লেখালেখি ও পাঠের শৈলী নিয়ে কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমানের সঙ্গে আলাপ

সাক্ষাৎকারগ্রহণে : রুমা মোদক ও এমদাদ রহমান
লেখক অপেক্ষা করেন- মূল লেখাটির পাঠকৃতি, প্রতিক্রিয়া জানার জন্য; তাঁর নিজেরও অনেক কথা জমে যায়, কারণ ভেতরে তার অনেক ক্ষরণ, বিস্মরণের অতল থেকে সেইসব কথা খুঁজে খুঁজে বের করেন তিনি- নিজের অজান্তে;  পাঠকও সেই কথায় মজেন, তাই যে-কোনও লেখকের ‘আর্ট অফ ফিকশন’ সাক্ষাৎকার হয়ে ওঠে মূল্যবান এবং তাৎপর্যপূর্ণ দলিল- কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমানের এই সাক্ষাৎকারটিও তাই- লেখক ও পাঠকের এক মিথস্ক্রিয়া, অন্তরঙ্গ বিনিময়। এই সাক্ষাৎকারগ্রহণ শুরু হয়েছিল প্রায় বছরখানেক আগে, গল্পপাঠে প্রকাশ পেল এ বছরের জানুয়ারিতে। অতিমারীর নানারকমের বিপর্যয়ে পড়ে ঢাকার লেখক পাপড়ি রহমানের সঙ্গে প্যারিস এবং হবিগঞ্জ থেকে নিয়মিত যোগাযোগটা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, দীর্ঘতর হচ্ছিল এর সীমারেখা; আবার সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীদের প্রস্তুতিও চলছিল সাক্ষাৎকার নিতে নিতেই। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকার গৃহীত হয়েছে কখনও টেলিফোনে এবং বেশিরভাগটাই লিখিত প্রশ্ন দিয়ে, লেখকের উত্তর এবং সে উত্তরের ভেতর থেকে কথাসূত্র খুঁজতে খুঁজতে। এর মধ্যেই আমাদেরকে স্তব্ধ করে দিয়ে চলে গেছেন শঙ্খ ঘোষ এবং হাসান আজিজুল হক। এ হারানোর বেদনার মতো এমন শোক সহ্য করার ক্ষমতা বাংলাভাষী পাঠকের নেই, আমরা তাঁদের কর্মের প্রতি আনত। গল্পপাঠের অশীতিতম সংখ্যায় প্রকাশিত কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমানের মূল্যবান এই সাক্ষাৎকারটি শঙ্খ ঘোষ এবং হাসান আজিজুল হককে উৎসর্গ করা হলো, আর নিবেদিত হলো পাঠকের প্রতি। কতোখানি তাঁকে জানা হলো, জানানো গেলো, অন্তর্গত পাপড়ি রহমানকে কতোখানি পাঠক পেলেন,পাঠকই তার রায় দেবেন। পাপড়ি রহমান, আপনি আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন। লেখায় নিরন্তর সচল থাকুন। আপনার আরও দিগন্তবিস্তারি লেখায় বাংলাসাহিত্য ঋদ্ধ হোক
পাপড়ি রহমান কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং অনুবাদক। প্রকাশিত বই : গল্প— লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা (২০০০, খনা প্রকাশন) হলুদ মেয়ের সীমান্ত (২০০১, দিব্য প্রকাশ) অষ্টরম্ভা (২০০৭, মনন প্রকাশ) ধূলিচিত্রিত দৃশ্যাবলি (২০১০, আমার প্রকাশনী) মৃদু মানুষের মোশন পিকচার (২০১২, শুদ্ধস্বর) মামুলি জীবনের জলতরঙ্গ (২০১৪, নান্দনিক) Lilies, Lanterns, Lullabies (2014, writers.ink) শহর কিংবা ঊনশহরের গল্প (২০১৬, চৈতন্য প্রকাশনী) নির্বচিত গল্প (২০১৭, চৈতন্য প্রকাশনী) নির্বাচিত গল্প (২০১৯, ঐহিক, কলকাতা) হলদে ফুলের বিকেল (২০২০, পরানকথা) উপন্যাস— পোড়ানদীর স্বপ্নপুরাণ (২০০৪, মাওলা ব্রাদার্স) বয়ন (২০০৮, মাওলা ব্রাদার্স) পালাটিয়া (২০১১, মাওলা ব্রাদার্স) নদীধারা আবাসিক এলাকা (২০১৯, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স) পালাটিয়া (রি-প্রিন্ট, অভিযান পাবলিকেশন্স, কলকাতা) কিশোর উপন্যাস— মহুয়া পাখির পালক (২০০৪, জোনাকী প্রকাশনী) মুক্তগদ্য— বনতরুদের বায়োগ্রাফার (২০২০, চৈতন্য প্রকাশন) গবেষণা— ভাষাশহিদ আবুল বরকত (২০১০, বাংলা একাডেমি) আত্মজীবনী— মায়াপারাবার (২০১৬, নান্দনিক) সম্পাদনা— ধূলিচিত্র (ছোটকাগজ) বাংলাদেশের ছোটগল্প : নব্বইয়ের দশক (২০১১, বাংলা একাডেমি) গাঁথাগল্প (যৌথ, ২০১০, writers.ink) লেখকের কথা (যৌথ, ২০১৩, writers.ink) অ্যালিস মানরোর নির্বাচিত গল্প (যৌথ,২০১৭, মাওলা ব্রাদার্স)
 
 
 
 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
একটু আগে, ফোনে কথা হচ্ছিল তখন, আপনি জোসেফ ক্যাম্পবেল আর বিল ময়ার্সের কথা উল্লেখ করলেন, ‘মিথের শক্তি’র সূত্রে, ‘মিথ’-প্রসঙ্গে মনে পড়ল আপনার সম্পর্কে বলা কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের কিছু কথা; তাঁর সঙ্গে আপনার যোগাযোগটা কীরকম ছিল? তিনি যে আর জীবিত নেই, এই অভাবটা বোধ করেন?
পাপড়ি : 
হ্যাঁ, আমরা কথা বলছিলাম ‘মিথের শক্তি’ নিয়ে। জোসেফ ক্যাম্পবেল আর বিল ময়ার্সের কথোপকথন নিয়ে। এটা তো সত্য, সবকিছুর মূলে ওই আন্তরিকতা। যে কোনো ভালো মিউজিকের জন্য যেমন যন্ত্রের পারফেক্ট টিউন দরকার, তেমনি কথা বলার জন্যও। আর আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, স্নেহ, সহমর্মিতা যা-ই বল না কেন, সবই কিন্তু অনুভব করা যায়।
আমার খুবই সেনসেটিভ একটা জায়গাতে স্পর্শ করলে তুমি। তাঁর সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হতো না ঠিকই, কিন্তু যে কোনো জটিলতা বা সহজতায় আমরা একে অপরের শরণাপন্ন হতাম। এত বছর হয়ে গেল, কিন্তু আজও আমি অশ্রুসজল হয়ে উঠি। জীবিত নেই, এই বিষয়টা আমি আজও তেমন করে ভাবতে পারি না।
যদিও তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে এ জীবনে এক কি দুইবার। কিন্তু ভালো বন্ধুত্বের জন্য এটা তেমন কোনো বাধা নয়। ফেইসবুকের আমার প্রায় সকল পোস্টেই সে কমেন্ট করতো। বা আমিও করতাম। আজও মেমোরিতে সেসব ভেসে উঠলে আমি দৃষ্টি সরিয়ে নেই।
তুমি জানো যে, পেশায় সে ছিল চিকিৎসক। এজন্য আমি তাকে ডাকতাম ‘শশী ডাক্তার’। অবধারিতভাবে সে আমাকে ‘কুসুম’ই ডাকতো। এগুলি ছিল আমাদের দুজনের স্রেফ মজা করা। এই আনন্দযজ্ঞের আনন্দকে আহরণ করার নিমিত্ত মাত্র।
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ছিল আমার একজন অত্যন্ত কাছের বন্ধু। যিনি ছিল অকপট ও অকুতোভয়। সাহিত্য-অন্তপ্রাণ একজন মানুষ। যারা তাকে জানতেন, তারাও নিশ্চয়ই আমার সাথে একমত হবেন। দেখো, আমি বিশ্বাস করি মানুষের মূল্যই এই পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি। তাই আমি চাইনা আমার কাছের কোনো মানুষ হারিয়ে যাক। কিন্তু আমার চাওয়া বা না চাওয়াতে কিছুই তো ঘটে না। যা কিছু ঘটে সেসব আপন নিয়মেই ঘটে। এমন ভাবে ঘটে, যেন ওটাই ঘটার কথা ছিল।
মানুষ কেন যে পৃথিবীতে আসে? তুমিও জানো দুঃখ, কষ্ট, লড়াই, দৌড়, অসুস্থতা এসবের মাঝে সুখ বা আনন্দের ভাগ কিন্তু খুবই কম। খুবই ক্ষণস্থায়ী।
একটা ঘটনা স্মরণ হলে আমি কিছুতেই স্থির থাকতে পারি না।
জাহাঙ্গীর এসেছিল বইমেলার ২০ কি ২১ তারিখে। আমার সাথে দেখা করবে কিনা আগেভাগে কিছুই বলে নাই আমাকে। আমি ভাবলাম হয়তো নিজের কাজে ব্যস্ত থাকবে, এবার আমাদের দেখা হবে না। কিন্তু সে আমাকে ঠিকই ফোন করল ২১ ফেব্রুয়ারি, দুপুর একটা কি দুইটার দিকে। বলল, আমি সেদিন যাব কিনা মেলায়?
কিন্তু আমার এমনই মন্দভাগ্য যে, আমি সেদিন এমন একজনের সাথে অকিউপাইড ছিলাম, তাকে ফেলে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না। বা বাংলা একাডেমি থেকে এতটাই দূরে ছিলাম যে, বইমেলাতে পৌছানোর মতো সময় আমার হাতে ছিল না। আমি ইতস্তত করে নিজের অপারগতা জানালাম। সে বলল যে, আচ্ছা থাক তাহলে। আমি বললাম, তাহলে ২২ তারিখ বিকেলে আসি? সে জানালো ২১ ফেব্রুয়ারির রাতেই সে ফিরে যাবে চট্টগ্রামে।
হায়! আমার আর তার সাথে দেখা হলো না! এমনকী ফোনে আর কথাও হলো না।
সর্বশেষ ইনবক্সে টেক্সট হয়েছে মার্চের ২ তারিখে। আমি সেদিন যাকে সময় দিয়েছিলাম, যাকে মর্যাদা দিয়ে আমার অন্য সব কাজকে পণ্ড করেছিলাম, সেও কিন্তু শেষাব্দি আমার পাশে থাকে নাই। নিজের সবকিছু কৌশলে গুছিয়ে নিয়ে সময়-সুযোগ বুঝে সটকে পড়েছে। আদতে আমারই দোষ, মানুষকে অবহেলা করতে না-পারার দোষ। মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে না-পারার দোষ।
আমার আজও প্রচণ্ড অপরাধ বোধ জাগে এজন্য যে, আমি জাহাঙ্গীরের সাথে দেখা করতে পারলাম না বলে। হয়তো সে মন খারাপ করেছিল, কিন্তু আমাকে সেসব তো সে বলে নাই। বা বলতোও না কোনোদিনই।
মার্চের ৮ তারিখে আমার বন্ধু কবি জুনান নাশিত ফোন করে জানালো যে, সে আর নেই! শুনে আমি কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কী করব, কোথায় যাব, কার কাছে যাব কিছুই উপলব্ধিতে আসছিল না।
আমি বাসার সবার সামনে সেদিন প্রচণ্ড কেঁদেছিলাম। বারংবার মনে পড়ছিল, সে আমায় ডেকেছিল, অথচ আমি তার ডাকে পৌঁছাতে পারি নাই! আজও এই অপরাধবোধ আমার মনে তীব্র ক্ষতের মতো দগদগে হয়ে আছে। আমি যতদিন বেঁচে আছি, আমার এ বেদনা উপশম হবার নয়।
জীবিত নেই- আমি এমনটা ভাবতে পারি না, আমার আপনজনদের ক্ষেত্রে অন্তত। নেই মানে কী? সে তো আছে। আছে না বল? এই যে আমি যতদিন বেঁচে আছি সে তো আমার মনে আছে। মনে রইবে। আর তার লেখাপত্রও তো আছে, তাইনা। আমি যেদিন থাকব না, সেদিন তো সেও আমার সাথেই চলে যাবে। তাছাড়া লেখকের তো মৃত্যু নেই। মৃত্যু হয় না, যদি সে তেমন লেখক হয়।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আমরা অতিমারী পেরিয়ে এসেছি, অথবা পার হচ্ছি; প্রতিদিন মৃত্যু- অদ্ভুত এক বেদনার ভেতর দিয়ে বিশ্ববাসীর দিনযাপন; এই যে অবিরাম মৃত্যু… মৃত্যু নিয়ে আপনি কী ভাবেন?
পাপড়ি : 
এমদাদ, তুমি কি আজ প্রতিজ্ঞা করে এসেছ যে, আমাকে কাঁদিয়েই ছাড়বে? এমনিতেই জাহাঙ্গীরের প্রসংগ এনে আমাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছ। দেখো, আমি নিজেও তো মৃত্যুর প্রায় দ্বার থেকে ফিরে এসেছি। হাসপাতালে ব্লাড-থিনার ইনজেকশন দেয়ার ফলে বা হতে পারে অন্য কোনো কারণে আমার কাশির সঙ্গে প্রচুর রক্ত যাচ্ছিল। আমার ব্লাডসুগার নিল হয়ে যাচ্ছিল। বিপিও সেইম অবস্থা। আমি যদি তখন অত উন্নত চিকিৎসা না পেতাম, তাহলে কিন্তু আমার আজ আর এ কথাগুলি বলা হতো না।
এই ক্রান্তিকালে আমি যে কত প্রিয়জন হারিয়েছি! এক একটা মৃত্যু সংবাদ আমাকেই যেন মেরে ফেলেছে। একা একাই আমি বেদনার মহাসমুদ্রে নিমজ্জিত হয়েছি। যাঁদের জন্য আজ আমি লেখক হতে পেরেছি, তাঁরা প্রায় সকলেই চলে গেলেন।
কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত, ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খান, বশীর আল-হেলাল।
চলে গেলেন আমার স্যার আনিসুজ্জামান, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী- ইনারাও তো আমাকে দিয়েছিলেন প্রতুল-স্নেহ আর বরাভয়।
দেখো কোনো প্রিয় মানুষের মৃত্যু মানে জীবিত মানুষটিরও বেহাল অবস্থা হয়ে যাওয়া। সেও কি আর জীবিত থাকে? আর স্মৃতি বহন করার বেদনার সাথে অন্য কোনো বেদনারই তুলনা হয় না।
আর একটা বিষয়, আমার নিজের জীবন অন্যদের মতো নর্মাল বা স্মুথ বা ট্র্যাডিশনাল হয়নি বলে মৃত্যুর উপলব্ধি আমার কাছে নতুন কিছু নয়। আমি তো মরেই আছি বহুকাল আগে থেকেই। ফলে আমার দেহটাই শুধু বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়, আর তো কিছু নয়। আর মৃত্যু খুব বড় কোনো বিস্ময়ও নয়। বরং জীবনে থাকাটাই আমার কাছে বিস্ময়।
মৃত্যু আমার কাছে কী- সেই উপলব্ধি নিয়ে সম্প্রতি একটা ঘটনার কথা বলি। আমার ছোটকন্যাটি ভারি মজার হয়েছে। সে তার নানানকিছুর সাথে আমাকে যুক্ত করতে ভালোবাসে। তো এবারও তার জন্মদিনের সারপ্রাইজ হিসেবে আমাদের ডিনারে নিয়ে গেল। ডিনারের পূর্বে আমাদের জন্য সে কিছু রিক্রেয়েশনের আয়োজনও করেছিল। সে আমাদের চড়ালো এক উড়ন্ত-গাড়িতে। তাও আবার ছাদখোলা গাড়ি। আমার আছে এ্যাক্রোফোবিয়া। আমি তো ভয়ে চোখ বুজে আছি। আর গাড়ি তো উড়ছে বেগতিক। ঠিক ওই মুহুর্তে আমি মৃত্যুর কথা ভাবছিলাম।
আমার মনে হলো মৃত্যু হয়তো এরকম, এমনই কোনো কিছু–
ধরো, তুমি একটা উড়ন্ত কারে চড়ে বসেছ। কারটা ছাদহীন। বাতাসে শাঁই শাঁই শব্দ তুলে চালকবিহীন এক গাড়ি তোমাকে উলটেপালটে, চক্কর খাইয়ে, মাথায় আলকাতরার মতো থিকথিকে অন্ধকার পুরে দিয়ে চলছে তো চলছেই। তুমি তাকাতে পারছ না ভয়ে। কিন্তু বাতাসের ভিতর সাঁতার কেটে কেটে চলছ এটা বেশ অনুভব করতে পারছ। মৃত্যু হলো ওই অনুভব। যে অনুভবের কোনো ব্যাখ্যা নাই। যাওয়া আছে, কিন্তু আর ফিরে আসা নাই। ওয়ান ওয়ে জার্নি–যে যায় শুধু সেই জানে সে যাওয়ার মানে কী? বা কেনই সে যায়? কোথায় যায়? কিন্তু ফিরে এসে সেটা আর কাউকে তা জানাতে পারে না।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আপনার লেখার যথাযথ সমালোচনা হয়েছে কি? সমালোচনা থেকে নেওয়ার মতো কিছু পেয়েছেন?
পাপড়ি : 
সমালোচনা বলতে কি তুমি বুকরিভিউ মিন করছ? হ্যাঁ , আমার বহু গ্রন্থই বহুভাবে, বহুবার রিভিউড হয়েছে। কিন্তু হয়তো সেসব ‘সমালোচনা’ অর্থে হয়নি। হলে কিন্তু ভালো হতো। অন্তত আমার জন্য। কেউ যদি বলতো যে, আমার লেখায় এই এই বিষয়ের খামতি আছে, তাহলে আমি সেসব ক্রটি কাটিয়ে উঠতে পারতাম। আমি চাই আমার লেখার যথাযথ সমালোচনা হোক। কেউ সেটা করুক। একেবারে ‘নিখুঁত সুন্দর’ বলে কিন্তু কিছু নেই এই পৃথিবীতে। সে অর্থে আমার লেখাপত্রও নিশ্চয়ই ‘নিখুঁত’ নয়। কিন্তু কেউ-ই সেসব বলে না। তবে এই বলাটাও কিন্তু যথাযথ হতে হবে। খামাখাই আমাকে ডাউন করার জন্য যুক্তিহীন কিছু বললে আমি তো সেটা মানব না। মানে বলে চাইছি সমালোচনাটা এপ্রোপ্রিয়েট হতে হবে। ধুনফুন কিছু বললে আমি তা গ্রাহ্যের ভিতরই নেব না। বা ইর্ষা-প্রসুত কিছু বললেও আমি তা মানবো কেন?
দুই-একটা পয়েন্ট কেউ কেউ কখনো বলেছিল। আমি সেসব আমার পরবর্তী লেখায় সংশোধনের চেষ্টা করেছি। এটা আমি বরাবরই করি, সমালোচনা থেকে নিজেকে শুধরে নেবার।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
আপনি এলিস মুনরোর গল্প অনুবাদ করেছেন, বইও বেরিয়েছে। আর কাউকে নিয়ে কিন্তু এরকম কাজ আপনি করেন নি; এর পেছনে কোন ভাবনা কাজ করেছে?
পাপড়ি : 
ভালো প্রশ্ন। এই কাজটা ছিল আমাদের টিম-ওয়ার্ক। মানরো ম্যান বুকার পেয়েছিলেন ২০০৯ সালে। কিন্তু যে বছর (২০১৩) নোবেল পেলেন, সে বছরই ‘গাঁথা’ সংগঠনের সিদ্ধান্ত ছিল মানরো অনুবাদ করার। এটা করার কথা ছিল আনোয়ারা সৈয়দ হকের। কিন্তু আপা আমার উপর দায়িত্ব দিলেন। ড. নিয়াজ জামানও চেয়েছিলেন আমি তাঁর ‘কো-এডিটর’ হিসেবে কাজ করি। ওই যে, অগ্রজদের অনুরোধ আমি ফেলতে পারি না। অর্থাৎ বড়দের প্রতি সম্মান থেকেই আমি এই সম্পাদনাটি করেছিলাম।
অনুবাদ বরাবরই আমার কাছে বড্ড কঠিন কাজ মনে হয়। বিশেষ করে কথাসাহিত্য। ফলত কোনো লেখকের পুরো একটা বই অনুবাদ করার ধৈর্য্য আমার কিছুতেই হবে না।
এই শতকের শুরুর দিকে মার্কেজ ও ঝুম্পা লাহিড়ীর দুই/একটা গল্প অনুবাদ করেছিলাম। পরে চিত্রা ব্যানার্জি দেবাকরণির The Unknown Errors of Our Lives থেকে দুই/একটা গল্প। চিত্রা ব্যানার্জির একটা বইয়ের পুরোটা অনুবাদ করতে পারলে আমার ভালো লাগত। ইচ্ছেও সেরকম ছিল। কিন্তু হঠাৎ পারিবারিক জটিলতায় আমার লেখাপড়ার সমস্ত কাজই বন্ধ করে দিতে হয়, এটা ধর ২০০৪ সালের দিকের ঘটনা। এর পরে আমার সেই সময় ছিল না অনুবাদ নিয়ে বসার বা করার। মনও খুব বিক্ষিপ্ত থাকতো। বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে আর যাই হোক অনুবাদের মতো পরিশ্রমের কাজ করা যায় না কিছুতেই।
তবে অ্যালিস মানরো করতে গিয়ে আমি কিন্তু লাভবানই হয়েছি। অর্থাৎ আমি কিনা মানরোর লেখার প্রেমে পড়েছি সিরিয়াসলি। এতই চমৎকার তাঁর লেখার বিষয়আশয়, ডিটেলিংয়ের কাজ! মানরোর লেখার সাথে আমি হাসান আজিজুল হকের লেখার সাযুজ্য পেয়েছি। প্রতিটা লাইনে লাইনে নিজস্ব জীবন-দর্শন, জীবন ও প্রকৃতিকে মিলিয়েমিশিয়ে দিয়ে দারুণ এক কনটেন্ট, যার তুলনা দেবার ভাষাও আমার আয়ত্বে নেই।
মানরো যদি তুমি পড়ে থাকো, দেখবে দারুণ সব গল্প উনি বলেছেন। শুধু মাত্র তাঁর লেখনী-শক্তির গুণেই সেসব অসাধারণ ব্যঞ্জনা হয়ে ধরা দিয়েছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
মানরো কিংবা মুনরো, আচ্ছা তাঁর নামের উচ্চারণ যা-ই হোক, তাঁর এক সাক্ষাৎকার থেকে জেনেছিলাম যে তিনি একেকটি গল্প লিখতে কমপক্ষে ৮ মাস সময় নেন, গল্প লিখে ফেলে রাখেন; ৮ মাসের মধ্যে আরও কয়েকবার গল্পটিকে পুনর্লিখন করেন। আপনার কি এরকম পদ্ধতি? একেকটি গল্প চূড়ান্ত হতে কতো সময় লাগে?
পাপড়ি :
ফোনেটিক্স অনুযায়ী উনার নামের উচ্চারণ কিন্তু মানরোই হবে। মুনরো নয়। যে কোনো ভালো কাজ করতে হলে টাইম তো বেশিই দিতে হবে। হ্যাঁ, আমিও টাইম বেশি নিই যে-কোনো লেখার জন্যই। আগে বছরে গল্প লিখতাম ২/৩ টা। এখন তো দেড়/দুই বছরে একটা গল্প লিখছি। একটা গল্প চূড়ান্ত করতে তিন থেকে চারমাস সময় তো আমার লাগেই। বা তার চাইতেও বেশি। বয়স বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে সময় নিয়ে লেখার বিষয়টাও হয়তো বৃদ্ধি পাচ্ছে। কী করা? সবার স্বভাব একরকম হবে এমন তো নয়। বা সবার লেখার প্রক্রিয়া একই হবে, এমন তো নয়।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
ধরুন, কোনও এক রাতে খুব হাঁটতে ইচ্ছে হলো, তখন কোন কোন লেখককে সঙ্গে নিতে চান?

পাপড়ি : 
হাহাহা জটিল প্রশ্ন। মানুষের মন তো আকাশের রঙ, ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। আমি যাঁদের সঙ্গে নিতে চাই তাঁদের প্রায় সকলেই উড়ন্ত গাড়ি করে চলে গিয়েছেন আমাদের নাগালের বাইরে। যেমন মার্কেজ, নবারুণ ভট্টাচার্য্য, সুধীর চক্রবর্তী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এঁদের কম্প্যানি পেলে আমার নিশি-ভ্রমণ আনন্দদায়ক হতে পারত। তবে কবিদের প্রতি আমি কিন্তু বরাবরই দূর্বল। যার কবিতার প্রেমে তো আমি সেই চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই পড়ে আছি– তিনি কবি জীবনানন্দ দাশ। যদি সম্ভব হতো আমি কবি জীবনানন্দ দাশের সাথে একদিন ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে বেড়াতে যেতাম। কিংবা যমুনার জলে একদিন পানসী ভাসানে যেতাম। অবশ্য তিনি আমাকে সংগে নিতেন কিনা সে প্রশ্নও থেকে যায়!
আর এখনকার কথা যদি বল, তাহলে তরুণ কবিদের সংগে নিতে চাই। কবিদের কবিভাব, ভাবালুতা আমার ভালো লাগে। বা তাদের যখনতখন এদিকসেদিক প্রেমে পড়া! তাছাড়া আমার তো খানিকটা বয়স হয়েছে, তুমি কিন্তু বল নাই যে হাঁটতে চাওয়া রাতের অবস্থা কেমন হবে? পূর্ণিমা নাকি অমাবশ্যার রাত? ঘোরঘুট্টি আন্ধার হলে তরুণ কবিরাই উত্তম, কারণ আমি হোচট খেয়ে পড়ে গেলে তারা সামলাতে পারবে। পুর্ণিমা হলেও কোনো সমস্যা নাই,
কবি তখন আবৃতি করবে-
আজি, এমন চাঁদের আলো / মরি যদি সেও ভালো, / সে মরণ স্বর্গ সমান!
কিংবা মেঘমন্দ্র গলায় বলে উঠবে-
আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ
বাতাসে ঘুঘুর ডাক—অশত্থে ঘুঘুর ডাক—হৃদয়ে ঘুঘু যে ডাকে—নরম ঘুঘুর ডাক আজ
তুমি যে রয়েছ কাছে—ঘাসে যে তোমার ছায়া—তোমার হাতের ছায়া—তোমার শাড়ির ছায়া ঘাসে
আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ…
চোখে তেমন ভালো দেখি না, ফলত কবির আবৃতি শুনে চাঁদের আলোটুকুতো দেখার অনুভব হতে পারে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
সম্প্রতি কলকাতার দেশ পত্রিকা তাদের ফেইসবুক পেইজে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ একটা কথা বলেছেন, আমি উদ্ধৃতি দিচ্ছি- বুকার বা ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল বা বিদেশের একাধিক সম্মাননীয় পুরস্কারের তালিকাভুক্ত বইগুলি দেখলে আশ্চর্য হতে হয় এই ভেবে যে, সেই সব লেখকরা নিশ্চয়ই অন্য কোনও গ্রহের বাসিন্দা। না হলে ফুরফুরে প্রেম, পরকীয়া, সম্পর্কের টানাপোড়েন, একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙনের ইতিহাস, দেশভাগের কচকচি বা নিদেনপক্ষে ইতিহাস বই টুকে বায়োফিকশন না-লিখে এঁরা এমন সব চমকপ্রদ উপন্যাস লেখেন কী করে!
আপনার এ ব্যাপারে বক্তব্য কী? বাংলাভাষার লেখকরা কি সত্যিই বিষয়হীনতায় ভুগছেন? বিদেশের লেখকরা তো অদ্ভুত অদ্ভুত সব উপন্যাস লিখছেন, আর আমরা যেন থিম খুঁজেই পাচ্ছি না!
পাপড়ি : 
দেখ একজন লেখক কী লিখবেন তা কিন্তু নির্ভর করে তার দেখার চোখ, তার অনুভব, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ, পঠনপাঠন, বেড়ে-ওঠা ইত্যাদি নানান কিছুর উপর। তাছাড়া নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে লিখতে গেলে কিন্তু সেটা ঠিক তেমন লেখা হয়ে ওঠে না বা উঠবে না। এখন আমাদের বা ভারতে দেশভাগ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাববিস্তারি একটা অধ্যায়। বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। আমি তো মনে করি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বহুকিছুই লেখা এখনো বাকি। বা লেখা যায়।
আর হালকা বিষয়গুলি নিয়ে কিছু লেখা কিন্তু সহজ। এই কপি-পেস্টের যুগে কেইবা অতটা পরিশ্রম করতে চায়? শর্টকাট ওয়েতে লেখা গেলে কে যায় অত সরেজমিনে তদন্ত করে কিছু লিখতে?
আর যারা ম্যান বুকার বা নোবেল পাচ্ছেন তাঁরাও যে চটুল কিছু লিখছে না তা কিন্তু নয়। যেমন ধর অ্যালিস মানরো। যিনি ২০১৩র নোবেল লরিয়েট। মানরোর লেখা কিন্তু আমাদের সহজ জীবনেরই গল্প। প্রেম, পরকীয়া, যৌনতা থেকে শুরু করে সবই এসেছে মানরোর লেখায়। সেসব এলেও লেখার প্রসাদ গুণে সেসব কিন্তু আর সহজ থাকছে না। বা সাধারণ মনে হচ্ছে না। এটা মনে রাখতে হবে, অনেক চটুল বিষয়ও শুধুমাত্র লেখনীর গুণে অসামান্য হয়ে ওঠে উঠতে পারে।
না, আমি একমত নই। আগেই বলেছি যে, কে কী লিখবে এটা তাঁর একেবারেই ব্যক্তিগত চয়েস। আমি একথাটা বহুবার বলেছি- উপন্যাস লিখতে চাইলে বিষয়ের অভাব হওয়ার কথা নয়। অন্তত আমি এটা নিজের ক্ষেত্রে কক্ষনই অনুভব করি না।
মাস কয়েক আগে হারুকি মুরাকামির একটা উপন্যাস পড়লাম ‘নরওয়েজিয়ান উড’ নামে। এটা কিন্তু একটা প্রেমের উপন্যাস। তাহলে একথা কিন্তু বলা যাচ্ছে না যে, প্রেম-পরকীয়া নিয়ে কোথাও কিছুই লেখা হচ্ছে না। যা কিছু লেখা হচ্ছে সেসব এই ভারত বা বাংলাদেশেই হচ্ছে। এরকম আজগুবি কথাবার্তা কেন যে বলা হয় আমি ঠিক জানিনা।
একটা প্রবাদ আছে না- ‘পরের ছেলেকে দেখতে মোটা লাগে’, অর্থাৎ অন্যের যা কিছু, সকলই ভালো লাগে। কেন আমাদের এখানেও কি ভালো লেখা হচ্ছে না? হচ্ছে কিন্তু। তরুণদের লেখাপত্র পড়ে আমি কিন্তু বিস্মিত হই। বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণ কবিরা কিন্তু এই সময়ে অত্যন্ত ভালো কবিতা লিখছে।
আর কথাসাহিত্য তো প্রচণ্ড পরিশ্রমের কাজ, এই কাজে ধৈর্য্য লাগে। লাগবে।
আমাদের দেশের উপন্যাসগুলির দিকে দেখ, হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’ কিন্তু অসাধারণ উপন্যাস, এবং এটা কিন্তু দেশভাগ নিয়েই লেখা।
বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’। শহীদুল জহিরের ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’। এরকম আরও কিছু উপন্যাসের নাম তো বলাই যায়।
সবকিছুর মূলে আদতে যে কথাটি সত্য, তা হলো–আমরা দরিদ্র, আমাদের দেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ। তাই আমাদের এই পিছিয়ে থাকা। যদি এই লেখকেরাই পশ্চিমে জন্ম গ্রহণ করতো, দেখতে তাঁদের নিয়েও হইহই রইরই কাণ্ড ঘটে যেতো।
আমাদের যেসব লেখক রয়েছেন, তাঁদের লেখাপত্র উন্নত অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে পৌছে দেয়া হোক। তখন দেখো কী ফিডব্যাক আসে?
তবে এখানে আরেকটি কথা থেকে যায়, বাংলাভাষার মাধুরিমা ও শব্দ-বাক্যের খেলা ঠিক রেখে অনুবাদ করা প্রায় অসাধ্য মনে হয় আমার কাছে। বাংলাভাষার যে অপরূপ সৌন্দর্য তা ইংরেজিতে অনুবাদ করার সময় ইকুইভ্যালেন্ট রাখা, সেরকম স্কিলড-অনুবাদক না-হলে এটা একেবারেই অসম্ভব।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আপনি রবীন্দ্রনাথকে কীভাবে দেখেন? তাঁর কোন লেখাগুলো বারবার পড়েন? তাঁর কথাসাহিত্য, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, এবং গান…

পাপড়ি : 
রবীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ হিসেবেই দেখি। তিনি যা আমাদের দিয়েছেন বা যেভাবে দিয়েছেন, সেভাবে তো অন্য কেউ দিতে পারেনি। আগামীতেও কেউ পারবে বলেও মনে হয় না। আমার যে কোনো সংকটে তিনিই আমার নির্ভর। তিনিই আমার পরম আশ্রয় । তিনিই আমার নিদান। তাঁর ছোটগল্প বা উপন্যাসের তুলনা হয় না অন্য যে কোনো লেখকের সঙ্গে। আরেকটা বিষয় বলতেই হয়, রবীন্দ্রনাথ যেভাবে নারীর অতি-সংবেদনশীল ও বর্ণচোরা মনোজগতকে আবিস্কার করতে পেরেছিলেন, তেমনভাবে কিন্তু আমি আর কাউকে দেখিনি। মানে বলতে চাইছি অন্য কারো লেখায় আমি সেসব খুঁজে পাইনি। আমি তাঁর সবই পড়ি বা পড়েছি।
যখনই আমি অন্যদের দেয়া আঘাতে ভেঙে পড়ি, যখনই আমি বেদনার অতল সাগরে ডুবতে থাকি, রবীন্দ্রনাথই আমাকে উদ্ধার করেন। আমাকে সাহারা দেন। যখন কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত হয়ে আমি মরতে বসেছিলাম, তাঁর একটা গান আমি সারা দিনরাত বহুবার করে শুনেছি।
তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই / কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই / মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ। দুঃখ হয় সে দুঃখের কূপ / তোমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ আপনার পানে চাই / কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই।
জানো, গানটা শুনতে শুনতে মনে হতো, আমি তো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেও কী দারুণ এক প্রশান্তিতে ভরে উঠছি। আমার সত্যি কোনোকিছুর জন্যই কিন্তু আফসোস নাই। আমি বড় নির্ভার হয়ে ফিরে যাচ্ছি আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে। এসব ভেবে ভেবে আমার দুইচোখ অশ্রুজলে ভেসে যেতো। আমি যখন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু, বা নির্ভরতার, প্রশান্তির মানুষটির কাছ থেকেও পেয়েছি নিদারুণ অপমান, প্রচণ্ড অবহেলা বা ছোটলোকামি, আমি কিন্তু তখনও বলেছি-
আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছে দান / 
তুমি জানো নাই তার মূল্যের পরিমাণ ।
বা নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি তাঁর সংগীতেই ডুবে থেকে—
মেঘের পরে মেঘ জমেছে / 
আঁধার করে আসে / 
আমায় কেন বসিয়ে রাখ / 
একা দ্বারের পাশে…
রবীন্দ্রনাথই একমাত্র, যিনি আমার সমস্ত নিদানে আলগোছে পাশে এসে দাঁড়ান। আর খুব স্নেহভরে মাথায় হাত রেখে বলেন-
দেখো, এরকমই জীবন। এই না-হক অপমান আর অতল বেদনারাশিই তোমার নিয়তি। তুমি তোমার নিয়তি এড়াবে কী করে?
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
লেখার ক্ষেত্রে সঙ্গীত কতোটা আপনাকে তাড়িত করে? লিখবার সময় কোনও বিশেষ সঙ্গীত শুনতে শুনতে লেখেন?
পাপড়ি : 
লেখার সময় না হলেও সংগীতের বড় ভূমিকা রয়েছে আমার প্রতিদিনের জীবনে, যাপনে। লেখাপত্রেও চান্স পেলেই নানান গান আমি জুড়ে দেই। তাছাড়া যে কোনো ক্রাইসিসেই আমি সংগীতেই শরণ নিয়ে থাকি। কিন্তু লেখার সময় আমি কোনো শব্দই সহ্য করতে পারি না। শব্দ বা কোলাহলে আমি কিছুই লিখতে পারি না। আবার যখন সংগীতে নিমগ্ন থাকি, তখন অন্যকিছুতেও মন দিতে পারি না। আমি হয়তো অতি সংবেদনশীল একজন মানুষ। কী করা? আমার বেড়ে-ওঠা বা আমার জীবনযাপন বা আমার জেনেটিক্স হয়তো আমাকে এরকম সংবেদনশীল করে তুলেছে।
যে কোনো সফট-মিউজিক শুনতে পছন্দ করি। অবশ্য আবহাওয়ার হেরফেরে এই পছন্দ বদলে যায়।
সংগীতের টুকরোটাকরা আমি নানান লেখাতেই জুড়ে দিই।
‘বয়ন’ উপন্যাসের তাঁতিদের নিজস্ব গানগুনি পাঠকের কাছে পৌছে দেবার জন্য মুল্লুকচান নামে এক চরিত্রই সৃষ্টি করেছিলাম।
ঘুমুবার সময় কিছু Relaxing Music শুনি। তবে আমি সারাদিনরাত পিয়ানো ও বৃষ্টির যুগলবন্দী শুনে যেতে পারি। কিছুমাত্র বোরড না হয়ে। পিয়ানো এবং ভায়োলিনের সুর আমার পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
দিনের কোন সময়টাতে লেখেন?
পাপড়ি : 
লেখার বিষয়টা আমার কাছে এত সহজ নয়। লেখার জন্য আমার অনেক প্রস্তুতি লাগে। যখনতখন যে কোনোভাবে বা যে কোনো পরিবেশে লিখতে বসতে পারিনা। লেখার জন্য নির্জনতা লাগে, লাগেই। কারো উপস্থিতি বা কোনরকম শব্দের মাঝে লিখতে পারিনা। বাচ্চারা যখন ছোট ছিল তখন ওরা ইশকুলে চলে গেলে, বাসা খালি হলে লিখতে বসতাম। ওরা ফিরে এলে টেবিল থেকে উঠে যেতাম। ওদের লুক আফটার করার জন্য।
কিন্তু এখন দিন যতই যাচ্ছে, ততই যেন আমার স্বাধীনতা খর্ব হয়ে উঠছে। নির্জনতা পেতে পেতে একেবারে রাত্রি ১০টা হয়ে যায়। মানে আমার একান্ত নিজের ঘর কাম লাইব্রেরিতে নিজের ল্যাপটপে বসার জন্য অফুরন্ত নির্জনতা বা সময় খুব একটা মেলে না। কিছু পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে আমার এই সময়-সঙ্কট চলছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
এই সময়ে লিখবার কারণ কী?

পাপড়ি : 
পূর্বের প্রশ্নেই জবাবটা দিয়ে দিয়েছি বোধ হয়। আমার আদতে কোলাহল বা মানুষজন একদম ভাল লাগে না। দিনের কিছু সময় একা হতেই হয়। আমি একা হতেও চাই। একা একা লিখতে বা পড়তে বা চিন্তা করতে পছন্দ করি। ফলত পিনড্রপ সাইলেন্সের জন্য অপেক্ষমান থাকতে হয়। যখন ওটা মেলে, শুধু তখনই আমি লিখতে বসি। অবশ্য লেখার ভাবনাচিন্তা তো মাথার ভেতর চলতেই থাকে অনবরত। এই চিন্তা থেকে কোনো লেখকেরই নিষ্কৃতি মেলে না কোনোদিনই।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
এটা একটা দারুণ বিষয় লেখকদের জন্য! নিজের ঘর কিংবা লেখার ঘর! আপনার লেখার ঘরের কোনও নাম রেখেছেন?
পাপড়ি : 
বাংলাদেশের যে কোনো লেখকের জন্যই তাঁর নিজের বা নিজের লেখার বা পড়ার একটা ঘর আলাদা করে পাওয়া অত সহজ মনে হয় না আমার কাছে। এই নাগরিক জীবনে তো আরও সহজ নয়। সবাই তো আর রবীন্দ্রনাথের মতো রাজকপাল নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন না। আর নারীলেখকদের জন্য তো এটা আরও বেশি কষ্টসাধ্য। আমার মনে হয়না, দুই-একজন ভাগ্যবান নারীলেখক বাদে শুধুমাত্র লেখালেখি করার জন্য আলাদা কোনো স্পেস নারীদের থাকে! মাঝে মাঝে হতাশ বোধ করি, লেখালেখি যে সহজ কম্ম নয়, অত্যন্ত সংবেদনশীল, প্রচণ্ড কঠিন একটা বিষয়— তা আমাদের পরিবার বা সমাজ বুঝবে কবে? ধারণা করি, কোনোদিনই হয়তো তা বুঝবে না। আমার তো ভাবনাচিন্তা করার জন্যও আলাদা স্পেস লাগে। নির্জনতা লাগে। বা গান শোনার জন্য। মুভি দেখার জন্য বা বই পড়ার জন্য। আমি হাটবাজারে বসে কিছুই করতে পারিনা। বারংবার বলছি, কোলাহল একেবারেই আমার অপছন্দের একটা বিষয়। আমার স্বভাব খানিকটা জেন-সন্যাসীদের মতো। চান্স পেলেই চুপচাপ চোখ বুজে থাকা। নতুন কোনো উপন্যাস লেখার আগে তো আমি প্রায় কাউকে সহ্য করতে পারি না। এত বিরক্তিকর লাগে তখন এই সমাজ-সভ্যতা! পারিবারিক দায়িত্ব! এদিকে আমি আবার উপন্যাস লেখবার সময়টাতে আর অন্য কিছুই লিখতে চাই না। আমার মনে হয়, অন্যকিছু লিখলে যেন উপন্যাস লেখবার ছন্দপতন ঘটে! কিন্তু তবুও কখনো কখনো এত গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা থেকে লেখার ফরমায়েশ আসে যে, তখন আমি সত্যি বিব্রত বোধ করি। যখন বয়স অল্প ছিল, তখন মনের বিরুদ্ধে অনেক ফরমায়েশি লেখা লিখেছি। আর নিজের ওপরই নিজে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে উঠেছি! একবার আমার সাথে গাড়ি না-থাকার দরুন সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক তাঁদের গাড়ি করে আমার বাসায় লিফট দিতে চাইলেন। আমিও মহানন্দে উঠে পড়লাম তাঁদের গাড়িতে। আমি তখন এক ফাঁকে হকভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হকভাই ফরমাইশি লেখা নিয়ে কী করেন? বিরক্তিকর লাগে না?
হকভাই তড়িৎ জবাব দিয়েছিলেন- আমি কোনো ফরমাইশি লেখাই লিখি না।
হকভাইয়ের এই সিদ্ধান্ত আমার অত্যন্ত পছন্দ হয়েছিল। তখন থেকে আমিও ফরমাইশি লেখার চাপ এড়াতে চেষ্টা করি। যদিও আমি হকভাইয়ের মতো অমন উঁচু দরের লেখক নই। হকভাইয়ের পায়ের নখের সাথেও নিজেকে তুলনা করার মতো স্পর্ধাও আমি রাখি না।
আমি যে ঘরে বসে লিখি সেটাই আমার শোবার ঘর, পড়ার ঘর, লেখার ঘর। অর্থাৎ পুরো ঘরটা জুড়েই আমি আছি। মানে যা-কিছু রয়েছে তার সবই আমার একান্ত নিজস্ব। ঘরে আছে দুইটা লেখার টেবিল। একটাতে ল্যাপটপে কাজ করি। অন্যটাকে কাগজকলমে লিখি। ঘরের স্লাইডিং-ডোর খুলে দিলে একটুকরো ব্যালকনি। ব্যালকনিতে আগে ছিল নানারকম গাছের সার সার টব। কিন্তু গাছেদের যত্ন করার সুযোগ এখন আর জোটে না। বইয়ের খোলাপাতার সামনে গাছেরা মরে যেতে থাকে। গাছেদের বদলে ব্যালকনিতে এখন আসন পেতে থাকে ঝিরঝিরে হাওয়া। বাদলার দিনে জলের ছাঁট আর শীতকালে হুহু শীত। আমি আমার বিছানায় বসেই প্রতিবেশি আমগাছের সবুজ-সবুজ-পাতাগুলি দেখতে পাই। বিশাল বিশাল অট্টালিকাকে হার মানিয়ে ওই আমগাছের ওপাশে নীলাম্বরীর খানিকটা আঁচল আকাশ লুটিয়ে রাখে। আমগাছের হলুদাভ-বোল দেখে ঘরে থেকেই বুঝতে পারি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে! ছাঁদ সমান উঁচু উঁচু বুকসেলফ রেখেছি ঘরের দেয়াল জুড়ে। ঘরের কাবার্ডের ওপর বই। ড্রেসিঙয়ের ফাঁকে ডাঁই করে রাখা বই। দুইটা টেবিলের প্রায় সর্বত্র বই গুছিয়ে রাখি। যে বইগুলি প্রিয় সেসব চোখের সম্মুখে রাখি। যেন চাইলেই তাদের টেনে নিতে পারি। এরকম বইবন্দী হয়ে থাকতে থাকতে নিজেকে বাল্মীকি মনে হয়। যেন বইগুলিই উইপোকার মতো আমাকে ঘিরে ধরেছে।
যেসব বই সেলফে স্থান পায় নি, তাদের জন্য সেলফের ব্যবস্থা করতে পারলে এই উইপোকারা আরও দলে বাড়বে। অর্থাৎ আমার সারা ঘরই তাদের দখলে চলে যাবে। তখন আমি আমার ঘরটার নাম দেব ‘বাল্মীকির কুটির’। কবি মজনু শাহর কবিতা সমগ্রের নাম— ‘বাল্মীকির কুটির’। নামটা আমার অত্যন্ত ভালো লাগে। এবং মজনু শাহর কবিতাও।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
এই যে বললেন, লেখার ঘরের ল্যাপটপে বসবার অফুরন্ত নির্জনতা! ল্যাপটপেই লেখেন? কাগজে লেখেন না?
পাপড়ি : 
এই প্রশ্নের জবাব হয়তো খানিকটা আগের উত্তরে দিয়ে রেখেছি। এখন প্রায় সব লেখাই ল্যাপটপেই লিখি। কিন্তু উপন্যাস লেখবার সময় কাগজ-কলমের স্পর্শ ছাড়া লিখতে পারি না। তাও আবার বিশেষ ধরণের কাগজ। আগে আমার সাংবাদিক বন্ধুরা এই কাগজের যোগান দিতো। পত্রিকা অফিসগুলোতে এই কাগজ লিখবার জন্য ব্যবহার করা হয়। পরে বেশি বেশি কাগজের দরকার হওয়াতে আমি বইপত্রের দোকানগুলিতে ওই কাগজের খোঁজ করি। কিন্তু ওসব নাকি বিদেশি-কাগজ। না পেয়ে প্রায় কাছকাছি মানের বসুন্ধরার ব্রান্ডের রিম কাগজ কিনে ছোট ছোট লেখার প্যাড বানিয়ে নিয়েছি।
আগে গল্পও এই কাগজে লিখতাম। এখন জোর করে নিজেরে ওই অভ্যাস থেকে মুক্ত করেছি। খসখসে নিউজপ্রিন্ট কাগজে প্রথম ড্রাফট করার পর দ্বিতীয় বা তৃতীয় ড্রাফট ওই কাগজেই করি। লেখা ফাইনাল করি হোয়াইট প্রিন্টের এফোর সাইজ কাগজে। আমার লেখবার হ্যাপাও ম্যালাই। সবকিছুতেই আয়োজন লাগে। আগেভাগে প্রিপারেশন লাগে। লেখার জন্য দামী কলম ব্যবহার করি। হোয়াইট প্রিন্টে ফ্রেশ করে তুলবার সময় অবশ্যই জেলপেন ব্যবহার করি।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
রাত ১০টার দিকে লেখার সেই নির্জনতা যখন পেয়ে যান, তখন কি নোট করেন? না কি লেখাটি একদম মাথায় তৈরি হয়েই থাকে, শুধু কীবোর্ডে চেপে লেখাটিকে লিখে যাওয়া বাকি থাকে?
পাপড়ি : 
না, নোট ঠিক নয়। হয়তো কিছু কী-পয়েন্ট মোবাইলের নোটস অপশনে লিখে রাখি। বা ছোট কোনো নোটপ্যাডে। এসবও আগে করতে হতো না। এখন করতে হয়। কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত হবার পর এটা বেড়েছে মনে হচ্ছে। মানে অনেক কিছুই স্মরণে রাখতে না পারা। আর লিখতে শুরু করলে পূর্বের চিন্তা ধরে লেখা এগোয় তাও কিন্তু নয়। লিখতে লিখতে কোন দিকে যাই তার ঠিকঠিকানা জানা থাকে না।
লেখা হলো নদীর মতন, সে কোনোদিকে ছুটবে, কোনদিকে বাঁক নেবে আগেভাগেই বলা মুশকিল। কখন নদীতে জোয়ার আসবে, ভাটা নামবে, ঝড় উঠবে, জল গড়াবে এসব আগেভাগেই কিন্তু ঠিক করে রাখা যায় না। তেমনি লেখাও। আগেভাগে ঠিক করে রাখলেও লিখতে শুরু করলে বহুকিছুই বদলে যেতে পারে। বা বদলে যায়।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
কখনও টাইপরাইটারে লিখতে চেয়েছেন? বিশ্বের বড় লেখকদের অনেকেই টাইপরাইটারে মাস্টারপিস লিখে গেছেন, তাদের মতো করে টাইপরাইটারে?
পাপড়ি : 
ভাল প্রশ্ন। হ্যাঁ অবশ্যই চেয়েছি বা এখনো চাই। টাইপরাইটারের কী টেপার শব্দাবলি আমার দারুণ লাগে। মনে হয় পাখসাট। বিহঙ্গের ডানা ঝাপটে উড়ে যাবার মতো।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
লেখা কি আগাগোড়াই ল্যাপটপে করেন না কি কিছু কিছু কাগজেও লেখেন, পরে টাইপ করে নেন?
পাপড়ি : 
এটা আগে করতাম। এখন আর টাইম পাই না। মানে কাগজে লিখে টাইপ করার। এখন যা কিছুই লিখি সরাসরি ল্যাপটপেই লিখি। তবে উপন্যাস লিখি যখন, তখন হোয়াইট প্রিন্টে লেখা ফাইনাল করে কম্পোজিটরকে দিয়ে কম্পোজ করাই। কারণ আমার টাইপের গতি একদমই নেই। ভালো না। কোনোরকমে টেনেটুনে কাজ চলে। এটার কারণও রয়েছে, আমাদের শুরু বা শুরুর পরে্র দীর্ঘ সময় আমরা কাগজ-কলমেই কাজ করেছি। হঠাৎ এই যন্ত্রের ব্যবহার, আয়ত্ব করতেও তো সময় লেগে যাচ্ছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
কখন নিজেকে ঘোরগ্রস্থ লাগে? একটানা কতক্ষণ লিখতে পারেন?
পাপড়ি :
ঘোরগ্রস্থ লাগে নাকি লাগে না সেটা সঠিক বলতে পারব না। লেখার পরিশ্রমটুকু সহ্য হলে দীর্ঘক্ষণ লিখতে পারি। অবশ্য ঘাড়-হাত-চোখ ব্যাথা হয়ে যায়। তবে উপন্যাস যখন লিখি, খুবই দুরাবস্থার ভেতর থাকি। যেমন নাওয়াখাওয়া ভুলে যাই। সারাদিন লিখতে লিখতে ওসবের কথা মনেও থাকে না। দেখা গেল দুই-তিনদিন পর হয়তো স্নান করছি। সারাদিনে একবেলা খেয়েছি কী খাইনি, এরকম ঘটে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
ভোরে বা দিনের শুরুর দিকে লেখেন না?
পাপড়ি : 
আমি সম্ভবত কোনোদিনই শিশুভোরে লিখিনি। আমি বরাবরই লেইট-রাইজার। আমার যত আলস্য এই ভোরবেলাতেই। আহা! ভোরের ঘুমের মতো মধুর আর কিছুই নেই এই পৃথিবীতে। দিনের শুরুতে আমার কাঙ্ক্ষিত নির্জনতা পেয়ে গেলে লিখি।
তবে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর ভোরে লেখা হয়েছে। তখন সারারাত নির্ঘুম কেটে যেত। কী যে এক অসহ্য যন্ত্রণা বলে বোঝাতে পারব না। কোনো বোধই যেন আর কাজ করতো না। মাথার ভেতরে দিবানিশি ঘনকালো মেঘের চাঙারি ভেসে বেড়াত।
ওই সময়টাতে আমার জার্নাল ‘একলা পথের সাথি’ লিখে চলেছিলাম।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
হোসে সারামাগো কম্পিউটারে লিখিত লেখাটিকে প্রিন্ট করে নিতেন, কারণ হচ্ছে লেখাটিকে স্পর্শ করা। আপনার কি লেখাকে প্রিন্ট করে স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে? করলে সেটা কেমন, বিস্তারে বলুন।
পাপড়ি : 
আরে এটা তো আমার খুবই ইচ্ছে করে। আমি তো ইউনিকোড ছাড়া অন্য ফন্টের টাইপ পারি না। ফলে আমার প্রায় সব লেখাই একটা সময় কম্পোজিটরের কাছে পাঠাতে হতো। তখন আমি আমার লেখার প্রিন্ট দেখে আনন্দিত হতাম। এখন তো দিন বদলেছে। সব ফন্টই চলে। তবুও আমি আমার লেখা স্পর্শ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকি। আর স্পর্শ ছাড়া আমি কিছুতেই উপন্যাস লিখতে পারব না। উপন্যাস লিখলে তা আমাকে প্রিন্ট নিয়ে দেখতেই হবে। না দেখা পর্যন্ত আমি তা প্রকাশের জন্য দিতেই পারব না। মোটকথা এটা আমার জন্য একেবারেই ইম্পসিবল।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
কোথাও বেড়াতে গেলে লিখতে পারেন? ট্রেনে বাসে যেতে যেতে লিখতে ইচ্ছে করলে কী করেন?
পাপড়ি : 
যদি আমার মনপছন্দ ভ্রমনসঙ্গী পাশে থাকে, তাহলে লিখতে পারি। বাচাল বা অগভীর লোকজনের সাথে বেড়াতে গেলে লেখা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। মানে ‘গুড কম্প্যানি‘ পছন্দ করি। মনে মনে সেটা চাই-ও। কিন্তু চাইলেই কী আর সব পাওয়া যায়? ট্রেনে বা বাসে লিখতে ইচ্ছে করলে ফোনের নোট অপশনে কী-নোট নিয়ে রাখি। বা নোটপ্যাডে লিখে রাখি।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
(বাইরে গেলে) সঙ্গে সব সময় বই থাকে?
পাপড়ি : 
আমার পড়াটাও লেখার মতোই। আদতে আমি সব বিষয়েই মনে হয় চূড়ান্ত সেনসেটিভ। বিদঘুটে স্বভাবের মানুষ। হ্যাণ্ডব্যাগে বই রাখি বা রাখতাম, কিন্তু পড়তে পারি না। হাটবাজারে বসে আমি পড়ালেখার কাজ করতে পারি না। আমার ধ্যান লাগে, সব বিষয়ে নিরবিচ্ছিন্ন মগ্নতা লাগে। আর লাগে একাকী এক গৃহকোণে একাকী চিন্তা করার ফুসরত।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
সঙ্গে কি নোটবুকও থাকে?
পাপড়ি : 
ফোনের নোটপ্যাড অপশনটা যথেষ্ঠ সুবিধাজনক হওয়া সত্ত্বেও নোটবুক সঙ্গে রাখি। রাখিই। কারণ কাগজ আর কলমের মেলবন্ধন পেরিয়ে অনেক পরে আজকের এই যান্ত্রিকতা আমরা পেয়েছি। মানে যান্ত্রিক সুবিধা। কিন্তু নিঃশব্দ কাগজকলমের টান বড় মারাত্নক। নিজের অতি পরিচিত হস্তাক্ষরের সাথেও তো লেখকের একধরণের বন্ধুতা গড়ে ওঠে, নাকি? যা যন্ত্র থেকে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
আপনার ‘বয়ন’ উপন্যাসটি আমি আগে পড়েছি, সম্প্রতি পড়লাম এ নিয়ে আপনার যে গ্রাউন্ড ওয়ার্ক, বেদনার কিংবা সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। মূলত এই তাঁত-শিল্পীদের জীবন ও যুদ্ধকে গভীর থেকে দেখার যে চেষ্টা ও দৃষ্টি, সমকালীন অনেক উপন্যাসে তা পাইনা। সেদিক থেকে মনে হয় উপন্যাসটি নিয়ে পাঠকের প্রতিক্রিয়া কম, এটা কেনো?
পাপড়ি :
আমার সেটা মনে হয় না। আমার লেখাপত্র তো সবাই পড়বে না, বা সবারই ভালো লাগবে, এমনও নয়। আমি অনেক বোদ্ধাপাঠকের কাছ থেকেই অত্যন্ত মূল্যবান প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। সেগুলি বলে শেষ করতে পারব না। হয়তো সাধারণ পাঠক আমার লেখা কমই পড়ে থাকবেন। আমি সেটা চাইও না। আমি চাইনা আমার লেখা সব ধরণের পাঠকেরা পড়ুক। আর আরেকটা বিষয়ও আছে, দেখবে সমকালে কাউকে তেমন মর্যাদা দেয়া হয় না। এটা শুধু আমার বেলায় নয়, আমার পূর্বসুরিদেরও এই অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়েছে। এসব বিষয়ে আমাদের দেশের সাহিত্যাংগন তো আরও এক কাঠি সরস! যোগ্যকে সমাদর করতে এঁরা জানে না কিংবা এঁরা সমাদর করতে চায়ও না। আর সে যদি হয় নারীলেখক, তাহলে তো কথাই নেই। নারীলেখকদের লেখাপত্র নিয়ে বেশিরভাগই মুখও খুলতে চায় না।
প্রতিক্রিয়া আমি অঢেল পেয়েছি। তরুণ লেখক, অনুবাদক শবনম নাদিয়া ‘বয়ন’ নিয়ে সর্বপ্রথম আলোচনা করেছিল এবং তা ছাপা হয়েছিল ‘দ্য ডেইলি স্টারে’। কলকাতার লেখক ভগীরথ মিশ্র ও আনসারউদ্দিন বইটি নিয়ে দুর্দান্ত আলোচনা করেছিলেন। ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খান, কথাসাহিত্যিক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, আহম্মদ কবীর, তরুণ লেখক সালাহ উদ্দিন শুভ্র– এরকম আরও অনেক নামই বলা যাবে।
তোমরা হয়তো জানো, সম্প্রতি ‘বয়ন’ কলকাতার ‘তবুও প্রয়াস‘ থেকে রিপ্রিন্টেড হয়েছে। ওখানকার পাঠকদের কাছ থেকে আমি কিন্তু দারুণ সাড়া পেয়েছি। কলকাতার তরুণ লেখকেরা বইটি নিয়ে অত্যন্ত আগ্রহ দেখিয়েছে। ‘বয়ন’ লিখবার একযুগ বাদে সম্প্রতি অত্যন্ত মূল্যবান একটি প্রতিক্রিয়া লিখেছে কলকাতার তরুণ লেখক অমিতাভ প্রহরাজ।
তবে একথা সত্য বইটি হয়তো ততটা প্রচার পায়নি, যতোটা পাওয়ার কথা ছিল। এর কারণ হতে পারে, কোনো মিডিয়াই আমার পক্ষে নেই। দ্বিতীয় কারণ, আমার ইন্ট্রোভার্ট-স্বভাব। নিজের লেখাপত্র নিয়ে নিজের মাঝেই গুটিয়ে থাকা মানুষ আমি। যেহেতু আমি কারো কাছেই যাই-না,সেহেতু আমার বইয়ের প্রচার কে করবে? কার এমন দায় পড়েছে, বল? তবে যারা জানবার তারা কিন্তু ঠিকই জানে যে, ‘বয়ন’ নামক একটি উপন্যাস লেখা হয়েছে এই বাংলাদেশে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
লেখার ক্ষেত্রে ‘নারীর লেখা’, ‘পুরুষের লেখা’- একটা বহুল ব্যবহৃত টার্ম। অনেক সময় মাইন্ড সেটও এমন থাকে। নারীর লেখা নাকি পড়লেই বুঝা যায়। ঢালাওভাবে বর্তমানে একথা বলার কোন সুযোগ কী আছে?
পাপড়ি : 
আমাদের নারীশিক্ষার ইতিহাস তো খুব বেশিদিন আগের নয়। বেগম রোকেয়ার সময় থেকে যদি ধর, তাহলে তো মাত্র ১৫০ বছর। সেক্ষেত্রে এরকম কথা চালু থাকাটাই কিন্তু স্বাভাবিক। ‘নারীর লেখা’ বলতে আদতে কী বুঝায় এটা আগে জানা জরুরি। নারীর লেখা মানেই যদি হয় ট্র্যাশ অর্থে তাহলে আমার মনে হয় ভাবনাচিন্তা করে কথা বলার দরকার আছে। তবে এটাও তো সত্য বেশিরভাগ নারীর লেখাই কিন্তু জলো-আবেগে ভরপুর। সূক্ষ্ণ জীবনবোধ বা জীবনদর্শন বা সূক্ষ্ণভাবে জীবনকে দেখার দৃষ্টি অনেক নারীলেখকের মাঝেই নেই বা থাকে না। নিজেদের ব্যক্তিগত প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-বেদনার উর্ধ্বে উঠতে না পারলে নারীদের কাছ থেকে কোনোভাবেই ভালো লেখা পাওয়া যাবে না।
তবে ঢালাওভাবে কিছুতেই এরকম বলা ঠিক নয়, আমি তো দেখছি অনেক নারী লেখক পুরষদের চাইতে শতগুণ ভালো লিখে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
লেখক কেবলই লেখক। এই যে নারী পুরুষ বিভেদ করে বিবেচনা করা তা নারীকে অবমূল্যায়ন করে। বরং অনেক নারী এই সময়ে অসাধারণ লিখছেন। তবু এই ‘কোটা বিবেচনা’ থেকে বের হতে পারছেনা। আপনার মতামত জানতে চাই।
পাপড়ি রহমান: 
প্রথমত ভাবতে হবে এই ‘কোটা’ ব্যবস্থার স্রষ্টা কে বা কারা? কোটার ব্যবস্থা বা হিসেব বা কোটা নিয়ন্ত্রক, যা-ই বলো না কেন সমস্তই কিন্তু পুরুষদের তৈরি। অন্য সব ক্ষেত্রের মতোই নারীকে ‘ঊন’ করে রাখার এটাও একটা কৌশল বা কায়দা ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন সত্য কথা বললে অনেকেই আমাকে তেড়ে মারতে আসবেন, ওই যে একটা কথা আছে না— গরম ভাতে বিলাই ব্যাজার, উচিত কথায় মামুজি ব্যাজার। পুরুষদের মাঝে যারা লিখছেন তাঁদের সকলের লেখাই কি ‘এ’ গ্রেডের লেখা নাকি? তাঁরা সকলেই কি ক্রমাগত ক্ল্যাসিক লিখে যাচ্ছেন? আমি তো দেখি ‘ডি’ গ্রেডের লেখাপত্র নিয়েও অনেক রাইটারই বেশ বহাল তবিয়তে আছেন। সেখানে কিন্তু একজন ‘এ’ গ্রেডের নারীলেখককে নিয়েও টুঁ শব্দটি হবার যো নেই। আদতে কথা হলো নারীর প্রতিভাকে মেনে নেয়া বা যথাযথ সম্মান জানানোর মতো মানসিকতা এখনো আমাদের সমাজে তৈরিই হয়নি। তবে আমি আশাবাদী মানুষ, অচিরে না ঘুচলেও ধীরে ধীরে এ অবস্থার উন্নতি হবে। যেমন এখন সামাজিক মাধ্যমে নারী ও পুরুষ কিন্তু একইভাবে একইরকম করে নিজের চিন্তাকে সার্ভ করতে পারছে। একই স্বরে কথা বলতে পারছে। একদিন নিশ্চয়ই ওই ‘কোটা’ বরাদ্দ থাকাটাও উঠে যাবে। উঠে যাওয়াই তো উচিত।
ভালো একজন পাঠক নিশ্চয়ই ওয়াকিবহাল থাকেন, কে ভালো লিখছে? অই কোটাফোটা যা-ই থাকুক না কেন ভালো লেখকের লেখাটি ঠিকই কিন্তু পাঠকের দরবারে পৌছে যায় বা যাবে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
এই যে কোন ট্র্যাশ লেখার অতিমূল্যায়ন, ‘বয়নের’ মতো উপন্যাসের মূল্যায়ন না হওয়া আপনি কি মনে করেন না এটি সামগ্রিক ভাবে সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর?
পাপড়ি: 
এ প্রশ্নের জবাব এক-দুইকথায় দেয়া সম্ভব নয়। তবে একটা সত্য কী জানো- পাঠকেরা কিন্তু লেখকের চাইতেও অনুসন্ধানী। লেখকের চাইতেও পাঠক অনেক বেশি বুদ্ধিমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে। মিডিয়ার সুদৃষ্টি আমার ওপর নেই বলে হয়তো আমাকে কর্নার্ড হয়ে থাকতে হচ্ছে। বা বলা যায় আমাকে কর্নার্ড করে রাখা হয়েছে। তাতে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আমি কিন্তু হচ্ছিনা বা হইনি। আমি তো মনে করি, এতে বরং আমি লাভবানই হচ্ছি। আমার নিজের কাজগুলি নির্বিঘ্নে করে যেতে পারছি।
পূর্বেই বলেছি পাঠক কিন্তু বোকা নন। তারা ভালো গ্রন্থকে একসময় ঠিকই খুঁজে নেবেন।
এই যে দিবারাত্রি ডামাডোলে থাকা বা ট্র্যাশ বইকেও শুধুমাত্র প্রচার জনিত কারণে ‘ভালো বই’ হিসেবে চিহ্নিত করা- এসবই সাময়িক। সময় সবকিছুর বড় নিয়ন্ত্রক। একটা সময় পরে ওইসব ‘ট্র্যাশ’ কালের ধূলায় ঠিকই বিলীন হয়ে যাবে।
ধর, দুইযুগ আগের কথাই যদি বলি, আমাদের সাথে লিখতে আসা গুটিকয়েক লেখককে নিয়ে ওইসময়ে মিডিয়া কিন্তু ভীষণ-রকম তোলপাড় হয়েছিল, কিছু কিছু পাঠকও মিডিয়ার বানানো ওইসব স্টার-লেখকদের নিয়ে প্রচণ্ডভাবে মেতে উঠেছিল– সেইসব পাঠকেরা এখন কই? বা সেইসব লেখকেরাই এখন কোথায়? কই তাঁদের তেমন বইপত্র? কই তাঁদের উচ্চাংগের কোনো কাজ?
বা যদি ঠিক আমাদের আগে শুরু হওয়া আশির দশকের কথাই বলি– আশির দশকের কতজন লিখছেন এখনো? কতজন এখনো টিকে আছেন তাঁদের লেখার কারণে? কতজন লেখককে মনে রেখেছে পাঠক?
আমি কচুরিপানার মতো শেকড়হীন-লেখক নই। বা কোনো গড্ডালিকা-প্রবাহেও ভেসে যেতে আসিনি। তাই এসব নিয়ে আমি একদমই ভাবিত নই।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :
সাহিত্যে সমসাময়িক কালে এতসব পুরস্কার, মূল্যায়ন ইত্যাদি উপভোগ করার জন্য ‘বিশেষ কোন কোয়ালিটি’ র প্রয়োজন হয়– যা কখনোই লেখার মানের উপর নির্ভরশীল নয়। অভিজ্ঞতার আলোকে আপনি এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
পাপড়ি: 
সত্যিই হাসালে তোমরা। খুব করে হাসতে পারলাম। আমি আদতে সত্যি জানি না কীভাবে বা কী লিখলে পুরস্কার পাওয়া যায়? বা কীসের জন্য পুরস্কার দেয়া হয়? অবশ্যই বিশেষ কোনো ‘কোয়ালিটি’ তো থাকতেই হয়। কিন্তু সেই ‘বিশেষ কোয়ালিটিটা’ কী? আমি তো আগেই বলেছি আমি খুব নির্জন-মানুষ। প্রায় নিজের ঘরে অন্তরীণ থাকা মানুষ। আর তৈলবাজি আমার দ্বারা কিছুতেই সম্ভব নয়। যারা পুরস্কার পেয়ে পকেট ভারি করে বাড়ি ফিরে গেছেন তারাও তো কিছুতেই মুখ খোলেন না। তারা মুখ খুললে না-হয় পুরস্কার পাওয়ার টিপসগুলি জেনে নিতাম।
পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয়টা টেক এণ্ড গিভ, গিভ এণ্ড টেকের আওতায় কিনা তা-ও আমি জানিনা। তবে এটুকু জানি, পুরস্কার হইল ক্ষমতাবানদের ইচ্ছে পূরনের কোনো গল্প। আর নারী লেখকদের জন্য পুরস্কার পাওয়া আরও বেশি টাফ- কারণ ‘উন’ দের হাতে স্বীকৃতির বাঘ-মহিষ ধরিয়ে দিতে কেমন বাধো বাধো লাগে না?
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বহু লেখক জীবদ্দশায় মূল্যায়িত হননি।
পাপড়ি: 
জীবন তো একটাই। একবারই আসা এই পৃথিবীতে। এই পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর…
যা কিছু প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি তার সবকিছুই এই জীবনের ধুলাবালিতেই গড়া। কী যায় আসে কেউ মূল্যায়িত না করলে? পুরস্কৃত না-করলে? বা মুখ ফুটে প্রশংসাবাণী না ঝরালে? যে কোনো প্রকৃত-লেখক মাত্রই জানেন, তিনি কী লিখছেন? জানেন, তাঁর সময়ের লেখকদের চাইতে কেন তিনি ব্যতিক্রম? কেন তিনি উত্তম?
ধারণা করি, নিজের লেখাপত্র নিয়ে পরিস্কার ধারণা ছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। নিজের লেখা নিয়ে স্বচ্ছধারণা না থাকলে একের পর এক ওরকম ক্ল্যাসিক লিখে যাওয়া সম্ভবপর হতোনা। তেমনি শহীদুল জহিরও জানতেন তিনি কী লিখছেন? এই দুইজনই আমার অত্যন্ত পছন্দের-গদ্যকার। এঁদের দুইজনের কাজ আজও আমায় বিস্মিত করে।
নিজের লেখা সম্পর্কে স্বচ্ছধারণা না থাকলে ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’, ‘দিবারাত্রির কাব্য’, ‘জননী’ বা ‘চতুষ্কোণ’ লেখা কিছুতেই সম্ভব হতো না। তেমনি— ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা‘, ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ ‘মুখের দিকে দেখি’ বা ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু’ লেখাও সম্ভব হতো না।
দেখো, একটা বিষয় খেয়াল করেছি, সৎ মানুষের মূল্যায়ন কোনোদিনই হয় না। যদি কোনোদিন হয়ও, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় তাঁর মৃত্যুর পরে নয়তো একেবারে বিদায়-বেলায়। বহুক্ষেত্রেই দেখবে জীবন্ত-কংকালদের টেনেহিচড়ে স্টেজে ওঠানো হচ্ছে। দেয়া হচ্ছে সম্মাননা ,পদক। পরানো হচ্ছে উত্তরীয়। তখন হয়তো তাঁর বোধশক্তিই ক্ষীণ। সে ঠিকমত হাঁটতে -চলতেও পারেননা। চোখেও দেখতে পাননা ঠিকমত। আমি এরকম মূল্যায়নের কোনো কারণই দেখিনা। এই মূল্যায়নের দরকার কী? এই অর্থপ্রাপ্তির প্রয়োজন কী?
আর যে কোনো লেখকের মনেই এই আশাটি প্রদীপের মতো জ্বলতেই থাকে-
আজি হতে শতবর্ষ পরে / 
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি / 
কৌতূহলভরে…
আমাদের সাহিত্যাংগনে যে-সমস্ত নোংরা-রাজনীতি চলে, কিংবা যেভাবে চলে দলবাজি, তাতে করে এসবের বাইরে থাকা কেউ-ই তাঁর যোগ্য সম্মান কোনোদিনই পাবেন না। আমার দুই যুগের অধিককাল লেখক-জীবনে এ সত্য আমি হাড়েহাড়ে জেনেছি।
তবে আমার নিজের কথাটি যদি জানতে চাও, তাহলে আমি কবীর সুমনের ওই গানটির সাথে গলা মেলাব-
অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো দাবীদাওয়া/
এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া…
অর্থাৎ আমি শুধু লিখতেই চাই। লেখার কাছে আমার কোনো দাবীদাওয়া একেবারেই নাই। আমি শুধু আমার লেখাগুলি যত্ন-সহকারে লিখে যেতে পারলেই আনন্দিত।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
আপনার লেখার বিষয় বা চরিত্ররা একদম প্রান্তিক, মাটিঘেঁষা মানুষ আপনার কলমে প্রাণ পায়, এটি কি উদ্দেশ্যমূলক? নাকি তারাই তাড়িত করে আপনাকে?
পাপড়ি: 
যা আমি ভালোবাসিনে, বা যাঁদের ভালোবাসিনে তাঁদের নিয়ে লেখা কিন্তু সহজ কম্ম নয়। শুধুমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে লিখলে তা হয়তো লেখা হতে পারে, কিন্তু সাহিত্য কিছুতেই নয়। আর যদিও-বা তা সাহিত্য হয়, সেটা হবে একেবারে প্রাণহীন-সাহিত্য। অনেকটা পর্দার আড়াল থেকে সুতো নাড়িয়ে পুতুলনাচের দৃশ্যের মতো।
আলো-ঝলমলে স্টেজে নাচের পরে পুতুলগুলি কিন্তু নিষ্প্রাণ, মৃত! তাদের কথা আমাদের তেমন করে আর মনে পড়ে না। আর রঙ্গমঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার পরে ওইসব জড়-পুতুলগুলির কিছু করবারও থাকে না।
এ প্রসংগে কিছু ব্যক্তিগত-কথা বলতেই হচ্ছে। আমার বেড়ে-ওঠার কালটা– শৈশব-কৈশোর বা তা তারও পরবর্তী কিছু-সময়ে আমি যে পরিবেশ পেয়েছিলাম, এঁদের নিয়ে, এইভাবে লেখার পেছনে সেসবের হয়তো বড় ভূমিকা রয়েছে। আমার পরিবারের প্রায় সবাই সুবিধা-বঞ্চিত মানুষদের প্রতি দয়াশীল ছিলেন। ছিলেন তাঁদের প্রতি অত্যন্ত সহমর্মী। আমাদের বাড়িতে যারা কাজ করতে আসত তাঁদের প্রতি ‘এক্সট্রা কেয়ার’ নেয়া হতো। বা আমাদের বাড়িতে যারা ঝিয়ের কাজ করত, তাঁরাও আমাদের মতো একই সুযোগসুবিধা ভোগ করত। একই খাবার খেতো ও আমাদের সাথে তাঁরা বেড়াতেও যেতো। আমার দাদাজান, দিদি, আব্বা, চাচাজান, ফুপুরা সবাই তাঁদের প্রতি অত্যন্ত মানবিক আচরণ করতেন। আমিও হয়তো তাঁদের দেখেই এই ‘মায়াবীজ’ নিজের মাঝে বুনে দিয়েছিলাম। যার ফলে আমি সত্যিই তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল। মমতাময়ী। আমি যখন তাঁদের নিয়ে লিখি, তখন ঠিক তাঁদের অবস্থান থেকে, তাঁদের দৃষ্টি দিয়েই সবকিছু দেখার চেষ্টা করি। কতোটা সফল হতে পারি তা আমি জানি না। কিন্তু আমার আন্তরিক চেষ্টাটুকু অন্তত থাকে, এটা আমি হলপ করে বলতে পারি।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয়, আপনি এই যে লেখায় একেবারে গ্রামীন প্রবাদ-প্রবচন, নাম, পরিবেশ এসব ব্যবহার করেন তা কি নোট রাখেন, নাকি স্মৃতিতে কিংবা অভিজ্ঞতায় ডুব দিয়ে লিখেন?
পাপড়ি: 
না, না,না, কোনো নোটই আমি রাখিনা। কোনোদিনই কোনো নোট রাখিনি। রাখবার প্রয়োজনও হয়নি বা হয় না। তবে আজকাল কোথাও বেড়াতে গেলে জায়গার নামগুলি টুকে রাখি। জায়গার নামগুলি খুব সহজেই ভুলে যাই কিনা। একবার ভুলে গেলে আর সহজে মনে করতে পারি না। হয়তো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘ভুলোমন’ হয়ে উঠছি। তবে আরেকটা বিষয়ও ঘটে, কারো আচরণে কষ্ট পেলে বা কেউ অপমান করলে কয়েকদিন সবই কেমন উলটাপালটা লাগে। মাথার ভিতর তখন খালি ঘোরঘুট্টি-অন্ধকার! কিন্তু এমনিতে আমি ভালো থাকি। অন্যের দেয়া বিষন্নতা আক্রমণ না-করতে পারলে আমার স্মৃতিরা বেশ ঝকঝকে থাকে।
আর একটা কথা, যা কিনা অনেকেই হয়তো জানেন না– আমার গল্প বা উপন্যাসে ব্যবহৃত ছড়া বা কবিতা বা পদ্য বা লোকগান বা গান, যা-ই বলনা কেন, বেশিরভাগই কিন্তু আমারই রচনা। আমার লিখিত বহুপদ জুড়ে দেয়া আছে আমার বিভিন্ন লেখাপত্রে।
জীবনের পথে চলতেফিরতে যা-দেখি সেসবই স্মৃতি থেকে তুলে আনার চেষ্টা করি। আদতে আমি যাঁদের ভালোবাসি, তাঁদের সবকিছুই যত্ন করে মনে রাখি। মনে রাখার চেষ্টা করি। এটাকে অভিজ্ঞতাও বলা যেতে পারে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আপনার গল্প-উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ অত্যন্ত চমৎকার। এটি কি আপনার বেড়ে উঠার পরিবেশের ভাষা?
পাপড়ি: 
না, এসব আমার বেড়ে-ওঠার পরিবেশের ভাষা নয়। আর আমি নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের ভাষা নিয়েও কাজ করি নাই। যখন যা লিখেছি, সেই অঞ্চলের ভাষা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। যেমন নারায়ণগঞ্জের মুগরাকুলের ভাষা ব্যবহার করেছি ‘বয়ন’ উপন্যাসে। আবার ‘পালাটিয়া’ যেহেতু ছিল দিনাজপুরের লোকঐহিত্য বিষয়ক উপন্যাস, তাই ওটাতে দিনাজপুরের আঞ্চলিক ভাষাই ব্যবহার করেছি। যদিও এটা আমার জন্য অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ছিল এবং দিনাজপুর অঞ্চলের নেটিভ অনেকেরই সাহায্য নিতে হয়েছিল। তবুও উপন্যাসের চরিত্রগুলি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য আমাকে দিনাজপুরের আঞ্চলিক ভাষাই ব্যবহার করতে হয়েছে। ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ বুড়িগঙ্গার অপর তীরের জীবনাখ্যান। এই বইয়ে আমি কেরানিগঞ্জের আঞ্চলিক-ভাষা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি।
তোমরা যেহেতু বলছ, আমার আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ চমৎকার, সেই সূত্রে বলছি- এটার সঠিক কারণ আমি জানি না। আমার জন্ম হয়েছে ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। আমার বেড়ে ওঠার সময়টার বেশিরভাগ সময়ে আমি ছিলাম সিলেটে। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক দুই বছর পূর্বে ছিলাম আমাদের গ্রামের বাড়ি করটিয়ায়। এসব দিক থেকে আমাকে তোমরা শংকর-প্রজাতির মানুষ বলতে পার। অর্থাৎ আমাকে কিন্তু কোনো আঞ্চলিকতাই তেমন করে স্পর্শ করতে পারে নাই। তারপরেও কেউ যদি আমাকে কোনো আঞ্চলিকতার মাঝে আমাকে ফেলতে চায়, সেটা কিন্তু সিলেট। কারণ ওখানেই আমি আমার শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছি। তবে আর একটা কথা বলতে চাই, আমি যখনই যে অঞ্চল নিয়ে কাজ করি, সেই অঞ্চলের ভাষা বেশ ভালো করে শুনেটুনে, মোটামুটি রপ্ত করে নিয়ে লিখতে বসি। তাছাড়া অভিজ্ঞতারও কিছু ব্যাপারস্যাপার থাকে। তোমরা তো জানোই যে, অবজার্ভেশন ঠিকঠাক মতো না-হলে অভিজ্ঞতার-ঝুলিও সহজে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে না।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আপনি কিছু অসাধারণ ছোটগল্পের স্রষ্টা, যেমন- ‘লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা’ অসাধারণ থিমের এক গল্প। এই যে গল্পের শৈলী, তাকে মিথের সাথে একীভূত করা কিংবা শুরুর অসাধারণ পদ, এই শৈলী নিয়ে আপনি আগে ভাবেন নাকি লিখতে লিখতে ভাবেন?
পাপড়ি: 
এটা আসলে প্রিসাইজলি বলা মুশকিল। তবে ভাবনাচিন্তা কিন্তু আগে থেকেই শুরু হয়। শুরু হলেও লেখার সময় হুবহু একই রকমভাবে লেখা যায়, তা কিন্তু নয়। লিখতে লিখতে নতুন নতুন প্রাসঙ্গিক ভাবনা এসে যুক্ত হয়। বদলে যেতে থাকে গল্পের গতিপথ। তবে ‘শৈলী’ নিয়ে ভাবনাটা কিন্তু বহুদিন ধরেই চলে। হ্যাঁ, এটা কিন্তু আমারও পছন্দের একটা গল্প। এই ফর্মটাকে প্যারালল টেক্সট বলা যেতে পারে। কারণ গল্পে কী ঘটতে যাচ্ছে তা আগেভাগেই কাব্যের পঙক্তিতে বলা দেয়া। কবিতা বা ছন্দ জানাশোনা না-থাকলে এই ফর্মে কাজ করাটা শ্রমসাধ্য হয়ে যাবে।
আমিও খুব বেশি এই ফর্মটাতে কাজ করতে পারিনি। অত্যন্ত পরিলব্ধ কাজ বলে। সমস্ত গল্পটা কবিতার কয়েকটা চরণে বলে দেয়া এত ইজি কিন্তু নয়। আমিও এত পরিশ্রম আর কুলিয়ে উঠতে পারিনি। ফলত তিন কি চারটা গল্পে ওইরকম কাব্য জুড়ে দিয়ে লিখেছিলাম। এটা অনেকটা দৃশ্যকাব্যের মতোও বলতে পার। এভাবে গল্প লিখবার পেছনের কারণ— আমি আদতে চেয়েছি পাঠক গল্পটি পড়ার সাথে সাথে যেন গল্পের দৃশ্যাবলিও দেখতে পায়।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আরেকটা গল্পের কথা মনে পড়ছে- ‘হলদে ফুলের বিকেল’। গল্পটা নেহাৎ এক নারীর জীবন নয়, বরং সে বঙ্গদেশীয় সকল নারীর প্রতিনিধিত্ব করছে যেন, এই অন্ধত্ব আক্ষরিক অন্ধত্ব নয়, সিম্বোলিক অন্ধত্ব। সমাজ সংসারের কাছে প্রতারিত সব নারী, এই ভাবনাটি কি আপনি ভেবেছেন? নাকি কেবলই নয়নের গল্পই লিখতে চেয়েছেন?
পাপড়ি: 
না না শুধু নয়নের ভাবনাটিই ভাবলে চলবে কেন? একটা লেখার সঙ্গে কিন্তু বহু কিছু, বহু বিষয়াদি যুক্ত থাকে। গল্প অনেকটা প্রিজমের ভেতর দিয়ে আলোকের বহুবর্ণ দেখার মতোই কোনো বিষয় হয়তো বা। একটা গল্পকে সফল করে তুলতে হলে নানান মনস্তত্ত্ব জুড়ে দিতেই হয়। নইলে কিন্তু গল্পটা মনোটনাস মনে হতে পারে। বা ক্লিশে বা হরদরে লিখে যাওয়া অন্যসব গল্পের মতোই।
উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি হাসান আজিজুল হকের গল্প। বা শহীদুল জহির বা জগদীশ গুপ্তের গল্প। হাসানভাইয়ের গল্পের প্রতিটি লাইন মন দিয়ে পড়তে হয়। মনযোগ দিয়ে পড়তে হবেই। নইলে উনার গল্পের নানান ডাইমেনশন আবিস্কার করা থেকে পাঠক বঞ্চিত হবেন। হবেনই। হাসানভাইয়ের গল্পের প্রায়ই নানান স্তরের মনস্তত্ত্বের জাল বিছানো থাকে। সামান্য বেখেয়াল হলেই জালের ফাঁক দিয়ে আসল গল্প হারিয়ে যেতে পারে। বা শহীদুল জহিরের গল্পের কথাও যদি বলি। একই অবস্থা না-হলেও অন্য কোনো অবস্থাতো আছেই। যা পাঠকের সমস্ত মনঃসংযোগ দাবী করে।
‘হলদে ফুলের বিকেল’- এটাও আমার অত্যন্ত পছন্দের একটা গল্প। গল্পটির সঙ্গে কিন্তু সত্যিকারের একটা করুণ ইতিহাস যুক্ত হয়ে আছে। আমি যখন থেকে ভাবছি গল্পটি লিখব, ভাবছি লিখব- চরিত্রগুলিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অবজার্ভ করছি। আমার চোখের সম্মুখেই নয়ন ধীরে ধীরে চোখের আলো হারিয়ে ফেলছে, এবং ওই সাপটি! হ্যাঁ ওই চন্দ্রবোড়া সাপ– সর্ষেফুলের মতো নাকি অড়হর ফুলের মতো হলদেটে যার গায়ের বরন! লুকিয়ে বড় হতে থাকে বাড়ির আঙিনাতেই। এবং সত্যিই সে একদিন নয়নকে পেঁচিয়েও ধরেছিল, এখনো ভাবলে আমার শরীর ভয়ে শিউরে ওঠে– কী অমোঘ সত্য রে বাপ! এ যেন সেই হাসান আজিজুল হকের ‘আমৃত্যু আজীবন’ বা জগদীশ গুপ্তের ‘হাড়’! আমার চোখের সম্মুখেই এই গল্প ঘটে চলল। সত্যি বলছি! আমি বিমূঢ় হয়ে দেখে যেতে লাগলাম। আমি কিন্তু গল্পের শেষে কিছুই বলিনি, নয়নের কী হলো শেষাব্দি? কিন্তু আমি না বললেই বা কী? বাস্তবে ঘটল আরও ভয়ানক কিছু…
আঁখি মারা গেল! কমবয়সী মেয়েটা বলা নাই কওয়া নাই- দুম করে মারা গেল!
আঁখির মৃতদেহ দেখার পর আমি বহুদিন স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম- কেন আমি লিখতে গেলাম এই গল্প? কেন গেলাম? আহা! না লিখলে হয়তো মেয়েটা বেঁচে যেতো। বেঁচে থাকতো।
জানিনা কেন আমার অমন মনে হয়েছে বহুদিন? এবং ওই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমি গল্পও লিখতে পারছিলাম না দীর্ঘদিন! লিখিও নাই প্রায় কিছুই।
দেখো এটা তো সত্য- নারীর না মরে মুক্তি নাই!
নারীরা কোথায় ভালো আছে? কোথায় সম্মানিত অবস্থায় আছে? তোমরা তেমন একটা জায়গা দেখাতে পারবে আমায়? থাকলে দেখাও।
নারী মানে- স্যাক্রিফাইস। কর, কর, করতেই হবে তোমাকে স্যাক্রিফাইস! করলেও মুক্তি মেলে? মিলবে? তাও মেলে না মুক্তি। তা তুমি যতকিছুই কর। সামনে যতই আগাতে চাও, দেখবে তুমি সেই ঠিক আগের জায়গাটিতেই দাঁড়িয়ে আছ। নারীদের অবস্থা সিসিফাসের মতো। পাহাড়ের চূড়াতে পাথর ঠেলে নেবার পর দিনশেষে তা গড়িয়ে পাদদেশেই নেমে আসে!
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
বয়ন উপন্যাসটি পড়ছিলাম, সেখানে, পয়রন বিবির কথা যে-পর্বে এসেছে, সেখানে একটা শব্দ পেলাম- চিন। মানে চিহ্ন। কথাটি এরকম- …কিছুতেই বয়সের চিন খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এই চিন শব্দটি চমৎকার, চিহ্নের চেয়ে। কীভাবে এই শব্দটি মাথায় এল? লিখতে লিখতে চলে এসেছে না কি খুব ভেবে চিন্তে?
পাপড়ি : 
এই প্রশ্নটি করে ভালো করেছ এমদাদ। এটা আমার দাদির শব্দ। মানে আমার দাদি বলতেন চিন। আমি আমার প্রায় সব লেখাতেই আমার পারিবারিক অজস্র শব্দ জুড়ে দিয়েছি। যেমন আমার দাদি বলতেন ‘সিজিলমিছিল’ মানে গুছিয়েগাছিয়ে বা সারিবদ্ধভাবে চলা বা রাখা। আম্মা, চাচিমা, ফুপুমারা বলতেন- ‘চল’, চল মানে ট্রেন্ড। ‘আসলে’ কে বলতেন ‘আদতে’, খুব সকালকে বলতেন ‘পুট্টিসকাল’, হঠাতকে ‘হঠাশ’, দাদি বলতেন ‘ও চিঠির মুসাবিদা ভালো জানে’, এর অর্থ চিঠির কন্টেন্টটা ভালো বোঝে সে–এরকম বহু পারিবারিক শব্দ আমি আমার লেখায় ব্যবহার করেছি বা করি। এবং সেই শব্দাবলী কিন্তু অনেকের লেখাতেও আমি হরহামেসাই দেখতে পাই। আমি এসব ইচ্ছে করেই করেছি বা করি, কারণ সবই তো এই পৃথিবীর, এই প্রকৃতির- আমার নিজের কিই-বা থাকবে বা কিই-বা আছে বল?
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
এ-উপন্যাসেই, পরে আরও লিখেছেন- ‘খেও মারতে মারতে কখন যে সে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল তাও আজ আর মনে আসে না’- এখানে খেও শব্দটিও অসামান্য।
আপনার এ-আখ্যানে মানবজীবনের গভীরতা বুঝাতে গিয়ে এই লাইনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কী মনে হয় আপনার? এই লাইনটিকে বিশেষ কিছু মনে হয়?
পাপড়ি : 
এই ‘খেও মারা’ মানে বয়ন করা। বুনে চলা। ‘খেও’ শব্দটির কিন্তু নানান ব্যবহার রয়েছে- যেমন কেউ জাল দিয়ে মাছ ধরতে গেল, মাছেদের বুরবুরি তোলা দেখে বলা হয়, ‘খেও মার, জলদি খেও মার’ অর্থাৎ জাল ফেলতে বলা। নিজের লেখা নিয়ে আমি কিই-বা বলি? আর কেনই-বা তা বলব? আমি যা-কিছুই লিখি না কেন জেনেবুঝেই তো লিখি, ভেবেচিন্তেই লিখি- এখন পাঠক কী বুঝল বা উপলব্ধি করল সেসব তো আমার জানার কথা নয়। তোমরাই ভাল বলতে পারবে এটা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠল কি উঠল না।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
ভবিষ্যতে কোন লেখাটি লেখার স্বপ্ন দেখেন।
পাপড়ি : 
স্বপ্ন তো কতকিছুরই দেখি, কিন্তু পুরণ হয় না কিছুই। লেখার বহু ইচ্ছেকেও তো সমাজ-সংসারের দায়িত্বের চাপে চিতায় তুলে দিতে হয়, হয়েছে। বা আমার অতি সংবেদনশীল মনের কারণে! অন্যদের প্রতারণা-ধুর্তামি দেখে নিজের ডিপ্রেশন কাটাতেই পারিনা। খুঁজে বেড়াই নির্ভেজাল বন্ধু। নির্ভেজাল কোনো প্রণয়। স্বার্থ, লোভ, অপমানের বাইরে কোনো অকারণ-প্রণয় খুঁজি, কিন্তু পাইনা কোথাও। সবই কেমন ক্লেদে ভরপুর! যন্ত্রণায় ঠাসা! প্রণয় নামক মুখোশের আড়ালে ভয়ানক প্রতারণা লুকিয়ে রাখে বেশিরভাগ মানুষই।
লেখা হয় নাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তেমন কিছুই। দেশভাগ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তিনটি গল্প মাত্র লিখতে পেরেছি। আরও কতকিছু লেখার যে ইচ্ছে আছে। জানিনা আয়ু কুলাবে কিনা? জানিনা সেসব লেখার আয়ূ আমি পাব কিনা?
লিখতে চাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস। আরও কিছু মুক্তিযুদ্ধের গল্প। আমার স্যারদের কাছ থেকে নাগরিক জীবন নিয়ে লেখার চ্যালেঞ্জ আছে। বরাবরই চ্যালেঞ্জ আমার ভালো লাগে। চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি। এতে করে হয় কি নিজেকে খুঁড়ে খুঁড়ে পরীক্ষা করে দেখা যায়। আমার বেশিরভাগ কাজই তো সাবঅল্টার্ন বা আন্ডারপ্রিভিলেজডদের নিয়ে। অথচ নাগরিক জীবনের ক্রাইসিস কিন্তু ওদের চাইতে বেশিই হবে, কম কিছুতেই নয়।
নাগরিক জীবন নিয়ে একটা কিছু লিখতে চাই।
অসমাপ্ত রয়ে গেছে একটা আখ্যানকাব্য- ‘পাতাবাহার অন্ধকার’ নামে। দুইটা পর্ব মাত্র লিখেছি। ছয় পর্বে শেষ করার ইচ্ছে ছিল, হয়নি। কবে লিখব জানি না।
আরেকটা কাজ অসমাপ্ত। স্মৃতগদ্য- ‘সুরমাসায়র’। ওটাও যে কবে শেষ করতে পারব জানিনা। ৩৫ পর্ব লিখে হাত গুটিয়ে বসে আছি। আর লিখতে ভালোই লাগছে না কেন যেন! ভালো লাগলে তখন হয়তো একটানে লিখে ফেলব।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
এই সময়ের লেখকদের লেখা পড়েন কিনা,পড়লে কার লেখা ভালো লাগে বা কাদেরকে আপনার কাছে সম্ভাবনাময় মনে হয়?
পাপড়ি : 
অবশ্যই পড়ি। আমি নতুনদের লেখাই বেশি পড়ি। খুঁজে খুঁজেই পড়ি। নতুনদের পড়তেই হবে। না পড়লে যে এগিয়ে যাওয়া সময়ের কাছ থেকে পিছিয়ে পড়তে হবে।
অনেকেই আছে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ভালো লিখছে অনেকেই। যারা এখন লিখছে তাদের দুই-চারজন বাদে প্রায় সকলেরই লেখার জন্য পূর্বপস্তুতি আছে। অর্থাৎ তারা আঁটঘাঁট বেঁধেই মাঠে নেমেছে। এর ব্যতিক্রমও কিছু আছে। যেমন দুই-চারজন জলো-আবেগের ওপর লিখতে শুরু করেছে। হয়তো কোনো সম্পাদকের সংগে সদ্ভাব থাকার কারণে সম্পাদক তাকে লিখতে বলেছে। কিংবা কোনো বন্ধু। কিংবা আশেপাশের বন্ধুদের দেখে হয়তো সে ভেবেছে, লেখক হওয়া? এ আর তেমন কী কঠিন কাজ? ফলত সেও লেখার মাথামুন্ডু কিছু না বুঝে, না জেনে লিখতে শুরু করেছে। তাদের লেখাও কিন্তু পড়লেই বোঝা যায়।
কয়েক মাস পূর্বে নাহিদা আশরাফী সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘জলধি’ সারা বাংলাদেশ থেকে নতুন লিখিয়েদের লেখা আহ্ববান করেছিল। আমি ওই লেখা প্রতিযোগিতার ফাইনাল রাউণ্ডের বিচারক ছিলাম। এত লেখার ভীড়ে আমি কয়েকজনের লেখা পড়ে রীতিমত চমকে উঠেছি! আমি একটা কাজ শুরু থেকেই করি, কারো লেখা ভালো লাগলে সেই লেখাটির কথা অন্যদের বলি। ও সুযোগ থাকলে তার সাথে যোগাযোগ করে বলি— তোমার লেখাটি ভালো হয়েছে। এক্ষেত্রেও আমি এই কাজটি করেছি। সেরা লেখকদের খুঁজে তাদের সাথে কথা বলেছি। এবং তাদের আমার ভালো লাগার কথা জানিয়েছি।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
লিখতে আসা নতুনদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?
পাপড়ি: 
একটাই কথা, carpe diem অর্থাৎ অদ্যকার দিবসের জন্য বেঁচে থাকো। আগামীকাল মানেই বাকি। গোলক ধাঁধার চক্কর! আগামীকাল বলে কিছুই নাই! দার্শনিক চার্বাকও তেমনই বলে গিয়েছেন!
ভারী ভারী কোনো যুক্তি-তর্ক জুড়ে দিয়ে বিশাল ওজনদার কোনো উপদেশ আমি কাউকেই দিতে চাই না। আমার আদতে উপদেশ দিতে ভালোও লাগে। মোদ্দাকথা মাতুব্বুরি আমার অপছন্দ।
যা বলতে চাই, সেসব বন্ধুর মতো পাশে বসে বলতে চাই।
ভালো লিখতে হলে পড়তে হবে, জানতে হবে। ভালো লেখক হতে চাইলে দলবাজি বা তৈলবাজি না করলেও চলবে। আর কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়া করা যাবে না। লিয়াজো মেইনটেইন করে কেউ কোনোদিন ভালো লেখক হতে পারে নাই। এভাবে হয়তো সাময়িক খ্যাতি বা বাহ্ববা জোটে, কিন্তু দিন কয়েক পর পতনও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ভালো লেখার জন্য নিজের প্রস্তুতি, নিজের পরিশ্রমই মূলকথা।
আর যত বেশি করে পারা যায় চাটুকারদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। উদ্দেশ্য প্রবণ চাটুকাররা জ্ঞানবাগিচার চারা গাছগুলিকে মাড়িয়ে দিতেই আসে। ফুল ফোটাতে নয়। চিরপুস্প কিন্তু আপনা আপনিই ফোটে।
অদ্য যে লিখতে শুরু করেছে, সেই নবীন লেখকটির জন্যও আমি আমার মন থেকে আশীর্বাদ জানাই। যেন সে এই দুগর্ম পথটা ধীরেসুস্থে- বুঝেশুনে পাড়ি দিতে পারে। লেখালেখির অধরা-হরিণটিকে যেন সে একদিন স্পর্শ করতে পারে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আপনি উপন্যাসের নামকরণ করেন কীভাবে?
পাপড়ি: 
যে কোনো গ্রন্থের নামকরণই কিন্তু গ্রন্থের বিষয়আশয়ের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই করা উচিত বা হওয়া উচিত। তবে নাম নিয়ে আমি বড়ই ইনডিসিশনে ভুগি। কিছুতেই কিছু মনে ধরে না। কতজনকে যে বলি, ভাই একটা ভালো নাম দাওতো। তারা দিলেও যে পছন্দ হয়, এমনও নয়। আবার অনেক সময় পছন্দ হয়েও যায়। তখন হয়তো সে নামটি রেখেও দিই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাতিল হয়ে যায় অন্যের দেয়া নাম। তখন আমার লজ্জা লাগে। এই ভেবে লজ্জিত হই, ইস! তার দেয়া নামটা রাখা গেল না! অবশ্য যাদের সাথে এই নাম নিয়ে কথাটথা বলি, তারাও মনেই রাখে না যে, একদা একটা নাম তারা আমায় দিয়েছিল। আমিও হয়তো দিব্যি ভুলে যাই।
জামদানী তাঁতিদের জীবনাচার নিয়ে লিখেছিলাম বলে নাম দিয়েছিলাম ‘বয়ন’। সেরকমভাবেই ‘পালাটিয়া’ বা ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আপনার গল্প, উপন্যাস নিয়ে কলকাতার প্রতিক্রিয়া কেমন পেয়েছেন?
পাপড়ি: 
দেখো, একই ভাষাভাষীর বলে কলকাতাকে আমি এতবেশি আলাদা করে দেখতে চাইনা। ভুগোল ভিন্ন হলেই যে তাঁদের আলাদা করে দেখতে হবে এরকম কোনো কথা নেই। যেহেতু তাঁরাও ‘বাংলা’ নিয়েই আছেন, আমরাও তো তাই-ই নিয়ে আছি।
ইতোমধ্যে আমার তিনটে বই প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে। একটা নির্বাচিত গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করছে ‘ঐহিক প্রকাশন’। ৩২ টা গল্প নিয়ে আরেকটি ‘নির্বাচিত গল্প‘ প্রকাশিত হবে অচিরেই। প্রকাশিত হবে আমার একটি গল্পগ্রন্থ ‘একটি পাতার মতো অন্ধকার’।
আমার ‘পালাটিয়া’ উপন্যাসটির ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে কলকাতার ‘অভিযান প্রকাশনী’ , ২০১৯ এ। আর ‘বয়ন ‘ উপন্যাসটির ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে ‘তবুও প্রয়াস প্রকাশনী’ ২০২০ সালে।
তাঁরা আমার লেখাপত্রকে সমাদর না-করলে এই বইগুলি নিশ্চয়ই প্রকাশিত হতো না, তাইনা?
হ্যাঁ, আমি তাঁদের কাছ থেকে বহু অনুপ্রেরণা পেয়েছি বা এখনো পাই।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
বাংলাদেশের তুলনায় তাদের আলাপ কি কিছুটা ভিন্ন?
পাপড়ি : 
হ্যাঁ এমনটি আমার বরবরই মনে হয়েছে। মনে হয়। কলকাতার বইমেলাতে আমি দেখেছি, প্রচুর লিটলম্যাগ প্রকাশিত হয় ওখানে। এবং যারা কর্মী তাদের পড়াশুনাটাও ব্যাপক। ওখানকার বেশিরভাগ লেখক-পাঠকই অত্যন্ত নলেজিবল।
আর একটা বিষয় তাদের মতামত প্রকাশে তারা খুব সাহসী ও সৎ। বাংলাদেশে যেমন ধরি মাছ না ছুঁই পানি টাইপ একটা ব্যাপার আছে। ভালোকে সহসা কেউ ভালো বলতে চায় না, কলকাতাতে আমি এই হিপোক্রিসি দেখিনি। অন্তত আমার ক্ষেত্রে। তারা অকপটে আমার লেখাপত্র নিয়ে কথা বলেছে।
২০২০ এ যখন ‘তবুও প্রয়াস’ থেকে ‘বয়নের’ ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হলো, তখন এই বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে। কতজন যে আমার এই উপন্যাসটি নিয়ে ফিডব্যাক দিয়েছে- যাদের নামও আমি শুনিনি কোনোদিন। কিন্তু তারা বইটি মন দিয়ে পড়ে তাদের মতামত জানিয়েছে। অথচ বাংলাদেশে দলকানা ছাড়া অন্য কেউ একটি কথাও বলবে না কোনো বই নিয়ে কোনোদিন। সব গোষ্ঠীপ্রীতিতে মশগুল। অবশ্য এটা আমি ঢালাওভাবে বলছি না, ব্যতিক্রম তো আছেই ও থাকবে সবখানেই।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
লেখালেখির দীর্ঘ সময়জুড়ে কখনও কি এমন কিছু মনে হয়েছে যে আপনি বিশেষ একজন লেখক দ্বারা প্রভাবিত?
পাপড়ি: 
আমি ঠিক জানিনা আমি কারো দ্বারা প্রভাবিত কিনা বা আমার লেখায় অন্য কারো প্রভাব পড়ে কিনা?
তবে আমি প্রভাবিত হলে একজন লেখক দ্বারা প্রভাবিত হবো না, হলে দুই/তিনজন লেখক দ্বারা হবো বা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
আর কারো প্রভাব থাকলে এই বিশ/ ত্রিশ বছরে তা নিয়ে কেউ না কেউ কিছু হলেও তো বলতো আমায়। আমি কিন্তু সেরকম কিছু কখনোই শুনিনি।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
যদি এক সময় এমন হয় যে কেউ আর বাংলাভাষায় কিছু পড়ছে না, তখন কি আপনি কিছুটা বেদনাহত হবেন? বাংলায় লিখেছেন বলে কষ্ট পাবেন?
পাপড়ি : 
বাংলাভাষায় কেউ কিছু পড়ছে না, এমন দৃশ্য আমি কিন্তু মনের ভুলেও ভাবতে পারি না। যদি এরকম হয়, আমি তাহলে অবশ্যই বেদনাহত হব। না, আমি বাংলায় লিখছি বলে কোনোদিনই কষ্ট পাব না। কারণ এটা আমার মাতৃভাষা। আমি আমার মতো করেই লিখে যেতে চাই, কারো পড়বার প্রয়োজন পড়লে সে অনুবাদ করে নিয়ে পড়ুক না কেন? কিংবা কেউ না পড়লেও ক্ষতি কিছুই নাই। আমি চাই আমার লেখাপত্র শুধুমাত্র ৫জন সেইরকম পাঠকই পড়ুক।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আপনার মতে লেখালেখির সবচে কঠিন দিক কোনটি?
পাপড়ি : 
লেখালেখির সমস্ত প্রক্রিয়াটাই কঠিন। ভয়ানক শ্রমসাধ্য। এখানে সহজ কিছু আছে বলে দেখিনি। বা সহজভাবে আমি কোনো বৈতরিণী পার হতেও পারিনি।
লেখালেখি সহজ- কে বা কারা মনে করেন, জানতে ইচ্ছে করে খুব।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
এমন কোনও একটি লেখা কি পড়েছেন যা পড়ে মনে হয়েছে লেখাটি যদি আপনি লিখতে পারতেন?
পাপড়ি : 
হ্যাঁ, এরকম বহু লেখা পড়েই মনে হয়েছে বা মনে হয়। মানিক, জীবনানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথের গল্প পড়ে এরকম মনে হয়। জগদীশ গুপ্ত ও সৌমেন চন্দের গল্প।
হাসান আজিজুল হকের প্রতিটা গল্প পড়েই আমার মনে হয়েছে, আহা! এরকম একটা গল্পও যদি আমি লিখতে পারতাম, ইহজীবনে? বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প। বা শহীদুল জহিরের গল্প। কিংবা মার্কেজের কোনো গল্প যখন আমি পড়ি। বা পীযূষ ভট্টাচার্যের আখ্যানগুলি। ইদানীং হারুকি মুরাকামি’র গল্পগুলি পড়ে তেমন বোধ হয়।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
কোন উপন্যাসগুলো আপনি বারবার পড়েন? বারবার পড়েছেন?
পাপড়ি : 
আমি সব বই-ই আগে একবারই পড়তাম এবং টু দ্য পয়েন্টে আমার সেসব স্মরণেও থাকত। কিশোরীবেলায় বহুবার পড়েছি শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’। অবধূতের ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’।
আর এখন এক বই বহুবার পড়ার টাইম একেবারেই মেলে না। কিন্তু তবুও আমি যে সব উপন্যাস দুই থেকে তিনবার পড়েছি সেসব হলো— রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’, হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’, পাওলো কোয়েলহোর ‘দ্য আলকেমিস্ট’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’, নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘হার্বার্ট’, বরিস পাস্তরনাকের ‘ডা: জিভাগো’, পীযূস ভট্টাচার্যের ‘তালপাতার ঠাকুমা’, আনসারউদ্দিনের ‘গো রাখালের কথকতা’ অন্যতম। আর বহুবার করে পড়েছি আমিয়ভূষণ, বঙ্কিম ও মানিকের একাধিক উপন্যাস। সংসারের হাড়িকাঠে ওতপ্রোতভাবে জড়ানোর পূর্বে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, মানিক ও অমিয়ভূষণ বেশ আয়েশ করে পড়া যেতো। কিন্তু সময়াভাবে এখন তো একই উপন্যাস বাবংবার পাঠ করা একটা খিটকেলে ব্যাপার মনে হয় আমার কাছে। তবে আমি এখনও কবিতার বই বহুবার পড়ি। কবিতা পাঠে আমার কখনই ক্লান্তি আসে না।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
পাপড়ি রহমান আপনি লেখক হলেন কেন?
পাপড়ি : 
অন্য কোনো কাজের জন্য আমি একেবারেই অনুপযুক্ত বলে। কিংবা বলতে পারো জীবে দয়া করে যে জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর- এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে। অর্থাৎ উই ও মুষিকের পেট ভরানোর জন্য। যেমন ধরো আমার লেখা বইপত্র একদিন উইপোকা ও মুষিকের খাদ্য-ভাণ্ডারে পরিণত হলো, এতে করে আমি কিছু জীবে দয়া করতে পারলাম। মানে ওই উই ও মুষিকদের পেট ভরানোর কাজ করে তাদের শরীরে কিছু পুষ্টির যোগান তো দেয়া গেল, নাকি?
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
এই যে আজ আমরা আপনার সাক্ষাৎকার নিচ্ছি, প্রশ্নের প্রশ্নের সূত্রে কথাবার্তা এগোচ্ছেও; ব্যাপারটি আপনার কেমন লাগছে?
পাপড়ি : 
ভালোই লাগছে, নিজের সম্পর্কে কথাবার্তা অন্যদের জানানো গেলে বেশ একটা আমোদ অনুভূত হয়, তাইনা? কমবেশি নার্সিসিজম সবার মাঝে ওঁত পেতে থাকে। ফলত আপনা বাদ্যি সবাই বাজাতে চায় এবং তা বেশ জোরেসোরে। সামনাসামনি বসে এই কথাগুলোই বলা গেলে হয়তো আড্ডাটা আরও বেশি জমে উঠতো। আমি সামনাসামনি সাক্ষাৎকার দিতে অধিক আগ্রহী। কারণ তখন কথার পৃষ্ঠে বহু কথা এসে যায়। বহু কথার গতিপথ চেঞ্জ হয়। বহু বিষয় যুক্ত হয়, ফের বর্জিতও হয়।
তবুও মন্দ লাগছে না। এর কারণ তোমাদের পরিশ্রমলব্ধ প্রশ্ন ও নিখাদ আন্তরিকতা।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
সৈয়দ হকের সঙ্গে আপনার কি প্রায়ই দেখা হতো? কথা হতো? তার সঙ্গে লেখালেখির ভাবনা বিনিময় করতেন?
পাপড়ি : 
হ্যাঁ, হকভাইয়ের সাথে আমার প্রায়ই দেখা হতো । অবশ্য এই ঘনিষ্ঠতার যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল আনোয়ারা আপার কল্যাণে। আনোয়ারা আপা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। সেই সুবাধে আমি বহুবার হকভাইয়ের নিকটবর্তী হতে পেরেছিলাম। হকভাই ও আনোয়ারা আপা মিলে একটা সাহিত্য-আড্ডা গড়ে তুলেছিলেন ‘অশ্রুপাত’ নামে। সেইসব আড্ডাতেও আমি গিয়েছি কয়েকবার। ‘অশ্রুপাত’ তো সাহিত্য ভিত্তিকই ছিল।
হ্যাঁ, হকভাইয়ের সাথে লেখালেখি নিয়েও কথা হতো। বহু সময় বহু বিষয় নিয়ে উনার সাথে আমার কথা হয়েছে। হকভাইয়ের অনেক বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্যও আমার হয়েছে।
আমি আমার স্মৃতিগদ্য ‘একলা পথের সাথিতে’ এ নিয়ে সংক্ষিপ্ত একটা পর্ব লিখেছি। বইটা ২০২২ এর বইমেলায় প্রকাশিত হবে।
হকভাইয়ের সঙ্গে আমার বহু মজার স্মৃতি আছে, যার কিছু কিছু আমি আমার এই বইতে আমি লিপিবদ্ধ করেছি।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
তাঁর সঙ্গে আপনার কী ভাবনা বিনিময় হতো? গল্পের বা আখ্যানের পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পর্কিত কোনও বিনিময়, বা ধরুন বিশ্বসাহিত্যের সাম্প্রতিক প্রবণতা ইত্যাদি নিয়ে আলাপ হতো না?
পাপড়ি : 
হকভাইকে আমি সমসময়ই পেয়েছি লোকজনের মাঝে। সেটা তাঁর বাসায় হোক, কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে হোক। এতসব ক্রাউডের মাঝে সাহিত্য আলাপ তোলা বেশ মুশকিল। তবে আনোয়ারা আপার ‘অশ্রুপাতের’ যে কয়টি সভায় আমি গিয়েছি, সাহিত্য নিয়েই আলাপসালাপ হয়েছে ওখানে। আর সাহিত্যের বাইরে ব্যক্তিগত কথাবার্তা লেখকরা পাবলিক প্লেসে বলে নাকি?
হকভাইয়ের বাসায় যখন গিয়েছি, ফাঁকফোকর পেলেই আমি সাহিত্য নিয়েই আলাপ পেরেছি। এবং বলাই বাহুল্য হকভাই তাতে সায় দিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
গল্প কিংবা উপন্যাস, কীভাবে লিখতে শুরু করেন, শুরুটা খুব ভেবে নিয়ে, গল্পের শেষ দেখে না কি অপেক্ষা করেন প্রথম লাইনটির জন্য?
পাপড়ি : 
হ্যাঁ, ভাবনা-চিন্তা তো থাকেই। থাকতেই হয়। না না এটা আবার কিরকম কথা? গল্প ফুরিয়ে যাবার পরে প্রথম লাইনে ফিরে যাওয়া, আমার জন্য ইম্পসিবল। আমি অপেক্ষা করি প্রথম লাইনটির জন্য। এই প্রথম লাইনটি আমার মনপছন্দ যতক্ষণ না-হয়, ততক্ষণ আমি ড্রাফট করতেই থাকি। কাটাকুটি যাকে বলে। যখন আমার কাঙ্ক্ষিত লাইনটা পেয়ে যাই তখন গল্প এগোয় তরতর করে, যেন পালে-হাওয়া-লাগা-নৌকো। সম্মুখে আর কোনো বাধা-পারাবার নাই।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
গল্পের বীজ কোথায় পান?

পাপড়ি : 
এটা আদতে হলপ করে বলা বেশ মুশকিল। কোন বীজ যে কোথা থেকে উড়ে আসে, আর মহীরুহ হয়ে যায় সেকথা আগেভাগেই কী করে জানা যায় বা বলা যায়? তবে বেশির ভাগ বীজই পথ চলতে চলতে কুড়িয়ে নেয়া। আমি খুব গল্পকথার মানুষ, আড্ডা দিতে পছন্দ করি, তখন হয়তো একটা বীজ উড়ে আসে আমার মনোজগতে। আর পরবর্তীতে সেটা আমার গল্পগাছ হয়ে ওঠে। কখনো কখনো পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে আমার গল্পগাছকে পল্লবিত হতে দেই। তবে জীবন অভিজ্ঞতাই আমার সবচাইতে বড় নির্ভরতা। এই অভিজ্ঞতার আলোকেই আমি লিখে চলেছি গল্পের পর গল্প!
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে, কীভাবে?
পাপড়ি : 
পত্রিকায় নানান রকম সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেসব পড়তে পড়তে হঠাত মনে হতে পারে যে, এই সংবাদটা নিয়ে গল্প লিখা যায়। তবে সেসব কিন্তু বেশির ভাগই সত্য ঘটনা। সেসব সত্য ঘটনা, যা মনকে স্পর্শ করে যায়। মন স্পর্শ না করলে তো সেসব নিয়ে লেখা প্রায় অসম্ভব।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
গল্পে, গল্প না থাকা কিংবা গল্পহীন গল্প- এরকম একটা ঝামেলাজনক ব্যাপার চালু হয়েছে। গল্পহীন গল্প হয় কী করে?
পাপড়ি : 
সর্বকালে সর্বদেশেই দুই/তিনজন করে অতি আঁতেল বা সাহিত্যের মাতুব্বুর কিসিমের কেউ না কেউ থাকেন। তাঁরাই নিজেদের হালে পানি পাওয়ার আশায় বা নিজেদের জাহিরির লিপ্সায় এরকম উদ্ভট কিছু কথাবার্তা বাজারে চালু করতে চান। গল্পে গল্প থাকতেই হবে বা থাকেই।
ধর, কেউ শুধু ন্যারেটিভই লিখলো, কিন্তু তাও তো তাকে লিখতে হবে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর উপর বা কিছু না কিছুকে কেন্দ্র করে। এক্ষণে যাই বা যাকে নিয়েই লিখুক না কেন, গল্প তো তারই। মানে কিছু একটার বয়ান তো থাকতেই হবে।
আমি জানি না, গল্পহীন গল্প কী করে লেখা যায়। কেউ লিখে থাকলে আমাকে পাঠাতে বলো, আমি পড়ে শিখে নেব গল্পহীন গল্প লেখার কলকব্জা।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
 গল্পের কাহিনি না (শৈলী) ক্র্যাফট, আপনার কাছে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
পাপড়ি : 
আমার কাছে দু-টোই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কাহিনি যদি হয় গল্পের কংকাল, তাহলে ক্র্যাফট কিন্তু গল্পের মেদ-মাংস। এখন কংকালের ওপর কে কীভাবে রঙ-তুলির বুলাবে তা তার একান্ত নিজস্ব বিষয়। বা মেদ-মাংসের পরিমিতি বোধটাও একজন লেখকের একেবারে নিজস্ব বিষয়ই। শুধু জলো কাহিনী দিয়ে কিন্তু গল্প এগোবে না। সেরমভাবে শুধু ক্র্যাফট দিয়েও কিন্তু একটা গল্পকে মনোগ্রাহী করে তোলা যাবেনা কিছুতেই।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: 
আপনি মুনরোর গল্পের অনুবাদ সংকলন করেছেন। তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হয়েছে। কিন্তু মুনরো হয়তো আপনার একটিও লেখা পড়েননি, তাঁর কাছে আপনার লেখা পৌঁছে দেবার কোনও ব্যবস্থা আছে?
পাপড়ি : 
হ্যাঁ, আমি যৌথভাবে মানরোর গল্প সংকলনটি সম্পাদনা করেছি, এটা সত্য। আচ্ছা, এটা কেন জিজ্ঞেস করছ যে মানরোকেও আমার লেখা পড়তে হবে? পড়া বা লেখা তো টেইক এন্ড গিভের কারবার নয়। একজন পাঠক কী পড়বে বা পড়বে না সেটা কিন্তু তার রুচির ওপর নির্ভর করে।
আমার লেখা মানরোর কাছে পৌছে দেবার উপায় তো আছেই। কারণ আমার একটা গল্পগ্রন্থ ইংরেজী অনুবাদে ছেপেছে রাইটার্স ডট ইঙ্ক। বইটা মানরোর কাছে পাঠিয়ে দিলেই তো হয়।
এ প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা উল্লেখ করছি-
মানরোর অনুবাদ গ্রন্থটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন উম্মে কুলসুম রত্না ওই গ্রন্থের একজন অনুবাদক ও আমার বন্ধু- সে ক্যানাডায় স্থায়ীভাবে চলে গেল। এবং রত্না কিন্তু টরেন্টো ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করছে এখন। যাবার প্রাক্কালে সে কিন্তু বলেছিল, পাপড়ি আপা, এই বইটা মানরোকে উপহার দিয়ে তাঁর সাথে দেখা করে আসব। শুনে আমার অত্যন্ত আনন্দ হয়েছিল।
মানরোর কাছে না পৌছালেও বইটার কথা কিন্তু ক্যানাডার টরেন্টোবাসী জেনেছে। ওখানে ‘পাঠশালা’ নামক এক শিল্প-সাহিত্যের প্ল্যাটফরম থেকে ফারহানা আজিম শিউলি ‘মানরোর নির্বাচিত গল্প’টি নিয়ে একক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এবং ওই অনুষ্ঠানে রত্না মানরোর গল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিল।
আমাদের সম্পাদিত বইটি নিয়ে এরকম একটা অনুষ্ঠান খোদ টরেন্টো শহরেই অনুষ্ঠিত হলো, এটাও কিন্তু বইটা প্রকাশের আগে পর্যন্ত ভাবতে পারি নাই।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : 
সালমান রুশদী, মুরাকামি কিংবা ওলগা তুকারচুক আপনার কোনও লেখা পড়লেন না- এ নিয়ে আপনার কোনও আক্ষেপ আছে?
পাপড়ি: 
পড়লেন না মানে কী? এতদিনেও পড়েননি মানে এই নয় যে, আগামীতেও কোনোদিনই পড়বেন না তেমন তো নয়। আমার গল্পগুলি তো বেশ অনুবাদ হচ্ছে। এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পত্রিকায়-ওয়েব পোর্টালে সেসব প্রকাশিতও হচ্ছে। সম্প্রতি আমাদের তুখোড় অনুবাদক শবনম নাদিয়ার অনুবাদে আমার একটা গল্প ‘এন্টনিম’ নামে এক আন্তর্জাতিক মানের ওয়েবে প্রকাশিত হলো। তাছাড়া আমি বরাবরই আশাবাদী মানুষ, ফলত তাঁরা কোনো না কোনো একদিন আমার লেখা পড়বেন।
তবে আক্ষেপ যা আছে, তা হলো আমার উপন্যাসগুলির অনুবাদ হওয়া দরকার। এবং তা দ্রুতই হওয়া দরকার। আর অনুবাদ হয়ে সেরকম কোনো মানসম্মত প্রকাশনা থেকে বইটি প্রকাশিত হলে তাঁরা কিন্তু আমার লেখা পড়বেনই। কারণ আমার কাজ তো আমার দেশের ঐতিহ্য নিয়ে, আমার দেশের মানুষদের নিয়ে। আমার দেশের মাটি নিয়ে। তুমিই বল, বাংলাদেশকে জানতে হলে এসব কি তাঁদেরও পড়া উচিত নয়?
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী :
আপনাকে ধন্যবাদ।
পাপড়ি:
আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।   
                                                

One thought on “লেখালেখি ও পাঠের শৈলী নিয়ে কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমানের সঙ্গে আলাপ

  • January 9, 2022 at 7:18 pm
    Permalink

    পাপড়ি রহমান নিঃসন্দেহে সমসাময়িক বাংলা ভাষার একজন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক। সাক্ষাৎকারটি ভালো লেগেছে। কয়েকমাস আগে তাঁর লেখা "নদীধারা আবাসিক এলাকা" উপন্যাসের উপর একটা আলোচনা লিখেছিলাম, বিডিনিউজ২৪.কম-এর আর্টস পাতায় তা ছাপা হয়েছিল। এছাড়া "বয়ন" উপন্যাসের উপরও একটা আলোচনা লিখেছি, যা প্রকাশ্যের অপেক্ষায় আছে। তাঁর লেখায় বাঙালি নারী চরিত্রগুলো যেভাবে উপস্থাপিত হতে দেখি, সেটি অনন্য। ইউরোপ-প্রভাবিত নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পাপড়ি রহমানের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট, বাঙালির আদি জিনতাত্ত্বিক যে বৈশিষ্ট, তার সচেতন উপস্থিতি তাঁর লেখা নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এই সাক্ষাৎকারে স্বীকার না করলে কী হবে, পাপড়ি রহমানের লেখায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রভাব আছে, সেটি সচেতন যে কারও নজরে পড়তে বাধ্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *