কারমেন লাফোরেত’এর গল্প: ফিরে আসা

বাংলা অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

খুলিয়ান ভাবছিল- ওটা বাজে আইডিয়া ছিল। কাচে মাথা ঠুকছিল সে। স্বচ্ছ চামড়ার তলায় যত্ন করে আঁকা ঠাণ্ডা ভেজা অনুভূতিটা তার হাড়ের ভেতরে সেঁধিয়ে যাচ্ছিল। ক্রিসমাসের আগের রাতে তাকে বাড়ি পাঠানোই একটা বাজে ভাবনা ছিল। তার ওপর একেবারে বরাবরের মত বাড়ি পাঠানো। 
অবশ্য এখন সে পুরোপুরি সুস্থ। খুলিয়ান লম্বা লোক। দেহটা কোটের মধ্যে খাপে খাপে আঁটানো। সে ব্লন্ড মানুষ, সোনালি চুল, চিবুক আর চোয়ালের হাড় একটু উঁচিয়ে থাকা, যেন রোগা চেহারার ওপরে ওটাই দেখবার জিনিষ। যাই হোক এখন তার বেশ স্বাস্থ্য হয়েছে। বউ যতবার ওর ভাল চেহারার দিকে তাকায় ততবার গলায় ক্রশ এঁকে নেয়। একটা সময় খুলিয়ান ছিল একমুঠো দলাপাকানো শিরার মত দেখতে। চপস্টিকের মত লম্বা ঠ্যাং, আর লম্বা খোঁচা খোঁচা দুটো হাত। দুবছর আগেও যখন এ বাড়িটায় এসেছিল ওরা, তখনও জায়গাটা অচেনা নতুন লাগত। বাড়ি থেকে বেরোতই না পারতপক্ষে। সেইসব দিনগুলোয় এরকম দেখতে ছিল সে।
-খুব অধৈর্য! না? … তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে শিগগিরি ওরা চলে আসবে এখানে। চারটের ট্রেন আসার সময় হয়ে এল। এর পরের ট্রেনটা সাড়ে পাঁচটায়। ওটা ধরতে পারবেন আপনারা। … আজ রাতে নিজের বাড়িতে ক্রিসমাসের আগের রাত উদযাপন করা… আমার ভাল লাগবে খুলিয়ান… গাইয়ো-র প্রার্থনার সময় সভায় যোগ দিতে তুমি যদি পরিবারের কাছে পৌঁছে যাও। আসলে ধন্যবাদ জানানোর জন্যই তো যাওয়া … বাড়িটা যদি এত দূরে না হত, …আজ রাতে তোমাদের সবাইকে নিয়ে থাকতে পারলে দারুণ হত,… তোমার বাচ্চারা দারুণ মিষ্টি, খুলিয়ান..। সবচেয়ে বড় কথা ওখানে একজন আছে, সব্বার ছোট সে, ঠিক ছোট্ট যিশুর মত দেখতে অথবা যেন সন্ত খুয়ান। কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, নীল চোখ। মনে হয় বড় হয়ে ও একজন দারুণ সহকারী পাদ্রী হবে। মুখটাও বেশ চালাক চতুর।

সন্নাসিনীর কথা শুনতে শুনতে মগ্ন হয়ে পড়েছিল খুলিয়ান। এই সিস্টার মারিয়া দে আসসুনসিয়ন ছিলেন বেঁটেখাটো মোটা চেহারার মানুষ, হাসিহাসি মুখ আর আপেলের মত মিষ্টি গাল। খুলিয়ান তাকে খুব পছন্দ করে। হেঁটে যাবার জন্য তৈরী হয়ে সেই বিশাল ঠাণ্ডা ভিজিটিং রুমে বসেছিল। নিজের ভাবনায় এত ডুবেছিল যে ওঁর সেখানে এসে পৌছনো টেরই পায় নি। উনি এসেছেন আন্দাজ পায় নি। কারণ ঈশ্বরই কেবল জেনে থাকবেন এইসব মহিলারা একগাদা ভারী ভারী স্কার্ট ব্লাউজ মাথায় ওড়না পরার পরেও কিভাবে নিঃশব্দে চলাফেরা করতে পারেন। পরে অবশ্য খুলিয়ানকে দেখে হাসলেন উনি। ওর তখনকার জীবনের পক্ষে সেটাই ছিল শেষবারের মত হাসি দেখা। তার চোখদুটো জলে ভরে গিয়েছিল। কারণ বরাবরই সে খানিক আবেগপ্রবণ মানুষ, তবে সেবার ব্যাপারটা প্রায় অসুখের মত হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। – সিস্টার মারিয়া দে লা আসসুনসিওন… আমি, গাইয়োর এই প্রার্থনা সভায় আপনাদের কাছে এসে আপনার কথা শুনতে চেয়েছি। আমি নিশ্চিত আমাকে কাল সকাল পর্যন্ত থাকতে দেবেন আপনারা। খ্রীস্টমাস উপলক্ষ্যে নিজের পরিবারের সঙ্গে ঢের সময় কাটিয়ে ফেলেছি এবার … আর একদিক থেকে আপনারাও তো আমার পরিবার। আমি, আমি আপনাদের কৃপাধন্য সিস্টার। 

 
কিন্তু! বেচারী! এসো এসো, তোমায় এত কিছু বলতে হবে না। তোমার স্ত্রী কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে তোমাকে নিতে। তখনই তুমি সবকিছুর ভেতরে নিজেকে ফিরে পাবে। কাজ করতে থাকবে। এ সমস্ত কিছু ভুলে যাবে। এসব ঘটনাগুলো স্বপ্নের মত মনে হবে তোমার…

কিছুক্ষণ পরে সিস্টার মারিয়া দে আসসুনসিওনও উঠে চলে গেলেন। এবং খুলিয়ান আরও একবার একলা বসে রইল ওইসব তিক্ত মুহূর্তগুলো সঙ্গী করে। সেই পাগলাগারদ ছেড়ে আসার স্মৃতি মনে পরলে ওর কষ্ট হত। সেই হতাশা ও মৃত্যুর জায়গাটাও কিন্তু খুলিয়ানের কাছে এক ধরনের আশ্রয় ছিল। একটা মুক্তি… কয়েকমাস আগে পর্যন্তও যখন তার চারপাশের সবাই ভাবছিল সে সেরে গেছে, তার সামনে একটা প্রাপ্য বাড়িও রয়েছে… এসব কথা বলতে বলতে ওরা এমনকী তাকে গাড়ি চালাবার কথাও বলছিল! এটা তো আর ইয়ার্কির বিষয় নয়।

আশ্রমের সর্বোচ্চ কর্ত্রী স্বয়ং সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিজের এবং সিস্টার মারিয়া দে আসসুনসিওনের সঙ্গে তাকে বাজার করতে যেতে অনুমতি দিলেন। খুলিয়ান তো জানত এঁরা কতটা মর্যাদা ও সতর্ক আচরণ পাবার যোগ্য! তার মত এক পাগলের ক্ষমতার ওপরে এঁদের ভার দিতে গিয়ে কতখানি বিশ্বাস তার ওপর রাখা হয়েছিল… হ্যাঁ একজন মেজাজী পাগল। কিন্তু সে তো আর ওঁদের ঠকাতে পারে না। তার দক্ষ হাতে গাড়িটা ভালই চলেছিল এমনকী রাস্তার মাঝের বাম্পারগুলোও ওঁরা টের পান নি। ফেরার পর সবাই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। গর্বে বুকটা ভরে গিয়েছিল তার। লাল হয়ে উঠেছিল সে। 

 
খুলিয়ান

এখন সে সিস্টার রোসার সামনে দাঁড়িয়ে। মহিলার চোখদুটো গোল আর লাল, মুখ গহবরও গোল। সিস্টার রোসাকে অবশ্য সে ততটা পছন্দ করে না, বলা যায় একেবারেই তাঁকে পছন্দ করে না। জীবনে খারাপ কিছু ঘটার কারণ হিসাবে সবসময়ই ওঁকে মনে করে। অবশ্য তার জানা নেই ওখানে থাকবার সময় প্রথম দিককার দিনগুলোতেই পাগলাগারদের লোকেরা সিস্টারকে বলে দিয়েছিল যৌন হেনস্থা করতে একটা শার্টের চাইতে বেশি শক্তি খুলিয়ানের প্রয়োজন হয় না। সিস্টার রোসা সেজন্যই বোধহয় সারাজীবনের মত খুলিয়ানের ব্যাপারে আতংকগ্রস্ত থাকবেন। এখন হঠাৎ করে খেয়াল হল সিস্টারকে চেনা চেনা কার মত যেন দেখতে। ওহ ওঁকে এর্মিনিয়ার মত দেখতে। এর্মিনিয়া তার বউ, যাকে সে খুব ভালবাসে। জীবনে অনেক কিছু থাকে সব বুঝে ওঠা যায় না। সিস্টার রোসা কিনা তার নিজের বউয়ের মত দেখতে। যাই হোক, কিংবা হয়ত সে কারণেই সিস্টার রোসাকে খুলিয়ান ঠিক হজম করতে পারে না। 

 
খুলিয়ান, তোমার জন্য একটা সভা ডাকা হয়েছে। ফোনে আসতে চাও? মাতাজী বললেন তিনি নিজে থাকবেন সেক্ষেত্রে।

মাতাজী হলেন সুপিরিয়র সিস্টার নিজে। এখানে সবাই ওঁকে এ নামে ডাকে। এই টেলিফোনের কাছে যাওয়া ব্যাপারটা খুলিয়ানের কাছে দুঃস্বপ্নের মত ছিল।

এর্মিনিয়া ফোন করত। তারের ওপ্রান্ত থেকে কীরকম কাঁপাকাঁপা গলায় কথা বলত। ওকে বলত বউয়ের কথা সে যদি না শোনে তাহলে নিজে নিজেই যেন সে ট্রেন ধরে চলে আসে। 

 
তোমার মায়ের কিছু হয়েছে… নাঃ অসুখ বিসুখের ব্যাপার না, ওই লিভারের পুরনো ব্যাথাটা… কিন্তু বাচ্চাদের কাছে ওঁকে একলা ফেলে যেতে চাই না। তাই আগে ফোন করতে পারি নি… একলা বাড়িতে ওঁকে ব্যথা সহ্য করতে ফেলে রেখে যেতে চাই নি…

হাতে একটা টেলিফোন ধরা। ওটা ছাড়া খুলিয়ান বাড়ির কথা বেশি ভাবত না। সে কেবল ভেবেছিল রাত্তিরটা একসঙ্গে থাকতে পারবে। মঠের ভেতর বেথলেহেমের আলো সাজিয়ে জ্বালানোর কাজে হাত লাগাতে পারবে। ক্রিসমাসের আগের রাতের জমকালো খাওয়াদাওয়া করতে পারবে। সমবেতভাবে সবার সঙ্গে ক্যারল গাইতে পারবে। খুলিয়ানের জন্য এসমস্ত কাজই অনেকখানি গুরুত্বের। 

 
কাল সকাল পর্যন্ত আমি হয়ত যাচ্ছি না,… ভয় পেও না। না না কোন কিছুকেই ভয় পেও না। তবে যদি তুমি না-ই আসো সেক্ষেত্রে মাতাজীদের আমি কিছু সাহায্য করতে চাই; এইসব উৎসব টুৎসবে বড্ড হইহল্লা হয়… হ্যাঁ, খাবার সময় থাকতে পারব… বড়দিনে বাড়িতেই থাকব। পাশে বসে সিস্টার রোসা গোল চোখ আর গোল মুখগহ্বর নিয়ে ওকে লক্ষ্য করে যাচ্ছিলেন। উনিই ছিল একমাত্র মানুষ যার কাছে সে কম কৃতজ্ঞ। সিস্টার রোসা একমাত্র মানুষ যাকে চিরকালের মত ছেড়ে যেতে পারলে খুলিয়ান খুশি হত… চোখ নামিয়ে সে বিনয়ের সাথে মাতাজীর সঙ্গে কথা বলল। একটা উপকার চাইল।

পরদিন শহরে ক্রিসমাসের ছাই ছাই শিলাবৃষ্টির আকাশে একটা ট্রেন খুলিয়ানের দিকে এগিয়ে এসেছিল। সে যাচ্ছিল মুরগী টার্কি আর তাদের মালিকে ঠাসাঠাসি একটা থার্ড ক্লাস কামরায় চড়ে। দেখে মনে হচ্ছিল ভাগ্যবানেরাই এমন সুযোগ পায়। একমাত্র কপাল জোরেই খুলিয়ান কালো সুতোয় সেলাই করা কোটটা পরেছিল আর সঙ্গে ছিল তার স্যুটকেস। অত ঠাণ্ডায় ওটাই তাকে বাঁচাচ্ছিল। শহরের দিকে লোকজন যত এগোচ্ছিল শহরের গন্ধের ঝাপট তাদের নাকে আসছিল। চোখ ধাক্কা খাচ্ছিল বিশাল বিশাল কলকারখানা আর শ্রমিকের বাড়ি ভরা গিজগিজে জনপদের বুননের গায়ে। গত রাতের আনন্দের কথা ভেবে খুলিয়ানের কষ্ট হচ্ছিল, এত খাবার খেয়েছিল সে। এত রকম পোশাক পড়ে আনন্দ হইহুল্লোড় করেছিল। এমন গলা ছেড়ে চিৎকার করে গান গেয়েছিল। যুদ্ধের সময় সঙ্গীদের নিয়ে ব্যারাকে থাকাকালীন দুঃখ হতাশার সময়ে যেমন গলায় গাইত ঠিক সেরকম।

ক্রিসমাসের আগের রাতে খুলিয়ানের অত উষ্ণ ও আরামে থাকার অধিকার তো ছিল না, কেননা বহু বহু বছর আগে তার নিজের বাড়িতেও এইসব উৎসবের রাতগুলোয় তেমন মনে রাখার মত কোন সময় কাটত না। বেচারি এর্মিনিয়া হয়ত যাহোক কোন একটা পোশাক পরত, আর অগুনতি বাদাম তক্তি বানাত, রঙবেরঙের ডিজাইন করা মিষ্টি আলু সেদ্ধ মাখা বানাত ছেলেমেয়েরা যা রোজ খাবারের পরে আধঘন্টা ধরে চিবিয়েই যেত… অন্ততঃ শেষ যেবার তার বাড়িতে ক্রিসমাসের আগের রাতের যে উৎসবটা হয়েছিল এমনটাই কেটেছিল মনে পড়ে। তারপর তো বেশ কমাস খুলিয়ানের কাজই ছিল না। যখন গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছিল এসব তখনকার ঘটনা। বরাবর তার অফিস বেশ সাজানো গোছানো থাকত। রোজ পাহাড়প্রমাণ সিঁড়ি ধোয়ামোছা করত সে। সিঁড়ি নিয়ে এতকিছু করতে হত যে বেচারি তা নিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকত। তাছাড়া যেসব খাবার সে কস্মিনকালেও দেখে নি কখনও কখনও সেসবের কল্পনাতেও ডুবে থাকত। এর্মিনিয়া তখন দ্বিতীয়বারের মত গর্ভবতী ছিল। তখন ওর ভয়ানক খিদে পেত। ঠিক খুলিয়ানের মতই ও ছিল রোগা আর লম্বা। সোনালি চুলের যুবতী হওয়া সত্ত্বেও মোটা চশমা আর নম্র বিনয়ী স্বভাবের… সেই এর্মিনিয়া যখন জলের মত পাতলা স্যুপ আর সিদ্ধ মিষ্টি আলু খেত তা দেখে খুলিয়ান নিজের খাবার খেতে পারত না। মিষ্টি আলু সিদ্ধ আর স্যুপ ছিল তখন প্রতিদিনকার মেনু। পুরো শীতকাল জুড়ে আচ্ছন্নের মত খুলিয়ানের বাড়িতে সকালে রাতে একই মেনু থাকত তখন। বাচ্চারা ছাড়া বাকিদের প্রাতঃরাশ জুটত না। ইস্কুলে যাবার আগে বাচ্চারা যখন তাদের গরম দুধের নীলচে গ্লাসে চুমুক দিত এর্মিনিয়া গভীর মনোযোগে সেদিকে তাকিয়ে থাকত… আগে খুলিয়ান বেশ ভোজনরসিক ছিল। পরিবারের লোকেরা তাই বলত। তারপর খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল সম্পূর্ণ… তবে বাকিদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো খারাপ হয়েছিল, কারণ মাথা হালকা হয়ে যাচ্ছিল দিন দিন আর হিংস্র হয়ে উঠছিল তারা। তারপর একদিন, বহুদিন ধরে ভেবে ভেবে তার সাধের বাড়িটা যেখানে একটা গ্যারেজও ছিল এককালে, যেখানে শোবার ঘরে রাখা খাটগুলো দারুণ সুন্দর হয়ে উঠছিল দিনে দিনে। আর সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার পরে সে যখন মা আর এর্মিনিয়াকে মেরে ফেলতে উদ্যত হল ঠিক তখনই ওরা তাকে শার্ট ধরে টানতে টানতে বাড়ির বাইরে টেনে আনে… তবে এসব কিছুই ঘটে গেছে ঢের দিন হল… বলতেই হবে তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ের জন্য ব্যাপারটা হয়েছিল। তবে এখন সে সুস্থ হয়ে গেছে। বেশ কমাস হল সেরে গেছে। অবশ্য সন্ন্যাসিনীরা এখনও ওকে বড্ড স্নেহ করেন, এখানে আরো কিছুদিন থাকতে অনুমতি দিয়েছেন… অন্ততঃ সামনের ক্রিসমাস পর্যন্ত। হঠাতই তার খেয়াল হল কতখানি কাপুরুষের মত সে এমন সুযোগ খুঁজছে। তার বাড়ি বরাবর রাস্তাটা রাস্তার পাশের ঝলমলে দোকানের আলোয় আলোময়। কেক পেস্ট্রির দোকান থেকে ভেসে আসা সুগন্ধে ম ম করছে। ওরকমই একটা পেস্ট্রির দোকানে দাঁড়িয়ে পড়ল কেক কেনার জন্য। তার কাছে কিছু পয়সা আছে, এটা কিনে খরচ করবে সে। মঠে থাকার দিনগুলোতে এত মিষ্টি খেতে পেত সে যে মিষ্টিতে অরুচি ধরে গেছিল। তবে পরিবারের লোকজনদের কাছে অবশ্য ব্যাপারটা তেমন নয়।

বাড়ির সিঁড়ি ভেঙে বেশ পরিশ্রম করে উঠল, একহাতে স্যুটকেস অন্য হাতে মিষ্টির বাক্স। তার ফ্ল্যাট বেশ উঁচু তলায়। এখন হঠাতই তার বড্ড ইচ্ছে করছে মাকে জড়িয়ে ধরতে। বরাবর হাসিমুখের সেই নারী, সবসময় যন্ত্রণা চেপে নিজের অসুখ লুকিয়ে রাখে যে মানুষ।

চারটে ভাঙাচোরা দরজা, কবেকার পুরনো সবুজ রঙ করা দেওয়াল, এগুলোর একটা হল তার বাড়ি। সে ডাকল।

এর্মিনিয়ার কোলে তার রোগা রোগা হাত দিয়ে কাঁখে জড়িয়ে রাখা বাচ্চাদের চিৎকারের আওয়াজ আর রান্নাঘরের ধোঁয়ায় সে একেবারে চাপা পড়ল। গরম স্ট্যুর ধোঁয়া বের হচ্ছিল। 

 
বাবা! আমাদের জন্য টার্কি আছে!

এটাই ছিল তাকে বলা ওদের প্রথম কথা। বউকে দেখল। বড্ড বুড়িয়ে গেছে, বড় ফ্যাকাশে। বিশেষ করে শেষবার গন্ডগোলটার পর থেকে। তবে এখন গায়ে নতুন উলে বোনা শাল জড়ানো। খাবার ঘর নানারকম লজেন্স, মিষ্টি আর ফিতে ভরা ঝুড়িতে ঝলমল করছে। 

 
তুমি… তুমি লটারি পেয়েছ নাকি?
 
না খুলিয়ান… তুমি যখন বেরিয়ে গেলে তখন কয়েকজন মহিলা এসেছিলেন… মঠ থেকেই হবে, তুমি তো জানো… ওঁরা আমাদের জন্য অনেক করেছেন ; আমাকে কাজ দিয়েছেন একটা, তোমাকেও কোন না কোন কাজ খুঁজে দেবেন, একটা গ্যারাজে…

গ্যারাজে? হুমম একজন প্রাক্তন পাগল মানুষকে ড্রাইভারের চাকরি দেওয়া বেশ ঝুঁকির। কিংবা হয়ত মেকানিকের চাকরি। খুলিয়ান তার মাকে দেখতে গেল। চোখে জল মায়ের, তবে হাসি হাসি… চিরকাল যেমন হাসিখুশি মুখ থাকে।

দুম করে আবার কাঁধে দায়িত্ব অনুভব করতে লাগল সে… সেই উৎকণ্ঠা। সেই বিরাট পরিবার যারা দল বেঁধে তার কাছে এসেছে যেন সে মঠ থেকে পাওয়া দাক্ষিণ্যের হাত থেকে তাদের উদ্ধার করতে পারে। আবার তাদের ক্ষুধার্ত রাখবে সে, নিশ্চিতভাবেই… 

 
কিন্তু খুলিয়ান, তুমি সুখী নও? আমরা সবাই একসঙ্গে হয়েছি… তাও আবার ক্রিসমাসের দিনে সবাই এক জায়গায়… আহ্‌ কী দারুণ ক্রিসমাস! দেখো!

আরও একবার ওরা তাকে ঝুড়ি ভর্তি উপহারগুলো দেখায়, মিষ্টি চকচকে তাদের ছেলেমেয়েদের মুখ। আর সে, সেই রোগা পাতলা, পরনের কালো কোট আর একটু ঠেলে বেরিয়ে আসা বড় বড় দুঃখভরা চোখের মানুষ… মনে হচ্ছিল ক্রিসমাসের দিনটা যেন আবার তাকে শৈশব থেকে বের করে আনছে যাতে সে বর্তমান দেখতে পায়। মনের সবটুকু নিষ্ঠুরতা নিয়ে আর একবার তাকিয়ে দেখে সবকটা উপহার… তার বরাবরকার জীবন।

লেখক পরিচিতি: কারমেন লাফোরেত, স্পেনের বার্সিলোনায় ১৯২১ সালে জন্ম হয় এই বলিষ্ঠ সাহিত্যিকের। বহু উপন্যাস গল্পের রচয়িত আএই মরমী সাহিত্যিক এর প্রায় পুরো লেখক জীবনই ডিক্টেটর ফ্রাঙ্কোর সময়কালে কেটেছিল। সেই কঠোর সভ্যতা বিমুখ প্রতিকূল পরিবেশে থেকে নারীর অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন এই নারী। তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসের নাম Nada বা কিছু না বহু পুরষ্কারে ভূষিত। পাঁচ সন্তানের জননী এই সাহিত্যিক শেষ জীবনে অ্যালঝাইমার রোগে আক্রান্ত হন এবং ২০০৪ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন।
 
 

অনুবাদক পরিচিতি:

জয়া চৌধুরী
কবি। অনুবাদক। গল্পকার।
কলকাতায় থাকেন।

One thought on “কারমেন লাফোরেত’এর গল্প: ফিরে আসা

  • October 27, 2021 at 7:28 pm
    Permalink

    অসাধারণ গল্প ও অনুবাদ

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *