গল্পের কাছে কী চাই : রুখসানা কাজল

আমাদের রান্নাঘরের পাশে কিছুটা দূরত্ব রেখে দুটি বরই গাছ ছিল। আমার বাবা গাছদুটিতে এক উদ্ভট জাতের অচেনা শিমগাছ লতিয়ে দিয়েছিল। পাখাওয়ালা শিম। গাঢ় সবুজ রঙ। ঝেঁপে ফলেছিল। কিন্তু অপ্রচলিত তাই কদর ছিল না তেমন। মা অচ্ছেদ্দায় উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। যার যত খুশি এমনকি গোরু ছাগলেও নুয়ে পড়া ডালগুলো থেকে টেনে টেনে খেত। শিমগাছে ঘেরা বরই গাছের নিচে অপূর্ব সুন্দর আলো আসত। মায়া মাখানো নরম সবুজ প্রদীপ্তি। যেন আমার আজন্মের চেনা উপলব্ধি। আমি ওখানে কালীপূজোর মেলায় কেনা রঙ্গিন মাটির হাড়িপাতিলে রান্নাবাটি খেলতাম। তখন যুদ্ধ শেষের স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বজন হারানো হাহাকারের সাথে যুক্ত হয়েছে অভাব অনটন দুর্ভিক্ষ বন্যা। চলছে নৈতিকতা আর মূল্যবোধের সশব্দ পতন। আমার কাছে দুঃখিনী লাগত স্বাধীনতাকে। দুঃখ আমার ভাল লাগত না। অই বরইতলা, অচেনা শিমের সবুজ ছায়াঘরে আমি এক রঙ্গিন আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিলাম। মাতৃগর্ভের মত সুরক্ষিত আশ্রয়। 
পাঠক হিসেবে গল্পের কাছে আমি এখনও অই আশ্রয় খুঁজি। 
ঠা ঠা দুপুর। ইশকুল ছুটির পর নদি দেখতে চলে যেতাম। দুপুরের নদি। দুলে দুলে ভেসে যাচ্ছে কচুরিপানার দল। কোন কোন নৌকার পাশে একটুকরো ছেঁড়া গামছা পরে নাইতে নামত কোন দরিদ্র পুরুষ। হয়ত মাঝি বা কাঠগুদামের শ্রমিক। আমাদের দিকে পিঠ দিয়ে নগ্ন শরীর মুছে নিত। খারাপ লাগত না আমাদের। ক্রুশবিদ্ধ যিশুও ত প্রায় নগ্ন। অথচ ইশকুলে যাওয়ার পথে, গান রেকর্ডিংএর দোকানে বসা জামাপ্যান্ট পরা অনেক পুরুষ সুট করে লিঙ্গ বের করে আমাদের দেখাত । থকথকে জ্যান্ত সরিসৃপ যেন। গা গুলিয়ে উঠত লজ্জা আর ঘেন্নায়। 
আমি গল্পের কাছে উৎকট অশ্লীলতার পাশে অই অপাপ সরলতা খুঁজে ফিরি। 
আমাদের ছোট্ট শহর ছিল প্রেমে খ্যাত। প্রেমের যে কত অভিমুখ। এরকম প্রেমও ছিল, ছোটবোনের সাথে স্বামীর প্রেম , অতঃপর বোনটি গর্ভবতী হয়ে পড়ায় স্ত্রীটি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে । ধনী ঘর। লোকালয়ে প্রচার হল, ভুল ওষুধ খেয়ে মারা গেছে। সত্যিটা জেনে গেছিলাম আমরা। আরেকটি প্রেম আরও মর্মান্তিক ছিল। শিক্ষিত ধনী ঘরের ছেলে । প্রেম করে বিয়ে করেছিল দরিদ্র ও জাতে ছোট একটি মেয়েকে। প্রবল পারিবারিক বাধায় বউকে তার ভাইয়ের বাড়ি রেখে প্রেমিক স্বামী পালিয়ে যায় ইন্ডিয়া। সন্তান হয়েছে জেনে ফিরে আসে। দুদিনের মাথায় সেই সন্তানটির লাশ পাওয়া যায় খালের জলে। প্রেমিক স্বামীটি আবার উধাও হয়ে যায়। পদ্মপাতায় নুনমরিচ রেখে কাঁচা তেতুল খেতে খেতে সেই কৈশোরে আমরা বলেছিলাম, ধ্যাচ্ছাই জীবনেও প্রেম করব না। অথচ কতবার যে প্রেমে পড়ছি ! 
গল্পের ভাঁজে এরকম নিষ্পাপ নাদান ভুলচুক খুব টানে আমাকে। 
যুদ্ধে পুড়ে যাওয়া বাড়িগুলো থেকে এটাসেটা কুড়িয়ে এনে খেলি। এক দুপুরে এক পোড়া বাড়ির বাগানে দেখি এক মহিলার শাড়ি খুলে নিচ্ছে দুজন চেনা কাকু। মহিলা প্রাণপনে শাড়ি ধরে চেঁচাচ্ছে, ছোড় দিজে চাচাজী, মেহেরবানি—এক ছুটে আব্বুকে ডেকে আনি। কাকুরা শাড়ি ছেড়ে সরে দাঁড়িয়ে আব্বুকে অপমান করে, আপনি কি রাজাকার হলেন নাকি ! ভুলে গেছেন এরা কি অত্যাচার করেছে আমাদের উপর ? এরকম সময় ছুটে আসে পাগলী মোমেনাফুপু। একাত্তরে ডিসি রোডের এক ক্যাম্পে মিলিটারি আর রাজাকারদের রান্নার কাজ করত সে। অনেকেই দেখেছে শুধু পেটিকোট পরে রান্না করছে মোমেনা। কোন কোন রাজাকার বা পাকিস্তানী সৈন্য এসে মোমেনার উদোম স্তন খাবলে ধরত, মুখ লাগাত। মোমেনা হিহি করে হেসে গড়িয়ে পড়ত। স্বাধীনতার পর কেউ জায়গা দেয়নি। এক পোড়োবাড়ির পরিত্যক্ত মালির ঘরে মোমেনাফুপু একাই থাকত। অথচ পাগল ছিলনা সে। মিলিটারি তুলে এনেছে। বাপভাইয়ের সম্মান বাঁচাতে নিজের পরিচয় গোপন রেখে পাগলি সেজে থাকত। নারীর শত বিপদ। আপনা মাংসে কেবল বনচারী হরিণা বৈরি নয়। সভ্যতার আলোকসভায় নারীও বৈরি। জানত বলেই সেদিন ছুটে এসে বাঁচিয়েছিল শত্রুপক্ষের এক অসহায় নারীকে। 
যুদ্ধের গল্প পড়ি। খুঁজে ফিরি ধর্ষিতা মোমেনাফুপুকে। বীর নারী মোমেনাফুপুকে খুঁজে পাইনা। 
গল্প উপন্যাস আমার দ্বিতীয় বাবা মা। এটা চাই, ওটা চাই করে গল্পকে তটস্থ করে রাখি। এক বা আধ ঘন্টায় একটি গল্প পড়ে শেষ করা যায় সত্যি কিন্তু পড়াটাই কি শেষকথা ? তেমন গল্প হলে সারাজীবনের জন্যে গেঁথে যায় মনে। অই যে আমাদের মননভূমির জাগ্রত মনমাঝি, চিরজনের প্রেমিকসখা আর গল্পগুচ্ছের মুকুটহীন রাজামহারাজা দাড়ি রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন না, শেষ হইয়াও হইলো না শেষ ! আমার কাছে গল্প তেমন এক নিদাঘ অনুভব। অঙ্কুরিত বৃক্ষশিশুর মত আকাশ দেখার নির্ভার সাহস। কিন্তু যদি লিখতে যাই বা লিখেই ফেলি ত কেমন হয় সে সব গল্প ? আদৌ কী গল্প হয়ে ওঠে লেখাগুলো ?
ইউনিভার্সিটিতে একদল ছাত্র, মেয়েদের দেখলেই ঠোঁট বুক পেট কোমর নিয়ে বিশ্রী মন্তব্য করত। ইচ্ছে করত ওদের খুন করে ফেলি। তখন গনগনে নব্বই। ফুটছে এরশাদ বিরোধী তীব্র আন্দোলন। এরকম এক মিছিলে ছাত্রীদের লাঠিপেটা করে ভ্যানে তুলে নিতে উদ্যত হয় এরশাদের পুলিশবাহিনী। ‘আমাদের বোনদের এরেস্ট করতে দেবো না। ওদের গায়ে হাত দিবি না শালার ঠোলা’ (সে সময় পুলিশদের আমরা ঠোলা বলতাম) বলে সেই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পুলিশের মারে ওদের নাক ফেটে গেছে, দাঁত খুলে পড়ছে, রক্তে ভেসে গেছে মাথা মুখ। তবু এক দুর্নিবার ব্যূহ রচনা করে সেদিন ওরা ছাত্রীদের পুলিশ ভ্যানে তুলতে দেয়নি। গ্রেফতারের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল আমাদের। আমি কি পেরেছি আমার লেখায় কখনও তাদের কথা বলতে ? 
অথচ এক বুক আশা নিয়ে জেগে আছি। বাংলাদেশের বুকে ক্রমশ নেমে আসছে সাম্প্রদায়িক আর ধর্মান্ধ দুঃসময়। এ দুঃসময়কে দূর করতে এদের মত কেউ কেউ বুক দিয়ে রক্ষা করবে বাংলাদেশকে। রচিত হবে এক সুকঠিন মানবিক ব্যূহ। ডানা ভেঙ্গে পড়বে সাম্প্রদায়িক শকুনদের। আমার বিশ্বাস আশা জাগায়। ছায়া দেখি। অথচ লিখতে পারিনা। 
আমি স্বল্পপ্রিয় একজন লেখক। নিভৃতি আমার প্রিয় স্বভাব। তাছাড়া অফুরন্ত লেখার ফ্লো নেই আমার কলমে। নিজেই সমালোচনা করে ফেলে দিই নিজের লেখা। ছাপার পর মনে হয়, অখাদ্য। লজ্জায় আরও নিভৃতিতে ডুবে যাই। আবার লিখতে বসায়। তখন মনে হয়, অতিকথন কিম্বা একই লেখা লিখে যাচ্ছি। নতুনত্ব নেই লেখার বিষয়বস্তুতে। গল্পের ফর্ম বড্ড নড়বড়ে। ইচ্ছেটা চলে যায়। মনে হয়, গল্পে থাকবে কভিড১৯ এর মত নতুন নতুন রূপান্তর ক্ষমতা। পাঠককে আক্রান্ত করার নবীনতর শক্তিমত্তা। তা নইলে আর গল্প লিখে কী লাভ ! 
————————- 
রুখসানা কাজল, ঢাকা, বাংলাদেশ। 
গল্পকার। প্রাবন্ধিক। 

2 thoughts on “গল্পের কাছে কী চাই : রুখসানা কাজল

  • January 14, 2021 at 3:04 am
    Permalink

    অনেক সুন্দর করে বললেন আপা।

    Reply
  • January 19, 2021 at 4:07 pm
    Permalink

    'গল্প উপন্যাস আমার দ্বিতীয় বাবা মা।' সুন্দর কথা। তাই তো গল্প আশ্রয়।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *