁছে গেল।
দেখতে ছোটোখাটো হলেও ফাউজার দেহ পোক্ত ও সুঠাম। ঢুঁ মারায় তার খ্যাতি ছিল। সে যখন প্রতিপক্ষের বুকে বা তলপেটে মাথা দিয়ে গুঁতিয়ে দিত তখন সেই ব্যক্তির গোটা শরীর দারুণ আঘাতে কঁকিয়ে উঠত।
কলেজের দ্বিতীয় বছরে সে মজা দেখার জন্য করল কি – প্রিন্সিপালের নতুন চার চাকার গাড়ির পেট্রল – ট্যাঙ্কে মাত্র চার আনা মূল্যের চিনি ঢেলে দিল। ব্যস, গাড়ির এঞ্জিন জ্যাম হয়ে গেল। প্রিন্সিপাল কোনওভাবে জানতে পারলেন, এই অপকর্মের হোতা ফাউজা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তিনি ওর বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেন না। পরে তল খুঁজে জানা গেল, ফাউজা প্রিন্সিপালের কিছু গুপ্ত বিষয়–আশয় জানে।
এই সেই সময় যখন দেশব্যাপী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বিক্ষোভ -আন্দোলন তুঙ্গে। সর্বত্র ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে চরম প্রতিবাদ সংঘটিত হচ্ছে। বিদেশি শাসকদের ছুঁড়ে ফেলে দেবার অনেক ব্যর্থ প্রয়াসও দেখা যাচ্ছে।
প্রচুর ধরপাকড় চলছে। বিক্ষোভকারী বিদ্রোহীদের গ্রেপ্তারের ফলে জেলখানা সব উপচে পড়ল। রেল উপড়ে ফেলা আর চিঠিবাক্সে দাহ্য বস্তু ভরে দেওয়া, রোজকার খবর হয়ে উঠল। এখানে ওখানে বোমা তৈরি হতে লাগল ; পুলিশ প্রচুর পিস্তল বাজেয়াপ্ত করল। সংক্ষেপে, চারদিকে বিদ্রোহের আবহ গড়ে উঠল, স্কুল কলেজের ছাত্ররাও এইসব কাজে শামিল হল।
ফাউজা আদৌ রাজনীতিতে আগ্রহী ছিল না। মনে হয়, মহাত্মা গান্ধীর নামটিও সে জানত না। কিন্তু একদিন যখন কোনও এক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করল, সকলে চমকে গেল। ইতোমধ্যে অনেক ষড়যন্ত্রের ঘটনা খুঁড়ে তোলা হয়েছে। স্যন্ডার্সকে হত্যা করার দায়ে ভগত সিং আর দত্তর(!) ফাঁসি হয়ে গেল। তাই এই নতুন ঘটনাটি দারুণ রোমহষর্ক মনে হল যার অর্থ এই ঘটনাতেও ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ সরকারকে উৎখাত করতে।
জনাকয় ছাত্র কলেজ ল্যাবরেটরি থেকে নাইট্রিক অ্যাসিড চুরি করল যা বোমা তৈরিতে লাগে। এই চুরিতে অংশগ্রহণ করা ও এই ষড়যন্ত্রের অনেক গুপ্তকথা জানা – এই দুই অভিযোগে ফাউজা অভিযুক্ত হল।
তার সঙ্গে কলেজের আরও দুটি ছেলে গ্রেপ্তার হল। একজন শহরের এক নামী ব্যারিস্টারের ছেলে অন্যজন এক ধনী – সন্তান। ডাক্তারি পরীক্ষার পর ঘোষণা করা হল, দুজনেই কোনও না কোনও রোগে অসুস্থ। তাই পুলিশের নির্দয় পেটানি থেকে তারা রেহাই পেল। বেচারা ফাউজা পুলিশি নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে গেল। উল্টো করে ঝুলিয়ে তাকে আগাপাশতলা পেটানো হল। তার মুখ থেকে গুপ্তকথা বের করার জন্য তাকে বরফের চাঙড়ের ওপর দাঁড় করিয়ে অকথ্য অত্যাচার চালানো হল। কিন্তু সে এমন শক্ত ধাতুতে গড়া যে কোনও অবস্থাতেই তার মুখ ফুঁড়ে টু শব্দটি বেরোলো না। পরন্তু থানার ভেতরেও সে তার দুষ্কর্ম চালিয়ে যেতে লাগল।
পুলিশের চাবকানি অসহ্য হয়ে উঠলে সে পুলিশ ইন্সপেক্টরকে থামতে বলে আর সবকিছু প্রকাশ করবে বলে কথা দেয়। তখন সে প্রায় অর্ধমৃত। সে গরম দুধ আর জিলিপি চাইল আর তার অবস্থা দেখে এই খাবার তাকে দেওয়াও হল। খানিক বিশ্রামের পর সে কিছুটা সুস্থ বোধ করল। এরপর পুলিশ ইন্সপেক্টর ফাউজার বক্তব্য নথিভুক্ত করার জন্য লেখার প্যাড আর পেন নিয়ে এলেন আর ফাউজাকে শুরু করতে বললেন। সে কোনওমতে বিষিয়ে যাওয়া হাত পা টেনে তুলল,লম্বা শ্বাস নিল আর হাই তুলে বলল,” আমার এখন কী বলা উচিত। খেয়েদেয়ে অনেকটাই জোর বেড়েছে, তাই আবার মারধর শুরু করতে পারেন। “
ওকে নিয়ে এরকম অনেক কাহিনি আছে যা ভুলে গিয়েছি।কিন্তু যে গল্পটি বলব সেটি বেশ মজাদার। এটি আরও উপভোগ করতে পারতে যদি আমাদের সহপাঠী মালিক হাফিজ যে কিনা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল, সে নিজে এটি বর্ণনা করত…।
একদিন দুই পুলিশ রক্ষী হিসাবে ফাউজাকে কোর্টে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে মালিক হাফিজকে দেখতে পায় যে কিনা কোর্টেই কোনও কাজে গিয়েছিল। তাকে দেখামাত্র ফাউজা বলে উঠল,” সালাম -এ-আলাইকুম, মালিক সাহেব। ”
হতচকিত হাফিজ ইতিউতি তাকাতে লাগল। হাতকড়া লাগানো অবস্থায় ফাউজা তার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল, ” মালিক সাহেব, আমি এখন খুব দুঃখী ও একা। খুবই চাইছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা হোক – আপনি শুধু আমার নামটি নেবেন। “
ফাউজার এই কথা শুনে মালিক হাফিজ কেমন ঘাবড়ে গেল। ফাউজা তখন সাহস জোগাল। বলল, ” ঘাবড়ে যাবেন না, এমনিই ঠাট্টা করছিলাম। যাই হোক, দয়া করে বলুন, আমি আপনার কোনও কাজে আসতে পারি কি না।”
‘এখন ভাবুন, এই অবস্থায় ফাউজা মালিক সাহেবের কোন কাজে লাগতে পারে। হাফিজ তো প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি পালাতে গেলে ফাউজা বলল,” স্যার, হয়তো আমি আপনার কোনও কাজেই আসব না কিন্তু আপনি চাইলে আমি আপনার নোংরা কুয়োটা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করতে পারি। “
একমাত্র মালিক হাফিজই বলতে পারত ফাউজা এই কুয়োটাকে কী পরিমাণ ঘৃণা করত। এর জল থেকে মরা ইঁদুরের পচা গন্ধ ছড়াত। আল্লাহ জানেন, কেন কেউ কখনও এটা পরিষ্কার করার কথা ভাবেনি।
সপ্তাহখানেক পর একদিন স্নানের জন্য মালিক হাফিজ বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন, তখন দেখলেন তিনজন ধাঙড় তার কুয়ো থেকে গোবর, নোংরা সব তুলতে ব্যস্ত।এটা কীভাবে সম্ভব হল তা ভেবে তো মালিক অবাক। এদের কে পাঠাল? পড়শিরা ভাবল,হয়তো বড় মালিক সাহেব তাদের সুবিধার জন্য বা মানুষের প্রশংসা পেতে এই কুয়ো সাফাইয়ের কথা ভেবেছেন। কিন্তু যখন তারা জানল যে ছোটো মালিক এসবের কিছুই জানে না আর বড় মালিক শিকারে বেরিয়েছে, তারা এই রহস্য বিষয়ে অবাকই হল। তারা যখন কর্তব্যরত সাদা পোশাকের পুলিশের কাছে এ ব্যাপারে খোঁজ নিতে গেল, তারা জানল যে মহান ফাউজা খবর দিয়েছে, এই কুয়োর ভিতরে বোমা আছে এবং সে সবের তল্লাশিতেই এই সাফাই।
কুয়ো সাফাইয়ের কাজ চলছে। সব নোংরা উঠে টলটলে জল বেরিয়ে গেছে। বোমা তো দূরের কথা, পুলিশ একটা পটকাও খুঁজে পায়নি।
তারা তো রেগে কাঁই। তাই ফের ওরা ফাউজাকে জিজ্ঞাসাবাদ জুড়ে দিল। ফাউজা সাদামাটা ঢঙে ইন্সপেক্টরকে বলল,” আমি বোকাসোকা মানুষ স্যার, আমি শুধু চেয়েছিলাম বন্ধুর কুয়োটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে। আর তা হয়ে গেছে। “
এটা ফাউজার অপকর্মের এক মোক্ষম চাল। পুলিশ এরপর ওর ওপর নির্দয় অত্যাচার চালিয়ে আর একবার আধমরা করে ছাড়ল। পরে হঠাৎ একদিন খবর ছড়াল যে ফাউজা পুলিশের হয়ে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়েছে আর সে সবকিছু ফাঁস করে দেবে বলে কথা দিয়েছে। এতে ওর চারপাশের লোকজন ছিছিক্কার করে ওকে শাপশাপান্ত করতে লাগল। এমন কি সরকারের ভয়ে ভীত ওর বন্ধু মালিক হাফিজ ওকে গালিগালাজ করে বলল,” ওই জারজটা ভীরু আর বিশ্বাসঘাতক। একমাত্র আল্লাহই জানেন,ফাউজা পুলিশের কাছে যে বয়ান দেবে তাতে কতজন ফাঁদে পড়বে! “
এখন ঘটনা হচ্ছে, ফাউজা পুলিশের এন্তার মার খেয়ে চরম ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত। ওকে পেটপুরে খাইয়ে জাগিয়ে রাখা হয়েছে। ও ঘুমকাতুরে। টানা ঘুম চায়। তাই একরাশ ক্লান্তি নিয়ে সে বোমা বানানোর ষড়যন্ত্র বিষয়ে সবকিছু ফাঁস করতে মনস্থ করে।
তখনও অব্দি কারাবন্দি থাকলেও সে মারধর থেকে রেহাই পেয়েছে আর কোনও কিছু পাওয়ার ব্যাপারেও তেমন নিষেধাজ্ঞা নেই। তার হাত পায়ের অবস্থা সঙ্গিন,তাই সে বিশ্রাম চায়। এরপর বেশ কিছুদিন তাকে ভালো খাবারদাবার দেওয়া হল,শরীরেও চলল নিয়মিত দলাইমলাই। পুরো সেরে উঠে সে নিজেকে যখন যথেষ্ট সুস্থ মনে করল,তখনই বয়ান দিতে শুরু করল।
রোজ সকালে বড় দু গ্লাস মাখন- দুধ খেয়ে সে বয়ান দিতে থাকল। কিছুক্ষণ পরেই সকালের নাশতা চলে আসত। সেসব খেয়ে মিনিটপনেরো বিশ্রামের পর সে আবার তার বক্তব্য শুরু করত।
‘যে স্টেনোগ্রাফার ফাউজার বয়ান টাইপ করত সেই হুশেনকে জিজ্ঞেস করলে জানা যেত, দেশের এ কোণ থেকে সে কোণে ছড়িয়ে থাকা এই দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের পর্দা ফাঁস করতে ফাউজা পুরো একটি মাস সময় নিয়েছিল। সে কয়েকশো মানুষের নাম, জায়গার নাম,বিপ্লবীদের গোপন ডেরা যেখানে তারা সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করার ছক আঁটত – সব একে একে বলে দিয়েছিল। স্টেনোগ্রাফার হুশেনের হিসাব অনুযায়ী ফাউজার এই বয়ান লিখিতভাবে পুরো আড়াইশো পাতার মতো। পুলিশ খুঁটিয়ে সেসব পড়ে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি ছকেছিল। তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কিছু গ্রেপ্তার হল। আবার মানুষের মধ্যে প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া। তারা ফাউজার দিকে অভিশাপ আর গালাগাল ছুঁড়তে লাগল। এভাবে সবকিছু ফাঁস করার জন্য খবর -কাগজগুলি বাঁকা ঢঙে ওর নিন্দা করতে লাগল। দেশের অধিকাংশ মানুষ ব্রিটিশবিরোধী, সে কারণেই ফাউজার এই বিশ্বাসঘাতকতায় তারা তীব্রভাবে ফেটে পড়ল।
ফাউজা এখন যেন সিংহবিক্রমের প্রতীক, জেলখানায় খানাও জোরদার। মাথায় উঁচু চূড়াশোভিত পাগড়ি, গায়ে সিল্কের শার্ট আর পরনে চল্লিশ গজ কাপড় ফুঁড়ে বানানো বহুভাঁজের দামি সালোয়ার – এমন পরিধানে গটগটিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে সে – মনে হচ্ছে যেন কোনও আধিকারিক জেলখানা পরিদর্শনে এসেছেন।
ইতোমধ্যে পুলিশ তদন্ত শেষ করে যাবতীয় গ্রেপ্তার সেরে ফেলেছে। এরপর সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সেই রোমহষর্ক কেসের শুনানি হবে আদালতে। সেইদিনে আদালত – চত্বর লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল।
পুলিশের ঘেরাটোপে ফাউজা যখন হাজির হল,তার বিরুদ্ধে স্লোগানে আকাশ ফেটে পড়ল। ” ফাউজা হারামজাদা মুর্দাবাদ, মুর্দাবাদ জারজ ফাউজা… নিপাত যা,নিপাত যা।” উপস্থিত জনতার রাগ তুঙ্গে ; যে কোনও সময় তারা ফাউজার ওপর ফেটে পড়তে পারে। পুলিশকে তাই লাঠি – সাট করতে হল যাতে বেশ কিছু লোক আহত হল।
‘এরপর শুরু হল শুনানি। বিচারক যখন জানতে চাইলেন, ফাউজা পুলিশের কাছে তার স্বীকারোক্তি – বয়ান দিয়েছে কি না, সে সটান বলে দিল, এইরকম কোনও বয়ানের বিষয় তার জানা নেই। ” হুজুর, আমি কোনও বয়ানই দিইনি। পুলিশ একগাদা কাগজপত্তর লিখে এনে জোর করে আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নিয়েছে। “
এই কথা শুনে পুলিশ ইন্সপেক্টরের রক্ত জমে হিম হয়ে গেল। তিনি পুরোমাত্রায় ক্ষুভিত হলেন। পরদিনের খবর- কাগজে এই খবর ছেপে বেরুলে মানুষজনও মানহানি বোধ করতে লাগল। তারা এই ভেবে অবাক হল যে ফাউজা আবার নতুন কী চাল চালছে!
প্রকৃতই তা বাঁক নিল যখন ফাউজা কোর্টে নতুন বয়ান দিতে শুরু করল যা পুলিশের কাছে আগের দেওয়া বয়ান থেকে পুরো আলাদা। এবারের এই বয়ান শেষ করতে পনেরো দিন লাগল আর তা লিখিত আকারে দাঁড়াল বড় কাগজের একশো আটান্ন পাতা। এভাবে পুলিশ পুরোমাত্রায় নীতিভ্রষ্টতা আর অপযশের ভাগীদার হল কেননা এই কেসের ব্যাপারে যে ইমারত তারা গড়ে তুলেছিল ফাউজা এক এক করে তার ইট খসিয়ে তাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
হঠাৎই এই কাহিনির শ্রোতাদের মাঝ থেকে একজন ফিরোজ সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, ” কিন্তু ফাউজার কী হল? ” মেহর ফিরোজ সাহেব উত্তর করলেন, ” কী হতে পারে আর? সরকারি সাক্ষী হিসাবে বেকসুর খালাস পেয়ে গেল। ”
‘যে চাতুরি আর মানসিক দক্ষতার সঙ্গে ফাউজা পুলিশকে হতাশ করে বেবাক হারিয়ে দিল তাতে সবাই হাঁ হয়ে গেল। অপর এক শ্রোতা, ফাউজা যার মন পুরোপুরি জিতে নিয়েছে, জানতে চাইল, ” ফাউজা এখন কোথায় থাকতে পারে? ”
” এইতো এই লাহোরেই। সে এখন কমিশন এজেন্ট হিসাবে কাজ করছে আর নিজের ব্যাবসা চালাচ্ছে “, ফিরোজ বললেন। ‘
এরমধ্যেই বেয়ারা এসে ফিরোজ সাহেবকে চা – স্ন্যাকসের বিল ধরিয়ে দিল কেননা তিনিই অর্ডার দিয়েছিলেন।
ফাউজার এই কাহিনি শুনে যে মানুষটি দারুণ মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি বিলে বড় মাপের হিসাব দেখে দাম মেটানো থেকে বিরত হলেন। তিনি ফিরোজ সাহেবকে বললেন, ” আমি একদিন ফাউজার সঙ্গে দেখা করতে চাই। ”
মেহর ফিরোজ সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন,” তার সঙ্গে তো আপনার দেখা হয়েই গেছে মশাই, আপনার বিনীত ভৃত্য এই ফাউজা হারামজাদা স্বয়ং। দয়া করে বিলটি মিটিয়ে দিন। সালাম – এ – আলাইকুম। ”
এ কথা বলে সে দ্রুত বেরিয়ে গেল।

One thought on “সাদাত হাসান মন্টো-এর গল্প নচ্ছার ফাউজা’র বাংলা অনুবাদঃ বিপ্লব বিশ্বাস

  • December 15, 2020 at 8:24 am
    Permalink

    দারুণ গল্প

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *