দেবাশিস সরকারের গল্প : নির্মাণের যন্ত্রণা অথবা যন্ত্রণার নির্মাণ

‘ধানের রসের গল্প’ বলতে গেলে ‘পৃথিবীর নরম অঘ্রাণের ‘ কথা মাথায় রাখা উচিত। তেমনি, দামোদরের চরে বসত করা লোকগুলোর কথা বলতে গেলে নেহেরু আর জিন্নার কথা মাথায় রাখা উচিত।এই প্রেক্ষিত মাথায় রেখেই আমি গিয়েছিলাম, গল্প খুঁজতে। ওঁদের দুঃখ, যন্ত্রণার ওপর যে পলি জমেছে সেই পলি খুঁড়ে টাটকা দুঃখকে স্পর্শ করতে!
গুছিয়ে গল্প করতে বসার পর বৃদ্ধ ভদ্রোলকটিকে বললাম,”একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমাকে জানানো হল, সে রাতেই আমাকে বাড়ি ছাড়তে হবে।আমার মা,বোনকেও আমার সাথে নিয়ে যেতে হবে।বোন সবে মাধ্যমিক দিয়েছে,রেজাল্ট বেরোতে তিনমাস দেরি।যে বাড়িটিতে এতদিন বেড়ে উঠেছি,যে বাড়িটিকে মনে করতাম নিজের বাড়ি, এক লহমায় তা আর নিজের রইল না! রাতের মধ্যেই গরুর গাড়ি ভাড়া করে,মা বোনকে চাপিয়ে রওনা দিলাম নিকটবর্তী বাসস্ট্যান্ড এর উদ্যেশ্যে।কোথায় নিয়ে গিয়ে মা, বোনকে তুলব কিচ্ছু জানি না!আপনার জীবনের সাথে কিছু মিল পাচ্ছেন ?মনে পড়ছে আপনার ভিটে মাটি ছেড়ে চলে আসার আগের রাতটার কথা? সেই রাতটার কথা বলুন! আপনার সেই রাতের বেদনাকে আমি ছুঁতে চাই!”
–কোতায় বারি আসিল আপনের?
“ক্যান ?”,মৃদু হাসি আমি,”বারির কতা জিগান ক্যান?”
–না -। পদ্মাপার তো অইবই। পুরানা কতা হইলেই এক্কেরে বুকির ভিতর হু হু কইরা উঠে। তবু জিগাই! কুন গ্রাম? বরিশাল থিকা জাওন লাগে মনে লইতাছে।
–বাঁকুড়ার এক গ্রামে বড় হয়েছি আমি।
–না না!আপনে রহস্য করতে আসেন! কওনে অসুবিদা কি?
–আমি সত্যি বলছি।
ভদ্রলোকের অবিশ্বাস ভরা চাহনি দেখে বলে ফেলি, ছোটবেলায় আমার বাবা মারা যাবার পর মা আমাকে আর বোনকে নিয়ে আমাদের দাদুর বাড়িতে আশ্রয় নেন। দাদু যতদিন ছিলেন একরকম চলছিল। দাদু মারা যাবার পর মেঘ ঘনাচ্ছিলই,মামীরা আর আমাদের রাখতে চাইল না। বোনটা বড় হচ্ছিল,বিয়ে দেবার দায়িত্ব তাদের ঘাড়ে চেপে বসবে,এই জন্যে।তো, সে রাতটার কথা আমার খুব মনে পড়ে! প্রায় দশ বছর আগের কথা।তবুও!আপনারা এসেছেন মুক্তিযুদ্ধের আগে পরে।আমার বছর কুড়ি আগে।মনে থাকা উচিত। বলবেন আমাকে?
ভদ্রলোক হ্যারিকেনের শিখা টা উস্কে দেন একটু, বিড়ি ধরান। দু মিনিট আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবেন।তারপর পাশে বসা স্ত্রীকে বলেন,”উনান খালি আসে? চা পাতা তো কিসু আসে মনে লয়। র-ই দ্যাও।
ওনার স্ত্রী উঠে যাবার পর বলেন,” কোটালিপারড়ায় আমাগো বাড়িত অতিথ আইলে আমার পরিবার মিস্টিমুখ না করাইয়া ছারত না।চা খান,যুত কইরা বসেন! যা শুনতে চান,সুইন্যা কি করবেন?
কথার খেই হারাতে দেওয়া চলবে না!দুঃখের,যন্ত্রণার গল্প আমার চাই! টপ করে বলে উঠি,”কোটালিপাড়ার কাছেপিঠে কোনো বিখ্যাত জায়গার নাম বলুন! না হলে আইডিয়া করতে পারছি না!”
–আমাগো শহর হইল আপনের ফরিদপুর। নাম শুইন্যা থাকবেন।
কত শুনেছি!”আপনার জীবিকা তো ছিল নিশ্চয়ই চাষবাস?”
–হ।
–নিশ্চয়ই হালের বলদ,দুধেল গরু – এসব ছিল?
ভদ্রলোক হঠাৎ ডুকরে ওঠেন,”ও -হো -হো-হো! গরুর কতা আর কইয়েন না! কইয়েন না! সব কিসু ব্যাবাক ভুইলা গেসি!খালি গরুগুলান! অবলা জীব সব! খুটায় বাইন্ধ্যা রাইখ্যা সে রাইতে ….!”কথা শেষ করতে না দিয়ে খপ করে যেন সে রাতটাকে আঁকড়ে ধরি আমি!”–হ্যাঁ! সে রাতের কথা বলুন!সোনাদানা টাকা- পয়সা সব পোঁটলাতে বাঁধলেন।গরুগুলো কি সব খোঁটাতেই বাঁধা রইল?মনে করে দেখুন, রাতের অন্ধকারে সবাইকে নিয়ে বেরোনোর আগে আপনি একবার গোয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, গরুগুলো কেউ ঘুমোচ্ছে, কেউ জাবর কাটছে! এমন সময়–“
— আপনের চা আইস্যা গ্যাসে। দ্যাখেন তো, খাওনের মতন হইসে কিনা!
ধূমায়িত চায়ের কাপ বরাবরই আমার কাছে লোভনীয় পানীয়। এই প্রথম, হয়তো এই শেষও আমি ব্যাজার মুখে ভদ্রমহিলার হাত থেকে চায়ের কাপ নিই।চুমুক দিয়ে বলে উঠি,” সে রাতে আপনার বাড়িতে আর রান্না হয়নি, না?মুড়ি বা চিঁড়ে খেয়েই–“
ভদ্রলোক বলে ওঠেন,” পশ্চিমা গাই সিল দুইডা। বাসুর চাইরডা।দুইডা গাইই পাঁচ-ছ সের দুধ তো দিসসিলই!কতজনরে কইলাম,শ্যাসম্যাস মিনতি তক কইরেসি!সবাই কইল,’ নিয়া কি করুম! তুমি কাল যাইবা, ত আমি পরশু যামু। তার আগেই যে ওরা আইস্যা সব কাইড়া নিব না, তার ঠিক কি!কেউ নিল না! গরুগুলান আমারে চিনত। এক্কেরে মাইনষের মতন–
বাধা দিয়ে বলি,”আহা– সেসব তো থাকবেই!গরুর কথা ছাড়ুন! মানুষের কথা বলুন।সেই তীব্র বেদনা,ঘর ছাড়তে হচ্ছে তাই নিস্ফল রাগ…,সে সব বলুন!”
–সে সব তো গতজন্মের কতা! আবসা আবাসা মনে আসে! বেনাপোলের বর্ডার পার হইয়া লবণহ্রদ ক্যাম্পে যেদিন আইলাম–
না-না! এদেশে আসার পর কি অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তা কিছুটা আঁচ করতে পারি। পড়েছি নানা বইয়ে।আপনি সে রাতটার কথা,বাংলাদেশের কথা বলুন!
–রাতের পর রাত দু চক্ষের পাতা এক করতে পারি নাই!লবণহ্রদে তবু খাওন জুটত। কলেরা যখন শুরু হইল–
–ক্যাম্পে কলেরা হয়েছিল নাকি?
–আপনি জানেন না ! আমি ত ভাবসি আপনে সব জাইন্যা শুইন্যাই—
–না না! সব কি করে জানব!এদেশে আসার পরে কি হয়েছিল, সে সব পরে শুনব। আজ আপনি শুধু সে রাতটার কথা বলুন! চলে আসার আগের রাতটা। সে রাতের যন্ত্রণার কথা বলুন!মাঝরাতে ঘর ছেড়ে বেরোলেন। অন্ধকারে–চুপিসাড়ে—!
ভদ্রলোকের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে গলায় যতটা পারা যায় ততটা আবেগ আনতে গলা কাঁপিয়ে আমি বলি।
কি যেন ভাবতে ভাবতে ভদ্রলোক বলে ওঠেন,”এহানেও গরু পুসসি একখান। যাই, ওরে কিসু বিসালি দিয়া আসি। বসেন আপনে–“
ভদ্রলোক উঠে যাবার পর ভদ্রমহিলা বলে ওঠেন,” আমার এক মামাতো ননদ সিল পাঁস মাইল দূরের এক গেরামে।বিয়া হয় নাই তখনো! খুব ডাকাবুকো মাইয়া! রাজাকার দলের কতা তো আপনে জানেন, তাদের এক ন্যাতা কয় কি,’অরে আমি বিয়া করুম। তিন দিন টাইম দিসি। বিয়া না দিলে তুইল্যা নিয়া যামু।’ আমরা ত চিন্তায় পাগল! আমার ননদ মাঝরাতে সালতি চইড়া, সারারাত সালতি বাইয়া–“
এসবই আমি পড়েছি, শুনেছি! ভদ্রমহিলা বলে চলেন, আমি কিছুই শুনি না।নিজের ওপর করুণা জাগে।আমার লেখক বন্ধুরা এতক্ষনে আলোড়ন তুলে ফেলার মতন একখানা গল্পের রসদ নিশ্চয়ই পেয়ে যেতেন। অন্তর্দৃষ্টি বা থার্ড আই টাই নেই আমার! ভদ্রোমিহিলা বলে চলেন, দুঃখের কথা, কষ্টের কথা।”দুঃখ কর অবধান/ দুঃখ কর অবধান/ আমানি খাবার গর্ত দেখ বিদ্যমান/” অন্নদামঙ্গলে কালকেতুর দুর্দশা বোঝাতে গিয়ে ভারতচন্দ্র আমানি খাবার গর্ত দেখিয়েছেন। এটা শিল্পসম্মত নয়! এভাবে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায় না।বরং, লেখকের প্রতি করুণা জাগে। এনারা যেসব বলছেন তা আমার লেখক সত্তাকে তৃপ্ত করছে না।
ভদ্রমহিলা বলে চলেছেন,আমি এসব ভাবছি! উঠে পড়ার আগে ভদ্রমহিলা কৈফিয়তের সুরে বললেন,”আপনে ওনার মনটা খারাপ কইরা দিলেন! এসব পুরানা কতা আমরা কই না।সে কারণেই উনি আর আইলেন না! হয়তো কানতেসেন কোথাও বইয়া!”
আমি শিউরে উঠি! এ কি করলাম আমি! কাউকে দুঃখ দেবার অধিকার তো আমার নেই!ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলি,” এক রাতের নোটিশে আমাকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল।আমি ভেবেছিলাম,এখানে এসে আমার দুঃখটা ভাগ করে নেব।আমি কি অন্যায় করলাম?”
ভদ্রমহিলা বরাভয় দেন,'”না না! একবার ক্যান, হাজারবার আসেন। আপনে আপনার কতা কবেন,আমরা আমাদের কতা কমু! আসলে অনেক যুগ বাদে ওপারের কতা হতাছে তো! তাই একটু–“
ভদ্রমহিলার প্রশ্রয়ে আরেক বিকেলে যাই। ঘন্টা তিনেক বাদে ফিরি। ঝুলিতে কিছু না নিয়েই! একটি দুধেল গাইয়ের কথা ভদ্রলোক বারবার বলতে থাকেন।গাইটি ওনার ছোটছেলের হাত,পা যত্ন করে চেটে দিত। অথচ ওনাকে মোটেই খাতির করতো না! ছোটছেলেটির তখন চার- পাঁচ বছর বয়েস। সুড়সুড়ি লাগছে তাই সে খিলখিল করে হাসতো।ওইটুকু বাচ্চা, ভালো করে হাঁটার ক্ষমতা নেই, তবু দুহাতে জড়ো করে পাঁচ আটি খড় নিয়ে গিয়ে গাইটাকে খেতে দিত।
–আপনার ছোট ছেলে কি করে?
একথার উত্তরে ভদ্রলোক অদ্ভুত হাসেন। পাশে বসা স্ত্রীকে বলেন,”সুজিতের কথা জিগায়। কমু?”
ভদ্রমহিলা দ্রুত উঠে যাবার আগে ঝাঁঝালো গলায় বলেন,”না। তুমি কিসু কইবা না। ভুইল্যা গেসি,ভুইল্যা থাকতে দেও।” ভদ্রমহিলা এরপর অদ্ভুত কণ্ঠে আমাকে বলেন,” আপনে আসেন এইবার!”
বুঝতে পারি, ভুল করে ফেললাম এখানের অধিকাংশ যুবক রাজমিস্ত্রি র কাজ করে,নয়তো রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে , কেও কেও পানের গুমটি। যুবতীরা হয় লোকের বাড়ি আয়া নয়তো কাজের মেয়ে।এঁদের ছোটছেলে বোধহয় সমাজবিরোধী,জেলে আছে অথবা মৃত।যাক গে! বলতে চাইছে না যখন, খুঁচিয়ে লাভ কি!
এরপর কয়েকটা দিন-‘বৃথা দিন যায় বয়ে/ মাথায় তুলসী,পেছনে তুলসী/ শুই শালগ্রাম হয়ে /’ এভাবে কেটে গেল।এক রবিবার সকালে সুকান্তি ওর নিজের লেখা একখানা চমতকার গল্প পড়ে শোনাল। আগের রাতেই শ্যামলের একটা ফাটাফাটি গল্প পড়লাম একটা ম্যাগাজিনে! আমার মাথা বিলকুল ফাঁকা! কোনো গল্পের বীজ পোঁতা যাচ্ছে না। আরেকবার যাবো? ওনারা কি আমার পছন্দমতো সে রাতটাতে একবার ফিরে যাবেন! কোনো মণিমুক্তো কি উঠে আসবে? ওনারা যদি আমার সঙ্গে কথা না বলেন ! আর বললেও সেই গরুর কথা যদি ওঠে! যাবো?
ভাবতে ভাবতে শেষমেশ সেদিন সন্ধ্যেয় বেরোতে যাচ্ছি,আমার স্ত্রী বলল,”তোমাকে তো অনেকদিন আগেই বলে রেখেছিলাম যে আজ সন্ধ্যায় আমি আমার দাদার মামাশ্বশুরকে দেখতে যাবো,ভুলে গেছো?”
–যাও না! আমার সঙ্গে তো যাবো বলো নি, তাহলে আমার বেরোনোতে আপত্তি কিসের !
–তাই ? গুল্টু কোথায় থাকবে?
এই রে! আমাদের পাঁচবছরের পুত্রকে খামোখা হাসপাতালে রুগীদের মাঝে নিয়ে যাওয়া যায় না আবার বাড়িতে একা রেখে যাওয়া যায় না! কি করি! সহসা মাথায় সমাধান এসে যায়! বলি,”ওকে আমি নিয়ে যাচ্ছি।” “কোথায় ? দামোদরের চরে?” ,স্ত্রীর প্রশ্নের মাঝেই বারণ করার সুর লুকোনো ছিল।
–চলুক না। যেতে যেতে আমি ওকে ওখানকার সম্পর্কে ব্রিফিং করে নেব।বড় তো হচ্ছে , শিখুক না কষ্টের, যন্ত্রণার গল্প কতরকমের হয়!”
আমাদের ছেলে তো আহ্লাদে আটখানা! সন্ধ্যাটা হোমটাস্ক করতে হোল না প্লাস একটা নতুন জায়গা বেড়ানো হবে!
রাস্তায় যেতে যেতে ওকে হুঁশিয়ারি দিই, “ওখানে একটা দাদু আর একটা ঠাম্মা যখন আমার সাথে কথা বলবে,চুপ করে শুনবি।বিরক্ত করবি না কিন্তু! ভাল্লাগছেনা বলে বাড়ি আসার জন্যে ঘ্যান ঘ্যান করবি না তো? আমার ছেলে সবেতেই ঘাড় নাড়ে।
গেলাম।দুরুদুরু বুকে।ভদ্রমহিলা ধান সেদ্ধ করছিলেন। বিশাল বড় গনগনে উনুনের ওপর বিশাল বড় কড়াই, তাতে ধান ভর্তি। ধানের চুড়া থেকে ভাপ উঠছে! আমার ছেলে তো দেখে হাঁ! আমি গাঁয়ের ছেলে ছোট থেকে এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত। ভদ্রমহিলা আমাকে দেখে বলে ওঠেন,”আসেন, আসেন! লগে হেইডা কেডা? পোলা মনে লইতাসে ?”
ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে আমার! একগাল গেসে বলি,”হ্যাঁ!”
–বসেন,বসেন! যাওয়ায় বসেন। ধানটা নামাই। হুনছনি? একবার আসো! ধানটা নামান লাগব।
ভদ্রলোক গোয়াল থেকে বেরিয়ে আসেন। হাতে একঘটি টাটকা ফেনা ওঠা দুধ।উঠোনে ঘটিটা নামিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে আপ্যায়ন করেন ।
একটা মাঝারি বাঁশ তুলে সেটা কড়াইয়ের দুইদিকে দুই হ্যান্ডেলের মধ্যে ঢোকান। বাঁশটির দুপ্রান্ত ওঁরা দুজনে ধরে কড়াইটা উঠোনের একপাশে নামান।উনোনের গনগনে আঁচ এই এতদূরে দাওয়াতে বসেও টের পাই।
গামছা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে ভদ্রমহিলা আমাদের কাছে আসেন।”ছিলেন কেমন?” প্রশ্নটি আমাকে করে ছেলের গাল টিপে বলেন,” কি নাম তুমার?” 
–পোলাপান কয়টি?” একগাল গেসে বলি,” ওই একটিই!”
–বৌমারে লইয়া আসেন একদিন ।
–আনবো।
আমার ছেলের থুতনি ধরে জিজ্ঞেস করেন, ” কি খাবা তুমি?”
–কিছু না মাসীমা! এইমাত্র এক গেলাস দুধ খেয়েছে তো, এরপর একেবারে রাতে খায়।সময় থাকলে বসুন না,গল্প করি।
ওনারা আমাদের মুখোমুখি বসেন। বিনা ভূমিকায় ভদ্রমহিলা বলতে শুরু করেন,”আমার ভাসুর সিলেন খুব রাশভারী মানুষ। খুব সাহস!একখান ঘটনার কতা কই! আমাদের গেরামে গরুর গাড়ি জাওনের রাস্তার দুপাশে ঘন ঘন গাস। জঙ্গল কইলেই হয়।মাইয়া মাইনষের তো দিনের বেলাতেও ঘর থিকা বাইর হওনের হুকুম সিল না, পোলাপানগুলাও দিনের বেলায় ওই রাস্তায় জাওনের সাহস পাইত না।হঠাৎ কইরা একরাতে ওইহানে অপদেবতা দেখা দিলেন!
“অপদেবতা! মানে ভুত?”, মুচকি হেসে আমি বলি।আমার ছেলের দু চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে!
–হ। ত, শোনেন! আমার ভাসুর একদিন কন কি, ‘ওইসব ভুত টুত কিসু না। ভীতু মাইনষের মনের ধারণা।’ এক অমাবশ্যার রাতে একখান লাঠি আর একখান লণ্ঠন লইয়া তিনি চললেন ওই জঙ্গলে!তারপর-
বাধা দিয়ে বলি,”আপনাদের গেরাম থিকা বাইর হওনের ওই একটাই রাস্তা, না ?আমাদের গেরামেও তাই সিল! “ওনারা সায় দেন। আমি সুযোগ হারাতে চাই না।খপ করে বলে উঠি,”তাহলে সে রাতেও যখন বেরিয়ে এসেছিলেন,ওই রাস্তা দিয়েই তো আসতে হয়েছিল! তখন আর ভুতের ভয় ছিল না, বলুন ?বলুন না, সে রাতটার যথা! অনেকদিন ধরেই তো ঘর ছাড়ার জন্যে একটু একটু করে তৈরি হচ্ছিলেন।সন্ধ্যাবেলায় দালাল এসে বলে গেল,সেই রাতেই আপনাদের বর্ডার পার করিয়ে দেবে। তাড়াতাড়ি গোছগাছ শুরু করলেন! এমন সময়–“
” কে কইল আপনারে ?আমরা এই দ্যাশে চইলা আসার কথা কুনোদিনও ভাবি নাই! “, ভদ্রলোক বলে উঠলেন, বেশ ঝাঁঝিয়ে!
–মানে?
–ক্যান আসুম ? পাঁস কাঠা জায়গা নিয়া দুইতলা পাকা বারি। বারির গায়ে পুস্করিণী। তাতে বারো মাস মাছ! ক্যান আসুম?
–কিন্তু, মানে—-
ভদ্রলোক আমার দিকে দৃকপাত না করে বলে চলেন ঘোর লাগা মানুষের মতো!”সন্ধ্যায় ওরা আইল!
তখন উঠানে পাঁচখানা বড় বড় কড়াইয়ে ধান সেদ্ধ হতেসিল।দুইডা ঝি আর বারির সবাই উঠানেই আসি।সন্ধ্যায় তো ঘর থিকা বাইর হওনের উপায় সিল না! অরা আইল ! সদর দরজা ভাঙার জন্যি ঢেঁকী আনসিল।হুড়মুড় কইরা, খুলা তরবারি লইয়া চিৎকার করতে করতে উঠানের মাঝখানে! সবার চক্ষু জ্বলতাসে !হগ্গলেই তো চেনা । মকবুল কইল,”খুৱা! অনেকবার কইসি,’হিন্দুস্তান চইলা যাও, চইলা যাও! আইজ যাতি হইব ! খুৱা কই,তাই বারির মাইয়া মাইনষের গায়ে হাত দিমু না। যে যা পইরা আছ, অহনি বাইর হইয়া যাও!”
“তারপর?”, উৎকন্ঠায় আমার হৃৎপিন্ড যেন গলার কাছে এসে ঠেকে গেছে!
–আমার দাদা, যে ভুতের ভয় করতো না, সে আউগাইয়া গেল,’যদি না যাই?’ একটা শয়তান ছুইট্যা আইসা তরবারিটা দাদার প্যাটে ঢুকাইয়া দিল!
–তারপর আপনারা বেরিয়ে পড়লেন ?
“না!”,ঘোরলাগা গলায় ভদ্রলোক বলে চলেন,” আমি আউগাইয়া গেলাম!সবারে কাইট্টা ফ্যাল! যামু না!”
–তারপর?
উত্তর বা দিয়ে ভদ্রলোক তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন।আমার ছেলেটাকে তুলে নিয়ে সেই গনগনে আগুনের দিকে ছুটলেন!উননের কাছে গিয়ে খলখল হাসতে হাসতে আমার ছেলেকে ওই গনগনে আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার ভঙ্গি করতে শুরু করলেন!আমি বিকট চিৎকার করে উঠি! ওই গনগনে উনুনের ওপর আমার ছেলেকে দুহাতে শূন্যে ঝুলিয়ে খ্যা খ্যা করে হাসতে হাসতে বলেন,” দিমু? ফ্যালায় দিমু?”
আমার ছেলে প্রাণভয়ে চিৎকার করে ওঠে!আমি ভয়ংকর চিৎকার করে উনুনের কাছে যাই,লোকটাকে মারবো! আমার ছেলেকে যদি পাগল টা উনুনে ফেলে দেয়, আমি ওকে খুন করবোই! লোকটার গায়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়বার আগেই পাগলটা আমার ছেলেকে মাটিতে নামিয়ে দেয়।তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে ‘হো হো হো হো’ করে হাসে কি কাঁদে বুঝতে পারি না! আমার ছেলে হেঁচকি তুলতে থাকে।ছুটে গিয়ে ওকে জাপটে ধরি।ভদ্রমহিলা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন।লোকটা টলতে টলতে আমার সামনে হেঁটে আসে।বিচিত্র হেসে বলে,” মাইরব্যান ? মারেন ! মারেন! আপনি পারেন, আমি পারি নাই! আমার সুজিতরে উনানে ফেলাইসিল! সে চিৎকার কইরা একবার উনান থিকা বাইর হওনের চেষ্টাও করসিল! একটা লাঠির বাড়ি তারে উঠান থিকা উঠতে দেয় নাই! আমার দাদা, প্যাটে তরবারি লইয়া উঠানে রক্তমাখা পইরাসিল! আমার দুইধারে দুইডা তরবারি আমারে দুজিতের কাসে যাইতে দেয় নাই! আমি বাপ হইয়া খাড়াইয়া খাড়াইয়া দ্যাখসি সন্তানের মরণের কষ্ট !”
এরপর লোকটা মুখ ভেঙচে বলে ওঠে, ” যন্তনার গল্প শুনতি চান? যন্তনার ঘরের দরজায় খাড়াইয়া আপনার হাঁকুপাঁকুডা মনে রাখেন গিয়া। অন্দরেই তো আইলেন না !আমি-আমরা এই যন্তনার ঘরেই বাস করতে আসি আইজ ত্রিশ বৎসর! যান ! নিজির ঘরে যান! হুঁ! যন্তনার গল্প শুনতি আসে এইহানে!
চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আশেপাশের বাড়ি থেকে অনেকেই এসে হাজির হয়েছিল! তারা সবাই নির্বাক ছিল। আমিও!
লেখক পরিচিতি
দেবাশিস সরকার
কথাসাহিত্যিক। 
জন্ম : ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ।
পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে থাকেন।
প্রকাশিত গল্পের বই–
১.হিপোক্রেটিসের বাঙালী বাচ্চা, প্রকাশক অমৃতলোক সাহিত্য পরিষদ। 
২. ইপ্সিতা কখন আসবে, প্রকাশক দিয়া পাব্লিকেশন।

2 thoughts on “দেবাশিস সরকারের গল্প : নির্মাণের যন্ত্রণা অথবা যন্ত্রণার নির্মাণ

  • June 24, 2022 at 5:13 am
    Permalink

    এই গল্পে যন্ত্রণাজনিত এমপ্যাথি রূঢ় বাস্তবে বিনির্মিত হয়। আর কখন যে গল্পের আঁচড়ে জীবনও বোনা হয়ে যায় সে টেরটি পাওয়া যায় না। এমনই দক্ষতায় বোনা আখ্যান।

    Reply
  • June 24, 2022 at 3:33 pm
    Permalink

    ধন্যবাদ উপল! আমরা অনেকেই যেহেতু দু-চার কলম লিখি তাই নিজের কোনো আলোচনায় এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য লেখক সম্পর্কে নীরব থাকি।খামোখা অন্যকে মাইলেজ দিই কেন! তুমি এক ভিন্ন ধারার প্রতিষ্ঠিত কথাকার , তাই তোমার এই মূল্যায়ন আমাকে বিশেষ তৃপ্তি দিয়েছে! আগতহীহী পাঠকদের জন্যে জানাই প্রকাশিত গল্পটির প্রতিটি লাইন ঘটিত ভাবাস্তব,কেবল আমার পুত্রকে নিয়ে ওনাদের বাড়িতে যাওয়াটুকু নির্মিত!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *