নাহার তৃণা’র গল্প: অদৃশ্য খরস্রোত

>এক<
গল্পটা এখনো মাথায় দানা বাঁধেনি। এক লাইনও না। প্রথম শব্দটিও না।
গল্পটি কেবল একটি বিন্দুতে স্থির হয়ে আছে
( . )
বিন্দু এবং দুপাশে দুটি অদৃশ্য প্রহরী দুটো ধনুক হাতে দাঁড়িয়ে আছে বিপরীতমুখী হয়ে। 
 
বিন্দুটিকে নিয়ে ভাবছি। বেচারা একটা, একা এই দুটো ধনুকের বিরুদ্ধে পেরে উঠবে না। দুটো ধনুক আকারে তার কয়েকগুণ বড়। প্রহরীদের শক্তি নিশ্চিতভাবে বিন্দুটির চেয়ে বেশী। কিন্তু তাকে গল্প তৈরী করতে হলে বাধাকে অতিক্রম করতেই হবে। স্থির বসে কোন ঘটনার জন্ম হয় না। 
 
চলমান ঘটনার সমন্বিত প্রকাশই একটি গল্পের কাঠামো তৈরী করতে পারে। বিন্দুটির মাথার উপরে আকাশ। পায়ের নীচে মাটি। সে চাইলে আকাশপথে ভেসে বেড়ানো মেঘের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করতে পারে কিংবা পায়ের নীচের ধুলোদের সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে পারে। 
 
কিন্তু না মেঘ না ধুলো, কারোরই সময় নেই। মেঘগুলো উড়ে উড়ে উত্তরের হিমালয়ের দিকে চলে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের উতল হাওয়ার ধাক্কা খেয়ে। আর ধুলোরা আসন্ন বৃষ্টির আশঙ্কায় পিঁপড়ে দলের জন্য ঘর তৈরীতে ব্যস্ত। বিন্দুটি পড়লো মহামুশকিলে। বৃষ্টি এলে তাকে বেঘোরে ভিজতে হবে, ঝড় এলে তাকে উড়িয়ে নেবে।
 
বিন্দুটিকে সকালে জাগিয়ে বলা হয়েছিল নদীর দিকে চলে যেতে। নদী তীরে একটা ডিঙি বাধা। আরো বলা হয়েছে, সেই ডিঙির মাঝির কোচড়ে বাধা আছে একটি মাছের ঝোলা। সেই ঝোলাতে জমে আছে কয়েকটি টাকি পুঁটি মাছের জ্যান্ত শরীর। তাদের কাছে জমা আছে তিন ছটাক গল্প। 
 
বিন্দুটি রওনা দেবার আগে সেই খরগোশের মতো একটু ঘুমিয়ে নিতে গিয়ে বেচালে পড়ে গেল। প্রহরী এসে আটকে দিল বিন্দুটিকে। কে এই অদৃশ্য প্রহরীদের পাঠিয়েছে তার জানা নেই। গল্পের কোনো প্রতিদ্বন্দী শক্তি হতে পারে। যারা চায় না বিন্দুটি নদীতীরে গিয়ে ডিঙি নৌকার মাঝির কাছ থেকে গল্পটি পেয়ে যাক।

>দুই<
নদীর চড়ায় ডিঙিটা আটকে রেখে মাঝি রওনা দিল গ্রামের পথে। কোচড়ে বাধা মাছগুলো তখনো খলবল করে প্রাণবায়ুর সমাপ্তি টানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঘরে বউ আছে অপেক্ষায়। বৃষ্টি আসার আগেই ঘরে পৌঁছাতে হবে। আকাশে কালো মেঘ জমে গেছে। টিপটিপ করে ইতিমধ্যে পড়তেও শুরু করেছে। এঁটেল মাটির পথ পিছলা হয়ে আছে। সাবধানে হাঁটছে। পড়ে গেলে কোমর ভাঙতে পারে। ছোট্ট জালে অনেক কষ্টে এই কটা মাছ বাগিয়েছে আজ। দুজনের এতেই চলে যাবে। অল্প ঝোলে ঝাল ঝাল মাছ দিয়ে ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাতের গন্ধ মাঝি হাঁটতে হাঁটতেই পেয়ে যাচ্ছিল নাকের কাছে।
 
জোর বৃষ্টি নেমে গেছে। মাঝি জোরসে পা চালায়। হেমন্তের বৃষ্টিতে শীত লাগছে বেশ। শরীরে ভিজে লুঙ্গি গেঞ্জি সপসপ করছে। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। পথে লোক চলাচল নেই। আদিগন্ত পলিমাটির চর। আশ্রয় নেবার কোন জায়গা নেই। চরের উপর গড়ে তোলা বিচ্ছিন্ন ঘরে একলা বউ। বউকে বড় ভালোবাসে মাঝি। আজ অনেকদিন পর বউয়ের আশা পূরণ হবে। আকালের দিনে এই কয়টা মাছ দিয়ে একবেলা সুখাদ্যের স্বপ্নপুরণ। পায়ের গোছায় শক্তি পায় মাঝি। ঘোমটা মাথার এলোচুলের পানপাতা মুখে মোহনীয় হাসিটাও দেখতে পায়।
 
আলপথ কিছুদূর যাবার পর প্রবল বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে একটি সুক্ষ্ণ অস্পষ্ট চিৎকার ভেসে আসে কোথাও থেকে। কোনো ঝড়ের পাখি আশ্রয় খুঁজছে কোনো গাছের ডালে। অথবা পড়েছে কোনো শিকারীর ফাঁদে।

>তিন<
বিন্দুটি অঝোরে ভিজে যাচ্ছে। সেও শুনেছে শব্দ। কিন্তু অটল প্রহরা সরিয়ে বেরিয়ে যাবার কোনো উপায় নেই তার। অদৃশ্য প্রহরীদের ঘেরাও থেকে পালাবার উপায় খুঁজতে খুঁজতে যখন একটা পথ বের করে ফেলেছিল প্রায়, তখনি ঘাড়ের উপর বিপুল একটা জান্তব আওয়াজ হুমড়ি খেয়ে পড়লো প্রহরীদের ধনুক পিষ্ট করে। চোখের সামনে পড়ে যেতে দেখলো আস্ত এক মানুষকে, যার কোচড়ভর্তি তিন ছটাক টাকি আর পুঁটি মাছ খলবল করতে করতে বিলের পানিতে নেমে পড়লো। বিন্দুটি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো চোখের সামনে যে মানুষটা কোমর ভেঙ্গে পড়ে গেল তার আর্ত চাহনি বৃষ্টির ছাঁট এড়িয়ে একটি সুখাদ্যের স্বপ্নকে বিসর্জন দিচ্ছে। ঘরে তার অপেক্ষমান ঘোমটা পরা বউটি………….

>চার<
প্রচণ্ড এক বজ্রপাতের ধারাবাহিক গর্জনের মধ্যে গুলিটা ছুটে গেল মাঝির বুক বরাবর। কাটা কলা গাছের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সে। মাঝির শরীরটা বার কয়েক কেঁপে কেঁপে, একেবারে নিথর না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত খর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সৌদি ইদ্রিস। চারপাশটায় একবার সর্তক চোখ বুলিয়ে নেয়। যদিও এই বিরান চরে লোক চলাচল তেমন নেই বললেই চলে। তবুও সাবধানের মার নেই। বিকেল থেকে অপেক্ষার সফল সমাপ্তির ফলাফলটা সচক্ষে যাচাইয়ের তাড়নায় আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসে। এটেল মাটির পিচ্ছিলতাকে অগ্রাহ্য করে প্রায় দৌড়ে যায় নিথর শরীরটার কাছে। 
 
খরচোখে মাঝির মৃত্যু নিশ্চিত করে পকেট থেকে সিগারেট দেশলাই বের করে। বহুক্ষণ বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে দেশলাইবাক্সটা ভিজে নেতিয়ে গেছে। বার কয়েক চেষ্টায় সেটার জ্বলে ওঠার কোনো লক্ষণ না দেখে খিস্তি ছোটে, 
 
হাউয়ার পো ! হোগায় আগুন নাই ক্যারে? 
 
সিগারেটের আগুনের বন্দোবস্ত চাইলেই করা যায়। আরেকটু এগিয়ে ডানে মোচড় দিয়ে তিন ঘর পেরলেই রেহানার ঘর। সেখানে গিয়ে উপস্হিত হলে রেহানা নিশ্চয়ই ভূত দেখার ভয়ে চমকে যাবে। 
 
এতদিন এক ঢিলে এক পাখি মেরেছে সে। আজ এক ঢিলে দুই পাখি। এই চর থেকে মাঝিকে উচ্ছেদের নানা ফন্দিফিকির করেও রইসু মাতব্বর যখন সুবিধা করতে পারছিল না, তখন একদিন সৌদি ইদ্রিসই ব্যাপারটা সুরাহার সহজ পথ দেখায়। ইদ্রিসের নজর ছিল মাঝির কচি বউ রেহানার দিকে। তার শর্ত একটাই, রেহানার দিকে মাতব্বর যেন হাত না বাড়ায়। রইসু মাতব্বরের স্বভাবে বিবিধ খারাপ ঘোট পাকালেও নারীঘটিত দুর্বলতা তার ছিল না। কাজেই ইদ্রিসের প্রস্তাবে সে সময়ক্ষেপণ না করে রাজী হয়ে যায়। সে কাজটা শেষ হওয়ায় এখন মাতব্বরে চরের দখল পাইল, আর ইদ্রিস পাইল রেহানার দখল। সিগারেটের আগুনের জন্য রেহানার ঘরে না গেলেই না। এমন বৃষ্টি বাদলার দিনে এই নির্জন চরে বুঝি দ্বিতীয় মানুষ নাই। রেহানার রূপের আগুনে দগ্ধ হবার সুখ স্বপ্নে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চললো ইদ্রিস।

>পাঁচ<
বিন্দুটা মুক্তি পেয়ে উড়ে চললো রেহানার ঘরের দিকে। উঠোনে গিয়ে রেহানাকে সাবধান করার চেষ্টা করলো। ‘পালাও।’ চিৎকার করে বললো- ‘পালাও।’ কিন্তু রেহানা নির্বিকার তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। মাঝি ফিরবে। কখন ফিরবে। মাছ নিয়ে ফিরলে ভাত খাবে। দুজনে একসাথে বসে। খিদে পেটে কানে কথা ঢুকলো না। বিন্দুর চিৎকার ব্যর্থ হলে সে ফিরে গেল আর কারো সাহায্যের খোঁজে। 
 
পথে দেখা হলো ‘ব’ এর সাথে। দুজনে যুক্ত হয়ে ‘র’ হলো। ‘র’ হয়ে ফিরে এসে রেহানাকে আবারো সতর্ক করলো, কিন্তু রেহানা নির্বিকার। ব্যর্থ হয়ে যখন ফিরছিল ‘র’, তখন পথের ধারে ‘ত’ এর দেখা পেল। ‘রত’ হয়ে ফিরে এসে বিপদ সম্পর্কে বোঝাবার চেষ্টা করলো রেহানাকে। কিন্তু রেহানা তার দিকে ফিরেও তাকালো না। হতাশ হয়ে ফিরে গেল ‘রত’। যেতে যেতে কিছুদূর গিয়ে দেখা হলো গাছে ঝুলে থাকা ‘ন’ এর সাথে। চারজনে মিলে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতেই হয়ে গেল ‘রতন’। এবার শেষ চেষ্টা করা যায় রেহানার কাছে গিয়ে।
 
বৈঠা হাতে রতন ছুটে এসে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাঁক দিয়ে বললো – ‘বুবুরে ইদ্রিস্যা খুন করছে মাঝি ভাইরে। এখন এদিকেই আসতেছে তুমি পালাও, জলদি পালাও।’
 
এবার কথাটা কানে গেল রেহানার। চোখও গেল রতনের দিকে। সুফিয়া খালার ছেলে। খালের ওই পাড়ে তাদের বাড়ি। মাছ ধরতে আসলে মাঝে মাঝে সাঁতার দিয়ে খাল পেরিয়ে এদিকে চলে আসে। রেহানার টুকিটাকি কাজ করে দেয়। রেহানা সচকিত হয়ে উঠলো ইদ্রিসের কথা শুনে। মাত্র কয়েকদিন আগে তার ঘরে পানি খাবার কথা বলে ঢুকে পড়ে তার হাত ধরে টানাটানি শুরু করেছিল, মাঝির গলা শুনে ছুটে বেরিয়ে গেছিল। আজ তাকে রক্ষা করবে কে। এতটুকুন রতন তাকে বাঁচাবে কেমন করে। কোথায় পালাবে এই বিরান ভূমিতে! দিন কেটে গিয়ে রাত নেমে গেছে ইতিমধ্যে। এই সাঁঝ পেরোনো অন্ধকারে কোথায় যাবে ওরা?

>ছয়<
কোথায় পালাবে সেটা রতন জানে না, রেহানাও জানে না। জানে রতনের হাতের বৈঠা। মাঝির নৌকা আছে চরে লাগানো। রতন বৈঠা হাতে ঘরের পেছন দিকের জঙ্গলে ঢুকে পড়লো। রেহানা দ্বিতীয় বাক্যব্যয় না করে, খুন হওয়া মাঝির শোকের কথা ভুলে, নিজের ইজ্জত এবং প্রাণ দুটোই বাঁচাবার তাগিদে রতনের পিছুপিছু ছুটতে শুরু করলো। 
 
ঘুটঘুটে অন্ধকার জঙ্গলের পথে ঠিক মতো ছুটতে পারার কথা না। অথচ তারা দুজন বেশ নির্বিঘ্নেই সামনে ছুটতে পারে। অন্ধকারে একবারও হোঁচট খায় না কোত্থাও। গাছের গায়ে ঠক্কাস করে কপাল ঠুকে যায়না একবারও। বুদ্ধি পাকিয়ে রতন তার হাতের বৈঠা আড় করে সামনে কিছুটা অংশ বাড়তি রেখে মাঝখানটা শক্ত হাতে চেপে ধরে রেহানাকে পেছনের অংশটা ধরতে বলে। বাক্যব্যয় না করে রেহানা তাই করে। এবার ওরা আরো তড়বড়িয়ে এগোতে থাকে। জঙ্গলটা পেরোতে পারলেই চরের দেখা পাওয়া যাবে। চরের শেষ প্রান্তে মাঝির নৌকাটা বাঁধা আছে। কিন্তু পথ আর কতটা বাকি তার ঠাহর করে উঠতে পারে না দুজনের কেউই। তবু একসময় জঙ্গলের পথ শেষ হয়। সামনে ধূ ধূ চরাঞ্চল। জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর অন্ধকার অনেকটা সরে গেছে খোলা আকাশের নীচে। আবছা একটা আলোয় দিগন্তে অনেকদূর দৃষ্টি চলে যায়। মাঝির নৌকাটা বাধা আছে যেদিকে, সেদিক পানে ছুটলো দুজন চরের বালিয়াড়ির উপর দিয়ে। 
 
কিছুদূর যেতেই পেছন থেকে একটা জান্তব চীৎকার শোনা গেল। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তীরের বেগে ছুটে আসছে ইদ্রিস। রেহানার বুক শুকিয়ে গেল। নৌকায় ওঠার আগে যদি ধরা পড়ে যায়। রতন ভাবছে নৌকাটা ঠেলে নামাতে যে শক্তি লাগে সেটা তার একার পক্ষে সম্ভব না। রেহানাবু কী পারবে? পেছনে চিতাবাঘের গতিতে ছুটে আসছে ইদ্রিস। খরগোশের মতো ভীত সন্ত্রস্ত রতন আর রেহানার পিঠে পাখা গজালো। প্রাণের তাগিদে তারা উড়ে যাচ্ছে দুজনে। 
 
পেছনে ধেয়ে আসা ইদ্রিস পিস্তল হাতে হুংকার দিচ্ছে। না থামলে গুলি করে দেবে। কিন্তু রেহানার শরীরে তখন মহাজাগতিক শক্তি ভর করেছে। সে কিছুতে এই পিশাচের হাতে ধরা দেবে না। প্রাণ হারানোর চেয়েও বেশী ইজ্জত হারানোর ভয়। সে দুটোকে বাজি ধরেছে। সাথে আছে রতনের প্রাণ। ছেলেটাকে ছাড়বে না হারামীটা। তার জন্য প্রাণ যাক ছেলেটার। সেটা সে কিছুতেই হতে দেবে না।
 
নৌকটা আর খুব বেশী দূরে না। মাত্র কয়েকশো গজ। আরেকটু ছুটলেই নাগাল পেয়ে যাবে। কিন্তু ইদ্রিসের গুলি যদি ছুটে আসে তারও আগে। সে কাকে গুলি করবে, রেহানাকে, নাকি রতনকে? ছুটতে ছুটতে ভাবতে থাকে রেহানা। আকাশ বাতাস নদী সমুদ্র সব ছুটছে তাদের সাথে। পায়ের নীচে বালি সরে যাচ্ছে সরসর করে। বালিগুলো ক্রমশ ঝুরঝুরে মনে হচ্ছে। যতটা আগানোর কথা ততটা পারছে না। পা দেবে যাচ্ছে খানিক পর পর। ঘটনা বুঝতে পারলো না রতনও। এদিকটায় তারা আগে কখনও আসেনি। এলাকার কোথায় কি জানা নাই। রতন যেন নিজের অজান্তেই রেহানার হাত ধরে এক ঝটকায় ডানদিকে সরিয়ে নিলো। তারপর চোখের পলকে একটা লাফ দিয়ে বালির মাঝে একটা সরু নালা পার হয়ে এলো, রেহানাও তার সাথে লাফ দিয়ে পার হলো নালাটা। কয়েকবার এলোমেলো লাফ দিয়ে ওরা নৌকার কাছে চলে এলো, এবং রতন নৌকা ঠেলতে শুরু করলো। রেহানাও হাত লাগালো। 
 
এমন সময় পেছন থেকে গুলির শব্দ। বুম!! গুলি করছে হারামীটা। রেহানা দ্রুত নৌকার উল্টাদিকের আড়ালে চলে গেল। সে আবারো গুলি করার জন্য হাত তুললো। 
 
হঠাৎ করে কী যেন হয়ে গেল, বালির মতো কিছু একটা উড়ে এসে তার চোখে তীব্র আঘাত করলো। সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। পিস্তলটা দূরে ছিটকে পড়লো। নদীর দিকে। সে পিস্তল নেবার জন্য একটা লাফ দিল, কিন্তু সেই লাফে তার বাম পা পড়লো একটু কাদার মতো জায়গায়। সেখানে তার পা দেবে গেল। সে ডান পা এনে মাটিতে ভর দিয়ে বাম পা তুলতে গিয়ে দেখলো ডান পাও দেবে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে শরীরের কয়েক ইঞ্চি গেঁথে গেল। সে কিছু বুঝতে পারছে না। যতই উঠতে চাইছে, ততই আটকে যাচ্ছে বালিতে। এখানে এত কাদা কখনো ছিল না। সে হাঁচড়ে পাঁচড়ে সরে যেতে চাইল, কিন্তু আরো ডুবে যাচ্ছে ক্রমশ। তার হাঁটু ডুবে গেছে, সে নড়তে পারছে না। কারো সাহায্য ছাড়া এখান থেকে তার মুক্তি নেই, বাস্তবতা বুঝে সে রেহানাদের উদ্দেশ্যে চেঁচান দিলো।
 
নৌকার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে রতন ও রেহানা বিস্ময়ে হতবাক। কোথা থেকে এক টুকরো আলো এসে ঘিরে ফেলেছে ইদ্রিসকে। সে আলোর নীচে একরাশ ধোঁয়া। ধোঁয়ার জালে ইদ্রিস প্রায় হাঁটু পর্যন্ত বালির চড়ায় আটকে গেছে। তার পিস্তলটা একটু দূরে পড়ে আছে। ইদ্রিস যেন ফাঁদে পড়া হিংস্র পশু। কিছুক্ষণ আগে ওই জায়গা ওরা পেরিয়ে এসেছে নির্বিঘ্নেই। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি যেন ওদের ছুটিয়ে এনেছে নিরাপদে।
 
কিন্তু রেহানা বুঝতে পারছে না এখনো তারা নিরাপদ কিনা। রতন ভাবছে পিস্তলটা নিয়ে আসবে কিনা। 
 
ইদ্রিসের চোখে আঘাত করে বিন্দুটা একটু থামলো। নৌকার গলুইয়ের উপর বসে ইদ্রিসের পরিণতি দেখতে দেখতে ভাবলো এই খুনী, জোচ্চোর লম্পট লোকটাকে মরতে দেয়া উচিত, নাকি আইনের হাতে তুলে দেবে। ভাবতে ভাবতে বিন্দুটা রেহানার দিকে তাকালো, রতনের মুখটা দেখলো। দুজনের চেহারা দেখে বিন্দুটির সামনে একটি ভবিষ্যতের চালচিত্র দাঁড়িয়ে গেল। সেই চালচিত্রে বিন্দুটি দেখতে পাচ্ছে আইনের হাতে ইদ্রিস কতটা নিরাপদ। দুবছর পরে সে জামিনে বেরিয়ে এসে রেহানাকে ধর্ষণ করতে গেছে, তার আগে খুন হয়ে পড়ে আছে রতনের লাশ। দৃশ্যকল্পটি মুছে ফেলে বিন্দুটি তখনই সিদ্ধান্ত নিল। চোরাবালিতে আটকে থেকেই বরং ওর মরণ হোক।
 
এলোপাথাড়ি শরীর নাড়ানোর কারণে ইদ্রিস ততক্ষণে কোমর পর্যন্ত ডুবে গেছে। এবার সে আরো চিৎকার করে ডাকছে। ‘রেহেনা, ও ভইন আমারে মাফ কইরা দাও..’ বাতাসের তীব্র ঝাপটা ইদ্রিসের ঘ্যানঘ্যানানিটা মুছে দেয় কিছু সময়ের জন্য… ।
 
অর্ধেক ডুবে যাওয়া লম্বা-চওড়া শরীরের ইদ্রিসের কানে নদীর হাওয়া এসে সুড়সুড়ি দেয়। বিন্দুর ইশারায় পিঁপড়েরা দল বেঁধে এগিয়ে গিয়ে ইদ্রিসের গা বেয়ে ওঠে। পিলপিল করে তার কানের ভেতরে ঢুকে হল্লা শুরু করে। পিঁপড়াদের হল্লায় ইদ্রিসের শরীরে বিভৎস যন্ত্রণা শুরু হলে সে মরণ চিৎকার দেয়। তার চিৎকার সমগ্র দ্বীপে হাহাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। 
 
নদীতে জোয়ার এসে যাচ্ছে। নৌকার তলদেশে পানি চলে এসেছে। নৌকা ভাসাতে বেশি কষ্ট করতে হবে না। নৌকাটা অল্প ধাক্কা দিলেই ভাসবে। রতনকে অবাক করে দিয়ে রেহানা এক হাতে নৌকা ধাক্কা দিয়ে রতনকে দ্রুত নৌকায় উঠে পড়তে বলে। ইদ্রিসের মতো পাষাণ না তাদের সামান্য মনুষ্য হৃদয়। মরণ চিৎকার দিতে দিতে একটা আস্ত মানুষের শরীর মাটিতে দেবে যাচ্ছে এমন দৃশ্য হজম সম্ভব না তাদের পক্ষে। এখান থেকে দ্রুত সরে যেতে চায় তারা। 
 
রেহানা আর রতনের নৌকা নদীর অন্য পাড়ে অদৃশ্য হয়ে যাবার পর বিন্দুটি আবারো একা হয়ে যায়। ধূ ধূ বালির চড়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে মুক্ত হাওয়া। ইদ্রিসের ত্রাহি চিৎকার থেমে গেছে। 
 
আকাশে লক্ষ কোটি তারা জ্বলছে। এই দ্বীপের কোথাও যেন কেউ নেই। নিঃসঙ্গ বিন্দুটি ভাবছে পরবর্তী গন্তব্য কী হতে পারে। রতন ও রেহানার এই গল্প ইদ্রিসকে দিয়েই শেষ নয়। মানুষের বিপুল কুটিল সমাজের হাজারো দুষ্ট শেকড়ের মাঝে ইদ্রিস একটি শাখা মাত্র। সমগ্র বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা একটি বিন্দুর পক্ষে সম্ভব নয়।
 
ভাবতে ভাবতে বিন্দুটি সৈকতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোরের সূর্যের আলোয় যখন চোখ মেললো তখন দেখলো তার দুপাশে দুটো ব্র্যাকেট তৈরী হয়ে গেছে। এক জেলে মাছ ধরতে এসে তার দুপাশে দুটো বাধা সৃষ্টি করেছে মাছ ধরার টেটা দিয়ে। বিন্দু আবারো আটকে পড়লো। সে জানে না পরবর্তী মুক্তি কখন আসবে। কিন্তু এবার বিন্দুটি খুশী হয়ে দেখলো তার সাথে আরো দুই সঙ্গী যুক্ত হয়েছে। বাকী দুই বিন্দু কী রতন আর রেহানার কাছ থেকে এসেছে? কেউ জানে না সেটা। তবে তিন বিন্দুতে যুক্ত হয়ে গল্পটিকে সমাপ্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। 

 (…) 

 
 
 
লেখক পরিচিতি:
নাহার তৃণা
গল্পকার। অনুবাদক। প্রাবন্ধিক
শিকাগোতে থাকেন।

14 thoughts on “নাহার তৃণা’র গল্প: অদৃশ্য খরস্রোত

  • October 27, 2021 at 11:08 am
    Permalink

    অভিনব গল্প।

    Reply
    • November 14, 2021 at 8:54 pm
      Permalink

      অভিনব গল্প পড়ে নেবার জন্য অভিনন্দন প্রিয় সাহিত্যিক। 🙂

      Reply
  • October 28, 2021 at 8:45 pm
    Permalink

    ব্যতিক্রমী গল্প। মুগ্ধ হয়েছি লেখিকার কুশলতায়।

    Reply
    • November 14, 2021 at 8:55 pm
      Permalink

      অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো মন্তব্য। অসংখ্য ধন্যবাদ নামহীন ভাই/বোন।

      Reply
  • October 28, 2021 at 11:02 pm
    Permalink

    চমৎকার বর্ণনা।'এক'পর্বটি বাদ দেয়া নিয়ে লেখক ভাবতে পারেন।

    Reply
    • November 14, 2021 at 8:56 pm
      Permalink

      সহৃদ মন্তব্যের জন্য আন্তরিক সাধুবাদ আপু।

      Reply
  • November 15, 2021 at 5:23 am
    Permalink

    চমৎকার মিয়া ভাই! গল্প নিয়ে নিরীক্ষা চলুক।

    Reply
    • December 7, 2021 at 6:57 pm
      Permalink

      মিঞাভাই, আপনার মন্তব্য পেয়ে দারুণ অনুপ্রাণিত হলাম। অসংখ্য ধন্যবাদ।

      Reply
  • November 15, 2021 at 5:41 am
    Permalink

    এমন বিন্দু এক থেকে অনেক হোক। রেহানারা বাঁচতে চায়। খুব ঠাসবুনট গল্প। শুরুর পর্বটি অধিকন্তু মনে হল।

    Reply
    • December 7, 2021 at 7:01 pm
      Permalink

      বাঁচার আনন্দে বাঁচুক রেহানারা। পড়ে মন্তব্যের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ দিদি।

      Reply
  • November 15, 2021 at 6:27 am
    Permalink

    "অদৃশ্য খরস্রোত" দ্বিতীয়বার পড়লাম।
    সুন্দর হয়েছে এই গল্প। গল্প লেখার এই নতুন গঠন শৈলী এই গল্পের এক আকর্ষণীয় দিক বলে চিহ্নিত করা গেলেও, তা লেখিকার নতুন-কিছু-করার এক আলংকারিক প্রয়াস বলে মনে হয় নি। ঘটনার তীব্র স্রোত একে স্বাভাবিক ভাবে আত্মস্থ করে নিতে পেরেছে।
    সেই সাথে ওঁর এই অভিনব টেকনিক ওঁর সহজাত কল্পনার উড়ান ও ভাষার পেলবতার আবরণকে নষ্ট করে নি; বরং এক বাস্তবনিষ্ঠ জগতের সাহিত্যিক উত্তরণ ঘটিয়েছে।
    লেখিকা সাদা-মাটা কাগজে কলমের আঁচড় কেটে নয়, যেন জাদু-দণ্ড হাতে তুলে নিয়েছেন,এই গল্প লিখতে।
    এর আগে লেখিকার কিছু গল্পের ওপর মন্তব্য -কালে মনে হয়েছিল তার মরমী রচনা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ভাবে দীর্ঘায়িত হয়ে গেছে৷
    কিন্তু আলোচ্য গল্পের বাঁধুনি বেশ টানটান বোধ হল৷
    কেবল একটা ছোট্ট খটকা মনে ঠোকর দিচ্ছে৷
    প্রথম পর্বে "( . )"কে "বিপরীতমুখী" না বলে "পরস্পরের দিকে চেয়ে আছে" জাতীয় কিছু বললে কি বেশি যুক্তিযুক্ত হত?Just loud thinking!
    শূণ্য থেকে আখ্যানের অসীমতা স্পর্শ করার যে অভিযান লেখিকা শুরু করেছেন,তার সফর যেন আরও বিস্তার লাভ করে লেখিককে এই শুভেচ্ছা জানাই। 👌👏👌

    Reply
  • November 15, 2021 at 5:09 pm
    Permalink

    বাংলা ভাষায় এমন কিছু আগে লেখা হয়েছে কিনা জানি না। কিন্তু নগণ্য একটি ডটকে গল্পের চরিত্র বানিয়ে সেই কাহিনীকে এমন একটা পরিণতি দেয়ার জন্য যে পরিমাণ শৈল্পিক মুনশিয়ানা দরকার লেখক সেটা পুরোপুরি ব্যবহার করেছেন। সেটা প্রথম অংশটা বাদ দেবার কথা বলেছেন উপরে একজন। আমার মতে প্রথম অংশটাই গল্পের ভিত্তি। ওটা না থাকলে শেষ অংশটা অর্থহীন হয়ে যায়। একটি বিন্দু দিয়ে গল্প শুরু করে তিনটি বিন্দুতে সমাপ্ত। উপভোগ্য অনন্য একটি গল্প।

    Reply
  • November 16, 2021 at 3:42 pm
    Permalink

    অভিনব! মুগ্ধ আমি। গল্পকার তৃণাকে অভিনন্দন এবং ভালোবাসা। অতি চেনা একটা থিমকে কী অনায়াসে একদম ওপর থেকে বিন্দুর মতোই ছটফটিয়ে দেখলাম।

    Reply
  • November 17, 2021 at 2:26 pm
    Permalink

    গল্পের বিষয় অভিনবত্ব, অভিনবত্ব ভাবনায়। সুন্দর একটা গল্পপাঠ হল। খুব ভালো লেগেছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *