ওয়ানজিকু ওয়া নগুগির সিজন্স ইন হিপোল্যান্ড : গল্পের ক্ষমতা, ক্ষমতার গল্প

 এলহাম হোসেন
ধুনিক আফ্রিকী সাহিত্যের দিকপালদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অ্যামোস তুতুওলা, চিনুয়া আচেবে, ওলে সোয়িংকা, বেসি হেড, আমা আটা আইডু, বেন ওকরি, স্যমবেন উসমান, নুরুদ্দিন ফারাহ, তায়েব সালিহ প্রমুখ। এঁরা আধুনিক আফ্রিকী সাহিত্যের ভিত্তিভূমি নির্মাণ করেছেন। ইউরোপীয় ভাষা, বিশেষ করে, ইংরেজি ভাষাই এঁরা মোটামুটিভাবে সবাই ব্যবহার করে সাহিত্য রচনা করেছেন। যদিও সুদানের তায়েব সালিহ লিখেছেন আরবী ভাষায় যা আফ্রিকীদের মূল ভাষা নয়। সেনেগালের স্যমবেন ঔসমান লিখেছেন ফরাসী ভাষায়। মোজাম্বিকের মিয়া কুটো লিখছেন পর্তুগীজ ভাষায়। কেনিয়ার নগুগি ওয়া থিয়োং’ও লেখেন প্রথমত গিকুয়ু ভাষায়। পরে তা আন্তর্জাতিক পাঠকদের জন্য নিজেই অনুবাদ করেন ইংরেজিতে। চিনুয়া আচেবে লিখেছেন ইংরেজিতে। নাইজেরিয়ার ওলে সোয়িংকা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ লেখক যিনি ১৯৮৬ সালে নোবেল পুরষ্কার পান। তিনি এখনও ইংরেজিতেই লিখে চলেছেন। ২০২১ সালে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী আব্দুলরাজাক গুরনাহ, যাঁর জন্ম তানজেনিয়ায় কিন্তু বর্তমানে ব্রিটিশ নাগরিক, লেখেন ইংরেজিতে। উল্লিখিত সাহিত্যিকগণ আফ্রিকার সাহিত্যকে বিশে^র দরবারে হাজির করেছেন আফ্রিকার নিজের জবানীতে, নিজের বয়ান ও প্রপে র মাধ্যমে, আফ্রিকার ভেতর থেকে। উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক ও কবিতায় এঁরা আফ্রিকাকে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন; বিশ^সাহিত্যে আফ্রিকার আসন পাকাপোক্ত করেছেন। কিন্তু এঁদের কাঁধে ভর দিয়ে আফ্রিকার সাহিত্য এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? এই প্রশ্নটি স্বভাবতই পাঠকের মনে জাগে। যেমন, বাংলা সাহিত্যের দিকপাল যাঁরা ১৯৪৭ পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের পরে বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের ঝাণ্ডা কারা উড়িয়ে চলেছেন- এই প্রশ্নটি আমাদের নাড়া দেয়; এর উত্তর জানতে আমাদের উৎসুক করে তোলে। তেমনি উল্লিখিত দিকপালদের পরে বর্তমানে আফ্রিকার সাহিত্যের ঝাণ্ডা এখন কারা উড়াচ্ছেন? এই প্রশ্নটিও স্বভাবতই পাঠকের মনে উঁকি দেয়। এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, আফ্রিকার সাহিত্যের সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার উত্তর-আধুনিককালে কতিপয় যোগ্য সাহিত্যিক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই বয়ে চলেছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিমামান্ডা নগোজি আডিচি, আবি দারে, তেজু কোল, ইয়া গিয়াসি, ইগোনি ব্যারেট, এলনাথান জন, হেলেন ওয়েয়েমি, ইম্বোলো মবু, মাসান্দে নৎ শাঙ্গা, পেতিনা গাপ্পাহ প্রমুখ। আফ্রিকার বর্তমান সময়ের, বিশেষ করে, উত্তর-ঔপনিবেশিককালে জন্মগ্রহণ করা সাহিত্যিকগণ বর্তমানে আফ্রিকার সাহিত্যের মজবুত ঐতিহ্যের সিঁড়ি বেয়ে চলেছেন। আফ্রিকার সাহিত্যের এই ঝাণ্ডাবাহীদের মিছিলের অন্যতম প্রধান ও বলিষ্ঠ সাহিত্যিক হলেন ওয়াজিকু ওয়া নগুগি। জন্ম কেনিয়ায় ১৯৭০ সালে। কেনিয়া তথা বর্তমানে আফ্রিকার সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বকারী সাহিত্যিক নগুগি ওয়া থিয়োং’ও তাঁর বাবা। কিন্তু পিতৃপরিচয়ে নন, তিনি বর্তমান বিশ্বে পরিচিত স্বনামে এবং তাঁর বলিষ্ঠ সাহিত্যকর্ম দিয়ে তিনি ইতিমধ্যে বিশ্বের অসংখ্য পাঠকের মনোযোগ কেড়েছেন।

ওয়ানজিকু ওয়া নগুগি এ পর্যন্ত লিখেছেন দু’টি উপন্যাস। তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য ফল অব সেইন্টস। প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস সিজন্স ইন হিপোল্যা- প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে। তিনি হেলসিংকি আফ্রিকান ফিল্ম ফেস্টিভালের প্রাক্তন পরিচালক। তাঁর ছোটগল্প কেনিয়ার নাইরোবি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া প্রবন্ধ রচনাতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। বি.এ. পাশ করেছেন নিউইয়র্ক বিশ^বিদ্যালয় থেকে। এম.এ. করেছেন জিম্বাবুয়েতে। কাজ করেছেন ফিনল্যান্ড, ইরিত্রিয়া ও জিম্বাবুয়েতে। তাঁর দেখার গভীরতা তাঁর লেখার ধার ও ভার বাড়িয়েছে অনেক। তাঁর রচনায় নারীবাদী চেতনার ঝাঁজ পাওয়া যায়। বাস্তবকে অবাস্তবের সঙ্গে তিনি অতীব দক্ষতার সঙ্গে এমন একটি রেখায় মিলিত করেন যেখানে জাদু বাস্তবতার আবহ তৈরি হয় এবং তাঁর সাহিত্যকর্মকে দেয় ভিন্ন এক মাত্রা। সমাজের নানান অসঙ্গতির উপর বিশ্লেষণী আলোকপাত করলেও তিনি নিরস বক্তা হয়ে ওঠেননি, হয়ে উঠেছেন ভেতর-বাহির মিলিয়ে সুক্ষ্মদর্শী প্রভাবশালী এক সাহিত্যিক। কল্পনাকে তিনি রাখতে চান নিয়ন্ত্রণমুক্ত, কারণ কল্পনা যদি স্বাধীন না হয় মানুষ ও মানবতাও স্বাধীন হতে পারে না। কল্পনা তরল। এটি সবসময় বয়ে চলে বলে জীবনে পরিবর্তন আসে; জীবনের বাঁকবদল হয়। আর পরিবর্তন তো জীবীতেরই ধর্ম, মৃতের নয়। তাই যারা মানুষের কল্পনাকে শিকল পরাতে চায়, তারা মানুষের শত্রু। তারা জীবনবিনাশি শক্তি। যারা মিথ্যাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে ক্ষমতা-কাঠামো বা হেজেমনির অপব্যবহার করে, জ্ঞানের প্রতœসম্পদকে যারা মিথ্যার আবর্জনার নীচে চাপা দিয়ে রাখতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে ওয়ানজিকুর কলম ক্ষুরধার, সোচ্চার। এমনই প্রতিবাদে-প্রতিরোধে- প্রতিপ্রপে র স্বরে ধ্বনিত হয়েছে তাঁর সিজন্স ইন হিপোল্যা- এর প্রতিটি ছত্র।

উপন্যাসের আখ্যানে দেখা যায়, ভিক্টোরিয়ানা একটি কাল্পনিক দেশ। হতে পারে, এটি আফ্রিকার রূপকালঙ্কারিক উপস্থাপনা। এটিই উপন্যাসটির কাহিনীর সেটিং। এই দেশটি শাসন করেন একজন প্রতাপশালী সম্রাট। তিনি আজীবন শাসন করেছেন। জীবন সায়াহ্নে এসে কী যেন একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। স্বৈরশাসক তিনি। সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বানান। তাঁর কথার কেউ অন্যথা করার সাহস পায় না। দেশের অভিজাতগণ সম্রাটের অনুগত। শুধুমাত্র ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য সম্রাট মিথ্যার প্রুফ নির্মাণ করেছেন যাকে দেশের সবাই সত্য বলে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। মূলত দেশটি পুরোপুরিভাবে মিথ্যার দ্বারা শাসিত হয়। কিন্তু এই মিথ্যা এমনভাবে এখানে প্রচার করা হয় এবং তাতে আনুষ্ঠানিকতার রং লাগানো হয় যে, সেটি জনতার কাছে অকাট্য সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু আসলে দেশটি সত্যি সত্যি মিথ্যার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্র দুর্নীতিতে কানায় কানায় ভরে উঠেছে। এমনকি জন্মের পর থেকে ছোট ছোট বাচ্চারা পর্যন্ত এই মিথ্যার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এবং মিথ্যাকে তাদের অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য হিসেবে মেনে নিয়ে তা রপ্ত করতে বাধ্য হয়।

এই দেশের রাজধানী ওয়েস্টভিল। এখানকার মাম্বি নামের ছোট্ট একটি মেয়ে অত্যন্ত স্বাধীনচেতা। সে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে শিখতে চায়। সত্য-মিথ্যার বিভেদ করতে চায়। কিন্তু তা তো এই মিথ্যার রাজ্যে প্রথাসিদ্ধ নয়। তাই বিষয়টি তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তার প্রাণ ঔষ্ঠাগত হতে পারে। আবার স্কুলেও সে সঙ্গদোষে সিগারেট ফুকতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় তার আইনজীবী বাবা তাকে এবং তার ভাই মিটোকে হিপোল্যান্ড তাদের ফুফু সারার কাছে পাঠিয়ে দেন। বেড়াতে নয়। এক রকম নির্বাসনেই। কারণ, সেখান থেকে ওয়েস্টভিলে ফিরলে তাদের প্রাণসংশয় ঘটতে পারে। এই প্রাণসংশয়ের সুস্পষ্ট কারণ হতে পারে তাদের সত্যপ্রীতি। এমতাবস্থায় ওয়েস্টভিল এবং লন্ডনশায়ারের মাঝখানে অবস্থিত হিপোল্যান্ড এদের ফুফু সারার সঙ্গে এদের থাকতে হয়। মাম্বি হিপোল্যান্ড সংক্ষিপ্ত এবং তাৎপর্যপূর্ণ পরিস্থিতি খুব চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছে উপন্যাসের একেবারে প্রথম অধ্যায়ে। কথিত আছে, এখানে ধীরে প্রবাহমান জলের ধারায় এক সময় অনেক জলহস্তি বাস করত। কিন্তু এখন আর তাদের দেখা মেলে না। ল-নশায়ারের শিকারীরা এদের তাড়িয়ে দিয়েছে; শিকার করেছে। বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখন এদেও অল্প কিছু দক্ষিণে, উজানের দিকে বাস করে। কালেভদ্রে এদের দেখা মেলে। এভাবে মাম্বির বর্ণনা উপন্যাসের ইকোক্রিটিক্যাল বিষয়ের ব্যাপারে পাঠককে আকৃষ্ট করে। এ কথা সত্য, উত্তর-ঔপনিবেশিককালেও আফ্রিকার দেশগুলোর কিছু ভ্রান্ত নীতির কারণে সেখানকার বনভূমির ও বন্য জীবনের একটি বিশাল অংশ ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে; জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হয়েছে এবং মানুষের জীবনযাত্রাও প্রচন্ডভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে, অনেক পরিবেশ-সচেতন লেখক আফ্রিকার পরিবেশ, ইকোসিস্টেম ইত্যাদি অন্যতম বিষয়বস্তু হিসেবে তাঁদের লেখায় হাজির করেছেন।

তবে একথা অনস্বীকার্য যে, আফ্রিকার সাহিত্য মূলত রাজনৈতিক সাহিত্য বা পলিটিক্যাল লিটেরেচার। ওয়ানজিকু অত্যন্ত রাজনীতি-সচেতন লেখক। তাই স্বভাবতই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র তের বছর বয়সী মেম্বি তার রাজধানী ওয়েস্টভিলের দু’একটি বিষয় বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে ভিক্টোরিয়ানা দেশের দুর্নীতির অত্যন্ত শক্তিশালী চিত্র অংকন করেছে। মেম্বি বলে:

ওয়েস্টভিলে মন্ত্রীরা মার্সিডিজ বেঞ্জে চড়ে ঘুরে বেড়ান। রাস্তার খানা-খন্দক এঁদের চোখে পড়ে না। সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে এঁদের গাড়ী। ওয়েস্টভিলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এঁরা আলখাল্লার মতো লম্বা স্যুট পড়ে বের হন। হাতে থাকে কালো স্যুটকেস। তবে এখন এগুলো ফাকা। এগুলোর ভেতরের মালমসলা এঁরা নিরাপদে সুইস ব্যাংকে রেখে এসেছেন।

লন্ডনশায়ারে প্রাক্তন ঔপনিবেশিকদের বংশধরদের কেউ কেউ আজও বাস করে। মাম্বি বলে, এরা শক্ত দেয়াল দিয়ে বাড়ি তৈরি করেছে। সব সময় পিস্তল প্রস্তুত রাখে যাতে স্থানীয়রা বাড়াবাড়ি করলে তাদের ধরাশায়ী করতে পারে। এখানকার শাসকগোষ্ঠী ও অভিজাতদের আচার-আচরণ স্বাধীনতাত্তোর আফ্রিকার দেশগুলোর প্রাক্তন ঔপনিবেশিকদের ধ্বজাধারী শাসকদের আচার-আচরণকেই অংকন করে যাঁরা নিজ দেশের মানুষকে বুভূক্ষু রেখে, দেশের বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে বিদেশের ব্যাংকে টাকা জমায়; বিদেশের মাটিতে দেশের টাকা দিয়ে প্রাসাদ নির্মাণ করে বিলাসবহুল জীবযাপন করে।

অপরপক্ষে, হিপোল্যোর খেটেখাওয়া মানুষরা রাজধানীতে যায় জীবীকার খোঁজে। পুঁজির মালিকদের কাছে শ্রম বেচতে। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে এরা কায়োক্লেশে জীবনযাপন করে। একই সঙ্গে ওয়ানজিকু মাম্বির জবানীতে আফ্রিকায় বসবাসরত ভারতীয় ডায়াসপোরার কথাও বর্ণনা করেছেন ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে। মাম্বি বলে, অতীতে ভারতীয়রা এই হিপোল্যাে আসে। যন্ত্রপাতি ছাড়াই এক রকম খালি হাতেই তারা রেললাইন স্থাপন করে। এই শ্রমক্লিষ্ট কাজ করতে গিয়ে অনেকেই ভবলীলা সাঙ্গ করে । আবার কেউ কেউ হিট স্ট্রোক সহ্য করে টিকে যায় এই ভিক্টোরিয়ানায়। এরা মসলা নিয়ে আসে ভারত থেকে। এখানে মসলার ব্যবসা করে। স্থানীয়দের খাবারের স্বাদই পাল্টে যায় ভারতীয়দের এই মসলাগুলো ব্যবহার করার ফলে। এরা জলহস্তি শিকার করে। এগুলোর চামড়া ও দাঁতের অবৈধ বাণিজ্য করে। স্থানীয়দের বিয়েশাদি করে। দোকান বসায়। কেরোসিন, পোশাক-আশাক, দুগ্ধজাত খাবার ইত্যাদি বিক্রি করে। মন্দির ও গীর্জা নির্মাণ করে। বাহির থেকে আসা এই মানুষগুলো এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানান উপষঙ্গ ধীরে ধীরে সুনম্য হিপোল্যাের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। হিপোল্যা- বহুবর্ণিল হয়ে ওঠে। দেওয়া- নেওয়ার মধ্য দিয়ে বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে আফ্রিকা যে মহত্বের পরিচয় দেয়, তা এর চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। এই ঔদার্য দেখাতে গিয়ে আফ্রিকাকে যে আত্মপরিচয় সংকটে পড়তে হয়নি, তা নয়।

তবে দেশী এবং ভীনদেশী মানুষের সংমিশ্রণে স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সংকরায়নের মধ্য দিয়ে আফ্রিকার গল্পের ঝুলিও সমৃদ্ধ হয়। বৈচিত্র্যময় বর্ণ, বিশ্বাস-ব্যবস্থা, ভাষা ও মিথের দিক থেকে আফ্রিকা বহুবর্ণিল একটি মহাদেশ। তারপর বাহির থেকে বণিক ও ঔপনিবেশিকের বেশে আসা মানুষজনের সংস্কৃতি, নন্দন, জীবন ও যাপনের নানান উপষঙ্গ যখন সুনম্য আফ্রিকার শরীরে আছড়ে পড়েছে, তখন এর অঙ্গসৌষ্ঠব্য আরও বহুবল্লভে বিকশিত হয়েছে। এ কথা সত্য, ঔপনিবেশিকরা আফ্রিকাকে ‘অপর’ বা ‘ঊনমানব’ এ পরিণত করার সম্ভাব্য সব প্রকল্পই চালিয়েছে। কিন্তু সুনম্য আফ্রিকা তার স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখে কাল ও স্থানের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছে তার নিজস্ব গল্পে ও বয়ানে ভর দিয়ে। এই গল্প এবং বয়ান একান্তই আফ্রিকার নির্মাণ। এটি হাজর হাজার বছর ধওে লোকমুখে ফিরে ফিরে বর্তমান প্রজন্মের হাতে এসে পড়েছে। বাইরে থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা কোন ঔপনিবেশিকদেও কাছ থেকে পাওয়া কোন উত্তরাধিকার নয়। ঔপনিবেশিকদের প্রপ তো আফ্রিকার নিজস্বতাকে স্বীকারই করে না। করলে তো শোষণ, শাসন করা সহজ হবে না। এই শাসক-শোষকদের উত্তরাধিকার বহনকারী স্থানীয় রাজনীতিকরা যখন রাষ্ট্র-ক্ষমতার চালকের আসনে বসেছে তখন এরাও প্রাক্তন ঔপনিবেশিকদের ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এদেরই একটি প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্র হলো ওয়ানজিকুর কাল্পনিক আফ্রিকি রাষ্ট্রের সম্রাট।

উপন্যাসের মূল চরিত্র মাম্বি বলেছে, এই হিপোল্যান্ডের মানুষগুলো সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। সপ্তাহান্তে রবিবারে দিন শেষে ফুটবল খেলা দেখার জন্য এরা একত্রিত হয় মেক্সিকো ৮৬ বিয়ার হলে। সেখানে এরা গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে। সূর্য পাহাড়ের ওপাড়ে অস্ত গেলে অন্ধকার নেমে আসে। কিন্তু মেক্সিকো ৮৬ বিয়ার হলে টিমটিম করে বাতি জ্বলতে থাকে। হাতে ও ঠোঁটে ধরা জ্বলন্ত সিগারেট থেকে ধোঁয়ার কুন্ডলী ওঠে। প্রতিটি টেবিল এই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আলো-আঁধারির এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। কাঠের মটকায় গাঁজানো মদ ক্যালাবাশে পরিবেশন করা হয়। শত্রু-মিত্র সবাই বিভেদ ভুলে একাকার হয়ে গল্পে মজে ওঠে। ওয়েস্টভিলে সব বই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। কিন্তু মেক্সিকো ৮৬ এ সবার মুখে মুখে গল্পের শেষ নেই। এমনই সব গল্প মাম্বি শোনে তার ফুফু সারার কাছ থেকে। মাম্বি সারার কাছ থেকে গল্প শুনতে শুনতে ভুলেই যায় যে, সে তার নিজ বাড়ি থেকে নির্বাসিত। আসলে এখানেই গল্পের শক্তি। মানুষ তো গল্পেই বাঁচে। এই গল্পের মধ্যে মানুষ নিজেকে দেখে এবং জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার মন্ত্র শেখে এই গল্প থেকেই। মাম্বিও এই মন্ত্রের দীক্ষা নেয় গল্প থেকেই। গল্পের এই মন্ত্রেই সে ভিক্টোরিয়ানাতে আনে আলোড়ন, পরিবর্তনের জোয়ার।

সারা যে গল্পগুলো বাচ্চাদের বলে সেগুলোর মধ্যে একটি ছিলো চীনামাটির বাটি নিয়ে। বাচ্চারা এই গল্পটি খুব পছন্দ করে। চীনামাটির বাটিটি সাধারণ নয়। অসাধারণ। এর আছে রোগ নিরাময়ের অদ্ভুত এক ক্ষমতা। মাম্বি কৈশোর কাটিয়ে যৌবনে ওয়েস্টভিলে এসে যখন এই অদ্ভুত চীনামাটির বাটির গল্পটি বলে তখন এটি মোটামুটিভাবে সবাই গ্রহণ করে। এতদিন যারা দেশের সম্রাট কর্তৃক প্রচলিত জনপ্রিয় মিথ্যায় বুদ হয়ে ছিলো এখন তারা সেই মোহ কাটিয়ে মাম্বির চীনামাটির বাটির গল্পের মনোযোগী শ্রোতায় পরিণত হলো। এই গল্প দেশের মধ্যে চরম এক অভিঘাত তৈরি করলো। এই অভিঘাত গিয়ে লাগলো সেদেশের সম্রাটের গায়েও। সম্রাট অজানা এক রোগে আক্রান্ত। কাজেই, আরোগ্যের জন্য তারও এই চীনামাটির বাটি দরকার। কিন্তু আদতে এই চীনামাটির বাটির তো গল্পের বাইরে কোন অস্তিত্বই নেই। তাতে কী? গল্পের শক্তি তো এখানেই। এটি স্বৈরাচারী, মিথ্যোবাদী ও অতি চতুর সম্রাটকেও পরাস্ত করেছে, বশ করেছে। অন্যায় চতুরতাই তো তাঁর রোগ। অন্যায় ক্ষমতালিপ্সাই তো তাঁর রোগ।

গল্পের এই বাটি রূপকালঙ্কারিকভাবে উপস্থাপন করেছে আফ্রিকার স্থানীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস ও বয়ানকে। ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদী নিপীড়ন-নির্যাতন আফ্রিকার শরীরে যে রোগ-ব্যাধি বাঁধিয়েছে, তা দূর করার অন্যতম প্রধান ঔষধ হলো আফ্রিকার নিজস্ব সত্তা, আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, আফ্রিকার নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ন্যারেটিভের নির্মাণ। এই ন্যারেটিভ আফ্রিকাকে বাঁচাতে পারে ঔপনিবেশিকদের আধিপত্য ও প্রতাপ থেকে। তাঁদেও স্থানীয় দোসরদের হাত থেকেও। আফ্রিকীদের আত্মপরিচয় হারানোর ঝুঁকি থেকে। এই ঔপনিবেশিকরা স্থানীয়দের নাম পর্যন্ত পাল্টে দেয়। তারপর এদের পরিণত করে ‘অপর’- এ।

উপন্যাসের গল্পে মাম্বির ফুফু, সারার শৈশবের বেদনাদায়ক চিত্রের বর্ণনা রয়েছে। তখন সে সাত বছরের শিশু। মাকে ছাড়াই থাকে। তার মা গৃহকর্মী, আরো স্পষ্ট কওে বলতে গেলে দাস হিসেবে কাজ করে একটি শ্বেতাঙ্গ পরিবারে। এই শ্বেতাঙ্গ মহিলা সারার মা’র নাম বদলে দিয়েছেন। সারার মা’র নাম ছিল রোশানতাতা। কিন্তু এই ইংরেজ মহিলা তার নাম রেখেছেন রোজ। স্থানীয়দের ‘অপর’- এ পরিণত করার অন্যতম প্রধান কৌশল হলো ‘ নেমিং’, ‘ব্র্যান্ডিং’ বা ‘স্টেরিওটাইপিং’। সাত বছর বয়সে সারা তাঁর মাকে দেখতে যায় ট্রেনে চেপে। কিন্তু তার মা’র মনিবের বাড়িতে সে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারে না। ফিরতি ট্রেন ধরে সারা তার মা’কে পেছনে ফেলে আবার তার নানীর বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করে। করতে বাধ্য হয়। তবে নানীর কাছে ফেরার আগ পর্যন্ত সারা যে অল্প সময় তার মার সঙ্গে কাটায় সেই সময়ে প্রত্যেকদিন তাকে সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠতে হতো। মা’কে আলমারির ধূলো ঝাড়তে, মেঝে পরিষ্কার করতে, দুপুরের খাবার তৈরি করতে, থালা-বাসন ধুতে সাহায্য করতে হতো। সবকিছু করে গভীর রাতে যখন ঘুমাতে যেত, তখন রোদেলা দিনটা যে কখন, কিভাবে ফুরিয়ে গেছে, তা ওরা জানতেই পারত না। ওয়ানজিকু খুব দরদ দিয়ে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন এভাবে :

সারা ভোর ৬টা বাজার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ে। থালা-বাসন মাজা, মেঝে ঘষে পরিষ্কার করা ও ধূলো-ময়লা ঝাড়ার কাজে ওর মাকে সাহায্য করে। তারপর শুরু করে দুপুরের খাবার তৈরির কাজ। শেষ হওয়া মাত্রই আবার থালাবাসন ধোয়া। এরপর আবার রাতের খাবার তৈরির ব্যস্ততা। এবার আরোও বেশি থালাবাসন মাজতে হয়। ওর মা’র সঙ্গে ও যে ঘরে থাকে সে-ঘর ওদের নয়। এভাবে দিনের আলো না দেখেই ওদের দিন-রাত কেটে যায়। (অনুবাদ, লেখক, ৮১)

এই যে কর্মসংস্থানের নামে ব্যক্তিস্বাধীনতার পায়ে শিকল পরানো, রান্নাঘর আর বদ্ধঘরে আটকে রাখা, তা তো দাস প্রথার আরেকটি সংস্করণ। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা আফ্রিকা থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের হাতে-পায়ে-গলায় শিকল পরিয়ে জাহাজ ভরিয়ে ভরিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নিয়ে গেছে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অ লে। এদের দিয়ে কৃষি কাজ করিয়েছে। এদের রক্ত-ঘামে নির্মাণ করেছে তাদের সুপ্রশস্ত রাস্তা-ঘাট, চকচকে ইমারত আর বিলাসবহুল জীবনব্যবস্থা। জানা যায়, ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত প্রায় এক কোটি চব্বিশ লক্ষ আফ্রিকার কালো মানুষকে দাস বানিয়ে আমেরিকা মহাদেশে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এই হিসাব সামগ্রিক চিত্রের একটি ভগ্নাংশ মাত্র। ইউরোপীয়দের মধ্যে যারা আফ্রিকার নানান স্থানে জেঁকে বসেছিল তারা স্থানীয়দের নিজেদের গৃহকর্মে কেমন নির্মমভাবে ব্যবহার করত, তার একটি দৃষ্টান্ত পাঠক ওয়ানজিকুর উপরিউক্ত বর্ণনায় পান।

আঙ্গিক ও তাৎপর্যের দিক থেকেও ওয়ানজিকুর উপন্যাস সিজন্স ইন হিপোল্যা- একটি বহুমাত্রিক উপন্যাস। হীরকখণ্ডের গায়ে যত বেশি সংখ্যক তল থাকে এটি ততবেশি জ্বলজ্বল করে, কারণ নানান তল দিয়ে এর ভেতরে আলো প্রতিসরিত হয়ে এর ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে দেয়। ঠিক একইভাবে যেকোন মহৎ লেখারও অনেক মাত্রা থাকে। একে এক এক মাত্রায় দেখলে এক এক রকম দেখায়। উজ্জ্বলতর দেখায়। ওয়ানজিকুর উপন্যাস সিজন্স ইন হিপোল্যা– কে কখনও পাঠকের কাছে মনে হবে শিশুতোষ; আবার কখনও মনে হবে, এটি একটি রাজনৈতিক উপাখ্যান। মাম্বির শৈশব, গল্পের প্রতি ভালোবাসা ও গল্প ভালোলাগা, রোমা প্রিয়তা ইত্যাদি উপন্যাসটিকে শিশুতোষের মর্যাদা দেয়। আবার গল্পের নারী চরিত্রগুলোর চারিত্রিক দৃঢ়তা, প্রতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিরোধের সাহস উপন্যাসটিকে একটি ওজস্বি রাজনৈতিক ও নারীবাদী প্রপে পরিণত করেছে। এছাড়া উপন্যাসের রূপলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্য একে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সাহিত্যকর্মের মর্যাাদা দিয়েছে। মাম্বির গল্পের পোরসেলিনের বাটি, যেটির রোগ আরোগ্যের অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে, তা আসলে আমাদের এই পৃথিবীরও একটি রূপক। নানান সভ্যতার উত্থান-পতনের ভাঁজে ভাঁজে, ইতিহাসের নানান অভিঘাত ও বাঁকবদলে পৃথিবীব কতই না না-বলা গল্প জমে আছে। এই গল্প তো মানুষের গল্প, মানবতার গল্প, অসূরকে পরাস্ত করে পৃথিবীকে সম্প্রীতির সুরে মাতিয়ে তোলার গল্প। মানুষ তো গল্পের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে; গল্পে সে নিজেকে নির্মাণ করে। যার গল্প নেই, তার তো আত্মপরিচয়ও নেই। গল্প ধ্বংস করা তো নিজের আত্মপরিচয় ধ্বংস করারই নামান্তর। এই গল্পই আমাদের সভ্যতা, সমাজ, রাজনীতি, সমাজনীতি, নৈতিকতা ও সংস্কৃতির নানান রোগ সারাতে পারে। এর আছে এক অতুলনীয় নিরাময়কারী ক্ষমতা। তাই উপন্যাসের ভিক্টোরিয়ানা রাজ্যের সম্রাট যেমন গল্পের বাটি খুঁজছেন রোগ থেকে মুক্তির আশায়, আমাদেরকেও সেই গল্পের বাটি খুঁজতে হবে। শিকড়ের কাছে যেতে চাইলে গল্পের সিঁড়ি মাড়িয়েই যেতে হবে। গল্প হারিয়ে গেলে জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে যায়, সবকিছু ছন্নছাড়া হয়ে যায়। গল্প তো অবিচ্ছিন্ন সুতো যা নানান রংয়ের, নানান গন্ধের ফুলস্বরূপ জীবনের সব উপষঙ্গকে একসঙ্গে বেঁধে ফেলে; মালা গাঁথে। তাই গল্পকে বাঁচিয়ে রাখা ও রক্ষা করার জন্য মাম্বির মতো সবাইকে প্রতিবাদী ও বিপ্লবী হওয়ার আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে ওয়ানজিকুর এই উপন্যাসে। তবে ওয়ানজিকু এ কথা বলতে ভোলেননি যে, গল্পকে রক্ষা করার কাজ সহজ নয়। কারণ, গল্প অন্যায়কারী ও নিপীড়নকারী শাসকের কাছে ভয়ের। তাই সে গল্পকে নির্বাসনে পাঠাতে চায়, গল্পের কণ্ঠ রোধ করতে চায়। এর ভার্সন বদলে দিতে চায়। উপন্যাসে মাম্বির ফুফু সারা হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়েছে। মাম্বি লেখাপড়া শিখেছে, আইনজীবী হয়েছে আবার জেলও খেটেছে। কিন্তু তবুও সে উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করেছে: “I belonged to them now (১৯৮), অর্থাৎ “আমি গল্পের লোক”। মাম্বির এই সাহসী উচ্চারণ সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হোক, গল্প বাঁচুক, মানুষ বাঁচুক- ওয়ানজিকু সেই আহবানই জানিয়েছেন তাঁর এই উপন্যাসে।

তথ্যসূত্র:

ওয়ানজিকু ওয়া নগুগি, সিজন্স ইন হিপোল্যান্ড, সিগাল বুক্স, ২০২১

ড. এলহাম হোসেন, আফ্রিকার সাহিত্য ভাবনা, ঢাকা: বাঙ্গালা গবেষণা, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *