স্মৃতি ৭১ : না ভুলে থাকা সেই সব দিন

তপতী বসু
উনিশশ’ একাত্তর আমাদের জীবনের এক আশ্চর্য সময়—অভূতপূর্ব ইতিহাস । আমরা সবাই সেই ইতিহাসের কুশীলব। স্বাধীনতার জন্য বুকের রক্ত ঢালা যদি সব থেকে বেশি মূল্যবান হয়, তবে বাঙালিদের মতো এতো মূল্য পৃথিবীর অন্য কোনো জাতি দেয়নি। কিন্তু স্বাধীনতা পাওয়ার পর অতি দ্রুত এই ইতিহাস ও আত্মজাগরণের চেতনা দেশের মানুষের একাংশ বিস্মৃত হয়েছে। কিন্তু অনেকের মতো বেদনার্ত সেই দিনগুলোর অনেক কিছুই আমি ভুলিনি । আট বছর বয়সে দেখা, না ভুলে থাকা সেইসব দিন বুকের গভীরে রক্তক্ষরণ করে, করেই চলে।
উনিশশ’ একাত্তরের ১৭ মে, বাংলা ২ জ্যৈষ্ঠ। সকাল গড়িয়ে গেছে। দোতলার ঘরে কোনো একটা শব্দ শুনে একতলার বারান্দা ছেড়ে উপরের ঘরে যাই। বারান্দায় তখন আমার বাবার রক্তেভেজা নিথর দেহ ঘিরে মা এবং অন্য দাদা-দিদিরা। চুরাশি বছরের বৃদ্ধা ঠাম্মা বেঁচে । আমি দোতলার ঘরে উঠেই দেখি ঠাম্মা মেঝেতে গড়াগড়ি যাচ্ছেন আর অস্ফুট-অবরুদ্ধ কান্নায় ডেকে চলেছেন-‘ও ভোলা, ফিরে আয়।’ তাঁর প্রিয় ছেলে যে আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না, তিনি তখন তা জেনে গেছেন।
এরপর কয়েক মাস কেটে গেছে। তিন দাদা আর তিন দিদি বাড়ি ফেলে কোথায় চলে গেলেন বুঝতে পারি না। বাড়িতে আমরা পাঁচ ভাইবোন, মা-ঠাম্মা আর ছোটবেলা থেকেই মানসিকভাবে অসুস্থ জ্যাঠা । মনিদা রোজ সকাল হতে না হতে আমাদের খাবার খুঁজতে যায়। চাল আনে, ডাল আনে। ওর জোগাড় করা কেরোসিনে আলো জ্বলে । দশ বছরের রাঙাদি বারান্দার দরজাটা ছোট্ট করে ফাঁক করে বড়দের মতো কলসি কাখে পুকুরে জল আনতে যায়। আলো-আঁধারে নিঃশব্দে ভাতের হাঁড়ি বসিয়ে উনুনে কাঠ গোঁজে, আমি তার পাশে বসে যথাশক্তি সাহায্য করি।
একদিন সকালে ঠাম্মা বাড়ি নেই। কোথায় গেলেন (বছর কয়েক আগে পড়ে গিয়ে ঠাম্মা ভালো করে হাঁটতে পারতেন না)! মা-ই প্রথম দূর থেকে দেখতে পেলেন, বাসাবাটি স্কুলের জল-কাদা মাখা বড় মাঠটায় ঠাম্মা একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দৃশ্যটা আমার চোখে একেবারেই জীবন্ত। সমস্ত মাঠটা চক্রাকারে ঘুরছেন ঠাম্মা । আর তার পরনের থান কাপড়ের আঁচলটা বয়ে চলেছে। মার নির্দেশ পাওয়ার আগেই ছুটলাম ঠাম্মাকে ধরতে। আমরা যখন তাঁকে গিয়ে ধরলাম, তখন তার বেদনার্ত চোখে নিষ্প্রভ নিষ্প্রাণ দৃষ্টি। ধীর পায়ে তিনি ফিরে এলেন। মা হাত দিয়ে ঘষে ঘষে তার পা ধুয়ে শুকনো করে মুছিয়ে খাটে উঠালেন। বললেন–ও-মা, আপনি যদি রাস্তায় পড়ে যান, তাহলে আমি কি করে আপনাকে বাড়ি আনবো!
ঠাম্মা মায়ের মুখের দিকে চুপ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন—আচ্ছা, আর যাবো না।
এরপর ঠাম্মা যে ক’দিন বেঁচেছিলেন খাট থেকে আর নামতেই পারলেন না।
রোজ বুঝি, ঠাম্মার শরীর একটু একটু করে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মা দিনরাত তার পাশে বসে থাকেন। ভাত জল দিয়ে চটকে একটু একটু করে খাওয়ান। একদিন পাশের বাড়ির কল্পনাদির মা মাকে বললেন যে, পা ফুলে গেলে মানুষ বেশিদিন বাঁচে না। শুনে বুকটার মধ্যে কেমন করে উঠলো। ঠাম্মার পা আশঙ্কাজনকভাবে ফুলে গেছে। এরপর একদিন পা ফেটে রস গড়াতে শুরু করলো। একফোঁটা ওষুধেরও ব্যবস্থা নেই। মা পরম মমতায় ছেড়া কাপড়ের নরম টুকরো দিয়ে বারবার পা মুছে দিতেন। বিছানার পাশে হলুদের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিতেন, যাতে পিঁপড়া না ধরে। অনাগত দুঃখের আশঙ্কায় মার গায়ের কাছ লেপটে থাকি। একদিন মা মৃত্যুপথযাত্রীকে জিগ্যেস করলেন—আপনার কী খেতে ইচ্ছা করে?
ঠাম্মার শেষ অবস্থাতেও প্রচণ্ড বিবেচনা বোধ! কিছুতেই বললেন না। অনেক অনুরোধে তাঁর শেষ ইচ্ছা জানালেন—একটু দুধ।
কেমন করে জানি না, মা ঠাম্মার শেষ ইচ্ছা পূরণ করলেন। এরপর এলো সেই রাত। কাতর মিনতিতে ঠাম্মার হাত জড়িয়ে ডুকরে উঠছেন মা। বলছেন—মা, আমাকে ছেড়ে আপনি যাবেন না, আমি কোথায় থাকবো, কার কাছে থাকবো!
আমরা তেরো দিন মণিদার আনা কন্ট্রোলের চালের ভাত আর ঠাম্মার লাগানো গাছের অজস্র বরবটি খেয়ে অশৌচ পালন করলাম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, মা ঘরের মধ্যে প্রায় অন্তরীণ থাকা সময়ে শাস্ত্রীয় মতে ঠাম্মার শ্রাদ্ধাদি করলেন। নিয়ম ভঙ্গ, ব্রাহ্মণ-প্রামাণিক সেবা কিছুই বাদ গেল না। দোতলার ঘরে নন্দ ঠাকুর মন্ত্রপাঠ করলেন। আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া আরতিদি আর প্রতিবেশী কল্পনাদির মা, পরামাণিক বাড়ির আনন্দ কাকা আর সাধু পিসেমশাই একসঙ্গে বসে খেলাম। সদ্য স্বামীহারা একাহারী মা সারাদিন উপবাসী রইলেন । অনেকদিন পরে মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম সে দিনের খরচ তুমি কীভাবে চালিয়েছিলে? সর্বমোট পনেরো টাকা খরচ হয়েছিল এবং টাকাটা এসেছিল আমাদের নিয়ে তৈরি করা মার ঠোঙ্গা বিক্রির অর্থ থেকে।
বাড়িতে বাবার পায়ে পায়ে ঘোরা পোষ মানা একপাল কুকুর ছিল। ১৭ মে আমাদের সঙ্গেই তারা চিৎকার করে কাঁদলো। তারপর এর একটা এসে ঘরে আশ্রয় নিলো। নাম ছিল তার সাদাবুলি। খেতে বসে একটা শূন্য থালায় আমরা প্রত্যেকের থালা থেকে মুঠো করে খাবার বুলির জন্য তুলে রাখতাম। তবে আরেকটা মুশকিল ছিল বুলিকে নিয়ে। ঘর নোংরা করেনিকোনোদিন, কিন্তু প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে ছুটে যেত নিচে। বাইরে যাওয়ার জন্য দরজায় ধাক্কা দিতো। ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে বাইরে পাঠিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। কাজ সারা হলে ফিরে এসে খুব সন্তর্পণে আঁচড়ানোর আওয়াজ করতো দরজায়। তখন দরজা খুলে আবার তাকে ঘরে ঢুকিয়ে নিতে হতো। আমাদের দোতলার সঙ্গে পেছন দিকে একটা ছাদ আছে, যার শেষে একটা সিঁড়ি ছিল বাইরে নামার। সেটা অনেক নিরাপদ। মা একদিন ছাদের দরজাটা খুলে বুলিকে রাস্তাটা দেখিয়ে দিলেন। বুলিকে বললেন, তুই যে ওরকম করিস আমার দরজা খুলতে ভয় করে। তুই এই রাস্তা দিয়ে বাইরে যা। এরপর প্রতিদিন রাতে প্রায় একটা নির্দিষ্ট সময়ে সে ছাদের দরজার কাছে গিয়ে দাড়াতো। মা দরজাটা একটু ফাঁক করতেই সে ছুটে বাইরে চলে যেতো। ফিরে এসে খুব আস্তে দরজায় আঁচড় কাটতো। মা দরজা খুলে তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিতেন।
আকাশে তখন ঘন নীল মেঘ ছিল, তাই মনে হয় সময়টা তখন সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর হবে। মা দুর্গা এসে হয়তো চলেও গেছেন! বিশ্ব পরিসরে দেশের অবস্থা স্বাভাবিক দেখানোর জন্য পাকিস্তান সরকার স্কুলগুলো খুলে রাখার নির্দেশ দিলো। স্কুলের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, বহুদিন স্কুলে যাই না। বাড়ির পাশেই স্কুল, তাই মা আমাদের স্কুলে পাঠাতে বাধ্য হলেন। সেদিন আমি, বিশুদা আর আমাদের ছোট বোন বেবি স্কুলে গেছি। পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে হঠাৎ একটা পাক মিলিটারি জিপ এসে থামলো স্কুলের সামনে। অস্ত্র হাতে উর্দিধারী। কয়েকজন সৈন্য নেমে ঢুকে পড়লো স্কুলে। বেবি আমার পাশেই বসে ছিল। অস্ত্রধারীদের দেখে ও একটা আর্তচিৎকার করে কেঁদে উঠলো। বড় মৌলভী স্যার ক্লাস নিচ্ছিলেন। তিনি দৌড়ে এসে বেবিকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর সৈন্যদের কী যেন বললেন। একটু পরে তারা চলে গেলে, বেবিকে বিশুদা কোলে করে বাড়িতে নিয়ে এলো। এরপর মা আর কক্ষনো বেবিকে আমাদের সাথে ছাড়েননি।
বেলা ছোট হয়ে গেছে, শীত পড়েছে। শুনি ভারত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। একদিন কালকের পুকুরের কাছ থেকে মণিদা যখন আসছে, খুব নিচু থেকে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল বোমারু বিমান। বোমা পড়ার আতঙ্কে মণিদা, বিশুদা, আরতিদির ছেলেরা আমাদের বাড়ির ঠিক পাশে রতনদা-দের মাঠটার মধ্যে লম্বা ট্রেঞ্চ খুঁড়লো, যেন বোমা পড়লে সবাই সেখানে আশ্রয় নিতে পারে। এই সময় একদিন আমি রাঙাদির সঙ্গে পুকুরে বাসন মাজতে গিয়ে তলিয়ে যাই। সেবার প্রচণ্ড বর্ষা হওয়ায় শীতের প্রথমেও পুকুর ছিল কানায় কানায় ভর্তি। রাঙাদি ঝাঁপ দিয়ে আমাকে পাড়ে তুলে আনে। শীতে কাঁপতে কাঁপতে দুবোন বাড়ি আসি। মোরেলগঞ্জ থেকে আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন আরতিদি। এরপর থেকে তিনিও আমাদের সঙ্গে যেতেন।
সবার কাছে ফিসফাস শুনি, দেশ নাকি স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতা কী, অর্থ কিছু বুঝি না। ১৭ ডিসেম্বর দুপুরবেলা আমরা ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় নাগেরবাড়ির দিক থেকে একটা মিলিত আওয়াজ এগিয়ে আসছে শুনতে পাই। জয় বাংলা, আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ। দূর থেকে দেখি অনেকে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। আমরা নিচে নেমে ছুটে চলে যাই রাস্তায়। স্লোগানকারীরা আমাদের দিকে হাত নাড়তে নাড়তে চলে যায়। চেয়ে দেখি সবার চোখে জল, তার মধ্যে অনেকেই চিৎকার করে কাঁদছে। আমরা দৌড়ে আসি বাড়িতে মায়ের কাছে। চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। মাকে জড়িয়ে ধরে আমরা কেঁদে চলেছি। মনে পড়ছে আমাদের বাবা নেই, কয়েকদিন আগে ঠাম্মাও চলে গেছেন। বড় ছয় দাদা-দিদি বেঁচে আছে কিনা আমরা কিছু জানি না। সেই সময় দৌড়ে আসেন প্রতিবেশিনী কল্পনাদির মা। পরম মমতায় আমাদের চোখ মুছিয়ে বেবিকে কোলে নিয়ে মাকে ধরে নিয়ে যান ঘরে।
বাগেরহাটের রাস্তায় রাস্তায় পাকসৈন্যের ভারি বুটের আওয়াজ আর নেই। ভেসে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় উল্লাস। ২১ ডিসেম্বর সকালবেলায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এলেন আমাদের বাড়িতে। মাকে ডেকে নিয়ে গেলেন
বাসাবাটি স্কুলের ধারের রাস্তায়। মার সঙ্গে আমরাও আছি। রাস্তার পাশে একটা রিকশা দাঁড়ানো। তার মধ্যে বসে আছে বাবার হত্যাকারী। একজন মুক্তিযোদ্ধা মায়ের কাছে জানতে চাইলেন- ‘কাকিমা আপনি কি বিচার চান?’ মা আমাদের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন-‘আমার এই সন্তানরা কী অন্যায় করেছিল তোমার কাছে!’ লোকটা তখন খুব ভালোমানুষের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকে– আমি অন্যায় করেছি, আমাকে শাস্তি দেন।’
মা বললেন– ‘আমি তোমাকে শাস্তি দেয়ার কে? ভগবান তোমার বিচার করবেন। তিনি তোমাকে শাস্তি দেবেন।’ রাস্তায় তখন অসংখ্য লোক।
তিন-চারদিন পরে দুপুরের দিকে দাদা ফিরে এলেন। ছুটে গিয়ে দাদাকে জড়িয়ে ধরলাম। দাদা অনেক কষ্ট করে জীবনবাজি রেখে দেখতে এসেছেন আমরা বেঁচে আছি কিনা। দুদিন পর আবার দাদা অন্যদের খবর দিতে চলে গেলেন ভারতে। এর মধ্যে বুলিকে আর কোথাও দেখি না। আমি, বেবি আর বিশুদা তাকে খুঁজতে বেরোলাম। অনেক দূরে পাড়ার শেষে পল্টুদাদের পরিত্যক্ত, পুড়িয়ে দেয়া বাড়ির এক প্রান্তে মৃত অবস্থায় দেখলাম বুলিকে। মরার সময়ও সে আমাদের বিরক্ত করেনি।
আমরা তখন প্রায়ই শুনতাম বিভিন্ন জায়গা থেকে গণকবর বা লাশের খবর পাওয়া যাচ্ছে। চক্রবর্তীদের বারবাড়ির দোতলায়, ঠিক আমাদের বাড়ির পেছনে ছিল রাজাকার ক্যাম্প। ১৭ ডিসেম্বর জল্লাদ রাজাকারেরা প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে গেলে সেখানে অনেক কাগজপত্রের সঙ্গে নতুন করে যাদের হত্যা করা হবে তাদের তালিকা পাওয়া যায়। একদিন আমরা নাগেরবাড়িতে একটা হত্যাকুপের কথা শুনে দেখতে গেলাম। ফিরবার পথে খবর পেলাম, আমাদের বাড়িতে কে যেন এসেছে। আমি, রাঙাদি, বিশুদা দৌড়াতে শুরু করলাম। এসে দেখি উঠোনে মা যেন কাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। একটু পরে সে আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। আমরা তিনজন একসঙ্গে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সে আমাদের ছোড়দা। মে মাস থেকে যার সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
একদিন বাসাবাটি প্রাইমারি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সকালবেলায় স্কুল থেকে আমাকে, আর দু’একটা ছেলেমেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন বাড়িতে মায়ের কাছে। মার সাথে দেখা করে বললেন—বৌদি আমি মানসকে (বিশুকে) দিয়ে বৃত্তি পরীক্ষা দেয়াবো, ফি লাগবে পাঁচ টাকা।
মা তাকে বললেন—কোথা থেকে দেব পাঁচ টাকা! পাঁচ টাকাতো দূরের কথা, একটা খাতাকলমও জোগাড় করার সাধ্য আমার নেই।
স্যার নিজে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে কোচিং করিয়ে বিশুদাকে পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুত করেছিলেন। উনিশশ’ বাহাত্তরের জুনে রেজাল্ট বেরোলো। বিশুদা বৃত্তি পেল। সেদিনের অশ্রুমাখা আনন্দের কথা কখনও ভুলি না।
কেমন করে জানি বছর পেরিয়ে গেল। একদিন মর্নিং স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে দেখি, মা বারান্দায় আঁচল পেতে শুয়ে আছেন। রাঙ্গাদি বললো, আজ বাবার মৃত্যুদিন। দুপুরে মা উঠলেন। স্নান করে শেষ সময়ে বাবার পায়ে যে জুতো ছিল, সেই জুতো জোড়াকে আঁচল দিয়ে মুছে একটা টুলের উপর রেখে ফুল দিয়ে প্রণাম করলেন, আমরাও প্রণাম করলাম। সারাদিনের উপবাসী মা সন্ধ্যায় প্রতিদিনকার মতো বাবা-ঠাকুরমার সমাধিতে প্রদীপ জ্বাললেন। চল্লিশ বছর ধরে প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে প্রদীপ জ্বলে।
আমার মাকে কখনও গান গাইতে শুনিনি। কিশোরী বেলায় অনেক সুর সঙ্গে নিয়ে তিনি সংসার করতে এসেছিলেন। উনিশশ’ একাত্তর আমার মায়ের সমস্ত হাসি সব সুর কেড়ে নিয়ে গেছে। তাই যে কোনো পারিবারিক আনন্দে এখনও মায়ের দু’চোখ শুধু জলে ভেসে যায়।
বাবার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি আলাদা করে তেমন মনে আসে না। দীর্ঘদিনের দুঃখ-বেদনায় সব জমাট হয়ে গেছে। এর মধ্য থেকে আলাদা একটুকরো স্মৃতি আমার মনকে এখনও নাড়া দেয়। উনসত্তর সালে আমাদের সাংসারিক দারুণ বিপর্যয়ে, দিনের পর দিন অভুক্ত থাকার সময় একদিন সকালে আমি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম, বাবা ছুটে এসে আমাকে কোলে করে তুলে তার বুকের সঙ্গে অনেকক্ষণ জাপটে রেখেছিলেন। বাবার বারান্দায় বসে থাকা, চা খাওয়া, বাইরে থেকে এসে উঠোনে দাঁড়ানো, এসব ঘটনা একাত্তরের পর বহুদিন আমার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। কতদিন মনে হতো দুঃস্বপ্নের জাল ছিড়ে একদিন সকালে উঠে দেখতে পাবো, সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে। সাইকেলের ঘণ্টা শুনে আমরা সবাই ছুটে চলে গেছি উঠোনে বাবার কাছে। যে কোনো সাইকেলের ঘণ্টা শুনলে চমকে উঠতাম, একাত্তরের ১৭ মের পরে বহু দিন পর্যন্ত।
দিনের পর দিন কেটে গেছে। একে একে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্যজনের সঙ্গে পরিচয়ে জেনেছি, আমার মতো বাংলাদেশের হতভাগ্য বহু সন্তানেরা কমবেশি সকলেই একাত্তরের দুঃস্বপ্নের জাল কেটে আর বাইরে বের হতে পারেনি। তারা কেউ ক্ষমা করেনি সেসব ঘাতক দালালদের, যারা পৃথিবীর ইতিহাসের বিরলতম অত্যাচার-হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে অতি শৈশবে আমাদের চেতনাগতভাবে বৃদ্ধ করে তুলেছিল, ভাসিয়ে দিয়েছিল দুঃখ নামক অসীম সাগরে।
বাহাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন উদ্যমে স্কুল শুরু হলো। বাসাবাটি প্রাইমারি স্কুলের সামনের বিশাল মাঠের একপ্রান্তে, শিক্ষকদের নেতৃত্বে শীতের রোদে শতাধিক ছাত্রছাত্রী আমরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। একজন শিক্ষক বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত—‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’র সুর শেখাচ্ছিলেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ সেই গানের প্রথম শোনা সুর উত্তরে হাওয়ার দমকায় মিশে, চিরদিনের মতো হারিয়ে যাওয়া আমার বাবা-ঠাম্মা, বহুদিন না দেখতে পাওয়া দাদা-দিদিদের কথা মনে করিয়ে দিলো। আমি কাঁপতে শুরু করলাম। আমার চিৎকারে থেমে গেল ‘সোনার বাংলা’র সুর। সমস্ত মাঠ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। কী জানি সেটাই হয়তো ছিল আমার শহীদ বাবার সম্মানে সমব্যথী-হৃদয়ের প্রথম নীরবতা পালন।
—————————————–
তপতী বসু (রায়চৌধুরী) শহীদ ভোলানাথ বসুর পঞ্চম কন্যা
শিক্ষক। কথাসাহিত্যিক।
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *