বই নিয়ে আলাপ : দূরদেশের গল্প যখন হাতের কাছে

সাদিয়া সুলতানা
কজন গল্পকার যেন একজন জাদুকর। দেশে-দূরদেশে অসামান্য সব জাদুকর বিবিধ কৌশলে বিবিধ গল্প লিখে চলছেন। সামান্য একটা আখ্যানকে পরিকল্পিত একটা কাঠামোর মধ্যে ফেলে গল্প তৈরি করতে এইসব জাদুকরের তুলনা নেই।
একটা গল্প কীভাবে শুরু হবে, গল্পের ছক কেমন হবে, কোথায় গিয়ে থামবে গল্পের চাকা-এসবের কোনো সীমানা নির্ধারণ করা সম্ভব নয় জানি। আরও জানি গল্পের কোনো শেষ নেই। যদিও জানা নেই মানুষের কল্পনা আর অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে যেই গল্প নির্মিত হয় আদৌ তার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব কিনা।

আমি পাঠক। জানা-অজানার গণ্ডির মধ্যে অযথা খেই না হারিয়ে গল্প পড়ে যাই মহাআনন্দে। যদিও নিজের সীমাবদ্ধতার কারণে হরেক দেশের হরেক ভাষার মূল গল্প পড়া সম্ভব হয় না। পাঠক হিসেবে আমার সেই সীমাবদ্ধতা আর অতৃপ্তি ঘুচিয়ে দেন আমাদের প্রাজ্ঞ অনুবাদকেরা। আর যদি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ করা গল্পকারদের গল্প এক মলাটে পাই তবে প্রাপ্তির কৌটা ষোলোআনা পূর্ণ হয়।
অস্বীকার করবো না, অনুবাদের কাজ আমার কাছে কঠিন ও কষ্টসাধ্য বলে মনে হয়। তাই সাহস করে ঐদিকে কখনো হাত বাড়াইনি। পাঠক আছি, বেশ আছি। যদিও জীবনে একাধিকবার অনুবাদ গ্রন্থ পড়তে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পাঠক হিসেবেও সহসা ওমুখো হবো না এমন পণও করেছি। তবু ‘দূরদেশের গল্প’ হাতে আসতেই কী যেন একটা হলো, কালবিলম্ব না করেই পড়তে শুরু করলাম।
আসলে আমার পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে জানি গল্পকার, অনুবাদক নাহার তৃণা অনুবাদের কাজটি করেন সাবলীল ঢঙে, মসৃণ ভাষায়। এই আস্থাটুকুই হয়তো আমাকে ‘দূরদেশের গল্প’র প্রতি মনোযোগী করে তুলেছে।
২০২২ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় চৈতন্য প্রকাশন প্রকাশ করেছে নাহার তৃণার অনুবাদ গল্প সংকলন ‘দূরদেশের গল্প।’ গল্পকারগণ কতোটা বৈচিত্র্যময় করে তুলেছেন বিশ্বসাহিত্যের গল্পের ভাণ্ডার তা জানার জন্যই মূলত কৌতূহলভরে সংগ্রহ করেছি ‘দূরদেশের গল্প।’ এছাড়া আমার পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে জানি গল্পকার, অনুবাদক নাহার তৃণা অনুবাদের কাজটি করেন সাবলীল ঢঙে, মসৃণ ভাষায়। এই আস্থাটুকুও আমাকে ‘দূরদেশের গল্প’র প্রতি বিশেষ আগ্রহী করে তুলেছে।
 
‘দূরদেশের গল্প’র শুরুতেই কথাসাহিত্যিক মোজাফ্ফর হোসেনের লেখা অসামান্য একটি আলোচনা আছে। আলোচনাটি বইয়ের ভূমিকা হিসেবে সংযুক্ত হয়েছে যা ছোটগল্প ও অনুবাদ সম্পর্কে আমার ধারণাকে সমৃদ্ধ করেছে।
 
এই সংকলনে ষোলটি গল্প আছে। প্রথম গল্প ‘একজন কলুর বলদ ও দুই নির্বোধ আমলা।’ গল্পটির মূল গল্প রাশিয়ার প্রথম সারির স্যাটায়ার লেখক মিখাইল ইয়েভগ্রাফোভিচ সালটিকভ শেড্রিনের। এই গল্পটিও স্যাটায়ারধর্মী যেখানে গল্পকার দুইজন আমলা এবং একজন খেটে খাওয়া কৃষকের সামাজিক অবস্থাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করেছেন। লঘুচালে এগিয়ে যাওয়া গল্পটিতে কলুর বলদ আমজনতার প্রতি সমাজের উঁচু মহলের মানুষের লোকদেখানো বদান্যতাকেও কটাক্ষ করা হয়েছে। অনুবাদকের দক্ষতায় গল্পের ভাষা সরস ও প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে।
 
‘একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা’ গল্পটি নাইজেরিয়ান লেখক চিমামান্দা নগুজি আদিচির। এটি দুজন নারীর একটি দিনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প। গল্পটি হাউসা মুসলিম উগ্রপন্থী ও বদলা নিতে উদ্ধত ইগবো খ্রিস্টানদের মধ্যকার দাঙ্গা-হাঙ্গামা নিয়ে আবর্তিত। গল্পটির কথনশৈলী অনন্য। কখনো বর্তমান কখনো বা ভবিষ্যত-দুভাবেই ঘটনার বর্ণনা করছিলেন গল্পকার। অনুবাদক গল্পের কেন্দ্রীয় দুই চরিত্রের মুখে তাদের সামাজিক অবস্থানভেদে আঞ্চলিক ও প্রমিত ভাষায় সংলাপের ব্যবহার করায় গল্পটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। যদিও গল্পটিতে আফ্রিকার প্রচলিত ভাষা, জাতিগোষ্ঠীর নাম আসায় মাঝেমধ্যে থামতে হয়েছে।

ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত পোলিশ লেখক ওলগা নভোয়া তোকারচুকের ‘লেখকের সঙ্গে একটি সন্ধ্যা’ গল্পটি শুরু হচ্ছে এভাবে ‘রাতের বেলাতেই চমৎকার ভাবনাগুলো এসে ভর করে আমার মাথায়, যেন দিনের আমি আর রাতের আমি দুজন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। সে বলত, ওসব ফালতু ধারণা। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে ‘আমি’ যুক্ত একটি বাক্য তৈরি করে বলত তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিষ্কার ভাবনাগুলোর উদয় ঘটে দিনের শুরুতে, প্রথম কফিটা শেষ করার পর।’
 

উদ্ধৃত অংশ থেকেই বোঝা যাচ্ছে বেশ মসৃণ ভাষায় গল্পটি লেখা। মূল গল্পটি পড়ার সুযোগ হয়নি আমার, কিন্তু অনূদিত গল্পটি পড়তে পড়তে একবারের জন্যও মনে হয়নি গল্পের ভাষান্তর পড়ছি।
 
লাতিন আমেরিকার সাহিত্যিক পেদ্রো মায়রালের গল্প ‘আর্লি দিস মর্নিং’ গল্পটির অনুবাদ ‘আজ ভোরে’ পড়তে পড়তে নিজের কাছেও অপরিচিত একজন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে হতে অদ্ভুত একটা ঘোরে পড়ে গিয়েছি। এই গল্পটা যেন খুব চেনা আমার, আমার চেনা গণ্ডিরই। যেখানে বহু ভুল করে বহু পথ ঘুরে একটি মানুষ আবার বালক হয়ে স্মৃতিময় এক বাড়ির প্রেতাত্মার উপর দিয়ে কেবলই ছুটে চলছে।
 
বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক ও’ হেনরির গল্প মানেই সরস ভাষার বর্ণনা আর শেষটায় দারুণ চমক। ‘ছন্দপতন’ গল্পটিও তেমন। নানা ফন্দিফিকির করেও সোপি যখন কিছুতেই জেলে যাওয়ার সুযোগ পায় না তখন হঠাৎ করে গল্পের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায়। এমন গল্প পড়লে অনেকক্ষণ নতুন কিছু পাঠে মন দেওয়া যায় না। অভিনব প্লটের গল্প ‘ছন্দপতন’ পড়তে পড়তে একবারও ছন্দপতন ঘটেনি, এজন্য অনুবাদকের কৌশলের তারিফ করতেই হয়।
 
আফ্রো-ইতালিয়ান ছোটগল্পকার গ্যাব্রিয়েলা ঘেরমান্ডির গল্প ‘পাড়াতুতো টেলিফোন’ এ নিয়তি নির্ধারিত পথের মতো কেচেনে গ্রামের সবকিছু একটি বাড়ি আর একটি টেলিফোন ঘিরে চলতে থাকে। ‘এই গ্রামের জীবনযাত্রা মাঝে মাঝে পটে আঁকা ছবির মতো স্থির অচঞ্চল হয়ে যায়। খুব সামান্য কোনো চিহ্ন, আধঘোরানো একটা চাকা, সময়কে চলার জন্য একটু জায়গা করে দেয়, কোনো ঘটনার ঘনঘটা ছাড়া সময় গড়িয়ে যায়।’ গল্পকথক জেনিট নিজের অতীত জীবনের অক্ষত স্মৃতি খুঁজতে বন্ধু জেগগুকে বাধ্য করতে করতে যখন প্রায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছিল তখনই জেগগুর আহ্বানে সে একদিন কেচেনে গ্রামে যায়। কেচেনে গ্রামের পাড়াতুতো টেলিফোনকে ঘিরে মানুষের নিরন্তর বেঁচে থাকার গল্প পড়তে পড়তে বার বার মনে পড়ছিল কথাসাহিত্যিক আফসার আমেদের অসামান্য উপন্যাস ‘অশ্রুমঙ্গল’র কথা। সেই কোন সে আদ্দিস আবাবার দরিদ্রতম অঞ্চলের ছোট্ট এক গ্রাম কেচেনে আর এই অশ্রুমঙ্গলের কুসুমপুর-দুই ভিন্ন দেশ, ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো যেন কোনো না কোনো ভাবে একই সূত্রে বাঁধা, যাদের একটা টেলিফোন নিরন্তর জাগিয়ে রাখে।
 
‘ছাতাওয়ালা লোকটি’ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা কথাসাহিত্যিক রোয়াল্ড ডালের গল্প। গল্পটি বেশ মজার। টান টান উত্তেজনার ভেতরে মা, মেয়ে আর একজন ছাতাওয়ালা লোককে ঘিরে গল্পের কাহিনি এগিয়ে যায়। গল্পটির অনুবাদ এতই মসৃণ হয়েছে যে পড়তে পড়তে দশ বছরের বালিকার অতি সচেতন মায়ের মতো বিমূঢ় হয়েছি, হুট করে বোকা বনে গিয়ে উচ্চস্বরে হেসেও উঠেছি।
 
‘একজন মাননীয় প্রাক্তন মন্ত্রীর মৃত্যু’ গল্পের লেখক নাওয়াল আল সাদাবি জন্মসূত্রে মিশরীয় লেখক হলেও আরব বিশ্বে তিনি ‘সিমন দ্য বোভোয়া’ নামে পরিচিত। নাওয়াল আল সাদাবির লেখা পড়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিলো নাহার তৃণার অনূদিত ছোট্ট এই গল্প আর গল্পের শেষে সংযুক্ত সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতিটি। ‘একজন মাননীয় প্রাক্তন মন্ত্রীর মৃত্যু’ গল্পটি আসলে কর্মব্যস্ততার ঘোরে ডুবে থাকা একজন স্বেচ্ছাচারী মাননীয় প্রাক্তন মন্ত্রীর তার মাকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটি খোলা চিঠি। আপাতদৃষ্টিতে গল্পটি সাধারণ মনে হলেও এমন একটি গল্প লেখার জন্য কলমে অনেকটা সাহস ও শক্তি ধরতে হয়।
 
নাইজেরিয়ান লেখক বেন ওকরির গল্প ‘জীবিত জনের প্রার্থনা’ গল্পে যুদ্ধ বিধ্বস্ত এক শহরে একজন জীবিত মানুষ কান্নাহীন শুকনো চোখে তার প্রিয় স্বজনদের খুঁজে বেড়ায়।গল্পের এক একটি বাক্য বেদনার নিষ্ঠুরতম সঙ্গীত বাজিয়ে চল। এই সঙ্গীতের সুর তীব্র ও সম্মোহনীয়।
 
ইন্দোনেশিয়ান কথাসাহিত্যিক একা কুরনিয়াওয়ানের ‘প্রাপ্তি ও হারানোর গল্পে’ মরণাপন্ন বাবার কাছাকাছি থেকে ছেলে বার বার স্মৃতির মুখোমুখি হতে থাকে। ইন্দোনেশিয়ান জাতির ভাগ্য আর একটি মক্তবের ওস্তাদ হিসেবে কাজ করা বাবার ভাগ্যের সঙ্গে কোথাও একটা যোগসূত্র খুঁজে পায় ছেলেটি। বাবার জীবনের ঘটনাক্রমের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া প্রজাতন্ত্রের উত্থান পতনের মিল খুঁজে পেয়ে চমকিত হয় সে। কিন্তু গল্পটি যতোটা সম্ভাবনা ও চমকের সঙ্গে এগিয়ে গেছে গল্পের সমাপ্তিটা যেন ঠিক ততোটা মন ভরাতে পারেনি। তবে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, গল্পটিতে অনুবাদক বেশ সতর্কতার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উল্লেখ করেছেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় শব্দের ব্যবহারেও তিনি ছিলেন সতর্ক।

 

কানাডার হাস্যরসাত্মক গল্পের অন্যতম সফল লেখক স্টিফেন বাটলার লিককের ‘একটি ম্যাচের কাঠি’ গল্পটি বেশ মজার। মামুলি এক ম্যাচের কাঠি খোঁজা নিয়ে উদ্ভূত বিড়ম্বনাকে ঘিরে লেখা ছোট গল্পটি ক্ষণিকের জন্য হলেও জীবনের গুরুভার লঘু করে।
 
পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী লেখক ঝুম্পা লাহিড়ীর গল্প ‘সীমারেখা।’ গল্পটি মনের ভেতরে ডুব মেরে থাকা পুরানো কিছু প্রশ্ন উস্কে দেয়, ‘এই যে আমার চিরচেনা ছকে বাঁধা জীবন, এই জীবন ছেড়ে দিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে একদম নির্জন একটা জীবন কি সত্যিই বেছে নেওয়া সম্ভব?’ হাঁফ ধরে গেলে তো পালাতে চাই, কিন্তু চিরচেনা গণ্ডি ছেড়ে পালালে সত্যি সত্যি কি স্বস্তি মেলে?’ ‘সীমারেখা’ গল্পের ভেতরে যতোটা সহজে ঢুকতে পেরেছি ততোটা সহজে এসব প্রশ্নের উত্তর পাইনি।
 
দূরদেশের গল্পে আরও রয়েছে আইরিশ লেখক এ্যানি টেরেসা এনরাইটের গল্প ‘ নৈশ সাঁতার’, আফ্রিকান কথাসাহিত্যিক চিনুয়া আচেবের গল্প ‘বিবাহ ব্যক্তিগত বিষয়’, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আব্দুলরাজাক গুরনাহ্ র গল্প ‘আমার মায়ের খামার বাড়ি’ এবং ভারতীয় লেখক নানক সিং এর গল্প ‘আপ্যায়নের অত্যাচার।’
 
‘দূরদেশের গল্প’ সংকলনের কয়েকটি গল্পের কিছু অংশ আমার কাছে বেশ দুর্বোধ্য মনে হয়েছে। গল্পকে প্রাঞ্জল ভাষায় অনুবাদ করতে অনুবাদকের ঘাটতি ছিল না হয়তো, হয়তো মূল গল্পই এমন কুহকে ভরা যে আমার মতো পাঠকের সবটা আয়ত্ত্বে আনার সাধ্যই নেই। ‘নৈশ সাঁতার’ গল্পটি এমনই এক গল্প। গল্পটি পড়তে পড়তে বুঝতে পারছিলাম ভাষান্তর করতে গিয়ে অনুবাদককে কতোটা নিবিড় মনোযোগী হতে হয়েছে।
 
এই সংকলনের মাধ্যমে অনুবাদক নাহার তৃণা দূরদেশের লেখক আর তাদের লেখার সঙ্গে এই দেশের পাঠকের যোগসূত্র তৈরি করে দিয়েছেন। আর তাই দূরদেশের গল্প হয়েও এই গল্প সংকলনের গল্পগুলো আমাদেরই গল্প হয়ে উঠেছে।
 
বইয়ের তথ্য:
বইটির প্রকাশক: চৈতন্য প্রকাশনী
প্রচ্ছদ কারিগর: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
মলাট মূ্ল্য: ৩৫০টাকা

লেখক পরিচিতি:

সাদিয়া সুলতানা
কথাসাহিত্যিক।
 রংপুরে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *