কণিষ্ক ভট্টাচার্যের গল্প : কেমিক্যাল লোচা অথবা ফাঁসির দড়ির গল্প

একটা কম্বলের কথা সে ছোটবেলা থেকে শুনেছে। যে কম্বল পেঁচিয়ে থানায় পেটানো হত বিপ্লবীদলের নেতাদের। সেই কম্বলটা সে কখনও দেখেনি। তার মনে হয় সেই কম্বলটা হবে মিশমিশে কালো রঙের। কয়লাখনির সুরঙ্গের মতো। যদিও সে খনি কখনও দেখেনি। কুটকুটে কালো একটা কম্বল।
যেটা গায়ে লাগলেই চুলকুনিতে জ্বালা করে ওঠে সারা শরীরে। বিষ-কুঁড়িতে ভরে যায় সারা গা। নখ দিয়ে খামচে খামচে ছালা উঠে যায় গায়ের। এমন একটা কম্বলের কথা সুরঞ্জন ছোটবেলা থেকে শুনেছে। কিন্তু কখনও চোখে দেখেনি। যেমন দেখেনি ফাঁসির দড়ি।
মাঝে মাঝে সেই কম্বল এসে পড়ে ওর ওপর। যে ভাবে ফাঁদের জন্তুকে জাল ফেলে ধরা হয়। বিরাট বড়ো জাল। জন্তুটা থাবা চালায়। দাঁত দিয়ে কাটতে যায়। কিন্তু পারে না শিকারীর জালের বুননের আর ছুঁড়ে দেওয়ার আর বেঁধে ফেলার কৌশলে। জন্তুটা হাঁকপাঁক করে। চিৎকার করে অক্ষম ভয় দেখাতে চায়। শিকারী দূরে দাঁড়িয়ে জন্তুটাকে আরও উত্তেজিত করে। জন্তুটা বাঁচার জন্য আরও চিৎকার করে, আরও কামড় বসায় জালে, আরও নখ চালায়। তার মগজের মধ্যে শুরু হয়ে যায় রাসায়নিকের খেলা। সে কথা জানে শিকারী, কারণ তারও মাথার মধ্যে তখন সেই রাসায়নিকই খেলা করে যায়। সে উত্তেজিত করে করে ক্লান্ত করে জন্তুটাকে। তারপর একটা মোটা লাঠি নিয়ে জালে আটকানো, অসহায়, ভীত, মুক্তির আশা হারিয়ে ফেলা জন্তুটাকে বেদম মারতে থাকে। এবার পরিত্রাহি চিৎকার করে জন্তুটা। সে চিৎকারে আগের মতো নিজের শক্তির গর্ব, অহংকার নেই, ভয় পাইয়ে দেওয়া নেই বরং প্রাণের ভয় আছে। ত্রাস আছে। ফেটে যাওয়া চামড়া আর ভেঙে যাওয়া হাড়ের যন্ত্রণার আকুতি আছে। নিজের শরীরের বহমান রক্ত দেখার আতঙ্ক আছে। জালে বদ্ধ অবস্থায় সে তার মৃত্যুকে তার সামনে দেখতে পায়।
কিন্তু সুরঞ্জনের ওপরে যখন কম্বল এসে পড়ে সে তখন কিচ্ছু দেখতে পায় না। মাথা মুখ ঢেকে যায়। চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। বিষ কুঁড়ির ফুল ফুটে ওঠে তার সারা গায়ে। বিষ পরাগ ছড়িয়ে পড়ে। দম আটকে আসে। সে মুখ বের করতে চায় কম্বল থেকে। খাবলে খাবলে গা-হাত-পা চুলকায়। সে চিৎকার করে। হাত পা ছোঁড়ে। দাঁত বসাতে যায় সে কম্বলে। জিভ ভরে যায় শুকনো তেতো রোঁয়ায়। জন্তুটা তো তবু তার শত্রুকে দেখতে পায়, আততায়ীকে চিনে রাখতে পারে। কিন্তু কে তার শিকারী কিমবা কে তার আততায়ী তাকে কখনও দেখতে পায়নি সুরঞ্জন। তবু কম্বলটা এসে পড়ে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। ওর মগজ থেকে রাসায়নিক ছড়ায় সারা শরীরে। পেশি প্রথমে শক্ত হয়ে আসে উত্তেজনায়, তারপর শিথিল হয় ক্লান্তিতে, তারপর আবার শক্ত হয়ে ওঠে আততায়ীর আঘাতে। চামড়া ফেটে যায়, পেশি থেঁতলে যায়, হাড় ভেঙে যায়, যন্ত্রণায় ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরোয় গলা দিয়ে। তবু আততায়ীকে ও কখনও দেখতে পায় না। যেমন ও দেখেনি কখনও যে, ফাঁসির দড়ি কেমন দেখতে হয়।
সাদা কাগজের সামনে সুরঞ্জন বসে থেকেছে। জানলার গ্রিলে কাটা পড়ে ঘরের মেঝেতে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়েছে রোদ। বিচ্ছিন্ন পা জানুর তলা থেকে আলাদা হয়ে পড়েছে দূরে লাইনের স্টোন চিপসের ওপরে। রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে গেছে। তবু ধাতব লাইনে প্রতিফলিত হয়েছে চকচকে রোদ। সে শুধু দেখেছে পালানো যুবককে। সিনেমার মতো সামনের সাদা পর্দায় তার বাড়ির কাছের রেললাইন। হাতে একটা সুতলির দলা নিয়ে দৌড়চ্ছিল ছেলেটা। বেশ খানিকটা পিছনে আরও তিনটে ছেলে। কিন্তু একটা অক্ষর লিখতে পারেনি। একই গল্পের শুরু সাতবার লিখেছে। একটাও পছন্দ হয়নি। অনেক বছর সে লিখেছে হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকায়। ছোটো পত্রিকায় যেমন হয় তেমন নির্দিষ্ট পাঠক পড়ছেন। অথচ রহস্য উপন্যাসটা লিখে ফেলার পর তার প্রচুর লেখার চাপ বড়ো পত্রিকার। তার জন্য নিজেকে বদলে নিয়েছে সুরঞ্জন। সাহিত্য সভায় সাদা শার্ট আর চিনোজ পরে সে যাচ্ছে উদ্বোধক করতে। কিন্তু প্রতিদিন সে একটু একটু করে যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। যা সে লিখছে তা তার পছন্দ হচ্ছে না। যা তার পছন্দ হচ্ছে তা সে লিখতে পারছে না। ও নিজে যে লেখা পছন্দ করছে তা ওর নিজের লেখা নয়। কালো কুটকুটে কম্বলটা আবার তাকে ঘিরে ফেলার পর আলোকদার কাগজের ডেডলাইনের ‘মারো অথবা পালাও’ সিচুয়েশনে সুরঞ্জনের মনে পড়ল এবার মেলায় কেনা লাল হার্ড বাউন্ড কভারের বইটার প্রথম গল্পটা, যেটা তাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এমনই কিছু তো লিখতে চায় সে। মরিয়া সুরঞ্জন লেখার খাতা খুলে বসে। রাতের পর রাত ঘুম হচ্ছে না ওর। ঘুম থেকে ওঠার পরে শিথিল যে ঘুম ঘুম ভাবটা থাকে মানুষের, সে লক্ষ করেছে যে তার সেটা একেবারেই থাকে না বেশ কিছুকাল। চোখ খুললেই সে অনুভব করে সমস্ত স্নায়ু টানটান হয়ে আছে। তারপর সারাদিন কিছুতেই ক্লান্তি যায় না ওর। সরকারি অফিস হলেও চাপ ওর কম না। 
ফাঁসুড়ে অনেক দিন ধরে দড়িটা তৈরি করে ফাঁসির জন্য। নরম হয়ে আসা কলা মাখায় দড়িতে। তাতে দড়ির নমনীয়তা বাড়ে। দেহের ওজনে টান লাগার সঙ্গে সঙ্গে গলার মাপের সঙ্গে ঠিকঠাক বসে সুষুম্নাকে ছিঁড়ে দেয় সুচারু ভাবে। দড়ির নমনীয়তা কম থাকলে ঠিক জায়গা মতো বসে না নিজের আড়ষ্টতার জন্যে। 
জানলার কাচে মাথা ঠেকিয়ে সুরঞ্জন বসে বসে ভাবছিল, বাক্য সাজাচ্ছিল মনে মনে। ফেরার সময় বাসে জানলার ধারে জায়গা পেয়েছিল সুরঞ্জন। ওর পাশের সিটটা খালি হওয়ায় এক সাহেব এসে বসল ওর পাশে। টিকালো নাক, ভরাট গাল, মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করার পরে মাঝখানটা ফেটে গেছে, জুলফি নেমে গালের ওপর চওড়া হয়েছে। বয়েস ষাট-বাষট্টি হবে। পঁচিশে জুলাইয়ের এই প্যাচপ্যাচে ওয়েদারে সাহেব পরেছে একটা লংকোট। 
সাহেব হঠাৎ ওকে বলে, ‘জানো, সেদিন আমার জন্মদিন ছিল। আমার বত্রিশতম জন্মদিন। সেবার একুশে অক্টোবর রবিবার পড়েছিল। কিন্তু দিনটা আমার একদম ভালো কাটেনি।’ 
গল্পের গন্ধ পেয়ে চোখ ফেরায় সুরঞ্জন। সাহেবকে উসকে দেওয়ার জন্য বলে, ‘তারপর?’ 
‘সেদিন আমি আমার ডায়রিতে লিখলাম, “একটা গোটা বছর কেটে গেল, কিন্তু আমার কোনও ফসলই ফলল না। তার লজ্জা আর কষ্ট আমায় ঘিরে রইল। তবু একটা গোটা বছর আমি প্রায় কিচ্ছু করিনি।” আসলে কিন্তু সত্যি কথা লিখিনি সেদিন। আমি কবিতা লিখতাম জানো, আমি ওই ছাব্বিশ সাতাশ বছরের পরে আর কিছুই করিনি। কিন্তু করিনি যে সেটা স্বীকার করতে আমায় বত্রিশ অবধি অপেক্ষা করতে হল।’
‘কেন? করেননি কেন? মিস্টার …?’ 
‘টেলর। আমার নাম স্যামুয়েল টেলর।’ উত্তর দেয় সাহেব।
‘করেননি কেন?’
‘ভয়। জানো তো, একটা অদ্ভুত অনির্দিষ্ট ভয়। সেটাকে আমি ঠিক বর্ণনা করতে পারি না। লিখতে বসলেই সেই আতঙ্কটা ফিরে ফিরে আসত।’
‘তখন কী করতেন?’
একটা বিষণ্ণ হাসি হাসে টেলর। ‘বাকি গোটা জীবনটা যা করেছি।’ উৎসুক চোখে তাকায় সুরঞ্জন। টেলর কোনও উত্তর না দিয়ে হাতের রুমালের দুটো কোনা ধরে ঘোরাতে থাকে। সুরঞ্জন উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। টেলর যে একটা কথা শুরু করেছিল সেটা যেন ওর আর মনেই নেই। রুমালটা পাকাতে পাকাতে দড়ির মতো হয়ে আসার পর টেলর বলে, ‘আফিম খেতাম। বাকি গোটা জীবনটা আমি আফিম খেয়ে কাটিয়েছি।’
‘আর কিচ্ছু লেখেননি! কেন?’ প্রশ্ন করে সুরঞ্জন। ‘আপনি তো বললেন, আপনি কবিতা লিখতেন। তাহলে এরকম করলেন কেন? আপনার মনে হয়নি যে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে আবার লেখা দরকার!’
কথাটা শুনে টেলর গম্ভীর হয়ে যায়। বলে, ‘ও, তুমি আমাকে জেগে ওঠার কথা বলছ? যাও, যার দুটো হাত প্যারালিসিস হয়ে গেছে তাকে বলো হাত দুটো জোরে জোরে ঘষতে দেখবে তাতে সে ঠিক হয়ে যাবে।’ খানিক থেমে আবার বলে। ‘শোনো, আমি আমার হাতদুটো নাড়াতেই পারি না। এবার বুঝেছ?’
একটু অস্বস্তিতে পরে যায় সুরঞ্জন। কথা ঘোরাতে বলে, ‘আপনি যে ভয়টার কথা বলছিলেন সেটা ঠিক কেমন?’
টেলর সেই পাকানো রুমালটা হঠাৎ সুরঞ্জনের গলায় পেঁচিয়ে ধরেই জোরসে টান দেয় দুদিকে। দম বন্ধ হয়ে আসে সুরঞ্জনের। চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে। এক ঝটকায় মাথাটা সরাতে গিয়ে জানলার কাচে ঠুকে যায়। তাকিয়ে দেখে পাশের সিটে বসা একটা কলেজের মেয়ে ওর ঠোঁটের পাশ দিয়ে লালা গড়াতে দেখে নাকে রুমাল চেপে বসে আছে। ওর বাড়ির স্টপ পেরিয়ে বাসটা প্রায় টার্মিনাসের কাছাকাছি চলে এসেছে।
পৃথিবীতে অনেক কিছুই আসলে ঘটে না। যেমন আলোকদার সম্পাদকীয় দপ্তরের দরজার দুপাশে টবে দুটো অ্যাস্পিডিস্ট্রা গাছ ছিল যারা কখনও উড়তে শেখেনি। যেমন গর্ডন কমস্টক লন্ডনের একটি দিন নিয়ে তার মহাকাব্যিক কবিতাটা শেষ করতে পারেনি। যেমন মবি ডিক লেখার পড়ে হেরম্যান মেরভিল বেশ কিছুকাল লিখতেই পারেননি। যেমন বড়ো পত্রিকার জন্য নিজেকে বদলে নিয়ে সুরঞ্জন ভেবেছিল, লিখতে শুরু করলে সে পত্রিকাকেই বদলে দেবে। যেমন তার জানা হয় না প্রত্যেকটা ফাঁসির জন্য ফাঁসুড়ে আলাদা আলাদা দড়ি ব্যবহার করে কিনা।
আবার দুনিয়ায় অনেক কিছুই ঘটে। যেমন মিলানের পেট্রোল পাম্পের পাশে এপ্রিলের ঊনত্রিশ তারিখে আগের রাতে ফায়ারিং স্কোয়াডে ঝাঁঝরা হওয়া ফ্যাসিস্ত শাসকের মৃতদেহে লাথি মারতে মারতে পাবলিক ঝুলিয়ে দেয় দেয় উলটো করে। সান্তাক্লজের স্লেজ আসার আগেই একানব্বইয়ের বড়োদিনে ক্রেমলিন থেকে লাল পতাকা নামিয়ে নেওয়া হয়। ক্ষমতা কোথায় যে কী ভাবে বদলে যায় সে বুঝে ওঠা খুব কঠিন। যেমন মুসোলিনির ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুর সত্তর বছর পরেও দেশে দেশে শাসকেরা ফ্যাসিস্ত হয়ে উঠতে চায়। যেমন সেই বড়োদিনের ছাব্বিশ বছর বাদে আবার সেই পতাকা হাতে আইসিসদের রাজধানী সিরিয়ার রাক্কা মুক্ত করে ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিডম ভলান্টিয়ার আর কুর্দিশ মিলিশিয়া। যেমন নানা চাপে সুরঞ্জনের মস্তিষ্কে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ সেরিব্রাল কর্টেক্স থেকে চলে গিয়েছিল লিম্বিক সিস্টেমের কাছে। কলেজের ছেলে ছোকরারা যাকে বলে কেমিক্যাল লোচা। যে কেমিক্যাল লোচার জন্য মানুষ প্রেমে হাবুডুবু খায়, ফ্রাস্টু খায়। আবার এক দড়ির দুদিকে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পড়ে, তেমনই একটা কিছু। আর তাতে এমন অনেক কিছু ঘটে যায়, সেটা আর ক্ষমতা প্রয়োগের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। যেমন নাজি পার্টিকে ভোট দেওয়ার সময় জার্মানরা জানত না কী হতে চলেছে। সেও বোঝেনি।
লেখাটা আলোকদার কাগজে জমা দেওয়ার পর থেকে সুরঞ্জন আর কিছুই লিখতে পারেনি। একটা শূন্যতা তাকে গিলে ফেলেছে বলে মনে হয় ওর। মনে হয় এক না শেষ হওয়া কুয়োতে পড়ে যাচ্ছে ও, আর কখনওই নিচের মাটি বা জল ছুঁচ্ছে না ওর পতনশীল দেহ। সেই অন্তহীন পতনে ওর পাতলা হয়ে আসা চুল ওড়ে, শরীর হালকা হয়ে আসে। তবু পতনের পথটা কখনও যেন শেষ হয় না। নিজেকে একটা ফাঁপা পুতলের মতো লাগছে ওর। যেমন প্লাস্টিকের পুতুল বোনের ছোটবেলায় ছিল। হাত-পা-মাথা-গা সব মিলে একসঙ্গে কাস্ট করা। প্লাস্টিকের ওপরে রং বুলিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চোখ-কান-নাক এমনকি হাসিটাও। বেকায়দায় সামান্য চাপ লাগলে যে পুতুল তুবড়ে যায়। অল্প ঘষা লাগলেও যার রং উঠে আসে। গল্পটা নিয়ে সারাদিন নিজের সঙ্গে তর্ক করেছে ও। নানা যুক্তিতে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে সে অন্যায় কিছু করেনি। অমন মিল অনেক পৃথিবী বিখ্যাত গল্পেও আছে। অপরাধবোধে মেলায় কেনা বইটা লুকিয়ে ফেলেছে তাকের পিছন দিকে। নিজের মনের মধ্যে মুখ গুঁজে রেখে নিজের মনের ঝড় থেকে পালাতে চেয়েছে। সুজাতা কথা বললেই খিঁচিয়ে উঠেছে। অফিসে যায়নি চারদিন। ফোন বন্ধ করে, ঘর অন্ধকার করে রেখেছে। জানলা খোলেনি ঘরের। বই মুখে করে বসে থেকেছে। মন দিতে পারেনি। সিগারেট উপচেছে অ্যাশট্রেতে। আবার কখনও পড়ার চেষ্টা করেছে। পড়েছে সিলভিয়া প্লাথ কীভাবে সন্তানকে দুধ আর পাউরুটি দিয়ে রান্না ঘরে ঢুকেছিল। কত যত্নে নিজের মৃত্যু আর সন্তানের জীবনের মাঝের দরজা এয়ারটাইট করেছিল, গ্যাস খুলে মুখে তোয়ালে চাপা দিয়ে মরে যাবার আগে। উসে ঝাঁপ দেওয়ার আগে উলফের কোটের পকেটে কত পাথর ছিল সেই তথ্য খুঁজে পায়নি সুরঞ্জন। মার্চের সে সময়ে আবহাওয়া কেমন ছিল সেটা কি লক্ষ করেছিল ভার্জিনিয়া! রাশিয়ান রুলেটে প্রথম দুবারেও কি মরতে চেয়েছিল মায়াকোভ্‌স্কি! হেমিংওয়ের স্ত্রী কি সত্যি কথা বলেছিল যে বন্দুক পরিষ্কার করতে গিয়েই ফায়ার হয়ে গিয়েছিল! 
পঞ্চম দিন অফিসে গিয়ে জীবনে প্রথম এমন চূড়ান্ত মাতাল হয়ে অনেক রাত্তিরে ফিরেছিল সুরঞ্জন। সুজাতা যখন ওকে ধরে ধরে ঘরে ঢোকাতে গিয়ে অবাক হয়ে মুখের দিকে দেখছিল, তখন কিছুই খেয়াল করার মতো অবস্থায় ছিল না ও। পরের দিন সকালে তীব্র মাথা যন্ত্রণার মধ্যে তাকিয়ে দেখেছিল তিতলি তাকিয়ে আছে ওর দিকে। দরজার আড়াল থেকে। ভিতরে আসছে না। ও ভালো করে চোখ মেলতেই লুকিয়ে পড়ে তিতলি। সুরঞ্জনের মনে হয় এটাই সিলভিয়ার রান্নাঘরের দরজা। ওই পাশে ওর সন্তান আর এই পাশে ওর বিছানাটা যেন গ্যাসের লাইন খুলে দেওয়া একটা বার্নার। চার দিক দিয়ে গ্যাস উঠছে। সিগারেট ধরাতে গিয়ে ভয়ে কেঁপে ওঠে সুরঞ্জন। যেন দেশলাই কাঠিটা ঘষা মাত্র একটা বিরাট অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে ঢুকে যাবে ও। চোখের সামনে নিজেকে ওই আগুনের মধ্যে দেখে চিৎকার করে ওঠে সুরঞ্জন। পাগলের মতো নিজের হাতদুটো গুটিয়ে শরীরের মধ্যে যেন ঢুকিয়ে নিতে চায় ও যেন ওর চারপাশে আগুন জ্বলছে। সুজাতা ছুটে আসে। বিছানায় কুঁকড়ে বসে থাকা সুরঞ্জনকে জড়িয়ে ধরে সুজাতা। ঠকঠক করে কাঁপছে ও। সুজাতার পিছন পিছন তিতলি এসে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। অবাক হয়ে গেছে তিতলি। দেখে বাবা বাচ্চা ছেলের মতো হাউহাউ করে কাঁদছে মায়ের বুকে মাথা রেখে। চোখের জল মোছাতে যখন তিতলির ছোট্ট আঙুল ওর গাল ছুঁলো তখনই যেন কোটের পকেটে পাথর ঢোকানো অবস্থায় ওকে নদীতে ছুঁড়ে দিল কেউ। 
মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছে সুরঞ্জন।
আরও পাঠক, আরও পাঠক। আরও খ্যাতি, আরও জনপ্রিয়তা খুঁজতে গিয়ে ও ভুলেই গিয়েছিল পাঠক শুধু সমকালে থাকে না, এমনকি যারা পড়ে তারাও সবাই পাঠক নন। শেলির প্রথম বই বিক্রি হয়েছিল মাত্র একুশ কপি। যার দুটো আবার কিনেছিল কবি আর তার বান্ধবী। জীবনানন্দের একটা উপন্যাসও তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। সুরঞ্জন বোঝে দৌড়োতে গিয়ে সে বন্ধুদের হারিয়েছে ফেলেছে পথে। ভবভুতি লিখেছিলেন অনাগত কালের পাঠকের জন্য। আজকের জনপ্রিয়তা নয় মহাকালের বিচারই শেষ পর্যন্ত টেঁকে। আর্ট আসলে সমাবেশের বস্তু নয় বরং একা ঘরে বসে নিজের ভিতরে কুয়ো খোঁড়ার মতো একটা আত্মহননের কাজ। নিজের অস্তিত্বের সংকটকে লোকের সামনে ঠিক হাততালির জন্য খুলে দেওয়া হয় না।
গত সাতদিন ধরে দুনিয়ার সঙ্গে ওর কোনও যোগাযোগ ছিল না। তাড়াতাড়ি ফোন নিয়ে সরাসরি আলোকদাকেই একটা ফোন করে সুরঞ্জন। ফোন বেজে যায়। তাড়াহুড়ো করে জামা গলিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে পত্রিকার অফিসে ছোটে ও। দীপায়নদা বলে, আলোকদা একটা মিটিংএ আছে অপেক্ষা করতে হবে। ঘড়ির কাটা ঘুরতে চায় না যেন। চেয়ারের হাতলে হাতদুটো ঘষতে চায় পারে না। যেন খুব ভারি ওর হাতদুটো। যে করেই হোক ওই লেখাটা পাবলিশ হওয়া থেকে আটকাতে হবে। হবেই। 
আলোকদার ঘর থেকে লোকজন বেরতেই প্রায় দৌড়ে ঢোকে সুরঞ্জন। ওকে দেখেই কালো পার্কারের কলমটা বন্ধ করে আলোকদা। কলমটা দুই আঙুলের ফাঁকে নিয়ে ঘোরাতে থাকে। এবার জোর করে নিজের দুটো হাত ঘষতে থাকে সুরঞ্জন। ওর হাত আর প্যারালিটিক নয়। ডান হাত কপালের কাছে তুলে রাশিয়ান রুলেটের তৃতীয় গুলিটার জন্য ট্রিগার টিপল সুরঞ্জন।
‘আলোকদা প্লিজ ওই লেখাটা ছাপতে দেবেন না। ওটা আমি তুলে নিতে চাই।’
কলম ঘুরছে আলোকদার হাতে।
‘তোমার লেখাটা পরশু বেরিয়েছে সুরঞ্জন, আর কালকেই ওটার সম্পর্কে প্লেজারিজমের চিঠি এসেছে দপ্তরে।’ ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে বলেন আলোকদা।
কেঁপে ওঠে সুরঞ্জন। সতেরশো সাঁইত্রিশের কলকাতা সাইক্লোন আবার সুন্দরবনের ওপর দিয়ে উপকূল পেরোয়। সূর্য ওঠার আগে লাতুরের মাটিতে মিশে যায় বাহান্নটা গ্রাম। চীনের হলুদ নদীর বন্যা ফিরে আসে একশো কুড়ি বছর বাদে। কেদারনাথের ওপরে মেঘ-ভাঙা বৃষ্টি নামে আবার। সুমাত্রার নিচে ভারতীয় প্লেটের ওপরে উঠে যায় বার্মা প্লেট। চল্লিশ ফুট উঁচু ঢেউ পৌঁছয় নাগাপত্তনমে। শেষবার কম্বলটা ঢেকে দেয় ওকে। অন্ধকার হয়ে যায় চারপাশ। সুরঞ্জনের সারা গায়ে অন্যের বাক্য বিষ-কুঁড়ির ফুল হয়ে ফুটে ওঠে। বাক্যগুলো ফেটে গিয়ে শব্দ ছড়িয়ে পড়ে ওর সারা গায়ে। চুলকোতে চুলকোতে মরে যাওয়া, ছিঁড়ে যাওয়া, পিষে যাওয়া অন্যের অক্ষর উঠে আসে ওর নখে। অন্ধকারে নিজের রক্ত লেগে থাকা অক্ষরগুলোকে দেখতে পায় না সুরঞ্জন যেমন সে দেখেনি এখনও ফাঁসির দড়ি কেমন দেখতে হয়।

16 thoughts on “কণিষ্ক ভট্টাচার্যের গল্প : কেমিক্যাল লোচা অথবা ফাঁসির দড়ির গল্প

  • August 14, 2018 at 8:53 am
    Permalink

    ভালো লাগল বলা যাবে না। বরং বলি ভয় লাগলো। মুখের সামনে আয়না-তুলে-ধরা-গল্প ।

    Reply
  • August 14, 2018 at 8:58 am
    Permalink

    অনেক ধন্যবা। কী বলি…

    Reply
  • August 14, 2018 at 8:17 pm
    Permalink

    অপূর্ব লিখেছেন। ঋদ্ধ হলাম।

    Reply
    • August 24, 2018 at 6:15 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবা।

      Reply
  • August 15, 2018 at 11:24 am
    Permalink

    গল্পটি আমার দম বন্ধ করে দিয়েছিল। মনে দাগ রেখে গেছে।

    Reply
    • August 24, 2018 at 6:17 pm
      Permalink

      অমরদা তুমি পড়ে মতামত দিয়েছ এটা আমার কাছে প্রাপ্তি। বাকিটা পুরস্কার।

      Reply
  • August 15, 2018 at 1:41 pm
    Permalink

    বাপ রে! এক নিঃশ্বাসে পড়লাম। বুবুন চট্টোপাধ্যা।

    Reply
    • August 24, 2018 at 6:18 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ, বুবুন। কৃতজ্ঞতা।

      Reply
  • August 16, 2018 at 6:19 am
    Permalink

    ভালো লাগলো। কখনও দেখা হলে আরও কথা হবে…

    Reply
    • August 24, 2018 at 6:19 pm
      Permalink

      আহা, অপেক্ষায় থাকলাম শিবাংশুদা।

      Reply
  • August 18, 2018 at 10:39 am
    Permalink

    এমন সাফোকেশন না দিতে পারলে লেখক জীবন ব্যর্থ।

    Reply
    • August 24, 2018 at 6:19 pm
      Permalink

      অহো। কৃতজ্ঞতা।

      Reply
  • September 28, 2018 at 6:09 pm
    Permalink

    এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    Reply
  • September 28, 2018 at 6:10 pm
    Permalink

    কথা আছে,বলবো,মুখোমুখি

    Reply
  • July 4, 2019 at 11:58 am
    Permalink

    বেশ। কবে?

    Reply
  • August 27, 2020 at 8:01 am
    Permalink

    ভাল গল্প। অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশের জন্যে অনেকগুলি পরিসর চয়ন করতে হয়েছে। জার্নিই। বেশ ভাল লাগল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *