ইরানের গল্প : নীরব হাসি

মূল: ফরিদেহ্ খেরাদমান্দ
অনুবাদ: ফজল হাসান

প্রচন্ড রাগে-ক্ষোভে মিজ সাবুরি ছবি ভর্তি খাম টেবিলের উপর রাখে। ছবির দোকানের লোকটির সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় । মিজ সাবুরির অগ্নিমূর্তি দেখে দোকানী নরম গলায় জিজ্ঞাসা করে, ‘কোন ভুল হয়েছে?’

‘এই ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন !’
বলেই মিজ সাবুরি দোকানের ভেতর পায়চারি করে । একপাশের দেয়ালে সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো ছোট একটা মেয়ের ছবি ঝুলে আছে । মেয়েটির চেহারায় না আছে হাসি-খুশি ভাব, না আছে দুঃখবোধের কোন চিহ্ন। ছবিতে মনে হয় মেয়েটি যেন চোখেমুখে উৎফুল্লতার আলো ফুটিয়ে তোলার জন্য কারোর নির্দেশের অপেক্ষায় আছে । অন্যদিকের দেয়ালে বিশাল ফ্রেমে দু’টি বড় ছবি টাঙানো । একটা ছবিতে একজন লোকের চোখেমুখে নিরব হাসির প্রভা লেগে আছে ।
দোকানের লোকটি খুব সাবধানে আস্তে করে খামের ভেতর থেকে ছবিগুলো বের করে ।
খামের ভেতর মোট ছয়টি ছবি । ছবিগুলি মিজ সাবুরির । চার-বাই-ছয় সাইজের রঙিন ছবি । একসময় দোকানী মাথা তোলে ।
‘মাফ করবেন, ছবিগুলির সমস্যা কোথায় ?’
মিজ সাবুরি পাল্টা জিজ্ঞাসা করে, ‘মিষ্টার মোখতারি কী আছেন ?’
‘না, তিনি নেই । তবে যেকোন মুহূর্তে চলে আসবেন ।’
‘আপনি কী ছবিগুলির সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন ?’
‘কী সমস্যা ?’ দোকানী জিজ্ঞাসা করে ।
‘ভাল করে দেখুন, দুঃখিত আমি আপনার নাম জানি না। গত সপ্তাহে এই দোকানে আমার ছবি তিন বার তোলা হয়েছে । কিন্তু প্রতিবারই …’
ঠিক সেই মুহূর্তে চোখে চশমা পড়া প্রশস্ত কাঁধওয়ালা একজন লোক দোকানের ভেতর প্রবেশ করে । মিজ সাবুরি কথা বন্ধ করে ঘাড় ঘুরিয়ে মিষ্টার মোখতারির দিকে তাকায় ।
মিজ সাবুরি বললো, ‘এই যে … ছবিগুলি দেখুন … এই নিয়ে তিনবার … পর পর তিনবার !’
দোকানের লোকটি ছবিগুলি মিষ্টার মোখতারির হাতে তুলে দেয় ।
মিষ্টার মোখতারি মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলি দেখে ।
‘আমি জানি না, তোমার আন্ধার ঘরের ঘটনা !’
মিষ্টার মোখতারি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল । তার কথার মাঝে মিজ সাবুরি বললো, ‘কী এমন হয়েছে যে ছবি তোলার সময়ে প্রতিবারই ফটোগ্রাফারের একই ঘটনা ঘটবে । আমাকে বলুন, দুনিয়ার কোথায় আছে যে, একই ছবি তিন বার তুলতে হয় এবং প্রতিবারই …’
মিষ্টার মোখতারি ভুরু কোঁচকায় এবং অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে দু’পাশে মাথা দোলায় ।
‘দেখুন, মিষ্টার মোখতারি, এই ছবিগুলি আমার কাছে কতটুকু মূল্যবান ।’
‘হ্যাঁ, আমার মনে আছে । আপনি বলেছিলেন এই ছবিগুলি …’
‘ম্যাগাজিনের জন্য ।’
‘বিশ্বাস করুন, আপনার মুখের আসল হাসিটুকু ফুটিয়ে তুলতে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, কিন্তু …’
মিজ সাবুরি থুতুনির নিচে স্কার্ফ শক্ত করে বাঁধে এবং ঠোঁটের ফাঁকে তপ্ত হাসির উষ্ণতা ফুটিয়ে বিড়বিড় করে বললো, ‘আমার আসল !’
মিষ্টার মোখতারি নিজের মাথার পাতলা চুলে হাত রাখেন । তার চোখেমুখে চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠে । তিনি নাকের উপর চশমা সামান্য ঠেলে বললেন, ‘আমি দুঃখিত ।’
‘ধন্যবাদ । কিন্তু আপনার দুঃখ প্রকাশে আমার সমস্যার সমাধান হবে না । দয়া করে একটা বিহীত করুন ।’
মিষ্টার মোখতারি ছবিগুলি খামের ভেতর ঢুকিয়ে রাখে। এক মুহূর্তের জন্য থেমে মিজ সাবুরি বললো, ‘আগামীকাল উইম্যান ম্যাগাজিনে ছবি পাঠানোর শেষ দিন । বুঝতে পারছেন ?’
‘হ্যাঁ …, বুঝতে পেরেছি ।’
দোকানের কর্মচারী একটা চামড়ার চেয়ারে বসেছিল । সে এক দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে দু’জনের কথা শুনছিল ।
মিষ্টার মোখতারি বললো, ‘আপনি যদি রাজি থাকেন, তাহলে আরেকবার ছবি তুলতে পারি ।’
মিজ সাবুরি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে । তারপর বললো, ‘ঠিক আছে, আর একবার । কিন্তু এবার ভালো ছবি তোলার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করুন ।’
মিষ্টার মোখতারি সম্মতি সূচক ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে বললো, ‘আমি শপথ করছি ।’
মিজ সাবুরি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ।
মিষ্টার মোখতারি বললো, ‘অনুগ্রহ করে তৈরি হোন । আপনার ছবি তুলবো ।’
বলেই তিনি পাশের কক্ষের দিকে হাত উঁচিয়ে দিক-নির্দেশ করেন ।
মিজ সাবুরি পাশের কক্ষে প্রবেশ করেন । তিনি আয়নার সামনে দাঁড়ান এবং মাথার স্কার্ফের গিঁট শক্ত করে বাঁধেন । স্কার্ফের ফাঁক গলিয়ে কয়েকটা চুল দেখা যাচ্ছিল । তিনি সেই চুলগুলো স্কার্ফের ভেতর ঢুকিয়ে দেন । তারপর ভুরু পরিপাটি করেন এবং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসিটা বার কয়েক মকশো করেন । সাজগোজ শেষ করে পাশের কক্ষ থেকে বের হয়ে আসার আগেই মিষ্টার মোখতারি তাড়া দেয়, ‘আপনি কী তৈরি ?’
নির্দিষ্ট টুলের দিকে এগিয়ে আসার সময় মিজ সাবুরি বললো, ‘হ্যাঁ ।’
‘দয়া করে টুলের উপর সোজা হয়ে বসুন । ঠিক আছে । ক্যামেরার দিকে তাকান । এবার একটু হাসুন ।’
মিজ সাবুরি সরাসরি ক্যামেরার লেন্সের দিকে হাসি মুখে তাকায় ।
‘হয়ে গেছে ।’
‘ধন্যবাদ । কখন এসে ছবিগুলি নিয়ে যাবো ?’
‘আগামিকাল বিকালে ।’
*****
পরদিন বিকালে মিষ্টার মোখতারি দোকানে ছিলেন না । কিন্তু দোকানের কর্মচারীর কাছে তিনি মিজ সাবুরির জন্য একটা চিরকুট রেখে গিয়েছেন । তরুন কর্মচারী মিজ সাবুরির হাতে চিরকুটটা তুলে দেয় ।
‘ডিয়ার মিজ সাবুরি, আমি জানি না কেমন করে ছবিগুলি সামনাসামনি আপনার হাতে তুলে দিই । তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আপনাকে চিরকুট লিখবো এবং ক্ষমা চাইবো । দয়া করে আমাকে দোষারূপ করবেন না । বিশ্বাস করুন, আমি জানি না আন্ধার ঘরে কী এমন আজব ঘটনা ঘটে । আপনার অকৃত্রিম এফ. মোখতারি ।’
মিজ সাবুরির চোখমুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায় । দোকানের কর্মচারী কাউন্টারের টেবিলের উপর ছবিসহ খাম তার দিকে ঠেলে দেয় । মিজ সাবুরির খামের ভেতর থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটা ছবি বের করে ।
‘না …এটা অসম্ভব !’
মিজ সাবুরির নতুন ছবিগুলিতে অশ্রুসিক্ত মুখের চেহারা ফুটে উঠে ।
লেখক পরিচিতি: সমকালীন ইরানি কথাসাহিত্যের অন্যতম নারী লেখক ফরিদেহ্ খেরাদমান্দ । তাঁর জন্ম তেহরানে, ১৯৫৭ সালে । তিনি নাট্য সাহিত্যের উপর পড়াশুনা করেন । ছোটবেলায় অংকন শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন ছিল । তাঁর লেখালেখির সূচনা হয় রেডিওর মাধ্যমে । তিনি একজন সফল নাট্যকার, পরিচালক এবং অভিনয় শিল্পী হিসাবে কাজ করেন । পরবর্তীতে রেডিওর কাজে ইস্তফা দিয়ে তিনি পুরোপুরি সাহিত্য চর্চ্চায় মনোনিবেশ করেন এবং বেশ কিছু নাটক এবং শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা করেন । এছাড়া তিনি কবিতা এবং ছোটগল্প রচনা করেন । ‘এ বার্ড ইক্জ্ইস্টস্’ এবং ‘দ্য নাইটলি ট্র্যাংক্যুইলিটি’ ফারসি ভাষায় প্রকাশিত তাঁর ছোটগল্প সংকলন । বর্তমানি তিনি ইস্পাহান শহরে বসবাস করেন ।
গল্পসূত্র: ‘নীরব হাসি’ গল্পটি ফরিদেহ্ খেরাদমান্দের ইংরেজিতে ‘স্মাইল’ গল্পের অনুবাদ । গল্পটি মোহাম্মদ মেহদি খোররামি এবং শৌলে ভাতানাবাদি অনূদিত এবং সম্পাদিত ‘এ ফীস্ট ইন দ্য মিরর: স্টোরিজ ফ্রম কন্টেম্পোরারী ইরানিয়ান উইম্যান’ ছোটগল্প সংকলন থেকে নেওয়া হয়েছে ।
একজন যুবতী মনের ভেতর দুঃখ জমা রেখে ছবি তোলার সময় জোর করে হাসতে চেয়েও পারেনি, তারই কাহিনী অত্যন্ত সুন্দর ভাবে প্রকাশ পেয়েছে ফরিদেহ্ খেরাদমান্দের ‘নীরব হাসি’ গল্পে ।

অনুবাদক
ফজল হাসান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *