দেবতোষ দাশের গল্প : ধর্ষণের ১৮ দিন পর

নন্দিনী ধর্ষিত হওয়ার ১৮ দিন পর আমি আজ অফিস এলাম। নন্দিনী আমার বউ।

নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলাম। বসার আগে অবশ্য টেবিলের ড্রয়ার থেকে ডাস্টার বার করে চেয়ারটা ভালো করে মুছে নিয়েছি। টেবিলটাও। ১৮ দিন পরে বসছি। জানি না এই ক’দিন ঝাঁড়পোছ পড়েছে কিনা। ধুলোয় ঢেকে গেছে এমন নয়। তবু ১৮ দিন আগে অফিসে এসে রোজ যেমন মুছতাম, কতকটা সেই অভ্যাসেই মুছে নিলাম। সহকর্মীরা আমায় দেখল। বরুণ এগিয়ে এল। রায়দাও। বরুণ আমার সমবয়সী। ঘটনার পর ফোন করেছিল।
রায়দা কাছে এলেন। কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, “তুমি ঠিক আছো তো?”
আমি স্মিত। রায়দা’র স্পর্শে পেলাম ওম। উনি সিনিয়র। এ’বছরই রিটায়ার করবেন। আরও বললেন, “বউমা কেমন এখন? আমি বললাম, “ভাল।”
একে একে আমার সেকশনের সব সহকর্মীরাই এল আমার টেবিলের কাছে। আমাকে দেখল। কেউ বসল চেয়ার টেনে। কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়াল। কেউ জিগ্যেস করল কুশল। আমার। নন্দিনীর। আমি উত্তর দিলাম। সবাই চলে গেল।
১৮ দিন হয়ে গেল আমার বউ ধর্ষিত। আকস্মিক ঘটনাটির পর কার্যত ঘোরেই কেটে গেল এই ১৮টি দিন। ‘ঘোরে’ বলছি কারণ, বলতে গেলে সেইভাবে কোনো কিছুরই ওপর আমার তেমন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। যেমন যেমন চলেছে দুর্ঘটনা-পরবর্তী অনুক্রম, আমি তাকে কেবল অনুসরণ করেছি।
এই ক’দিন হসপিটাল-থানা-পুলিশ-আদালত-মিডিয়া। হাসপাতালে ধর্ষণ-পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষা। চিকিৎসা। থানায় এফআইআর। পুলিশের প্রবেশ। আদালত। আর যা অবধারিত সেই রাজনীতির অনুপ্রবেশ। মিডিয়ারও। ফলত এইসবের ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ ছিল না। থাকার কথাও নয়। আমার পরিচয় একটাই, আমি ধর্ষিতার স্বামী।
এতদিন খবরের কাগজে বা টিভি চ্যানেলে ধর্ষণের খবর পড়েছি বা দেখেছি। লক্ষ করেছি ধর্ষণ-পরবর্তী ঘটনার প্রতিক্রিয়াও। ভেবেছি। তর্ক করেছি। নিন্দে করেছি রাজনীতির কারবারিদের। বলেছি, তাদের আচরণ খুব কুশলী, সুযোগসন্ধানী। মানবিক সুকুমারবৃত্তি তারা হারিয়ে ফেলেছে। গালমন্দ করেছি পুতুল-পুলিশের সক্রিয়তা, নিষ্ক্রিয়তা বা অতিসক্রিয়তা নিয়ে। নারীর প্রতি পুরুষের লালসা ও নির্মমতা আমাদের সমাজে কেন ক্রমবর্ধমান, আশঙ্কিত হয়ে বন্ধু-মহলে বা সহকর্মী-মহলে লাল চা খেতে খেতে আলোচনা করেছি, বিশ্লেষণ করেছি।
কিন্তু দুর্ঘটনা যখন নিজের বাড়িতে, আমার বউ যখন ধর্ষিত, ভিকটিম যখন আমরাই, মানে আমার পরিবার, তখন? খবরের কাগজে খবর যখন আমার বউ, নিউজ-চ্যানেলের ছবিতে যখন আমার বাড়ি, আমি, তখন?
বাবা বা মা মারা যাওয়ার পর সন্তান, মূলত পুরুষ সন্তানকে যে ধরণের অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়, আমার অবস্থাও কতকটা ওইরকমই দাঁড়িয়েছিল বলা যেতে পারে।
সরব সমবেদনা, নিশ্চুপ সমবেদনা, হা-হুতাশ, ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি, আগামী জীবন-সংগ্রামসংক্রান্ত জ্ঞান ইত্যাদি হরেক অভিজ্ঞতা, আমাকে নিঃসহায় করেছে। সত্যিই মনে হয়েছে আমি পিতৃ-মাতৃহীন নিঃস্ব হলাম। আমি ভাগ্যহীন স্বামী। ধর্ষিতার স্বামী। আমাকে কেবল কাছাটুকুই যা পরানো হয়নি।
জয়েন্ট সেক্রেটারি আমায় ডেকে পাঠালেন ওঁর চেম্বারে।
গেলাম। উনি বসতে বললেন। বসলাম।
– সব ঠিক আছে?
আমি মাথা নাড়ালাম। হ্যাঁ সূচক।
– কী করে এমন কেস হল বলুন তো?
আমি নিশ্চুপ। উনি নিজেই আবার বললেন,
– শুনলাম ছেলেকে টিউটরের বাড়ি থেকে আনতে যাওয়ার সময়ই মিশ্যাপটা ঘটেছে। রাস্তাটা অন্ধকার। দেশে যে কী শুরু হয়েছে, কোথায় একটু শান্তি নেই মশাই! টিভিতে দেখতাম, কাগজে পড়তাম, আমার অফিসেরই কারুর এমন ঘটবে এতো ভাবিনি মশাই! টিভিতে দেখাচ্ছে — সবাইকে তো আর বলা যায় না – মিসেসকে বললাম আপনার কথা – ভদ্রলোক খুব কাজের জানো, ফাইল ফেলে রাখেন না, ভাল ড্রাফট করেন, দ্যাখো ওনার সঙ্গেই এমন ঘটল – গিন্নি অবাক হয়ে গেল। আচ্ছা, আপনি ঠিক আছেন তো?
আমি আবার সেইভাবেই মাথা নাড়ালাম যাতে বোঝা যায় আমি ভালো আছি। এতে আমার বিমূঢ়তা পুরোটা চাপা গেল কিনা জানি না।
নিজের বউয়ের ধর্ষণের আগে আমার অবস্থান, আর তার পরবর্তী অবস্থান, বলা বাহুল্য, এক নয়। সামাজিক অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ বেশ খানিকটা বদলেছে। বদলাবেই। সেই বদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। তার আগে একটা যুদ্ধ চলবে। এখন সেই যুদ্ধ জারি। যুযুধান দুই পক্ষ। আমি আর বাকি বিশ্ব।
এটা বড় যুদ্ধ। ওয়ার। অন্যান্য ছোট কিন্তু অধিকন্তু লড়াইগুলোও আছে। ব্যাটল। অধিকন্তু অথচ জরুরি। আমার পরিবার বনাম আত্মীয়-স্বজন। আমার পরিবার বনাম পাড়া-পড়শি। আমি, আমার বউ বনাম আমার বাবা-মা। শেষত আমি বনাম আমার বউ।
– টিভিতে দেখছিলাম – যদিও মুখটা ব্লারড – ব্লারড করাই উচিত – জানেন তো আমাদের সোসাইটি – মিডিয়া এই কাজটা ভাল করে। রেপ ভিকটিমের মুখটা ঝাপসা করে দেয় – মিডিয়ার সবকিছুই খারাপ নয় মশাই –
জয়েন্টসাহেব হাসলেন। ওঁর নিজেরই নিজের কথাটা খুব ভালো লেগেছে। জয়েন্টসাহেব মানে জয়েন্ট সেক্রেটারি। জয়েন্টসাহেব বলাটাই চল। আমি বুঝতে পারছি না কী করব, উনি আবার শুরু করলেন।
– টিভিতে দেখলাম আপনার মিসেসকে – মুখটা ঝাপসা – কিন্তু এমনিতে মনে হল দেখতে -শুনতে ভালোই – আপনার একটাই ছেলে?
– হ্যাঁ।
এবার শব্দ উচ্চারণ করলাম। মাথা নাড়লাম না।
– কোন ক্লাস?
– সিক্স?
– বয়স কত হবে?
– এগারো।
– না, মিসেসের?
– থার্টি ফাইভ।
– হুঁ, টিভিতে চেহারা দেখেই আন্দাজ করেছিলাম ফর্টি ক্রস করেনি, মিডিয়াও বলছিল যুবতী গৃহবধূ — এই বয়সে এমন একটা শক – কী বলব বলুন – ঠিক আছে – টেক কেয়ার —
আমি বেরিয়ে আসি। নিজের চেয়ারে এসে আবার বসি। বরুণ এগিয়ে আসে।
– কী বলল রে মালটা?
– এই জিগ্যেস করছিল – কীভাবে হল – কেমন আছি –
– হারামি একটা! শালা ঘটনার দু-দিন পরই সেকশনে এসে বলছে, আরে আপনাদের কোলিগ তো সেলিব্রিটি হয়ে গেল! টিভিতে দেখাচ্ছে – যে কারণেই হোক মশাই রাতদিন টিভিতে মুখ দেখানো, ইন্টারভিউ দেওয়া, চাট্টিখানি কথা!
গ্রুপ ডি নন্দ কয়েকটা ফাইল দিয়ে যায়। মৃদু হাসে। বলে, দাদা ভালো আছেন? আমি মাথা নাড়ি। জয়েনিং লেটার লিখতে বসি।
দুই
ঘটনার আজ উনিশতম দিন। গত ১৮ দিন অফিসের কথা ভাবতেই পারিনি। ছুটির নেওয়ার কথা নিকট সহকর্মীকে টেলিফোন করে জানিয়েছিলাম। আধিকারিককেও। একটা মেলও পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। দু-একজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ফোন করেছিল। দু’একজন বাড়িতেও এসেছিল। কর্মচারী সমিতির নেতা ফোন করেছিলেন।
আজ যখন অফিস এসেছি, ধরেই নেওয়া হবে সমস্ত বিপর্যয় কাটিয়ে আমি স্বাভাবিক যাপনে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু করছি। ঘটনার আকস্মিকতা আর নেই। তৎজ্জনিত সৃষ্ট অভিঘাতও অপসৃয়মান। সময় আঘাত হন্তারক। ১৮ দিন ধরে যে ঝড়-ঝাপটা আমি সহ্য করেছি, তা কাটিয়ে উঠে আমি অফিসে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিক কাজ করেছি। এমনটাই ধরে নেওয়া হবে।
বস্তুত, এমনটা ধরে নেওয়া হলে ঠিকই ধরে নেওয়া হবে। টেলিফোনে বা সাক্ষাতে ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের সঙ্গে কথোপকথন আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। দিনের বেশিরভাগ সময় যাদের সঙ্গে কাটাই, তাদের মাঝে ফিরে যেতে আমার ইচ্ছেই করছিল। আজ কিছুটা চাপমুক্ত লাগছে।
আজ সকাল সকাল তৈরি হচ্ছিলাম এইসব ভাবতে ভাবতেই। নিজেকে তৈরি করছিলাম। বাড়িতে একটা তাল যে কেটেছে, এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। নন্দিনী ঘর থেকে প্রায় বেরোচ্ছেই না। ‘প্রায়’ বলছি কারণ টয়লেট আমাদের শোওয়ার ঘরের লাগোয়া হলেও, খাওয়ার জন্য ঘরের বাইরে বেরোতেই হবে। খাওয়ার টেবিলটা আমাদের ড্রয়িং কাম লিভিং রুমে।
খাওয়ার কথা বলছি বটে কিন্তু নন্দিনী খাবার দাঁতে কাটছে কই! প্রথম কয়েকদিন, প্রায় দিন সাতেক, কিছু মুখে তুলেছে কিনা সন্দেহ। ক্রমাগত বমি করেছে। ট্রমার কারণে বমি হওয়া স্বাভাবিক। এখন তা-ও কিছুটা খাওয়ানো যাচ্ছে। মুখ বুজে, যেন খাওয়া উচিত নয় কিন্তু শারীরবৃত্তিয় ব্যাপার, তাই খাচ্ছে। যদিও সামান্য সে-খাওয়া। সেই সামান্য খাওয়া খেয়ে কী করে বাঁচবে নন্দিনী আমি জানি না।
আমি খেতে বসলাম। মা আমাকে ভাত বেড়ে দিল। সোফায় বসে খবরের কাগজ হাতে বাবা। নন্দিনী নিজের ঘরে। মানে আমাদের শোওয়ার ঘরে। আমি চুপচাপ খেতে থাকলাম। এই ক’দিন এমনই চলছে। মা-বাবা কথা প্রায় বলছেই না। বললেও অতি অল্প। যেটুকু না বললে নয়।
একটা ব্যাপার ঘটে গেছে লক্ষ করছি, আমরা কেউ প্রায় পরষ্পরের চোখের দিকে তাকাচ্ছি না। মা বা বাবার দিকে তাকিয়ে আমি কথা বলছি না। মা-বাবাও। তবুও যেটুকু যা দৃষ্টিপাত পারষ্পরিক – স্থবির, বোবা। যেন ঘটে গেছে মর্মান্তিক বিপর্যাস, যেন ঝড় এসে উপড়ে নিয়ে গেছে শেকড়-বাকড়।
মা আমাকে আর দুটো ভাত দেওয়ার জন্য হাতা বাড়াল, আমি মাথা নাড়ালাম। না, লাগবে না। এভাবেই চলছে আমাদের সংসার।
খাওয়া শেষ করে আমাদের শোওয়ার ঘরে পা ফেলি। নন্দিনী শুয়ে ছিল। আমার আসার শব্দে চমকে তাকায়। আমি হাসি। নন্দিনী পাশ ফিরে শোয়। পায়জামা ছেড়ে জামা-প্যান্ট পরি। নিজেকে তৈরি করি। বডি স্প্রে-টা হাতে নিই। কিন্তু আবার রেখে দিই। গায়ে দিলাম না। ইচ্ছে করল না।
রেডি হয়ে নন্দিনী’র কাঁধে হাত রাখি। ঘুরে আমার দিকে তাকাল। সোজা চোখের দিকে। বলল, “তোমাকে একটা কথা বলার ছিল – ঠিক আছে রাতে বলব, সাবধানে যেও।”
আবার পাশ ফিরে গেল। আমি মা-বাবাকে বলে বেরোলাম।
তিন
ভেবেছিলাম বরুণ চলে গেল, ওর হয়ে গেছে। দেখলাম, না হয়নি, ও আবার অভীক, শ্যামল আর বাগচিকে নিয়ে এল। ওরা চেয়ার টেনে আমার টেবিল ঘিরে বসল। এর মধ্যে একদিন বরুণ আর অভীক আমার বাড়িও গিয়েছিল।
– নন্দিনীর গাটস্‌ আছে বলতে হবে, নো ডাউট! যে ভাবে টিআই প্যারেডে ক্রিমিনালটাকে ধরিয়ে দিল –
অভীক শুরু করে। শ্যামল আর বাগচি সায় দেয়। আমি ওদের দিকে তাকাই। এবার বাগচি।
– আচ্ছা চল আমরা ক্যান্টিনে গিয়ে বসি, তুইও একটু হালকা হবি, চ –
ক্যান্টিনে গেলাম। লাল চা এল। চায়ে চুমুক মারি। আবার বাগচি।
– নন্দিনী সেদিন কী পরে ছিল, শাড়ি না সালোয়ার?
– সালোয়ার।
– কীভাবে হল ব্যাপারটা একটু ডিটেইল কর তো, মানে –
ওরা নন্দিনীকে চেনে। আমার বিয়েতে গেছে। অন্য সহকর্মীদের বিয়েতে যেখানে আমার সপরিবার নেমতন্ন, নন্দিনীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। অভীক আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে। অন্যরাও। আমার সহকর্মীরা একটা রানিং কমেন্ট্রি চাইছে। আঁখো দেখা হাল। কিন্তু আমি তো ঘটনাটা চোখে দেখিনি। নন্দিনীকেও এখনও জিগ্যেস করে উঠতে পারিনি। আমি কী ধারাবিবরণী দেব?
চার
সকালেই ছিল ইশারা। অটোয় গড়িয়া আসছি। পেছনের সিটে বসেছিলাম। কোনো দিকে তাকাইনি। কিছুদুর যাওয়ার পর পাশের ভদ্রলোক বললেন, “সব ঠিক আছে তো?” আমি তাকালাম। দেখলাম উদ্দেশ্য আমি। মুখটা পরিচিত মনে হল, অটো স্ট্যান্ডেই সম্ভবত দেখেছি। আমি মৃদু হেসে মাথা নাড়লাম।
অটো চলছে গড়িয়ার দিকে। উনিও সম্ভবত আমার মতো মেট্রোর যাত্রী। গড়িয়া নেমে মেট্রো ধরবেন। উনি জানেন সবকিছু। জানবেনই না কেন! প্রথম তিন-চারদিন মিডিয়া ক্যামেরা আর অন্য কোনো দিকে ঘোরায়নি। ধারাবিবরণী তো শুনিয়েইছে, প্রতি সন্ধে বেলা বসিয়েছে গোলটেবিল। সেখানে আমাদের বাড়ির ছবি। নন্দিনীর ছবি। ব্লারড। মুখটা ঝাপসা করে দিয়েছে।
আমার ছবি। আমার মুখ অবশ্য ঝাপসা করেনি। ফলত চেনা, স্বল্প-চেনা অনেকেই দেখে আমাদের বা আমাকে চিনতে পেরেছে। তাছাড়া খবরের কাগজেও ছবি দেখেছে। তাই চিনে ফেলতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু উনি মানে অটোয় এই মুহূর্তে আমার সহযাত্রী ‘সব ঠিক আছে’ জেনেও আরও কিছু জানতে চান। অতিরিক্ত। ঘোড়ার মুখের খবর। ওঁর শরীরী ভঙ্গি দেখে তাই মনে হল।
শেষমেশ উনি আবার মুখ খুললেন, “ছাড়বেন না, একদম ছাড়বেন না, ক্রিমিনালটার ফাঁসি হওয়া উচিত।”
আমি চুপ। এই কথার আর আলাদা করে কী জবাব হতে পারে। উনি আবার বললেন, “আচ্ছা একজনই তো ছিল, গ্যাং রেপ তো নয়, তাই না?” আমি মাথা নাড়লাম। মানে না, গ্যাং রেপ নয়। আবার প্রশ্নঃ আচ্ছা ওই ভর সন্ধেবেলা, কাছাকাছি লোকজন ছিল না? মাত্র একজন কীভাবে ঘটাল ব্যাপারটা?
আমি বুঝলাম উনি বিবরণ চাইছেন। আমরা বিবরণ পছন্দ করি। ধারাবিবরণী। প্রতিটা পদক্ষেপ। গোলটা কীভাবে গোলকিপারকে পরাস্ত করে জালে জড়াল বা বোলার কীভাবে নিখুঁত ইয়র্কারে ব্যাটসম্যানের মিডল স্ট্যাম্প নড়িয়ে দিল – আমরা শুনতে চাই । অজয় বসুদের মতো ঢিকিস ঢিকিস প্রাচীন গড়িয়ে গড়িয়ে নয়, হতে হবে স্মার্ট, ঝকঝকে উপস্থাপন। কিন্তু আমি নির্বাক।
আমি গড়িয়ার অপেক্ষায়। কখন আসবে। কিন্তু গড়িয়া তো আসবে না, আমাকেই যেতে হবে। অটো ছুটে চলে। অবশেষে গন্তব্য আসে। আমি নেমে পড়ি। নামতে নামতেও ভদ্রলোক বললেন, “ছাড়বেন না, একদম ছাড়বেন না!”
মাঝে অনেকটা বিরতি থাকায় আমি হঠাৎ ঠাহর করতে পারি না। বেবাক তাকাই ওনার দিকে। ভাড়া মিটিয়ে উনি ততক্ষণে ছুটছেন মেট্রো স্টেশনের দিকে। ভাড়া মিটিয়ে আমিও এগোই সেই দিকেই।
প্রেডিকশন ছিলই, না থাকারও কথা নয়, কিন্তু তখনই বুঝতে পারি আজ কী হতে চলেছে। মর্নিং শোজ দ্য ডে। মানে আমাকে আজ আরও অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হবে।
পাঁচ
আমার সহকর্মীদের জানার আগ্রহাতিশয্যে আমি আমতা আমতা করি। জানাই আমার অপারগতার কথা। বাগচি বিবরণের অনেকটা দায়িত্ব নিজেই নিয়ে নেয়।
– সালোয়ারে সমস্যা অনেক কম। চেপে ধরে শুইয়ে ফেলল, তারপর দড়িটা খোলা কী এমন কঠিন ব্যাপার! আর দড়ি খুললেই তো কেল্লা ফতে – চিচিং ফাঁক – সবটা ওপেন –
– কেন প্যান্টি আছে না?
আমি ওদের ধারাবিবরণী শুনি। নির্বাক। শেষ প্রশ্নটা বা শেষ বাধার কথা তুলল বরুণ। ঘটনার পর ও আমার বাড়ি গিয়েছিল।
– প্যান্টি ছিল?
বেশ খানিকক্ষণ পর আমি বুঝলাম শ্যামলের প্রশ্ন আমার উদ্দেশে। কেবল শ্যামলের নয়, বলাই বাহুল্য, সকলের। মূঢ়তা সম্ভবত আমায় পুরোটা গ্রাস করেনি। আমি ভাবার চেষ্টা করলাম এই প্রশ্নের উত্তর কী হবে। নন্দিনী তো প্যান্টি পরে। সালোয়ার তো কখনও প্যান্টিহীন পরে না।
– থাকার তো কথা।
– প্যান্টি থাকলেই বা কী! মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে কি গায়ের জোরে পারবে?
এরপর বাগচি, কীভাবে একটা মেয়েকে চেপে ধরে প্যান্টি খুলে নেবে, সামান্য অভিনয় করেও দেখাল। শ্যামল বলল ধর্ষণ আটকাবার জন্যে সব মেয়েকেই স্কিনটাইট জিনস্‌ পরা উচিত। স্কিনটাইট জিনস্‌ সহজে খোলা যায় না।
বাগচি সেই বাধাকেও পাত্তা দিল না। ও বলল গ্যাং রেপ হলে ওসব জিনস্‌-ফিনস্‌ দিয়েও কিস্যু হবে না। দু-জন হাত-পা চেপে ধরবে। একজন বোতাম আর চেনটা খুলে দেবে। তারপর একজন হাতদুটো টেনে ধরবে আর বাকি দু-জন দুটো ঠ্যাং থেকে ছাড়িয়ে নেবে জিনস্‌-এর দুটো পা। ব্যস, কেল্লাফতে! ওপেন!
– বহুদিন আগে একটা বাংলা বই দেখেছিলাম জানিস –
– আদালত ও একটি মেয়ে – আমিও দেখেছি – মৃণাল সেনের –
– তপন সিনহার! মৃণাল সেনের একদিন প্রতিদিন –
বাগচির মনে পড়ে গেছে ধর্ষণ-বিষয়ক বাংলা ছবির কথা। মনে পড়বেই। অনুষঙ্গের পর অনুষঙ্গ আসবে। আমি জানি। আমিও জানি ছবিটার কথা। যদিও বাগচি বলার আগেই সিনেমার নামটা বরুণ বলে দেয়। পরিচালকের নাম ভুল বলেছে। অভীক ঠিক নাম জানিয়েছে। বরুণও ওই ছবি দেখেছে। শ্যামলও। আর অভীক তো জানবেই। সে অনেক খবর রাখে।
তারপর সেই বাংলা ‘বই’ নিয়ে কথা হয়। বিভিন্ন দৃশ্যের কথা। জলের মধ্যে নায়িকার রেপের কথা। জলের মধ্যে কীভাবে করল, সেই ঘটনার সম্ভাব্যতা-অসম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাগচি নায়িকার স্ক্রিননেম ধরে কথা বলছে না, তনুজা-তনুজা বলছিল, কারণ তনুজা সেই ফিল্মের নায়িকা ছিলেন। তনুজা যে বোম্বের নায়িকা কাজলের মা, তা-ও উল্লেখ করল।
ছবিটা যে ওই সময়ের প্রেক্ষিতে খুব সাহসী ছিল, এ বিষয়ে ওরা প্রত্যেকে একমত। অভীক বলল ছবিটা এখনকার প্রেক্ষিতেও যথেষ্ট সাহসী ও প্রাসঙ্গিক। সকলে ‘বই-বই’ করে বললেও, অভীক ‘বই’ নয়, ছবি বলছিল। ওরা আরও একটা বিষয়ে সহমত হল, যে তপন সিংহ কাজটা খুব ভাল করেছিলেন। আমি ওদের মুখের দিকে চেয়ে, ওদের কথা শুনছিলাম। যে-যে যখন-যেমন কথা বলছিল, আমি তার দিকে তাকাচ্ছিলাম।
– আচ্ছা তোর অস্বস্তি হচ্ছে না?
আমি বুঝতে পারলাম না, কোন অস্বস্তির কথা আলাদা করে বলা হচ্ছে আমায়। আমি যথারীতি ফ্যালফ্যালে।
– সে তো হবেই – বইটায় মনে আছে যখন কোর্টে বলছে –
– বস্তি-দেশের লোম –
– হ্যাঁ, হ্যাঁ – ভয়ঙ্কর – সহ্য করা কিন্তু কঠিন –
– ওখানে একটা অবিবাহিত মেয়ের কথা ছিল – ওর প্রেমিকটা পালাল – এখানে বিবাহিত –
বাগচি ‘এখানে’ বলতে নন্দিনীর ঘটনার কথা বলছে। খেয়াল করার মতো বিষয়, ও কিন্তু ব্যাপারটা ফিল্মের মতোই ভাবছে। আদালত ও একটি মেয়ে’র নায়িকা তনুজা আর এই নাম-না-জানা বইটার নায়িকা নন্দিনী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তনুজা তো আর সত্যি সত্যি ধর্ষিতা হননি। কিন্তু, নন্দিনী ধর্ষিতা। সত্যি সত্যি। কোনো শ্যুটিং নয়।
সিনেমা দৃশ্যের পর দৃশ্য তৈরি করে। টিভিও। আমাদের জীবনের দৃশ্য সিনেমার দৃশ্যের সঙ্গে কীভাবে যে এক হয়ে যায়!
ধর্ষণ সবসময় ঘটে না। প্রতিটা পরিবারেও ঘটে না। অন্তত এখনও পর্যন্ত ঘটছে না। রেপ নামক কিছুটা লার্জার-দ্যান-লাইফ ঘটনাটা তাই সিনেম্যাটিক। ধর্ষণ তো কেউ চাক্ষুষ করে না। যা কিছু দেখা তা সিনেমার পর্দাতেই। তাই বাগচির কাছে তনুজা আর নন্দিনী বোধহয় এক হয়ে গেছে। নন্দিনীর ঘটনাটাও সিনেমা হয়ে গেছে। তনুজার ঘটনাটা সিনেমায় দেখেছে। নন্দিনীরটা দেখেনি, তাই শুনতে চাইছে। বিবরণ। তনুজারটা জলে হয়েছে, নন্দিনীরটা ডাঙায়। কিন্তু কীভাবে?
– বস্তির লোমটা কী?
শ্যামল বুঝতে পারে না, ঠিক কোন অঞ্চলকে বস্তি-দেশ বলে। বাগচি হাসে। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় যে ধরণের স্ল্যাং ব্যবহার করা হয়, সে অতদুর গেল না বা যেতে পারল না। সম্ভবত এখানে আমার বৌ জড়িত বলে। এবং আমি সামনে আছি – এটাও অন্যতম কারণ। অভীক শ্যামলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,
– পিউবিক হেয়ার।
– আচ্ছা, নন্দিনীর ওখানে সেরকম কিছু পাওয়া গেছে?
– সে তো পাবেই – রেপিস্টের লোম ওখানে থাকবেই – ফরেন্সিক ঠিক প্রমাণ করে দেবে – ওটা প্রমাণের বড় হাতিয়ার –
শ্যামল হাসে। হালকা। মানে সে এবার বুঝতে পেরেছে। বাগচিও হাসে। প্রচুর প্রশ্ন জড়ো হচ্ছে বুঝতে পারছি, আমাকে আরও দায়িত্ববান হতে হবে। উত্তরগুলো ঠিকঠাক দিয়ে বন্ধুদের দাবি, আমার পূরণ করা উচিত। শ্যামল আমার দিকে তাকায়। বুঝি আরও কোনো প্রশ্ন ওর ঠোঁটের ডগায় উঠে এসেছে।
– হ্যাঁরে, নন্দিনীর সেলাই পড়েছে?
আমি ইতস্তত। এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি। কিন্তু কী বলব ভাবছি, বরুণ চলে এল। বলল,
– না, না, এখানে তো একজন ছিল – গ্যাং রেপ-এ সেলাই পড়ে। ওটা মানে… ইয়েটা ফেটে যায়–
– ইয়ে মানে?
– ভ্যাজাইনাটা ফেটে যায় –
– তুই জায়গাটা দেখেছিস?
– বোঝো, ও স্বামী, দেখবে না?
– না, মানে… সে তো দেখবেই, কিন্তু রেপের পরে দেখেছে কিনা সেটাই জানতে চাইছি –
– কিরে দেখেছিস?
শ্যামল বা বাগচির কৌতূহলের জবাব কী দেব ভাবছি কিন্তু বুঝলাম কিছুই ভাবতে পারছি না। গুলিয়ে উঠল ভেতরটা। প্রশ্নটার পরবর্তী বিরতিটুকু চেপে ধরছে ক্রমশ।
নীরবতা কখনও কখনও সন্ত্রাস। বুঝতে পারছি কিছু বলতেই হবে, কিন্তু কিছুই বলতে পারছি না। ওরাও কি কিছু বলবে না? শ্যামলের না হয় নির্লজ্জ কৌতুহল অসীম, কিন্তু বাকিদের? অভীক তো কবিতা লেখে? ও-ও কিছু বলবে না? ওরা বোধহয় বুঝল কিছু।
– রেপ-এ অপমান, লাঞ্ছনা সবই আছে মানছি, কিন্তু একটা প্লেজারের ব্যাপারও আছে –
আমার মনে হল, অভীক একটু অন্যদিকে সম্ভবত আলোচনা ঘোরাতে চায়। ওর বোধহয় অস্বস্তি হচ্ছে। ও লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা লেখে। আমার অবস্থানে নিজেকে ভেবে নিয়েও এই অনুভূতি হতে পারে। জানি না।
বাগচি উৎকর্ণ। সে প্লেজারের ব্যাপারটা শুনতে চায়। রেপ-এ শেষমেশ একটা প্লেজার আছে – কেবল এইটুকুতে সে সন্তুষ্ট হতে পারে না। আরও একটু না শুনলে বিষয়টা পরিষ্কার হয় না। পরিষ্কারের দায়িত্ব অবশ্য অভীকের। সে শুরু করে।
– একবার যদি পেনিট্রেশন হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু মেয়েটা একটা সময় আনন্দ পাবে –
– ধুত্‌!
– পাবেই – এটা ফিজিওলজিক্যাল ট্রুথ ভাই বাগচি !
– কী বলছিস?
– নেচার। একটা প্লেজার পাবেই! অপমান-টপমানের ব্যাপার তার পরে –
আমি বুঝলাম এরপর কী প্রশ্ন আসতে চলেছে। যথারীতি বাগচি করেও ফেলল সেই প্রশ্ন যে ফুল পেনিট্রেশন হয়েছিল কিনা নন্দিনীর ক্ষেত্রে। আমি আবার বিপদে পড়লাম। এত কথা তো আমি নন্দিনীকে এই ১৮ দিনে জিগ্যেস করে উঠতে পারিনি।
ওদের উৎসাহ দেখে আমার খানিকটা নিজেকে অপরাধীই মনে হল। আমি ওদের কোনো প্রশ্নেরই যথাযথ উত্তর দিতে পারছি না। ওদের কৌতুহল মেটাতে পারছি না। নন্দিনীর পরনে সেদিন প্যান্টি ছিল কিনা আমি নিশ্চিত বলতে পারিনি। বলেছি থাকা উচিত। থাকার কথা। আমি পরিষ্কার করে বলতে পারিনি, আমার বউ-এর পিউবিক হেয়ারে, বাংলায় যাকে বলে যোনিকেশ, বন্ধুমহলে কথ্যবাংলায় আরও স্ল্যাং কিছু বলা হয়, সেখানে ধর্ষণকারী সেই পুরুষের বিশেষ জায়গার লোম পাওয়া গেছে কিনা!
আমি এটাও বলতে পারিনি, ধর্ষণের পর মানে এই ১৮ দিনের মধ্যে আমি আমার বউ-এর ধর্ষিত-যোনি দেখেছি কিনা!
এবার কৌতুহল, পেনিট্রেশন বা পুং লিঙ্গের পূর্ণ প্রবেশ ওই যোনিতে হয়েছিল না হয়নি! কিন্তু আমি জানি না ফুল পেনিট্রেশন হয়েছিল কিনা বা হলেও নন্দিনী আনন্দ পেয়েছিল কিনা! অজ্ঞানতা যথেষ্ট অপরাধবোধ তৈরি করে আমার।
ছয়
অভীক যে কোনও ঘটনার একটা সামাজিক-রাজনৈতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারে। বিশ্লেষণ করতে পারে। ভালো বলে। ও ইন্টেলেকচ্যুয়াল। বিদ্বজ্জন বা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। ও জানে ধর্ষণের মধ্যেও ধর্ষিতার একটা প্লেজার আছে।
– ইনস্টিংক্‌টিভ বেসিক ডিসায়ারকে ফ্রয়েড বলেছেন ইড। এই ইড কোনো সামাজিক অনুশাসন মানে না।
– যা খুশি তাই করব, তাই তো! বরুণ হেসে বলে।
– আর সুপার ইগো হচ্ছে আমাদের বিবেক। সে ইডকে বলে, না, কোরো না, লোকে কী বলবে! সুপার ইগোর দাবড়ানিতে ইড চেপে থাকে।
– কিন্তু চেপে কি রাখা যায়? বাগচি প্রশ্ন তোলে।
– ঠিক তাই! কিন্তু জোর করে চেপে রাখলে যা হয়, ভেতর থেকে ইডের বেরিয়ে আসার ছটফটানি চলতেই থাকে। তাহলে? এবার ব্যালান্স করে কে?
– কে? বরুণ উত্তর চায়।
– ইগো।
– ইগো!
– ইয়েস। ইগো। সমাজের সিস্টেম মেনে সে সিদ্ধান্ত নেয় কতটা ইচ্ছেপূরণ করবে।
– সবসময় ব্যালেন্স করতে পারছে কোথায়?
– কিন্তু যার ইড ডমিন্যান্ট অর্থাৎ যার ইগো মূলত ইডের কথায় চলে, সে মরালিটির তোয়াক্কা করে না। ভেতরের ডিসায়ারকে সে লাগামছাড়া করে দেয়।
– তখনই যা খুশি করে বসে! বাগচি বলে।
– হ্যাঁ। নিজের আবেগের ওপর তখন আর কোনো কন্ট্রোল থাকে না। রেপিস্টরা মূলত এই নেগেটিভ ইমপাল্‌সের শিকার।
ইতোমধ্যে অর্পিতা আর মানালি এসে যোগ দিয়েছে। ওরা কখন এসেছে আমি ঠিক খেয়াল করিনি। সম্ভবত ওদের আগমন মানে দুটি মেয়ে আসার কারণেই অভীক রেপিস্টের মনের একটা ফ্রয়েডিয়ান ব্যাখ্যার দিকে আলোচনাটা ঘুরিয়ে দিয়েছে।
অভীক একটু থামতেই মানালি আর অর্পিতা আমায় কুশল জিগ্যেস করে। বৌদির কথা অর্থাৎ নন্দিনীর কথা জানতে চায়। আমি মৃদু হেসে ওদের প্রশ্নের জবাব দিই। মানালি আর অর্পিতা কম বয়েসী দুটি মেয়ে। বছরখানেক হল জয়েন করেছে।
– জানো তো মানালি, শ্যামল রেপ আটকাবার একটা ফর্মুলা বার করেছে –
বাগচি অনেকক্ষণ পরে কিছু বলার সুযোগ পায়। আমি বুঝতে পারছি ও কী বলতে চায়। মানালি আর অর্পিতা, সামান্য অস্বস্তি নিয়েই, বাগচির দিকে তাকায়। চাহনিতে বোঝা যায়, তারা জানতে চায় কী সেই ফর্মুলা।
– মেয়েদের সবাইকে স্কিনটাইট জিনস্‌ পরতে হবে। ওটা সহজে খোলা যায় না তো –
বাগচির চোখ অর্পিতার দিকে। বাকিদেরও। অর্পিতা জিনস্‌ই পরে। অস্বস্তি মেশানো আছে, তবু ওরা সেই হাসিই হাসে। শ্যামল কেন চুপ থাকবে। সে বলে,
– ঠিকই বলেছি, তুই অর্পিতাকে জিগ্যেস কর, ও তো টাইট জিনস্‌ পরে, খোলা কি যায় অত সহজে?
সকলের দৃষ্টি চলে যায় অর্পিতার জিনস্‌-ঢাকা নিটোল উরুর দিকে। আমারও। চোখ সরিয়ে আমি একটা সিগারেট ধরাই। ওরা হেসে বিদায় নেয়। অস্বস্তি কাটাতেই এই বিদায়। চোখগুলো এবার অর্পিতার জিনস্‌-শোভিত নিতম্বে দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়। আমিও একবার তাকাই। বলা বাহুল্য, না তাকিয়ে পারি না।
সাত
সিগারেটে টান মারি। আমার সহকর্মী-বন্ধুরা সিগারেট ধরায়। সমিতির নেত্রী এগিয়ে আসেন। মিতাদি। সকলের মতো কুশল জানতে চান। আমি যথাসাধ্য বলি। মিতাদি চলে যান। ক্যান্টিনে অনেকেই আমাকে দেখে। আমি আলাদা করে কারুর দিকেই তাকাই না। জনাদুয়েক কুশল জানতে চাইল। আমার কুশল।
আসলে ওরা নন্দিনী কেমন আছে জানতে চাইছে, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে না, অস্বস্তি হচ্ছে। তাই আমার কুশল। ওরা জানে আমার ভালো থাকা মানেই আমার বউ-এর ভালো থাকা।
সিগারেটটা অ্যাস্ট্রেতে গুঁজে ক্যান্টিন ছাড়ি। নিজের সেকশনের দিকে পা। ওরা মানে আমার সহকর্মীরা সম্ভবত এল না, পরে আসবে। সম্ভবত বললাম কারণ আমি হঠাৎই উঠে পড়লাম। আমার আর থাকতে ইচ্ছে করল না। ওদের সেভাবে কিছু বললামও না। ওরা হয়তো খেয়ালও করেনি। গল্পে মত্ত। নানান গল্প।
পথে টয়লেট পড়ে। ঢুকি। বেসিনে যাই। চোখে-মুখে জল দিই। ঘাড়ে। আবার গুলিয়ে ওঠে গা। টের পাই একটা বিবমিষা। ওয়াক। দু-চারবার কষ্টদায়ক ওয়াক ওঠে। বমি হয় না। লালা-টালাসহ সামান্য জল।
আমি সেকশনে ফিরে আসি। তপন সিংহের ‘আদালত ও একটি মেয়ে’র কথাই মাথায় ঘুরছে। ওখানে ভিকটিমের বাবা, সহকর্মীদের অর্গলহীন কৌতূহল আর উপদেশের ঠেলায়, অফিসে নিজের টেবিলের সামনে লিখে রেখেছিলেন, আমার ধর্ষিতা কন্যা ভালো আছে। ভাবলাম ওইরকম কিছু লিখে রাখলে কেমন হয়। আমার ধর্ষিতা স্ত্রী ভালো আছে।
নাহ্‌, একটু বেশি নাটকীয় হয়ে যাবে। বা ফিল্মি। এতদূর যাওয়াটা ঠিক হবে না। আটকে যাই, কিন্তু কিসে যে আমি আটকে যাই বুঝতে পারি না। সম্ভবত অতটা সাহস আমার নেই।
আট
আমার পাশের টেবিলটা বিপাশাদির। উনি বোধহয় সেকেন্ড হাফে জয়েন করলেন। কোনো কাজ ছিল হয়তো। এতক্ষণ দেখিনি। হাসলেন। আমিও। ঘটনার পর বিপাশাদিও ফোন করেছিলেন। আমার বাড়িও গিয়েছিলেন একদিন। বিপাশাদি অনেকটা সিনিয়র। আমায় স্নেহ করেন। চুপচাপ ফাইল দেখছেন।
জানি কিছু বলবেন, কিন্তু হঠাৎ করে কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। আমিও ফাইল দেখি, কিন্তু অপেক্ষায় থাকি বিপাশাদির জন্য। যদিও বিপাশাদি আমার বাড়ি গিয়েছিলেন, কিন্তু তখন তো আর সুস্থির হয়ে কথা বলার মতো জায়গায় ছিলাম না।
নন্দিনীর ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে আমি অপেক্ষায় থাকছি। কখন এ প্রসঙ্গ উঠবে। আমি জানি বিপাশাদিও নিজেকে প্রস্তুত করছেন। কীভাবে শুরু করবেন। কীভাবে কথাটা পাড়বেন। অবশেষে বিপাশাদি নিজেকে প্রস্তুত করতে পারলেন।
– দুনিয়াটা চোখের সামনে হঠাৎ পাল্টে গেল তো?
আমি হাসলাম। মৃদু। হাসির কথা নয়, কিন্তু হাসলাম। আসলে পরিস্থিতি সময় সময় ব্যক্তিমানুষকে ক্লাউন বানিয়ে ছাড়ে।
– সবাই পাল্টে যেতে পারে, কিন্তু তুমি ঠিক থেকো, ওটাই আসল –
আমি আবার হাসসি। মৃদু। ওঁর দিকে পলকে তাকিয়ে আবার ফাইল। গ্রুপ ডি স্টাফ নন্দকে মনে মনে কৃতজ্ঞতায় ভরালাম। ভাগ্যিস কয়েকটা ফাইল দিয়ে গেছে। কিন্তু বুঝলাম আমায় কিছু বলতে হবে। পজ খুব লম্বা হচ্ছে যা অস্বস্তি বাড়ায়।
– আপনি সেকেন্ড হাফে ঢুকলেন?
– হ্যাঁ, হাফ সিএল ছিল। বউয়ের পাশে তুমি থাকলেই সব ঠিক – মনে রেখো রেপের আঘাতটা এখানে লাগে –
বিপাশাদি ডান হাতের তর্জনি নিজের মাথার নিয়ে দু’বার ঠুকলেন।
– রেপ না করে ক্রিমিনালটা তোমার বউকে যদি ছুরি মারত, শারীরিক আঘাত এর থেকেও বেশি হত, কিন্তু পরবর্তী পরিস্থিতি এইরকম হত না! এখন যে অসহায়তার মধ্যে পড়েছ, যেটা অসহ্য – এমন হত না !
চোখ মেললাম বিপাশাদির দিকে। আমি গাছের গন্ধ পেলাম। ছায়া সুনিবিড়।
– আমার শরীরটা কেবল আমার, সেখানে অতি ব্যক্তিগত গোপন ইচ্ছার জায়গায় কেউ জোর করে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে – এর থেকে অপমান আর কী হতে পারে! আমি চাইছি না, অথচ স্রেফ তোমার গায়ের জোর আমার থেকে বেশি বলে তুমি ফোর্স করবে! এই অপমানের সঙ্গে কোনো শারীরিক আঘাতের তুলনা চলে না –
নীচু গলায় বিপাশাদি যেন নিজের সঙ্গে কথা বলছেন। আত্মকথন। আমি দেখছি, ওঁর চোখে মুখে যন্ত্রণা চারিয়ে যাচ্ছে। নন্দিনীর আঘাতটা উনি ধারণ করছেন। মুহূর্তে নন্দিনীর স্বামী সত্তা থেকে হিঁচড়ে কেউ বার করে আনল আমার পুরুষ সত্তা। জানি না, সম্ভবত জীবনে এই প্রথম, পুরুষজন্মের জন্য লজ্জা বোধ হল।
– আমার পাড়ার মাদি কুকুরটার পেছনে মদ্দাটা জোর করেই উঠে পড়ে – ওদের তো কোনো রেপ নেই – কারণ ওদের সব সম্পর্কই রেপ – আলাদা করে কিছু নেই – কিন্তু আমরা মানুষ – তাহলে কী আমরা মানুষ নই – স্রেফ কথার কথা – আমরাও আসলে জন্তু-জানোয়ার –
অনেকটা পজ। এই নীরবতা আর অস্বস্তি তৈরি করছে না। অনেকক্ষণ পর, না ভুল বললাম, অনেকদিন পর একটা প্রশান্তি টের পেলাম। পরিস্থিতির ঢেউ-এর মাথায় ভাসতে ভাসতে অশান্তিটাই স্থায়ী হয়ে ছিল এতদিন। বিপাশাদির শুশ্রূষায় আমার আটকে যাওয়া দম যেন মুক্তি পেল।
– তোমার ছেলে কী বলছে ?
– ছেলে?
– শিশু হলেও চারপাশ দেখে ওর একটা রিঅ্যাকশন তো আছে? তাছাড়া খুব ছোট নয়!
বিপাশাদি আমার দিকে চোখ ফেরালেন। আমি উত্তর কী দেব হঠাৎ বুঝতে পারলাম না। ছেলের বয়স এগারো। ক্লাস সিক্স। কিছুই বোঝে না এমন তো নয়। এই বয়সে আমরা অনেকটাই পরিপক্ক ছিলাম।
বন্ধুরাই একে অপরকে জীবনের শিক্ষা দিত। নিষিদ্ধ ব্যাপারগুলো সম্পর্কে ঠিক-ভুল একটা ধারণা তৈরি হত। ওদেরও তাই হয় নিশ্চয়ই। তবে ঘটনার পর থেকে ছেলে কিছুটা চুপচাপ। অবশ্য আলাদা করে ওর দিকে এই ক’দিনে আর নজর দিলাম কই। একদিন কেবল স্কুল থেকে ফিরে এসে বলেছে, বন্ধুরা নাকি তাকে বলেছে, তোর মা তো সেলিব্রিটি হয়ে গেল!
বিপাশাদিকে সেসব কিছু বললাম না। বললাম, “না, তেমন কিছু না, তবে একটু চুপচাপ হয়ে গেছে – “
বিপাশাদি আবার ফাইলের দিকে। আমার অপেক্ষা শেষ হয় না। আমি জানি বিপাশাদির শেষ হয়নি। উনি আরও কিছু বলবেন। বাতাবরণ সেইরকমই। কিন্তু একটা সাবধানতা নিচ্ছেন কারণ এটা অফিস।
আমার পুরুষ কলিগদেরও সাবধানতা ছিল। কিন্তু তুঙ্গ আগ্রহ তাহারা কী করিয়া পরিহার করিবে! কী করবে বেচারারা! সহকর্মীর বউ। একে পরিচিত। দুয়ে যুবতী। সে যদি ধর্ষিত হয়, ডিটেইল জানতে ইচ্ছে করবেই!
আচ্ছা আমি কী করতাম, যদি নন্দিনী না হয়ে ঘটনাটা বরুণ বা বাগচির বউ-এর সঙ্গে হত? হলফ করে বলতে পারি কি আমারও আগ্রহ তুঙ্গস্পর্শী হত না! শ্যামল, বরুণ, বাগচি আর অভীকের জন্য আমার খারাপ লাগল।
– তোমার বাবা-মায়ের ওপর সামাজিক চাপ বেশি হবে, তারা অত চাপ নিতে পারবেন কিনা জানি না – কিন্তু তুমি যদি চাপটা নিয়ে বউয়ের পাশে থাকতে পার , তাহলে ও বাঁচবে , নাহলে –
বুঝতে পারছি বিপাশাদি যথেষ্ট ভরসা আমাকে করতে পারছেন না। বারবার আমার পাশে থাকার বিষয়ে ফিরে আসছেন। কিন্তু বিপাশাদির সন্দেহের কোনো কারণ নেই, কারণ আমি নন্দিনীর পাশেই আছি। নন্দিনীর অপমান আমার অপমান।
সঙ্কট এখানে একটাই। পুরুষের সঙ্কট। তার ওপর আমি নন্দিনীর স্বামী। স্বামী হিসেবে যে ক্রাইসিসের মুখোমুখি হব, নিজের মখোমুখি নিজে, তা হল শরীর। নন্দিনীর স্বামী হিসেবে আমার একক অধিকারে একজন এসে জোর করে ভাগ বসাল। নন্দিনীর শরীরটা আর আমার একার রইল না। এটাই ক্রাইসিস। একমাত্র ক্রাইসিস।
– তোমরা দ্বিতীয় সন্তান চাও না?
আমি হাসি বিপাশাদির প্রশ্নে।
– কেন বিপাশাদি?
– চার ধরণের সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে না গেলে একজন মানুষের জীবন পূর্ণ হয় না –
– চার ধরণের?
– স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, মা-ছেলে আর বাবা-মেয়ে। তোমার তো বোন আছে?
– হ্যাঁ।
– তাহলে একটা সম্পর্কই তোমার বাকি আছে –
অবাক চোখে আমি বিপাশাদির কথা শুনি।
– একজন পুরুষের মেয়ের বাবা হওয়া খুব দরকার।
নয়
চুপচাপ বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। এটা ঠিক নন্দিনীর শরীর আর আমার একার নেই। ভাগ বসে গেছে। নন্দিনীর শরীর এজমালি হয়ে গেছে। বরুণ-শ্যামল-বাগচিরা ভাবছে আর আমার একার অধিকার নেই নন্দিনীতে। ওদেরও আছে।
এক রেপিস্ট এসেই নন্দিনীকে বহুভোগ্যা করে দিল। আমার সহকর্মীরাও আমার স্ত্রীর শরীরের ভাগ চাইছে। ঘটনার ধারাবিবরণী চাইছে, গোপন অঙ্গের বর্ণনা চাইছে! আবার গুলিয়ে উঠল গা। আমি বাথরুমের দিকে পা বাড়ালাম।
বাথরুমে গিয়ে সামান্য টকজলসহ লালা-টালা বার করে, ঘাড়ে-মাথায় ভালো করে জল দিলাম। আয়নায় দেখলাম নিজেকে। না, সেইরকম ধ্বস্ত কিছু লাগছে না। বিপর্যয় তাহলে আমি এখনও ভেতরে রাখতে পারি!
নন্দিনী ঘরে বসে আছে আজ ১৮ দিন। ছুঁইনি। কিন্তু নন্দিনী এই ১৮ দিনে কত সহজলভ্য হয়ে গেল। সবাই এসে ওকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আসলে বারবার ধর্ষিতা হচ্ছে নন্দিনী। আদালত ও একটি মেয়ে-তে তো তাই আছে, কীভাবে একটি মেয়েকে সমাজ উপর্যুপরি ধর্ষণ করে। ধর্ষণের ছবি তো ওটা নয়, ধর্ষণ-পরবর্তী বলাৎকারের ছবি।
প্রতি মুহূর্তে সমাজের স্বীকৃতিতে এই হেনস্থা এই লাঞ্ছনা আজ আমার জীবনে চামড়া-পোড়া ক্ষত। কিন্তু এটাই দস্তুর। কোন ঘটনায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে সমাজ তা ঠিক করা আছে। জন্ম হলে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে সমাজ, মৃত্যু হলে কীভাবে বা বিবাহে কীভাবে – সব পূর্বনির্দিষ্ট। তেমনি ধর্ষণ হলেও প্রতিক্রিয়া পূর্বনির্দিষ্ট। নিস্তার নেই।
এভাবে ভেবে নিতে পারলে, কোনো ঘটনাই নতুন নয়। চমক নেই কোনো ক্ষেত্রেই। অনাস্বাদিত নয় কোনো মুহূর্ত। কিন্তু আমি তো এতটা সিনিক নই। সমাজের প্রতিক্রিয়া তাই কখনও আমার কাছে ছায়া সুনিবিড় আবার কখনও বমন-উদ্রেককারী।
আবার অভীকের কথা মনে পড়ল। ও বলছিল, পুরুষমাত্রই রেপিস্ট! নিজের স্ত্রী বা পার্টনারকে জোর করে সঙ্গম করলেও তা রেপ। এমনকি অরাজি পার্টনারকে ছলে-কৌশলে, ম্যানিপুলেশনে রাজি করিয়ে, সঙ্গম করাটাও রেপ।
সত্যিই এমন কোনো পুরুষ আছে নাকি, যে কক্ষনো তার অনিচ্ছুক পার্টনার/স্ত্রীকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাজি করিয়ে সেক্স করেনি? বুকে হাত দিয়ে আমরা বলতে পারব! সুপ্রীম কোর্ট ধর্ষণের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছে, তার মধ্যে এগুলোকেও ধর্ষণ হিসেবে ধরা হয়েছে। ফলে কে ধর্ষণকারী আর কে নয়, খুঁজতে গাঁ-শহর সব উজাড় হয়ে যাবে।
অভীকের কথাটা শোনার পরই সিগারেটটা চায়ের কাপে ফেলে আমি ক্যান্টিন থেকে উঠে পড়ি। আগে যে বলেছি হঠাৎ-ই আমি উঠে পড়েছিলাম, তা হয়তো ঠিক নয়। তারপর তো বাথরুমে গিয়ে ওয়াক ওয়াক, লালা-টালা ইত্যাদি।
পোস্টমর্টেম করলে বেরোবে কেন এ বিবমিষা? নন্দিনীকে পাবলিক করে আমার বন্ধুরা পরপর ধর্ষণ করছে বলে নাকি অভীকের কথা, সুপ্রীম কোর্টের ধর্ষণের সংজ্ঞা, আমাকে এক ঝটকায় সেই ক্রিমিনাল ধর্ষণকারীর সমগোত্রীয় করে দিল বলে? বন্ধুদের প্রতি ঘেন্নায় নাকি নিজের প্রতি ঘেন্নায় এ বিবমিষা?
আমি কি সত্যিই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, আমি কক্ষনো অনিচ্ছুক নন্দিনীকে ম্যানিপুলেট করে রাজি করাইনি? কখনও ছলে, কখনও কৌশলে, কখনও বলে, হ্যাঁ বলে, ওর সঙ্গে মিলিত হইনি?
দশ
সেকশন অফিসারকে বলে একটু আগে আগেই বেরিয়ে পড়লাম। করিডোরে অভীকের সঙ্গে দেখা হল। বলল, “স্যরি!”
বাইরে বেরিয়ে ভালো লাগল। যেটুকু শহুরে আকাশ, অসহায় দু-একটা গাছ আর ধোঁয়া ধোঁয়া কালচে বায়ুমণ্ডল – আমায় প্রশান্তি দিল। স্বস্তি ছেয়েছে সেরিব্রাল গোলকে।
নিজেকে কাটাছেঁড়া ফলদায়ক। স্পষ্ট হচ্ছে নিজের অবস্থান নিজের কাছে। হাঁটতে শুরু করলাম। গতিময়তা ও মলিন বাতাসই সম্ভবত কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিল। একটা শুদ্ধি টের পাচ্ছি নিজের ভেতর। স্বীকারোক্তি সঞ্জীবনী। শ্বাস ফিরিয়ে আনে।
নন্দিনীর প্রতি এক অনিঃশেষ ভালবাসা টের পেলাম। কত অসহায়, কত অবলম্বনহীন পড়ে আছে মেয়েটা এই ১৮টা দিন। একটা স্নেহবোধও জাগ্রত হল। নন্দিনী যেন আমার দয়িতা। আমার মেয়ে। বিপাশাদির কথা মনে পড়ে গেল। মেয়ের বাবা না হলে জীবন অপূর্ণ থাকে।
নন্দিনীর মাথায় মনে মনে হাত বুলিয়ে দিলাম। একটা কষ্ট ঠেলে উঠছে। গলার কাছে কিছু একটা যেন আটকে। আমি জানি ওটা কান্না। ঝাপসা হল চোখ। রুমাল বোলালাম।
সকালে কী যেন বলতে চাইছিল নন্দিনী। আমি জানি কী বলবে। ও বলবে বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়ার কথা। অন্যত্র ফ্ল্যাট কেনার কথা। যেখানে প্রতিবেশী থেকেও নেই। ঈর্ষা নেই। হুল নেই। যার যার তার তার।
বাবা-মাও তাই বলবে জানি। ধর্ষিতা পুত্রবধূর শ্বশুর-শাশুড়ি হয়ে বাঁচা কঠিন। বাবা এর মধ্যে বাজার যাওয়া বন্ধ করেছে। মাছওয়ালারাও নাকি ফিসফিস করছে।
জানি সময় সবকিছু হত্যা করে। কিন্তু সন্দেহ, এই জান্তব ক্ষতে সময়ও প্রলেপ দিতে অসমর্থ। তবু, একটু থিতোক, তারপর আমরা চলে যাব নন্দিনী। অনেকদূরে চলে যাব। যেখানে যার যার তার তার। আমার ট্রাজেডি অন্যের কমেডি নয়। দফতর বদলেরও দরখাস্ত দেব।
আমার শ্বশুরবাড়ি খুব দূরে নয়। নন্দিনীর মা-বাবা হতভম্ব। কী করণীয়, এই বোধটাই হারিয়ে ফেলেছেন। নন্দিনীরা এক ভাই এক বোন। ও বড়। ওর ভাইটা থানায় গিয়ে ক্রিমিনালটার মুখে সপাট একটা ঘুঁষি দিতে পেরেছিল। উপস্থিত জনতা ও পুলিশ তাকে দ্রুত সরিয়ে নেয়, নাহলে সে দিদির অপমানের একটা হেস্তনেস্ত ওখানেই করে ফেলত।
ভাই-ভাইয়ের বউ নিয়মিত আসে আমাদের বাড়ি। ওদের ক্লাস থ্রিয়ের মেয়ে আমার ছেলের সঙ্গে খেলে। ওরা এলে বাড়িটা কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। আমার শ্বশুর-শাশুড়িও এসেছেন বারকয়েক এই ১৮ দিনে। তারা কেমন একটা জড়োসড়ো হয়ে থাকেন। বিশেষত আমার মা-বাবার সামনে। যেন তারাই অপরাধী।
আমি রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়াই। চা খাই এক কাপ। গ্রীষ্মের এই ব্যাকুল সাঁঝবেলা আমার জীবনে অপার্থিব আনন্দ ঢালে। চরাচর পবিত্র মধু ক্ষরন্তী। হাত বোলালাম এক ধূসর গাছের গায়ে। কালচে বাতাসই নিলাম বুক ভরে। বাড়ি যাব। নন্দিনীর কাছে যাব। মেট্রো ধরব বলে দ্রুত পাতাল প্রবেশ করলাম।
এগারো
বাড়ি পৌঁছেই জুতোটা খুলে গেলাম আমাদের বেডরুমে। সোজা নন্দিনীর কাছে। ছেলে মা-বাবার ঘরে পড়ছে। নন্দিনীর হাতেও ম্যাগাজিন। আমায় দেখে হাসল। বিষণ্ণ সে হাসি। কিন্তু হাসিতো বটে! গত ১৮ দিনে যা ছিল না। আজ নন্দিনী হাসছে। বসে আছে বিছানায়।
সংলগ্ন হলাম নন্দিনীর। দু’হাতে ওর গাল স্পর্শ করলাম। মাথাটা টেনে নিয়ে কপালে একটা চুমু খেলাম। আমি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে। নন্দিনীর মাথা আমার পেটে। আমি ক্রমাগত ঘন আলিঙ্গন। রিরংসাহীন এই আশ্লেষ সম্ভবত নন্দিনীকে দিয়েছে আশ্রয়সুখ।
ও কেঁদে ফেলল। হু-হু সেই কান্না আর তার দমক আমাকেও আদ্র করল। আমার গাল বেয়ে টপটপ জল ঝরে পড়ল নন্দিনীর মাথায়। কোথায় যেন পড়েছিলাম কাঁদলে অস্তিত্বের স্নান হয়।
একচোট নীরব কান্নার পর আমরা কিঞ্চিৎ ধাতস্থ। এবার আমি ওর মাথায় একটা চুমু খেলাম। তারপর বললাম, “সকালে কী বলবে বলছিলে, বল?”
– আমাদের মেয়ে আসছে –
ওর মুখ তুলে ধরলাম। কী বলতে চায় ও।
– মানে?
– তুমি মেয়ে চেয়েছিলে, দেখবে এবার মেয়েই হবে –
আমার পেটে আবার মাথা রেখে নন্দিনী যা বলল আমার হাত শিথিল। পা দুটো কেমন পলকা ঠেকছে। তারা যেন আর আমার দেহের ভার বইতে পারছে না। আমি বুঝতে চেষ্টা করছি নন্দিনী ঠিক কী বলছে। নন্দিনী তো কেবল মুখে বলছে না, ওর শারীরিক ভাষাও আমি পড়তে পারছি। আমি ক্রমাগত শূন্য কেবল এই ক’টা কথায় নয়। নন্দিনী তো আরও বলছে। অনেক কথা বলছে নন্দিনী।
পিরিয়ড মিস করেছি – বুঝতে পারছিলাম না – ভাবছি, হয়ে যাবে হয়ে যাবে – কিন্তু আজ তিনদিন, তাই বললাম –
ধর্ষণকারীর বীজে তৈরি সন্তান আমরা রাখব না, ওয়াশ করে নেব, এ তো পরিষ্কার। কিন্তু, না পরিষ্কার নয়। নন্দিনী আবার বলছে, আমাদের মেয়ে আসছে। দেখবে এবার আমাদের মেয়ে হবেই। কী বলছে নন্দিনী? এই সন্তান ও রাখতে চাইছে!
আচরণ কেমন হবে আমার এই পরিস্থিতিতে বুঝতে পারছি না। সামাজিক টেক্সট বইগুলোর পাতা মনে মনে উল্টেও আমি পূর্বনির্দিষ্ট কোনো আচরণবিধি খুঁজে পেলাম না। কিন্তু এই মুহূর্তে তা আমার দরকার।
দৃশ্যত স্থানু আমি আবার হাসলাম। সেই হাসি। হাসির কথা নয়, কিন্তু আমরা হাসি।
– তুমি এই সন্তান রাখবে – পাপের সন্তান!
ইউরেকা! সংলাপ পেয়ে গেছি! নির্বাক মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা সবচে কঠিন!
নন্দিনী অবাক। আমায় ছেড়ে খাটের অন্য পাশে গেল। আমি বসলাম।
– পাপ কেন? এ আমার তোমার সন্তান – পাপ আসছে কেন ?
– আমার? এখানে আমি কোত্থেকে আসছি নন্দিনী?
– একি, তুমি ভুলে গেলে – ঘটনার আগের দিন রাতেই তো – ভুলে গেলে! নন্দিনীর চোখে হাসির ঝিলিক।
– কী?
– সেদিন ডেঞ্জার পিরিয়ডই ছিল – মনে নেই তোমার –
ঘটনার আগের রাতেই আমাদের মিলনের কথা মনে করিয়ে দিতে চাইছে নন্দিনী, পারস্পরিক সম্মতিতেই যা সম্পন্ন হয়েছিল। আমার একটা আলগা ইচ্ছা সেদিন প্রকাশ করেছিলাম, “দ্বিতীয় বাচ্চায় আমায় আপত্তি নেই, তোমার?”
নন্দিনী হেসেছিল। সম্মতি স্মাইল। অতঃপর বনতল ফুলেফুলে ঢাকা।
সেই ঘটনা তো আমার যথেষ্ঠ মনে আছে। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে সৃষ্টির বীজ আমারই। কারণ ঠিক তার পরের দিনই আরেকজন বীজ বপন করেছে।
শেষ পিরিয়ডের প্রথম দিনের ১৪ দিন পর ডিম্বানু বেরোয় – ডেঞ্জার পিরিয়ড বলতে নন্দিনী সেই সময়কেই ইঙ্গিত করছে । প্রথম সন্তানের সময় আমাদের ডাক্তারবাবু নিখুঁত বুঝিয়েছিলেন। এক্ষেত্রেও আমাদের মিলন সেই মোক্ষম সময়েই ঘটেছে। যদিও তর্কসাপেক্ষে আমারই এগিয়ে থাকার কথা লক্ষ্যভেদে। কিন্তু – হ্যাঁ, এই কিন্তুটাই এখানে বড়!
লক্ষ্যভেদে যদি আমি সেদিন ব্যর্থ, তাহলে পরেরদিন সে সফল। একটা যদি থেকেই যায়। সন্দেহ। আর সন্দেহ নিয়ে পিতৃত্ব স্বীকার আমি করতে পারব না। কিন্তু কীভাবে এই কথা আমি নন্দিনীকে বলব?
কিছুক্ষণ একথা সেকথার পর আমি বলে বসলাম,”ওয়াশ করে ফেল নন্দিনী, মনে সন্দেহ নিয়ে এতবড় ডিসিশন নেওয়া ঠিক হবে না!”
নন্দিনী হতবাক হয়ে চেয়ে রইল আমার দিকে। চোখ ছলছল। ওর শরীর স্পর্শ করে কিছু বলতে চাইলাম। পারলাম না।
বারো
রাতে ঘুমিয়ে থাকি তাই, নাহলে বোঝা যেত কতটা পরাক্রম নিয়ে সে হাজির হয়। আজ আমি বুঝলাম। শেষ তো হবেই না, চেপে ধরে ক্রমাগত পাতালে ঢুকিয়ে দেবে এ নিশুতি। এই রাত নির্ঘুম আত্মনিয়ন্ত্রণহীন।
নন্দিনীর গর্ভনাশের জন্য কী বলেছি আর কী করেছি, জানে এই মূষল রাত আর নন্দিনী। নন্দিনী কেবল হাঁ করে চেয়েছিল আমার আচরণে। ওকে নরম-গরমে বুঝিয়েও যখন দেখলাম আমি ব্যর্থ, আমি পুরুষ, প্রয়োগ করলাম বল ও আদেশ।
– গর্ভনষ্ট করতে হবে, না হলে…।
– কী, নাহলে কী?
নন্দিনীর প্রশ্ন শীতল।
– আমি মানতে পারব না, তাই আর আমাদের একসঙ্গে থাকা সম্ভব নয়।
নন্দিনী থম মেরে গেল আমার কথা শুনে।
তছনছকারী রাত। আমি তোলপাড় করেছি। অমৃত ওঠার কথা নয়। ওঠেওনি। গরল, গরল! সহকর্মীরা প্রশ্ন যুগিয়ে গেছে, আমি কেবল সেইগুলোই সাজিয়ে দিয়েছি। কেবল সেইগুলিই কেন, প্রশ্নের তো অভাব নেই।
– ছেলেটি তোমার চেনা?
– আগে কখনও দেখেছ?
– আগে নিশ্চয়ই কোনোদিন ফলো করেছিল, না হলে তোমার গতিবিধি জানবে কী করে?
– এত তো মায়েরা ওখানে যায়, কারুর কিছু হল না – তোমার কেন হল?
– পুরোনো কোনো প্রেম এর পেছনে নেই তো? আক্রোশ?
চাইনি এইসব বলতে, কিন্তু এ ভয়ানক নিশি চেপে ধরে আমায় সবটা বলিয়ে নিল! স্তম্ভিত নন্দিনী। আমি থামতে পারিনি।
– ফুল পেনিট্রেশন হয়েছিল সেদিন?
– তুমি আনন্দ পেয়েছিলে?
– ধর্ষণে শেষমেশ একটা আনন্দ আছেই – কতটা পেয়েছিলে, আনন্দ?
– আমার থেকেও ওই ধর্ষণকারী তোমায় বেশি আনন্দ দিয়েছিল?
এইসব অবলীলায় জিগ্যেস করেছি। কিন্তু সব জিজ্ঞাসায় তো আর প্রশ্ন থাকে না। নন্দিনী আর পারেনি। আমার থেকেও ওই ছেলেটি বেশি আনন্দ দিয়েছিল কিনা বলতেই ঠাটিয়ে একটা চড় কষাল আমায়।
দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য আমি তারপর নন্দিনীর চুল-টুল ধরে ইত্যাদি সে এক – গরল , গরল! নন্দিনী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।
চুরমার আমাদের বারো বছরের দাম্পত্য। নন্দিনী দ্রুত ব্যাগ গোছাল। আলো ফোটার আগেই সে বেরোবে। বাড়ি চলে যাবে। নিজের বাড়ি। বাবা-মা ভাইয়ের কাছে। আমি যা অপমান করেছি এমন অপমান নাকি ওই রেপিস্টও করেনি।
ভয়ানক ভোর ভারি হয়ে নেমে আসে আমার ওপর। কিন্তু জিভ নড়বেই। আমি পুরুষ।
বললাম,”নাটক কোরো না, তোমার বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে আর ছোটভাইটাকে বিপদে ফেলো না।”
নন্দিনীর ঠাণ্ডা স্বর,”আমি বাপের বাড়ি যাচ্ছি না, নিজের বাড়ি যাচ্ছি। ওটা আমারও বাড়ি, অধিকার আছে আমার। ভাইটা আর যাই হোক রেপ করবে না, লোকলজ্জার ভয় আছে। আর হ্যাঁ, বাবাইকে যদি না রাখতে পারো, পাঠিয়ে দিও।”
আমাদের এগারো বছরের ছেলেকেও নেবে না নন্দিনী। একা সম্পূর্ণ একা কয়েকটা জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়ে যায় শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে স্বগোত্রাভিমুখে।
আমার মা-বাবা উঠে এসেছে। তারা হাঁ করে চেয়ে। নির্বাক নন্দিনী কোনোদিকে না তাকিয়ে হেঁটে চলে যায়।
ছেলেও উঠে এসেছে ঘুম থেকে। সম্ভবত আমার মা-ই উঠিয়ে দিয়েছে। ছেলে অস্ফুটে একবার, তারপর বেশ জোরে ‘মা’ বলে চিৎকার করে। নন্দিনী পেছন ফিরেও তাকায় না।
আমি ভোরকে স্পর্শ করি। লুকোতে চাই। কিন্তু এ ভোর হাহাকার।
লেখক পরচিতি
দেবতোষ দাশ
জন্ম ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত উপন্যাস: ‘হলুদ কোকাবুরা’ (আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা), ‘বিন্দুবিসর্গ’ (কেতাব-ই, কলকাতা, ই-বই ও মুদ্রিত), ‘সন্ধ্যাকর নন্দী ও সমকালীন বঙ্গসমাজ’ (দ্য কাফে টেবল, কলকাতা) ও ‘কামসূত্র’ (ই-বই কেতাব-ই, কলকাতা; মুদ্রিত বই মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা)। গল্প সংকলন ‘ধর্ষণের ১৮ দিন পর’ (দ্য কাফে টেবল, কলকাতা)। লিখেছেন বাচ্চাদের জন্য নভেলা ‘ভূতের নাতি ভোলামন’ (মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা)। লেখেন নাটকও। কিংবদন্তী নাট্যদল নান্দীকার-এর হাত ধরে নাট্যজগতে তাঁর প্রবেশ। নাটক ‘ও চাঁদ’ লিখে পেয়েছেন ‘সুন্দরম পুরস্কার’। পেয়েছেন মোহিত চট্টোপাধ্যায় নামাঙ্কিত ‘মোহিত সম্মান’। ‘ধর্ষণের ১৮ দিন পর’ গল্পটি ২০১৫ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হতেই পাঠক-মহলে আলোড়ন তৈরি হয়।

7 thoughts on “দেবতোষ দাশের গল্প : ধর্ষণের ১৮ দিন পর

  • June 15, 2022 at 4:21 pm
    Permalink

    আমি তো দেবতোশ-এর ভক্ত। অসম্ভব ভালো, ভেতর নাড়িয়ে দেওয়া গল্প।

    Reply
  • June 15, 2022 at 6:27 pm
    Permalink

    পুরুষ মানসিকতার সমস্ত জটিল অংশগুলোকে বিস্তারিত ভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন ,দেবতোষ ।
    নাড়িয়ে দেওয়ার মতন লেখা ।

    Reply
  • June 16, 2022 at 11:55 am
    Permalink

    গল্পে বুঁদ! ভাষাাহীন।নগ্ন সমাজে,,,, পদে পদে,,,।

    Reply
  • June 16, 2022 at 2:25 pm
    Permalink

    পুরুষ শাসিত সমাজের এ যেন এক আত্ম বিশ্লেষন।

    Reply
  • June 20, 2022 at 12:46 pm
    Permalink

    কান্নার সাথে বমি উঠে আসছে দেবতোষ। ঐ ভোরে আমাকেও দাঁড় করিয়ে দিলে! — সুরজিত দা।

    Reply
  • June 29, 2022 at 11:08 am
    Permalink

    ভেতর নাড়িয়ে দেওয়া গল্প, শুধু ওপরে একটি জায়গায় সামান্য খটকা, পিতৃমাতৃহীন নিঃস্ব, পরবর্তীতে মা বাবা এলেন, ওটা কি গল্পে এমনি তুলনা দিতে বলা হয়েছিল

    Reply
  • July 4, 2022 at 1:27 pm
    Permalink

    দেবতোষ দাস স্যার যেভাবে হাত খুলে লিখেন। সেটা তো আমাকে অসম্ভব ভালো লাগে।
    আর এই ছোটগল্পটা তো আমাকে আরো ওনার দিকে টেনে নিলেন।।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *