আলমুদেনা গ্রান্দেসের গল্প : মায়ের ভালোবাসা


অনুবাদ : জয়া চৌধুরী
ও সেই। আপনারা কিছু মনে করতে পারছে না? আমার মেয়ে মারিয়াননে, যে ছোট্ট মেয়েটা আমার পাশে, এই দোলনাতে বসে আছে, ওই সে। দেখি, একটু এগিয়ে যাই যাতে ওকে সবাই ভাল করে দেখতে পায়…। ঠিক জানতাম যে আপনারা ওকে মনে করতে পারবেন। এই ক’বছরে যে ঝড় আমার ওপর দিয়ে গেল, তা আপনারা সহ্যও করতে পারবেন না, আন্দাজও নয়। কারণ ভাগ্যবশত এমন মেয়ে যদি আমার না হোত, নিশ্চিতভাবে আমি প্রতিটি সোম- বৃহস্পতি এই সব সভাতে আসতাম না। একটাও কামাই করি নি, শেষ পর্যন্ত। আপনারা জানেন না যে ছোট থেকে ও কি পরিমাণ বাঁদর হয়েছে। একটা দুর্দান্ত মিষ্টি খুকি ছিল, হাসিখুশি, বাধ্য, সুশৃঙ্খল, অনুগত। যখন ছোট্ট ছিল, ওকে ওর ছোট্ট গাড়িটা করে ঠেলতে ঠেলতে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বের হতাম। একশ মিটার যেতে আধঘন্টার বেশি সময় লাগত। সত্যি সত্যি। কারণ ও এত্ত মোটাসোটা, এত্ত ঝকঝকে কটা রঙ, এত্ত হাসিখুশি … সক্ষেপে এত্ত সুন্দর ছিল যে মা মাসীরা সব্বাই ওকে দেখে আদর করবার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ত। ওর ছোট্ট ছোট্ট হাতদুটো আদর করত, কুচিকুচি করে আদর করত আর চুমু ছুঁড়ে যেত আঙুলের মাথায়। হ্যাঁএইরকম সুন্দর নেসলে-র বিজ্ঞাপনের শিশুর মত গাবলুগুবলু বাচ্চা দেখলে সবাই তা করে। তারা বড় হয়ে কলেজ গেলেও, বড়জোর ক্রিসমাসের সময়কার ভার্জিন মেরীর বয়সে পৌঁছলেও সবাই তা করে। কিন্তু তাই বলে সারা জীবন ধরে, হেঁ? একজন নয়, দুজন নয়, কেউ বললে বিশ্বাস করবে না সবাই, সব্বাই। আমার এত গর্ব হয়!- -আর রাত্রিবেলা, যখন ইউনিফর্মটা খুলে ফেলে, আমাকে দেখায় ওর ঘাড়, হাতের মুঠি–সেগুলো সকালবেলার মতই সমান ঝকঝকে পরিষ্কার আছে। আমার মারিয়াননে শক্তির খেলাধুলো করে না। মাটিতে গড়াগড়ি দেয় না, বন্ধুদের গায়ে জাপটাজাপটি করে না, কি বলব, এসব কিচ্ছুটি করে না। একটা উদাহরণ দেবার মত বাচ্চা ও। সব দিদিমণিরা একথা বলে– এত খোলামেলা, এত মিশুকে যে সবার সঙ্গেই বনিবনা করে থাকতে পারবে ও। কে আমাদের বলে দিত যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার মেয়ের সঙ্ক্ষেপে সেটাই প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে যে সে যার তার সঙ্গে চলে যাবে!
বয়ঃসন্ধির সময়ে পৌঁছে অবাধ্য হতে শুরু করল। সেটাই সত্যি। কুড়ি পূর্ণ হবার আগেই তার প্রিয় কাজ হয়ে দাঁড়াল আমাকে অসভ্য কিছু দৃশ্যের স্বাদ নিতে বাধ্য করা। একটা বুনো জন্তুর মত হয়ে দাঁড়াল। সত্যি সত্যি। চিৎকার করে, পা দাপাদাপি করে, অদ্ভুত, উত্তপ্ত, বিশ্রী কাজকর্ম, কি লজ্জা! সমস্ত প্রতিবেশিরা ওর গলা শুনছিল। আমার ওপর এত গায়ের জোর ফলাচ্ছিল… শেষমেষ দরজা খুলে, আমার অনুমতি না নিয়েই চিৎকার করতে লাগল যে আমি ওকে কিচ্ছু কাজ করতে না দিয়ে ওকে আহত করেছি। একথা কেউ বিশ্বাস করবে? হ্যাঁ, একথাই সে বলত। আর আমাকে কাঁদিয়ে ছাড়ত। কারণ…কি অসভ্যতা! ছেলেমেয়েরা কি অকৃতজ্ঞ হতে পারে! যখন থেকে সামান্য মদ্যপান শুরু করি মনে হয় তখন থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। আমি স্বীকার করছি। আমি জানি এটা কোন ভালো কাজ নয়। কিন্তু মারিয়াননে বাইরে ছিল। চারপাশে বিপদের মাঝখানে। আর আমি বেঁচে থাকতে পারছিলাম না। সেটা সত্যি। এমন কি আমার ছোট্ট মেয়েটার ওপর কি বিপদ চলছে একথা ভেবে শ্বাস নিতেও পারছিলাম না। একা একা অচেনা লোকদের মাঝে, আশেপাশের গরীব বস্তির ছেলে সব। সেই বিষাক্ত সব ছেলেমেয়ে, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, মদের গন্ধ ঘুরপাক খাচ্ছে। যেমন খুশি নরকের মত সব আচার আচরণ করত, অতগুলো পুরুষের গায়ের ঘামের মধ্যে, গা থেকে নোঙরা জামাকাপড় ফুটে বের হওয়া সেই প্রচুর পরিমাণ বর্জ্য পদার্থ; আর স্কুটারগুলো। ওগুলোকে আমার সবচেয়ে ভয় লাগত। মারিয়াননে একটা স্কুটারে যদি চড়ে, এখন যে পরিমাণ দুর্ঘটনা হয়, আর যে ধরণের ধর্ষণকারী, খুনী, ড্রাগের নেশাসক্ত, বিদেশী– যাদের এসবের কোন অধিকার নেই, তারপর ওর মতো কোন পরীকে তার মোটরে চড়ানো এবং তার পর একটা নরকে গিয়ে থাকা, যাতে পরে তারা বলতে পারে মাতৃত্ব কোন নাটক নয়… শেষ অবধি সেটা কোন জীবন নয়। তাদের অনুরোধ করি যে সেগুলো যথার্থ বেঁচে থাকা নয়। সবকিছু, সঅবকিছু আমি চেষ্টা করেছি শান্তি বজায় রাখবার জন্য। কিন্তু মেয়েটা আগেকার মত বাড়িতে পার্টি দিতে রাজি হল না। বলতে লাগল যে ওর বন্ধুরা আসতে চায় না, এইজন্য যাতে মাঝরাতগুলোয় ও নিজে তাদের ওখানে চলে যায় আমার কাছ থেকে। যাতে তাদের কপালে দুদিক দিয়েই মাখন জোটে। কি অকৃতজ্ঞতা। আর তারপর আমাকে একা ফেলে রেখে যায়। আমি এক পেগ হাতে নিয়ে সময় কাটাই। তারপর আর একটা , তারপর আরো এক। দশটা বা সাড়ে দশটা পর্যন্ত যতক্ষণ না দরজায় ওর চাবি ঘোরানোর আওয়াজ কানে আসে। অথচ এই নীতিজ্ঞানহীনটা কখনো তার আগে ফিরত না। কি বলব, ওর কিন্তু জানা ছিল যে সাড়ে আটটায় রাতের খাবার খেয়ে নিতে পছন্দ করি আমি..
একথা ঠিক যে সবচেয়ে খারাপ বিষয়টা তখনো আসে নি। জঘন্য ব্যাপারটা হল ছেলেটার উচ্চতা সাতান্ন মিটারের বেশি মাপের ছিল না। কালো চুল, কোঁকড়া, লম্বা আর একটা অদ্ভুত মুখ, সীমাহীন চালাক, নানা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যে ভরা। যেন ভুরু, চোখ,নাক, চিবুকের হাড়, মুখ– তাতে মোটা দুটো ঠোঁট– না শুধু মোটা না ভীষণ মোটকা। আমি শপথ নিয়ে বলতে পারি ঠিকঠাক করে বললে সেগুলো বাঁদরের ঠোঁটের মত। ওর নাম নেস্তোর রোবের্তে, ট্রাম্পেট বাজিয়ে।– ওই ঠোঁট দিয়ে আর কিই বা সে করতে পারত! জন্ম ‘এল সালভাদরে’। ও সালভাদরবাসী ছিল! ভাবা যায় ? সালভাদরবাসী! দেখুন আপনারাই বলুন আমাকে…, কোনো ইউরোপীয়ান রক্ষণশীল মা তার মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে যখন সে দেখে যে তার একমাত্র মেয়ে কোন সালভাদরবাসীর সঙ্গে প্রেম করছে? স্বাভাবিকভাবেই না। সেইজন্য আমি মারিয়াননেকে বললাম যে দুজনের মধ্যে একজনকে তার বেছে নিতে হবে। মারিয়াননে বেছে নিল। আর ছেলেটার সঙ্গে থাকার জন্য বাড়ি থেকে চলে গেল।
পরের তিন বছর খুব কম, কোন কোন রবিবার খাবার সময় আসত। আমি বুঝতে পারছিলাম যে আমার খারাপ ব্যবহার বেড়ে গিয়েছিল। কনিয়াকের বোতলটা এগিয়ে দেওয়া এড়িয়ে গেছি, একটা সীমা পর্যন্ত। খবরের কাগজ এগিয়ে দেওয়ার কাজটা ছেড়ে দিয়েছি, সকালবেলা কোন না কোন পানীয় নিয়ে বসে পড়েছি–, তবে আমি আমার সপক্ষে নির্দিষ্ট করে বলতে চাই যে, মেয়েটার ব্যবহার দিনকে দিন আমার চেয়েও আরো বাজে হয়ে যাচ্ছিল। সালভাদরবাসী ছেলেটার পরে একজন পাকিস্তানী এল। পাকিস্তানীর পরে একজন আলজিরীয় ছেলে, এবং শেষমেষ আমেরিকার সেই টেররিস্ট মুর ছেলেটা। মেয়ে বলত ছেলেটা একজন বিপ্লবী। সবচেয়ে অশান্তিবাজ ছোকরা। কিন্তু ঘটনাটা হল যে এই শেষ ছেলেটা আমার খুব চোখে পড়েছিল। আর আমার ওর প্রতি আগ্রহ হয়েছিল। সে দৌড়বিদ বা বাস্কেটবল খেলোয়াড় বলে নয়। জ্যাজ সঙ্গীত গায়ক হিসেবেও নয়। কারণটা হল ছেলেটি টাকাকড়ি বানানোর সারিতে ছিল। আর এতেই বোঝা যায় যে আমার মেয়ে সমস্ত ভালমন্দ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেনি । কারণ সত্যি কথা বলতে কোন কোন ক্ষেত্রে চামড়ার রঙ ইত্যাদি খুঁটিনাটিগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ, তবে অন্যসব জিনিষ কখনোই অতটা গুরুত্ব পাবে …তাও ভাবি নি। তবে অন্য কোনো সময়ে আমার তা জিজ্ঞেস করবার কথা মনে হল। ভগবান, কোন সময়টাতে হল। হে যীশু, হে মেরী– ওনারা আমাকে সবসময় সমস্যায় ফেলেন ! না, মা,–মারিয়াননে বলল–ছেলেটা তোমার চেনা। অনেক বছর আগে নিউইয়র্কে যখন থাকতাম, ও একজন বিখ্যাত ফটোগ্রাফারের মডেল ছিল। সেই ফটোগ্রাফার এখন এইডস্ রোগে মারা গিয়েছে… আমি চমকে পড়ে যাই নি, মেয়ে তখন একটা উচ্চারণের অযোগ্য পদৰী ঘোষণা করল। ফটোগ্রাফারটা হ্যাঁ, মেয়ে। মারিয়াননে বলেই যাচ্ছিল যে ছেলেটা এখন খুব ফ্যাশন আইকন হয়ে গেছে কারণ ওর প্রদর্শনীগুলো সেন্সর করা হয়েছিল.. আমি যেন একটা পাগল–, যাইহোক শেষ পর্যন্ত যখন ছবিগুলো দেখলাম , মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে যাব। উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যে আমার কানে মৃত্যু ডেকে আনছিল– সেসব কিছুই ওর নজরে পড়ে নি।– এমন মুখ করে থেকো না মা!–বলল সে, আরে এগুলো অনেক পুরোনো ছবি, ও যখন নিউইয়র্কে থাকত তখনকার ছবি। এটা ঠিকই ও হোমোসেক্সয়াল ছিল,তবে এখন ও মেয়েদেরও পছন্দ করে। আমার জন্য ভাবছ কেন মা? আরে শোনো না, আমি কখনো এত সুখী থাকি নি। মা… মারিয়াননে একথা বলল আমাকে! আমি তিনদিন মাতাল হয়ে ছিলাম। পুরো তিনটে দিন, যতক্ষণ না ছেলেটার সঙ্গে ও স্কুটার চড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে একথা বলার জন্য আমাকে ডেকে ওঠাল । মস্কো পর্যন্ত যাচ্ছে। ছুটি কাটানোর জন্য। আমার কোন শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। এমন কি ভয় পাবার জন্যও নয়।।
এইরকম পরিস্থিতিতে, আপনারা বুঝতেই পারবেন যে দুর্ঘটনাটা আমার মনে হয়েছিল ঈশ্বরের দান। মারিয়াননে বাড়িতে ফিরে এল। ওর বিছানায়, চারপাশে ওর পুতুলগুলো আর টেডি বিয়ারগুলো নিয়ে– ওগুলো যেন নতুনের মত ছিল। কারণ মেয়েটা আমাকে ছেড়ে যখন চলে গেছিল তখনো আমি নিজের হাতে ওগুলোকে হাল্কা ডিটারজেন্ট পাউডার দিয়ে কেচে রাখতাম। ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, যেন ওদের একা না লাগে। ওদের নিজের হাতে চুল আঁচড়ে দিতাম, সব সব কিছু করতাম আমি। যার ফলে সত্যি সত্যি মনে হত পুতুলগুলো সদ্য কেনা হয়েছে। মারিয়াননে যখন ছোট ছিল, তখন যেমন ছিল এখনো ঠিক সেই রকম। শুধু পুতুলগুলোর হাত পাগুলো ভেঙে গেছিল। মারিয়াননে যখন ঘুমোতো, আমি ওর পাশে বসে থাকতাম, ওকে দেখার জন্য। মনে মনে আমার এত সুখ হত, যে মনে হত এক পেগ পানীয় নিয়ে সেই আনন্দ উদ্যাপন করি। যখন ও জেগে উঠত, সমানে বলত যে ওর প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে, আমি সহ্য করতে পারতাম না। এমন করে ওকে দেখতে পারতাম না। এত অল্পবয়স, আমার খুকী, এত কষ্ট পাচ্ছে। তাই আরেক পেগ পানীয় নিয়ে বসতাম, যাতে মনে দম নিতে পারি, বল বাড়ে। আর ওকে আরো একটা ওষুধের বড়ি দিতাম। ডাক্তারবাবু খুব বিরক্তিকর লোক ছিলেন। আমাকে একশবার করে উপদেশ দিয়ে রেখেছিলেন ওষুধের মাত্রা যেন বেশি না হয়, তাহলে সাংঘাতিক বিপদ। ওইসব ঘুমপাড়ানি ওষুধ গুলো নেশার মত অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু ঘটনা হল, ওইসব ডাক্তারেরা একজন মায়ের কষ্ট কি করে বুঝবে…! দিন কেটে যাচ্ছিল। আর মারিয়াননে সেরে ওঠছিল। মুখে আবার রঙ ফিরে আসছিল। ওর সাদা ত্বকের ওপরের ঘাগুলো শুকিয়ে সমান হয়ে আসছিল। আর ওর আগের স্বভাবও ফিরে আসছিল ঘরকুনো, বাধ্য, মিষ্টি আর অনুগত। আমি ওর মুখে সেই আশ্চর্য ওষুধের বড়ি ঢুকিয়ে দিতাম, ও ওর মাথাটা পিছনে হেলিয়ে দিত, যাতে গিলতে সুবিধে হয়। এক চুমুক জল খেত আর তারপর ওকে দেখতাম। ওর সাদা চোখ দিয়ে আমার দিকে চেয়ে হাসত। এত খুশী থাকত যে আমি কখনো ওকে তার বিপরীত অবস্থায় দেখতে চাই নি। না কক্ষনো না। অনেক ঘন্টা ধরে ঘুমোতো ও। ঠিক যেমন ছোটবেলায় ঘুমোতো। রাত্রিবেলা আমার পাশে বসত টিভি দেখার জন্য। কখনো চ্যানেল পাল্টাতে বলত না। আমার মারিয়াননে। ওর কাছে সবকিছুই ভাল লাগত। আমরা দুজন একসঙ্গে। সুখী। আবার। আগের মত একইরকম।
যখন ওই ডাইনিটা আমাকে বলল যে প্রেসক্রিপশন ছাড়া এই ওষুধ আর আমাকে বিক্রি করবে না, মনে। হল আমার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল। আমাকে এগুলো স্বীকার করতেই হবে। কারণ আমি এইজন্যই এখানে এসেছি। আমি স্বীকার করতে এসেছি যে আমি মদের নেশায় আসক্ত। এটা স্বীকার করতেই এসেছি যে বাড়ি ফিরে গিয়েই সুপারমার্কেট থেকে কেনা খুব সস্তাদরের স্প্যানিশ ব্র্যান্ডির পুরো বোতলটা আমি সাবড়ে দেব। যদিও এখনো দুপুর বারোটাও বাজে নি। কিন্তু …। আপনারা আমার দায়িত্বটা নিন, আমার মরীয়া লড়াইটা নিন! আহা বেচারা। আমার খুকী, আমার মারিয়াননে। শেষ অবধি আমাকেই সে আশ্রয় নেবার জন্য খুঁজে পেল। আমি ওর মা, আমার মধ্যেই সেটা পেল। আমি, যে কিনা একমাত্র মানুষ যে ওকে সত্যিকারের ভালবাসে, ভালবেসে এসেছে আর বাকী জীবনটাতেও ভালবাসবে…তখন ঠিক করলাম এখানে এসে থাকবার জন্য আমরা সব বিক্রি করে দেব। এই বাড়িটাতে আমার অসাধারণ ছোটবেলাটা কেটেছে। এই ছোট্ট পাহাড়ী গ্রামে আমার ইস্কুলের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু পাকাপাকি ভাবে থাকে। পড়াশোনা শেষ করে একটা ওষুধের দোকানের মালিক ও ফার্মাসিস্ট হয়েছে। প্রচুর ওষুধের ভাঁড়ার আছে ওর। সেকথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। কারণ ও আমার বন্ধু। ওর চার চারটে ছেলেমেয়ে। ও জানবে না তো কে জানবে এরকম বিষয়? বড় অসুখের বেশি ওষুধ– একথাই ও আমাকে বলেছে। কাউন্টারের ওপরে ওষুধের বাক্সের পাহাড় রেখে একথা বলেছে। মারিয়াননে খোলামেলা পরিবেশে থাকতে খুব পছন্দ করছে। ছোটবেলাতেও এরকমই পছন্দ করত ও, যখন আমরা ছুটি কাটাতে আসতাম। আর এখন? ইয়ে, একইরকম। কারণ ও কক্ষনো কিছু বলে না। কিছুর জন্য অভিযোগ জানায় না। শুধু হাসে। সারাদিন শুধু হাসে। বেচারা। এখন আবারও এত ভাল…
ছেলেটা? আহ! ছেলেটার নাম ক্লাউস। ও আমার মেয়ের প্রেমিক… এটা ঠিক, আপনাদের ওর কথা জানাতে হবে। ও ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার ছিল। আপনাদের মনে পড়ছে না? যখনই ওকে প্রথম দেখি, ভেবেছি আমার মারিয়াননের জন্য ওই উপযুক্ত হবে। লম্বা, রোগা, দারুন দেখতে। অনেক দিন আগেকার সেই জন্তুগুলোর সঙ্গে কোন মিল নেই, কোন কিছু মিলই নেই। অ্যাঁ? আর যথেষ্ট সাদাসিধে– হ্যাঁ ম্যাডাম, আচ্ছা ম্যাডাম, যতক্ষণ চাইবেন ম্যাডাম। যদিও সত্যি কথা বলতে কি আমার মনে হয় একটু অভদ্র। কারণ প্রথম দিন যখন আমরা কথা বলি, আমি ওকে জানাই যে আমার একটি খুউব সুন্দরী মেয়ে আছে, আর আমি ওকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করি। ও আসে নি। আমার অবাক লেগেছিল। ভেবেছি সবচেয়ে খারাপ ব্যপার হল ছেলেটা খুবই লাজুক। কয়েকদিন পরে আমি আবার ফিরে আসি আর ওকে মারিয়াননের একটা ছবি দিই। কিন্তু ও আমাকে পাগলের মত কিছু কারণ দেখালো– ইয়ে হ্যাঁ। আপনার মেয়ে সুন্দরী ম্যাডাম। ঠিকই, উনি সুন্দরী।– ওকে আবার ডিনারে নিমন্ত্রণ করলাম। আবার ও এড়িয়ে গেল। পারল না আসতে। যাই হোক আমি ওর সঙ্গে লেগে রইলাম, কিন্তু পরের দিনটা আর কখনো এল না। তার পরের দিন, তারও পরের দিন– আমার রাগ হল প্রচন্ড। শেষপর্যন্ত ওকে ডাকা ছেড়ে দিলাম। যখন টাকার প্রয়োজন হত আমি ডানদিকের স্বয়ংক্রিয় টাকা তোলার যন্ত্রের কাছে যেতাম। আমার জন্য ভাবছিলে! এই মেশিনটার চেয়ে তোমার দাম যখন বেশি নয়, তখন মর গিয়ে!
কিন্তু দিদিমা হবার ইচ্ছে আমি ছাড়ি নি, সেকথা সত্যি। হাল আমি ছাড়ি নি। আমার মারিয়াননের বয়স ত্রিশ হতে চলল। আমরা দুজনে খুব সুখী ছিলাম কিন্তু এবার ওর বিয়ে করার সময় হয়েছিল। আমার প্রয়োজন হয়েছিল যে ও বিয়ে করুক। আমি বিয়েতে খুব আনন্দ ফুর্তি করব, আঞ্চলিক বিয়ের পোশাক পরব যা আমার বিয়ের সময় আমার মা পরেছিল। একটু ছোট্ট চোখের জল ফেলব যখন সে পাদ্রীর সামনে বলবে– হ্যাঁ..এই এক আনন্দ কোন মা ছেড়ে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, কারণ ভাল করে দেখলে এটা কোন আনন্দ নয়… এটা একটা অধিকার! তাইতো, এক বৃহস্পতিবার বিকেলে যখন এইরকম মদ্যপায়ীদের একটা সংগঠন “অচেনা মদ্যপ”-তে আসছিলাম দেখলাম ক্লাউস ব্যাঙ্কের দরজা বন্ধ করছে। আমি আমার প্ল্যানটা গুছিয়ে বানালাম। এক সপ্তাহ পরে, সেই একই দিনে, একই সময়ে আমি তার পেছন দিক থেকে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তারপর আমার মৃত স্বামীর পিস্তলটা তার বাঁদিকের রগে ঠেকিয়ে– কি আনন্দ।– শোনো ক্লাউস!– এখন আমার সঙ্গে এসো…। আমাকে ছেড়ে দিন ম্যাডাম। ওপরে যা রাখা আছে সব আপনাকে দিয়ে দেব–বলল সে।–খুব উদ্ধত ছেলেটা। কিন্তু এটা কোন ব্যাঙ্ক ডাকাতি নয়, বাছা– আমি বললাম…এটা একটা অপহরণ! –গুবরে পোকা একটা। কাঁদতে শুরু করে দিল। কচি খুকীর মত ফোঁপাতে শুরু করে দিল। আপনারা ভাবতে পারেন? এই অদ্ভুত পৃথিবীতে কোন একটাও পুরুষমানুষ দেখেছেন এরকম!
এখন আমরা তিনজন একসঙ্গে থাকি। মারিয়াননে, ক্লাউস আর আমি। এটা কখনকার তোলা ছবি? দিন চারেক আগেকার… হ্যাঁ, ঠিক। ছেলেটিকে খুব সুখী মনে হচ্ছে না। সবসময় পালানোর সুযোগ খোঁজে। ঐটা খুব সত্যি যে রাতে যাতে ও পালাতে না পারে তার জন্য ওকে আমি বিছানায় কিছু শেকল দিয়ে আটকে রাখি। তবে ওর অভ্যেস হয়ে যাবে। ঠিক অভ্যেস…। আমি চেষ্টা করি যাতে এই আটক করে রাখা, কাঠ কাটা, ক্ষেতে কাজ করা, পাঁচিলটা ঠিকঠাক করে রাখা, কারণ এভাবে এটা ভাল করে সামলানো যাচ্ছে। সবকিছু খুব সস্তা, আর নিশ্চিতভাবেই যেহেতু আমাদের কাউকে দরকার নেই, আমাদের দুজনকেই অতএব সব কাজ করতে হয়। ক্লাউস কাজ করে আর আমি ওর পিছু পিছু যাই, পিস্তলটা নিয়ে… মারিয়াননে ? ওর কাছে সব কিছুই ভাল ঠেকে। আপনার তো দেখেছেন। কেমন করে হাসে ও। দুহাত ছড়িয়ে …একটু অদ্ভুত আচরণ মনে হচ্ছে? ইয়ে, হ্যাঁ। হয়েছে কি যতদিন ধরে ও ওষুধটা খায়, হাতদুটো খুব দুর্বল হয়ে গেছে। নড়াচড়া করে এত হঠাৎ হঠাৎ, এত ছাড়া ছাড়া, শেষমেষ… এতে আমার সন্তুষ্টি হয়। সত্যি? হ্যাঁ, সত্যি। কারণ আমি নিশ্চিত যে শেষকালে সব কিছু ঠিক ঠাক হয়ে যাবে। শুধু একটা জিনিষেরই অসুবিধা। সেটা হল মদ্যপানের অভ্যেসটা ছাড়া। আর তারপর এক শুভ দিনে, ওরা একে অন্যের দিকে তাকাবে। নিজেদের বুঝবে। আমার সমস্ত আত্মত্যাগ তো এই একটা কাজের উদ্দেশ্যেই। কারণ, ইয়ে …একজন মা তার একমাত্র সন্তান, তার মেয়ের জন্য কি না করতে পারে, বলুন তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *