বই নিয়ে আলোচনা ঃঃ সাগুফতা শারমীন তানিয়ার– অলসদিন-খয়েরিপাতা-বাওকুড়ানি

সাদিয়া সুলতানা

নিতান্ত ঘাড় গুঁজে নিস্পৃহভাবে টেনে চলা জীবনের গল্প নতুবা উদোম আকাশের ক্ষয়িষ্ণু মেঘের মতো বিষণ্ন জীবনের গল্পগুলো কতভাবেই না বলা হয়েছে তবু একই স্লেট ঘষেমুছে রোজ নতুন করে লেখা হচ্ছে সেই জীবনের বহুরৈখিক গল্প।
জেসমীন আর ঋকের জীবনের সেই গল্পগুলোই বাওকুড়ানি হাওয়ায় উড়ে এসেছে সাগুফতা শারমিন তানিয়ার “অলসদিন-খয়েরিপাতা-বাওকুড়ানি” উপন্যাসের পাতায় পাতায়। 
বইটি হাতে আসামাত্র কোলাহলে মশগুল করোটির মধ্য থেকে একটি বাক্য উঁকি দিয়েছিল, “জীবন হলো রং দিয়ে মোড়ানো নীরস বিষণ্ন এক বিষয়।” ম্যাক্সিম গোর্কির “পাঠক” গল্পের এই আপাত নীরস বাক্যটি মনে হওয়ার পেছনের কারণ হয়তো বইটির নাম। “অলসদিন-খয়েরিপাতা-বাওকুড়ানি” নামটি পড়ে প্রথমেই চোখের সামনে একটি দৃশ্যপট ভেসে উঠেছে; এক অলসদিনে শুকনো খয়েরিরঙা পাতার মতো বিষণ্নতায় নিমগ্ন কেউ একজন চুপচাপ কুড়িয়ে নিচ্ছে স্মৃতির ঝরাপাতা। 
বইটি যখন পড়ছি তখন শীতের পাতাঝরা বিষণ্ন সময় আর আমি নির্জন ঘরে বিষণ্নতা পুষে চলছি। বাতাসের অদেখা সরোবরে ভাসতে ভাসতে কখন যে বইটির ভেতরে ঢুকে পড়েছি, টের পাইনি। প্রবাসী জেসমীনের কোনো এক ছুটির দিনে পত্রিকার অ্যাগোনি আন্টের কলাম পাঠের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের শুরু, “আপনি লিখেছেন আপনি নেহাত সততা এবং গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পর্কগুলি বজায় রাখেন। শুরুটা স্বাভাবিক হলেও পরবর্তীতে আপনার প্রতি প্রাথমিক টানটা কারোর থাকেনা…অথচ মানবসম্পর্কগুলির বাইরে আপনি কর্মজীবনে কৃতী এবং নিষ্ঠাবান…।” 
কর্মজীবী জেসমীনকে কর্মব্যস্ত সপ্তাহের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে যাতায়াতের ক্লান্তি ঘিরে থাকে। ছুটির দিনের একটি নরম সকালে ক্লান্ত জেসমীনের সাথে ওর সিঁড়িবারান্দার থোকা থোকা ফুলের নাশপাতিগাছ, কাঠপায়রার দোল দেখতে দেখতে গল্পের ভেতরে ঢুকতে শুরু করি। 
বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে তৃতীয় পুরুষে জেসমীনের কথা আর ঋকের স্বগোতক্তির মাধ্যমে কাহিনী বিস্তৃত হয়েছে। জাদুমাখা শব্দ-উপমায় লেখা এই উপন্যাসের কাহিনী কোনো নির্দিষ্ট ছক বেঁধে এগোয়নি। অযাচিত বর্ণনা কিংবা ঘটনার বাহুল্যে অহেতুক বইয়ের কলেবর বাড়ানো হয়নি। জেসমীন আর ঋকের সম্পর্কের সূত্রে ছোট ছোট ঘটনা, কিছু চরিত্রের আগমন আর দুজনের অতীতমুখীতায় বিস্তৃত হয়েছে গল্পের ডালপালা। ঋক আর জেসমীনের সাথে একে একে এসেছে ধর্মপ্রাণ নুরুল, সিস্টার নীতা, ঈশ্বরগঞ্জের গুলবাহার বেগম নামের এক আয়ার অপাংক্তেয় কন্যা চিনু, ফুলকাকা, পুতুল, ঋক আর জেসমিনের সন্তান দুলি, সঞ্জু আর সুরাইয়া। তবে এদের গল্পে উপন্যাসের পাতা ভারাক্রান্ত হয়নি। কেউ কেউ ঋক আর জেসমীনের জীবনে উঁকি দিয়ে গেছে শুধু। আবার নির্লিপ্তভাবে লিখে দেওয়া একটি বাক্যেই হয়তো প্রবলভাবে আলোড়ন তুলে গেছে কোনো চরিত্র। অথচ যেন কিছু হয়নি তেমনিভাবে লেখক ছুঁড়ে দিয়েছেন শব্দের অব্যর্থ তীর।
কখনো কখনো জেসমীনকে মনে হয়েছে তীরবিদ্ধ পাখি। ঋকের ভাবনামতো চল্লিশে দাঁড়ানো জেসমীন কি কোনো কারণহীন মনোবৈকল্যে ভোগে? না মাতৃশোকে অহেতুক ঘায়েল হয়ে নিমগ্ন থাকে স্মৃতিকাতরতায়? কেন খোলা দিগন্তে দাঁড়িয়েও জেসমীনের মনে হয় একটু হা হা করে কেঁদে নিতে পারলে বেশ হতো?
লেখকের উপস্থাপনার স্বকীয়তায় বাতাসের বিভ্রমে ডুবসাঁতার কাটতে থাকা বইয়ের প্রতিটি বাক্যকে খপ করে ধরে একটু একটু করে গল্প বের করতে হয়েছে। তাই পাঠক আমাকে হতে হয়েছে মনোযোগী, শব্দের আড়াল ভেদ করে গল্পের কোলাহল খুঁজতে কানতে রাখতে হয়েছে সতর্ক। 
উপন্যাসের কিছু কিছু অংশ বড় মনোরম, পড়তে পড়তে বুকের জলে চুপ করে ঢেউ তুলে গেছে কেউ। কিছু বাক্য পড়ে “খেজুর-নিম-অ্যাপলব্লসম ট্রি-পাতাবাহারের ঝুপুসী আঁধারে” দাঁড়িয়ে থেকেছি থির হয়ে। আবার কখনো ঋকের সাথে সাথে দেখতে পেয়েছি কী করে সিস্টার নীতার নত “চোখের সমস্ত পারদ জলের মতো নির্ভার-স্বচ্ছ হতে হতে কিমুলোনিম্বাস মেঘ” হয়ে যায় আর ফুলকাকার বাবা রাজাদাদা কী করে “অল্প জ্বালে রং ধরানো চিনির” মতো হাসে।
জেসমীনের মতো ভেবেছি, ”কত অন্ধকার ব্যক্তিগত, তার বিভাজন চলে না। তার ভারোত্তোলন চলে না।” দেখেছি সস্তাপুরে খিড়কিবাগানের দুয়ার ধরে দাঁড়ানো জেসমীনের মায়ের স্নেহ জড়ানো বিমর্ষ মুখ।
কিংবা আশ্চর্য এক অনুভূতির দেখা পেয়েছি, জনশূন্য দেওদারবনে ঝকঝকে সবুজ ফোয়ারার মতো অবিরল জোনাকী দেখে। 
সহজভাবে বললে উপন্যাসের চরিত্রগুলো এসেছে বিক্ষিপ্তভাবে। মূল দুটি চরিত্রসহ কাউকে পাট পাট ভাঁজ খুলে দেখাননি লেখক। তবে স্বল্প পরিসরের মধ্যেও কেউ কেউ রেখে গেছে তীব্র ছাপ। তেমনই একটি চরিত্র নুরুল। জেসমীনের বাসায় নুরুলের আসা বন্ধ হওয়ায় জেসমীন ভাবে, হয়তো নুরুল লুকিয়ে কোনো আশ্চর্য সুখস্মৃতি নিয়ে গেছে আর ছোটবেলার মতো মার খেলেই সে সেই চোরাই ধনরত্ন বের করে দেবে। সেই নুরুল প্রসন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীর মতো জেসমীনের জীবনে বারবার এসেছে। 
জেসমীন জানে “যারা ভালোবাসে তারা কথা বলতে বলতে পিঠে ঘনিষ্টজনের মতো হাত রাখে-যে হাত আত্মীয়তার, রাগতে গিয়ে কখনো তারা হেসে ফেলে, আর প্রায়ই চুপচাপ তাকিয়ে দ্যাখে-যে চোখ অনুরক্তের-যে চোখ বলে তোমার দোষগুলিও কী উপাদেয়” -ঠিক তেমন মানুষটি ঋক নয়, সে কখনো কখনো ভীষণরকম শরীরসর্বস্ব যে জেসমীনের কাছাকাছি আসে কেবল ওর ভেতর থেকে নারীশরীর ছেঁকে তোলার বিহ্বলতাতেই। তবু মানবিক সম্পর্কের বোঝা টেনে বেড়ানো উপন্যাসের চরিত্রগুলো টের পায় না কী করে “ঘৃণা জমতে জমতে ভালোবাসার মতোই গুঁড়িগুঁড়ি” হয়ে যায়।
জেসমীন, পুকুরের টলটলে জলের মতো স্থির অথচ সেই জেসমীন একটা সময়ে অসম্ভব নিঃশর্ত ভালোবাসা চেয়েছিল যা যেকোনো স্বেচ্ছাচারিতা প্রশ্রয় দিবে। এই জেসমীনই আবার কখনো গ্রহণলাগা চাঁদের মতো বিষণ্ন। জেসমীন যখন উত্তর আকাশের ব্যালেরিনা মেঘের মতো পাক খেয়ে অসীম ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকে তখন উপন্যাসের টান টান বর্ণনায় বুঁদ হতে হয়।
উল্টোদিকে ঋক ভয়ানক উদাসীন। এলোমেলো, বিশৃঙ্খল। নিজের স্থিতিস্থাপক জীবনে যে কখনো কখনো ভীষণ শরীরসর্বস্ব। কখনো বা জেসমীনের আকাশে চন্দ্রতাপের মতো প্রসন্নতা বিলানো মানুষ। এই ঋক পাঠককে হুট করে এমন দেশে নিয়ে যায় যেখানে আদিগন্ত লিলি ফুল ফুটে আছে আর আকাশ থেকে অঝোরে ঝরছে নরম পালক। সেই পালকে সাজানো দাম্পত্যচর্চায় জেসমীন আর ঋক দুজনেই ভেবেছে, জেসমীনকে কি ঋক ভালোবাসে? বা জেসমীন ঋককে? ঋকের মতো উড়ান মেঘ কি সত্যিই কাউকে ভালোবাসতে পারে? কাঁদতে পারে দুলিকে হারানোর বেদনায়?
জেসমীনের কিচেনগার্ডেনে হামলে পড়া মানুষ্যাকৃতির মেঘ, গাছগাছালির ছায়া, কচি পাতার সুঘ্রাণ আর আম-খিচুড়ি, কালবাউশ ভাজা, বড়িভাজা গুঁড়ো দিয়ে পাঁচমিশালি শাক ভাজি, বাইল্যা মাছের ঝুরিভাজি, লালচে গরগরে মাংসের ঝোলের ভেতর টুবুটুবু ভেসে থাকা ডিমভাজার মৌ মৌ সুঘ্রাণের বিভ্রমে লেখক পাঠককে এমনভাবে আবিষ্ট করে রাখেন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর পাঠককেই খুঁজে ফিরতে হয়। 
ছুটির অলসদিনে জেসমীনের পিছু ফিরে তাকানো দিয়ে শুরু হওয়া উপন্যাসের গোলকধাঁধায় ঘুরে এসে দেখি হুট করে বইয়ের পাতা ফুরিয়ে গেছে। তাই পাঠের আনন্দে অতৃপ্তি থেকে গেছে। হয়তো লেখক ইচ্ছে করেই তা করেছেন। কিন্তু যেখান থেকে উপন্যাসের শুরু সেখানে ফিরতে না পারাটা একটু অস্বস্তি দিয়েছে। বইটি পাঠশেষে মনে প্রশ্ন থেকে গেছে, “অলসদিন-খয়েরিপাতা-বাওকুড়ানি” কি কেবল বিষণ্ন জেসমীন অথবা ভাবলেশহীন ঋকের গল্প নাকি এককালে রবীন্দ্রনাথের “গোরা”র ভেতরে লুকিয়ে রাখা হলদে খাম নতুবা জহির রায়হান রচনাবলীর “আরেক ফাল্গুন”র পাতায় নীল দাগ টানা মানুষগুলোর হারিয়ে যাবার গল্প? (সাদিয়া সুলতানা)

2 thoughts on “বই নিয়ে আলোচনা ঃঃ সাগুফতা শারমীন তানিয়ার– অলসদিন-খয়েরিপাতা-বাওকুড়ানি

  • March 12, 2019 at 5:38 am
    Permalink

    এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    Reply
  • March 12, 2019 at 5:40 am
    Permalink

    এত সুন্দর বিশ্লেষণ!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *