ছোটগল্পে বাস্তবতা বনাম নির্মিতি : মোজাফ্‌ফর হোসেন

শুরুটা করি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে। গল্প প্রকাশিত হওয়ার পর দেখেছি, যে গল্পটা আমার নির্মিতি, মানে পুরোটাই কল্পনাপ্রসূত, পাঠক পড়ে বললেন, ‘বাহ! খুব বাস্তবসম্মত। ঘটনাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।’ আর যে গল্পটা আমার সম্পূর্ণ নির্মিতি না, অর্থাৎ জানা বা যাপিত জীবনের ঘটনা অবলম্বনে লেখা, সেটি পড়ে হয়তো পাঠক বললেন, ‘অতি নাটকীয় মনে হলো। মনে হচ্ছে জোর করে বানানো! বাস্তবের অতিরঞ্জন।’

এর মানে হতে পারে, বাস্তবতা নিজেই আসলে অতিনাটকীয় হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ শেকসপিয়ার যে অতিনাটকীয়তার জন্ম দিয়েছেন, তার চেয়ে অতিনাটকীয়তা বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আছে। কিছুদিন আগে আমেরিকার মতো কথিত প্রগ্রেসিভ জাতি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। এটাও কি কম নাটকীয় বিষয়? অন্যদিকে দেশে এত এত আন্দোলন হওয়ার পরও সাগর-রুনি হত্যার বিচার হলো না, বিচার হলো না তনু হত্যারও।
শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে একজন, অনেকগুলো মানুষ সেটা দেখেছে, ভিডিওতে ধারণ করেছে। এরপর আবার মানুষ আন্দোলন করেছে এই নৃশংস হত্যার বিচার চেয়ে। এসব ঘটনা কি অতিনাটকীয় নয়? এটা কি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা? এ রকম শত শত সিরিয়াস নাটকীয়তার জন্ম হচ্ছে দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। সাহিত্যের নাটকীয়তা সে তুলনায় সামান্যই বটে। 
নাটকীয়তা বাস্তবে কি পরিমাণ নাটকীয় হতে পারে তার উদাহরণ দিই, আমাদের পাশের গাঁয়ে এক মহিলার এক ঘণ্টার ব্যবধানে তিন শিশুসন্তান মারা গেল। সেটা যেতেই পারে। তাই বলে এভাবে? মাঝেরটা নিয়ে মহিলা গেছে পুকুরে কাপড় ধুতে। নবজাতককে রেখে গেছে বড় ছেলের কাছে। বড়টার বয়স বছর পাঁচেক। ও সদ্য মুসলমানি করানো দেখেছে কোথাও। হাতের কাছে চাকু পেয়ে ট্রাই করেছে ছোটটার ওপর। পরে রক্তাক্ত অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে লুকিয়েছে ঘরের পেছনে বিচালির পালার ওতে। মায়ের কানে এই খবর গেলে সঙ্গের ছেলেটিকে পুকুর পাড়ে রেখেই চলে এসেছে। কিছুক্ষণ পর খবর এল সেটা পানিতে ডুবে মরেছে। এবার বড়টার খোঁজ নেওয়া শুরু হলো, সেও মরে পড়ে আছে বিচালির পালার নিচে। সাপের কামড়ে। এখন এই ঘটনা যদি কেউ গল্পে লিখতেন, পাঠক কি মানতেন? হয়তো বলতেন, ‘এই অবাস্তব (অতি নাটকীয়?) গল্প লেখার প্রয়োজন কি? তাই বলছি, বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে লিখতে গিয়ে লেখকদের নির্মিতি নিয়ে অনেক কিছু ভাবতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, ঘটনাটা খুব মর্মস্পর্শী হলেও অতিনাটকীয় হওয়ার কারণে লেখকরা সেটি এড়িয়ে যাচ্ছেন।
আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, বাস্তব ঘটনা-আশ্রিত গল্পের চেয়ে কল্প-নির্মিতি গল্পে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি। অথচ এটা তো ঠিকই যে, আমার গল্পে বিষয়বস্তু ও নির্মিতির দিক দিয়ে যা এসেছে সবই আমার জীবন থেকে। ফকনার যেমনটি বলেছিলেন, ‘গল্পটা (‘দ্য রোজ ফর এমিলি’) কল্পনা থেকে এসেছে। কিন্তু ওই বাস্তবতা চারপাশে বিদ্যমান। গল্পটা নতুন কোনো বাস্তবতাকে আবিষ্কার করেনি। তরুণীরা কাউকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখে সংসার চায়, সন্তান চায়, এটা আমার আবিষ্কার নয়। কিন্তু ওই মেয়েটির (এমিলি) যে নির্দিষ্ট ট্র্যাজিক পরিণতি সেটা আমার তৈরি।’ অনুরূপভাবে আমার ‘আলীমেয়েলির প্রস্থান ও ইতিহাসের বিস্মৃত তরঙ্গ’ গল্পে সমাজব্যবস্থা বা পরিস্থিতিটা আমার নির্মাণ নয়। আলীমেয়েলি নামে তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ সত্যি সত্যি আমাদের গ্রামে আছেন। আহলে হাদিস এবং হানাফি মাজহাবের ভেতর একটা প্রকাশ্য দ্বন্দ্বও আছে সেখানে। এটাও সত্য যে আহলে হাদিসের আমিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এই গল্পে নির্দিষ্ট করে আলীমেয়েলির যে ট্র্যাজিক পরিণতি সেটা আমার সৃষ্টি। একইভাবে ‘বাঁশিওয়ালা মজ্জেল’ গল্পের মজ্জেলও জীবিত। এখানে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার নতুন পরিণতি টেনেছি। কিন্তু বাস্তবতাটা কোথাও কোথাও আছে। একটা সম্ভাব্য গল্প সেখান থেকে তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, যে গল্পটা আগে থেকে তৈরি সেটি সাহিত্য না। ফলে গল্পে আমাকে আবার জীবন বিনির্মাণ করতে হয়েছে। কতটুকু বাস্তব কতটুকু নির্মিতি একসময় আমি নিজেই গুলিয়ে ফেলেছি। মনে হয়েছে, ভাইস-ভার্সা বাস্তবটাই নির্মিতি, কারণ ওটা অন্যকারো রচনা। আর আমি যেটা নির্মাণ করছি সেটাই আমার বাস্তবতা। মার্কিন কল্পকাহিনি লেখক লইস ম্যাকমাস্টার বুজোল্ড যথার্থই বলেছেন, ‘I am who I choose to be. I have always been what I chose, though not always what I pleased.’
এখন এই বাস্তবতা একজন লেখকের ভেতর কীভাবে আসবে? তাকে কি ঘটনার অংশ হতে হবে? এখানেও ফকনার প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মতে তুমি যা অনুধাবন করতে পারো, তা-ই অভিজ্ঞতা। এটা বই থেকেও আসতে পারে। এটা এমন বই, এমন গল্প এবং এতই জীবন্ত, যা তোমাকে নাড়িয়ে দেয়। আমার মতে এটা তোমার অভিজ্ঞতাসমূহের একটি। এমন নয় যে, ওই বইয়ের চরিত্রগুলো যা করে তা করে অভিজ্ঞতা নিতে হবে। চরিত্রগুলোর কাজগুলো যদি বাস্তবসম্মত মনে হয় এবং মনে হয় মানুষ এমনটিই করে তাহলে এটা অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। তাই আমার কাছে অভিজ্ঞতার সংজ্ঞা এই যে অভিজ্ঞতার বাইরে লেখা সম্ভব নয়। কারণ তুমি যা পড়ো, শোনো, অনুভব করো, কল্পনা করো, সবই অভিজ্ঞতার অংশ।’ (অনুবাদ : সাবিদিন ইব্রাহিম)
এই কারণে শেষ পর্যন্ত, বাস্তব ঘটনানির্ভর গল্পই লিখি আর সম্পূর্ণ তৈরি ঘটনা নিয়েই লিখি, লেখার পর তৃতীয় বাস্তবতা অর্থাৎ লেখকের নিজস্ব বাস্তবতার সৃষ্টি হয়। যে কারণে বলা যেতে পারে, সাহিত্য মানেই হলো তৃতীয় বাস্তবতা বা থার্ড রিয়ালিটি।
সাহিত্যের প্রধান কাজ হলো, ব্যক্তির সম্ভাবনাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করা। ব্যক্তির সেই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে বিদ্যমান থাকতেও পারে, নাও পারে। মার্ক টোয়েন যে কারণে বলছেন, ‘Fiction is obliged to stick to possibilities, Truth isnot.’ যদি সম্ভাবনা থেকেই আধুনিক সাহিত্যের সৃষ্টি হয়, তাহলে সাহিত্য আর জীবনের হুবহু দর্পণ থাকে না। অর্থাৎ অ্যারিস্টটলের ‘আর্ট ইজ ইমিটেশন অব লাইফ’ কথাটার আধুনিক ব্যাখ্যা দাঁড়ায়, অস্কার ওয়াইল্ড যেমনটি বলছেন, ‘Literature (art) always anticipates life. It does not copy it, but molds it to its purpose.’ অর্থাৎ সাহিত্য বস্তুগত বাস্তবতার নিরিখেই একটা নিজস্ব বায়বীয় বাস্তবতা সৃষ্টি করে। জীবন যেমন এখানে নির্মিতির অংশ হয়ে ওঠে, তেমন নির্মিতি হয়ে ওঠে জীবনের অংশ। জীবন ও নির্মিতির এই মিথস্ক্রিয়াকে তুলে ধরতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরÑতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন, ‘পোস্টমাস্টারটি আমার বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।’ অনেক সময় এই নির্মিতি ও বাস্তবতার মাঝখানের নিরপেক্ষ একটা জায়গা থেকে গল্প বলতে চাওয়ার কারণে অনেকে আমার গল্পের ফর্মহীনতার কথা বলেছেন। বলেছেন গল্পে নির্মিতি বলে কিছু নেই। হঠাৎ শুরু, হঠাৎই শেষ। ব্যাখ্যাতীত উপকরণ নিয়েও কথা বলেছেন কেউ কেউ। এর কারণ হতে পারে, আমি জন্মসূত্রে যে পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছি, সেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামির পাশাপাশি নানা রকম অতিপ্রাকৃত ঘটনা, লোকবিশ্বাস, জনশ্রুতি ও মিথ ছিল। এর অনেক কিছুই হয়তো এখন আর আমি বিশ্বাস করি না, কিন্তু আমার গল্প সব সময় আমার বিশ্বাসের তোয়াক্কা করে না। ফলে আমি না চাইলেও অনেক কিছু চলে আসে। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা বা বাস্তবতা সব সময় একজন লেখককে আক্রান্ত করতে চায়। গৎবাঁধা ছকে আটকে রাখতে চায়। লেখককে খুব কৌশলে সেটি থেকে বের হওয়ার একটা উপায় বের করে নিতে হয়। অভিজ্ঞতা নিশ্চয় গল্পকে সমৃদ্ধ করে কিন্তু অনেক সময় সৃজনশীলতা বা নবনির্মাণের ধারাকে মুক্তভাবে চালনা করার জন্য অভিজ্ঞতার বলয় থেকে বের হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে।

7 thoughts on “ছোটগল্পে বাস্তবতা বনাম নির্মিতি : মোজাফ্‌ফর হোসেন

  • August 14, 2018 at 5:43 am
    Permalink

    আপনার সাথে সহমত পোষণ করছি। এই ধরনের লেখা গুলান নবীন লেখকদের উৎসাহিত করে।

    Reply
    • August 18, 2018 at 11:59 am
      Permalink

      ধন্যবাদ

      Reply
  • August 14, 2018 at 2:54 pm
    Permalink

    ছোটগল্পে বাস্তবতা বনাম নির্মিতি পড়ে সহমত পোষণ করছি। আসলেই জীবনে গল্প নাটককেও হার মানায়।

    Reply
    • August 18, 2018 at 11:59 am
      Permalink

      ধন্যবাদ প্রিয় দিদি।

      Reply
  • August 25, 2018 at 1:59 am
    Permalink

    চমৎকার!লেখার বিষয়বস্তুর সাথে দ্বিমতের উপায় নাই তেমন। আমার মতো গল্প লিখতে গিয়ে কলম ভাঙাদের জন্য আপনার এই সুচিন্তিত লেখা অনেক উপকারে আসবে। লেখককে ধন্যবাদ।

    Reply
  • August 25, 2018 at 3:38 am
    Permalink

    পড়লাম। লেখককে ধন্যবাদ।

    Reply
  • June 24, 2021 at 5:55 pm
    Permalink

    চমৎকার সত‍্যিকার অর্থে। লেখকসত্ত্বার শক্তিমানতার স্বাদ পেয়েছি আপনার মধ্যে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *