মো ইয়ান’এর গল্প: উড়াল

মূল (চৈনিক) মো ইয়ান
ইংরেজি (soaring) হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাট
বাংলা অনুবাদ রঞ্জনা ব্যানার্জী
স্বর্গ এবং মর্ত্যকে যথাযথ সম্মান জানানোর পরে হং শি নামের বিশালকায় মানুষটি কিছুতেই তার উত্তেজনা চেপে রাখতে পারছিল না। ওর নতুন বৌয়ের মুখ ওড়নার আড়ালে লুকোনো তা সত্ত্বেও তার পল্লবিত বাহুযুগল এবং ক্ষীণ কটিদেশের আভাস বেশ বুঝিয়ে দিচ্ছে এই উত্তর জিয়াঝু শহরের অধিকাংশ তরুণীর চেয়ে সে অধিকতর সুন্দরী। অন্যদিকে চল্লিশ ছোঁয়া এবং মুখে বিচ্ছিরী রকমের বসন্তের দাগযুক্ত হং শি উত্তরপূর্ব গাওমি শহরের অবিবাহিত পুরুষদের মধ্যে অন্যতম। হং শি’র বৃদ্ধা মা সম্প্রতি ইয়ানইয়ানের সঙ্গে তার এই বিয়ের সম্বন্ধটির আয়োজন করেছেন অবশ্য বিনিময়ে হং শি’র বোন উত্তরপূর্ব গাওমি শহরের প্রকৃত সুন্দরী বলতে যা বোঝায় তাদের মধ্যে অন্যতমা, ইয়াংহুয়াকে ইয়ানইয়ানেরই বাকপ্রতিবন্ধী ভাইয়ের গলায় মালা দিতে হয়েছে। বোনের এই আহুতি হং শির মনে গভীর ছাপ ফেলেছে, বোনটিকে মূক স্বামীর সন্তান ধারণ করতে হবে এই ভাবনা ওর মনে আসতেই সব বিহ্বলতা ছাপিয়ে নবপরিণীতার প্রতি এক ধরনের ক্রূর বিদ্বেষ পাক খেয়ে উঠল ওর মনে : গুঙ্গা, তুই আমার ছোটবোনের সঙ্গে কোনো রকমের ঝামেলা করলে তোর বোনেরও খবর করে দেবো আমি মনে রাখিস।
হং শির নতুন বৌকে যখন বাসর ঘরে ঢোকানো হলো তখন বেলা দ্বিপ্রহর। ইটের বিছানার কিনারে বসা কনে-বৌকে আশ মিটিয়ে দেখবার জন্য এক ঝাঁক ফাজিল ছেলেপুলে গোলাপি কাগজ সাঁটা জানালাটায় আগেভাগেই ফুটো করে রেখেছে। পড়শি মহিলাটি হং শির কাঁধে মৃদু চাপড় দিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘দাগু মিয়া, তোমার তো চাঁদ কপাল! একটা কোমল কমল পেয়েছ, ধীরেসুস্থে এগিও। “
অস্থিরতা কাটাতে ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে হং শি অবিরাম ওর ট্রাউজার খুঁটছিল। ওর মুখের দাগগুলি কেমন যেন লালচে আভা ছড়াচ্ছিল ।
সেই কবে থেকে সূর্যটা একভাবে আকাশে বিকারহীন ঝুলছে নড়ার নামগন্ধ নেই, আঁধার নামার প্রতিক্ষায় উঠোনের এমাথা ওমাথা অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল হং শি । ওর মা লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে কাছে এসে বললেন, “ শি নতুন বৌয়ের মধ্যে কিছু একটা ব্যাপার আছে, আমার কেমন যেন ভালো ঠেকছে না। খেয়াল রেখো যেন পালিয়ে না যায়।“
“দুশ্চিন্তা করো না মা। ইয়াংহুয়া আছে ওদিকে, ইনি কোথাও চাইলেও যেতে পারবেন না। ওরা একই সুতোয় গাঁথা পতঙ্গ এখন। একজন উড়তে চাইলেই আরেকজন টান খাবে। “
মা-ছেলের এই বাতচিতের মাঝেই নতুন বৌ নিত-কনে দু’জনকে সঙ্গী করে হঠাৎ উঠোনে নেমে এলো। হং শির মা উষ্মা জানালেন, “কে কবে শুনেছে যে নতুন বৌ আঁধার নামার আগে চাপ কমাতে ঘর ছেড়ে ছাদের বাইরে আসে? বোঝা যাচ্ছে এ বিয়ে টেকার নয়। এই মেয়ের মাথায় নির্ঘাত কিছু একটা ঘুরছে। “
হং শি নতুন বৌয়ের রূপে তখন পুরোপুরিই মজে গেছে, মায়ের আশঙ্কার এক বর্ণও ওর কানে গেলো না। কনে বৌয়ের মুখের লম্বাটে গড়ন , চিকণ ভ্রু-যুগল, খাড়া নাক, এবং ফিনিক্স পাখির মতো তীর্যক চক্ষু-জোড়া ওকে মুগ্ধতায় বিবশ করে ফেলেছিল। কিন্তু হং শির মুখের দিকে কনে-বৌয়ের নজর পড়তেই সে ঝট করে থেমে গেল। দীর্ঘ সময় একভাবে শব্দহীন স্থির দাঁড়িয়ে রইল একই জায়গায়, তারপরেই হঠাৎ তীক্ষ্ণ চিৎকার দিয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগল। হতবিহ্বল নিতকনে দুজন ওর বাহু টেনেও থামাতে পারল না বরং ওদের টানাটানিতে ওর পরনের লাল পোশাকটি ছিঁড়ে তুষারধবল বাহু যুগল, মরাল গ্রীবা , এবং ওর লাল অন্তর্বাসের সামনের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেল।
ঘটনার আকস্মিকতায় হং শিও স্থানু বনে গিয়েছিল। হাতের লাঠি দিয়ে ওর মাথায় টোকা দিতে দিতে ওর মা চেঁচাতে লাগলেন, “হাঁদারাম ছুটে যা ওর পেছনে!”
হংশির চটকা ভাঙল এতে এবং ভারী শরীরের টাল সামলাতে সামলাতে সে ছুটল বৌয়ের পেছনে।
ইয়ানইয়ান ততক্ষণে উড়ে নেমে গেছে রাস্তায়, ওর অবিন্যস্ত চুলের ঢাল পাখির লেজের মতো লুটিয়ে চলছে পিছুপিছু।
‘ওকে থামাও!” হং শি প্রাণপণে চেঁচাচ্ছিল, “ওকে থামাও!”
ওর চিৎকারে গ্রামবাসীরা ঘর ছেড়ে দল বেঁধে রাস্তায় নেমে এলো এবং ডজন খানেক কিংবা তার চেয়েও বেশি নেড়ি-কুকুর তারস্বরে খেঁকিয়ে উঠল আশেপাশে।
ইয়ানইয়ান একটা গলিতে বাঁক নিয়ে দক্ষিণের গমখেত লক্ষ্য করে ছুটতে থাকল। সেই গমখেতে গমের ছড়াগুলো হাওয়ায় নুইয়ে ছিল এবং ওদের আগায় থাকা ফুলেরা এমনভাবে মাথা ডুবিয়ে দুলছিল- মনে হচ্ছিল যেন সবুজ সমুদ্রে জলতরঙ্গের ঢেউ বইছে।
ইয়ানইয়ান কোমর সমান সেই গমের সমুদ্রের ভেতর আছাড়িপাছাড়ি ছুটতে লাগল, সবুজের বিপরীতে ওর লাল জামা এবং দুধসাদা বাহুযুগল এক অপূর্ব দৃশ্যকল্প তৈরি করেছিল, মনে হচ্ছিল ও যেন কোনো চলমান চিত্রকলা। বিয়ের আসর থেকে কনে পালানোর ঘটনা উত্তরপূর্ব গাওমি শহরের সকলের জন্য চরম অপমানের। গ্রামের পুরুষেরা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে সকল কোণ থেকে ওকে ধরার জন্যে বেরিয়ে পড়েছিল। এমনকী কুকুরের দলও সেই সবুজের ঢেউয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ওকে তাড়া করছিল। চারপাশ থেকে আসা এই মানব-জাল যখন ওকে প্রায় ঘিরে ফেলেছে ঠিক তখনই ইয়ানইয়ান অধোমুখে খেতের গভীরে সজোরে ঝাঁপ দিলো। এতক্ষণে হং শি যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অনুসরণকারীদের ছোটার গতিতেও টান পড়েছিল, ওরা বেদম হাঁপাচ্ছিল। এরপর যেভাবে মৎস্যশিকারীরা জাল আঁটে ঠিক সেইভাবে পরস্পরের হাত ধরে ওরা সন্তর্পণে সামনের দিকে এগোতে লাগল। এদিকে রাগ পাক খেয়ে যেন হং শির বুকে চেপে বসেছে, চারপাশ ভুলে ও মনে মনে ছক কাটছিল এই বৌকে বাগে পেলে কেমন পিটুনিটা দেবে সে!
হঠাৎ একটা লাল আলোর রশ্মি গমখেতের ঠিক উপরে জেগে উঠল, নিচে দাঁড়ানো জনতা ঘটনার আকস্মিকতায় টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। সকলে অবাক বিস্ময়ে দেখল দুই হাত নেড়ে, দুই পা জোড় করে এক ঝলমলে প্রজাপতির মতো ইয়ানইয়ান নিচের ঘেরাটোপ ছেড়ে অনুপম ভঙ্গিতে উঁচুতে উঠে যাচ্ছে।
সব ভুলে মাটির মুর্তির মতো হাঁ করে দেখছিল ওরা এই দৃশ্য আর ওদের মাথার উপরে বাহু ঝাপটে ভাসছিল সে। খানিক পরেই ইয়ানইয়ান উড়তে শুরু করল, যথেষ্ট ধীরগতিতে ঠিক যতটা হলে ওরা ওর ছায়ার পিছু নিতে পারে। ওদের মাথা থেকে তখন সে কেবল সাত কি আট মিটার উঁচুতে, আহা সে কী অনুপম ভঙ্গিমা! যত ধরনের অদ্ভুত ঘটনার কথা ভাবা যায় তার প্রায় সব কটিই এই গাওমি শহরে ঘটেছে কিন্তু কোনো নারী আকাশে উড়ছে – এমনতর ঘটনা এবারই প্রথম।
কিংকর্তব্যবিমুঢ অবস্থা কেটে যেতেই জনতা ফের ধাওয়া শুরু করেছিল। কেউ কেউ নিজেদের বাড়ির পানে ছুটল এবং সাইকেলে চেপে ফের ফিরেছিল যেন ওর ছায়াকে আরো দ্রুতগতিতে ধাওয়া করতে পারে এবং নিচে নামা মাত্রই ওকে আটকে ফেলতে পারে।
উড়ুক্কু এবং তার ধাওয়াকারীদের মাঠময় এই হৈচৈ এবং চেঁচামেচি সব মিলিয়ে নাটক বেশ জমে উঠেছিল।
শহরের সীমানার বাইরের লোকেরাও পথচারীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গলা টেনে দেখছিল আকাশে চলমান এই অভিনব দৃশ্য। উড়ন্ত নারীটির রূপ মোহগ্রস্থ হওয়ার মতোই; ওর ছায়া অনুসরণকারীরা ছোটার সময়েও চোখ তুলে উপরে তাকাতে গিয়ে দিশাহীন সৈনিকের মতো একে অপরের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল বারবার। শেষমেশ ইয়ানইয়ান শহরের পুবপ্রান্তের পুরোনো কবরস্থানের চারপাশে লেপ্টে থাকা পাইন ঝোঁপটাতে ঠাই নিলো। এই কালচে পাইনের বন আদিকাল থেকে প্রায় এক একর জুড়ে উওর-পূর্ব গাওমি শহরের পূর্বপুরুষদের একশ’রও বেশি কবরের উপর নজরদারী করে যাচ্ছে ।
এইসব বৃক্ষ বয়সে প্রাচীন, মাথা উঁচু করে সটান দাঁড়িয়ে আছে সার বেঁধে, ওদের চুড়ো নিচুতে ওড়া মেঘেদের যেন গেঁথে রেখেছে। এই পাইন বন এবং কবরস্থানকে একই সঙ্গে শহরের সবচেয়ে ভীতিকর এবং সবচেয়ে পবিত্র স্থান হিসেবে মেনে আসছে শহরবাসী । পবিত্র কেননা এই শহরের পূর্বপুরুষদের শেষ শয়ন এখানেই; ভীতিকর হওয়ার কারণ এই শহরের অসংখ্য ভৌতিক ঘটনা ঠিক এইখানেই ঘটার রটনা আছে।
ইয়ানইয়ান কবরস্থানের মধ্যিখানের সবচেয়ে প্রাচীন এবং উঁচু গাছটার চুড়োয় গুছিয়ে বসল। যারা তাকে এতক্ষণ ধাওয়া করে এই পর্যন্ত এসেছিল, তারা গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ওকে দেখছিল আর ভাবছিল কেমন করে সে সবচেয়ে উঁচু ডালগুলোর একটার উপরে অমন অনায়াসে ভাসছে! গাছটির শাখা ওকে কী সহজেই না ধরে রেখেছে যদিও ওর ওজন একশ পাউন্ডের কম হবে না কিছুতেই!
এক ডজনের বেশি কুকুর ভাসমান ইয়ানইয়ানকে লক্ষ করে ক্রমাগত চেঁচিয়ে যাচ্ছিল।
হং শিও চেঁচিয়ে হুকুম দিলো, “নেমে এসো। এক্ষুনি নেমে এসো বলছি! “
কুকুরদের ঘেউঘেউ কিংবা হংশির চিৎকার সবই যেন বধির কারো উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়েছে, ইয়ানইয়ান নির্বিকারচিত্তে, বাতাসের ছন্দে ওঠা-নামা করেই যাচ্ছিল। নিচে দাঁড়ানো অসহায় জনতা খানিকক্ষণ পরেই বিচলিত হয়ে উঠল কেবল অতি উৎসাহী শিশুর দল চেঁচিয়ে বলতে লাগল, “নতুন বৌ, এই যে নতুন বৌ তুমি আমাদের আরেকটু উড়ে দেখাও দেখি”, ইয়ানইয়ান ওর বাহু প্রসারিত করল। “উড়ছে”! বাচ্চারা উল্লাসে চেঁচাল, “ও এক্ষুনি উড়বে!” কিন্তু ইয়ানইয়ান উড়ল না বরং ওর পাখির নখের মতো বাঁকা আঙুলগুলো নিজের চুলের ভেতরে এমনভাবে চালাতে লাগল ঠিক যেমন করে পাখিরা তাদের ডানার পালক পরিপাটি করে।
হং শি হাঁটু মুড়ে বিলাপ শুরু করে দিলো, “তোমরাই আমার কাকা, তোমরাই ভাই, হে আমার প্রিয় শহরবাসী – ওকে নিচে নামানোর একটা উপায় বার কর দয়া করে । এই বয়সে বৌ পাওয়া কী কঠিন ছিল আমার জন্যে তার সবই তোমাদের জানা”, ওর কথা হতেই গাধার পিঠে চেপে হং শির মা অকুস্থলে হাজির হলেন। পিঠ থেকে পিছলে নেমে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে কোঁকাতে কোঁকাতে বৃদ্ধা হং শির কাছে জানতে চাইলেন, “কোথায় সে?”, “কোথায়?”
হং শি গাছের চুড়োর দিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখাল, “ঐখানে- ওই ওপরে” । বৃদ্ধা চোখের ওপরে হাত উঠিয়ে গাছের উঁচুতে তার ছেলে-বৌয়ের অবস্থান খুঁজে বার করে আর্তনাদ করে উঠলেন, “ডাইনি! এই মেয়ে একটা আস্ত ডাইনি!” এলাকা-প্রধান ‘লৌহমানব’ বললেন, “ডাইনি হোক না-হোক, ওকে নামানোর একটা পন্থা আমাদের বার করতেই হবে। সব শুরুর মতো এরও একটা শেষ দরকার। “
“মুরুব্বি,” বৃদ্ধা বললেন, “আমি আপনার কাছে মিনতি করছি, দয়া করে একটা কিছু করুন। “
উত্তরে ‘লৌহমানব’ বললেন, “ কী করব, বলছি। আমরা প্রথমে উত্তর জিয়াঝু শহরে ওর মা, ভাই আর ইয়াংহুয়াকে লোক পাঠিয়ে এখানে আনাব। এর পরেও যদি সে না-নামে তবে ইয়াংহুয়াকে আমরা এখানেই রেখে দেবো । এরপরে আমরা কয়েকজনকে তীর-ধনুক বানাতে এবং কিছু উচু খুঁটি কেটে আনতে বাড়িতে পাঠাব। যদি কোনো কিছুতে কাজ না হয় তবে ওকে নামাতে আমাদের কঠিন পদ্ধতিটিই আরোপ করতে হবে। এবং আমরা আমাদের স্থানীয় সরকারকেও অবহিত করব। যেহেতু সে এবং হং শি স্বামী-স্ত্রী, আমাদের সরকার নিশ্চয় বিবাহ আইনের বিধি মেনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। এই কথা রইল তবে। হং শি তুমি এই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে খেয়াল রাখ। আমরা একটা কাঁসাসহ কাউকে পাঠাচ্ছি। এর মধ্যে যদি কিছু ঘটে তবে গায়ের জোর দিয়ে তুমি কাঁসাতে আঘাত করবে। ওর আচরণ দেখে আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে ওর উপরে কিছু একটা ভর করেছে। আমাদের শহরে ফিরতেই হবে এবং কুকুর মারতেই হবে যেন প্রয়োজনে কুকুরের রক্ত আমাদের হাতের কাছেই থাকে।“
জনতা ভিড় ভেঙে আসন্ন প্রস্তুতির জন্য বাড়ির পথে পা বাড়াল। হং শির মা ওর সঙ্গে থাকার জন্য জেদ করছিলেন, কিন্তু এই ব্যাপারে লৌহমানব অটল রইলেন। “অবুঝের মতো কথা বলবেন না। এখানে থেকে আপনি কী কাজে আসবেন? যদি পরিস্থিতি বাজে হয় তবে আপনি গোলমালের মধ্যিখানে আটকা পড়বেন। তার চেয়ে বরং বাড়ি যান। “
বৃদ্ধা যখন বুঝতে পারলেন এদের সঙ্গে তর্ক বৃথা তখন তিনি নিজেকে গাধার পিঠে টেনেটুনে বসালেন এবং বিলাপ করতে করতে সেখান থেকে বিদায় নিলেন।
ভিড় সরতেই হৈচৈ থেমে গেল কিন্তু উত্তরপূর্ব গাওমি শহরাঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষ হিসেবে পরিচিত হং শির কাছে এই নিস্তব্ধতা অসহনীয় মনে হচ্ছিল। সূর্য পশ্চিমে ঢলতেই হাওয়ারা যেন পাইন গাছগুলোর ভেতরে গুঙিয়ে ঘুর্ণি তুলছে। ওর ঘাড় ধরে আছে, মাথা নুইয়ে হং শি ঘাড় মালিশ করতে লাগল।এরপরে কাছাকাছি একটা পাথরের চাঁইয়ে বসে যেইমাত্র সিগারেটে আগুন ধরিয়েছে অমনি উপর থেকে অদ্ভুত বিদ্রুপাত্মক হাসি পিছলে নামল। ভয়ে হং শির চুলের গোড়া খাড়া হয়ে গেল, ওর সারা শরীরে হিম বয়ে গেল! আগুন নিভিয়ে ও ঝট করে উঠে দাঁড়াল এবং কয়েক কদম পিছিয়ে গাছের চুড়োকে লক্ষ্য করে বলল, “আমার সঙ্গে কোনো ধরনের ভুতুড়ে চালাকি করার চেষ্টা করবে না। একবার শুধু হাতে পেয়ে নিই তারপর বুঝবে… “
অস্তগামী সুর্যের পটভূমিতে ইয়ানইয়ানের লাল অন্তর্বাসে যেন আগুন লেগেছে, রঙের আভা ওর মুখেও ছড়িয়েছে- মনে হচ্ছে সদ্য মসৃণ করা কোনো মুখ। বিদ্বেষপূর্ণ সেই হাসি যে ওর দিক থেকে এসেছে তার কোনো চিহ্নই নেই কোথাও। বৃষ্টির মতো ধূসর বিষ্ঠা ছড়াতে ছড়াতে এক ঝাঁক কাক হং শিকে পেরিয়ে নীড়ের পথে চলেছে। কিছু উষ্ণ বিষ্ঠার ফোঁটা সরাসরি ওর মাথাতেই পড়ল। মাটিতে থুথু ছিটাতে গিয়ে হং শির মনে হলো অশুভ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে ওর জীবনে। গাছের চুড়োয় তখনও রাঙা আলোর আভা যদিও পাইনঝোঁপে আঁধার ঘন হয়ে নামছে এবং বাদুড়েরা গাছের ফোকরে এবং বনের গভীরে ক্ষিপ্র গতিতে ঢুকে যাচ্ছে। কবরস্থানের ভেতর থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে । হং শির মনে খানিক আগের সেই ভয়াল অনুভূতি ফের চেপে বসল।
ও বিলক্ষণ অনুভব করতে পারছে- এই ঝোঁপের সবখানে আত্মা ঘুরছে,; নানা ধরনের আওয়াজে ওর কান ভার হয়ে যাচ্ছে। সেই তাচ্ছিল্যময় হাসি আবার শুনতে পাচ্ছে সে। প্রতিবারই সেই হাসির দমক কানে আসা মাত্র ওর শরীর বেয়ে শীতল ঘাম গড়াতে লাগল। দুষ্ট আত্মাকে তাড়ানোর মোক্ষম উপায় হলো মধ্যমার আগায় কামড় খাওয়া, এই সংস্কারটি ওর মনে পড়তেই তাই করল সে। সত্যি সত্যি তীব্র ব্যথায় ওর মগজ ঝকঝকে পরিষ্কার হয়ে গেল যেন। ও দেখতে পেলো পাইন ঝোঁপটা খানিক আগে যতটা অন্ধকার দেখাচ্ছিল আসলে ততটা অন্ধকার নয়। সারি সারি কবরের ঢিবি এবং কবরের সিথানের পাথর ক্রমশ স্পষ্ট হতে লাগল । গাছের গুঁড়ির আভাসও সে মরা আলোয় ঠাহর করতে পারছে এখন। কবরের ঢিবির আড়ালে কিছু শেয়াল-শাবক খেলছিল। ওদের মা শুকনো ডালপালার ওপরে গুঁড়ি মেরে ওদের উপর নজরে রাখছিল,আর খানিক পরপর দাঁত বার করে হেসে যেন ওর উপস্থিতিকেও মান্যতা দিচ্ছিল। আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই ও দেখতে পেল ইয়ানইয়ান একচুলও নড়েনি এবং ওর মাথার ঠিক উপরে এক দল কাক চক্কর দিচ্ছে।
ফ্যাকাশে দেখতে একটা বাচ্চা ছেলে দুটো গাছের মধ্যিখান থেকে উদয় হলো । ছেলেটা একটা কাঁসা এবং তা বাজানোর জন্য মুগুর , একটা কুড়াল আর একটা বড়ো রুটি ওর দিকে বাড়িয়ে দিলো এবং জানাল, লৌহ মানব তীরধনুক তৈরির কাজ তদারক করছেন, উত্তর জিয়াঝুতে লোক পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় পৌরসভার কর্তাব্যক্তিরা ব্যাপারটা অতি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন; অতি শিঘ্রই তারা কাউকে এখানে পাঠাচ্ছেন। হং শি এই রুটি দিয়ে যেন আপাতত ওর ক্ষুধা নিবারণ করে এবং ওর পাহারাদারীর কাজ চালু রাখে। তেমন কিছু ঘটলেই যেন ও কাঁসায় মুগুরের বাড়ি হেনে জানান দেয়। ছেলেটা চলে যেতেই হং শি কাঁসাটা স্মৃতি-স্মারক পাথরগুলোর একটার উপর রাখল, কুড়ালটা ওর কোমরবন্দের ভেতর ঢোকাল এবং রুটিতে কামড় বসাল। খাওয়া শেষ হলেই ও কুড়াল বার করে চেঁচাতে লাগল, “ এই তুমি নেমে আসবে নাকি না? যদি ‘না’ হয় তবে আমি গাছটাই কেটে ফেলব। “
উপর থেকে ইয়ানইয়ান টু শব্দটি করল না।
অতঃপর হং শি গাছে কুড়ালের কোপ বসাল, হঠাৎ আঘাতে গাছটা কেমন কেঁপে উঠেছিল! তারপরেও ইয়ানইয়ানের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। কুড়ালটা গাছের এতটা গভীরে গেঁথে গিয়েছিল যে হং শি কিছুতেই তা টেনে বার করতে পারল না। আচ্ছা ও কি মরে গেছে? হং শির মনে সন্দেহ উঁকি দিলো।
অতঃপর কোমরের রশির গেরো কষে বাঁধল হং শি। পায়ের জুতোজোড়াও খুলল। এরপর গাছটা বাইতে শুরু করল। খসখসে বাকলের জন্য ও বেশ তরতরিয়ে গাছে চড়তে পারছিল। অর্ধেকটা বাইবার পরে উপরে তাকানোর জন্য থামল খানিক। কেবল ইয়ানইয়ানের ঝুলানো পা-জোড়া এবং গাছের ডালে বসা ওর পশ্চাদ্দেশই দেখা যাচ্ছে। আহা আমাদের দুজনের এতক্ষণে বিছানায় থাকবার কথা ছিল- মনে মনে ভাবল হং শি। ওর মন বিষিয়ে উঠল- আর তুমি কিনা আমাকে এই সময়ে গাছ বাওয়াচ্ছ! কিন্তু ওর এই ফুঁসে ওঠা ক্রোধ যেন শক্তিতে বদলে গিয়েছিল। উপরদিকে যতই গাছের বেড় সরু হচ্ছিল ততই ডালপালা ছাউনির মতো ছড়িয়ে আছে ফলে হং শির জন্য ভারসাম্য রাখা ক্রমশ সহজতর হচ্ছিল। এমনই একটা খাঁজে পা রেখে চুপিসারে ইয়ানইয়ানকে ধরবার জন্য যেই না হাত বাড়িয়ে কেবল তার পায়ের আগা ছুঁয়েছে অমনি একটা গভীর দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ শোনা গেল। মাথার উপরের ডালপালার কাঁপন অনুভব করল হংশি; সোনার কুচি উড়তে লাগল চারপাশে ঠিক যেভাবে জল ছেড়ে লাফিয়ে ওঠা পোনা মাছের আঁশ ঝিকমিকিয়ে ওঠে ঠিক সেই ভাবে।
ইয়ানইয়ান ওর বাহু ঝাপটে পাতার ঝোঁপ ছেড়ে উড়াল দিলো। ওর হাত -পা সবই চলছে দ্রুতলয়ে এবং বাতাসে চুল ভাসিয়ে সে অন্য আরেকটা গাছের শিখরে মসৃণভাবে নেমে বসল। শি শঙ্কিতচিত্তে লক্ষ করেছিল সেই গমখেতের সময়ের চেয়ে ইয়ানইয়ানের উড়াল- দক্ষতা অনেকখানি বেড়ে গেছে।
নতুন গাছটার আগায় ঠিক পুরোনো ভঙ্গিতেই বসেছে ইয়ানইয়ান। সূর্যাস্তের গোলাপি আভার মুখোমুখি বসায় তাকে দেখতে সদ্য ফোটা গোলাপের মতোই মনোরম লাগছিল। “ইয়ানইয়ান”, হং শি অশ্রুসজল কণ্ঠে ডাকল, “লক্ষ্মী বৌ আমার, বাড়ি চল, আমার সঙ্গে জীবন শুরু কর।তুমি যদি না আস আমিও ইয়াংহুয়াকে তোমার বোবা ভাইয়ের বিছানায় যেতে দেবো না- “
ওর কথাগুলো তখনো হাওয়াতে ঝুলছিল যখন ঠিক নিচ থেকে ভয়ঙ্কর সেই ভাঙনের আওয়াজ কানে এসেছিল ওর এবং ভালো করে কিছু বোঝার আগেই ডাল মটকে এক তাল মাংসের মতো হং শি ধপাস করে নিচে পড়ে গিয়েছিল। নিজেকে শুকনো পাইন-সূচের সুজনী থেকে খাড়া করে এবং গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে কয়েক পা হাঁটার আগে হং শি অনেকক্ষণ একভাবে পড়েছিল গাছতলায়। কেবল গায়ে, পায়ে পতনের আঘাত ছাড়া ও ঠিকঠাকই ছিল; হাড়গোড় ভাঙেনি।
ধাতস্থ হয়ে আকাশে তন্নতন্ন করে ও খুঁজেছিল ইয়ানইয়ানকে, সেখানে কেবল চাঁদই ভাসছে, যার জলজ আলোকরশ্মি পাইন শাখার ফাঁক গলে ইতিউতি কবরের গায়ে, সিথানের স্মারকপাথরে এবং ক্বচিত গজানো শ্যাওলার গায়ে ছিটকে ছড়াচ্ছে। আর ইয়ানইয়ান বসে আছে গাছের আগায়। জ্যোৎস্না-স্নাত ইয়ানইয়ানকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল মনোরম পাখি, রাত কাটানোর জন্যই ঠাই নিয়েছে সেই খানে।
কেউ একজন পাইন বনের ওপার থেকে ওর নাম ধরে ডাকছে । হং শিও চেঁচিয়ে প্রত্যুত্তর দিলো। কাঁসার কথা মনে পড়তেই ও স্মারক পাথর থেকে সেটি তুলে নিলো কিন্তু একে বাজাবার মুগুরদণ্ডটি কোথাও খুঁজে পেলো না।
একদল মানুষ শোর তুলে পাইন বনে ঢুকছিল ওদের হাতের ল্যাম্প, মশাল, টর্চলাইটের আলো গাছের ফাঁকে বিছানো সেই চাঁদের আলোকে হটিয়ে দিচ্ছিল। এদের মধ্যেই আছে ইয়ানইয়ানের বয়েসী মা, বোবা দাদা, এবং হং শির ছোটোবোন ইয়াংহুয়া। সেই ভিড়ে লৌহমানবকেও দেখল হং শি – সঙ্গে পিঠে ঝোলানো তীর-ধনুকসহ সাত-আটজন সমর্থ পুরুষ। অন্যেরাও নানা সরঞ্জাম নিয়ে এসেছে-বড়ো খুঁটি, শিকারী বন্দুক, এমনকী পাখি ধরার জালও। একজন সুদর্শণ তরুণ জলপাইরঙা পোশাক এবং মোটা চামড়ার বেল্টে তার কোমর আঁটা- হাতে রিভলভার, হং শি একে স্থানীয় পুলিশের অফিসার হতে পারে আন্দাজ করল।
হং শি’র মুখে কালশিটে এবং আঘাতের চিহ্ন লক্ষ করে লৌহমানব জানতে চাইলেন, “কীভাবে ঘটল?”
“ও কিছু না”, হং শি উত্তর দিলো।
“কোথায় সে?” ইয়ানইয়ানের মা বেশ জোরে তলব করলেন।
কেউ একজন টর্চলাইটের আলো গাছের আগায় তাক করল, ইয়ানইয়ানের মুখের উপরে তা সরাসরি জ্বলতে লাগল। নিচে দাঁড়ানো লোকজন ডালে কারো নড়াচড়ার খসখস আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল, খানিক পরে সকলে দেখল ঘন ছায়াটি নিঃশব্দে গাছটি ছেড়ে অন্য একটা গাছের আগায় সরে যাচ্ছে।
‘বেজন্মার দল!” ইয়ানইয়ানের মা গাল পাড়ল। “আমি জানি তোমরা আমার মেয়েকে খুন করেছ এবং এই বৃদ্ধা বিধবা আর তার অনাথ ছেলেকে ঠকানোর উদ্দেশ্যে এমন একটা উদ্ভট গল্প ফেঁদেছ । নইলে কীভাবে একটা মেয়ে প্যাঁচার মতো উড়বে?”
“মাসিমা শান্ত হন, “লৌহমানব উত্তর দিলেন। “আমরাও নিজের চোখে না দেখলে এই ঘটনা বিশ্বাস করতাম না। আচ্ছা আমার একটা কথার জবাব দিন তো, আপনার মেয়ে কি কোনো গুরুর কাছে শিক্ষা নিয়েছে? কোনো অস্বাভাবিক বিদ্যা আয়ত্ত্ব করেছে? ডাইনিদের সঙ্গে যোগসাজস আছে? কিংবা জাদুকরদের সঙ্গে?”
“আমার মেয়ে কোনো গুরুর কাছে কখনই কোনো শিক্ষা নেয়নি,” ইয়ানইয়ানের মা বললেন, “কিংবা কোনো অস্বাভাবিক বিদ্যাও অধ্যয়ন করে নি। এবং কোনো ডাইনিকূল বা জাদুকরের সঙ্গে সংশ্রবের প্রশ্নই ওঠে না। ও যখন বড়ো হচ্ছে তখন আমি ওকে আমার চোখের আড়ালই করিনি এবং ওকে যা করতে বলা হয়েছে ও সবসময় তাই করেছে। আমার পড়শিরা সবসময় বলত, কী অসাধারণ মেয়েই না আমি তৈরি করেছি! আর এখন সেই লক্ষ্মী মেয়েটা একদিন তোমাদের ওখানে কাটাতে না কাটাতেই গাছের আগায় ঈগলপাখি বনে গেল? এর উওর না পাওয়া পর্যন্ত আমি নড়ছি না। আমার ইয়ানইয়ানকে ফেরত দাও নতুবা ইয়াংহুয়াকে আর ফেরত পাবে না। “
“যথেষ্ট ক্যাঁচাল হয়েছে মাসিমা,” পুলিশ অফিসারটি এবার নাক গলাল। “আপনার চোখ গাছের আগায় রাখুন।“বলেই সে তার হাতের টর্চলাইটটি পাশের গাছের ছায়াময় চুড়োর দিকে তাক করল, এবং চট করে আলো জ্বালাল। সেই আলো ইয়ানইয়ানের ঠিক মুখের উপরেই বসল।সঙ্গে সঙ্গে দুই বাহু নেড়ে সে বাতাসে ভেসে উঠে গেল এবং অন্য একটা গাছের আগায় পিছলে নামল।
“দেখতে পেলেন মেয়েকে, বুড়ি মাসি?”, পুলিশের লোকটি জানতে চাইল।
“হ্যাঁ,” ইয়ানইয়ানের মা উত্তর দিলেন।
“এটিই আপনার মেয়ে তো?”
“আমারই মেয়ে। “
“খুব প্রয়োজন না হলে আমরা কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চাই না”, অফিসার বলল।
“আপনি যদি ওকে নেমে আসতে বলেন ও নিশ্চয় শুনবে। “
ঠিক তখনই ইয়ানইয়ানের মূক ভাইটি উত্তেজিত হয়ে ঘোঁতঘোঁত আওয়াজ করতে করতে দুই বাহু ঝাঁকাতে লাগল যেন বোনের উড়ালভঙ্গি নকল করছে সে।
ইয়ানইয়ানের মা কাঁদতে লাগলেন, “গতজন্মে কী পাপ করেছিলাম যে এই জীবনে তার শাস্তি পেতে হচ্ছে?”
“না-কাঁদার চেষ্টা করুন বুড়ি-মাসি,” অফিসার উপদেশ দিল। “মেয়েকে ওখান থেকে নামানোর জন্য বরং কিছু একটা ভাবুন। “
“ও সবসময় একগুঁয়ে। আমার কথা নাও শুনতে পারে,” ইয়ানইয়ানের মা বিষণ্ণভাবে স্বীকার করল।
“সঙ্কোচের সময় এটা নয়, বুড়ি মাসি”, অফিসার বলল, “ওকে নেমে আসতে বলুন। “
ছোটো বাঁধোপায়ে বেশ কায়দা করে ইয়ানইয়ানের মা সেই গাছের কাছে এগিয়ে গেলেন যার ডালে ইয়ানইয়ান বসে আছে, মাথাকে পেছনে সরিয়ে অশ্রুসজল চোখে উনি ডাকলেন,
“ইয়ানইয়ান লক্ষ্মী মেয়ে আমার, মায়ের কথা শোনো। নেমে এসো…আমি জানি তোমার মনে হচ্ছে তোমার সঙ্গে সঠিক আচরণ করা হয় নি, কিন্তু এর কোনো সুরাহা নেই। তুমি যদি না নেমে আস তবে ইয়াংহুয়াকে আমরা রাখতে পারব না আর সেটি যদি ঘটে তবে আমাদের পরিবার শেষ হয়ে যাবে…”
বৃদ্ধা মহিলাটি ভেঙে পড়েছিলেন এবং সন্তাপ করতে করতে গাছের গুঁড়িতে মাথা কুটছিলেন। একটা খড়খড়ে আওয়াজ ভেসে এলো গাছের আগা থেকে, পাখিরা পালক ওড়ালে ঠিক যেমন আওয়াজ হয়।
“কথা বলতে থাকুন”, পুলিশ অফিসার তাড়া দিলো।
বোবা ওর দুই বাহু দুলিয়ে অনেক উঁচুতে থাকা বোনের দিকে তাকিয়ে ঘোঁতঘোঁত করেই যাচ্ছিল।
“ইয়ানইয়ান”, হং শি চেঁচিয়ে বলেছিল, “তুমি তো এখনও মানুষই আছ, তাই না? যদি তোমার শরীরে এক তোলাও মনুষ্যত্ব থাকে তবে তুমি অবশ্যই নিচে নেমে আসবে। “
ইয়াংহুয়াও কাঁদছিল: “বৌদি, নেমে এসো। তুমি, আমি দুজনই এই পৃথিবীতে কষ্ট নিতে এসেছি। মানছি আমার দাদা কুৎসিত, কিন্তু সে তো তবু কথা বলতে পারে। কিন্তু তোমার ভাই…দয়া করে নেমে এসো… এ আমাদের নিয়তি…”
ইয়ানইয়ান ফের বাতাসে ভাসছিল এবং লোকজনের মাথার উপরে আকাশে চক্কর দিচ্ছিল। শিশিরের মতো শীতল ক-ফোঁটা জলবিন্দু আকাশ থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ল – এরা হয়তো তারই অশ্রুবিন্দু।
“রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াও, ওকে জায়গা দাও, মাটিতে নেমে ও বসুক,” লৌহমানব চেঁচিয়ে বললেন জনতাকে।
বৃদ্ধা এবং ইয়াংহুয়া ছাড়া সকলে পিছিয়ে গেল।
কিন্তু ব্যাপারটা লৌহমানব যেমনটি ভেবেছিলেন তেমন ঘটল না। বাতাসে ওদের মাথার উপর চক্কর দিয়ে ইয়ানইয়ান গাছের আগাতেই ফের বসল।
চাঁদ তখন পশ্চিম আকাশে পাশ ফিরেছে; রাত গভীর হচ্ছে। ক্লান্তি এবং ঠান্ডা দুই-ই নিচের মানুষদের কাবু করতে শুরু করেছে। “আমার মনে হয় আমাদেরকে কঠিন পথটিই বাছতে হবে,” অফিসার রায় দিল।
লৌহমানব উত্তরে বললেন, “আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে এই ভেবে যে লোকজন ওকে হয়তো এই ঝোঁপ থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে, এবং আজ রাতে যদি ওকে ধরা না যায় তবে পরে ব্যাপারটা আরও কঠিন হয়ে যাবে।“
“আমি যতটা দেখছি,” অফিসার বলল, “ও দূরপাল্লার উড়ালে পারদর্শী নয়, তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই ঝোঁপ ছাড়লে বরং ওকে ধরা সহজ হবে। “
“কিন্তু ওর পরিবারের লোকজন যদি আমাদের এই পরিকল্পনায় সায় না -দেয় তবে?”, লৌহমানব জানতে চাইলেন।
“ব্যাপারটা আমার হাতে ছেড়ে দিন,” অফিসার তাঁকে আশ্বস্ত করল।
এরপরে অফিসার জনতার ভিড়ে মিশে গেল এবং কিছু তরুণকে ওর বৃদ্ধা মা এবং বোবা ভাইটিকে পথ দেখিয়ে পাইন বনের বাইরে দিয়ে আসতে নির্দেশ দিলো।
বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে ইতোমধ্যে নেতিয়ে পড়েছে, কোনো বাধা দেওয়ার চেষ্টাই করল না । অন্যদিকে বোবা ভাইটি তীব্র প্রতিবাদে ঘোঁতঘোঁত করতে লাগল কিন্তু যেই না অফিসার তার পদকৃত রিভলভারটি দোলাল অমনি সুরসুর করে সেও হাঁটতে লাগল ।
অকুস্থলে তখন কেবল পুলিশ অফিসার, লৌহমানব, হং শি এবং দুই তরুণ যাদের একজনের হাতে ছিল একটা খুঁটি, অন্যজনের হাতে জাল।
“গুলি ছুঁড়লে লোকজন আতঙ্কিত হবে”, অফিসার বলল। “বরং তীর ধনুক ব্যবহার করাই শ্রেয়। “
“আমার ক্ষীণ-দৃষ্টি”, লৌহমানব বললেন, “আমি মোটেই এই কাজের উপযুক্ত নই। আমার লক্ষ্য যদি কোনোভাবে একচুলও নড়ে যায় তবে আমি ওকে খুন করতে পারি। যা করার হং শিকেই করতে হবে। “
অতঃপর তিনি বাঁশের ধনুক এবং পালক লাগানো তীক্ষ্ণ তীরখানি হং শির হাতে দিলেন, যে কিনা তীর ধনুক হাতে নিলেও অন্য ভাবনায় বুঁদ তখন। “আমি পারব না”, হঠাৎ করেই ঘটনার গভীরতা বুঝতে পেরে সংবিৎ ফিরে পেল যেন সে, “আমি পারব না এবং আমি করবও না। ও আমার বৌ। তাই নয় কি? আমার স্ত্রী। “
“হং শি”, লৌহমানব বাধা দিলেন, “বোকার মতো কথা বলো না। তোমার বাহুডোরে থাকলে তবেই ওকে ‘স্ত্রী’ বলা সংগত হতো, কিন্তু ওই ডালে যে বসে আছে সে এক অদ্ভুত পাখি। “
“তোমরা না,” বিরক্ত হয়ে অফিসার বলল, “কিছুই করতে পারো না, না? যদি ঐখানে দাঁড়িয়ে কেবল কাপড়ের মুড়ি সেলাই করবে আর বেড়া বেঁধে সময় কাটাবে তো আমাকেই দাও আমিই করি “, বলেই সে তার বন্দুকখানি খাপে ভরল এবং তীর-ধনুক নিজের হাতে তুলে নিল। এরপর গাছের আগায় বসা আবছা অবয়বটিকে তাক করে তীর ছুঁড়ল। একটা ভোঁতা আওয়াজ জানান দিলো যে সে তার লক্ষ্য ভেদ করেছে। গাছের আগায় পাতাদের কাঁপন বোঝা যাচ্ছে এবং পরক্ষণেই উপস্থিত সকলে চাঁদের আলোতে দেখল পেটে তীর গাঁথা ইয়ানইয়ান উঁচুতে ভেসে উঠেই পাশের বেটে গাছটার পাতার ছাউনিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো । বলাই বাহুল্য সে তার ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে নি। পুলিশ অফিসার আরো একটা তীর, ধনুকের ছিলায় আটকে, ফের তাক করেছিল এবং ইয়ানইয়ান যখন হামাগুঁড়ি দিয়ে সেই বেটে পাইন গাছটার মাথায় কেবলমাত্র চড়েছে তখনই অফিসার চেঁচিয়ে আদেশ দিলো, “এক্ষুনি নেমে এসো!” কিন্তু অফিসারের চিৎকার বাতাসে মেলানোর আগেই দ্বিতীয় তীরটি ধনুকের ছিলা ছেড়ে বেরিয়ে গেলো হঠাৎ। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল কোথাও কেউ এবং পরক্ষণে ইয়ানইয়ান অধোমুখে উল্টে পড়ল মাটিতে।
“চো***- পো”, হং শি আর্তনাদ করে উঠল, “তুমি আমার বৌকে খুন করেছ…। “
পাইন বন ছেড়ে যারা খানিক আগে চলে গিয়েছিল তারা সকলে ফের তাদের লণ্ঠণ এবং টর্চলাইটের আলো ছড়িয়ে ফিরতে লাগল । “ও কি মরে গেছে?”, উৎকণ্ঠিত জনতা জানতে চাইল, “ওর গায়ে কি পালক আছে?”
লৌহমানব উত্তর দিলেন না, কুকুরের রক্ত ভরা বালতিটা তুলে ইয়ানইয়ানের সারা শরীরে ছিটাতে লাগলেন।

—————
লেখক পরিচিতি
মো ইয়ান 
মো ইয়ান আধুনিক চৈনিক সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ২০০০ সালে কাও শিংচিয়েনের পর মো ইয়ান দ্বিতীয় চৈনিক সাহিত্যিক যিনি ২০১২তে সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার নোবেল লাভ করেছেন। লোককথা, ইতিহাস ও বর্তমান সময়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এক ‘আবছায়ার বাস্তব জগত’ তৈরির এক নিপুণ কারিগর মো ইয়ান। সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’-এর সঙ্গে মো ইয়ানের ‘হ্যালুসিনেটোরিক রিয়ালিজম’-এর তুলনা করা হয়৷

অনুবাদক পরিচিতি:

রঞ্জনা ব্যানার্জী
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক
কানাডায় থাকেন।

3 thoughts on “মো ইয়ান’এর গল্প: উড়াল

  • October 29, 2021 at 3:42 am
    Permalink

    গদ্যভঙ্গিটা বেশ মজার।

    Reply
  • November 2, 2021 at 10:53 am
    Permalink

    চমৎকার অনুবাদ, তড়তড় করে পড়ে যেতে পারার আরাম বোধ হলো। অনেক ধন্যবাদ ম্যাম।

    Reply
  • November 3, 2021 at 5:01 pm
    Permalink

    দারুণ হয়েছে অনুবাদটা। গালিটা বুঝেছি। দিয়ে দিতেন ভালো হতো। গালি একরা পরিস্থিতির ভাষা মাত্র।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *