এডাম লেভিনের গল্প : বহু কিছুই ঘটেছে


সমকালীন আমেরিকান গল্প 
অনুবাদঃ রাবেয়া রব্বানী

প্লাঞ্জার

রাতের পোশাক জড়ো করতেই সারা একটু চমকে উঠছিল। কিছু একটা নড়েচড়ে উঠছিল বা শব্দ করছিল। সারা বিড়বিড় করে বলছিল, শব্দটা কিসের? ধস্তাধস্তির? পানিতে হাবুডুবু খাওয়ার নাকি নিঃশ্বাসের? এত দ্রুত ঘটে গেল ব্যাপারটা যে বুঝতেই পারলাম না।

সারা নিশ্চিত হতে পারছিল না কিন্তু একটা ইঁদুরকে গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবে কমোডের বোল বেয়ে ওঠার চেষ্টা করতে দেখার পরই সারা আবিষ্কার করেছিল সে বাথটাবে দাঁড়িয়ে ড্যারেনকে চিৎকার করে ডাকছে।

ড্যারেন আবিষ্কার করেছিল সে একটা প্লাঞ্জার হাতে নিয়ে হম্বিতম্বি করছে আর ইঁদুরটাকে লক্ষ্য করে চেঁচাচ্ছে। সে চাইছিল ইঁদুরটা যাতে ভয় পেয়ে নিজেই পালিয়ে যায়।তারপর প্লাঞ্জারটা দিয়ে ইঁদুরটাকে কমোডের নির্গমনপথে ঠেলে দিয়েছিল সে।

তারপর প্লাঞ্জারটা দিয়ে ইঁদুরটাকে নিচের দিকে ডুবিয়ে দিয়েছিল সে।

কিন্তু অচিরেই সে বুঝতে পেরেছিল একটা ভুল হচ্ছে কারণ নির্গমনপথের দিকে ইঁদুরটাকে ঠেলে দিলে বরং পুরো পথটাই বন্ধ হয়ে যাবে।

আর তাই ড্যারেন তার কৌশল বদলে ফেলেছিল।

প্রথমে সে প্লাঞ্জারটা দিয়ে কমোডের নির্গমন পথের রাস্তা বন্ধ করেছিল এবং একই সাথে কোনো রকম চাপ না দিয়ে ইঁদুরটার পশ্চাদভাগে পাম্পটার কাপটা লাগিয়েছিল।

ইতোমধ্যেই ড্যারেন অসুস্থ বোধ করছিল। সারাকে হাসতে দেখে প্রথমে সে বলছিল, হেসোনা তো! তারপর আবার বলেছিল, আচ্ছা, হাসো।

ড্যারেন হয়ত নিজেকে সাহায্যই করছিল কিংবা সে হয়ত নিজের মধ্যেই ছিল না কিংবা অল্প বিস্তরই নিজের মধ্যে সে থাকতে পারছিল কিংবা এও হতে পারে সে তখন নিজের স্বরূপ চিনতে পারছিল। তাকে খুনি বানানোর জন্য দায়ী ইঁদুরটার প্রতি সে রেগে গিয়েছিল এবং তাই একটা উম্মাদের মতো কাজ করেছিল সে, একটা নোংরা কাজ করেছিল সে। প্লাঞ্জারটায় চাপ দিয়ে কাপটা সমতল করে ইঁদুরটার পেছন দিক চেপে ধরেছিল আর তারপর একইরকম ভাবে আরও কয়েকবার পাম্পটা চালিয়েছিল।

সারা বলেছিল, আরো বিশ ত্রিশ বার পাম্পটা এভাবে চালাতে হবে হয়ত। কিন্তু একটা ব্যাপার কি জানো, মনে হচ্ছে কাজটায় তুমি জন্মগত ভাবেই বেশ অভিজ্ঞ, ডন কারলন।

ড্যারেন বলেছিল, না, কিছুক্ষণ মনোযোগ ছিল বাকি সময় আমার মন অন্য কোথাও ছিল, আমি ঘামছিলাম।

সারা বলেছিল, ইঁদুরটা একটা হতচ্ছাড়া, একটা লম্পট। আচ্ছা বাদ দাও, এখন তোমার কাজটা শেষ হলে আমাদের নব দম্পতিকে বল, তুমি একটু আগে যা বলেছিলে।

একটু আগে আমি কিছু বলেছিলাম নাকি? আমার সত্যিই কিছু মনে নেই সারা।

সারা এরপর আমাদের বলেছিল, দেখো কাণ্ড! তার নাকি কিছু মনে নেই, মনে হয় কাজটা করে সে অনুতপ্ত। দেখো,আমি চেষ্টা করেছি যাতে তোমাদের বলে এবং বলেছিও তোমাদের বলতে।

এরপর ড্যারেন উঠে দাঁড়িয়ে জসেটকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি আর একটা বিয়ার নেবে?

তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি আর এক পেগ হুইস্কি নেবে?

তারপর সারাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমার কাছে কি কিছুই নেই?

উত্তরের অপেক্ষা না করে ড্যারেন খালি ক্যানগুলো একসাথে করে রান্নাঘরে ঢুকে কাচের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়েছিল। টেবিলের উপর রাখা থের্মস আকৃতির স্পিকারটায় মোবাইলের ব্লুটুথ সংযোগের শব্দ ভয়ানক ভাবে ভেঙে ভেঙে আসছিল। কয়েক মিনিট পর ড্যারন পানীয়গুলো নিয়ে এসেছিল, একটা বিয়ার, দুটা বারবেন আর একটা নিগরনি তার স্ত্রী সারার জন্য।

ড্যারেন ভেতরে গেলে আমি বলেছিলাম, তাহলে ইঁদুরটা একটা লম্পট?

সারা তার কবজিতে ধরে রাখা পানীয়গুলো একটা করে আমাদের ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, হ্যাঁ একটা লম্পটই। আমি বাথটাব থেকে জিনিসটা দেখেছি, উহ, কি জঘন্য! ইঁদুরটা অবশ্য আমাকে সেভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলেনি কিন্তু ড্যারেনের মুখের যে কি অবস্থা হয়েছিল! হা ঈশ্বর, কি বলব! মুখ বিকৃত করে, ভ্রু কুচকে যেভাবে লাফাচ্ছিল ড্যারেন! সবচেয়ে ভয়াবহ সময়টা ছিল যখন সে তার কাঁধ অনবরত নড়াচ্ছিল, উপর নিচ, উপর নিচ করছিল, কাজটা তখন শেষ , পাম্পটাও কিন্তু আর তার হাতে ছিল না, তার হাতদুটো স্থিরই ছিল কিন্তু কাঁধ ওভাবে নড়ছিল। প্লাঞ্জারটা দিয়ে ইঁদুরটা মারার সময় কাঁধের সেই ভঙ্গিটা ছিল বলে কি তখনও সে ভাবছিল যে সে কাজটা করছে? তার কি মৃগী রোগ হচ্ছিল কিংবা পক্ষাঘাত হচ্ছিল কিংবা একটা অসুখের মতো কিছু।ইঁদুরটাকে নিয়ে নয়, ঠিক এটা নিয়েই দুশ্চিন্তা করছিলাম আমি, জটিল কিছু,খুবই খারাপ কিছু। ভালো সময় যেন শেষ হয়ে গেল। এখন থেকে সব কঠিন হয়ে যাবে। আমি যাই, ড্যারেন? সোনা? ড্যারেন? তুমি কি ভেতরে?

ড্যারেন টয়লেটের দিকে ইশারা করে মাথা নাড়ছিল আর আমাদের উদ্দেশ্য করে বলছিল, দেখো বন্ধুরা, এভাবেই গণহত্যা ঘটে।

চেয়ার

২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে হেটি গ্রান্টের সাথে আমার কথা হয়েছিল। তখন এক মাস হয় আমি গ্রেড স্কুলের প্রথম বর্ষে পড়ি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার পড়াশোনা কেমন চলছে।উত্তরে সে বলেছিল একটা ছাত্র ‘সেলফ এসটিম’ নিয়ে একটা রচনা লিখেছে যেখানে শব্দটার বানান সে লিখেছে ‘সেলফ অব স্টীম’। সেটাই তার বলা গল্পটার মজার বিষয় না, মজার বিষয়টা ছিল, রচনাটা চুরি করা।

আমি ভেবেছিলাম, হেটি মেয়েটাকে আমার বোনরাও খুব পছন্দ করবে।

কোনো মেয়ের ব্যাপারে এধরনের কিছু তার আগে মাত্র তিনবারই ভেবেছিলাম আমি। হেটি আর আমার সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিটা ঘটনা একটা লম্বা একগামী সম্পর্কের ইশারা দিচ্ছিল। যেই এম এফ এ প্রোগ্রামে আমরা অংশগ্রহণ করেছিলাম তা খুবই ছোট পরিসরের ছিল আর তাই তখন আমাদের দুজনের পারষ্পরিক বন্ধুরাই সেই পুরো নর্থ ইস্টের বন্ধু ছিল। তাই আমার আর হেটির হাসি তামাশা সাহসের সীমা পাড় করেনি। বেশির ভাগ সময় আমার মনে হতো আমার সেই বিশেষ কল্পনা শুধুই আমার একার না, দ্বিপাক্ষিক। আমি নিশ্চিত না তখন আমি কোলাহল আর ইশারার পার্থক্য বুঝতাম কি না, বুঝতাম কি না ডাকা আর সাড়া দেওয়ার ভেদাভেদ কিংবা ভদ্রতা মেনে চলা বা আর গ্রহণ করার ভিন্নতা। হয়ত একটা মিষ্টি হাসি বিনিময় বা রাতের বিদায়ী অভিবাদনে একটা লম্বা আলিঙ্গন হতো কিংবা সপ্তাহে কয়েকবার সাঁতার কাটতে গিয়ে আমরা সব বন্ধুরা যেখানে একত্র হতাম সেখানে আমি হয়ত পুরো দলের জন্য মদ কিনতাম আর হেটি তা টেবিলে পরিবেশন করতে আমাকে সাহায্য করত কিংবা যখন আমাদের দুজনেরই এক কামরার( নারী-পুরুষ নির্বিশেষ) বাথরুম ব্যবহার করার প্রয়োজন হত তখন আমার মনে হত হেটিও আমাকে আমার মতো করেই পছন্দ করছে। তবে বাথরুমে এত লম্বা লাইন থাকত যে আসলে তখন আমাদের দুজনের প্রয়োজনটা মেকি ছিল না।

 
 সেই ঋতুটা একটা কোমল স্পর্শের মতো ছিল, পুরো সেমিস্টারটা বা শীতের ছুটিটা ছিল অদ্ভুত জাদুকরী।

*

জানুয়ারির এক রাতে, ক্লাস শুরুর প্রথম সপ্তাহে আমরা কিছু ডিলোডেড(এক ধরনের ড্রাগ) নিয়েছিলাম, তারপর আমি আর হেটি শারীরিক ভাবে মিলিত হয়েছিলাম।

সকালে আমি যখন নাশতা বানাচ্ছিলাম হুট করে একটা ইঁদুর বয়লার থেকে বের হয়ে ফ্রিজ আর দেয়ালের কোনায় চ্যাপটা হয়ে ছিল। এরপর আমি আবিষ্কার করেছিলাম আমি হেটির অপর পাশের চেয়ারে দাঁড়িয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধরে জোরে শ্বাস নিচ্ছি আর অসমান মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা তরল অমলেটের দিকে তাকিয়ে আছি।

 
এরপর আমি ব্যাপারটা সহজ করতে একটা নকল হাসি হেসে দিয়ে চেয়ার থেকে নেমে পড়েছিলাম। হেটি আমাকে সবকিছু পরিষ্কার করতে সাহায্য করে তার বাড়ি ফিরে গিয়েছিল।

*

সেদিন সন্ধ্যায় একটু দেরিতে বারে গিয়েছিলাম আমি। হেটি সেখানে ছিল না। আমার ভয় হচ্ছিল হয়ত হেটি সেদিন আর যাবে না সেখানে। মনে হচ্ছিল,একজন বোধবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এমন নোংরা ঘরে থাকতে পারে এই ব্যাপারটায় হেটি হয়ত হতাশ হয়েছে, সে হয়ত আমাকে বাতিল করে দিয়েছে। আমার সেই ভাবনাটা তখন একরকম অনুশোচনায় পরিণত হয়েছিল।

অসাবধানে দ্রুতই প্রত্যাখ্যাত হলাম আমি এমন লাগছিল আমার। তাছাড়া ড্যারেনের পরামর্শে এই বোধ হতে বের হতে আমি তখন নিম্ন মাত্রার এ বি ভি নিয়েছিলাম। বরাবরের মতো আমাকে বনডেড ওল্ড গ্র্যান্ড ড্যাড এন্ড ওয়াটার যোগে আমোরেটো সাওয়ারও নিতে হয়েছিল কিন্তু আমি তখন এইধরনের পানীয়গুলো নিতেও পারছিলাম না, তখনও হয়ত আমার লিভার ডিলোডেড হটাতে পারছিল না।

শেষমেশ, শেষমেশ যখন সত্যি হেটি এসেছিল আমি খুশিতে নির্বোধ হয়ে গিয়েছিলাম আর আমাদের চারজন বন্ধুর সামনেই তার মুখের ভেতর পর্যন্ত চুমু খেয়েছিলাম।

হেটি জোরে ধাক্কা দিয়ে আমাকে সরিয়ে দিয়েছিল তারপর তার মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ বের করে দ্রুত বাইরে বের হয়ে গিয়েছিল।

*

আমার বন্ধুদের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। দরজা থেকে পুরোটা পথ তারা আমাকে বকাঝকা করতে করতে গিয়েছিল, তোমার হয়েছেটা কি লেভিন? তোমার মাথা ঠিক ছিল? এরকম কিছু কীভাবে করলে?

বাইরে হেটি তার দাঁত মুখ খিচে একটা বরফের স্তূপের উপর কুঁজো হয়ে বসে থুথু ফেলছিল। আমরা পাঁচজন তাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি হেটিকে ডাকছিলাম, সে হাত নেড়ে আমাকে বলেছিল, যাও, এখান থেকে যাও।

আমার বন্ধুরাও সাথে সাথে বলেছিল,

রাস্তা মাপো মিয়া, হেটির কথা শুনতে পাওনি।

যাও, মানে মানে কেটে পড়।

আমি ফিরে যেতে চাইতেই হেটি আমার শার্টের কোনা ধরে বলেছিল, না যেতে বলিনি, কেবল এই অবস্থায় আমার দিকে তাকিয়ে থেকো না।

আমরা কয়েক পা পিছিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। হেটি আরো কিছুটা বমি করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমাকে একটা গাম দাও।

ড্যারেন তাকে একটা গাম স্টিক দিতেই সে আবার বলেছিল, লেভিনকেও দাও।

এরপর ড্যারেন আমাকে ও বাকিদের গাম স্টিক দিয়েছিল।

লবণের ছড়িয়ে রাখা সেই পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে আমরা গাম চিবাচ্ছিলাম।

হেটি এরপর বলেছিল, তোমাদের মধ্যে কি কেউ এডামকে বলেছ, মানে মানে কেটে পড়?

ড্যারন বলেছিল, আমি বলেছি, তাও পিটার রাস্তা মাপো বলার পরই।

পিটার বলেছিল,আমি ভেবেছিলাম এডামকে একটা শিক্ষা দেওয়া উচিত।

ড্যারেন আবার বলেছিল, আরে আমিও তো তাই ভেবেছিলাম। আমি তো ওর মুখে ঘুষি মারার জন্য হাত পাকাচ্ছিলাম।

পিটার আমাকে টিমের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। টিম আমাকে ড্যারেনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

আমি বলেছিলাম, ঠিক আছে এসব ভুলে যাও এবার।

সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল। আমি হেটির সাথে তার বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলাম।

*

হেটির বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে যেতে যেতে আমি যা বুঝেছিলাম তা হচ্ছে,

ছোট জাতের তালগাছের পোকা অনেকটা প্রকাণ্ড তেলাপোকার আকৃতির হয়, এগুলো গরম আবহাওয়ায় রাজত্ব করে আর আমোরেটোর মতো গন্ধ ছড়ায়। তারা বাইরেই থাকতে পছন্দ করে তবু কখনো কখনো ভুল ভালে আমাদের ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। ধরুন আপনি ফ্লোরিডার গুয়েন্সভাইল এলাকার একটা পাঁচ বছরের মেয়ে, আপনি একটি বাস্পায়িত সোঁদা গন্ধের বাথরুমে ঢুকেছেন, হঠাৎ কিছু একটা অনুভব করলেন রানের দিকে আর সাথে সাথে জিনিসটাকে ধরতে চাইলেন আর তখনি আপনার মুঠোর মধ্যে পোকাটা আবিষ্কার করলেন যা একটি সক্ষম পেনসিল দিয়ে নোটবুকে কিছু লেখার মতো আপনার গায়ে আঁচড় কাটছে, আপনি ছুড়ে ফেলতে চাইলেন কিন্তু আবিষ্কার করলেন শক্ত করে বাঁকানো পায়ের মতো শুং দিয়ে পোকাটা আপনার মধ্যম আঙুলের মাংস আর হাড়ের উপর গেড়ে বসেছে। একই সাথে আপনি চাইলেন পা ঝাঁকি দিয়ে নিরাপদ হতে, কিন্তু তা পারলেন না। আপনি বাথটাবে বসে কাঁদলেন, কাঁদতেই থাকলেন। একজন গীতি কবির মতো দুঃখী হয়ে উঠলেন আপনি আর আপনার পেট এর পর থেকে যখনি আমোরেটোর গন্ধ পেল ভেতরের সব কিছু উগরে দিতে শুরু করল।

তাই গাম খাওয়া হোক আর নাই হোক, সে রাতে বিদায় জানাতে চুমু খায়নি হেটি।

এরপর অবশ্য আমরা নয় মাস প্রেম করেছিলাম।

*

ইঁদুরটার সাথে আমার এরপর আর দেখা হয়নি। সেই সপ্তাহটা শেষ হবার আগেই আমি আমার সিকিউরিটি ডিপোজিট যা ছিল (দুমাসের ভাড়ার সমান) তা ভেঙে ,তার সাথে সেবছর আমার ফেলোশিপ থেকে পাওয়া অর্থের আট ভাগের এক ভাগ মিলিয়ে তার চেয়ে ছোট ও তার চেয়েও দামী ফ্লাটে উঠেছিলাম।

ফোন

২০১২ সালের ১৫ই আগস্ট , এক বুধবার শিকাগোর এক জাজের মাধ্যমে আমি আর জসেট বিয়ে করেছিলাম। আমাদের বিয়ের সাক্ষী আমাদের একটা ছবি তুলে দিয়েছিল। আমি সেটা ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম।

ছবিটা পোস্ট করার কয়েক ঘন্টা পর হেটি ফোন করেছিল। আমাদের সম্পর্ক তখন বেশ ভদ্রোচিত অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল, মানে ‘শুভ জন্মদিন’ জাতীয় বার্তা জানানোর পর্যায়ে গিয়েছিল সম্পর্কটা। কিন্তু তখন অনেকদিন হয় আমাদের কথা বার্তা হয়নি তাই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর মতো পরিস্থিতি হিসাবে আমি ভাবিনি। আমি তখন সারাদিন কেবল নিকট আত্মীয় ও বন্ধুদের ফোনে সাড়া দিতাম।

হেটির পাঠানো ভয়েস মেইলে সে বলেছিল সে আর তার স্বামী সবে মাত্র একটা বাড়ি কিনেছে। আর তাই যদি কখনো ভ্যাঙ্কুভার যাই জসেট আর আমি সেখানে থাকতে পারব, যতদিন আমরা থাকতে চাই ততদিন। এই বার্তা দেখে তার একনিষ্ঠতাকে সন্দেহ করে আমি অবশ্য অবাক হইনি।

*

এর পরের গ্রীষ্মে আমরা ব্রুকলিনে ড্যারেন আর সারার ওখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম আর সেখানেই ড্যারেন আর তার স্ত্রী ইঁদুর আর প্লাঞ্জারটার কথা আমাকে বলেছিল, তার আগে হেটির পাঠানো সেই ভয়েস মেইলটার কথা আমার কিন্তু মনেও পড়েনি।

*

শিকাগো ফিরে গিয়ে কয়েকদিন মধ্যেই হেটিকে ফোন করব এমন কিছু ভাবছিলাম তখন আমি। পরদিন সন্ধ্যায় ড্যারেন ওপর তলায় খাতা দেখছিল আর আমাদের স্ত্রীরা রেড হুক পুলে সাঁতার কাটছিল। আমি তখন হেটির ফেসবুক আইডিতে চোখ রেখেছিলাম। তার হোম পেজ সমবেদনা জাতীয় কমেন্টসে পূর্ণ ছিল। সেখানে তার বোনের মৃত্যু সংবাদ ছিল তবে স্পষ্ট ছিল না কীভাবে ঘটেছে ব্যাপারটা।

তার বোনের সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি, মনে হয় না নামটাও আমি জানতাম। কিন্তু আমার মনে পড়েছিল তার বোনের পরিস্থিতি ভালো ছিল না। মানসিক অসুস্থতা কিংবা ক্রেডিট কার্ড কিংবা উগ্র প্রেমিক নিয়ে তার কঠিন সময় কাটছিল।

হেটির সর্বশেষ পোস্টটা ছিল তখন থেকে ছয় মাসের আগের দেওয়া। দুবোনের জড়িয়ে ধরা ছোটবেলার একটা ছবি ছিল, যার উপরে ক্যাপশন হিসাবে লেখা ছিল, বিশ্বাস হচ্ছে না তুমি নেই।

সেই পোস্টের আগের পোস্টটা ছিল একটা ভিডিওর লিংক যেখানে দ্য সোপরানোস টিভি সিরিয়ালে প্রত্যেকবার ‘পিসাডো’ স্ল্যাংটা বলার দৃশ্যগুলো এক করে রাখা।

*

ড্যারেন তার শূন্য কফির কাপটা আবার পূর্ণ করে নিতে যখন নিচে এসেছিল আমি তখন পিসাডো স্ল্যাং পুষ্ট ভিডিওটা দেখা বন্ধ করে উপরের দিকে স্ক্রল করে শোকের পোস্টটা তাকে দেখিয়েছিলাম আর জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে জানে কি না ঘটনাটা।

ড্যারন বলেছিল, সে দেখে নি এবং সে চায়ও না আমি তাকে এসব দেখাই। সকল ধরনের সোশ্যাল সাইট বন্ধ করে দেওয়ার এটাই প্রথম কারণ তার। সরাসরি যার সাথে যোগাযোগ নেই এমন ভুক্তভোগীদের ক্ষতি, দুঃখ ইত্যাদি পোস্টে গিয়ে সে কীভাবে কি বলবে বা আদৌ বলবে কি না, এইসব বিষয় সে ভাবতেই চায় না। সে বুঝে না, মানুষ এরকম খবর সোশ্যাল সাইটে জানায় কি নিজেদের কিছুটা হাল্কা করত না কি অন্যের কাছে আশ্রয় চেয়ে তাদের ফোন করার ঝামেলায় ফেলতে? না কি যারা ফোন করে সান্ত্ববনা দিতে চায় তাদের দ্বারা ভারযুক্ত হতে? সে আরো বলেছিল,যখনকার ঘটনা তখন হলে না হয় ফোন করা যায় তবে যদি অনেক আগের ঘটনা হয়ে থাকে তবে একটা সান্ত্বনা জাতীয় কমেন্টস করা যায়।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা তাহলে তুমি এখন কী করবে?

আমি যেহেতু ফেসবুকে নেই তাই ফোন করা আর না করা সমান। আর তাও ছয় মাস পর তাও আবার হেটিকে? আমরা এত ঘনিষ্ঠ নই, প্রায় পাঁচ বছর কথা হয় না। তাই আমি ফোন করছি না।

তার মানে তুমি ভাব করবে যে জানো না?

আমি কোন বালের ভাব করব না, আমি কেবল ফোন করব না ব্যাস।

ঠিক আছে।

ড্যারন বলেছিল আবার, এটাকে কি তুমি এখন সামাজিক ত্রুটি বলবে?

জানি না। আমার কাছের কেউ কখনো মারা যায় নি।

আমারও না। কিন্তু আমার মনে হয় আমি যদি হেটি হতাম তবে আমার এই প্রিয়জন হারানোর ছয় মাস পরে কারো কাছ থেকে সান্ত্বনা নিতে পছন্দ করতাম না। এমনও তো হতে পারে আমি তখন একটা ভালো মেজাজে থাকতাম কিংবা সেই ঘটনাটা নিয়েই বিষণ্ণতায় ভুগতাম কিংবা ততদিনে আমি এই দুঃখ ভুলে যাওয়াই ঠিক মনে করতাম, সে যে মরে গেছে এই সত্যটা মেনে নিতে শিখে যেতাম? হয়ত মানুষের এই একই রকম সান্ত্বনার একই রকম প্রতি উত্তরের স্ক্রিপটা লক্ষ লক্ষ বার অতিক্রম করে ফেলত। ব্যতিক্রম তো ঘটেই। যদিও সম্ভাবনা খুবই কম তবুও যদি আগামীতে আমার হেটির সাথে কথা হয় তবে যদি আমি ঠিক মনে করি তবে হাল্কা ভাবে কিছু বলতেও পারি। যেমন কথাটা এমন হতে পারে, ও একটা কথা, আমি তোমার বোনের কথা শুনেছি, খুব খারাপ লেগেছে। হ্যাঁ এইভাবেই বলব।

আমি বলেছিলাম, আচ্ছা ঠিক আছে, ধন্যবাদ।

আমি তোমার কথা বলছি না জনাব, তুমি ওর সাথে এক বছর প্রেম করেছ, তার উপর সোশাল সাইটে আছো।

আরে না, নয় মাস প্রেম করেছি, তাও দশ বছর আগে। তাছাড়া ফেসবুকে ঢুকিই না।আজই দেখলাম ওর বোনের খবরটা।

তারপরও।

তাহলে কি আমার ফোন করা উচিত?

ড্যারন বলেছিল, আমি তাও বলছি না। আমি জানি না তোমার কি করা উচিত। কিন্তু আমি কি করছি তার সাথে তোমার এটা জুড়ো না। আমার যদি হেটির সাথে এরকম ঘনিষ্ঠ কোনো সম্পর্ক থেকেও থাকত তবে বরং আমার জন্য এই নির্লিপ্ততা প্রদর্শন আরোও সহজ হত। মানুষের একটা ধারণা হচ্ছে সে যে সব মারাত্মক ভুলগুলো করে তা আসলে না বুঝেই করে , সেগুলো আসলে নিরীহ ভুল বা ভুলো মনা হওয়ার কারণেই করে থাকে। আসলে তুমিও যা কর তা অনুমেয় এবং স্বেচ্ছাকৃত আর এটা তোমার ইতর চেহারার সাথেও যায়।

আচ্ছা, কথাটা ঠিক বললে না।

মিয়াও মিয়াও মিয়াও। ত্রিশের পর সবার চেহারাতেই চরিত্রটা এসে পড়ে।

আরে না… পঞ্চাশের দিকে আসতে পারে আর আমার বয়স সবেমাত্র ছত্রিশ।

আচ্ছা, যাই হোক যেভাবে আমার দিকে এখন তুমি তাকাচ্ছ না!

আমি বিশেষ ভাবে তোমার দিকে তাকাচ্ছি না।

মনে হচ্ছে তুমি চিরতরে আমার মুখ ভোতা করে দিতে চাও।

ইমেইল

তার পাঁচ বছর পর, ২০১৮ সালের দিকে টেক হিসাবে ফ্লোরিডায় চাকরি হয়েছিল জসেটের। আমরা গুয়েন্সভিলে প্রথম বারের মতো একটা বাড়ি কিনেছিলাম।

ডেলিভারি লোকেরা আমাদের জিনিসপত্রগুলো পৌঁছে দেবার পরের দিন শোবার ঘরে আর্টের বাক্সটা খুলছিলাম আর এমন সময় প্রায় আমার বুড়ো আঙ্গুলের সমান একটা তেলাপোকা আমার সামনে এসে পড়েছিল।

বাঙ্কারের বাক্সের ঢাকনা দিয়ে তেলাপোকাটা আমি ঢেকে দিয়েছিলাম।

জসেট রান্নাঘর থেকে ভয় পেয়ে দৌড়ে এসেছিল। আমি তাকে বলেছিলাম আমি কি দেখেছি আর ঢাকনার নিচে কি আছে। জসেট কিছুটা রেগে গিয়েছিল। আমি নাকি বেশ কয়েকবার উফ করে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, সে ভেবেছিল আমি ব্যথা পেয়েছি কিংবা আমার স্ট্রোক হচ্ছে।

আমি জানতামই না যে আমি চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। দুঃখিত, কথাটা বলে তাকে সিগারেট সেধেছিলাম।

সে বলেছিল, সে এক সপ্তাহ ধরে সিগারেট খাচ্ছে না, ছেড়ে দিতে চায়, আমি কি খেয়াল করিনি?

আমি আসলে খেয়াল করিনি। আর যদি খেয়াল করেও থাকি তাহলে আবার ভুলেও গেছি।

আমরা একমত হয়েছিলাম, দুটো বিষয়ই খারাপ। তবে কিছুক্ষণ আমরা তর্ক করেছিলাম কোনটা বেশি খারাপ এ নিয়ে। আমার মনে নেই আমরা কে কোন দিকটার পক্ষে তর্ক করেছিলাম তবে এটা মনে আছে যে আমি হেরে গিয়েছিলাম। আরোও কিছু বলতে যেতেই জসেট কঠিন রূপ ধারণ করে বেশ কয়েকবার ‘উফ’ করে উঠেছিল।

তেলাপোকাটা ততক্ষণে ঢাকনার ভেতর থেকে বের হয়ে গিয়েছিল।

হয়ত সেটা ঢাকনায় থাকা পাঞ্চ আউট হ্যান্ডেল দিয়ে ঢাকনার উপরে উঠে এসেছিল তারপর আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল।

তেলাপোকাটার এগিয়ে আসা এত ধীর ছিল যে তা নিয়ে চিন্তা করার কিছু ছিল না। হয়ত আমাদের ব্যাপারে তার কৌতূহল হচ্ছিল না কিন্তু আমাদের দিক থেকে সম্মতি নাও পেতে পারে এই ভেবে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করছিল। এও হতে পারে তেলাপোকাটা হতবুদ্ধি ও ক্লান্ত এবং নিওরোক্যামিকেল ডাইরেক্টিবের মধ্যে পড়ে এই দ্বিধায় ভুগছিল যে, “বিপদ থেকে পালানো” বনাম “শীত বেশি হলে (বিপদে পড়লে) নড়াচড়া কমিয়ে দেওয়া” এই দুই কৌশলের কোনটা বেছে নেবে।

আমাদের এসিটা করাক শব্দ করে পূর্ণোদ্দমে কাজ শুরু করে দিয়েছিল।

*

সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জসেট বলেছিল, তেলাপোকাটা অনেক বড়।

হ্যাঁ অনেক বড়, আমি উত্তর দিয়েছিলাম।

*

অনেক বড় বলতে আসলে আমরা বুঝিয়েছিলাম যে, তেলাপোকাটা এত বড় যে মারতে গেলে এটাকে ধড়ফড় করার দৃশ্য দেখতে আমাদের কষ্ট হবে কিংবা ধড়ফড় করে মারার কিছু শব্দও শোনা যেতে পারে আর একবারের আঘাতে পোকাটা মরবে না, চেপটা হয়েও বেঁচে থাকবে।

কিন্তু এটা মাকড়সা না, আমরা ব্যাপারটা অবহেলা করতে পারি না।

একেবারেই মাকড়সার মতন না, আমাদের কিছু একটা করতে হবে।

আমাদের তোতাপাখিটা তখন তার খাঁচার উপরে বসে ছিল। আমরা সবসময় বাসায় থাকলে বা জেগে থাকলে ওর খাঁচার আগল খুলে রাখি। তোতাটা হিসহিস ধরনের শব্দ করে আমাদের ফিসফিস করে বলা কথাগুলো নকল করে। শব্দগুলো আমাদের প্রিয় কারণ সেগুলো আসলে সেই শব্দই যা আমরা তার কাছ থেকে বার বার শুনতে চাই। তাই আমরা তখন তার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলেছিলাম, লক্ষ্ণী পাখি।

একটা পরিকল্পনা দ্রুত আমাদের মাথায় এসেছিল।

*

তার আগের দিন সন্ধ্যায় অখ্যাত এক কোম্পানির ব্যাগলেস হ্যান্ড ভ্যাকুয়ামটা কিনে ক্রেতাসূলভ খুঁতখুঁতানি থেকে জিনিসটা শক্তি পরীক্ষা করেছিলাম “ড্রয়ারের আবর্জনা, অফিস”নামক একটা বাক্সের মাঝের কিছু জিনিসপত্রের সাহায্যে।

যন্ত্রটা বেশ কাজের প্রমাণিত হয়েছিল, যন্ত্রের টানটাও ছিল কিছুটা শব্দহীন। পাখির খাঁচার পাশের দেয়ালেই চার্জারটা লাগানো হয়েছিল।

আমাদের পরিকল্পনাটা এমন ছিল যে, জসেট তেলাপোকাটাকে খেয়াল করতে থাকবে আর আমি পা টিপে টিপে ভ্যাকুয়াম যন্ত্রটা নিতে ঘরের কোনায় যাব তারপর তেলাপোকাটা মেরে ফেলে এটাকে উঠোনে ফেলে দিব।

আমার এখনো বিশ্বাস কাজটা একশত ভাগ সফল হত যদি আমি এটাকে মারার আগে জাংকটিনটা একটু পরিষ্কার করে নিতাম। তেলাপোকাটা মারা গিয়েছিল বাতাসের একটা প্রবল সাইক্লোনের মধ্যে, কিছু মুদ্রায় বাড়ি খেয়ে আর পুশপিনের খোচা খেয়ে।

যাই হোক আমরা পোকাটাকে বাইরে ফেলে দিয়েছিলাম।

*

আমি আমোরেটোর গন্ধ পাইনি, জসেটও পায়নি তাই আমি সেই রাতে ভালোভাবে ঘুমাতে পারিনি। আমি ইন্টারনেট জুড়ে তথ্য খুঁজছিলাম এই ভয়ে যে আমরা যে পোকাটা মেরেছিলাম তা তাল গাছের পোকা না, সেটা আসলে এমন ধরনের তেলাপোকা যা বাসাবাড়িতেই থাকে। হতে পারে সেটা আমাদের নতুন বাসার গর্তে লুকিয়ে থাকা একশো কিংবা হাজার তেলাপোকার একটা মাত্র।

আমি জানতাম আমার ভয়টা ছিল অযৌক্তিক, মোটেও বিজ্ঞানসম্মত নয়। তাল গাছের পোকা ছাড়া উত্তর আমেরিকায় কোন ধরনের তেলাপোকা আকারে এত বড় হয় না। কিন্তু উইকিপিডিয়া আমাকে পরষ্পর বিরোধী কিছু তথ্য দিচ্ছিল তার সাথে (অপ) আখ্যায়িত ছবিগুলো অনিচ্ছা সত্তেও বড় করে দেখছিলাম, স্যুডো বিশ্বাসীদের আশ্বস্ত করতে পারে এমন কপি পেস্ট সাইট গুলোতে আমি অনেক সময় ব্যয় করছিলাম আর নিজের অভিজ্ঞতাকে সন্দেহ করছিলাম। হতে পারে যে প্রক্রিয়ায় বার বার আমার মুখ থেকে ‘উফ’ শব্দটা বের হয়ে এসেছিল আর সেই একই প্রক্রিয়া আমার চোখের স্নায়ু স্তিমিত করে দিচ্ছিল আর তাই যা পড়ছিলাম তা নিয়ে বেশি বেশি বাড়িয়ে ভাবছিলাম।

*

সকালে আমি হেটিকে একটা ই-মেইল পাঠিয়েছিলাম। আমি অবশ্য এমনিতেও ভেবেছিলাম হেটিকে কিছু লিখে পাঠাবো, হেটির শৈশবের স্মৃতিঘেরা ছোট শহরটাতে তখন আমরা থাকছি তাই ভেবেছিলাম তাকে কিছু না জানালেই বরং অন্যায় হবে।

চিঠিটা বেশ বড় ছিল, আমি রাজ্যের বিষয় উত্থাপন করেছিলাম। এক দশক পর কোনো এপার্টমেন্টে ঘুমানোর ভুতুড়ে অনুভুতি কেমন তারপর আমি যেসব জায়গা উপভোগ করছি সেসব জায়গাগুলোতে হেটি হয়ত একটা শিশু হিসাবে গিয়ে থাকবে, কখনো কুমির দেখতে কখনো ফুটবল খেলতে কখনো আইসক্রীম খেতে কিংবা একটা বারের কাছাকাছি থাকার কারণে নিজেকে কেমন ভাগ্যবান মনে হয়, যেখানে ধূমপান করা যায়, যেখানে পপকর্ণ বিনামূল্যে পরিবেশন করা হয়, তারপর এটা জেনেও আনন্দ হওয়া বারটাতে হেরি ক্রিও আসা যাওয়া করতেন, যে লেখকের লেখা আমি আর হেটি দুজনই গুরুত্ব দিয়ে পড়তাম। শিকাগোর সবচেয়ে ভালো মানের বারবুন যে বারে পাওয়া যায় যা এক ডলারের জায়গায় পাচ ডলার দিয়ে কিনেও পুষিয়ে যায়। দৃশ্যের এক অবর্ণনীয় শক্তি, বিশেষ করে সন্ধ্যায় যখন মেঘে ফাঁপা আকাশটা আমার নিজের শৈশবের কথা মনে করিয়ে দেয়। ভীষণভাবে, এত পরিষ্কার ভাবে উশকে দেয় স্মৃতিগুলো যে আমি শৈশবকে নানান আঙ্গিকে দেখতে পাই। কেবল আমার দৃষ্টি এদিক ওদিক করলেই আমি সে সময়ের আমাদের বাড়ির সকল কামরা, প্রাকৃতিক দৃশ্য আর তার সাথে জুড়ে থাকা মুখগুলো পরিষ্কার দেখতে পাই।

এসব নিয়ে বলার পর আমি আবার আমাদের ঘরের তেলাপোকাটা নিয়ে আরো তিনশো শব্দ জুড়ে দিয়েছিলাম। আমি খুব চেষ্টা করেছিলাম তেলাপোকার অংশটা হাস্যকর বানানোর জন্য, যাতে আমার শঙ্কার জায়গাটা স্পষ্ট না হয়। আমি লিখেছিলাম তেলাপোকার ঘটনাটা আমার হেটির সাথে কাটানো সেই সকালের ইঁদুরটার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। স্বীকার করেছিলাম, সেই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি, কারো কাছ থেকে সান্ত্বনা আর সমবেদনা চাইছিলাম।

চিঠিটা শেষ হয়েছিল এই ভাবে,

হেটি তুমি খুব ভালো একটা বন্ধু, চিরকালই আমার কাছে এমনটাই থাকবে। ভ্যাংকুভারের কি অবস্থা? কবিতাকি এখনো পড়ো? সবমিলিয়ে তোমার কেমন যাচ্ছে? আচ্ছা আমি আর জসেট আমোরেটোর গন্ধ না পেলেও কি তেলাপোকাটা তাল গাছের পোকা হতে পারে?

তোমার এডাম।

রাত ১১:৩৭ এ হেটি আমাকে একটা ফিরতি ইমেইল পাঠিয়েছিল,

হ্যাঁ।তাল গাছের পোকার গন্ধ আমোরেটোর মতো।

এরপর, অনেক কিছুই তো ঘটে গেছে। যেমন আমার বোন মরে গেছে, আর তুমি কোনো খবর নাও নি।

*

হেটি আমার প্রতি অভিযোগ পুষে রেখেছে জেনে আমি খুব অবাকই হয়েছিলাম। আমি কল্পনাও করিনি সমবেদনা জানাতে আমার ব্যর্থতা তাকে এতটা কষ্ট দেবে। আসলে আমি ভাবতেই পারিনি এতে তার বিন্দু মাত্র কষ্ট হতে পারে। আমি বলব না আমি তখন ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলাম বা এও বলব না যে ব্যাপারটা আমি এখন বুঝতে পেরেছি। আসলে কেন সেই ঘটনায় হেটির কষ্ট পেতে হবে?

তার মানে এই না যে সে আমার ক্ষমা প্রার্থনা প্রাপ্য না বা আমি তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব না। তার কাছে ক্ষমা চাওয়াই যেত আর আমিও লজ্জিতই বোধ করছিলাম।

আমি যাই করি আর না করি আর তাতে হেটি কষ্ট পেলে আমার যে কিছু যায় আসে না তা আমি জানতাম, এখনো জানি।

কিন্তু একটা সমস্যা ছিল। আমি ভাবছিলাম, হেটি যেহেতু ইমেইলে তার কষ্টের কথা উল্লেখ করেনি তাই ক্ষমা চাওয়ার সময় তার কষ্টের কথা উল্লেখ করে তা বাড়িয়ে দেওয়া স্বার্থপরের মতো কাজ হতে পারে আবার তাকে কষ্ট দিয়েছি এই কথাটা বললে আত্মসমর্থন ও আত্মঅভিমান দুটোই প্রকাশ করা হবে। এমনকি সে কষ্ট পেয়েছে এটা জেনে আমি কষ্ট পাচ্ছি কিংবা তাকে কষ্ট দিয়েছি এই নিছক ভয়টা প্রকাশ করাই নিজের ব্যাপারে কৈফিয়ত দেওয়ার মতো একটা পাপ হিসাবে বিবেচিত হবে আর নিজেকে একজন বিনয়ী মানুষ হিসাবেই একরকম তার কাছে তুলে ধরা হবে। ক্ষমা প্রার্থনার ক্ষেত্রে মানুষ এটাই কি চায় না? একজন ক্ষমাপ্রার্থী থেকে একজন বিনয়ী মানুষ হয়ে ওঠা?

না কি, ব্যাপারটা এমন না।

আমি, আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি এবং আমি তাতে সন্তুষ্ট হয়েছি এমন ঘটনা মনে করার চেষ্টা করছিলাম তবে খুব একটা পারিনি এমন কিছু মনে করতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমা আমি আশাও করিনি, গ্রহণও করিনি।

এই বিষয়ে একজনের কথা কেবল আমি মনে করতে পেরেছিলাম।

*

আমার ওয়ার্কশপে একজন বড় মাপের মাথামোটা ছিল, আমি কাজ শেখাতাম ছেলেটাকে। একেবারে বাজে ধরনের ফালতু একটা মানুষ যাকে বলে আর কি, সে ছিল তেমন।

আর একজন শিক্ষার্থী, মূল চরিত্র বুলেমিয় নামক মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত এমন একটা গল্প লিখেছিল। গল্পটা উর্বর ছিল না এটা ঠিক। ভুলোমনা মায়ের সাথে নাটুকে স্বীকারোক্তি, সন্তের মতো ডাক্তার, স্বার্থপর বাবা আর শৈশবের নিপীড়ন এই নিয়েই ছিল গল্পটা। লেখার ধরণটাতে লেখকের একজন সহকারী লেখক হয়ে একত্রে কাজ করার ব্যাপারটা ভেসে উঠেছিল এবং তা সবাইকে বিরক্ত করেছিল, অবশ্যই করেছিল।

তবে গল্পটা কিন্তু আত্মজীবনী ধাঁচের। মূল চরিত্রের নাম আর লেখকের নাম একই সুরে গাথা, একই রকম ট্যাটূ দুজনের শরীরেই ছিল ( যদিও বিপরীত দিকের অঙ্গে), দুজনেরই ডেন জনসনের ( দা রক) উপর হাস্যকর আসক্তি ছিল, দুজনই উইনকনসিন নামক একটা ছোট শহর থেকে এসেছিল।

আমি একটি শিষ্টাচার সমৃদ্ধ ওয়ার্কশপ চালাতাম। যখন ক্লাসের অন্য ছেলে মেয়েরা কাজটা নিয়ে আলাপ করত, তখন গল্পের লেখকরা চুপ করে থাকত। তারপর যখন সবার আলোচনা শেষ হত তখন লেখক নিজের মতামত দিতে পারত বা কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারত।

বেশির ভাগ ছেলে মেয়েই ধন্যবাদ শব্দটা ছাড়া আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করত না।

এই গল্পের লেখক মেয়েটি কথা বলে উঠেছিল, আমার মনে হচ্ছে আপনারা সবাই ভাবছেন মূল চরিত্রটা পছন্দ করার মতো মানুষ না বা সহানুভূতিশীল না।

তখন হঠাৎ সেই গর্দভটা যে কি না আলোচনার সময় কেবল অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে মাথা নাড়ছিল, সে বলে উঠেছিল, ঠিকই বলেছ, সত্যি বলতে চরিত্রটা সম্পর্কে আমার ভাবনা অনুযায়ী আমার তাকে বলতে ইচ্ছে করেছে, মুটকি তুমি মরো।

আর তাই আমি গর্দভটাকে ওয়ার্কশপ থেকে বের করে দিয়েছিলাম।

*

কিন্তু চাইলেই এভাবে কাউকে বের করে দেওয়া যায় না। আমি যেখানে কাজ শেখাতাম সেখানে তো নয়ই, এমন নিয়ম সেখানে ছিল না। শিক্ষার্থীরা মোটা অঙ্কের বেতন দিত। এটা মাথামোটাটা জানত আবার মনে হয় জানতো না।যখন সে আমাকে ইমেইলে বলেছিল, আমি তাকে ওভাবে বের করে দিতে পারি না তাও নিজস্ব মতামত প্রকাশ করার জন্য, আমি তখন তাকে প্রত্যুত্তরে বলেছিলাম, সে ভুল বলছে। আমি তাকে আলবত বের করে দিতে পারি, এমনকি সে যে ক্লাসে ঠিকমত আসেনি সেটার জন্য তাকে ফেল পর্যন্ত করিয়ে দিতে পারি আর তাই সব বিবেচনায় নিয়েই আমি তাকে বের করে দিয়েছি। এখন সে যদি ক্লাসে ফিরে আসতে চায় তবে তাকে গভীর আবেগ দিয়ে চুড়ান্ত রকম ক্ষমা চেয়ে তিনটি আলাদা আলাদা চিঠি লিখতে হবে। একটি সে পাঠাবে সেই গল্পের লেখকের কাছে, একটি পুরো ক্লাসের ছাত্রদের কাছে আর একটি আমার কাছে।

সে তাই করেছিল আর একদিকে আমার জন্য অবশ্য ভালোই হয়েছিল।

এজন্য ভালো হয়নি যে আমি একটা বাইশ বছরের মাথামোটাকে বিনয়ী ও আরোও ভালো পুরুষ হিসাবে পরিণত হতে সাহায্য করেছি, এরকম কিছুই হয়নি। যদিও আমার ক্লাসে সে বেশ চুপচাপ থাকতে শুরু করেছিল- যেহেতু আমি জানতাম অন্য সবার মতো সেও আশেপাশে থাকা অন্যদের সাথে নিজের ক্ষমতা তুলনা না করে থাকতে পারছে না আর তাই সে যে নিজেকে অক্ষম হিসাবে দেখতে পাচ্ছিল তা দেখে আমার আনন্দ হচ্ছিল। আনন্দ হচ্ছিল এটা দেখতে যে সে নিজের সম্পর্কে মিথ্যা বলছিল, যেরকম বিশ্বাস সে ধারণ করছিল না তাতে একমত হতে হচ্ছিল, যে অনুভূতি তার ভেতর কাজ করছিল না তাই প্রকাশ করছিল।

হতে পারে আমি এ পর্যন্ত আপনার দেখা সবচেয়ে ভালো মানুষটি নই।

হতে পারে আমার চেহারায় ভেসে ওঠা চরিত্রের চেয়ে সত্যি অর্থে আমি আরোও খারাপ।

*

কিন্তু আমি আমার বন্ধুদের ভালোবাসি। হেটিকে কষ্ট দিয়ে আমার খুব খারাপ লাগছিল। হতে পারে এজন্যই বেশি খারাপ লাগছিল যে হেটিকে কষ্টটা আমি ইচ্ছে করে দেইনি আর তাই বেশ কয়েক ঘন্টা সময় ব্যয় করে হেটির কাছে ক্ষমা চেয়ে আমি একটা চিঠি লিখেছিলাম। তবে আমি আমার অবহেলায় আমার একজন বন্ধুকে কষ্ট দিয়েছি এটা বুঝতে পেরে যত অনুতপ্তই বোধ করি না কেন তা অবশ্যই যথেষ্ট ছিল না কারণ হেটি আমার এই চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে কখনো জবাব দেয়নি, একটা অপমানজনক নীরবতা বহাল রেখেছিল। এটাই হয়ত আমার প্রাপ্য ছিল, আর মনে হয় বরাবর এটাই পেয়ে যেতে হবে আমাকে।

মাস্ক

কেনোশায় শুটিংয়ের একদিন দুদিন পর, আবিষ্কার করলাম যে পাবলিক্স শপিং মল প্রশিওটো দে পারমা বায়ু নিরোধক প্যাকেটে বিক্রি করছে। দামটা বেশ অপমানজনক রকম চড়া ছিল। শিকাগোতে একই পরিমান রানের মাংসের স্লাইস আমি যে দাম দিয়ে কিনতাম তার প্রায় দ্বিগুন। মনে হল, এই দামে কিনলে ফ্লোরিডায় এসে হেরে গেছি এমন অনুভূতি মনে জাগতে পারে।

তারপর ইলেকশনের দুই তিন সপ্তাহ আগের এক রবিবার, আরোও কয়েকজনের সাথে জসেটের এক সহকর্মী তার স্ত্রীকে নিয়ে আমাদের উঠানে পান করতে আসার কথা ছিল। ছয়টা বাজে আসবে এমন একটা বার্তা উক্ত সহকর্মী তাদের পক্ষ থেকে পাঠানোর আগে আমাদের মনেই ছিল না ব্যপারটা। স্বাভাবিকভাবেই ছয়টায় আসা মানে রাতের খাবারের আগের হাল্কা নাশতা আর পানীয়ের একটা ব্যবস্থা রাখা। কেবল আমি ছাড়া পুরো দলটার সবাই ছিল ফ্রেঞ্চ। তাই আমরা এমন কিছু হাল্কা খাবার পরিবেশন করতে চাইলাম যাতে অতিথিরা নিশ্চিত হতে পারে আমরা নিজেরা সেগুলো বানাইনি।

এক্ষেত্রে মুখ না ঝুলিয়ে প্রশিওটো কেনার একটা সুযোগ আমরা পেলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, প্রতি জোড়া দম্পতিদের জন্য টেবিলের কোনায় কোনায় আলাদা আলাদা প্যাকেট রাখা থাকবে। সেখানে দেওয়া হবে না কাঁটা ফুটি, এক বাক্স গ্রানা পাডোনা আর আমাদের পছন্দের মুচমুচে নোনতা বিস্কিটের প্যাকেট।

এমনিতেও আমাদের পাবলিক্সে যেতে হত, এক সপ্তাহ হয় তখন আমরা বাজার সদাই করিনি।

বাজারের তালিকা বড় হলে আমি বরাবর প্রডিউসের চলে যাই এজন্য না যে জিনিস পত্র বেছে নেওয়ার আমার আলাদা মেধা আছে, কেবল এজন্য যে জসেটের খুঁজে নিতে নিতে আমি ট্রলিতে দ্বিগুণ জিনিস উঠিয়ে নিতে পারি। অন্ততপক্ষে ডিম কোথায় আছে কিংবা ডিটৌ কোম্পানির বাটার কোন তাকে আছে এ বিষয়ে আমার আন্দাজ বরাবর সঠিক হয় ।

তাই আমাকে প্রথমে প্রডিউসে যেতে হল। ঘামের গন্ধ ওয়ালা শরীরে টাংক টপ চাপিয়ে, ঘামাচি ভাসিয়ে, বোকাসোকা চেহারার একটা পরিবার ফুটির চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা সরে যেতেই আমি সব কিছু খুঁজে পেয়েছিলাম, পেঁয়াজ, আলু, টমেটো আর আপেল।

প্রায় এক ডজন ফুটি থেকে আমাকে বেছে নিতে হত, আমি জানি এভাবে খোলামেলায় কেটে রাখা ফুটিতে একটা পচা পচা গন্ধ হয় আর বেশি পাকা ফুটিতে এই গন্ধটা আরো বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু ভাবলাম মাস্ক পরা অবস্থায় বেশি পাকা ফুটির গন্ধ হাল্কা পাকা ফুটির মতো পাওয়া যাবে এবং হাল্কা পাকা ফুটির গায়ের কোনো গন্ধই আমি পাব না।

শুধুমাত্র কাঁচা ফুটিতে কোনো গন্ধ না পাওয়ার কথা।

ফুটির সামনে আমি হতবুদ্ধি, ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। একগুঁয়ে ও নির্ভুলভাবে নিজেকে প্রবোধ দিলাম একটা সুস্থ ও ভিন্ন উপায়ে বেছে নেওয়ার জন্য কেবল একটাই উপায় আছে আর তা হচ্ছে একটা সরল অন্তর্দৃষ্টি।

আমার বুদ্ধিমত্তার কার্যকারিতা আর মাস্ক পরিধান করার সময়, এ দুয়ের পারষ্পরিক সম্পর্ক তখন ঋণাত্মক।

নয় মিনিট ধরে মাস্ক পরে আমি তখন প্রায় পরম পুলকের অবস্থায় চলে গিয়েছি, মাস্কটা একটু নামিয়ে নাকের কাছে এনে শুঁকে দেখার তেজ আমার দেখাতে ইচ্ছা করেনি। তাছাড়া চালাকি করে মাস্কটা নামাচ্ছি দৃশ্যটা একটু বেশি বেশি হয়ে যাবে, বহুদিন এমন চালাকি আমি করিনি।

ফুটি না নিয়েই আমি চলে এলাম।

*

জসেট এসে দেখল আমি মজোরেলা খুঁজছি। সে বলল, তুমি কি আবার টক দই খাওয়া শুরু করবে না কি?

তারা মজোরেলাটা সরিয়ে ফেলেছে।

জসেট আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আর আমি বেশ কয়েকটা পনির ট্রলিতে তুলে নিলাম। জসেট ট্রলির দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আমি বললাম,

হ্যাঁ! কোনো ফুটি নেইনি। আমি পারব না, সম্ভব না।

কিন্তু আমি তো বেশ কিছু ফুটি দেখলাম।

হ্যাঁ আমি জানি। কিন্তু দুঃখিত আমি নিতে পারিনি।

স্যাঙ্ক কেক এন্ড কেপের সারির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে একটা লোক গান গেয়ে উঠল। একেবারে গলা ছেড়ে যাকে বলে। ওটিস রেড্ডিংয়ের সবচেয়ে বাজে গানটার কথাটা তবে একটু বদলে নিয়ে সে গাইছিল, হি ইজ সরি ফর দা ক্যান্টালোপ, বে!

অন্য সময় হলে এ ধরনের ঘটনা আমার ভালো লাগতো, হয়ত জসেটেরও ভালো লাগতো তবে সেই বুদ্ধিজীবীর মুখের মাস্ক কবজিতে লাগানো ছিল।

জসেট বলল, বোকচদ লোক একটা, লোকটাকে অসহ্য লাগছে আমার।

আমিও বললাম, ফাক ইউ।

ছেলেটা আরো জোরে গেয়ে উঠল, হি উড লাইক টু ডু মি ইন দা ডক অব মাই বে। একই সাথে ফুটির চারপাশে ঘিরে থাকা সেই পরিবারের, ব্রণ ওয়ালা চেহারার একটা জন্মগত ছ্যাঁচড়া কিসিমের মেয়ে আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তার হাতের কার্টটা ছিল স্লিম জিমস আর ফ্লামিন হট চিপসে ভরা আর মুখের মাস্কের আগাটা নাকের নিচে মোড়ানো। মেয়েটা গায়কের কাছাকাছি একটু থেমে জানালো তার ধারণা লোকটার কণ্ঠ চমৎকার।

জসেট বলল, দেখলে, আমরা হেরে গেলাম।

তারা যদি দ্রুতই মরে যায় তাহলে আমরা হারব না, আমাদের পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল। ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম একজন বৃদ্ধা আমাদের পেছনে ক্রীমের ঝুড়ির দিকে হাত বাড়াচ্ছে।

বৃদ্ধা মহিলার কথাটা শুনে আমার বেশ আনন্দ হল।

*

প্রশিওটোটা বেশ পছন্দ করল সবাই। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আরও কিছুক্ষণ পান করব আর পিজ্জা অর্ডার করব।

অর্ডার করতেই মেনো আমাদের ওয়াশরুমটা ব্যবহার করতে ভেতরে গেল। বাইরে ফিরে এসে সে আমাকে বলল আমাদের তোতাটা আমার নাম ধরে ডাকছে।

লেভিন বলে? জসেট জিজ্ঞেস করল।

মেনো হেসে বলল, না, এডাম বলে।

লিউক বলল, আমি ভেতরে যেতেও তোতাটা এই নাম ধরে ডাকছিল।

টেবিলের নিচে জসেট আমার পায়ে একটা লাথি দিল। তার হয়ত মনে হয়েছে আমাকে ভেতরে গিয়ে তোতাটাকে বশ মানানো উচিত। যেহেতু আমি তখন আতিথেয়তা করছি তাই বেশ ভালো মেজাজে আছি আর এমন ভাব করছি লাথির বিষয়টা আমি খেয়াল করি নি। জসেট দ্বিতীয় বার লাথি দিতেই আমি আমার পা ভাঁজ করে নিলাম।

*

আমি আমার তোতাকে কথা বলা শেখাইনি। সে নিজেই শিখে নিয়েছে তাও খুব কদাচিৎ। বেশির ভাগ সময় সে শীষ দেয়, হুইসেল বাজায় আর চিৎকার করে।

সে যদি বলে হ্যালো বা লেভিন বা এই জাতীয় অন্যান্য শব্দ বা যেগুলো সে জানে সেগুলো উচ্চারণ করার অর্থ হচ্ছে, আমি তোমাদের সাথে আছি, বা বল যে তুমি আমার সাথে আছো বা আমরা দুজনই দুজনার সাথে আছি। এভাবেই সে শব্দ বলে যাচ্ছে আর চিৎকার করছে প্রায় পনেরো বছর ধরে।

যাই হোক এডাম শব্দটা সে জসেট আমার সাথে থাকার সময় থেকেই শিখে নিয়েছে। আমার নামটা এভাবে বলার মানে সে তার মাথার খুলির মাঝখানটায় আঁচড় কাটতে চায়, সেখানে তার থাবা বা ঠোঁট পৌছায় না ।

এর মানে বরং সে চায় আমি যাতে তার খুলিতে এরকম কিছু করি কিন্তু অন্য কেউ চেষ্টা করলে সে তাকে কামড়ে দেবে।

*

ডেলিভারি এপ্লিকেশনে আমি ড্রাইভারকে পিজ্জা পৌঁছে দেবার নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলাম, পঞ্চাশ মিনিট পর আমি একটা মেসেজ পেলাম।

আমরা সফল ভাবেই কাজটা করতে পেরেছি, আপনার বাসার দরজার সামনে ডেলিভারিটা রাখা আছে।

তাই আমি দৌড়ে সেটা আনতে গেলাম যাতে আমার যাবার আগেই কোন তেলাপোকা বা টিকটিকি বাক্সটাতে ছিদ্র না করতে পারে।

*

আমাদের তোতাটা তার খাঁচার উপরের দিকে লাগানো দড়ির উপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আমার নাম দূরের কথা কিছুই বলছে না। এমনকি সে তার বা দিকের পাখার সাহায্যে নিজেকে আমার কাছ থেকে আড়াল করছে, সেখানে সে তার মুখ গুজে রেখেছে এবং হাবভাবে বরাবরের চেয়ে একটু বেশি প্রতাপ দেখাচ্ছে কিন্তু আদৌ ব্যাপারটা ভালো কিছু না। আমি যেহেতু একটা গবেট, ঠান্ডা মাথার আশাবাদী বা ইচ্ছাকৃত অন্ধ তাই সে আসলে কি করছে আমি বুঝে উঠতে পারছি না।

পিজ্জাটা নিয়ে তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি বললাম, কি অবস্থা? কিন্তু প্রথমবারের মতো সে কোনো সাড়া দিল না, যা আমাকে ভয় পাইয়ে দিল।

কি হলো?

আবারোও কোনো উত্তর পেলাম না।

তারপর বেশ কয়েকবার, আপনি যতবার ভাবছেন তার চেয়ে কম কিংবা নিশ্চিত ভাবে বেশি বার যাই হোক আমি তার নাম ধরে চেঁচালাম। সেই পর্যন্ত ডাকলাম যে পর্যন্ত না সে যা করছে তা থামিয়ে দেয়। সে তার বাম ডানার নীল পালকটা ঠোঁট দিয়ে টেনে দীর্ঘ করল।

ঠিক তাই, আমি তার নাম ধরে চেঁচালাম যে পর্যন্ত সে তার বামডানার নীল পালকটা ঠোঁট দিয়ে টেনে দীর্ঘ করতে থাকল।

আর এরপরই সে আমার দিকে মুখ ঘুরাল, এক পায়ে দাঁড়িয়ে, উঁচু করা পা টা দিয়ে ঠোঁট থেকে পালকটা সরিয়ে, কিছুটা সামনে হেলে, মাথাটা ঝুঁকিয়ে, তার পালকের শেষ মাথা দিয়ে খুলিতে আঁচড় কাটতে কাটতে বলল, এডাম লেভিন।

 

 

লেখক পরিচিতি: আমেরিকার সমসাময়িক ও তরুণ উপন্যাসিকদের মধ্যে একটি জনপ্রিয় নাম এডাম লেভিন। তার প্রথম উপন্যাস ইন্সট্রাকশন (২০১০) বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং তা ফ্রেঞ্চ,ডাচ ও জার্মান ভাষায় অনুদিত হয়। দ্বিতীয় উপন্যাস বাবলগাম (২০২০) এবং ২০২২ সালে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে মাউন্ট শিকাগো নামে তৃতীয় উপন্যাস। হট পিংক (২০১২) এডাম লেভিনের একটি গল্প সংকলন গ্রন্থ যা তার উপন্যাসের মতোই পাঠক মহলে সাড়া ফেলেছে। তার লেখা নিউ ইউর্কার, প্লে বয় ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এডাম লেভিন নিউ ইউর্কার পাবলিক লাইব্রেরী ইয়ং লায়নস ফিকশন এওয়ার্ড (২০১১)সহ আরোও কিছু এওয়ার্ড পেয়েছেন বা তালিকাভূক্ত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি শিকাগোতে থাকেন এবং সেখানে দা স্কুল অব দা আর্ট ইন্সটিউটে ক্রিয়েটিভ রাইটিং এন্ড লিটেরেচার শেখান।

অনুবাদক পরিচিতি:

রাবেয়া রব্বানী
গল্পকার। অনুবাদক
ঢাকায় থাকেন।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *