স্মৃতি ভদ্রের গল্পঃ প্যারিস রোড

আজ সকালেই কনফার্মেশন ইমেইলটি এলো। দায়িত্ব নিয়েছিলো অনেক পুরোনো এক বন্ধু। তবে মাঝখানে অনেক বছর যোগাযোগ ছিল না ওর সাথে। 
শুধু ও নয়, বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বন্ধুর সাথে যোগাযোগ ছিল না আমার এতদিন। কেন যোগাযোগ ছিল না তার অবশ্য নির্দিষ্ট কারণ নেই। কখনো ব্যস্ততায় আবার কখনো ইচ্ছাকৃত। 
আসলে এম,এ পরীক্ষা শেষ হবার সাথে সাথেই একটার পর একটা এমন ঘটনা ঘটতে লাগলো যে আমি সবকিছুতেই খেই হারিয়ে ফেললাম। আর একইসাথে হারিয়ে ফেললাম আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়ের মানুষগুলোকে। 
রোশন আরা, এই বন্ধুটি এতবছর বাদে আমাকে ঠিক খুঁজে নিয়েছে। আমাদের ডিপার্টমেন্ট পঞ্চাশ বছরপূর্তিতে মহা আড়ম্বরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সেখানে ডিপার্টমেন্টের নতুন পুরাতন অনেক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে। সেখানে ডিপার্টমেন্টের যে সব প্রাক্তন শিক্ষার্থী সমাজে বিশেষ অবদান রাখছে তাদেরও সম্মামনা দেওয়া হবে। রোশন আরা কোথা থেকে যেন জানতে পেরেছে আমি গাজিপুরে একটি নৈশ বিদ্যালয়ে নিয়মিত ডোনেট করি, যেখানে গার্মেন্টস-এ কর্মরত মেয়েরা বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ পায়। 
আমার বোনের কাছ থেকে ইমেইল এড্রেস নিয়ে রোশন আরা প্রথম ইমেইলে আমাকে নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস দেখাতেই, আমি বলে দিয়েছিলাম, ‘ রোশন, আমি তেমন কিছুই করিনি। শুধু শুধু আমাকে কেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মাননা দেবে?’ 
রোশন আরার সেই একই কথা, ‘তুমি কত ভাল কাজ করছো তুমি জানো না, তুমি মেয়েদেরকে আলোর পথে আনছো হোক তা গুটিকয়েক, তবুও তো মহান কাজ করছো। তোমাকে নিয়ে গর্ব হয়।’ 
রোশন আরার এই উচ্ছ্বাসে আমার কেন যেন জল ঢালতে ইচ্ছে হয় না। আমি সেই অনুষ্ঠানে নাম রেজিস্ট্রেশন করার সিদ্ধান্ত নেই। তবে এর কারণ অবশ্যই সম্মাননা নয়। 
আমি রেজিস্ট্রেশনের কনফার্মেশন ইমেইল পেয়েই অনলাইনে এয়ার টিকেট বুক করে ফেলেছি। দু’দিন পরেই ফ্লাইট। দেশে ফিরবো প্রায় বছর পাঁচেক পরে। 
অফিসে অ্যানুয়াল লিভের জন্য অনলাইনে ফর্ম পূরণ করে সাবমিট করেই ল্যাপটপ বন্ধ করে দিলাম। আমার অনেক ছুটি জমে আছে। এটা এপ্রুভ হবে, তা প্রায় নিশ্চিত। 
সত্যি বলতে, ফুরফুরে একটি অনুভূতি এনে দিয়েছে রোশন আরার ইমেইল টি। আমি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবো না করবো না করে প্রায় দিন দশেক নষ্ট করেছি। এরমধ্যে রেজিস্ট্রেশনের শেষ সময় পেরিয়ে গিয়েছিলো। রোশন আরা নিজে ডিপার্টমেন্টে গিয়ে চেয়ারম্যান স্যারকে অনুরোধ করে রেজিস্ট্রেশনের টাকা জমা দিয়ে এসেছিলো। তাই কনফার্মেশন মেইল না পাওয়া অবধি একটা অস্বস্তি হচ্ছিলো। 
ল্যাপটপ আমার রাইটিং ডেস্কে রেখে চলে আসি ওয়্যারড্রোভের কাছে। প্রথম ড্রয়ার টেনে অসংখ্য প্রয়োজনীয় কাগজের স্তূপ সরিয়ে বের করে আনি একটি লাল ডায়েরী। 
যখনই পেতেছ হাত দিয়েছি উপুড় করে প্রাণ 
তবু আমি একা। 
তবুও আমার কেউ নও তুমি 
আমিও তোমার কেউ নই। 
আমাদের অভ্যন্তরে স্রোতস্বিনী আছে, সেতু নেই। ( পূণেন্দু পত্রী) 

ডায়েরীর ভেতরের ভাজে ডাঁই করা শুকনো পাতাগুলো ঝুরঝুর করে পড়ে যায়, হাতে নিতেই। 
বিবর্ণ পাতাগুলো দেখে এখন হাসি পায় আমার। অথচ একসময় এই পাতাগুলোই কত না অলস দুপুর, বৃষ্টিধোয়া জারুলের পথ, অভিমানের শীর্ণ প্যারিস রোড। 
গল্পটি শুরু হয়েছিলো প্রথম বর্ষের ক্লাশ শুরুর প্রথম দিনেই। ক্লাশ শেষে নোট নিয়ে যখন অন্য সবার সাথে আমি মনযোগী ছাত্রীর মতো আলোচনায় ব্যস্ত ছিলাম ঠিক তখন পাশ থেকে কেউ বলে উঠেছিলো, “প্লেটোর ভাববাদী যুক্তিগুলো আরোও পরিস্কার করে বুঝতে চাইলে কার্ল মার্কস পড়া উচিত।’ 
পাশে দাঁড়ানো আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ছেলেটিকে দেখে সেদিন একবারের জন্যও মনে হয়নি, ক্যাম্পাসের আগামী দিনগুলো আমাকে ভাগাভাগি করে নিতে এই ছেলেটির সাথে। 
সে বয়সের উৎসুক চরিত্র বরং এক্ষেত্রে উলটো খাতে বয়েছিলো। এরপরের ক’দিন ক্লাশে তার উপস্থিতি আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। তারচেয়ে হলের মেয়ে বন্ধুদের সাথে ক্লাশ লেকচারের একঘেয়েমি কাটাতে নোট খাতায় কাটাকুটি খেলতে বেশী আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। আর আগ্রহ ছিল ক্লাশ শেষে দলবেঁধে হলে ফেরার পথে নানারকম জংলি ফুল আবিষ্কার করা। 
আর এই আবিষ্কারে আমাকে বিনা দ্বিধায় সহায়তা করতো রোশন আরা। 
তবে সবদিনই যে টু ডু লিস্টে টিক দেবার মতো গোছানো হতো তা নয়। সে দিনটিও ব্যতিক্রম ছিল। শ্রাবণের দিনটি আচরণ বা বৈশিষ্ট্যে খুব স্বাভাবিকই ছিল। ক্লাশ শেষে আমাদের দলবেঁধে হলে ফেরার কথাও ঠিক ছিল। কিন্তু সেদিন রোশন আরাসহ আরোও দুই বন্ধু আমাকে ক্লাশ শেষে মমতাজউদ্দিন কলাভবনের নীচে অপেক্ষা করতে বলে, শেষ ক্লাসের আগেই জরুরী কাজে বেরিয়ে গেলো। 
আমি আগেই বলেছিলাম শ্রাবণের দিনটি বৈশিষ্ট্যে খুব স্বাভাবিক ছিল। সকাল থেকেই ঝিরঝির বৃষ্টি দুপুরের পরই ঝমঝম হয়ে গেলো। 
মমতাজউদ্দিন কলাভবনের নীচের জটলা আস্তে আস্তে কমেও এলো সে বৃষ্টি উপেক্ষা করে। আমি তখনো রোশন আরাদের অপেক্ষায়। সেদিন যেন আকাশে অনেকদিনের কান্নাগোঁজা মেঘ জমা হয়েছিলো। বৃষ্টির তোড় বেড়ে চারপাশ প্রায় আবছা হয়ে আসছিলো। ততক্ষণে কলভাবনের নীচটা প্রায় ফাঁকা। গেটের সামনের রিক্সাগুলোও কোনো যাদুর মন্ত্রে নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে গেলো। 
নিজের বোকামি আর অসহায়তার জন্য কান্না যখন গলার কাছে ঘোট পাকাচ্ছে ঠিক তখনই পাশ থেকে ভেসে এলো, 
‘ আটকা পড়েছেন বৃষ্টিতে? সমস্যা নেই মিনিট দ’শেক অপেক্ষা করি, বৃষ্টি না কমলে আমি এগিয়ে দেবো আপনাকে হলে।’ 
একটু থেমে আমাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই আবার বলা শুরু করলো, 
‘ আমরা তো ক্লাসমেট, তবুও আপনার অনুমতি ছাড়া ‘তুমি’ বলতে অস্বস্তি হয়।’ 
তবে এই অস্বস্তি খুব তাড়াতাড়ি উধাও হয়ে আমরা ‘তুই’ তে পৌঁছে যাবো, তা তখনো আমার অজানা। 
সেদিন বৃষ্টি আর কমেনি। আমাকে নিজের ছাতাটি দিয়ে ভিজে ভিজে হলগেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বলেছিলো, ‘ আমার নাম জামিল রহমান। আর হ্যাঁ, ধন্যবাদ দেবার প্রয়োজন নেই।’ 
না, আমি সেদিন ধন্যবাদ শব্দটি উচ্চারণ করতে পারিনি, তবে মনের ভেতর মানুষটির প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন সম্মানের জায়গা তৈরী হয়ে গেলো। 
এরপরের দিনগুলোয় সেই আপনি থেকে সটান তুইতে নামার গল্প। সেই সময়ের কোনো প্রহরেই ‘তুমি’ শব্দটি কিন্তু জায়গা করতে পারেনি। 
ক্লাসশেষে নোট নিয়ে আলোচনা হোক বা উদিচির নতুন নাটক নিয়ে আলোচনা, 
‘ আপনার সার্ত্রে’র দর্শন একবার মন দিয়ে পড়া উচিত কিংবা উদীচীর ‘রাজাকারের পাঁচালী’ নাটকটি ধরতে হলে তোকে একাত্তর আরেকবার রিভিউ করতে হবে মনের ভেতর।’ 
আপনি, তুই-এর বাউন্ডারি পেরিয়ে আমাদের আলোচনার সময়টুকু দখল করে নিতো শুধুই ইতিহাস, দর্শন আর দেশ। আর সেসব আলোচনার ফাঁক ফোঁকর গলিয়ে মুগ্ধতার আভাস উঁকি দিতে লাগলো আমার ভেতর, জামিলের উদার মন ও জ্ঞানের প্রতি। 
আটপৌরে আমি তখন শুধু কবিতা বলতে পুর্ণেন্দু পত্রীকে বুঝি। এক ভর দুপুরে ফাঁকা ইবলিশ চত্বরে দাঁড়িয়ে জামিলের গমগম কন্ঠ আমাকে চিনিয়েছিলো নবারুণ ভট্টাচার্যকে: 
কিছু একটা পুড়ছে, গনগন করছে 
চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে 
ঝড় যদি ওঠে তাহলে কিন্তু দপ করে জ্বলে উঠবে 
কিছু একটা পুড়ছে বলছি 
দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য 
কিছু একটা পুড়ছে 
প্রকাশ্যে, চোখের ওপর 
মানুষের মধ্যে 
স্বদেশ!( নবারুণ ভট্টাচার্য) 
স্বদেশ, সমাজ আর সময় নিয়ে জামিলের ভাবনাগুলো একটু একটু করে জায়গা করে নিলো আমার ভেতরেও। বা বলা যায়, জামিলই যেন চাইলো আমাকে এক নতুন চিন্তার জগত উপহার দিতে। 
আর আমিও আমার না জানার ব্ল্যাংক জায়গাগুলো নির্দ্বিধায় তুলে দিলাম ওর হাতে, তা পূরণ করতে। 
শুধু নি:স্তব্ধ ফাঁকা দুপুর নয়, এমনকি হৈ হট্টগোলের পশ্চিমপাড়ার বিকেলও নয়, জামিল তার ভাবনা দিয়ে রাতগুলোও আমার কেড়ে নিতে লাগলো। প্রতিদিন একটি করে সাদা খাম বিকেলের আড্ডা শেষে হলে ফেরার আগে আমায় দিয়ে বলতো, রাতে ঘুমাতে যাবার আগে পড়িস। 
আমিও বাধ্য মেয়ের মতো সবকাজ শেষে হলরুমের মূল আলো নিভে গেলে, আলগোছে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে খুলতাম সে খাম। 
কয়েকপাতা জুড়ে শব্দের স্তূপ থেকে আমি উদ্ধার করতাম আরজ আলি মাতুব্বর, সার্ত্রে আর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে। আর তার মাঝে বড়জোর দু’লাইনে আমি থাকতাম। 
‘ ঝুমুর, তোকে বুঝতে হবে দেশ কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নয় , তা হলো অমূর্ত ভাবনা। আর একটি ভূখণ্ড তখনই স্বদেশ হয় যখন আমরা সেই অমূর্ত ভাবনাকে ভূখন্ডের প্রতিটি ইঞ্চির সাথে মিলিয়ে নিতে পারি। আমার আর তোর যুদ্ধ কিন্তু সেই একই।’ 
এতদিনে আমি সত্যিই জামিলের যুদ্ধটা আপন করে নিয়েছি কিন্তু একইসাথে আমার ভেতরে বেজে উঠেছে অন্য আরেকটি যুদ্ধের দামামাও। 
ওহ্, আমার নামটিই তো বলা হয়নি। আমি ঝুমুর দাস। 
জামিল চমৎকার আঁকতেও পারতো। ওর এই গুণের সাথে পরিচয় হতে অবশ্য বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিলো আমার। একবার বৈশাখের প্রথম দিনে একটি লাল খাদি কাপড়ের মলাট লাগানো ডায়েরি আমাকে দিয়ে বলেছিলো, 
‘ শোন, বৈশাখের প্রথম দিন ব্যবসায়ীরা নতুন হিসেবের খাতা খোলে। আজ আমি তোকে এমনই একটি খাতা দিলাম। তুই লিখবি এই দেশ, এই সময় নিয়ে, তোর ভাবনা, তোর স্বপ্ন নিয়ে। দেখিস, এই খাতাই কখনো সময়ের দলিল হয়ে উঠবে।’ 
না, আমি সেদিন জামিলের এসব ভারী ভারী কথার গুরুত্ব দেইনি। ডায়েরিটা হাতে নিয়েই পাতা উলটে আমি দেখেছিলাম অদ্ভুত সুন্দর এক চিত্রকর্ম, পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির চুল আকাশে মেঘের ঢল নামিয়েছে। 
কিন্তু,আমি কখনই আকাশের মতো বিশাল ভাবনা বা স্বপ্নের কথা সে ডায়েরিতে লিখতে পারিনি। 
তবে লিখতাম ছোট ছোট অনুভূতির কথা, উপায়হীন ভাল লাগার কথা। আর সেসব লেখার প্রতিটি শব্দ কেন যেন সবমসময় জামিলের অবয়ব ফুটিয়ে তুলতো, আমার শত সাবধানতা সত্বেও। 
সাবধান আমাকে থাকতে হতোই, তবুও কোন কোন সময় আবেগের অতিশয্য আমাকে অসাবধান করে তুলতো। তেমনই কোনো এক মুহূর্তে রোশন আরা প্রশ্ন করেছিলো আমাকে, 
‘ তুই জামিলের প্রতি নির্ভর হয়ে পড়ছিস কিন্তু। নিজেদের অসামঞ্জস্য বুঝিস নিশ্চয়।’ 
ভ্যাবাচ্যাকা আমি কিছুটা তোতলিয়ে উত্তর দিয়েছিলাম, 
‘ বন্ধুত্বেও সামঞ্জস্য খোঁজে নাকি কেউ?’ 
এর উত্তর রোশন আরা দেয়নি। শুধু আমার ঘাড়ে দু’হাতে রেখে ছোট্ট করে বলেছিলো, 
‘ পথটা কঠিন।’ 
আমি জানি না রোশন আরা কোন কঠিন পথের কথা বলেছিলো। 
আমি আর জামিল যে পথের পথিক ছিলাম সেখানে নবারুণের কবিতা ছিল, উদীচীর নাটক ছিল, সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ ছিল আর স্বদেশের জন্য মিছিল। 
সে পথে আমরা দু’জন নির্বিঘ্নে হেঁটে গেছি। শুধু আমার ভেতরে গজিয়ে ওঠা ভাললাগার বিন্দু বিঃসর্গ অপাংক্তেয় ছিল সে পথে। 
আমার স্মৃতিরা বড় উচ্ছৃঙ্খল, 
দমকা হাওয়া যেন 
লুকোচুরি, ভাঙাভাঙি, 
ওলোটপালটে মহাখুশি 
দুঃখেরও দুপুরে গায়, 
গাইতে পারে, আনন্দ-ভৈরবী । (পূর্ণেন্দু পত্রী) 
আজ অনেকদিন পর আমি লাল ডায়েরির পাতা উল্টালাম। লেখাগুলো অনেক পুরোনো, তাই কিছুটা লালচে হয়ে গেছে। 
৭ই জুন ১৯৯২ 
আজ বিকেলে কলাভবনের পাশের রাস্তাজুড়ে পড়েছিলো অসংখ্য জারুল ফুল। দুপুরের দিকে একটু হাওয়া ছেড়েছিলো। তাতেই ফুলগুলো গাছ ছেড়ে পথকে বেছে নিয়েছে। আমি আর জামিল ছড়িয়ে থাকা জারুল ফুলগুলো বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে হাঁটছিলাম। আর জামিল গুনগুন করছিলো, ‘এলে অবেলায় পথিক বেভুল, বিধিছে কাঁটা নাহি পাবে ফুল।’ 
আমি ওর সাথে গলা মিলিয়ে গানের স্থায়ী ধরবো, তখনি গান থামিয়ে জামিল বললো– ‘ঝুমুর দেখ, আরজ আলী মাতুব্বর জ্ঞানের জন্য সীমানা অতিক্রমের কথা বলেছেন। সীমাবদ্ধ পরিমন্ডলের সীমানা। চিন্তাভাবনায় কখনো আবদ্ধতা আনতে নেই।’ 
সত্যি বলতে এত গভীর করে ভাবতে আমি পারি না। তবে আমার সামনে যখন জামিল তুই থাকিস, তখন নিজেকে অতিক্রমের সকল সাহস এসে জড়ো হয় আমার মাঝে। 
২রা জুলাই, ১৯৯২ 
আজ অনেকদিন পর আমি আর জামিল প্যারিস রোডে হাঁটছিলাম। সামনেই ইয়ার ফাইনাল। তাই বিকেলে এখন কম বের হওয়া হয়। আজও বের হবার কথা ছিল না। হঠাতই কল এলো জামিলের। একটি গাছের পাতায় আমার নাম আর রুম নম্বর লিখে কল পাঠিয়েছে এক সিনিয়র আপাকে দিয়ে। 
কলের প্রতিউত্তরে দিতেই আপাটি একগাল হেসে বললেন, তোমার বন্ধুটির কাগজের অভাব। পাতায় তোমার নাম লিখে পাঠিয়েছে। হঠাৎ কী মনে হলো পাতাটি চেয়ে নিয়ে এই ডায়েরির ভেতর রেখে দিলাম। 
জামিল, তোর এসব অভিনব কাজ আমার কাছে আকুলতা কেন মনে হয়? 
১৮ই আগষ্ট, ১৯৯২ 
ইয়ার ফাইনাল একদম দোড়গোরায়। আজ লাইব্রেরির বারান্দায় সবাই মিলে বসেছিলাম লজিক্যাল ফ্যালাসি নিয়ে আলোচনা করতে। সংশয়বাদীদের ‘কে সৃষ্টি করেছে ঈশ্বরকে’ এই প্রশ্নের আলোচনার মাঝখানেই হঠাত জামিল তুই বলা শুরু করলি, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নয়, আমার জানতে ইচ্ছে মানুষের অস্তিত্ববাদকে। এই যে আমরা, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি আমরা নির্ধারণ করি নাকি ঈশ্বর? 
জামিল, আমার কেন মনে হয় জীবন নিয়ে আমাদের প্রশ্নগুলি এক, ভাবনার জায়গাগুলিও এক। কতটা এক হলে একাত্ম হওয়া যায় জামিল? 
১১ই সেপ্টেম্বর ১৯৯২ 
পরীক্ষা শেষ। আগামীকাল বাড়ি যাচ্ছি, দু’মাসের ছুটিতে। আজ দুপুরের পর পরীক্ষা শেষে রোকেয়া হলের পাশে পুকুরপাড়ে বসেছিলাম আমি আর জামিল। তেমন কিছু কথা হচ্ছিলো না। আসলে আমাদের বলার জায়গা তো ওই সময়, স্বদেশ, সমাজ। আজ সেসব নিয়েও কোনো কথা হচ্ছিলো না। জামিল তুই আজ অনেকদিন পর বাঁশিতে সুর তুলেছিলি, ‘খুঁজি তারে আসমান জমিন, আমারে চিনি না আমি।’ 
জামিল, তোর সুরের হাহাকারে কেন আমার যন্ত্রণা মিশে যায়? 
আমি লাল ডায়েরিটা পড়া বন্ধ করে লাগেজে রাখি। 
রোশন আরাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কে কে থাকছে ডিপার্টমেন্টের পঞ্চাশ বছরপূর্তির এই অনুষ্ঠানে। অনেক নামের ভিড়ে প্রফেসর জামিল হোসেনের নামটিও আছে। 
জামিল ডিপার্টমেন্টে যোগ দিয়েছে এটা আমার জানা ছিল না। 
বলা যায়, ক্যাম্পাস ছাড়ার পর নানাকারণেই জামিলের সাথে জানাশোনা কমে এসেছিলো আমার। প্রথমে মায়ের মৃত্যূ, এরপর বাবার পক্ষাঘাতে ছোট বোনগুলোর এমনকি পুরো সংসারের দায়িত্ব চলে আসে আমার উপর। 
এত দায়িত্বের মাঝেও আমি জামিলের প্রতি দায়িত্ব এড়াতে পারিনি। আমাদের যোগাযোগ হতো চিঠিতে। 
শেষ চিঠি জামিলেরই দেওয়া ছিল। 
ঝুমুর, 
জানিস, দাদার পুরাতন বাড়ির পুরো জায়গাটা একটা মেয়েদের স্কুলের জন্য দান করেছি। সেখানে মেয়েরা বিনাবেতনে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়বে। আমি স্কুল কমিটির সেক্রেটারি। শোন, যখন আসবি তখন কিন্তু এই স্কুলে তোকে জয়েন করতে হবে। আমাদের স্বপ্নগুলো এদের মাঝে ছড়াতে হবে। 
স্বপ্নের ভাগীদার বাড়াতে হবে, বুঝলি? 
তুই আসবি তো, ঝুমুর ? 
–জামিল 
আমার বোনদের ভবিষ্যৎ তখন নির্বিঘ্ন করতে আমি স্বার্থপরের মতো নিরুত্তর থেকে গেছি এই চিঠির। 
আর এই নিরুত্তরে আস্তে আস্তে অজানা হয়ে গেছে জামিল। 
তবে ডিপার্টম্যান্টের এই অনুষ্ঠানে জামিল থাকবে, এটাই বলা যায় বড় একটি কারণ আমার দেশে ফেরার। 
বোনেদের বিয়ে হয়ে যাবার পরপরই সুযোগ হয়েছিলো আমার প্রবাসে আসার, অফিসের কাজের সুত্রেই। এরপর এইচ ওয়ান বি ভিসার ক্যাটাগরিতে ইমিগ্রেন্ট হয়ে গিয়েছিলাম আর কোনো পিছুটান না থাকায়। 
না, এখানে মনে হয় একটু ভুল ছিল। সময়ের কারণে জামিল আমার কাছে অস্পষ্ট হয়ে গেলেও ওর দেখানো স্বপ্ন ঠিকই আঁকড়ে রেখেছিলাম আমি। এজন্যই নৈশ বিদ্যালয়ে মেয়েগুলোর শিক্ষার খরচ দেবার অনুরোধ পেতেই এক মুহূর্ত ভাবিনি সিদ্ধান্ত নিতে। 
ধ্রুব, কূট, নিশ্চিত শ্রাবণে 
তোমাকে সহজ কোনো আলে আলে নিয়ে যায়, যখন সহসা 
দুধারে চঞ্চল স্রোত, জল, নদী, কম্পিত ডাহুক, 
একটি মুহূর্তে শুধু তুলে নেয় প্রতিচ্ছবি, তোমার ভঙ্গিমা— 
আবার সহজে ভাঙে— যেন খেলা কেবলই মেঘের (উৎপল বসু) 
দেশে ফিরেই খুব অল্পদিন বোনেদের সাথে কাটিয়েই আমি পৌঁছে গেছি রাজশাহী। এরমধ্যে রোশন আরার সাথে যোগাযোগ হয়েছে শুধু। 
জামিলসহ অনান্য আরোও বন্ধুর কন্ট্যাক নম্বর আমাকে দিয়েছে রোশন আরা। তবে আমি ইচ্ছে করেই যোগাযোগ করিনি। আমি অধীর হয়ে অপেক্ষায় আছি সেইদিনটির যেদিন প্রফেসর জামিল হোসেন আর সমাজসেবায় বিশেষ অবদান রাখা ঝুমুর দাস মুখোমুখি হবে। 
আমাকে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে রাজি করানোর সময় রোশন আরা আলগোছে বলেছিল, জানিস ঝুমুর জামিল সারাজীবন একাই থেকে গেলো। 
রোশন আরার এই কথার উত্তরে আমি শুধু কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ ছিলাম। 
তাহলে প্রায় আটাশ বছর পর মমতাজউদ্দিন কলাভবনের নীচে সেই জারুলের ছায়ায় আবার জাগবে স্বদেশের স্বপ্ন, আরজ আলী মাতুব্বর। 
প্রবল উত্তেজনায় দু’টো দিন কাটল আমার। 
অনুষ্ঠানের দিন সময়ের একটু আগেই তৈরী হয়ে সেই লাল ডায়েরি নিয়ে আমি পৌঁছে গেলাম কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে। 
বিশেষ কারণেই সামনের সারিতে আমার বসার জায়গা নির্ধারিত। আমার পেছনের সারিতে রোশন আরা। 
আমি বারবার ঘাড় ঘুড়িয়ে দরজার দিকে তাকাই। 
রোশন আরা আমার অস্থিরতা আঁচ করতে পারে। আমাকে ফিসফিসিয়ে বলে, টিচারেরা ভিসি স্যারের সাথে আসবে। 
আমি মাথা নেড়ে বুঝতে পারার ভঙ্গি করে ব্যাগ থেকে লাল ডায়েরিটা বের করি। জামিলের শেষ চিঠিটার উত্তর দিতে আমার আটাশ বছর লেগে গেলো। 
ডায়েরির লাল মলাটে হাত রেখে কিছু একটা ভাবতে যাবো, তখনি ঘোষণা এলো মাননীয় ভিসি স্যারের আগমনের। 
পুরো অডিটোরিয়াম করতালিতে ভরে গেলেও শব্দ এড়িয়ে আমার সময় থমকে গেলো। 
অচেনা অনেকগুলো মানুষের ভিড়ে খুব ধীরে পা ফেলে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জামিল। 
আচ্ছা, জামিলের সেই ঋজুভাব একটু কী শিথিল হয়েছে? নাকি সেসব বয়সের জন্য? 
ভাবনা গুলো আমার কাছে খুব একটা পাত্তা পায় না। আমি শুধু অপলক তাকিয়ে আছি প্রফেসর জামিল হোসেনের দিকে। 
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বক্তব্য। অনেকেই বলছেন। তবে আমি শুধু অপেক্ষায় আছি জামিলকে শোনার। আটাশ বছর পর আবার আমি জামিলকে শুনবো। 
আস্তে আস্তে হেঁটে জামিল ডায়াসে গিয়ে দাঁড়ালো। 
জামিল বলছে, 
‘ আসসালামু আলাইকুম। 
দর্শন বিভাগের এই পঞ্চাশ বছরপূর্তিতে রাব্বুল আলামীন আল্লাহ্কে শুকরিয়া জানাই। প্রাক্তন ও নতুন সকল শিক্ষককে সালাম। 
আজ এখানে নতুন পুরাতন সকল শিক্ষার্থী এক হয়েছি দর্শন সপ্তাহ উৎযাপনের জন্য। তবে শুধু উৎযাপন করলেই হবে না, দর্শনের মূল বক্তব্য প্রচারও করতে হবে। দর্শনকে নিয়ে পৃথিবীব্যাপি অনেক ভূল ধারণা আছে। দর্শনকে ধর্মের অন্তরায় বলা হয়। এই ভুল ধারণার অবসান করাতে হবে। দর্শন আর ধর্মকে একই সূত্রে নিয়ে আসতে হবে, তবেই আমরা একটি সুশৃঙ্খল দেশ বা পৃথিবী পাবো।’ 
আবারো অডিটোরিয়ামে করতালির আওয়াজ। 
আমি তখনো নিস্পলক তাকিয়ে আছি প্রফেসর জামিল হোসেনের দিকে। 
একে একে গান, নাচ আর সম্মাননা প্রদানের সাথে শেষ হলো অনুষ্ঠান। আমিও পেলাম সম্মাননা। এরপর একটি র‍্যালি শেষে আমরা এসে দাঁড়ালাম মমতাজউদ্দিন কলাভবনের নীচে। সেই ভিড়ে অবশ্য জামিল কোথায় মিশে আছে আমার জানা নেই। 
দেশের গরম আর ভিড় ভাট্টায় অসহিষ্ণু আমি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রায় নিঃশ্চুপে প্যারিস রোডের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। 
তখনি পেছন থেকে ডাকটি এলো, 
‘ ঝুমুর ‘ 
এত বছর পরেও আমি এই ডাক অগাহ্য করা শিখিনি। 
আমি দাঁড়ালাম। পাশে এসে দাঁড়ালো প্রফেসর জামিল হোসেন। 
‘ তুই আমাকে চিনতে পারিসনি? 
আমি সত্যি উত্তরটা অস্বীকার করে বললাম, 
‘ হ্যাঁ’ 
এরপর শুধুই প্রফেসর জামিল হোসেন বলে গেলো। 
তার বিভিন্ন আর্টিকেলের কথা, যেখানে বলেছে ধর্ম আর দর্শনকে কীভাবে একইসূত্রে আনা যায়। বলে গেলো, ইবনে রুশদ্ আর ইমাম গাজ্জালির দর্শনকে আলাদা একাডেমিক কোর্স করার ভাবনার কথা। 
কথায় কথায় জামিল জানালো, আগামী বছর ভিসি নির্বাচনে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো তালিকায় তার নাম রেখেছে হলুদ দল। 
আমি গগনশিরিষের তলায় যেতে শুনতে থাকি প্রফেসর জামিল হোসেনের কথা। সেখানে সার্ত্রে নেই, আরজ আলী মাতুব্বর নেই। 
আমি লাল ডায়েরিটা আস্তে আস্তে আড়াল করে ফেলি। আমি জানি, এই ডায়েরিতে আর কখনো নতুন শব্দ যুক্ত হবে না। 
প্যারিস রোডে হাঁটতে হাঁটতে প্রফেসর জামিল হোসেনের শব্দ বাতাস কেটে আমার কাছে আসার আগেই হারিয়ে যেতে থাকে। আমার পাশে একটু কুঁজো হয়ে হাঁটতে থাকা প্রফেসর জামিল হোসেনও আস্তে আস্তে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠলো। 
আমি আটাশ বছর আগের জামিলকে খুঁজতে থাকি প্যারিস রোডে। 
আমি বিড়বিড় করে বলে উঠি, 
কিছু একটা পুড়ছে, গনগন করছে 
চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে 
ঝড় যদি ওঠে তাহলে কিন্তু দপ করে জ্বলে উঠবে 
কিছু একটা পুড়ছে বলছি 
দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য 
কিছু একটা পুড়ছে 
প্রকাশ্যে, চোখের ওপর 
মানুষের মধ্যে 

স্বদেশ!( নবারুণ ভট্টাচার্য) 
********************************************************************************* 
লেখকঃ স্মৃতি ভদ্র 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *