কবিতা সিংহের গল্প: চিত্

পুতুল সদরে দাঁড়িয়ে তানীর ছাগল দোয়ানো দেখছিল। আর তানীদের দড়ির চারপাই-এ বসে পাড়ার উঠতি বয়সের ছেলের পাল, গুলতানি করা ছেলের পাল, পুতুলকে দেখছিল। 
পুলিন ঠিক সেই সময়টাতেই গলির মুখে ঢুকল। গলি আবার কী? হাত-তিনেক, প্যাচপ্যাচে কাদাওঠা কানা একটা খোঁদল একটা বড়ো বাড়ির মাজা ভেঙে দুফাল করে ঢুকে গেছে। গলিটা যে দেয়ালে গিয়ে ফুরিয়ে গেছে, তার গা থেকে তানীদের ছোট্ট চালা। তানী থাকে, তানীর ঘুঁটেওয়ালি মা থাকে আর মুটেবাবা। আর ছাগলটা। দু-পাশের টালখাওয়া জানলা, ছাদ থেকে ঝুঁকে আছে দু-চার জন। চা খাচ্ছে, গল্প করছে। আকাশের ঘুড়িওড়া দেখছে। যারা এক-পো আধ-পো দুধ নেবে তারা তানীর দু উরুর মধ্যে চেপে রাখা দুধের ছোটো বালতিটায়, ফেনায় ফেনায় ফেঁপে ওঠা দুধের ফিনকি দেখছে।

আবার- ফিরে ফিরে ঠিক পুতুলকেও দেখছে।
 

সত্যি, কে বলবে বলো দেখি। এই পুতুল কি সেই রোগা পুতুল? হারানের বিয়ের সময়কার সেই সিড়িঙ্গি মেয়েটা? হারানের বউ-এ সঙ্গে পুতুলও ক’দিন তার দিদির সঙ্গে থাকতে এসেছিল। তখন পুলিন তাকে খোলামকুচির খেলাটা শিখিয়ে দিয়েছিল। সত্যি এই খোলামকুচি নিয়ে, আপন মনে কী সুন্দর সব খেলা যায়। একটা কিছু ভেবে নিয়ে ওপরে ছুঁড়ে দেওয়া আর লুফে নেওয়া। চিত হলে ফলে যায় আর উপুড় হলেই বি-ফল! আর খেলতে খেলতে কেমন ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্ন তৈরি হতে আরম্ভ করে আর গল্পের টানেল খুঁড়ে খুঁড়ে, তারা চলতে থাকে ভিতর ভিতর।
 
এই বাড়িটায় পৌঁছাতে হলে বড়ো রাস্তা থেকে গুনে গুনে পাঁচটা বাঁক। অথচ তাতেই কত তফাত।

বড়ো রাস্তায় কত আলো, কত শব্দ, ট্রাম বাস মিনি জামা কাপড়ের দোকান-পাট, গোলদিঘিতে সাঁতার, ট্রানজিস্টারে খেলার রিলে। আর এখানে। এই গলিতে? বাড়িগুলো সব খণ্ডবিখণ্ড, ছন্নছাড়া নষ্ট দাঁতের সারি হয়ে নড়বড়ে দুলছে। সামনের বর্ষার ভার সইবে কিনা সন্দেহ।
 

তবু পুলিনের মন খারাপ করে দেয় ক্কচ্চিৎ কখনো শ্রীহীন বাড়িগুলোয় লেগে থাকা একটি আধটি সাহেবি আমলের পোর্সিলিনের টালি, খানিকটা খানিকটা পঙ্খের কাজ, কখনো জানলার শার্সিতে আটকে থাকা রঙিন কাচের টুকরো- এসব বড়ো কষ্টের মতো বেঁধে পুলিনকে। যেমন বেঁধে পুতুল।
 
বড়ো বেশি শরীর পুতুলের শরীরে। বড়ো উগ্র। আগে যখন কাছে আসত পুতুল একটা ফিকে লেবুতেলের সুবাস লাগত পুলিনের নাকে গা থেকে উঠতো গাঁ-দেশের ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ। এখন মনে হয পুতুলের চাপ চাপ চুলের ভারে কেবলই বর্ষা স্যাঁতা শরীরে ঘাম আর বাসন মাজার গন্ধ। তবু কখনো, ক্কচিৎ কখনো, পুতুলের চাউনিতে, হাসিতে একটি দুটি সূক্ষ্ণ পঙ্খের কাজ, কর্নিকের গড়ন-দেখতে পায় পুলিন। আজও একঝলক দেখল।
 
সদরের এজমালি দরজার সামনে খানিকটা জমা জলের ওপর পিশু পোকা উড়ছে। তার ওপর পাতা ইঁটের ওপর পা ফেলে ফেলে পুলিন পুতুলের পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকল। আর পুতুলের শাড়ি থেকে উনুন ধরানোর গন্ধ পেল।
 
সদরের অন্ধকার গর্তটার মধ্য দিয়ে ভিতরে ঢুকলে প্রথমটা কিছু দেখাই যায় না। ভিজে ভিজে অন্ধকার প্রায় ঝালরের মতো গায়ে লাগে। ক্রমশ চোখ সয়ে এলে, তবেই পাশের, প্যাসেজ বেয়ে উঠে, উঠোন ঘুরে নিজের আস্তানায়, অর্থাৎ এই মহলের শেষপ্রান্তে যেতে পারে পুলিন।
 
কী ছিল আগে এ মহলটা? উঠোনের পাশের জমির সঙ্গে সমান ছোটো ছোটো খুপরিতে বোধহয় ঘোড়ারাই থাকত। এখন এক-একটি খুপরিতে এক-একটি পরিবার। মাঝখানের উঠোনটার আর কোনো অস্তিত্বও নেই। কেটে কেটে নিচু নিচু দেয়াল তুলে, খুপরি ঘরের সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। মানে প্রত্যেকটা ঘরের রান্নার জায়গা, আর বাসন মাজার জায়গা।
 
এ সময়টা বাড়ি ফিরলেই পুলিন দেখে, নিজের নিজের খোপের সামনে, বাসন মাজতে, কিংবা কাপড় কাচতে বসেছে মেয়েরা। উঠছে এঁটো বাসনের গন্ধ, কুলকুলিয়ে ওঠা যার যার আলাদা উনুনের ধোঁয়া আড়চোখে খুপরির ভিতরের আব্ছা উঁচু তক্তপোশ, বক্স প্যাটরা, বিছানার টাল, কখনো হতভম্ব শিশু দেখা যায়। উঠোনের এপাশের, অর্থাৎ খুপরিগুলোর উল্টোদিকের প্যাসেজ দিয়ে চবিবশ ঘণ্টা এত বাইরের লোক যাতায়ত করে যে মেয়েরা কেউ মুখ তুলে চেয়েও দেখে না। কিংবা হয়তো তাদের আর কিছু দেখবারই ইচ্ছে বাকি নেই।
 
পুলিনের তো সবাইকেই এক রকম মনে হয়। হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তোলা। বেরঙা শাড়ি পরা ভাঙাচোরা কতকগুলো মেয়েমানুষ। এদের মধ্যে পুতুলে দিদি নির্মলাও আছে।
 
এদের প্রত্যেকের মধ্যেই পুলিন তার মায়ের কিছু কিছু অংশ দেখতে পায়। এমনি পুতুলের মধ্যেও পায়।

কোন্ অংশ? কে জানে, এখনো ঠিক পরিষ্কার করে ধরতে পারেনি পুলিন। পুলিন প্যাসেজ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উঠোনের দৈর্ঘ্যটা পেরিয়ে গেল। তারপর মস্ত একটা ঘর। বোধহয় একসার ঘরের মাঝের দেয়াল ভেঙে নেওয়া হয়েছে। এখানে সারাদিন ধরে চলে ঘটাং ঘটাং। একটা ছোট প্রেস। একদিকে কম্পোজিটারদের খোপ। একদিকে মেশিন। আর পিছনে টালকরা কাগজ আর গ্যালির উঁচু দেয়াল দেওয়া, সরু গলির মতো জায়গাটা ফুট চারেক মতো হবে হয়তো। সেই লম্বা ফালিটা পুলিনের। লম্বায় অনেকখানি হলেও চাওড়ায় সরু। পুলিনের এই ফালির একপাশে কাগজের দেয়াল, আর একপাশে নোনা-ধরা এবড়ো খেবড়ো দেয়াল। দেয়ালটা এত নড়বড়ে যে কখন যে খসে পড়ে এই ভয়ে কেউ থাকতে চায় না। ভয় করার কারণও আছে। এই তো গত বর্ষাতেই সেই কাণ্ডটা ঘটেছিল। বাড়িটার সিলিঙ্ এত উঁচু যে ওপরে তাকাতে ঘাড় ভেঙে যায়। ওপরটা ঝুলকালো। নোনা-ধরা দেয়ালের গা দিয়ে একটা সঙ্কীর্ণ ইঁটের সিঁড়ি ধাপে ধাপে উঠে গিয়ে একটা বন্ধ দেয়ালের কাছে গিয়ে হঠাৎ শেষ হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ একটা অদ্ভুত খাঁজকাটা খাঁজকাটা সিঁড়ি একটা দেয়ালের গায়ে হঠাৎ হারিয়েই বা গেল কেন? পুলিন মাঝে মাঝে কথাটা ভাবত। হঠাৎ একদিন, ঘোর বর্ষায় সেই বন্ধ দেয়াল থেকে ঠিক একটা দরজার মাপে খানিকটা অংশ খসে পড়েছিল নীচে। ভাগ্যিস পুলিন তখন পাশের প্রেসে বসে চা খাচ্ছিল! না হলে অক্কা পেয়ে যেত সেদিনই।
 

তা যাই হোক গে, পুলিনের আস্তানার ওপরদিকের অনেকটাই এখন উদোল। তাতে পুলিনের কিছুই তরবিশেষ হয়নি। বৃষ্টি পড়লে একটা পর্দার মতো গুটানো তেরপল ফেলে দেয়। বরং খাঁজকাটা সিঁড়ি দিয়ে ভাঙা খোঁদলটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালে দারুণ মজা। প্রেসের লোকেরা বলেছিল, সেকেলে বাড়ি তো, হয়তো তখন ওই দেয়ালের ওপারে কোনো গুপ্তঘর বা গুমঘরের চোরাই জায়গা ছিল। কিন্তু এখন?

-পুলিন উঠে গিয়ে দেখেছে শুধু খানিকটা এবড়ো-খেবড়ো চাতাল দেয়াল কামড়ে পড়ে আছে। সেইখানে- নাঃ থাক্। ওটা পুলিনের একার ব্যাপার। ওখানে পুলিনের সঙ্গে কেবল পুলিন-ই।
 

পুলিনকে আসতে দেখে হারান ছাপাখানা থেকে গলা বাড়িয়ে ডেকে বলল- বাজারে যাবে নাকি?

পুলিন তার আস্তানার দিকে এগোতে এগোতে বলল, যাবো তুমি তৈরি হও, আমি এক্ষুনি আসছি। প্রেসের আলোকিত ঘরটা পেরিয়ে নিজের আস্তানার মুখের দিকে এসে পুলিন নর্দমার ধারে বালতি তোলা জলে ঘষে ঘষে পা ধুয়ে নিল।
 

তারপর চটের পাট করা থলিতে গা মুছে তার নিজের আড়ালটিতে ঢুকল পুলিন। সারা জায়গাটা জুড়ে মাদুর পাতা। পায়ের তলায় মাদুর কাঠির চিকন চিকন স্পর্শ আরশোলা ইঁদুর মশাকে মেরে মেরে তাড়িয়েছে। ধুনো দেয়। ফ্লিট দে়য়। তাড়াতে পারেনি শুধু নোনা ইঁট আর পুরোনো কাগজের গন্ধ। ..এখানে এলেই তার মন তৃপ্তিতে ভরপুর হয়ে যায। পুলিন পরিচ্ছন্ন। দড়িতে তার জামা কাপড় গুছানো। তার

ছোট টিনের বাক্স। গোটানো বিছানা আর দপ্তরির কাজের জিনিস। এ ছাড়া রান্নাবান্নার স্টোভ আর বাসনপত্র। নিজের সরু ফালির সেই অন্ধকার কুয়ো থেকে ওপরের আলোময় খোঁদলটার দিকে তাকাল পুলিন। এখন তার সামনে সেই লুপ্ত দরজার ভাঙা আয়ত ক্ষেত্রটায় অপরাহ্নের বেগুনফুল-রঙা আকাশ উঠে দাঁড়িয়েছে। আহা!
 

পুলিনের চোখ দুটি যেন ভরে গেল।
 
ছোট্ট একটা ঘটিতে করে জল নিয়ে পুলিন আস্তে আস্তে সেই বিপজ্জনক সিঁড়ির খাঁজে খাঁজে পা ফেলে ফেলে উঠতে লাগল। যেন সে মন্দির যাচ্ছে!
 
মানুষের সংসারের গন্ধ, বদ্ধতা, মেশিনের ঘটাং ঘটাং পেরিয়ে তানীর ছাগলের গলার ঘন্টাধ্বনি তার দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল। আর সে যত ওপরে উঠতে লাগল ততই তার চোখেমুখে হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগতে আরম্ভ করল।
 
ছোটবেলায় পুলিনদের বস্তির পাশের খোপে থাকত ধোপানিদের দাদিবুডি। দাদিবুড়ি ফোলা ফোলা দুপা ছড়িয়ে কেবল দেহাতের গল্প করত। তাদের দেহাতের পার্বতী মন্দির। সাদা, চুনকাম করা। নদীর ধারে যে যায় সে বড়ো ঘণ্টাটা একবার করে বাজিয়ে চলে যায়। চারপাশের গেঁহুরক্ষেত। সোনালি হলুদ। খয়েরি কাচ ডানার ফড়িং উড়তে থাকে।
 
বেগুনফুলে রঙের পশ্চাদপটে একটা রাঙা টবে দুলছে গাছটা। কী সুন্দর নধর তারশরীর। পুলিনের গুনে রাখা। সব পাতা মুখস্হ। চারপাশে উচু উঁচু বাড়ি। গাছটার বড়ো একলা লাগে হয়তো। এবার বাজারে গেলে, গাছওয়ালা বুড়োটাকে জিজ্ঞেস করতে হবে, কোথায় কোন্‌ বনে? কোন্‌ বাগানে? গাছটাকে পেয়েছিল সে? পুলিন পরম মমতায় ঘটির জলে এক একটি পাতা আলাদা করে মুছে মুছে দিল। তারপর মনে মনে বলল-নাও, তোমার মাথায় আলাদা করে বৃষ্টি ঝরিয়ে দিচ্ছি। স্নান করতে করতে পিছল আর ঝলমলে হয়ে উঠতে লাগল গাছটা। পুলিনকে সে দুলে দুলে নিজের দু’ডালের ফাঁকে ফাঁকে গজিয়ে ওঠা সুকুমার পত্রমুকুল দেখাতে লাগল। নতুন ডাল হবে, তারই লজ্জা কুঁড়ি। ডালে ডালে থোপায় মুঠিয়ে উঠছে ফুল্ল কুসুমগুচ্ছ। কুঁড়ির মধ্যে ঠেলে ঠেলে উঠছে গন্ধমধু।
 
আজ রাতে যখন ফুটে উঠবে তখন গন্ধে গন্ধে পুলিন পাগল হয়ে উঠবে। সেই কথা ভাবতে ভাবতে পুলিনের সারা গায়ে কাঁটা উঠতে থাকে। আকাশের বেগুনফুল-রঙ, তখন আরও আরক্ত। – কই তুমি কোথায়? নীচ থেকে পুতুলের কণ্ঠস্বর ঘুরে ঘুরে উঠে আসতে থাকে। পুলিন চমকে ওঠে। আর তখনই তার হাত লেগে কয়েকটা পাতা খসে পড়ে। পুলিন নিচু হয়ে তুলতে গিয়ে দেখে পাতাগুলো ঈষৎ বিবর্ণ হলদে।

পুলিন থমকে দাঁড়ায় তার মুখও বিবর্ণ হয়ে যায়। এখন তো বর্ষাকাল। এখন তো পাতা খসে না।
 

কই তুমি বাজারে যাবে না? জামাইবাবু ডাকছে। নীচেটা অন্ধকারে একাকার। ওপর থেকে পুতুলকে ঠাহর করা যায় না। পুলিন সেই অলক্ষ শব্দটা লক্ষ করে বলল,- বল, যাচ্ছি-
 
দেয়াল ধরে ধরে অভ্যস্ত পায়ে নেবে এল পুলিন। সুইচ টিপে আলো জ্বালল। পুতুল তখনও দাঁড়িয়ে আছে। একবার পুলিনকে আর একবার খাঁজকাটা সিঁডিটা দেখে সে বলল – খুব সাহস তো? তুমি ওই অত সরু সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলে?
 
সত্যি অদ্ভুত সরু, আর বিপজ্জনক সিঁড়িটা। দেয়ালের সঙ্গে প্রায় মিশে আছে। সহজে বোঝা যায় না। পুলিনের সারা ঘরে চোখের দৃষ্টিটা ঘোরাতে ঘোরাতে পুতুল এবার তাকাল সেই উঁঠুতে, খোলা আয়তক্ষেত্রে। তখনই ওপর থেকে একটা শক্তিহীন পাতা ঘুরতে ঘুরতে নেমে এল।
 
ওটা হাস্নাুহেনা না?

পাতাটা হাতে তুলে নিল পুতুল। তারপর দুঃখিত স্বরে বলল- বাঁচবে না! পুলিন হত্যাকারীর মতো তাকাল পুতুলের দিকে। তারপর বাজারের থলিটা তুলে নিল।
 

বাজারের মুখে এসে পুলিন বলল, – পুতুলের কী ব্যবস্হা হল?
 
-কাল হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।
 
পুলিন বলল, -যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভালো।

-নিজের বউ বলে পরিচয় দিতে হল! তিনটে ছেলেপুলে আছে বলতে হল।

-চুকে-বুকে গেলে তাড়াতাড়ি বিদেয় করে দিয়ো।
 

হারান মাথা নাড়াল। কথাটা পুলিন কেন বলছে হারান জানে। এমন কী পুতুলের রি রি যৌবন নিয়ে হারানের বউ পর্যন্ত ব্যতিব্যস্ত। পুতুল আসার পর থেকেই যেন এই গলিতে, এই পাড়ায় সারাক্ষণ যেন মাংস রান্না হচ্ছে। অথচ পুতুল যাবেই বা কোথায়? হারান পুলিনকে সব কথা বলে। সব কথা বললে যদি কেউ বন্ধু হয় তাহলে অবশ্যই হারান পুলিনের বন্ধু। কলকাতার কাছে মফস্বলে হারানের বউ পুষির বাপের বাড়ি। মাসতিনেক আগে পুতুলকে হাট করে ফেরার পথে তুলে নিয়ে গিয়েছিল কারা! তারপর রেললাইনের ধারে ফেলে দিয়ে যায়। এখন আর তাকে কলকাতায় না এনে উপায় নেই। হারান পুলিন আর পুষি ভেবেছিল কেউ জানবে না। বুদ্ধি করে কাজ হাসিল করতে পারলে পুতুল দিব্যি কুমারী বনে ফিরে আসবে। কিন্তু পুতুল আসবার পর থেকেই চারপাশের আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ খেলছে। সকলের মন চোখ চিন্তা সব যেন দৌড়োচ্ছে নাভির দিকে। এমন কি পুতুলেরও।

এমন কী হারানেরও।
 

বাজারের কাছ বরাবর এলেই পুলিনের মনে হয় সে যেন যাত্রার কনসার্ট শুনছে। কত মানুষ কত জিনিস! জিনিস সাজানোর মধ্যে কত কারিকুরি। বাজারের কাছে এলে তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। শীতের দিনে-শাড়ির দোলাই বেঁধে মায়ের কড়ে আঙুলটি ধরে, সে বাজার কুড়োতে আসত! ফেলা কপিপাতা, পড়া টমেটো, ধসা আলু।
 
-কী ভাবছ পুলিন?
 
-ভাবছি এসব কায়দা যদি তখনকার কালে থাকত, তাহলে আমার মা হয়তো আমাকে আনত না!…

কিন্তু মনে মনে নিজেকে আসল কথাটা বলল পুলিন।

-আমার মাঝে মাঝে কেমন সন্দেহ হয়। আমার মা হয়তো কোনো উঁচু ঘরের মেয়ে ছিল।

মায়ের একটি দুটি কথা, টুকরো টুকরো আচরণ এখন বুঝি যেন!

হারান বলল, ভালোই হতো। আমরা তাহলে জন্মাতাম না। এত কষ্টও পেতাম না।
 

-না, না, এই জন্ম বড়ো ভালো। এই জন্মে বড়ো পরিতোষ। না, না, মা তাকে চেয়েছিল। মা তাকে জন্মাতে দিরেছিল।পুলিন এ কথাটা রক্ত রক্তে বোঝে নাহলে তার জীবন এত আনন্দের হতো না। এত আনন্দ।
 
বাজারের মুখে পুলিন দেখল সেই গাছওয়ালা বুড়োটা দেয়ালে ঠেস দিয়ে তুরীয় হয়ে বসে আছে। পাশে কটা মাটির মুঠোয় ভরা গাছ।
 
পুলিনের একবার ইচ্ছে হলো সে মাথা নিচু করে বুড়োকে বলে- ও বুড়ো! তোমার হাস্নুহানা মেয়ে ভালো আছে! কিন্তু ততক্ষণে হারান খানিকটা এগিয়ে গেছে আর পুলিনেরও পুতুলের কথা মনে পড়েছে- বাঁচবে না। পুলিন হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে বুড়োকে জিজ্ঞেস করল, – ও বুড়ো, তুমি কোথা থেকে গাছ আনো?

-হেই কাকদ্বীপ!
 

কথাটা কোনো মতে বলেই ঘুমিয়ে পড়ল সে। পুলিন মনে করতে চেষ্টা করল তার বন্ধু রঘুনাথ কাকদ্বীপ সাইডের কত নম্বর বাসের ক্লিনার?
 
বাজার পুলিনের বড্ড ভালো লাগে। মাটির বুক ফাটিয়ে বেরোনো এইসব ফলপাকুড়। ফসল দেখলেই পুলিনের ভালো লাগে। কোনো কিছু হয়ে ওঠা দেখলেই। ডালায় সাজানো পুরুষ্টু বেগুনগুলো। আহা গা দিয়ে যেন লাবণ্য ঝরে ঝরে পড়ছে। যেন পাম্প্ করে কেউ যৌবন ঠেসে দিয়েছে শরীরে। সবুজ লেসের মতো গোছা গোছা সরষে শাক। এবডো-খেবড়ো গা-করলা, হালকা বাসস্তী পাতিলেবু। এতসব তরি-তরকারি দেখার পর, মা রাঙা আলুর সঙ্গে মাসকলাই সেদ্ধ করে দিত।কখনো কপিপাতা কুচোনোর সঙ্গে ভাত।
 
বস্তির সেই ছোট্ট খুপরি। উনুন জ্বালিয়ে রুটি সেঁকত মা। মায়ের টানা ছাঁদের মুখখানি জ্বলজ্বল করত আগুনের আভায়। চোখের কোলে গভীর গর্ত। এখন পুলিন বোঝে কত অল্প বয়স ছিল মা’র। কত সুন্দর ছিল মা। ওই অতটুকু ঘরে নানা রকমের মানুষের সঙ্গে উচু তক্তপোশে শুয়ে থাকত মা। তলায় লুকিয়ে রাখত পুলিনকে। তাদের মা ও ছেলের অদ্ভুত গোপন খেলা ছিল একটা। অন্য লোককে লুকিয়ে কখনো কখনো মা নিজের হাতটা নামিয়ে দিত পুলিনের কাছে, পুলিন সেই হাতটি নিজের চোখে গালে বোলাত। লোকটা বুঝতেই পারত না যে, পুরো দাম দিয়েও সে একটা হাত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
 
আর তখনই পুলিন বুঝতে পারত তার মা তার হাতের মধ্যে দিয়ে নেমে এসে গুটিশুটি হয়েছে পুলিনের কাছে। পুলিন জানত তার মা নিজেকে আলাদা করে নিয়েছে মড়ার মতো দেহটার থেকে। সেই থেকেই সে ক্রমে ক্রমে শিখে নিয়েছিল কী করে মনকে দেহ থেকে আলাদা করে নিতে হয়। তাই পুলিন কখনো তার মাকে ঘেন্না করতে পারেনি। কারণ সে জানত তার মা এসব কিছুতেই জড়িত নেই। ওই বস্তির পচা জল-জমা পায়খানা, পুরুষের বাসনা কামনা ঘাম মশামাছি, কাটা কাপড়, ফুটো চাল- সব তার মা ইচ্ছে করলে সারিয়ে দিতে পারে।

কী করে?

এই যেমন তারা মায়েপোয়ে, ঠিক শোবার আগে হাত পা ধুয়ে- গরম কাল হলে রাস্তার জল থেকে জল এনে পরিষ্কার করে গা হাত পা মুছে বিছানায় শুত। তারপর গল্পের জগৎ। অনেককাল আগের সব গল্প।

পুরোনো দিনের। সুখের দিনের। পুলিন তাই রাস্তায় গলিতে, আর পাঁচটা ছেলের মতো খেলেধুলে বেড়াতে পারেনি। কর্পোরেশন ইস্কুলে পড়ত সে। চুল আঁচড়ানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি ছেলে। সে যে অন্যরকম তা সবাই বুঝত। তাই একবার সকলে তার ঘোর জ্বরবিকার হলে মাস্টারমশাইরা নিজেরাই তাকে কোলে করে বস্তিতে পৌঁছে দিতে এসেছিলেন। মার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁরা মাকে আপনি আপনি করছিলেন। এটা পুলিন তখনই লক্ষ করেছিল। একজন মাস্টারমশাই বলেছিলেন- সন্ধ্যার সময় ওকে নাইট স্কুলে পাঠান না কেন? ও সময়টা আপনি তো…
 

মা বলেছিল-এটা তো আমার পেশা। এতে তো কোনে আজ্ঞা নেই বাবু! ও সব জানুক। তাতে কী?
 
মাস্টারমশাইদের একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন-আপনি কি এখানকার? মানে এখানেই জন্মটন্ম?
 
মা বলেছিল-না, আমি অনেক দূরের মানুষ। রংপুরের
 
সেই পুলিন জেনেছিল। তার মা রংপুরের।
 
হারান বলল-কী হে? তুমি কিছু কিনবে না?
 
পুলিন বলল–অ্যাঁ? হ্যাঁ, কিনব। বাইরে থেকে কম দামে কিছু তরি-তরকারি কিনব। আচ্ছা, হারান তুমি আলুর ডাল খেয়েছ?
 
আলুর আবার ডাল কী?
 
-মা রাঁধত। আলুসেদ্ধ করে গলিয়ে জলের সঙ্গে মিশিয়ে- প্রচুর মটরশুঁটি, আমাদের নিজস্ব রংপুরের রান্না।
 
‘আমাদের রংপুর’ কথাটা খুব জোর দিয়ে বলল পুলিন।
 
হারান বলল, বাঃ বেশ ত!
 
আসলে পুলিন কোনোদিন রংপুরে যায়নি। আসলে পুলিনের মা কোনোদিন আলুর ডাল রাঁধেনি।
 
এসব তার আর তার মায়ের কিছু নিজস্ব খেলা। মা যখন শেষের দিকে, লোকের বাড়ি বাড়ি বাসন মাজত, তখন ফিরে এসে স্নান করতে যেত। পুলিন ততক্ষণে ঘর ঝেড়ে মুছে বিছানা পেতে রাখত। মা পাশের ধোপানির উনুনে কিছু কয়লা ফেলে দিয়ে গরম গরম খিচুড়ি করে নিত। কিংবা মুড়ি কিনে আনত। তাই খেয়ে ওরা ঝাঁপ ফেলে দিত। তারপর মা বলত-এবার পুলিন?,
 
পুলিন বলত- হ্যাঁ মা!
 
-কী বাজার করলি বল?
 
বাজার কুড়োতে যেত রোজ পুলিন। বাজারের সেরা তরিতরকারি মাছ মাংস সে দূর থেকে দেখত। সেই সব তরিতরকারি মাছ মাংসের নাম সে তোতাপাখির মতো আউড়ে যেত। মা বলত- বেশ-বেশ বাজার হয়েছে। বাঁধাকপিটা কী সরেস। টমেটোগুলো কী নিটোল! আহা, বাজারের সেরা কড়াইশুঁটি এনেছিস বাবা! কী ভালো- কটা উনুন জ্বালব বলতো? তিনটেই জ্বালি… হ্যাঁ রে সরবতি লেবু এনেছিস? এই দ্যাখো সরবতি লেবুই আনিস নি? – যা যা শিগগির রাজার বাগান থেকে ছিঁড়ে আন। অঢেল আছে।
 
তারপর শুয়ে শুয়ে দুজনের মিছি-মিছি রান্না হতো। খেয়ে দেয়ে রেলে চাপা হতো। খুপরিটা হতো রেলের কামরা, আর ওদের তক্তপোশটা হতো বাঙ্ক । স্টেশনে স্টেশনে গরম চা খাওয়া হতো। পুলিনের জন্য বাড়তি গরম দুধ। বেশিরভাগ দিনই ওরা পুরী যেত। একটা না দেখা সমুদ্রের বালিয়াড়িতে অজস্র না দেখা ঝিনুক কুড়োত।
 
ঝুপঝুপ্‌ করে খানিকটা বৃষ্টি হয়ে গেল। হারান ছাতাটা খুলে বলল, মনে পড়ছে-আমার বিয়ের দিনে এমনি বৃষ্টি হয়েছিল। তুমি আর আমি বিয়ের বাজার করতে বাজারে এসেছিলাম।
 
-ও হ্যাঁ, তাই তো!
 
মনে পড়ে গেল পুলিনের। বছর দুই আগেই তো হারানের বিয়ে হয়েছিল। এমনি বৃষ্টি বাদলার দিনে। হঠাৎ সেদিন সেই বুড়ো গাছওয়ালাটার পাশ দিয়ে যেতে যেতে সাহস করে একটা হাস্নুহানার ছোট্ট চারা কিনে ফেলেছিল।
 
হারান হাঁ হাঁ করে উঠেছিল, -গাছ! কোথায় রাখবে? গাছের জায়গা কোথায়? মরে যাবে।
 
পুলিন মনে মনে বলেছিল, তুমি এটা আস্ত বউ পুষতে পারো আর আমি একটা গাছ পুষতে পারবনা! এখন তাই হারানের বউ আর গাছটাকে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখে পুলিন। মুখে কিছু বলে না।
 
বিয়ের সময় ওই পুতুলের মতোই ঝকঝকে চেহারা ছিল পুষির। প্রথমদিকে স্যাঁতস্যাঁতে রোদহীন দালানে থেকে সত্যিই হাস্নুহানা গাছটা নেতিয়ে পড়েছিল। যদি না হঠাৎ দেয়াল ধ্বসে গিয়ে চাতালটা বেরিয়ে পড়ত- তা হলে গাছটা হয়তো সত্যিই মরে যেত। কিন্তু পুতুল যে আজ তার বুকের মাঝখানে একদম গজাল গেড়ে দিল। বলল, আর বাঁচবে না গাছটা! হঠাৎ পুলিনের মনে পড়ল। তার বন্ধু ক্লিনার রঘুনাথ কাকদ্বীপগামী কোন বাসে কাজ করে।
 
রাতে শোবার আগে সদরে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছিল হারান আর পুলিন। হারান যেন কেমন অযথা ছটফট করছিল। ঘরে ঘরে সবাই ঘুমিয়ে গেছে। প্রেস এখনই বন্ধ হল। কেবল পুষি খামোখা কাজ বাড়াচ্ছে। আর উঠোনের পাশের প্যাসেজে বসে পুতুল একমনে খোলামকুচি নিয়ে খেলা করছিল। পুলিন ভিতরে ঢুকতেই পুতুল বলল -তোমার গাছটা কাছ থেকে দেখে এলাম।
 
পুলিন বলল-ওই সিঁড়ির খাঁজ বেয়ে তুমি ওপরে উঠেছিলে?
 
-হ্যাঁ, এখন জোছ্নায় ভাসছে, কিন্তু বাঁচবে না। সব শেকড়। সব শেকড়। আজ মরলেও মরবে। কাল মরলেও মরবে।
 
পুষির ছেলেটা কেঁদে উঠতেই উনুন সাজানো ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। কম পাওয়ারের বাল্বের হলদে আলোয় পুলিন এক ঝলকে যা দেখল তা কেবল শেকড় শেকড় আর শেকড়। হাতে গলায় বুকে কণ্ঠায় নিম্মমুখী স্তনে কেবলই শেকড়।
 
পুষিও ছেলেকে দুধ দিতে দিতে বললা- হ্যাঁ, মাটির চেয়ে সত্যিই শেকড় বেশি হয়ে গেলে গাছ বাঁচে না।
 
পুলিন পুতুলকে পেরিয়ে গুটি গুটি নিজের আস্তানায় গেল হাত মুখ ধুয়ে। খালি গায়ে, পরিষ্কার একটা ধুতি দু-পাট করে পরে সে ঠিক ওপরের সেই ফাঁকা আযতক্ষেত্রটার রুজুরাজি তার বিছানাটা পাতল। এখনো মায়ের তৈরি কাঁথাটা সবার ওপরে পাতে। যদিও কাঁথার ওপরের নরম কাপড়টা ছেঁড়াছেঁড়া হয়ে গেছে। একটু বাদেই – চাঁদের চৌকোণা আলোটা সরে সরে এসে পড়ল বিছানায়। পুলিন হাতটা লম্বা করে দিল। তার হাতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল হাস্নুহানার ছায়াটা। ফুটন্ত হাস্নুহানার গন্ধে মাত হয়ে যাচ্ছিল পুলিনের ছোট্ট খোঁদলটা। একটি সুগন্ধি সুন্দরী সবুজ মেয়ের ছায়া বুকে মেখে নিয়ে শোয়ার তৃপ্তিতে দু-চোখ বুজে এলো তার।
 
মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল পুলিনের,হাস্নুহনার ছাযাটা তখন তার পায়ের কাছে উপুড় হয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পুলিন ঘুম চোখেই উঠে গেল সিঁড়ি বেযে।
 
চাতালের ওপর গিয়ে দাঁড়াল একা।
 
তখন চাঁদ একেবারে মাথার ওপর। নিঝুম, নিশুতি। ঝলমলে সবুজ রাংতার মতো ঝলমল করছে হাস্নুহানা গাছটা। সারা গায়ে যেন জরির কল্কা দেওয়া সবুজ বেনারসী। কপালে চাঁদের শোলার সিঁতির মৌর। একটা ষোল বছরের যুবতীর সব সুগন্ধ আর সরলতা নিয়ে নিজের ভবিষ্যত না জেনে খিলখিল করে হাসছে।

চাপা গলায় পুলিন বলল- আমি তোমায় কিছুতেই মরতে দেব না। তুমি থাকবে।

বেঁচে থাকবে।

কিন্তু কদিন বাদে?

শিউরে উঠলো পুলিন। সে দেখতে পেলো নুয়ে পড়া হলদেটে একটা মনমরা গাছের ছবি। কেবল শেকড়!

পুলিন দ্রুত নীচে নেমে এসে প্যাসেজে বেরিয়ে চোখে-মুখে জল দিতে গিয়ে দেখে পুতুল প্যাসেজের ময়লাটে চাঁদের আলোয় একা একা বসে খোলামকুচি নিয়ে খেলছে। পুলিন কাছে এসে দাঁড়াতেই একটু

সিঁটিয়ে নিয়ে বলল- তুমিও কী জামাইবাবুর মতো আমাকে বিরক্ত করবে? কালই তো চলে যাবে। আর কেন?
 

পুলিন বুঝতে পারল হারান নিশ্চয়ই পুতুলকে…থাকগে… পুলিন কথা ঘোরাবার জন্য বলে-

তুমি কি বেশি খোলামকুচি নিয়ে খেল পুতুল?

-হ্যাঁ বেশি! সেই যে তুমি যেমন ভাবতে শিখিয়েছিলে?

-ঠিক তেমন করে! যেমন এই যে

চিৎ হলে রাজপুত্তর

উপুড় হলে খাঁ খাঁ

চিৎ হলে সোনার সংসার

উপুড় হলে খাঁ খাঁ

চিৎ হলে রাঙা খোকা

উপুড় হলে…
 

হঠাৎ হু হু করে কেঁদে উঠল পুতুল-উপুড় হলে সব শেষ!

কিন্তু পুলিন অন্ধকারে হেসে উঠল। তার মায়ের কথা মনে পড়ল। তার মা যে বেঁচে গিয়েছিল শুধু-

মা জগৎ বানাতে পারত। পুতুলও জগৎ বানাতে শিখেছে।
 

পুলিন আস্তে আস্তে পুতুলকে তুলে নিল। পুলিনের ধরার ভঙ্গি দেখে পুতুল কোনোরকম ভয় পেলো না। পুলিনের কাঁধে ভর দিয়ে পুতুল পুলিনের খোপে গেল। চাঁদের ঢল নামা বিছানায় পুতুলকে শুইয়ে দিয়ে পুলিন বলল-কাল আমরা কোথায় যাব বলো তো?

-হাসপাতালে।

-না! আমরা যাব কাকদ্বীপ! বাসে চেপে। তুমি, আমি, আর ও-হাস্নুহানার দিকে আঙুল দিয়ে দেখাল পুলিন!

-তারপর? সানন্দে বলল পুতুল।

-পুতুল সব ভুলে গিয়ে একমনে তার গল্প শুনছে।

-তারপর কাকদ্বীপে গিয়ে একটা ভালো জায়গায় ভালো মাটি যেখানে, খুঁজে নিয়ে ওকে রেখে আসব- কেমন?

পুতুল ঝিলমিলে চোখে বলল,- আমি খুঁজে দেব। আমি ভালো মাটি চিনি!

তারপর?

-তারপর আমরা একটা চিহ্ন দিয়ে আসব!

-হ্যাঁ, সে বেশ হবে। আমরা মাঝে মাঝে ওকে দেখতে যাব। ও অনেক মাটি পাবে। শেকড় ছড়িয়ে বাড়বে।

নতুন নতুন গাছ দেবে!

পুলিন চাঁদের আলোমাখা পুতুলের ছোট্ট কপালেটি ছুঁয়ে বলল, -এবার সত্যি করে বলো তো খোলামকুচি চিত হয়েছিল? না উপুড়?

-কখন?

-যখন রাঙা খোকা চেয়েছিলে।

পুতুল পুলিনের বুকে মুখ রেখে বলল, সত্যি কথা বলবো?

-হ্যাঁ

-চিত্।

(রচনাকাল: ১৯৭৭)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *