আলী নূর’এর ধারাবাহিক স্মৃতিকথা : তুচ্ছদিনের গান

-উনিশ-
স্কুল খুললো। পুরোনো হিন্দু বন্ধুদের মধ্যে অনুকূল, অজিত এই দুই ভাই ছাড়া আর কেউ নেই। ওদের পাশের খগেনরা নেই। সবাই চলে গেছে ওপার বাংলায়। ক্রমেই পাড়ায় নতুন নতুন লোক আসতে লাগল। পি,এ সাহেব এলেন, হাফিজ সাহেবরা, তাদের বাড়ির উল্টোদিকে ময়মনসিংয়ের মুসলিম লীগ নেতা মোসায়েব আলী খান সাহেব। ওঁর বড় ছেলে, দারা ভাই খুব সপ্রতিভ যুবক। ছোট ভাই মাসুদ আমার খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল। ওদের এক বিধবা বোন ছিল, তারাবু’ । অল্প বয়সে বিধবা হয়ে বাপের বাড়িতে আছেন। তারাবু’ সেলাই, এম্ব্রয়ডারি , ক্রুশ বোনা, উল বোনার কাজে খুব পারদর্শী ছিলেন। আমাকে ছোটভাইয়ের মতো আদর করতেন। সুযোগ পেলেই আমি ছুটে যেতাম তারাবু’র কাছে। আমাকে জাম রঙের সুন্দর ডিজাইনের একটা সোয়েটার বুনে দিয়েছিনেল অতি যত্নের সঙ্গে । সবাই এটির তারিফ করত। আমি সোয়েটারটা অনেকদিন রেখেছিলাম আমার কাছে।
দারা ভাই আমাদের খেলাধুলায় উৎসাহ যোগাতে লাগলেন। তখন ভিকারুন্নেসা স্কুলের জন্য অনেক জায়গা নেওয়া হয়েছিল। বিরাট খালি জায়গা। দারা ভাই আমাদের নিয়ে হকি টিম তৈরী করলেন। দারুণ উৎসাহে নওয়াবপুরের ও.কে. স্পোর্টস থেকে কেনা হলো হকি ষ্টিক। ওকে তেল খাইয়ে ভারি মসৃণ করা হলো। ক’দিন দারুণ চললো হকি খেলার হুজুগ। এদিকে ব্যাডমিন্টন খেলার আগ্রহ কমেনি মোটেই। আমি খুব পছন্দ করতাম ব্যাডমিন্টন খেলা। দারা ভাই দারুণ খেলতেন। দারা ভাই আর আমি ডাবল খেলার জুটি ছিলাম। আমাদের জুটিকে হারানো খুব মুশকিল ছিল। আমাদের বাসার সামনের মাঠের ব্যাডমিন্টন খেলার কথা অনেকদুর ছড়িয়ে পড়ল। শান্তিনগর থেকে কুদ্দুস সাহেবের ছেলে কাদির আসতো খেলতে। নয়াপল্টন থেকে আসতো পরবর্তীকালের সন্ধানীর সম্পাদক, সন্ধানী প্রেস এবং প্রকাশনীর মালিক, গাজী শাহাবুদ্দিন।
কাদিরের ডাক নাম ছিল ঠান্ডু। ওই নামেই ওকে ডাকত সবাই। ছোটখাটো ছেলে। আমাদের চেয়ে নিচের ক্লাসে পড়তো। ভারি স্মার্ট। চমৎকার আবৃত্তি করতো। ওর সঙ্গে অল্পদিনেই অন্তরঙ্গ হয়ে গেলাম। তখন বই পড়া, লাইব্রেরি-পাঠাগার করা, এই সব হুজুগে মেতে উঠেছিলাম। কাদিরের বাবা কুদ্দুস সাহেব ছিলেন আনসারের ডাইরেক্টর। খুব উদার মনের মানুষ। তাঁর বাসাতেই লাইব্রেরি করার উৎসাহ দিলেন। ওদের বাসাটা ছিল ওস্তাদ খসরুর বাসার পশ্চিমে এখন যেটা হোয়াইট হল কমিউনিটি সেন্টার। সামনের একটা বড় কামড়া নিয়ে শুরু করলাম আমাদের ‘শান্তিনগর পাঠাগার’। নানান ম্যাগাজিন জোগাড় করতে থাকলাম অতি উৎসাহে। তোপখানার মোড়ে ছিল ব্রিটিশ ইনফরমেশন সেন্টার। একটা সুবিশাল কাঠের বাংলো। মাঝের বড় কামড়ায় এক বিরাট পাঠাগার। এই পাঠাগার থেকে যেসব ম্যাগাজিন উঠিয়ে নেয়া হতো সপ্তাহান্তে তাই আমরা চেয়ে নিয়ে আসতাম। আরও আনতাম হাটখোলার আমেরিকান ইনফরমেশন সেন্টার থেকে। বেশ চলেছিল ক’দিন আমাদের পাঠাগার।
কাদিরের ছোট বোন রুবী ভারি সুন্দর ছিল দেখতে। মেয়েদের প্রতি ঠিক আকর্ষণ বোধ করার বয়স ছিল না আমার। তবুও কেমন জানি খুব ভালো লাগতো রুবীকে। এর অনেক দিন পরের কথা। আমি করাচী চলে গেলাম। এর মধ্যে ঠান্ডুরা বাড়ি কিনে এসে গেলো আমাদের বাড়ির খুব কাছে। ইলিয়টগঞ্জের জামাই ডা. জওহরের বাংলো টিনের ঘরটার উল্টোদিকে। আমি করাচী থেকে ফিরতে মেজো ভাই বললেন, তোর বন্ধু কাদির মারা গেছে ক্যান্সারে। হাঁটু জুড়ে বিশাল সারকোমা। কিশোর বয়সের এক নিষ্ঠুর ক্যান্সার। আমি বরিশালে থাকার সময় রুবীর বিয়ের কথা হচ্ছিল সেজ ভাইয়ের সঙ্গে। আমার সঙ্গে ভাবা হয়নি বলে আমার ভীষণ অভিমান হয়েছিল।
১৯৪৮ সালে আমরা যখন ঢাকায় আসি তখন কাছাকাছি কোনো দোকান কিংবা বাজার ছিল না। কাঁচাবাজার আর মুদি সামগ্রীর জন্য যেতে হতো ঠাঁটারী বাজারে। জামা কাপড় অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য নওয়াবপুর, ইসলামপুর. সদরঘাট বিপনী কেন্দ্রে। ইসলামপুরে বিরাট সব কাপড়ের দোকান – অমৃত বস্ত্রালয়, এল. মল্লিক, ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়। মেয়েদের শাড়িকাপড় এই সব দোকান থেকেই কেনা হতো । ছেলেদের কাপড় পাশের সব দোকান থেকে গজ হিসাবে কিনে দর্জি দিয়ে বানিয়ে নিতে হতো । তখনকার দিনে কোনো কিছু রেডিমেড ছিল না। সবই দর্জি দিয়ে বানিয়ে নিতে হতো। একমাত্র এল. মল্লিকের দোকানে কিছু রেডিমেড পোশাক অর্থাৎ সার্ট ইত্যাদি পাওয়া যেত। কিন্তু অনেক দাম। আমার বরাদ্দ সার্ট, হাফ প্যান্ট। সেজ ভাইয়ের ফুল প্যান্ট কিংবা পায়জামা আর ফুল সার্ট। সব বিদেশী কটন গেবার্ডিন, পপলিন আর টুইল কাপড়ের হতো । তখন পলিয়েস্টার, নাইলন কিংবা কোনো সিনথেটিক চালু হয়নি। সব কটন কিংবা সিল্ক। ঐ সব দিয়ে এখানকার দর্জি দিয়েই বানিয়ে নিতাম আমাদের কাপড়-চোপড়। চামেলীবাগের বাড়ি থেকে হেঁটে আসতাম এই অঞ্চলে। নতুন কাপড়ের লোভে কোনো কিছুই দূর মনে হতো না। এই এলাকার একজন নামকরা দর্জি ছিলেন বশিরুদ্দীন টেইলার। তাঁর শেরওয়ানীর খুব নাম ছিল। পরবর্তীকালে নিউ মার্কেটে বশিরুদ্দীন টেইলার্সের একটা ব্রাঞ্চ খোলা হয়।
এইদিকটায় ছেলে বেলায় আরো একটা দুর্দমনীয় কাজের জন্য আসতে হতো। এখানকার বাবুপুরা ফাঁড়ির সামনেই ছিল দুটো গ্রামোফোনের দোকান। গ্রামোফোনের পিন ফুরাতেই ছুটতাম এখানে। এর পাশেই ছিল কালাচাঁদ গন্ধ বণিক আর সীতারামের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান। বড় বড় লোহার কড়াইতে থাকত বড় বড় সাইজের লালমোহন, ছানার জিলাপি, রসগোল্লা, চমচম ইত্যাদি। । আব্বা এই দুই দোকান ছাড়া মিষ্টি কিনতেন না।
সদরঘাটের মাথায় ছিল ‘রূপমহল’ সিনেমা হল। বাংলা সিনেমা চলত। তখনও ভারতীয় পুরনো এবং নতুন বাংলা ছবিই চলত । আব্বা-আম্মা দুজনেরই সিনেমা দেখার বাতিক ছিল। এই অভ্যাসটা তাঁদের চট্টগ্রাম থেকেই। আব্বা-আম্মার সঙ্গে এই হলে জহর গাঙ্গুলীর ‘বাবলা’ ছবি দেখে অনেক কেঁদেছিলাম। আমারই বয়সের এক পিতৃমাতৃহীন বালকের নিদারুণ কষ্টের করুণ কাহিনী। আরো ছবি দেখেছি সায়গল-কানন দেবীর ‘সাথী’, সায়গল-লীলা চিটনিসের ‘জীবন মরণ’। এই সব ছবির গান তখন সবার মুখে মুখে। সায়গলের গানের প্রতি আমার দুর্বলতা সেই থেকেই। তাঁর সেইসময়ের বিখ্যাত সব গান ছিল, ‘শুনি ডাকে, মোরে ডাকে’, ‘প্রেমের পূজায় এই কী লভিলি ফল’, ‘নাইবা ঘুমালে প্রিয়, রজনী এখনও বাকি’, ‘প্রেম নহে মোর মৃদু ফুলহার’ ইত্যাদি। সায়গলের কন্ঠে কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল অতুলনীয়। যেমন, ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান’, ‘আজি খেলা ভাঙার খেলা’, ‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার।’
-বিশ-
এই সময়টাতে মুকুল ফৌজ, খেলাধূলা ইত্যাদি, অর্থাৎ পড়াশোনা ছাড়া আর যা হতে পারে তাতে জড়িয়ে পড়লাম। এখন যেটা মেট্রোপলিটান পুলিশ হেড কোয়ার্টার, সেই বাড়িতে থাকতেন তৎকালীন স্পিকার আবদুল করীম সাহেব। তার মেয়ে রুবী তখন কিশোরী। করীম সাহেব দারাভাইয়ের আব্বা মোসায়েব আলী খান সাহেবের রাজনৈতিক এবং পারিবারিক বন্ধু। স্বাভাবিক কারনেই দারাভাই এ বাড়িতেই ব্যাডমিন্টন খেলার আয়োজন করতে আগ্রহী হয়ে পড়লেন। রুবীর দুই ভাই, মুকুট আর তৃপ্তি খেলতো আমাদের সঙ্গে। একমাত্র দর্শক রুবী। এই রুবীই পরবর্তীকালের আমাদের রুবীভাবী, সিকদার ভাই-এর স্ত্রী, রুপার মা। তাঁর ছোট বোন ডালি ছিলেন মোকাম্মেল ভাইয়ের স্ত্রী। ডলির সূত্রে এবং আগ্রহেই মোকাম্মেল ভাই এর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। এবং মোকাম্মেল ভাইয়ের কারণেই আমি ১৯৭৯ সালে ইউরোপে যাই ইইসি দেশ গুলোতে এক ট্রেড-ডেলিগেশনের সদস্য হিসাবে। এই ডেলিগেশনের লিডার ছিলেন আসাফ ভাই।
মোরশেদের বাবা মফিজউদ্দিন সাহেব আব্বার ছেলেবেলার বন্ধু তখন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের জেল ও রিলিফ মন্ত্রী। থাকেন মিন্টু রোডে মন্ত্রীপাড়ায়। পরের বাড়ি স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহারের। আমি প্রায়ই মোরশেদদের বাসায় যেতাম আব্বার সঙ্গে । ঐ পাড়ায় তখন প্রখ্যাত কিশোর সংগঠক জিনু ভাইরা কয়েকজন মুকুল ফৌজের প্রতিষ্ঠা করলেন। প্রত্যহ বিকালে মিন্টু রোডে স্পিকারের বাড়ির পিছনের মাঠে চলতে থাকল ড্রিল, ব্রতচারী ইত্যাদি। এখানে আসতো বাহার সাহেবের ছেলে ইকবাল বাহার চৌধুরী আর ওর বড় বোন সেলিনা বাহার চৌধুরী। গান শেখাতেন আতিকুল ইসলাম। পরবর্তীকালের বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ও শিক্ষক। রফিক ভাই এর ছোট ভাই। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হামিদা আতিক ছিলেন তাঁর স্ত্রী। মশারীতে আগুন লেগে অকাল মৃত্যু হয় তাঁর।
মোরশেদ, সেলিনা আর আমি এক ক্লাসে পড়তাম, ক্লাস নাইনে। জিনুভাই রফিক ভাইরা ঠিক করলেন মুকুল ফৌজ থেকে এক্সকার্শনে যাবো আমরা তেজগাঁও মনিপুর ফার্মে। দশ বারোজনের একটি দল ঠিক হলো। ইকবালের এক মামা রবি ছিল আমাদের বিউগল বাদক। আমরা সব সাদা শার্ট- হাফপ্যান্ট, সাদা কেডস ও মোজা পরে এক সকালে খুব আনুষ্ঠানিকভাবে রওয়ানা হলাম সুশৃঙ্খল পদযাত্রায় মনিপুর ফার্মের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে মিলিটারী ফ্লাস্কে খাবার পানি, একটা ছোট্ট মতো ক্যারিয়ারে কিছু শুকনো খাবার। আগের রাতে শিরীবু’কে অনেক জ্বালিয়ে আদায় করেছিলাম। আমাদের লিডাররা হলেন জিনু ভাই, রফিক ভাই, আতিক ভাই । দলের সামনে কাঁধে বিউগল ঝুলিয়ে রবি। একমাত্র মেয়ে সঙ্গী সেলিনা। মিন্টু রোড ধরে হাতির পুলের পাওয়ার স্টেশনে পৌঁছলাম। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাদের সব দেখানো হলো। তখন সমগ্র ঢাকার পাওয়ার সাপ্লাই হতো এখান থেকে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাম ছিল, অক্টাভিয়াস স্টিল।
ওখান থেকে আবার যাত্রা শুরু হল তেজগাঁওয়ের পথ ধরে মনিপুর ফার্মের দিকে। এলাকাটা ভারি সুন্দর ছিল তখন। পথের দুধারে বিরাট বিরাট রেইনট্রি এবং অন্যান্য প্রাচীন সব বৃক্ষরাজি। শেখানো হল এমন করে পথের দুধারে সুবিন্যস্ত গাছের সারিকে colonnade বলা হয়। বিশাল এলাকা জুড়ে ফার্ম। ট্রাকটর চলছে, চলছে অন্যান্য কৃষিযন্ত্র। আধুনিক কৃষিপদ্ধতি শিক্ষা দেবার মহা আয়োজন।মাঝখানটায় তেজগাঁ কৃষি কলেজ। এখনকার সংসদ ভবন, শেরেবাংলা নগর কমপ্লেকস সব সেই মনিপুর ফার্মের অনেকখানি গ্রাস করেই গড়া হয়েছে। সরু পাকা রাস্তা দিয়ে ঢুকতেই বেশ ক’টা লাল ইঁটের সুন্দর দোতালা দালান। একটার গায়ে নীল সিরামিকে ইংরেজীতে লেখা LABORATORY. এই বিল্ডিংটা এখনো আছে। এই ল্যাবরেটরিতে আমাদের নেওয়া হলো। আগে থেকে সব ব্যবস্থা করা ছিল। মাইক্রোস্কোপে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সব পোকামাকড় দেখানো হলো। আমি এই প্রথম যন্ত্রটি দেখলাম।
খুব উৎসাহে চলছে আমাদের এই সব লেখাপড়ার বাইরের কার্যকলাপ। সেই অনুপাতে লেখাপড়ার কাজ চলছিল না তেমন। ব্যাডমিন্টন খেলাও চলছিল মুকুল ফৌজের মাঠেই। একদিন ইকবালের মা প্রস্তাব করলেন, তোমরা আমাদের বাসায় তুলে নিয়ে এসোনা তোমাদের খেলার পাটটা। আমরা সেই মুহূর্তেই রাজি হয়ে গেলাম। মেয়ে বড় হচ্ছে তার দিকে এবং আমাদের উপরও চোখ রাখার জন্যই যে এই ব্যবস্থা তা বুঝতে পারিনি তখন। সেলিনার মা আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ছিলেন কামরুন্নেছা স্কুলের জাঁদরেল হেডমিসট্রেস। পরদিনই কোর্ট কাটা হলো। জোরেসোরে খেলা চললো। এই সময়ে একটি নাটক অভিনয়ের তাড়া বোধ করলেন সবাই। নির্বাচন করা হলো সুকুমার রায়ের ‘অবাক জলপান’। মুখ্য ভুমিকায় মঞ্জু, মুনীর চৌধুরীর ছোট ভাই। অপূর্ব অভিনয় করলো মঞ্জু, সেলিনা আর ইকবাল। আমিও একটি ছোটখাটো ভূমিকায় অভিনয় করলাম। অভিনয় শেষে খোঁপায় ফুল গোঁজা সাজ নিয়ে মঞ্চের এক পাশে এসে সেলিনা জিজ্ঞেস করলো, কেমন লাগলো আমাকে? আমি বর্তে গেলাম। একেবারে আত্মহারা দশা! আর কাউকে নয়, আমাকেই কেন জিজ্ঞেস করলো একথা। তাও অভিনয় কেমন হলো তা নয়, কেমন দেখাচ্ছিল তাই নিয়ে। এরপর থেকে কিছুদিন কেমন উদাস উদাস লাগতে লাগলো সব কিছু। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম এই প্রথম আমি ওর প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ বোধ করছি। মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করার বয়সে অজান্তেই কখন পৌঁছে গেছি!
সেলিনা খুব মেধাবী ছাত্রী ছিল। সেবার মেট্রিকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিল। ও গণিত নিয়ে পড়াশোনা করে এবং ইডেন কলেজে গণিত বিভাগের প্রধান ছিল। ওর আবৃত্তির খুব নাম ছিল। রেডিওতে খেলাঘরে অনুষ্ঠানে ও আর ইকবাল নিয়মিত অংশ নিত। এই সুবাদে আমাকেও নেওয়া হলো ওদের দলে। রেডিও অফিস তখন নাজিমউদ্দিন রোডে, এখন বোরহানউদ্দিন কলেজ যেখানে ঐ বিল্ডিং-এ। বড় ভাই তখন রেডিওতে চাকুরি করতেন। খেলাঘর অনুষ্ঠান পরিচালনায়ও ছিলেন কিছুদিন। রেডিওর এইসব অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আমার সব জড়তা কেটে গেল। আমার পরবর্তী জীবনে এর একটা সুফল ছিল ।
এই বয়সে নিজেকে জাহির করবার ঝোঁক পেয়ে বসে। আমারও তাই হলো।একদিন হাতে একটা বই নিয়ে ইকবালদের বাসায় গেলাম। আশা ছিল সেলিনার চোখে পড়বো। পড়লাম ওর মায়ের সামনে। মাস্টারের মতোই জিজ্ঞেস করলেন, তোমার হাতে ওটা কী বই? কিছুটা গর্ব নিয়েই বললাম, শরৎচন্দ্রের বামুনের মেয়ে। এরপর উনি যা বললেন তাতে আমার সব উদ্যম মুহূর্তের মধ্যে দমে গেল। বললেন, এ বই কি তোমার পড়ার উপযুক্ত ? কে দিলো তোমাকে? মাথা নিচু করে চলে এলাম। বইটা আমার পড়া ছিল না। পড়ার পর মনে হল সেদিন আমার সামনে কেন ধরণী দ্বিধা হলো না ! সম্ভবত ‘বামুনের মেয়ে’-ই শরৎচন্দ্রের একমাত্র উপন্যাস যেখানে অবৈধ দৈহিক সম্পর্কের কথা আছে, তাও এক বিধবাকে নিয়ে।
-একুশ-
সেজ ভাইয়ের নতুন বন্ধু জুটলো হারুন ভাই। হারুন ভাই ক্লাস টেন আর তাঁর ছোট ভাই মামুন ক্লাস নাইনে। এরা কলকাতা থেকে এসে সিদ্ধেশ্বরীর কোণায় ভিকারুন্নিসা স্কুল যেখানটায় তার কাছাকাছি একটা বাসা নেন। হারুন ভাইরা সিনিয়র ছাত্র। আমরা খুব সমীহ করে চলতাম। খুব সপ্রতিভ ছিলেন। দেখতেও ছিলেন খুব সুন্দর, লম্বা গড়নের। । সেজ ভাই, হারুন ভাই মানিকজোড়। দুজনকে আলাদা দেখা যেতো না কখনই। সেবার স্কুলের ফাংশানে হারুন ভাই এর ম্যাজিক শো সবাইকে মাতিয়ে দিলো । সহকারি সেজ ভাই। অনেক খেলা একেবারে প্রফেশনাল পারফেকশনে উপস্থাপন করলেন হারুন ভাই । ভারি নাম হলো। এবার এই জুটি টিকিট ছাপিয়ে ম্যাজিক শো করার প্রস্তুতি নিলেন। এর পর থেকে সেজ ভাইয়ের একেবারে ন্যাওটা হয়ে গেলাম আমি। ম্যাজিকের কিছু খেলা শিখিয়ে দিলেন। কিছু কৌশল আমি নিজেই ভেবে বের করলাম।
পরের বছর হেডমাস্টার হয়ে এলেন রশীদ সাহেব। খুব অভিজ্ঞ শিক্ষক। ভোলা সরকারি স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন এর আগে। আমাকে খুব আদর করতেন আমি পড়াশোনায় মনযোগী ছিলাম না জেনেও। তার লেখা নাটক সেবার বাৎসরিক অনুষ্ঠানে অভিনীত হয়। আমি পাগলা দরবেশের ভূমিকায় অভিনয় করে বেশ প্রশংসা পেলাম। ড. শহিদুল্লাহ ছিলেন প্রধান অতিথি । একগাদা বই উপহার দিলেন,অভিনয়ের প্রশংসা করে অটোগ্রাফসহ। দু’একটা দৈনিকে আমার অভিনয়ের প্রশংসা করে লেখা হয়েছিল। পুত্রস্নেহে আপ্লুত আব্বা যথারীতি পত্রিকা কেটে রেখেছিলেন অনেকদিন।
স্কুলে মেয়েদের ক্লাস চালু হল। হেডমিসট্রেস হয়ে এলেন তখনকার দিনের ডাকসাইটে সুন্দরী জাহানারা ইমাম, এখনকার শহীদ-জননী। এঁদের পরিবারের সঙ্গে বড় ভাইয়ের বন্ধুত্ব ছিল আজীবন। একাত্তরে এই দুই পরিবার পাশাপাশি বাড়িতে ছিলেন। এদের সন্তান শহীদ রুমী আর বড়ভাইয়ের সন্তান শামীম একই দিনে মুক্তিযুদ্ধে যায়। শামীমকে আমার গাড়িতে করে নটরডাম কলেজের বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেই। জাহানারা ইমাম তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ে বড়ভাই এবং শামীমের কথা লিখেছেন।
শিরিবুবু, জেবনবুবুকে কামরুন্নেসা স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধেশ্বরীতে ভর্তি করা হলো। শিরিবু ভালো ছাত্রী ছিলেন। ও স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছেলেদের মাঝে বক্তৃতা করে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিল। আমার খুব গর্ব হতো শিরীবুকে নিয়ে।এ স্কুলে শিরিবু’র সহপাঠী বান্ধবীদের মধ্যে ছিলেন তখনকার দুই নামকরা গায়িকা: বকুল আর রওশান আরা। এরা দুজনেই তখনকার রেডিওর প্রথম সারির নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। বকুল ছিলেন ওস্তাদ খসরুর মেয়ে। আরেক বান্ধবী ছিলেন রওনাক। ক্যাপটেন দস্তগীর পরে মেজর জেনারেল ও আজমিরীর বোন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক এঁরা সবাই আমাকে খুব আদর করতেন। আমি সব সময় বিনা ওজরে এঁদের ফাই-ফরমাস খেটে দিতাম ।
সেজ ভাইয়ের উপস্থিতি আমার সকল চেতনা জুড়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমার জীবনের সব সুন্দরের উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা এবং অভিসারে তাঁরই অবদান। সেজ ভাইয়ের ছিল প্রখর মেধা, সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি, গভীর সৌন্দর্য্যবোধ এবং শিল্পীর হৃদয় ও মন। সাহিত্যে তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ। নিজেরও লেখার হাত ছিল। স্কুল বয়সেই একটি ছোট গল্প ‘মোক্তারের খালি বাড়ি’ লিখে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তখনকার বিখ্যাত মাসিক ‘মাহে নাও’ তে প্রকাশিত হয়েছিল সেই গল্প। পরিণত বয়সে ‘শীত নামে পাহাড়ে’ উপন্যাস লিখেন চট্টগ্রামের পাহাড়ী উপজাতিদের নিয়ে; তার জীবনের এক সুন্দর রোমান্টিক অভিজ্ঞতা নিয়ে । এদের মাঝেই থাকতে ভালোবাসতেন। ওদের কথাবার্তাও শিখে নিয়েছিলেন অনেক। ওদের সহজ সরল মন ও হৃদয় তাঁকে আকৃষ্ট করতো। সেজ ভাইয়ের মধ্যে এক সংসারবৈরাগী বোহেমিয়ান ছিল। কোন বন্ধনই তাঁকে বাঁধতে পারতো না। আজ এখানে তো কাল ওখানে। পাহাড় জঙ্গল খুব ভালবাসতেন। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, চিম্বুক এই সব এলাকার উপজাতীদের সহজ সরল জীবনযাত্রা তাঁর ভাল লাগতো। গঁগার তাহিতি দ্বীপে বাসের মতো তিনিও ভাবতেন এদের মধ্যেই থেকে যাবেন। কিন্তু পরিবারের সকলের চাপে তা আর পারেননি।
সেজ ভাই ধীর প্রকৃতির আলসে মেজাজের মানুষ ছিলেন। কিন্তু যা কিছু করতেন একদম নিখুঁত করে। তার ছিল শিল্পীর চোখ, অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। যা দেখতেন তাই গেঁথে নিতেন মনে। ছেলেবেলায় মকিমপুরে থাকতে কাঁকড়ার মাটি দিয়ে নিপুণভাবে গড়ে ফেললেন এক সুন্দর আবক্ষ মূর্তি। ওটা দেখেই আব্বা স্থির করলেন ছেলেকে তিনি আর্ট শেখাবেন। তখনও আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়নি।
সেজভাই মুখে মুখে গল্প বলতে পারতেন। প্রথম প্রথম সব ডিটেকটিভ গল্প বানিয়ে বানিয়ে অনেক রাত অব্দি আমাকে শোনাতেন। গল্পের একেবারে ক্লাইমেক্সে এসে বলতেন, ‘যা,এখন শুয়ে পড়, বাকিটা কাল হবে।’ আমার তখন করুণ অবস্থা। অনেক সাধ্যসাধনা করতে থাকতাম। পরদিন আবার গল্পের সেই আগের সূত্র ধরে বুনতে থাকতেন কল্পনার জাল। আমার কাছে এক ইন্দ্রজালের মতো মনে হতো। সেজ ভাইকে ভাবতাম একজন উঁচুদরের প্রতিভা। প্রকৃতপক্ষে ছিলেনও খুব প্রতিভাবান। সব কিছুতেই তাঁর খুব বুদ্ধি খেলতো। কিন্তু স্বভাবে ছিলেন ভারি অলস। আলসেমি করে করে নিজের প্রতিভার বিকাশ করেননি সঠিকভাবে। নয়তো আর্ট কলেজ থেকে ফাইন আর্টস নিয়ে ভালো রেজাল্ট করেও পরবর্তী জীবনে এর কোনো স্বাক্ষর রাখলেন না।
আমাদের পরিবারে একমাত্র সেজভাই-ই ছিলেন সত্যিকার প্রতিভার অধিকারী। সেজভাইয়ের লেখার হাত ছিল, কল্পনার শক্তি ছিল, ছিল না শুধু পরিশ্রম করে কিছু সৃষ্টি করার একাগ্রতা। এখানে সেখানে টুকরো টুকরো লেখা ইতস্তত পড়ে থাকতো। দু’একটা জলরঙ, দু চারটা তেল রঙ অসম্পূর্ণ পড়ে থাকতো। একত্র করে আর বড় কিছু করার তাগিদ ছিল না তাঁর। একবার পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের জীবন নিয়ে অনেক বড় বড় ফটো এনলার্জ করলেন, প্রদর্শনী করবেন। করা হয়নি শেষ পর্যন্ত- আলসেমির কারণেই। স্কুল শেষ করে ১৯৫১ তে ভর্তি হলেন আর্ট স্কুলে। আর্টট-স্কুল তখন জনসন রোডে মুকুল সিনেমার পাশে। তাঁর সহপাঠীরা ছিলেন রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, মুর্তজা বশীর, জোনাবুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। এরা প্রত্যেকে পরবর্তীকালের সব বিখ্যাত শিল্পী। আর্টকলেজের জীবনেও তাঁর প্রচন্ড আলসেমি। অথচ ভালো রেজাল্ট করেই পাশ করেন ফাইন আর্টস নিয়ে । সেজ ভাই ছিলেন একজন সত্যিকারের শিল্পী। তাঁর আঁকার হাত ছিল, শিল্পবোধ ছিল। যে কয়েকটা ছবি আঁকতেন তাতে তার পরিমিতি বোধ, ড্রয়িঙের হাত, রঙের ব্যবহার দেখে তাঁকে একজন ভালো শিল্পী হিসাবে প্রশংসা করা যেত। অথচ তখনকার কলেজে কিংবা বাইরের কোন আর্ট এগজিবশনে তারঁ ছবি থাকতো না। এটা তাঁর আলসেমির কারনেই। শিক্ষকরা তাঁকে ভালবাসতেন। আবেদীন স্যারের তিনি খুব প্রিয় ছিলেন। স্যার যখন শান্তিনগরে বাড়ি কেনেন তখন ঐ বাড়িতে নিত্য যাওয়া-আসা ছিল সেজ ভাই আর কাইয়ূম ভাইয়ের। আবেদীন স্যার সেবার ইউরোপে গেলে অনেকদিন এই বাড়িতে পালা করে রাত্রে শুতে যেতেন সেজ ভাই আর কাইয়ুম ভাই। সেজ ভাই আমাকেও নিতেন কখনো কখনো।
কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গে সেজভাইয়ের ছিল ভীষণ বন্ধুত্ব। কাইয়ূম ভাই থাকতেন সিদ্ধেশ্বরীর ‘কুঞ্জ কুটির’-এ। প্রায় রোজই আসতেন সেজ ভাইয়ের খোঁজে। আর আসতেন রশীদ চৌধুরী। থাকতেন মালীবাগে ওয়াজেদুলদের পাশে ওর বোনের বাড়িতে। রশীদ ভাইয়ের আব্বা ফরিদপুরের কোনো এলাকার জমিদার ছিলেন। বারান্দায় বসে ফর্শি হুঁক্কা টানতে দেখলে মনে হতো সত্যি একজন খানদানী লোক। ওযাজেদুলের বড় ভাই আমিনুল ইসলাম ছিলেন আর্ট-স্কুলের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। তিনি ফার্স্ট হন তাঁর ক্লাস থেকে।
কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গে সেজ ভাই ‘ঈঙ্গিত’ নামের একটি দেয়াল পত্রিকা বের করলেন। এর গেট-আপ এঁকে কাইয়ুম ভাই একেবারে প্রফেশনাল আর্টিস্টের সুনাম পেয়েছিলেন। এখনকার শান্তিনগর পোষ্ট অফিসের পিছনে কোনো হিন্দু পরিবারের একটা পরিত্যক্ত বাড়ি ছিল। পরিপাটি করে সাজানো। কয়েকটি বইয়ের শেল্‌ফে বেশ কিছু বই। দেখলে মনে হবে না এটি পরিত্যক্ত। মনে হতো বাড়ির মালিক কোথাও গেছেন ক’দিনের জন্য। শেল্ফ খুঁজে বিরূপাক্ষের ‘ঝঞ্ঝাট’ এবং ‘বিরূপাক্ষের অযাচিত উপদেশ’ সেইসঙ্গে দেবসাহিত্য কুটিরের কিছু বই পেলাম। হয়ত আমার বয়সের কোন ছেলে ছিল এই বাড়িতে।তড়িঘড়ি করে বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় ওর বইয়ের সংগ্রহটা ফেলে যেতে হয় ভেবে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। ওর বইগুলো পড়ার সময় মনে হতো ও আমার সামনে কিংবা কাছাকাছি কোথাও আছে। ঘরটা সব বড়রা বেছে নিলেন একটা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করবেন ভেবে। সাদাসিধে ভাবে চালু হল ‘মুসলিম ব্রাদারহুড এসোসিয়েশন’। ক্লাব নিয়ে আমরা ছোটরাও মেতে উঠলাম। কাইয়ুম ভাইদের ‘ঈঙ্গিত’ প্রতি সপ্তাহে এই ক্লাবের দেয়ালেই বের হতো। দেখাদেখি আমিও বের করে ফেললাম ‘কচিপাতা’। কাইয়ুম ভাই গেটআপ এঁকে দিতেন। লেখালেখি করতাম আমি নিজেই। কাইয়ুম ভাইয়ের সুন্দর হাতের লেখা মকশো করে আমার হাতের লেখার উন্নতি হলো।
এই ক্লাবের ব্যানারে বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন হলো। হারুন ভাই এর পরিচালনায় নজরুল ইসলামের ‘ভার্দুন ট্রেঞ্চ – ফ্রান্স’ গল্পটির ছায়ানাটিকা খুব নাম করেছিল তখন। শিল্পী মোস্তফা মনোয়ারের বড় ভাই, মোস্তফা আজিজ গান শেখাতেন আমাদের। নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘চল চল চল উর্দ্ধ গগনে বাজে মাদল’ এই সব। আজিজ ভাইও কলকাতা আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলেন। পেন্সিল স্কেচে নিখুঁত পোট্রেট করতেন। সবাই অবাক হয়ে দেখত। আমার খুব সুন্দর দুটো পোট্রেট করেছিলেন। আজিজ ভাই মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। ক্লাব নিয়ে খুব মেতে উঠলাম আমরা। নিত্য নতুন কিছু করতে হবে। সব কিছুই করতে থাকলাম শুধু লেখাপড়া ছাড়া। অভিভাবকরা শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। সেজভাইকে খুব ভর্ৎসনা করা হলো আমাকে একরকম গোল্লায় নেবার জন্য।
সেজ ভাইদের আর্ট কলেজ উঠে এলো সেগুনবাগিচায়, যে বাড়িটায় পরে মিউজিক কলেজ চলতো। সেজ ভাইয়ের শিক্ষকরা ছিলেন আবেদীন স্যার ছাড়া, কামরুল ভাই, শফিউদ্দিন আহমেদ, শফিকুল হক, আনোয়ারুল আমীনদের মত সব বিখ্যাত শিল্পীরা। শফিউদ্দিন সাহেব উডকাট্ আর এচিং পড়াতেন। তাঁর উডকাটের বড় নাম ছিল । উডকাট ক্লাসের সব কাজ বাড়ি নিয়ে আসতেন সেজভাই। নিখুঁত করে কাঠের উপর ছবি এঁকে সরু বাটালী জাতীয় একটা যন্ত্র ‘বুলী’ বলা হত, তাই দিয়ে কাঠ কেটে কেটে ছবি ফুটিয়ে তুলতে হতো রিভার্স পদ্ধতিতে। আমি তম্ময় হয়ে দেখতাম। মাঝে মাঝে সেজ ভাইকে সাহায্য করতাম কাঠে বুলি চালিয়ে কিংবা এচিং এর পাথর ঘষে। আমার সব প্রাণ গিয়ে পড়ল ছবির দিকে। সব ছবিগুলো প্রাণ পেতো আমার দৃষ্টির সামনে। ওয়াটার কালারে ল্যান্ডস্কেপ সব সজীব হয়ে উঠত তেমনি তেলরঙের স্টিল লাইফ কিংবা সিটিস্কেপগুলো জীবন্ত হয়ে উঠতো। ছবি আঁকতে শিখিনি কিন্তু ছবি দেখার চোখ তৈরী করে দিলেন সেজ ভাই।
সেজ ভাই বোর্ড হাতে স্কেচ করতে বের হতেন। মাথাভরা ঝাঁকাঝাঁকা চুল। আমার বন্ধু বাদলরা থাকতো শান্তিনগর বাজারে যাবার একটু বাঁ দিকে। ওর বোন রুবী খুব সুন্দর ছিল দেখতে। সেজ ভাই এর চুলে হাত ঢুকিয়ে ওদের বীরভূম অঞ্চলের ভাষায় টেনে টেনে বলতো, ‘আপনার চুলগুলো তো ভারি সুন্দর।’ সেজ ভাইয়ের নাচে খুব আগ্রহ ছিল। তখন বুলবুল চৌধুরী ঢাকায় এলেন তাঁর নাচের ট্রুপ নিয়ে। নামকরা সব শিল্পীরা তাঁর ট্রুপে । তাঁর স্ত্রী আফরোজা বুলবুল সেই সময়কার বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী। সংগীত পরিচালনায় তিমির বরণ, আলাউদ্দিন খাঁর সুযোগ ̈ ছাত্র। মাহবুব আলী ইনষ্টিটিউটে শুরু হলো তাঁদের শো। ভীষণ পাবলিসিটি পেলো এই শো। অনেকটা উদয়শঙ্কর ধাঁচের ব্যালে। এঁদের ‘হাফিজের স্বপ্ন’, চাঁদ সুলতানা’ এই সব নাচ ভীষণ সুনাম পেল। বুলবুল চৌধুরী ছিলেন অসাধারণ সুন্দর পুরুষ এবং উচ্চশিক্ষিত। চট্টগ্রামের চুনতির এক সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান। বুলবুলের এই নাচ সেজ ভাইকে মুগ্ধ করলো। তিনি নাচ শিখতে লেগে গেলেন। ইচ্ছে বুলবুল চৌধুরীর ট্রুপে যোগ দেবেন। অফারও পেয়েছিলেন। হঠাৎ বুলবুল চৌধুরী মারা গেলেন। সেজ ভাইয়ের নাচ আর এগোলোনা। পুরানো পল্টনে ইনকামট্যাক্স এডভাইজার আশরাফ আলী চৌধুরীর বাসার কাছেই একটি মেয়ে থাকতো নাম অঞ্জলী। ভারী সুন্দর নাচতো। অনেক অনুষ্ঠানে ডাক পড়তো ওর। সেজ ভাই ওকে নাচ শেখাতেন। একবার আমার উপর অঞ্জলীকে নিয়ে আসার ভার পড়লো। মনে পড়ে আমি সাইকেলের হ্যান্ডেলবারে বসিয়ে অঞ্জলীকে নিয়ে এসেছিলাম ।
সেই কালে ঢাকায় নাচের বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন লিলি খান- বি,এ, খানের মেয়ে। নয়া পল্টনে থাকতেন। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি পড়তেন। অপরূপ সুন্দরী, নাচেন অপূর্ব। একেবারে সবার মাথা খাবার জোগাড়। তাঁর গুরু ছিলেন গওহর জামিল। লিলি খানের বিয়ে হয় সিন্ধুর তৎকালীন চীফ মিনিস্টার পীর আলী রাশদীর সঙ্গে। আমি করাচী ছাত্র থাকাকালীন ন্যাশনাল এসেম্বলিতে যেতাম। এসেম্বলিতে পীর আলী রাশদী একটা লাল ফেজ টুপি পরে আসতেন। দর্শক গ্যালারিতে লিলি খান নিয়মিত থাকতেন।
তখনকার সময় আরেকজন নাচের শিল্পী ছিলেন নিজামউল হক, ভাষা সৈনিক অ্যাডভোকেট গাজীউল হকের ছোট ভাই। ধুমকেতু নামে নাচতেন। সলীল চৌধুরীর সব গণসংগীতগুলোকে নাচে কোরিওগ্রাফ করেছিলেন। এই সময় আলতাফ মাহমুদ অনেক নাম করেন । তিনি ‘কালোবরণ’ নামে সংগীত পরিচালনা করতেন। পরবর্তীতে নিজামুল হক এবং আলতাফ হোসেন দুজনেই করাচীতে ছিলেন সরকারি পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে চাকুরি নিয়ে। আমি করাচীতে ছাত্র থাকাকালীন এদের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হয়। ফরিদা আপার মেয়ে আমাদের নীলু নিজামউল হকের কাছে নাচ শিখত। ও খুব সুন্দর করে করাচীর ওয়াইএমসি মঞ্চে ‘গাঁয়ের বঁধু’ নাচটি পরিবেশন করে সবার প্রশংসা পেয়েছিল।
বড় ভাইয়ের আগ্রহে সেজ ভাই ঝুঁকে পড়লেন ফটোগ্রাফির দিকে। বড় ভাইয়ের ইচ্ছা ছিল সেজ ভাইকে দিয়ে একটা ফটোগ্রাফির স্টুডিও চালাবেন। একটা সস্তা কোডাক বক্স ক্যামেরা দিয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই সেজ ভাই বেশ কিছু সুন্দর ছবি তুললেন। একদম স্টুডিও কোয়ালিটি। নীরদ রায়ের বেশ কিছু বাংলা বই ছিল ফটোগ্রাফির উপর। সেজ ভাই অল্প ক’দিনের মধ্যে ফটোগ্রাফির এবং ডার্করুমের সব কলা-কৌশল আয়ত্ত করে ফেললেন। আমিও তাঁর সর্বক্ষণের চ্যালা হিসাবে অনেক কিছু শিখে ফেললাম।
বাইশ-
ক্লাস টেন-এ উঠতেই কিছু নতুন ছাত্র এলো আমাদের ক্লাসে। একজন মন্টু আরেকজন বাদল। মন্টু পাবনার আর বাদল বীরভূমের ছেলে। দুজনেই সিনেমার পোকা। বয়সে আমার চেয়ে বেশ বড়। আমার বালকসুলভ ব্যবহারে পরিবর্তন আসছিল। মিন্টুরোডে ইকবালদের কিংবা স্পিকার করিম সাহেবদের বাড়িতে ব্যাডমিন্টন খেলায় ছেদ পড়লো। খেলাধুলা ছেড়ে আড্ডাবাজিতে মেতে উঠলাম। কিশোর বয়স এখন। সব কিছুই অন্যরকম লাগছে। এখন আনন্দের উপাদান ভিন্ন। দল বেঁধে সিনেমায় যাই, সিনেমার গান গাই, কার কত ডায়ালগ মুখস্থ তারই প্রতিযোগিতা। সবই হিন্দী সিনেমা। দীলিপকুমার, রাজকাপুর, নার্গিস, নিম্মির অনেক ছবি দেখে ফেললাম। দিলীপ কুমারের মতো নায়ক নায়ক পরিবর্তন এল চলাফেরায়। দিলীপকুমারের ব্যথাভরা অভিব্যাক্তি মন ছুঁয়ে যেত।এর আগে তেমন সিনেমা দেখিনি। এখন শুরু হলো একেবারে নিয়মিত। মুকুল সিনেমা হলে ব্ল্যাকমার্কেটারদের সঙ্গে কাউন্টারে ধস্তাধস্তি করে টিকিট কিনতো মন্টু। মাস্তানিতে ওর খুব উৎসাহ। কোথায় কখন কাদের শায়েস্তা করেছে তাই নিয়ে খুব গল্প করতো। ভায়োলেন্সে ওর কেমন একরকম উন্মাদনা। শুনেছি, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনায় ওর নিজ এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়ে পাকবাহিনীর দোসর হিসাবে অনেক অত্যাচারে জড়িয়ে পড়ে। পরিণামে যা হবার তাই হয়েছে। মুক্তিবাহিনীর হাতে জীবন দিতে হয়েছে। আমার ঠিক উল্টো, ভায়োলেন্স আমার খুব অপছন্দের । আমি মারামারি, ধরাধরি এমনকি জোরেসোরে ঝগড়াঝাটিও পছন্দ করতাম না। আমাদের পরিবারে এসবে কোন সায় তো ছিলই না, বরং আম্মার কড়া নির্দেশ ছিল কারও বিরুদ্ধে কোন নালিশ আসলে তাকে আর আস্ত রাখা হবে না। আমি স্বভাবে নম্র ছিলাম, হয়তোবা টিমিড। কারুর সঙ্গে কোন বিরোধ হতো না। কেউ কিছু ভুল করলেও তা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে অপ্রস্তুত করতে পারতাম না। আমার বন্ধুভাগ্য বরাবরই ভালো। আব্বা লর্ড চেস্টারফিল্ডের ছেলের কাছে লেখা সেই বিখ্যাত চিঠি পড়ে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ভদ্রলোক হলো সে, যে অপরজনের দিকটা বিবেচনা করে। আমি এই উপদেশটা সারাজীবন মেনে চলেছি। এই কারণেই বোধ করি যেখানে গেছি সেখানেই লোকজনকে পেয়েছি একান্ত কাছে। মেয়েদের কাছে আমি খুব প্রিয় ছিলাম। আর এই প্রিয় থাকার অদম্য ইচ্ছাটাই বোধ করি আমার চরিত্রকে দুর্বল করে রেখেছিল। সবার মন রেখে চলতে গিয়ে নিজের মনকে শাসন করে ফিরেছি সব সময়।
টেস্ট পরীক্ষা শেষ। এই সময় মন্টু, বাদল, আমি একসঙ্গে চলতাম। ওরা আমাকে সিগারেট খাওয়ানোটা ভালো করেই রপ্ত করালো। এখন আর খেলতে যাইনা। প্রতি বিকালে বসি গিয়ে রমনার বটমূলের পাশের লেকের একপ্রান্তে একটা পাকা সিঁড়ি, ওটার ওপর। ছ’টা ক্যাপস্টান সিগারেট কেনা হতো, প্রত্যেকের দুটো করে। এই সিঁড়িতে বসেই সন্ধ্যা পার করতাম।আগে সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফেরার যে নিয়ম ছিল তা না-মানার মধ্যেই যেন পৌরুষ বোধ করছিলাম। আমি বড় হয়েছি, আমার জন্য আবার কী নিয়ম। সত্যি একটা বিদঘুটে বয়স। এর মধ্যে মন্টু আর বাদলের ভুমিকাটাই বেশি। সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং এর সেকেন্ড গেট তোপখান রোডে তিনটে রেস্তোরাঁ ছিল- জান, কিসমত এইসব নাম। চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছি, সিগারেট ফুঁকছি। লাউডস্পিকারে অবিরাম গান চলছে। তখন আর কলের গানের যুগ নেই। ইলেকট্রিক টার্ন টেবিলে একসঙ্গে বেশ কয়েকটা রেকর্ড চাপিয়ে দিলে পর পর বাজতে থাকতো। একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে গান বাজাত, কার শব্দ কত জোরে হয়।
১৯৫৩ তে ম্যাট্রিক পাশ করে কাছের ঢাকা কলেজ যেখানে বাকি সব বন্ধুরা গেছে সেখানে না গিয়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হলাম আর্টসে। কারণ মন্টু ওই কলেজে সায়েন্সে ভর্তি হয়েছে। এই কলেজ বিল্ডিংটা আমার কাছে খুব ইমপ্রেসিভ লাগতো। দুই জোড়া বিরাট আকারের পিলারের উপর প্রাচীন গোথিক কায়দায় বানানো প্রবশেদ্বার। এই কলেজের খুব ঐতিহ্য ছিল। প্রিন্সিপাল ছিলেন খান বাহাদুর আবদুর রহমান খান। পৃথিবী বিখ্যাত স্থপতি ও প্রকৌশলী ডা. ফজলুর রহমানের বাবা। সাদা ধবধবে পায়জামার উপর সাদা কিংবা কালো শেরোয়ানি এবং মাথায় কড়া ইস্ত্রি করা কিস্তি টুপিতে তাঁকে মানাত খুব। একজন খাঁটি অভিজাত এবং নামকরা শিক্ষানুরাগী ছিলেন। ভাইস প্রিন্সিপিাল ছিলেন রেবতীভুষণ বাবু, লজিক পড়াতেন। অতি উজ্জ্বল গায়ের রঙ, পরনে ধবধবে ধুতি পাঞ্জাবি। ইংরজি পড়াতেন শৈলেন ভদ্র, পালগ্রেভের গোল্ডেন ট্রেজারি। ইংরেজি কবিতা পড়ানোতে তাঁর খুব সুনাম ছিল। তাঁর হাত ধরে পরিচয় হল ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী, কীটসের সঙ্গে। আবদুল মতিন স্যার তখন ইংরেজির তরুণ শিক্ষক। পড়াতেন ‘কাভারলি পেপার্স’। ইংরেজি গদ্য যে কী আর্কষণীয় হতে পারে তাঁর ক্লাসে বুঝেছিলাম। আজও কাভারলি পেপার্স আমার সংগ্রহে আছে। ইংরেজির প্রতি ঝোঁক বাড়লো। তখনকার সময় ইংরেজির খুব কদর। আমি স্পেশাল সাবজেক্ট হিসাবে ইংরেজি সাহিত্য নিলাম। বাংলা পড়াতেন মোফাজ্জল হায়দার চোধুরী। ছোটখাটো মানুষ, শেরোয়ানি পরে ক্লাসে আসতেন। খুব ধীরে এবং মৃদুস্বরে কথা বলতেন। চমৎকার ব্যক্তিত্ব। কবিতা ও নাটক পড়াতেন। একাত্তরের ১৪ই ডিসেম্বর কুখ্যাত আল-বদর বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন এই মেধাবী শিক্ষাবিদ যাদের মধ্যে তাঁর একজন ছাত্রও ছিল।
ইসলামিক হিস্ট্রি পড়াতেন বোরহান উদ্দিন স্যার। ভারি কড়া ছিলেন। জাস্টিস আমীর আলীর হিস্ট্রি অব দি সারাসীনস পড়াতেন। প্রফেসর হিট্টির বইও পাঠ্য ছিল। আমি সেই সময়ে ইতিহাসে তেমন মজা পেতাম না এখন যেমন পাই। আমার তখন সাহিত্যের নব নব রসে নিত্য অবগাহন। মাইকলে মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র , ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পড়লাম । ঈশ্বরচন্দ্রের শকুন্তলার পিতৃগৃহে যাত্রার র্বণনায় আমার চোখ ভিজে আসতো। রবীন্দ্রনাথে পৌঁছার আগে পড়ে ফেললাম শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ এবং কিছু আধুনিক লেখকদের রচনাও। যেমন, মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে, যাযাবরের দৃষ্টিপাত, জরাসন্ধের লোই-কবাট, শংকরের কত অজানারে। দৃষ্টিপাত আব্বার খুব প্রিয় বই। এর গদ্যরীতি আব্বাকে খুব আকৃষ্ট করতো। বলতেন, একটা শব্দ বদলে দেখো, অমন মিষ্টি শোনাবে না আর। আব্বার নিজের লেখা চিঠিপত্রের মধ্যে ছিল মুজতবা আলীর আডডাবাজির ধাঁচ, গল্প-রসকিতা ভরা।
আব্বার উৎসাহে নেহেরুর সব ইংরেজি লেখা পড়ে ফেললাম। নেহেরু পরিবারের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় আব্বার কথা মতো নেহরুর কনিষ্ঠ ভগ্নি কৃষ্ণা হাতিসিংয়ের ‘কোন খেদ নাই’ বই পড়ে। পরবর্তীকালে আমি এর ইংরেজিটা, With No Regrets পড়েছিলাম ।এতে নেহরু পরিবারের, জওহরলাল নেহরু, মতিলাল নেহরু, বিজয় লক্ষ্মী পন্ডিত, কমলা নেহরুর কথা আছে।অতি মমতায় ভরা লেখা। কৃষ্ণা হাতিসিং লিখেছেন, বাবাকে অনেক রাতে খালি মেঝে কম্বল পেতে শুতে দেখে একদিন জিজ্ঞেস করায় মতিলাল নেহরু বললেন, তোমার দাদা বিলেত থেকে ফিরে যখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবেন তখন তাকে জেলেই কাটাতে হবে বেশি সময়। জেলে তাঁর পরম স্নেহের এবং গর্বের ধন পুত্রের কত কষ্ট হবে তাই বুঝতে তাঁর এই কাজ। এ জায়গাটুকু পড়তে আব্বা বড় আবেগাপ্লুত হতেন।
শুরু করলাম নেহরুর আত্মজীবনী দিয়ে, তারপর Discovery of India, শেষ করলাম Glimpses of World History দিয়ে। এর আগেই পড়েছিলাম A Father’s Letters To His Daughter. দুটোই ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা পত্রসমগ্র। বেশির ভাগ লেখা জেলে থেকে। স্বাধীনতা আন্দোলনের তৎকালীন ইতিহাস জানতে হলে আমার মনে হয় নেহরুর Discovery of India এবং সুভাষ বসুর Indian Struggle 1857-1944 এর চেয়ে ভালো বই আর নেই। আব্বা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক কিছু দেখেছেন। সেইসব দিনগুলিতে চট্টগ্রামে চাকুরিতে থাকাকালীন দেখেছেন সেকালের অগ্নিঝরা দিনের বিপ্লবী কার্য্কলাপ, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন। সুর্যসেনকে দেখেছেন, দেখেছেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, অনন্ত সেনকে। তখন এই বিপ্লবী বীরদের জয়যাত্রার এবং আত্মত্যাগের সব অপূর্ব কাহিনী প্রকাশ হতো ‘পাঞ্চজন্য’ বলে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়। আব্বা এর সংখ্যাগুলি বাঁধিয়ে রেখেছিলেন। আমি যখন নতুন পড়তে শিখেছি তখন থেকেই এগুলো পড়ে শিহরিত হতাম।
আম্মাও গল্প করতেন এদের কথা । আরও গল্প করতেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ঝড়ের রাতে দমোদর নদী সাঁতরে মার কাছে পৌঁছার কাহিনী । এবং স্যার আশুতোষের ভাইসরয়কে জানিয়ে দেয়া যে রাজাপুরুষের ইচ্ছার চাইতে তাঁর কাছে তাঁর মার আজ্ঞাই বড়। এসব কাহিনী আম্মা আমাদের মুখে মুখে বলতেন। আম্মা বেশি পড়াশোনা করেননি। কিন্তু লেখাপড়ার মর্যাদা ছিল তাঁর কাছে সব কিছুর উপরে।
(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *