দেবদ্যুতি রায়ের গল্প: কাঁটাতার

ঘরের দাওয়ায় বসে অনবরত বিড়বিড় করে চলেছেন অসিতবরণ রায়। কী বলছেন তা অবশ্য বোঝা যায় না। রায়বাড়ির সবচেয়ে দাপুটে এই মানুষটা এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে গেছেন।
মাথার পাতলা চুলগুলো ধবধবে সাদা হয়ে গেছে, চোখে চশমার কাচের পুরুত্ব বেড়েছে, শরীরের চামড়া ভেদ করে কালচে শিরার রেখা তাদের অস্তিত্ব জানিয়ে দিচ্ছে তুমুলভাবে। দাঁতগুলো এতদিন ঠিকঠাক থাকলেও আজকাল সেগুলোও আর ঠিক থাকতে চাইছে না।

এই বয়সে এসে অসিতবরণের গলার স্বরটাই কেবল তেমন ভেঙ্গে পড়েনি। এখনও হাঁক দিয়ে কথা বললে তার কথা পৌঁছে যায় বারবাড়ি পর্যন্ত। কিন্তু তার আজকাল হাঁক দিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, বদলে তিনি অনবরত বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গে কথা বলে চলেন। তার সঙ্গে কথা বলতেও তেমন আগ্রহ দেখা যায় না কারও মধ্যে, বলা বাহুল্য সে আগ্রহ তিনি নিজের মধ্যেও অনুভব করেন না অনেকদিন। অবশ্য মাঝেমধ্যে এলাকার মানুষজন নানান সমস্যা নিয়ে আসে। এক টার্ম আগেই নিজের ইউপি চেয়াম্যানের দায়িত্ব শেষ করলেও অনেকের কাছে এখনও তিনি শেষ ভরসার নাম। সময়ে অসময়ে সেই মানুষগুলোর সঙ্গেই তার যা একটু কথাবার্তা হয়।

তবে আর একজন আসে তার কাছে, অপ্রয়োজনের কথা বলতে- সে কলি। তার বড় ছেলের ছোট মেয়েটা। দশ বছরের এই মেয়ের কৌতূহলের কমতি নেই কোনোকিছুতে। রূপকথার বই, পাগলা দাশুর সঙ্গে সঙ্গে বাপের ঢাউস সাইজের বইগুলো নিয়ে সে পড়ে থাকে দিন রাত। তেমনই আসে এই বুড়ো দাদুর কাছে রাজ্যের গল্প করতে। আজ অসিতবরণকে বিড়বিড় করতে দেখে কলি একটু তফাতে ছিল এতক্ষণ। তারপর ঠিকই চলে এল এবারে।

– ও দাদু। তুমি সব সময় কী কথা বলো এতসব বলো তো!

এ বাড়ির এই দস্তুর। অসিতবরণের সঙ্গে সবাই যতটা সম্ভব আঞ্চলিক শব্দ বাদ দিয়ে কথা বলে। বোধহয় তিনি নিজে ‘শুদ্ধ’ ভাষায় কথা বলেন সেকারণে। কলি ছোট মানুষ হলেও সে কেতা শিখে নিয়েছে। তবে এই নিয়ম তিনি করে দিয়েছেন বলে মনে পড়ে না অসিতবরণের।

নাতনির প্রশ্নে তিনি হাসেন। এই প্রশ্ন অন্য কেউ করার সাহসই পেত না তাকে। ভাগ্যিস কলিটা এখনও বেজায় ছোট, সেজন্যই তিনি মাঝেমধ্যে এমন ছেলেমানুষী প্রশ্ন শুনতে পান। জাঁদরেল এই মানুষটারও হঠাৎ কখনও যে কারও সাথে দু’দণ্ড বসে আড্ডা মারতে ইচ্ছে করে- সেটা বোধহয় আর কারও মাথাতেই আসে না। কলি অন্য সবার মতো নয় বলেই তার প্রতি সেজন্যই এক অন্যরকম পক্ষপাত আছে তার।

– কী বলি রে?

অসিতবরণের পাল্টা প্রশ্নে কলি ভ্রু কুঁচকায়। তারপর ঠোঁট উল্টিয়ে জবাব দেয়-

– আমি কী করে জানবো বলো তো। তুমি কী কী বলো সে তো তুমি জানো।

– দিদিভাই, কাছে এসে বোস তো। তুই সকাল থেকে একবারও আসিসনি যে!

– আমার ক্লাস ছিল দাদু। এখন তুমি বলো না কী বলছিলে একা একা। বলো না দাদু।

অসিতবরণ আসলে ভুলে গেছেন তিনি বিড়বিড় করে কী বলছিলেন এতক্ষণ। সব সময়ই তো নিজের সঙ্গে কত কথা বলে চলেছেন। সেসব কি আর মনে থাকে? তবু মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন একবার। কিন্ত কিছুতেই মনে পড়ে না তার।

– আচ্ছা দাদু, শোনো না। বাবা কাল একটা মজার গল্প করছিল।

বোধহয় দাদুকে মনে করার দায় থেকে বাঁচাতেই প্রসঙ্গ পাল্টায় কলি। অসিতবরণও হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন এবার।

– হ্যাঁ হ্যাঁ বল তো শুনি কী বলল।

– তুমি নাকি একবার বড়পিসিকে খুব মার দিয়েছিলে আর বড়পিসি তখন প্যান্টে হিসি করে দিয়েছিল-

বলেই হি হি হি হি করে হাসতে থাকে কলি। যেন সত্যি সত্যি ভীষণ মজার ব্যাপার সেটা!

– যাহ্! শচীন বলেছে? যত্তসব পঁচা কথা তোর!

বলে নিজেও অনেকদিন বাদে গলা খুলে হাসেন অসিতবরণ। হাসেন বটে কিন্তু হঠাৎই তার মনে পড়ে ঘটনাটা।

সেবার ছয় বছরের অমৃতার খুব জ্বর। অসিতবরণ স্কুল থেকে ফিরে দেখেন তিনদিনের জ্বরে ভোগা মেয়েটা খুব বায়না করছে মমতার সাথে। হাতের কাজ ফেলে রেখে মমতা ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু অমৃতা কিছুতেই শুনবে না। শেষপর্যন্ত মার হাতে জোরে কামড় বসিয়ে দিয়েছিল, সে কামড়ে মমতার হাত কেটেটেটে একাকার অবস্থা! রাগে অন্ধ হয়ে জ্বরে ভোগা বাচ্চাটাকে বেদম মার দিয়েছিলেন তিনি। পাড়া কাঁপানো চিৎকারের সাথে সাথে কাপড়চোপড় ভিজিয়ে ফেলেছিল অমৃতা। সে রাতে মমতা একটাও কথা বলেনি তার সাথে, মেয়েকে বুকে নিয়ে শুয়ে ছিল চুপচাপ।

– আচ্ছা দাদু, বড় পিসি আসে না কেন? পিসির কি তোমাদের দেখতে ইচ্ছে করে না? আচ্ছা তোমরাই বা কেউ যাও না কেন ভারতে? বড়পিসিকে তোমাদের দেখতে ইচ্ছে করে না?

চঞ্চল কলি আবারও প্রসঙ্গ পাল্টায়। দশ বছরের চঞ্চলমতি শিশুর কাছে সেটাই স্বাভাবিক।

– এই তুই যা তো যা। এত বক বক করিস ক্যান তুই কলি?

পেছন থেকে মমতার গলার স্বরে দাদু নাতনির এই বিষণ্ণ গল্পের আসরটার সুর নষ্ট হয়ে যায় যেন। কলি আবার ঠোঁট উল্টা

– আমি আবার কী করলাম ঠাম্মা? তোমার যত কথা।
কলি একটা শিশু। সে কী করেছে তা বুঝবে না কিছুতেই। কিন্তু মমতা ঠিক জানেন অসিতবরণ এখন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকবেন। অমৃতার কথা ভাববেন থম মেরে। সেই যে মেয়েটা চৌদ্দ বছর আগে একবার এসে চলে গেল, তারপর তো আর চোখের দেখাটাও দেখতে পেলেন না তারা। সাতষট্টি সালে অমৃতার শ্বশুর যখন সলসলাবাড়ির ঐ মুসলমান ঘরটার সঙ্গে জায়গা বদলে চলে গেল- অসিতবরণ একদম বাচ্চা মানুষের মতো কেঁদে ভাসিয়েছিলেন। তারপর মেয়েটা একবারই এসেছিল দেশে। চৌদ্দ বছর আগে অমৃতা আর সঞ্জয় এসে থেকে গিয়েছিল দশ দিন। সেই দশ দিন পারতপক্ষে বাড়ি ছেড়ে যাননি কোথাও।
আজকাল অসিতবরণ মাঝেমধ্যেই অমৃতার কথা বলেন তাকে। বলেন- আর মনে হয় বেশিদিন নাই রে শচীর মা। যাওয়ার আগে অমির সাথে একবার দেখা হবে না কও তো!

অসিতবরণের একা একা কথা বলার অভ্যাসটা বাড়ছে দিনদিন। মমতা মাঝেমধ্যেই চুপ করে শোনার চেষ্টা করে দেখেছেন; নানা কথার মাঝে মানুষটা অমির সাথেও কথা বলেন। অমির সাথে এত দিন দেখা হয় না বলে আক্ষেপ করেন।

দুই
দুপুরবেলার রান্নাটা আজ কোনোমতে সেরে নিয়েছে অমৃতা। শুধু ডাল আর বেগুনভাজা দিয়ে খেতে সবার কষ্টই হবে এ বেলা সে জানে। বুবান তো কোনোমতেই মাছ বা মাংসের একটা পদ ছাড়া ভাত মুখে তুলতে পারে না। তবু ছোটছেলের মুখের দিকে তাকিয়েও আজ আর রান্না করতে মন সায় দেয় না তার।

সকালে বিশ্ব কল করেছিল, বিশ্ব মানে বিশ্বজিৎ, অমৃতাদের সাত ভাইবোনের সবচেয়ে ছোটটা। এমনিতেই মোবাইলে কথা বলার খরচার জন্য ওদেশে কথা তেমন হয় না। বিশ্ব আজকে কল করায় খুব খুশিই হয়েছিল সে। কত দিন পর ছোট ভাইটার গলা শুনল অমৃতা। কিন্তু বিশ্ব আজ দিদির সংসারের হালচাল আর শরীরের খবর নেয়ার জন্য কল দেয়নি। ফোনটা ধরতেই সে হড়বড়িয়ে বলেছিল-

– অমিদি, বাবার অবস্থা খুব খারাপ রে। তোক দেখির চায়। আইসপার পাবু নাকি একবার?

ভাইয়ের কথায় অমৃতার মাথাটা টলে গিয়েছিল যেন। কোনোরকমে উচ্চারণ করেছিল-

– বাবার কী হইছে ভাই?

– জানিসই তো বয়স। হাঁপানিও বাইড়ছে। মনে হয় না টিকবে। সুজলাদি, আরতিদি আইসছে কাইল। বাবা তোর নাম ধরি ডাকায়ছে বারেবারে।

কাঁটাতারের দূরত্ব পেরিয়ে বিশ্বর গলাটা যেন এক পৃথিবী বিষাদ বয়ে এনেছিল তখন। অমৃতার বুকটা কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ফোনটা রাখবার পর থেকেই ওর কান্না পাচ্ছে। বাবার সাথে কতদিন দেখা হয়নি! শেষবার ওরা বাড়ি গিয়েছিল সেই চৌদ্দ বছর আগে। বাড়ি বলতে ওদের বাড়িই। রামনগরের বাড়ি তো আর এখন নেই, এক্সচেঞ্জ করে আসা সে বাড়িতে বেড়াতেও যেতে চায়নি সঞ্জয়। নিজের আজন্ম পরিচিত বাড়িটায় অন্য কাউকে বসত করতে দেখতে পারবে না সে বলে দিয়েছিল। তাই পুরো সময়টাই ওরা কাটিয়েছিল চন্দনপাটের বাড়িতে। সেবার যে ক’দিন দেশে থেকে এল ওরা, বাবা বাড়ি থেকে নড়েনি। সেই বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে ওর মন মানতে চায় না কোনোভাবে।

বাবা নামের মানুষটার জন্য অমৃতার বুকের কুঠুরিতে কত কান্না জমা আছে। ছোটবেলায় ওদের জাঁদরেল বাবার কাছে মুখ ফুটে কোনোকিছু চাইত না ওরা, কথাও বলত খুব সাবধানে, মেপে মেপে। কখন কী ভুল করে বসে মা’র মতো এ চিন্তা সব সময় তাদেরও ছিল। তবু মা’র কাছে আবদার করা চিঁড়ের নাড়ু বা ফুলকাটা ফ্রক হঠাৎ কোনোদিন হাজির হয়ে যেত চোখের সামনে। বাবা নিজের শিক্ষকতা, সমাজের এই কাজ সেই কাজের ব্যস্ততায় ওদের জন্য তেমন সময় করে উঠতে পারত না।

একবারের চড়কের মেলার কথা স্পষ্ট মনে আছে অমৃতার। ওদের সাথে যাবার অন্য কোনো লোক ছিল না বলে বাবাই ওদের সবাইকে চড়কের মেলায় নিয়ে গিয়েছিল, সেই প্রথম আর শেষবার। ওকে একটা কাপড়ের টাট্টুঘোড়াও কিনে দিয়েছিল, বড়দাকে একটা কাঠের গাড়ি। ওদের সবাইকে পেট ভরে গুড়ের জিলাপি খাইয়েছিল বাবা। সে কথা মনে করে মা কতবার হাসত- মানুষটা ঠিকে তোমারগুলাক নিয়া গেল। মোক কিন্তু কোনোদিন নিয়া গেল না কোনোটে!
বাবার কথা মনে পড়তে আরও কত কথা মনে আসে হুড়মুড়িয়ে। অমৃতা বারান্দার বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশপাতাল ভাবে। চন্দনপাট বলে গ্রামটায় সেই সময়ে সবচেয়ে অবস্থাপন্ন ঘর ছিল রায়বাড়ি। আশেপাশের দশ গ্রামের মানুষ সমীহ করত রায়দের। সেই বাড়ির সবচেয়ে মান্যগণ্য মানুষটা ওর বাবা। চন্দনপাটে ওর জীবনের প্রথম সতেরটা বছর কেটেছে বাবার শাসনে, আহ্লাদে। অবশ্য শাসনটাই চোখে পড়ত বেশি, আদর আহ্লাদটা খুব বেশি দেখানো বাবার ধাঁতেই ছিল না। তারপর তো ওর বিয়ে হয়ে গেল। রংপুর শহরের একদম কাছে রামনগরের সঞ্জয় রায়কে জামাই হিসেবে পেয়ে খুশিই হয়েছিল বাবা।

রামনগরের বাড়ির তেমন কোনো স্মৃতি নেই ওর। ওর বিয়ের আগে থেকেই শ্বশুর সীতানাথবাবু চেষ্টায় ছিলেন, বিয়ের আট মাস পরেই গা থেকে নতুন বউয়ের গন্ধ মোছার আগেই ওরা চলে এল আলিপুরদুয়ারের সলসলাবাড়ি। আটচল্লিশের পর থেকেই সীতানাথবাবু যাই যাই করছিলেন ও পাড়ে, বউ আর ছেলেদের আপত্তিতে পারেননি। কিন্তু দু’বছর ধরে খুব ঝামেলা, তাদের দোমহলা বাড়িটায় দু’বার বড় হামলাও ঠেকাতে হয়েছে। এবার তাই কারও আপত্তিই ধোপে টেকেনি। সলসলাবাড়ির মাতবর পরিবারের সাথে জায়গাজমি বদল করেছিল ওরা। অমৃতারা শুনেছে রামনগরের নামও নাকি এখন বদলেছে, নামের হিন্দুয়ানিত্ব মুছে সে জায়গা হয়েছে হোসেনগঞ্জ। 

সেই যে দেশটা ছেড়ে, সবকিছু ছেড়ে চলে এল ওরা! অমৃতার বুকের ভেতরটা টনটন করে আজও ভাবলে। এদেশের মাটিতে শ্বশুর পরিবারের সাথে সে কাটিয়ে দিল একটা জীবন। আর কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে চিরদিনের মতো ফেলে এল তার বাবা মা বড়দা ছোট ভাইবোনগুলোকে, তার চন্দনপাট নামের গ্রামের শ্যামল মাটি।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে কত কথা মনে করে অমৃতার কান্না পায়। বাড়িতে এখন কেউ নেই। বুবান টুবান যে যার স্কুল আর অফিসে, দুপুরের খাবার খেতে আসবে একেবারে। রোশনী কালকেই ফিরে গেল যাদবপুরে, ক্লাস শুরু হয়েছে ওর। আর ওই মানুষটা বোধহয় বরেনদার বাড়িতে গেছে। এই ফাঁকা বাড়িটার সমস্ত নির্জনতা যেন ওকে গিলে খেতে আসে।
সংসারের গিন্নিপনা ঠিক কোনদিন যে আচানক শাশুড়ির হাত থেকে তার হাতে এসে পড়ল তা অমৃতা আজ আর মনে করতে পারে না। কেবল এটা বেশ মনে করতে পারে সেই গিন্নিপনার চক্করে পড়ে এ বাড়ির দরজার বাইরে পা রাখা হলো না আর। কেবল সেবার সঞ্জয়ের জেদেই ওদেশে ফেরা হয়েছিল। বিয়ের পর ওই ক’টা দিনই কেবল ওর জন্য নির্ভেজাল আনন্দের ছিল।

আচ্ছা, পাসপোর্টটা কোথায় রেখেছে সে? পাসপোর্টের কথা মনে পড়তে ওর মনে পড়ে সেই কবেই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সেটার, রিনিউ করানোর চিন্তাও করেনি আর। দরকারও পড়েনি কখনও। কিন্তু এবার পাসপোর্টটা দরকার ওর। জরুরি পাসপোর্ট করতে দিতে হবে। বাবাকে দেখতে যাবেই সে। টুবানের বাপের শরীরটা যদিও ভালো যাচ্ছে না তবু শ্বশুরের শেষ সময়ের কথা শুনলে কি আর যাবে না? শ্বশুরকে তো খুব শ্রদ্ধাভক্তি করে মানুষটা।

বাবার শেষ সময়ের কথাটা মনে করেই বুক কেঁপে ওর। ঝাপসা হয়ে আসা চোখ নিয়ে অমৃতা বহু পুরনো পাসপোর্টটা খুঁজতে যায়।

তিন

রায়বাড়ির সকালটা এই মুহুর্তে বড় কোলাহলময়। এ বাড়িতে আজ গোটা এলাকার মানুষ ভেঙে পড়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে খুব অসুস্থ থেকে আজ ভোরবেলা অসিতবরণ মারা গেছেন। মৃতদেহের স্নান এখনও হয়নি। অসিতবরণের বহু ছাত্র, এককালের কর্মস্থল ইউনিয়ন পরিষদের লোকজন সবাই এসেছে। সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষটার শেষকৃত্যে অংশ নিতে এসেছে পরিচিত অপরিচিত বহু মানুষ আর আত্মীয়েরাও। মেয়েরা কেউই কেবল এখনও এসে পৌঁছায়নি। কান্নাকাটির রোল থিতিয়ে এসে এখন সবাই কেমন চুপচাপ হয়ে আছে।

শচীন, অসিতবরণের বড় ছেলে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে বারান্দায়। বাবার মৃত্যুর পর সে কাঁদেনি এক ফোঁটাও। বড় বৌ ইন্দ্রাণী এত শোকের মধ্যেও তার স্বামীকে নিয়ে চিন্তায় আছে। ছোট বড় মিলিয়ে তিনবার স্ট্রোক করা শচীন একবার যদি চোখের জল ফেলতো তাহলে অনেকটাই নির্ভার হতো সে।

শোবার ঘরের চৌকাঠে মূর্তির মতো বসে থাকা মমতার মাথায় ঢুকছে না কিছু। চোখের সামনে লোকজনের এই ঢলকেও অবিশ্বাস করতে চাইছে তার মন। এই প্রবল মানুষটার সাথে তার বিয়ে হয়েছিল কোন ছোট বয়সে, তখনও ঋতুমতী হয়নি সে। সেই তখন থেকে একসাথে সারাটা জীবন পার করে এসে আজ মানুষটা তাকে একা ফেলে রেখে চলে গেল? এই ধাক্কা মমতা সামলাবে কী করে? মমতার মনে হয় তার শরীরে আর এতটুকু শক্তি অবশিষ্ট নেই।

আরতি আর সুজলা এল দশটার দিকে। মেয়েরা এসে পৌঁছানোর পর অসিতবরণের মৃতদেহ স্নানের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। মেয়েদের কান্নায় এতক্ষণ চুপচাপ থিতিয়ে থাকা মানুষগুলোর অনেকেই চোখের জল ফেলল আরকেবার। আরতি আর সুজলা আসার পর স্তব্ধ মমতার এই প্রথম মনে পড়ল মানুষটা চলে যাবার খবরটা অমৃতাকে জানানো হয়নি। অথচ এই তো কালও নানারকম প্রলাপ বকার মধ্যে মানুষটা বলেছিল-

অমি, কতদিন তোকে দেখি না রে মা। তুই জানিস না, আমি জেনেশুনে তোকে ও বাড়িতে দিছিলাম। দেশটা ভাগ হয়ে গেল, আমি তো আর গেলাম না। তোকে ও বাড়িতে পাঠাইছিলাম যেন তুই ঐ দেশটায় গিয়ে ভালো থাকতে পারিস….

অসিতবরণ মারা যাওয়ার পর এই প্রথম মমতা কথা বলেন- কায়ো একজন অমিক খবরটা দ্যাও তোমরা।

ওদিকে মাত্র শ’খানেক কিলোমিটার দূরে, কাঁটাতারের সীমারেখার অন্য পাশে অমৃতা তখন ব্যাগ গোছাচ্ছে- আগামিকাল ওদের ভিসা হয়ে যাবে আর পুরো চৌদ্দটা বছর পর সে আবার চন্দনপাট নামের গ্রামটায় ফিরবে, ওর বাবার কাছে।

Top of Form


One thought on “দেবদ্যুতি রায়ের গল্প: কাঁটাতার

  • November 19, 2019 at 6:17 am
    Permalink

    অমৃতার জন্য মনটা কেমন করে উঠলো! ভালো লিখেছো বালিকা।

    নাহার তৃণা

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *