কুলদা রায়ের ধারাবাহিক উপন্যাস : কাননবালার শেষ মুজরো অথবা পিপ্পলকুমারী বালা–পর্ব ৪

 
 
আগের পর্ব পড়ার লিঙ্ক : ১-২,
৪.
থানায় নতুন দারোগা এসেছেন। নাম আইয়ুব খান। মুখে পাকানো গোঁফ আছে। বাড়ি ময়মনসিং। তিনি,ময়মনসিং বলেন না। বলেন মোমেনশাহী। পাকিস্তানের মোনায়েম খাঁ তার দূর সম্পর্কের ফুফা লাগে।
 
আইয়ুব খান দারোগা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলেন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। চোরডাকাতের উৎপাত সেভাবে নেই। কাজিয়াটাজিয়া বিশেষ হয় না। বর্ডার এলাকা থেকে বহুদূর বলে চোরাচালান নেই। অফিসের লোকজন বসে বসে ঝিমোয়। আর যারা একটু তৎপর তারা বদলির ধান্ধায় থাকে।বড়ো কর্তারা এ থানার পরে খুশি নন। আয়ুব দারোগার মন খারাপ হয়ে গেল। বুঝতে পারল, এখানে কাজ করলে না খেয়ে মরতে হবে।
এ সময় তার রুমে টিপিটিপি পায়ে এসে দাঁড়াল টাউন দারোগা আকবরুদ্দিন। লম্বা একটা সালাম দিল। তারপর কিছু না বলে দাঁড়িয়েই রইল। হাতে কিছু কাগজপত্র। তার হ্যালাদোলা নেই। ঢলো ঢলো প্যান্ট। যে কোনো সময়েই খসে পড়তে পারে। কিন্তু কী এক অলৌকিক কারণে খসে পড়ে না। কাকতাড়ুয়ার মতো দাঁড়য়ে থাকে। নেশাখোরের মতো নিজেই যেকোনো সময় ঢলে পড়তে পারে।
তার ফাইল দেখেছেন দারোগা আইয়ুব খান। তাকে কোনো দ্বায়িত্ব দেওয়া হয় না। চাকরি আর বেশি দিন নেই। নিয়ম করে একবার অফিসে আসে। তারপর বেরিয়ে যায়। কোথায় কোথায় ঘোরে কে জানে। বিকেলে ফিরে কাগজে খসখস করে রিপোর্ট লেখে। সে রিপোর্ট কোনো দারোগা আমলে নেয় না। গাজাখোরের জন্য সময় ব্যয় করার কোনো অর্থ হয় না।
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দারোগা আইয়ুব শুধালেন, কিছু বলবেন?
শুনে নড়েচড়ে একটু সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল আকবরুদ্দিন। বলল, স্যার একটা কেস?
–কী
–কিছু না স্যার। একটা কেস।
শুনে একটু মুচকি হাসলেন দারোগা। আব্কবরুদ্দিনেরকোনো কেস থাকার কথা নয়। এর আগের দারোগা, তারও আগের দারোগা তাকে কোনো কেসকারবারির দ্বায়িত্ব দিয়েছে এমন রেকর্ড নেই। হেসে হেসে বললেন, কী কেস?
–রেপ কেস।
তবে রেপ শব্দটা এতো আস্তে করে বলল যে তা দারোগার কানে গেল না। দারোগার ইঙ্গিতে কেসের রিপোর্ট টেবিলে রেখে দ্রুতপায়ে টাউন দারোগা আকবিরুদ্দিন চলে গেল।
কোনো কাজ ছিল না বলে রিপোর্টটি টেনে নিল। বড়ো কতে লেখা– রেপ কেস।
শহরের মধ্য পাড়াস্থিত ঘুল্লিবাড়ি সংলগ্ন বাগানে অদ্য একটি নারীদেহ পড়িয়া থাকিতে দেখা যায় বলিয়া কে বা কাহারা স্থানীয় পাঞ্জাগানা মসজিদে জানান। তখন ফজরের নামাজ পড়িয়া মুসল্লীরা গৃহ অভিমুখে যাত্রা করিতেছিল। খবরবাহকরা খবরটি পরিবেশন করিয়াই প্রস্থান করে। তখনো রাত্রি কাটিয়া যায় নাই বলিয়া তাহাদের মুখও যথাযথভাবে দেখিতে পারা যায় নাই। তবে দুএকজন মুসল্লী তাহাদের এই এলাকায় অতীতে দেখা যায় নাই বলে।
রিপোর্টটি এইখানে খতম। আর কিছু লেখা নেই। স্বাক্ষরের জায়গাটিও কিছু নেই। সাদা। হেসে ওসি আয়ুব খান বাইরে তাকালেন। অন্ধকার হয়ে এসেছে বাইরে। লোড শেডিং চলছে। ঘরে আলো নেই। একজন কনস্টেবল তার টেবিলের উপর একটি হ্যারিকেন রেখে গেল। তার আলো চোখে বড়ো লাগে। কাগজটি দিয়ে হারিকেনের চিমনির একপাশে শেড দিলেন। সেই আলোতে কাগজের সাদা অংশে কিছু অক্ষরের আঁচড় দেখা গেল। হয়তো আরো কিছু লিখতে শুরু করেছিল আকবরুদ্দিন কিন্তু কালি ফুরিয়ে যাওয়ার তার আর লেখা হয়নি। আরেকটি কলম দিয়ে লিখতে পারত। কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে লেখেনি। তড়িঘড়ি করে তার কাছে দিয়ে গেছে।
আকবরুদ্দিনকেঅফিসে পাওয়া গেল না। রিপোর্টটি দিয়েই সে কেটে পড়েছে। থানার বড়ো বাবু মুখে একখিলি পান দিয়ে ওসিকে জানালো আকবরুদ্দিন তদন্তের কাজে গেছে।
–কী তদন্ত? ভ্রু কুঁচকে ওসি তাকে জিজ্ঞেস করলেন।
–তাতো জানি না। মুখে শুকনো হাকিমপুরী জর্দা নিয়ে উত্তর দিল বড়বাবু।
–কে জানে?
— তাও জানি না স্যার। হয়তো তার বৌ জানে।
–তার বৌ?
ওসির এই প্রশ্নে বড়োবাবু একটু হোচট খেলো। বুঝল এটা তারা বলে বলে তবে নতুন আসা এই ওসি সাবকে বলা ঠিক হয়নি। পানের পিক মুখ ভরে এসেছে। সেটা দেলা দরকার। সেটা করার মতো সময় না নিয়েই বলল, বৌ নয়– সে নিজেই জানে। হয়তো…
–হয়তো?
–হয়তো নিজেও জানে না। একটু মুচকি হাসি হাত দিয়ে চাপা দিল বড়োবাবু।
আরো কিছু প্রশ্ন করার ছিল বড়োবাবুকে। তার আগেই বগলে একটা ফাইল চেপে একজন লোক পরদা ঠেলে ওসির রুমে ঢুকে পড়ল। সোজা তার দিকে এগিয়ে এসে পকেট থেকে একটা আইডি কার্ড এগিয়ে দিলেন। লেখা-
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন। স্থানীয় বার্তাপরিবেশক। দৈনিক ইত্তেফাক।
তাকে একটা সালাম দিয়ে বললেন, স্যার কি শুনেছেন।
–কী ?
–একটা মেয়ে রেপড হয়েছে। বেলায়েত সাংবাদিক বললেন।
–হুম। বলে ওসি গম্ভীরভাবে বললেন। হতে পারে।
–কী বলেন স্যার। বিস্মিত হয়ে বেলায়েত সাংবাদিক বললেন। হতে পারে না।
এবারে ওসি মৃদু হেসে উত্তর দিলেন। এর আগেও হয়েছে। এখনও হচ্ছে। পরেও হবে।
–এর আগে হয়নি কখনো হয়নি।
–হয়েছে। সেগুলো কেউ জানতে পারেনি। জানার আগেই চেপে যাওয়া হয়েছে। আপনারাও খবর করেননি। অম্লান বদনে ওসি আয়ূব খান সাফ সাফ বলে দিলেন।
এবারে বেলায়েত সাংবাদিক আর কোনো বাহাসে না গিয়ে বললেন, সেতো বুঝলাম স্যার, এখন তো সত্যি সত্যি হলো। আপনিও এলেন। আর এ শহরে একটা রেপড হলো।
শুনে খুশি হলেন ওসি। বললেন, গুড সাইন–কী বলেন। কাজ পাওয়া গেল। কাজ ছাড়া খামোকা চাকরি করার কোনো মানে হয় না।
বাইরে মোটর সাইকেল দাড় করানো ছিল। তাতে চেপে বসলেন ওসি। বেলায়েত সাংবাদিককে বললেন, উঠুন।
–কোথায় যাব?
–রেপ দেখতে।
এবারে বেলায়েত সাংবাদিক একটু বিপদে পড়লেন। কাঁচুমাচু করে বললেন, জায়গাটা তো আমি জানি না।
–হা হা হা। রেপ হলো। আর কোথায় হলো সেটা না জেনেই চলে এলেন?
বলে ওসি মোটর সাইকেল স্টার্ট দিলেন। বললেন, শক্ত হয়ে বসেন। আমি জানি জায়গাটা কোথায়।
–কোথায় স্যার?
–তেলি ভিটা। বাবুর বাগানে। তবে কী জানেন– বাবুর বাগানে গিয়ে দেখব– কিছুই নাই। সব শুনশান। কেউ রেপ টেপ হয় না।
শুনে বেলায়েত সাংবাদিক বললেন, স্যার– আব্দুল হামিদের কথা ফেলে দিয়েন না। রেপ হতে কতক্ষণ।
তেলিভিটায় গিয়ে ওসির কথাই সত্যি হলো। সেখানে কেউ নেই। চারিদিক শুনশান। কেউ কোথাও নেই। রাস্তায় ইলেকট্রিক বাতি নিভে আছে। কিন্তু আকাশে সামান্য চাঁদ ঝুঁকে আছে–মৃদু জ্যোৎস্না ঝরছে।
মোটর সাইকেলের তীব্র আলো জ্বালিয়ে বাগানে ঢুকলেন ওসি। কিছু গাছপালা দীর্ঘ ছায়া মেলে দাঁড়ানো। কিছু ঝোঁপঝাড়।

(চলমান…)

লেখক পরিচিতি:

কুলদা রায়
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক
নিউইর্য়কে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *