নির্বাচিত ১০০ টি বই

রাজীব নূর খান

অনেককেই দেখেছি ১০০টি ভাল বইয়ের তালিকা তৈরি করেছে। কিন্তু আমার ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও আমি আমার প্রিয় বইয়ের তালিকা তৈরি করতে পারিনি। কারন সেই বই গুলো আমি পরে শেষ করতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যের সেরা বইয়ের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এবং আমার ধারনা আপনারা সবাই আমার সাথে একমত হবেন। বই আমাদের মানুষ করেছে, আমাদের সুসভ্য করেছে৷‌ তাই আজ যারা বই-বিমুখ, যারা শুধু কম্পিউটার, পানশালা আর টিভি সিরিয়ালে আনন্দ পায়, তাদের কি সভ্য বলা যাবে?

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘ভালো বই কাকে বলে?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘যে বইটা পাঠককে ভাবায়, সেটাই ভালো বই।’ বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই আমার পছন্দের বইয়ের তালিকার সাথে একমত হবেন আশা করি। পাঠকদের কাজ হল বই পড়া। বইয়ের মধ্য থেকে নিজের জন্য আনন্দ খুজে ফেরা। ”তিনটি ভাল বই একবার করে পড়ার চেয়ে একটি ভাল বই তিনবার পড়া বেশি উপকারী।”

আমাদের জীবনের আয়ু তো সীমিত। বইপত্র নিয়ে এলোমেলো পড়তে গিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। বইটি পড়ার আগে ভাবতে হবে আমি এই বইটি কেন পড়ব, বইটি থেকে কী চাই। যা পড়া হয়, তা আত্মস্থ করা গুরুত্বপূর্ণ। বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য থাকতে হবে আত্মিক উন্নয়ন। আপনার বইয়ের শেলফ যত বেশি সম্ভব ভিন্ন ধরনের বই দিয়ে ভর্তি করবেন, আপনার অ্যাডভেঞ্চারও তত বেশি হবে।

১। ‘শেষের কবিতা’ ও ‘গোরা’ লেখক- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপন্যাসের নায়কের নাম গোরা। মূলত গোরার পিতা ইংরেজ। সিপাহি বিদ্রোহের সময় এক ব্রাম্মন পরিবারের গোয়ালে তার জন্ম। জন্মের সময় সে মাকে হারায়। ব্রাম্মন দম্পতি তাকে মাতা-পিতার পরিচয়ে বড় করে। এই গোরা কালক্রমে বড় হিন্দু নেতা হয়ে যায় এবং ইংরেজ বিরোধী। এবং শেষের কবিতায় বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার অমিত রায় প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত এবং রোমান্টিক যুবক। তর্কে প্রতিপক্ষকে হারাতে সিদ্ধহস্ত। এই অমিত একবার শিলং পাহাড়ে গেল বেড়াতে । আর সেখানেই এক মোটর-দুর্ঘটনায় পরিচয় ঘটল লাবণ্যর সাথে। এই বইটি দুটি আমি প্রতি বছর একবার করে পড়ি। ঠিক করেছি আমৃত্যু পড়ে যাব।

২। ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ লেখক- শওকত আলী। উপমহাদেশের এক কোনায় বাংলাদেশে হঠাৎ করে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহণ যে কারণেই হোক একটি সর্ব অজ্ঞাত ঘটনা। লীলাবতীর মধ্যে আবহমান বাঙালী নারীকেই পাই। বইটি লিখতে লেখকের প্রায় ১৫ বছর লেগেছে। আজীবন মনে রাখার মত অসাধারণ একটি বই।

৩। ‘লৌহকপাট’ লেখক, ‘জরাসন্ধ’ (ছদ্মনাম)। আসল নাম- চারুচন্দ্র চক্রবর্তী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্ব শেষ করে এক তরুণ যুবক চাকরির সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে শেষপর্যন্ত যে কাজটি পেলেন, সেটি হল কারা বিভাগে। ছোটখাটো একটি জেলের ডেপুটি জেলারের পদ। সম্পূর্ণ একটা নতুন জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটল সেখানে।

পরিচয় হল বদর মুন্সীর মত ভয়ঙ্কর ডাকাতের সঙ্গে – খুন,জখম, নারীধর্ষণ যার কাছে ছেলেখেলা। কিন্তু সেই লোকটিই একবার ডাকাতি করার সময়ে গৃহস্বামীকে কথা দিয়েছিল, শুধু টাকা-গয়নাই নেবে – নারীর সম্মান নষ্ট করবে না। কিন্তু দলের একজন সেই হুকুম মানে নি বুঝতে পেরে, নিজেই ধরা দিল সেই অপবাদের বোঝা নিজের মাথায় নিয়ে।

৪। ‘অন্তর্লীনা’ লেখক- নারায়ণ সান্যাল। গল্পের নায়ক কৃশানু মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। বুদ্ধিদীপ্ত, কিন্তু সাধারণের দৃষ্টিতে স্মার্ট নয়, কারণ সে লাজুক, ইন্ট্রোভার্ট, নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে ভালবাসে। এছাড়া তার মধ্যে আছে এক শিল্পীমন, সে সাহিত্যের ছাত্র, ছবিও আঁকে। অথচ তার স্কেচবুকে নেই কোনও নারীর ছবি। তার বয়সী এক যুবক শিল্পীর কাছে একটু অস্বাভাবিক ঘটনা, সন্দেহ নেই। শুধু স্কেচবুক বলে তো নয়, সে ট্রামে উঠে চেষ্টা করে লেডিজ সীট থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকতে, তার সহপাঠী মেয়েদের মুখের দিকে সে কখনও তাকায়না পর্যন্ত। উপন্যাসটা পড়তে শুরু করলে, ভাল লাগতে শুরু করবে।

৫। ‘খোয়াবনামা’ পূর্ববাংলার আঞ্চলিক ভাষাকে অবলম্বন করে যে কি চমৎকার উপন্যাস লেখা যায় তার সার্থক উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার দীর্ঘ কলেবরের উপন্যাস খোয়াবনামার মাধ্যমে। আঞ্চলিক ভাষার অধিক ব্যবহার রয়েছে বইটিতে, রয়েছে কিছু খিস্তি-খেউরও। ’৪৭ এর দেশভাগ গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে খোয়াবনামা।

৬। ‘শুন বরনারী’ লেখক- সুবোধ ঘোষ। জন্মেছিলেন ১৯০৯ সালে ঢাকার বিক্রমপুরে জেলায়, মৃত্যু ১৯৮০ সালে। সহজ সরল একটি উপন্যাস। এ উপন্যাসকে সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন- অতি সাধারণ উপন্যাস মুগ্ধ হয়ে বারবার পড়েছি। হিমাদ্রিশেখর দত্ত ওরফে হোমিও হিমু। পেশায় হোমিও চিকিৎসক। যদিও কেউ তাকে ডাক্তারি করতে দেখেনা। লোকের ছেলেপেলে পড়িয়ে রোজগার চলে। আর,আসল কাজ হচ্ছে পরোপকার, মানে, অমুকের সাথে অমুক জায়গায় যেতে হবে,অমুকের মেয়েকে ট্রেনে করে হোস্টেলে দিয়ে আসা, নিয়ে আসা, অমুক কে তীর্ত্থে নিয়ে যাওয়া, এইসব। না করতে পারেনা হিমু। এমন কাজেই ডাক পড়ে তার।

৭। ‘কবি’ লেখক- তারাশঙ্কর। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে এটি একটি।কবি উপন্যাসের নায়ক একজন কবি । তবে কবি বলতে আমরা সাধারনত যা বুঝি সেই কবি তিনি নন,উপন্যাসের নায়ক নিতাইচরন একজন কবিয়াল । একবার এক মেলাতে এক বিখ্যাত কবিয়াল না থাকাতে নিতাইকে মঞ্চে তুলে দেয়া হয়,তারপরে নিতাই তার প্রতিদ্বন্দ্বী কবিয়ালকে প্রায় ঘায়েল করে ফেলে শেষে তার প্রতিপক্ষ কবিয়াল নিতাইয়ের পরিবার নিয়ে অশ্লীল আক্রমণ করে কবিয়াল লড়াইয়ে জিতে যায়,কিন্তু অই মঞ্চেই নিতাই জয় করে নেই হাজারো মানুষের মন ।

৮। ‘তবুও একদিন’ লেখক- সুমন্ত আসলাম। বইটি একটু সময় নষ্ট করে পড়ে ফেলুন। ভালো লাগবেই।

৯। ‘লালসালু’ লেখক- সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ। বেশ কয়েকটি শক্তিশালী নারী চরিত্রের প্রাধান্য পেয়েছে এই উপন্যাসে,তাদের মধ্যে জমিলা অন্যতম। জমিলা অত্যন্ত সাহসী এক নারী। মজিদ নামের প্রতিকী দ্বারা ভ্রান্ত না হয়ে, মজিদের সাথে না লেগে থেকে সে পরিবর্তন চেয়েছে। ধর্মকে পুঁজি করে যারা সমাজকে শোষন করে জমিলার মৃত্যু তাদের কপালে কলংকের চিহ্ন এঁকে দেয়।

১০। ‘হাজার বছর ধরে’ লেখক- জহির রায়হান। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র টুনি,অবশ্য অনেকে আম্বিয়াকেও কেন্দ্রীয় চরিত্র বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। তবে আম্বিয়ার চেয়ে টুনির জীবনের উত্থান পতনকেই লেখক বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। টুনি গ্রামের সহজ, সরল, চঞ্চল এক মেয়ে। টুনির পরিণতি হয়েছে হৃদয় চিরে যাওয়ার মতো কষ্টকর। শেষ পর্যন্ত শূন্য বুকে বাপের বাড়ি ফিরে টুনি,তবুও শৃংখল ভাঙ্গেনি।

নিজের পছন্দের উপর ভিত্তি করেই বই পড়া উচিত। অন্যের পছন্দ বা ভাললাগার মূল্য না দিয়ে নিজের পছন্দ অনুসারে বই বাছাই করুন। অনেকের কাছে ভাল লেগেছে, এমন বই আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। এছাড়া কোন বই অনেকেই পড়েছে বলে আপনাকেও পড়তে হবে এমন কোন কথা নেই। অন্যের পছন্দের বই আপনাকেও পড়তে হবে, এমন মনে করাটা বোকামী। প্রত্যেকের নিজস্ব একটি ভাললাগার জগৎ থাকে। কারো ভূতের গল্প পছন্দ, কারো ফুটবল আবার কারো বা ভ্রমণকাহিনী। কারো পছন্দ বা প্ররোচনায় বই বাছাই না করে নিজের দিকে তাকান। নিজে যা চান তাই করুন, অন্যের চাপে নয়।

নিজের যে বইটি পড়তে ভাল লেগেছে, অন্যকেও সেই বই পড়তে উৎসাহ দিন। পছন্দের বই নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা করুন। ভাই-বোনকে নিজের পছন্দের বই পড়তে উৎসাহ দিন। তাদেরকে তাড়াতাড়ি বইটি শেষ করতে তাগাদা দিন, যাতে আপনি তাদের সাথে কথা বলতে পারেন। বই পড়ার আনন্দ ভাগাভাগি করা বই পড়ার চেয়ে আরো বেশি আনন্দদায়ক।

১১। ‘দৃষ্টিপাত’ লেখক-যাযাবর। বইটি প্রকাশিত হওয়া মাত্রই বাঙালী শিক্ষিত সমাজে যে আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল তাহা যেমন বিস্ময়কর তেমনি অভূতপূর্ব । ‘দৃষ্টিপাত’-এ রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে ইতিহাস, স্থাপত্য, সঙ্গীত, মনুষ্যচরিত্র নিয়ে নানান আলোচনা । নিরস ভাবে নয়, গল্প ও ঘটনার সহজ প্রবাহের সঙ্গেই সেগুলি এসেছে; করেছে বইটিকে তথ্য-সম্বৃদ্ধ । ১৯৫০ সালে সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ বই হিসেবে ‘দৃষ্টিপাত’ নরসিংহ দাস পুরস্কারে সন্মানিত হয় ।

১২। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ লেখক- আলাউদ্দিন আল আজাদ। ১৯৬০ সালে পদক্ষেপ নামক এক পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় উপন্যাসটি প্রথম ছাপা হয় । শিল্পীর অপূর্ণতাবোধ, বেদনা এবং অশেষ সৌন্দর্যতৃষ্ণা এ উপন্যাসের প্রধানতম থিম । শিল্পীর মনের টানাপড়েন এবং নতুন ধরনের মূল্যবোধের কারণে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ প্রসিদ্ধ হলেও এ উপন্যাসের অন্য উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে এর নায়ক পরিকল্পনা ।

১৩। ‘কাবিলের বোন’ ও ‘উপমহাদেশ’ লেখক- আল মাহমুদ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বর্তমানে ভূরি ভূরি বই প্রকাশিত হতে দেখছি আমরা । বাজার থেকে এরকম দশটি বই তুলে নিয়ে পাঠ করলে দেখা যাবে, ইতিহাস ও বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে একরৈখিকভাবে আরোপ করা হচ্ছে লেখকের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত কোনো ধারণা । প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা কবি ও কথাশিল্পী আল মাহমুদ তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় জারিত হয়ে লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস—‘কাবিলের বোন’ ও ‘উপমহাদেশ’। মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উত্সারিত আল মাহমুদের এ দু’টি উপন্যাস বহুল আলোচিত, পঠিত ও নন্দিত হওয়ার পরও এগুলোর মর্যাদা এখনও চিহ্নিত হয়নি । ১৯৯৪ সালে আল মাহমুদের ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাস প্রকাশ করার কারণে বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলায় বাংলা সাহিত্য পরিষদের স্টলে ভাংচুর করা হয় এবং বইতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় ।

১৪। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লেখক- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমার চেতনার অনেকটা জুড়ে আছেন তিনি। দুঃখের মাঝে ধৈর্য, কষ্টের মাঝে হাসি, বিপদের মাঝে কঠিন মনোবল আর নীতির প্রশ্নে মাথা নিচু না করার মানসিকতা আমি তার জীবনীর মধ্যে পেয়েছি। তাকে জীবনের অন্যতম মহামানব ভাবতে পেরে আত্মতৃপ্তিটুকু পেয়েছি।

১৫। ‘লোটা কম্বল’ লেখক- সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। আমার পড়া একটি অম্ল-মধুর, হাস্য-রস মিশ্রিত মধ্যবিত্ত ঘরের বর্ণনা সম্বলিত চমৎকার উপন্যাস। দুই খন্ডের বই। প্রায় আটশ’ পৃষ্ঠা জুড়ে এর কাহিনীর বিস্তার। বইয়ের নিজের ভাষায়, “ভেঙে যাওয়া যৌথ পরিবারের পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে নিঃসঙ্গ এক পৌঢ়, হিমালয়ের মত যাঁর ব্যক্তিত্ব, অসম্ভব যাঁর আদর্শনিষ্ঠা, আপাত কঠোর যেন প্রুশীয়ান জেনারেল অথচ ভেতরে ভেতরে কুসুম কোমল। আর সেই মানুষটির একমাত্র মাতৃহারা যুবক সন্তান, মাঝে দুই পুরুষের ব্যবধান। পূর্বপুরুষ উত্তর পুরুষে সঞ্চারিত করতে চায় জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ আর মূল্যবোধ। মানুষের মত মানুষ করে তুলতে চায়।….দুই পুরুষের মূল্যবোধ আর দৃষ্টিভঙ্গির ঠোকাঠুকির মধ্যে আর এক পুরুষ। তিনি বৃদ্ধ মাতামহ। আধ্যাত্মিকতার বাতিটি তুলে যিনি খুঁজে পেতে চান সেই চির-চাওয়া পরমপুরুষটিকে…”

১৬। ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ লেখক- বিমল মিত্র। অসাধারণ একটি বই। প্রাক স্বাধীন ভারতের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসের কাহিনী। দুই খন্ডের বিশাল উপন্যাসটি দেখে আমার মত অনেকেই ভয় পেতে পারে। তবে এই বইটি না পড়লে আমার বই পড়া জীবনটি অসম্পূর্ন থেকে যেত। কিছু বই আছে যা পড়লে কখনও ভুলা যায় না। কড়ি দিয়ে কিনলাম বইটি সে ধরনের একটি বই। এত বড় উপন্যাসটি পড়ার সময় একবারও আমার মনোযোগ ছুটে যায়নি। বিমল মিত্রের অসাধারন লেখনি পাঠকদের নিয়ে যাবে কাহিনীর গভীর থেকে গভীরে।

১৭। ‘ন হন্যতে’ লেখক- মৈত্রেয়ী দেবী। আমাকে অনেক কাঁদিয়েছেন মৈত্রেয়ী দেবী, আর বোধ করি আমার মতো অনেককেই অতি অনায়াসে সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আপনমনে নিজেকে বিশ্লেষণ করতে শিখিয়েছেন। এ উপন্যাসটি আমি লাইনকে লাইন মুখস্থ বলতে পারি। বাংলা ভাষায় এক তুলনাহীন উপন্যাস এটি।

১৮। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লেখক- অদ্বৈত মল্লবর্মণ। এই একটি উপন্যাস লিখে লেখক খ্যাতি অর্জন করেন। এই উপন্যাসে গ্রামের দরিদ্র মালো শ্রেণীর লোকজনের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তীকালে এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।


১৯। ‘ওদের জানিয়ে দাও’ লেখক- শাহরিয়ার কবির। এই বই সম্পর্কে লেখক বলেছেন, এটি কাল্পনিক উপন্যাস নয়। তার ভাষায়, ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে বসে লেখা। কেবল ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। উপন্যাসটি ছোট আকারে ১৯৭৪ সালে বিচিত্রায় ছাপা হয়েছিল। পড়ে এটিকে খানিকটা বড় করা হয়েছে। শাহরিয়ার কবির এটি লিখেছিলেন ১৯৭৪ সালে।

২০। ‘পার্থিব’ ও ‘দূরবীন’ লেখক- শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অজস্র চরিত্র, নানান ঘটনাবলী, মানুষের জীবনের নানা টানাপোড়েন, উত্থানপতন, ঘাত-প্রতিঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি এখানে, এবং যেভাবে সবাইকে একজায়গায় জড়ো করে এক স্রোতে মিলিয়েছেন, সেটা এককথায় অতুলনীয়। পার্থিব উপন্যাসের প্রথম লাইন হচ্ছে- “বাদামতলায় রামজীবনের পাকা ঘর উঠছে ওই ।” আর শেষ লাইন হচ্ছে- “এসো আমার সঙ্গে তুমিও কাঁদো, এসো কান্নায় একাকার হয়ে যাই। একাকার হয়ে যাই ।” এই উপন্যাসে শহর গ্রাম মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে- কখনও লন্ডন-আমেরিকা । বুড়ো বিষ্ণুপদর তিন ছেলে ও দুই মেয়ে । এক মেয়ে নিখোঁজ। বড়ো ছেলে কৃষ্ণজীবন একজন বিজ্ঞানী । মেজ ছেলে রামজীবন- একজন ডাকাত । আর কন্যা বীনাপানি-যাত্রাপালা অভিনয় করে এবং তার সাধু স্বামী নিমাই । অ্ন্য দিকে হেমাঙ্গ – হেমাঙ্গ খুব সৌ্খিন এক যুবক। রশ্মি রায় ।হেমাঙ্গর চাচাতো বোন চারুশীলা । চয়ন- মৃগী রোগী । কিন্তু ছাত্রদের পড়ায় ভালো । ঝুমকি-, ঝুমকির বোন অনু- মনীশ, রিয়া এবং আরও অনেক চরিত্র ।

দূরবীন উপন্যাসে তিনটি প্রজন্মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমজন পুর্ববঙ্গের জমিদার হেমকান্ত চৌধুরী, দ্বিতীয়জন ব্রিটিশ ভারতের বিপ্লবী এবং স্বাধীন ভারতের ডাকসাঁইটে রাজনীতিবিদ ও হেমকান্তর নয়নের মণি কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী ও কৃষ্ণকান্তের বখে যাওয়া ছেলে ধ্রুব চৌধুরী; লোফার, হৃদয়হীন থেকে শুরু করে অনেক বিশেষনই তার সাথে যুক্ত করা যায়। উপন্যাসের ব্যাপ্তি অনেক বিশাল। তিনটি প্রজন্মের তিন ধরণের মানুষের কাহিনী বা জীবনাচরণ এখানে বিধৃত করা হয়েছে। এটি শুধু সাড়ে পাঁচশো পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস নয়; মানুষের ভাব, প্রেম, পদস্খলন, সংগ্রাম, বিরহ, জীবন-জীবিকা, আনন্দ-বেদনার- সব কিছুর এক প্রতিচ্ছবি।

বই পড়া আমার প্রিয় শখ। যদি আমাকে কেউ প্রশ্ন করে তুমি কি করতে বেশি পছন্দ কর? তাহলে আমি এক কথায় উত্তর দেব বই পড়তে। সত্যিই কেন জানি বই পড়তে আমার বেশি ভালো লাগে। প্রত্যেক রাতেই আমি বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ি। এমন কিছু বই আছে, যেগুলো পড়লে মনের মধ্যে ‘দোল’-এর অনুভূতি একটু বেশি অনুভূত হয়। আর সেটা দোলায়মান থাকে বহুদিনের জন্য। পড়ার ক্ষেত্রে আমি সর্বভুক শ্রেণির পাঠক। যা পাই তাই পড়ি।

২১। ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ লেখক- প্রমথনাথ বিশী। ঐতিহাসিক কাঠামোতে গঠিত অসাধারণ এক উপন্যাস। ১৯৬০ সালে “কেরী সাহেবের মুন্সী” গ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র’ পুরস্কার পান লেখক। বই থেকে কয়েকটা লাইন তুলে দিলাম- “ এমন সময় একটা হাতী দেখে কেরী ভাবল, যাক হাতীতে আজ রক্ষা করল বাঘের হাত থেকে।

কেরী বলল, ঐ দেখ।

সকলে দেখতে পেল গজেন্দ্রগমনে প্রকান্ড এক হাতী চলেছে, কাঁধের উপরে তার মাহুত, আর পিছনে জন দুই-তিন বর্শাধারী পাইক।

কিন্তু কেরী আজ এত সহজে রক্ষা পাবে না.

মিসেস কেরী উদ্বিগ্নভাবে বলল, বাঘ শিকারে চলেছে বুঝি?

টমাস ব্যাপারটা অনুমান করতে পেরেছিল, তাই বলল , না না, এদিকে বাঘ কোথায়! আর দু-চারটে থাকলেও তারা মানুষ খায় না।

কেন, সবাই বাইবেল পড়েছে বুঝি?—পত্নীর এবম্বিধ অখ্রিস্তানোচিত উক্তিতে মর্মাহত কেরী প্রমাদ গনল।

রামরাম বসু মনে মনে বলল —বাঘগুলো এখনও বাইবেল পড়েনি, তাই রক্ষা। ”

২২। ‘খেলারাম খেলে যা’ ও ‘নিষিদ্ধ লোবান’ লেখক- সৈয়দ শামসুল হক। বাবর আলী। সুন্দর নিপাট গোছানো মানুষ। কথার মায়াজাল বুনায় তার জুড়ি মেলা ভার। জীবন নিয়েও আপাত অর্থে তার কোনো টানাপোড়েন নেই। ব্যাবসার টাকায় বেশ আয়েশে, নিশ্চিন্তিতে দিন কাটে তার। নিজের বাড়ি, গাড়ি, টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করার সুবাদে সমাজের কাছে পরিচিতি— সবই আছে তার। ফলে, বলা যায় নির্ভার আনন্দময় জীবন বাবরের। শিক্ষিত, সুদর্শন, অবিবাহিত, সুকথক, সমাজের অন্য দশজনের থেকে বিত্তবান, মাঝবয়সী এই বাবরের যেন কোনো দুঃখ নেই। পিছু টান নেই। মনে হয়, যেন নিজের শরীরের সুখের জন্যই, শিশ্নের ইচ্ছেকে চরিতার্থ করবার জন্যেই সে কেবল উদগ্রীব।

তার লেখা অসংখ্য বইয়ের মধ্যে নিষিদ্ধ লোবান বইটি অন্যতম। ভেতরের আবেগী মনটাকে শক্তকরে নাড়া দেবার মতো উপাদানে সমৃদ্ধ ছোট পরিসরের এ উপন্যাসটির পরিশীলিত ভাষা ও সুলীখন সত্যই আবিষ্ট করে রাখবে পাঠককে।

২৩। ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ লেখক- আনোয়ার পাশা। শহীদ বুদ্ধিবীবি আনোয়ার পাশার এই একটি বইই যুক্তিশীল যে কোন মানুষকে ৭১ এর বাংলাদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যেতে পারে। শ্রদ্ধা জানাই এই বীরকে।

২৪। ‘প্রথম আলো’ ‘সেই সময়’ এবং ‘পূর্ব-পশ্চিম’ লেখক- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ওপর আমার একটা দূর্বলতা আছে। তিনখানা টাইম ট্রিলজি নিয়ে আমার বিস্ময়ের শেষ নেই। আমার প্রথম পড়া হয়েছিল পূর্ব পশ্চিম। সেসময় বলতে গেলে সমাজতন্ত্রে দীক্ষা পেয়েছিলাম এখান থেকেই। এই তিনটি উপন্যাস শেষ করে ওঠা মাত্রই একধরণের বিষণ্ণতা জেগে ওঠে। কারন উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র পাঠকের মনের ভেতর একটা জায়গা তৈরি করে নেয় এর মধ্যেই। সুনীল একবার বলেছিলেন ‘প্রথম আলো’ লিখতে তাকে সারা জীবনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় স্টাডি করতে হয়েছিল।

২৫। ‘নন্দিত নরকে’ ‘শঙ্খনীল কারাগার’ এবং ‘জোৎস্না ও জননীর গল্প’ লেখক- হুমায়ূন আহমেদ। নন্দিত নরকে বাংলা কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের প্রথম উপন্যাস। নন্দিত নরকে পড়ে চোখ ছলছল করেনি এমন পাঠক কি আছে?

বাকৃবিতে শিক্ষকতা করার সময়ে তিনি শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাসটি লিখেছিলেন। কোনো কোনো রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। সারা ঘর নরম আলোয় ভাসতে থাকে। ভাবি, একা একা বেড়ালে বেশ হতো। আবার চাদর মুড়ি দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। যেন বাইরে উথাল পাথাল চাঁদের আলোর সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। একঘেয়ে কান্নার সুরের মতো সে শব্দ।

গ্রেট হুমায়ন, গ্রেট জোছনা ও জননীর গল্প। “জোছনা ও জননীর গল্প” মূলত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে উপন্যাস হলেও এতে প্রেম,ভালোবাসা সবই আছে। হুমায়ুন তার স্বভাবসুলভ গল্প বলার ভঙ্গিতে ৭১’এর সেই ভয়াল ৯ মাসের কথা বলেছেন পাঠকদের।উপন্যাসের শুরু হয়েছে নীলগঞ্জ স্কুলের আরবী শিক্ষক মাওলানা ইরতাজুদ্দীন কাশেমপূরীকে দিয়ে যিনি ঢাকায় তার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে আসেন।… তারপর শাহেদ আর আসমানীর মমতায় পরিপূর্ণ সংসারজীবনের গভীরে যেতে যেতে পাঠকের পরিচয় ঘটবে নিজের চেনা জগতের সঙ্গে। শাহেদের বড় ভাই ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরির ঢাকায় আসা, রাস্তা হারিয়ে ফেলা, ভুল ঠিকানা, পরিশ্রম আর ক্লান্তিতে বিপর্যস্ত জীবন অস্থির উত্তাল মিছিল স্লোগানমুখর ঢাকায় তার বিপন্ন জীবনবোধ শুরু করিয়ে দেয় এক মহাযাত্রার।

২৬। ‘নারী’ ও ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’ লেখক- হুমায়ূন আজাদ। শুরুতে কখনও নারীবাদ নিয়ে কাজ করেননি হূমায়ন আজাদ। কিন্তু যখন শুরু করলেন তখন যেন বাংলা সাহিত্যের নারীবাদী ধারায় গোলাভরে গেল নতুন ফসলে। তবে তার এই প্রচেষ্টাকে তির্যক দৃষ্টিতে দেখতে ছাড়েননি অনেকেই। ‘নারী’ গ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে হুমায়ন আজাদ প্রথাবিরোধী লেখক হিসাবে পরিচিতি পান। পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীকে কি কি রূপে দেখা হয় বইটির প্রতিটি পৃষ্টায় তা ছড়িয়ে আছে।

হুমায়ুন আজাদ মানুষকে সচেতন করার প্রয়াসী ছিলেন। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মানুষ তার কবিতায় উঠে এসেছে। মানুষের মনোভঙ্গি, স্মৃতি, দুঃখ-কষ্ট, যাপিত জীবন ঘিরে কবির আগ্রহ। তিনি মানুষের মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছেন শুভ্রতা। হুমায়ুন আজাদ বাংলাদেশের সবুজ বনভূমি, উদার মানুষ ও নিসর্গের কাছে সমর্পিত। বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামগ্রিক অবস্থা কবিচিত্তে আলোড়ন তোলে।তার কবিতা পাঠককে সমৃদ্ধ করে।

২৭। ‘মেমসাহেব’ লেখক- নিমাই ভট্টাচার্য। নিমাই ভট্টাচার্য এখানে যেন তার নিজের জীবনেরই কাহিনী লিখছেন খানিকটা কল্পনা আর অনেকটা বাস্তবের মিশেলে। মনে দাগ কেটেছে যে কয়েকটা বই, মেমসাহেব এর একটি, সম্ভবত এই বইটা পড়ে চোখে পানি এসে গিয়েছিল। নিমাই ভট্টাচার্যের মূল জীবিকা সাংবাদিকতা।

২৮। ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ লেখক- আবু ইসহাক। ‘জোঁক’ গল্পের সার্থক গল্পকার আবু ইসহাক উল্লেখযোগ্য কিছু সাহিত্যকর্ম রেখে গেছেন বাংলা সাহিত্যে বলার অপেক্ষা রাখে না। তার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ একটি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি জীবনাখ্য। পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ নদ-নদী জলাভূমি-কৃষি ক্ষেতের পটভূমিকায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তার মধ্যে রক্তচক্ষু বের করা কতিপয় মানুষ নামের চারপায়া জানোয়ার, কিভাবে দিনের পর দিন বছর শতাব্দী যাবৎ ধর্মীয় ভণ্ডামিতে আবদ্ধ করে রেখেছে আমাদের, তার প্রতিছবি তার সাহিত্যকর্মে তার মেধা মননে আমরা প্রত্যক্ষ করি। উপন্যাসের গতিপ্রকৃতি দেখে বিশ্বাস হবে, আবু ইসহাক খুব কাছ থেকে সমাজের এই পিছিয়ে পড়া অন্ত্যজ এবং অনগ্রসর নিুবৃত্তকে বড় বেশি মমতা মাখিয়ে তার উপন্যাসে স্থান করে দিয়েছেন।

২৯। ‘আগুনপাখি’ লেখক- হাসান আজিজুল হক। জীবনসংগ্রামে লিপ্ত মানুষের কথকতা তাঁর গল্প-উপন্যাসের প্রধানতম অনুষঙ্গ। আগুনপাখি কেবল প্রথাগত চরিত্র নির্মাণ ও সংলাপ ধারণার বাইরের কোনো উপন্যাস নয় বলেই বলছি না, এর কাহিনীতে সেই অর্থে কোনো গল্প ফাঁদা নেই, বলবার মতো কোনো প্রণয় নেই, আকৃষ্ট করবার মতো ন্যূনতম কোনো যৌনতা নেই; এমন কি যে ভাষায় কাহিনীটি কথিত হয়েছে, সেই ভাষাটির সাথেও এদেশের অধিকাংশ পাঠকের বিশেষ কোনো যোগাযোগ নেই।

৩০। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ লেখক- মানিক বন্দোপাধ্যায়। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে লিখেছিলেন জীবনের প্রথম গল্প ‘অতসী মামী’। তার লেখাটি ‘বিচিত্রা’ নামক পত্রিকাতে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে তা ছাপা হয়েছিল। উপন্যাসের শেষে জেলে পাড়ায় থাকতে না পেরে কপিলাকে নিয়ে ময়নাদ্বীপেরর অজানা রহস্যময় দ্বীপের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় কুবের। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে আবহমান বাংলার সামজিক জীবনের টানপোড়নের ছবি একেছেন, একটা মেসেজ দিয়েছন, বার বার পড়েন, অনেক বার পড়েন, অবশ্যই একদিন মেসেজটা বুঝতে পারবেন!

মানুষ যত উপরের দিকে উঠতে থাকে ততই বুঝি সে একা হতে থাকে?! কর্তব্যের চাপে, ব্যস্ততার কোলাহলে বুঝি বা একে একে হারিয়ে যেতে থাএক সব চেনা চেনা মুখ! শ্বাশত এই কথাই যেন “পুতুল নাচের ইতিকথা”য় বলে দিয়েছেন অমর কথাশিল্পী মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায়। এই উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র পরাণের স্ত্রী তেইশ বছরের বাঁজা মেয়ে কুসুম। প্রকৃ্তপক্ষে কুসুম এক অস্থির, বেপরোয়া,ও দূর্বোধ্য গ্রাম্য রমণী ।

৩১। ‘নূরজাহান’ লেখক- ইমদাদুল হক মিলন। বিশাল ক্যানভাসের উপন্যাস ‘নূরজাহান’। হুমায়ুন আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদারসহ আরো প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিকদের মতে; ইমদাদুল হক মিলনের লেখা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এটি । শুধু তাই নয়, ‘নূরজাহান’ উপন্যাসটিকে ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক ‘আনন্দ বাজার’ বাংলা সাহিত্যের সাম্প্রতিক সময়ের শ্রেষ্ঠ রচনা বলে উল্লেখ করেছে । ‘নূরজাহান’ ধারাবাহিকের প্রধান চরিত্র নূরজাহান । এক উচ্ছল প্রাণবন্ত কিশোরী । বাবা দবির গাছি । আর মা হামিদা । অভাবের সংসারে তাদের একমাত্র আলো নূরজাহান । কিন্তু গ্রামের ফতোয়াবাজ ভন্ড মাওলানা মান্নানের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ করায় নূরজাহানের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ । সমাজের ফতোয়াবাজ ও কালো মনের মানুষদের দেওয়া এই দুভোর্গের বোঝা মাথায় নিয়ে চলতে থাকে নূরজাহানের দিনরাত্রি ।


৩২। ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ লেখক- জহির রায়হান। উপন্যাসের জাহিনী এই রকম- কাসেদ । মধ্যবয়সী এক যুবক । কেরানিগিরি তার পেশা । মা ছাড়াও তার ছোট্ট পরিবারে আছে নাহার । নাহার তার কেউই নয় । ছোট্টবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে কাসেদদের বাড়িতে তার আশ্রয় হয়েছে । কাসেদের মা এই মেয়েকে নিজের সন্তানের মত মায়া-মমতা দিয়েই বড় করেছেন । কাসেদের মত নাহারকে নিয়েও মায়ের সমান চিন্তা । ভালো দেখে একটা পাত্র জুটিয়ে নাহারকে বিয়ে দিবেন, মেয়েটি যেন তার চিরকালই সুখে থাকে । বেশিরভাগ সময় কেরানিগিরি নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও কাসেদের ভিতরে আছে এক রোমান্টিক মন । মাঝেমধ্যে টুকটাক কবিতাও লেখে কাসেদ । অবসর পেলেই সে জীবিকার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে এক অন্যরকম রোমান্টিক ভাবসাগরে আত্মনিমগ্ন হয় । জাগিয়ে তোলে কল্পনার চিত্রপটে আঁকা তার মানসীর ছবি । মানসীর নাম জাহানারা।

৩৩। ‘সাতকাহন’ ও ‘গর্ভধারিণী’ লেখক- সমরেশ মজুমদার। সাতকাহন উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র দীপা ছিলো সাহসী ও স্বতন্ত্র চরিত্রের অধিকারীনি এক নারী। যার নামের মধ্যেই নিহিত ছিলো অন্ধকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পুর্বাভাস। সাহস আর একাগ্রতা ছিলো বলেই নিজের নিষ্ঠুর অতীতকে মুছে ফেলে শুরু করেছিলো নতুন জীবন, জয় করেছিলো নিজের ভাগ্য, পড়াশুনা। কাছের মানুষ এমনকি নিজের মায়ের ঘৃণা, শত্রুতা, তাদের ভিতরকার বিভৎস লোভী চেহারাও দীপাকে পর্যুদস্ত করতে পারেনি। সে সময়ের কাঁধে মাথা ঠেকিয়েছে, কিন্তু ভেঙ্গে পড়েনি। কাছের মানুষ বলতে কেউই ছিলো না দীপার, দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলার সময় কেউ কাঁধ বাড়িয়ে দেয়নি দীপার দিকে। সুযোগ ছিলো অনেক,চাইলেই তা হাত বাড়িয়ে নিতে পারতো দীপা। কিন্তু তা সে করেনি। সাধারনের মাঝেই দীপা অসাধারন। যার জীবনে এসে মিশেছে নানা নাটকীয়তা, আর এসব নাটকীয়তাকে ছাপিয়েই যার জীবন এগিয়ে গেছে সমান্তরালভাবে-সেই দীপা। দীপাবলি বন্দোপাধ্যায়।

‘গর্ভধারিণী’র কাহিনী এই রকম- জয়িতা বড়লোক বাবা মার স্বেচ্ছাচারী আধুনিক মেয়ে। জয়িতার সাথে তথাকথিত নারী বা নারীত্বের সংজ্ঞা মিলে না। সে ছেলেদের পোশাক পড়ে, ধূমপান করে, ছেলেদের সাথেই মিশে। তাই এটা সেটা নিয়ে জয়িতার সাথে তার বাবা মার ঝামেলা লেগেই থাকে। কিন্তু এত কিছু সত্বেও জয়িতা অনেক পুরুষেরই স্বপ্নের নায়িকা। জয়িতা স্বপ্ন দেখে সমাজকে বদলে দেবার। তিন বন্ধুকে নিয়ে নেমে পড়ে যুদ্ধে, এভাবেই সে একসময় জড়িয়ে পড়ে রাজনীতির সাথে। সমাজপতিদের কৌশলের মারপ্যাঁচ, রাজনৈতিক গ্যাঁড়াকলে পড়ে জয়িতা শহর ছাড়তে বাধ্য হয়। তারপর ও থেমে থাকেনা তার যুদ্ধ। গ্রামে গিয়েও নানান জটিলতায় পরতে হয় জয়িতাকে। জীবনের সহজ সরল অংকগুলো জটিল মারপ্যাঁচে হারাতে চায় জয়িতাকে ।

৩৪। ‘তিথিডোর’ লেখক- বুদ্ধদেব বসু। সত্যেন, “তিথিডোর” উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র, সাধাসিধে রাজেনবাবুর কনিষ্ঠ কন্যা স্বাতীকে কবিগুরুর শেষযাত্রায় নিয়ে যেতেই ছুটে এসেছে জোড়াসাঁকো হতে টালিগঞ্জের স্বাতীদের বাড়িতে। অনবদ্য একটি মধ্যবিত্তের কাহিনী জুড়ে পাতায়-পাতায় চরিত্রদের সঙ্গে একাত্ম আঠা হয়েই বহুবার পঠিত এই বাইশে শ্রাবণের কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের ক্ষণটি যতবার পড়েছি ততবারই অদেখা মুহূর্তটি আশ্চর্য জীবন্ত দৃশ্যমান যেন বা!

৩৫। ‘দেশ বিদেশে’ লেখক- সৈয়দ মুজতবা আলী। “দেশে বিদেশে” মূলত একটি ভ্রমন কাহিনী নির্ভর রচনা। প্রকাশকাল – ১৯৪৮। সৈয়দ মুজতবা আলী’র লেখায় সাবলীল বর্ণনা থাকে, আর থাকে রসাত্মক উক্তি। তার লেখার প্রতিটি পরতে সূক্ষ্ম রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। উপযুক্ত শব্দচয়ন, প্রাঞ্জল ও রসাত্মক বর্ণনা এবং আফগানিস্থানে তার বিচিত্র অভিজ্ঞতা ‘দেশে বিদেশে’ বইটি-কে পাঠকপ্রিয় করেছে। কিছুদূর এগোলেই বোঝা যায় মুজতবা’র লেখায় বাঙলার কালচার ও সাহিত্যের সাথে মিশে গিয়েছে ইউরোপীয় নানা দেশের কালচার এবং সাহিত্য, আর তাতে উপযুক্ত অনুপাতে যোগ হয়েছে অভারতীয় প্রাচ্যদেশীয় বিষয়ও।

৩৬। ‘পঞ্চম পুরুষ’ লেখক- বাণি বসু। যোগাযোগটাই নাটকীয়। সেই কবেকার কলেজ জীবনের কিছু পাত্র-পাত্রীর আবার কুড়ি বছর বাদে দেখা হবে মহারাষ্ট্রে। কলকাতা থেকে বক্তৃতার কাজে এসেছেন অধ্যাপক মহানাম। অজন্তার টানে এসেছে মহানামেরই এক পুরনো ছাত্রী এশা।… পড়ুন এবং তারপর দেখবেন মন প্রান আনন্দে ভরে উঠবে।

৩৭। ‘মাধুকরী’ লেখক- বুদ্ধদেব গুহ। বইটির ছোটো একটি অংশ তুলে ধরছি, ”পৃথু ঘোষ চেয়েছিল, বড় বাঘের মতো বাচঁবে। বড় বাঘের যেমন হতে হয় না কারও উপর নির্ভরশীল না নারী, না সংসার, না গৃহ, না সমাজ সেভাবেই বাচঁবে সে, স্বরাট, স্বয়ম্ভর হয়ে। তার বন্ধু ছিল তথাকথিত সমাজের অপাংতেয়রা। পৃথু ঘোষ বিশ্বাস করত, এই পৃথিবীতে এক নতুন ধর্মের দিন সমাসন্ন। সে ধর্মে সমান মান-মর্যাদা এবং সুখ-স্বাধীনতা পাবে প্রতিটি নারী-পুরুষ।” “মাধুকরী” শুধু পৃথু ঘোষের বিচিত্র জীবঙ্কাহিনী নয়। “মাধুকরী” এই শতকের মানুষের জীবনের যাবতীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আগামী প্রজন্মের মানুষের সার্থক ভাবে বেঁচে থাকার ঠিকানা। এই কারণেই এ উপন্যাস উৎসর্গ করা হয়েছে ‘একবিংশ শতাব্দীর নারী ও পুরুষদের হাতে’।

৩৮। ‘হাজার চুরাশির মা’ লেখক- মহাশ্বেতা দেবী। উপন্যাসটি একটি লাশের গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত। মহাশ্বেতা দেবী একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক ও মানবাধিকার আন্দোলন কর্মী। তিনি ১৯২৬ সালে বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন । তিনি সাঁওতালসহ অন্যান্য আদিবাসীদের ওপর কাজ এবং লেখার জন্য বিখ্যাত । তাঁর লেখা শতাধিক বইয়ের মধ্যে হাজার চুরাশির মা অন্যতম।

৩৯। ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ লেখক- শিবরাম চক্রবর্তী। শুরুতেই শিবরাম বলে নিয়েছেন তাঁর শৈশব ছিল ঈশ্বর-পীড়িত । মা বাবা দুজনই অসাধারণ দুটি মানুষ কিন্তু তাঁর । পরে বুঝতে পারি তাঁর Bohemian জীবনের বীজ ওই বাবার বৈরাগী পদ্ব্রাজক ভাব, আর মার নিরাসক্ত আত্মশক্তির মধ্যেই বোধ হয় । চাঁচোলের এক রাজ-পরিবারেই তাঁর জন্ম — সম্পর্কের কাকা ছিলেন রাজা, কিন্তু রাজ-জোটক ছিল না তাঁর কপালে । বাবা ছোট বেলায় সংসার-ত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে ছিলেন, পরে এসে বিয়ে করেন তাঁর মা-কে । দুজনই সাদাসিধে মানুষ, গন্য মান্য ছিলেন, কিন্তু মনে হয় কোনো উন্নাসিকতার মধ্যে ছিলেন না । মা-ই ছিলেন শিব্রামের গুরু, বন্ধু, সবই । তাঁর কাছেই তিনি যা কিছু সার শিখেছেন । তার পর তার সঙ্গে জারিয়ে নিয়েছেন জীবনের অভিজ্ঞতা । শিব্রামের ভাষায়, পেলেই পড়ি, পড়লেই পাই !

৪০। ‘শাপ মোচন’ লেখক- ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়। একটা ঘটনা বলি- বাড়িতে পুরোনো কাগজের গাদা ছিল। কী মনে করে ঘাঁটতে গিয়ে একটি বই পেলাম। নাম শাপমোচন। লেখক ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়। এক দুই পাতা করে পড়তে লাগলাম। পড়া শেষে হাউমাউ করে কাঁদলাম। সেই থেকে বইয়ের জন্য মনটা কাঁদতে শুরু করল। এরপর যেখানে বই পাই, পড়ে ফেলি।

৪১। ‘সংশপ্তক’ লেখক- শহীদুল্লাহ কায়সার। সংশপ্তক শব্দের অর্থটি চমৎকার- হয় জয় না হয় মৃত্যু। ১৯৬৪ সালে রচিত এই উপন্যাসটি ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়। সংশপ্তক উপন্যাসের কাহিনির শুরু ইংরেজ আমলের অন্তিমকালে, শেষ পাকিস্তান আমলের সূচনাপর্বে ।কাহিনির অনেকখানি স্থাপিত পূর্ববঙ্গের গ্রামাঞ্চলে,খানিকটা কলকাতা ও ঢাকায়। এর বৃহত্তর পটভূমিতে আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ,মন্বন্তর ,পাকিস্তান আন্দোলন , সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ঘটনা। এতে প্রধান্য ভাল করেছে শাখা প্রশাখাসমেত এক সৈয়দ পরিবারের কথা। তার এক সৈয়দ প্রাচীন পন্থী নান সংস্কারের সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষা ও ইংরেজের চাকরি সমন্বিত করেছেন। আরেক সৈয়দ স্ত্রী-কন্যা ফেলে নিরুদ্দেশযাত্রা করে দরবেশ হয়েছেন। প্রথমোক্তজনের পুত্র জাহেদ আধুনিক শিক্ষা জীবন বোধ আয়ত্ত করে প্রথমে পাকিস্তান-আন্দোলন এবং বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রাচীনতার সঙ্গে তার ভয়াবহ দ্বন্দ্ব। কাহিনির শেষ হয় বাম রাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতার কারণে জাহেদের গ্রেফতারে এবং তার প্রতি রাবুর দেহাতীত প্রেমের স্থিতিতে।

৪২। ‘জীবন আমার বোন’ লেখক- মাহমুদুল হক। জীবন আমার বোন গ্রন্থের পেছনের প্রচ্ছদে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন-‘খুব বেশি নয় তার রচনার পরিমাণ কিন্তু মাহমুদুল হক যখনই লেখেন, লেখেন স্থায়ীভাবে, বারবার পড়তে হয় তার প্রতিটি বই, অসামান্য ভাষা শিল্পী তিনি। উপন্যাসে তিনি একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোর ছবি এঁকেছেন কাব্যের ভাষায়। ভিন্ন চোখে দেখে ঘটনার বর্ণনা করেছেন একান্তই নিজস্ব শৈল্পিক ভাষায়। অশরীরী উপন্যাসেও একাত্তরের কথা, পাক হানাদার ক্যাম্পে অম্বিয়ার করুণ যন্ত্রণা-পরিণতি পাঠকের কাছে দাঁড় করিয়েছেন।

৪৩। ‘উপনিবেশ’ লেখক- নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়। উপন্যাসটি তিন খন্ড।


৪৪। ‘অলীক মানুষ’ লেখক- সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ। এই উপন্যাস সম্পর্কে লেখক নিজেই বলেছেন- ‘অলীক মানুষ উপন্যাসটা লেখার পেছনে ছিল অগ্রজ গৌরকিশোর ঘোষের প্রণোদনা। মুসলিম জীবন নিয়ে এতকাল যা কিছু লিখেছি তার নির্যাস বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। নিরন্তর সংবাদ লিখতে লিখতে যখন আমার হাত বসে যাওয়ার দশা, ঠিক সে অবস্থায় আর কোনো কিছু না ভেবে আমার মাওলানা দাদা সম্পর্কে লিখতে শুরু করলাম। ফরায়েজি আন্দোলনের প্রবক্তা এই মানুষটি, গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়ানোটাই ছিল যাঁর কাজ, ‘আংরেজ হঠাও’ স্লোগান দেওয়া কট্টর মৌলবাদী এই পিতামহটি যে রসকষহীন ছিলেন তা নয়, নানা বৈপরীত্যে গড়া আশ্চর্য এক আকর্ষণীয় চরিত্র।

৪৫। ‘আমরা হেঁটেছি যারা’ লেখক- ইমতিয়ার শামীম। ইমতিয়ার শামীম স্পষ্টতই একই সঙ্গে গল্প ও উপন্যাস-লেখক, তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ডানকাটা হিমের ভেতর ও গল্পগ্রন্থ শীতঘুমে একজীবন একই বৎসর প্রকাশিত হয়েছিল। এই শীতঘুমে…-র গদ্যে যে-কাব্যময়তা ছিল তার থেকেও তিনি সরে এসেছেন অনেক। তার লেখায় আগের মতোই রাজনীতি উপস্থিত কিন্তু তা কোনওভাবেই কাহিনিকে নিয়ন্ত্রণ করে না বরং অনেক বেশি অন্তঃস্রোতে এই আবহ ধরা পড়ে। তাঁর উপন্যাস আমার হেঁটেছি যারা এবং গল্পগ্রন্থ গ্রামায়নের ইতিকথা তার পূর্বেকার রচনা থেকে আলাদা করে তুলেছে। বিষয় ও আঙ্গিকের দিক দিয়ে এটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগ্রন্থ।

৪৬। ‘আমি তপু’, ‘আকাশ বাড়িয়ে দাও’ এবং ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ লেখক- মুহম্মদ গাফর ইকবাল। “আমি তপু” মুহাম্মদ জাফর ইকবালের এক অনন্য কিশোর উপন্যাস। এই উপন্যাসে লেখক মানুষের এমন বয়সের এমন এক পরিস্থিতির করেছেন যেই বয়সে যেই পরিস্থিতিতে আমরা কেউ পড়লে কি ঘটবে আমাদের জীবনে তা এই বই পড়লে সহজেই উপলব্ধি করা যায়। জাফর ইকবালের সেরা কিশোর উপন্যাসের মধ্যে এই উপন্যাস নিঃসন্দেহে অন্যতম। একজন মানুষ সে বড় হোক কিংবা ছোট, তার জন্য একটা পরিবার যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা এই গল্প পড়লে অনুধাবন করা যায়। সেই সাথে বোঝা যায়, প্রতিভার বীজ লুকিয়ে থাকে সবার মাঝে, প্রয়োজন অঙ্কুরোদ্গমের পরিবেশ।আর প্রত্যেক খারাপ মানুষের জীবনে থাকে এক ভয়ংকর খারাপ ইতিহাস। কেউ খারাপ হয়ে জন্মায় না।

‘আকাশ বাড়িয়ে দাও’ শুধু বলব, বইটা পড়ুন। তারপর আপনি বলুন।

‘আমার বন্ধু রাশেদ’ সম্পর্কে লেখক বলেছেন- ‘আসলে আমার বন্ধু রাশেদের ঘটনাগুলো ১৯৭১-এ দেশের সবখানেই ঘটেছে। আমাদের দেশের কিশোরেরাও কিন্তু অসম্ভব সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। সেদিক থেকে বলতে গেলে ঘটনাগুলো সবই সত্যি। কিন্তু যে চরিত্রগুলোর কথা আমি বইয়ে লিখেছি, তারা সবাই কাল্পনিক।’

৪৭। ‘ক্রাচের কর্নেল’ লেখক- শাহাদুত জামান। লেখক শাহাদুজ্জামান’র টান টান উত্তেজনায় ভরা ‘ক্র্যাচের কর্নেল’ বইটিকে শুধুমাত্র একটি উপন্যাস বললে কম বলা হবে। কারন, এই অসাধারণ বইটি পড়লেই বুঝা যায় লেখক অনেক সময় নিয়ে, অনেক গবেষণার পর এই বইটি লিখেছেন। তার লেখনি ক্ষমতার গুণে এই বইটি একটি সাধারণ উপন্যাস থেকে কর্নেল তাহের-এর অসাধারণ জীবনী হয়ে উঠে। যারাই এই বইটি পড়বেন, তাদের কেউই যে বইটি শেষ না করে উঠতে পারবেন না এ ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া যায়।

৪৮। ‘ফুল বউ’ লেখক- আবুল বাশার। সম্পর্ক, সমাজ এবং ধর্ম নিয়ে চমৎকার উপন্যাস।

৪৯। ‘কৃতদাসের হাসি’ লেখক- শওকত ওসমান। সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতন এবং রাজনীতির অন্ধকার দিক লেখক সহজ সরল সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

৫০। ‘নিশি কুটুম্ব’ লেখক মনোজ বসু। মনোজ বসুর বই গুলর মধ্যে একটা আলাদা বন, জঙ্গলএর গান্ধ পাওয়া যায়।

৫১। ‘উত্তর পুরুষ’ লেখক- রিজিয়া রহমান। রিজিয়া রহমানের কোন বই পড়ি নাই আগে। আর মহিলা রাইটার বলে খুব একটা উৎসাহও ছিল না পড়ার। অসাধারণ বই এই “উত্তর পুরুষ”! আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির এ্যাসেট। উপন্যাসের শুরুতেই বঙ্গোপসাগরকে যে উপমায় বাঁধেন লেখিকা তা পড়ে তার আঙুল ছুঁয়ে আসতে ইচ্ছে করে। সারাটা উপন্যাসে উপমার সার্থক ব্যবহার পাঠককে যেমন সম্মোহিত করে তেমনি উপন্যাসটিকে করে তুলে অনেক বেশি বাঙ্ময়।

৫২। ‘কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ’ লেখক- সুস্মিতা বন্দোপাধ্যায়। এ উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে আফগানিস্তানে তালেবানদের সাথে রাব্বানির যুদ্ধকালীন সময়ে ধর্মের নামে কায়েম হওয়া সন্ত্রাসের রাজত্ব, মেয়েদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে অন্ধাকারে পাঠিয়ে দেয়া, কোরআন শরীফের মনগড়া অপবেখ্যা, সংকীর্ণতা এবং সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে। বাস্তবতা হলো লেখিকা তাঁর ”কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ” উপন্যাসে নিজের জীবনের কাহিনী তুলে ধরেছেন। কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ” এর কাহিনীর সংক্ষিপ্ত রুপ হচ্ছে, কলকাতার ব্রাক্ষ্মন পরিবারের একটি মেয়ে বিয়ে করে আফগাস্তানের কাবুলের গজনি এলাকার এক মুসলিম যুবককে। স্বামীর সাথেই পাড়ি জমান শ্বশুর বাড়ি আফগানিস্তান। সেখানে যাওয়ার পর ওই বাঙালি বউয়ের উপলব্দিতে হলো এরা শুধু ধর্মান্ধ নয়, এদের মানসিকতাও রুচিহীন। পরদেশী একজন বাঙালি নারীকে ছেলের বউ হিসাবে তারা কিভাবে গ্রহন করলো, তাদের দর্শন, তাদের দেশে নারীর মর্যাদা, পারিবারিক সম্পর্ক, দাম্পত্য জীবনসহ খুটিনাটি নানা বিষয় গল্পে গল্পে তুলে ধরা হয়েছে উপন্যাসে।

৫৩। ‘পথের পাঁচালি’ লেখক- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। উপন্যাসের গল্প এ রকম- “গ্রাম্য গরীব একটি পরিবারের সুখ দুঃখের মাঝে দুটি চঞ্চল শিশুর বেড়ে ওঠা । নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান অপু ও দূর্গা । বাবা হরিহর রায়, মা সর্বজয়া, আর অপু-দূর্গার বৃদ্ধা ফুফু ইন্দিরা ঠাকুরকে নিয়ে পরিবারটির সদস্য সংখ্যা পাঁচ । হরিহরের পেশা পুরোহীতগিরী করা । সামান্য আয় । কোন রকমে সংসার চলে । টানাটানির সংসারে বিধবা বোন ইন্দিরা ঠাকুর বাড়তি বোঝা । হরিহর কিছু না বললেও স্ত্রী সর্বজয়ার সাথে প্রায়ই ছোটখাট ঝগড়া হয়ে যায় । অপু বড় বোন দূর্গার সাথে বনে বাঁদাড়ে ঘুরে বেড়ায় । মিষ্টিওয়ালা, বায়োস্কোপ, আর ট্রেনের পিছনে ছুটতে ছুটতেই দিন কেটে যায় । সংসার, দারিদ্রতা কোন কিছুরই চিন্তা নেই ওদের । এদিকে অপু, দূর্গা খেলতে গিয়ে হঠাৎ একদিন বনের মধ্যে বৃদ্ধা ইন্দিরা ঠাকুরকে মৃত আবিস্কার করে। মর্মান্তিক দৃশ্য । বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরে আক্রান্ত হয় দূর্গা । চিকিৎসার অভাবে বাড়তে থাকে জ্বর। গভীর রাত । বাইরে প্রচন্ড ঝড়-বাতাস । ঘরদোর উড়িয়ে নেয়ার পালা । সেই রাতেই দূর্গা মারা যায় । হরিহর ফিরে আসে তারও কিছুদিন পর । সবার জন্য অনেক কিছু কিনে এনেছে । শাড়ি হাতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সর্বজয়া ।বুঝতে বাকি থাকে না হরিহরের । পাথরের মত নিশ্চল হয়ে যায় । ছবির সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য অবলোকন করে দর্শক । এত কষ্ট! এত সংগ্রাম! তবু পিছু ছাড়ে না দারিদ্র । সব ছেড়েছুড়ে হরিহর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গরুর গাড়িতে চড়ে অজানার উদ্দেশ্যে ……..।

৫৪। ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ লেখক- নীলিমা ইব্রাহীম। খুব সহজ ভাষায় সাতটি মেয়ের বীরত্বের কাহিনী এতে লেখা আছে। একশো ষাট পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে খুব বেশী সময় লাগার কথা নয়। জীবন যুদ্ধে যারা শত কষ্টের মাঝেও হেরে যায় নি শুধু তাদের গল্প দিয়েই বইটি সাজিয়েছেন লেখিকা। আমরা যারা সহজে হতাশ হই, হাল ছেড়ে দেই, নৈরাশ্যের অন্ধকারে হারিয়ে যেয়ে মুক্তি খুঁজি তারা যেনো যুদ্ধ করার, লড়ার মনোবল রাখি।

৫৫। ‘পুত্র পিতাকে’ লেখক- চানক্য সেন। ‘পুত্র পিতাকে’ উপন্যাসে পুত্র পিতাকে লিখে, ‘তোমরা আমাদের সরিয়ে দাও, দূরে রেখে দাও, তোমাদের বড়দের দুনিয়ার বাইরে, কেননা সে নিষিদ্ধ দুনিয়া মিথ্যা, অর্থ-মিথ্যা, চাতুরি-চালাকি, পারস্পরিক প্রবঞ্চনা প্রতারণার ধনদৌলত ভরা তোমাদের দুনিয়া আমদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে তোমরা কী চেষ্টাই না করো। অথচ, বাবা, তোমরা জান না যে আমরা তোমাদের অনেক কিছুই জেনে ফেলি, দেখে ফেলি, শুনে ফেলি। আমাদের হিসাব গোড়া থেকেই গোলমাল হয়ে যায়’ (পৃষ্ঠা-১২, সপ্তম সংস্করণ, প্রকাশ ভবন প্রকাশনী, কলকাতা)

৫৬। ‘দোজখনামা’ লেখক-রবিশংকর বল। রবিশংকর এর জন্ম ১৯৬২। বিজ্ঞানের স্নাতক। একটা বাংলা দৈনিকের সাংবাদিক। বাংলা ভাষার প্রথম সারির কথা সাহিত্যিক। ২০১১ সালে “দোজখনামা” উপন্যাসের জন্য বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন।

৫৭। ‘যদ্যপি আমার গুরু’ লেখক- আহমদ ছফা। যদ্যপি আমার গুরু গ্রন্থটি আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে সব্যসাচী লেখক অহমদ ছফার একটি গভীর ও সরস রচনা। দীর্ঘদিনের সান্নিধ্যের কারণে ব্যক্তিগত দূর্বলতা থেকে অধ্যাপক রাজ্জাক হয়তো লেখকের বিশেষ কিছু অনুভূতি দখল করেছেন তবে তাঁর প্রতি দেশ ও বিদেশের অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তির শ্রদ্ধার বর্হিপ্রকাশই প্রমান করে, তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন কি;বদন্তী। অধ্যাপক রাজ্জাককে নিয়ে রচিত এই গ্রন্থটিতে সেই সময়ের সমাজ, সমকালীন বিশ্ব ও রাজনীতির যে বিষয়গুলো উম্মোচিত হয়েছে তা এক কথায় অসাধারণ একটি সামাজিক দলিল। ইতিহাসের সহজ প্রকাশ।

৫৮। ‘চতুষ্পাঠী’ লেখক-স্বপ্নময় চক্রবর্তী। প্রথম উপন্যাস ‘চতুষ্পাঠী’ প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পূজা সংখ্যায় (১৯৯২) । প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশিষ্ট লেখকররূপে চিন্হিত হয়েছিলেন।

৫৯। ‘নামগন্ধ’ লেখক- মলয় রায়চৌধুরী। ঠাস বুনন, অভিনব বর্ণনা এবং নানা জনের অজানা হরেক তথ্যা ভরা নামগন্ধ নামের নাতবৃহৎ উপন্যাসটি স্রেফ ভিন্ন নয়, বিশিষ্ট মেজাজের, যা সদ্য-অতীত জটিল সময়ের এক বিচিত্র অভিলেখ। ‘নামগন্ধ’ সাহিত্যের বাজারি বিপণনে বিমোহিত বহু পাঠাকের কাছেও সুপাঠ্য এক অনন্য উপহার।

৬০। ‘বিষাদবৃক্ষ’ লেখক- মিহির সেনগুপ্ত। উপন্যাসটিতে হিন্দু মুসলিম সমস্যাটাই শুধু আসেনি, এসেছে দেশ ভাগ, তার ইতিহাস, তৎকালীন রাজনৈতিক সামাজিক মনস্তত্ব, জীবনসংগ্রাম, পাশাপাশি স্বপ্ন দ্রষ্টা কিছূ মানুষের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা, মোট কথা, একটি ভুখন্ডের ইতিহাস।

৬১। ‘অলৌকিক নয়,লৌকিক’ লেখক- প্রবীর ঘোষ। আপনাদের অনুরোধ করবো- আপনারা অবশ্যই- অলৌকিক নয় লৌকিক ১ম-৫ম খন্ড পড়বেন ।আমি জোর দিয়ে বলতে পারি বইগুলো পড়ে আপনি যা পাবেন তা হয়ত সারা জীবনেও পাবেননা এবং আমার কথা সারা জীবন মনে রাখা লাগবে । বইগুলো পড়লে ৯৯% অলৌকিক বিশ্বাস দূর হয়ে যাবে ।

৬২। জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্র। সাহিত্যের আলোচনায়, অথবা যে-কোনো শিল্পের ক্ষেত্রে শিল্পীর জীবনী জানবার প্রয়োজন আছে কি না তাই নিয়ে গত শতকে তর্ক তুলেছিলেন প্রকরণবাদী সাহিত্য-ভাবুকেরা। আমি আপনাদের অনুরোধ করবো, কবিতা সমগ্র পড়ার আগে- জীবনানন্দ দাশ এর জীবনী ভাল করে পরে নিবেন।

৬৩। ‘চরবিনাশকাল’- আবু বকর সিদ্দিকের ছোটগল্প। অথবা এটা ভাল না লাগলে রশীদ কবিমের ‘ মায়ের কাছে যাচ্ছি” পড়ে দেখতে পারেন।

৬৪। ‘গল্পমালা’ লেখক- উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। গ্রহ-নক্ষত্রের কথা, পশুপাখি ও গাছপালার কথা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা, রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণের গল্প, দেশ-বিদেশের নতুন ও পুরোনো কাহিনি, ইতিহাস ও ভূগোল, ছড়া-কবিতা-গান ইত্যাদি রচনা করেছেন। নিজের বইয়ের ছবি নিজেই আঁকতেন। স্কুলজীবনেই ছবি আঁকায় দক্ষতা অর্জন করেন। কলেজে পড়াকালে শেখেন ফটোগ্রাফি। গান-বাজনায়ও আগ্রহ ছিল।

৬৫। ‘নিমন্ত্রন’ লেখক- তসলিমা নাসরিন। নিমন্ত্রন পড়ে তো আমি হতবাক!!! মেয়েরা সুদর্শন ছেলে দেখে প্রেমে পড়ে এবং সেই ছেলের দ্বারা প্রতারিত হয়ে তার বন্ধু-বান্ধব‘দের দ্বারা ধর্ষিত হয়। এই লেখিকার বই পড়ার আগে তার জীবনী ভাল করে পরে নিবেন। তসলিমা নাসরিন নিজেই নিজের সম্পর্কে সহজ সরল ভাষায় লিখেছেন। খুবই সাহসী মহিলা। আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। আমার ক্ষমতা থাকলে আমি তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনতাম।

৬৬। ‘প্রথম প্রতিশ্রুত’, ‘সুবর্নলতা’ ও ‘বকুল কথা’ লেখক- আশাপূর্না দেবী। প্রথম প্রতিশ্রুতি বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি লেখিকা আশাপূর্ণা দেবীর একটি বিখ্যাত উপন্যাস। এই উপন্যাসের জন্য তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন । পরবর্তী কালে এই উপন্যাসটি অবলম্বনে একটি বাংলা সিনেমাও তৈরি হয় । এটি একটি উপন্যাস ত্রয়ীর প্রথম উপন্যাস । পরবর্তী দুটি উপন্যাসের নাম হল সুবর্ণলতা এবং বকুলকথা।

সত্যবতী – সুবর্ণলতা – বকুল : তিন প্রজন্ম। সত্যবতীর অগ্নিসম বিদ্রোহিনী রূপ থেকে যাত্রা শুরু করে সুবর্ণলতার চাপা আকাঙ্ক্ষার পথ ধরে বকুলের সময়ে সনাতনী যুগের অবসান প্রাঙ্গনে এসে সমাপ্ত আশাপূর্ণা দেবীর এই ট্রিলজি উপন্যাস। এত অপূর্ব লেখা, শেষ হওয়ার পরেও কিছুক্ষণ বইটা হাতে নিয়ে বসে ছিলাম। শেষ হয়েও শেষ না হওয়ার এক অবর্ণনীয় অনুভূতি রেখে গেলো।


৬৭। ‘ফেলুদা সমগ্র’ লেখক- সত্যজিৎ রায়। ফেলুদা সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসের সন্দেশ পত্রিকায় ফেলুদা সিরিজের প্রথম গল্প “ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি” প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত এই সিরিজের মোট ৩৫টি সম্পূর্ণ ও চারটি অসম্পূর্ণ গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। ফেলুদার প্রধান সহকারী তাঁর খুড়তুতো ভাই তপেশরঞ্জন মিত্র ওরফে তোপসে ও লেখক লালমোহন গাঙ্গুলি (ছদ্মনাম জটায়ু)।

৬৮। ‘কুবের সাধু খাঁর বিষয় আশয়’ লেখক- শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। ‘এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস’ এবং ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ উপন্যাস দুটির কাঠামোও প্রায় একই রকম। উপন্যাস দুটির ঘটনা একটানা বর্ণিত হয়নি। বরং দুটি উপন্যাসেই চরিত্রগুলো, নায়ককে সামনে রেখে নানা পর্ববিভক্ত হয়ে মূল কাহিনীকে টেনে নিয়ে গেছে।

৬৯। ‘বসুধারা’ লেখক-তিলোত্তমা মজুমদার। লেখক ‘বসুধারা’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার। এই উপন্যাসে পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলনের পরবর্তী সময়ের ছবি দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। আমি বিশ্বাস করি, পাঠকের মননকে সমৃদ্ধি দান করবে এই বই।

৭০। ‘দুচাকায় দুনিয়া’ লেখক- বিমল মুখার্জী। ভূ-পর্যটক বিমল মুখার্জীর সাইকেলে চড়ে বিশ্ব-ভ্রমণের অমর আখ্যান। ২৩ বছরের ভারতীয় এক তরুন ১৯২৬ সালে একটা সাইকেল আর সামান্য কিছু টাকা নিয়ে পৃথিবী ভ্রমণে বেড়িয়ে পরেন। পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করে ভারত ফিরে আসেন ১৯৩৭ সালে। পথে কত রহস্য কত রোমাঞ্চ, এমনকি তরুন হিটলারের সাথে দেখা পর্যন্ত। সে সব শুনুন তারই বয়ানে।

৭১। ‘কলকাতার কাছেই’, ‘পৌষ ফাগুনের পালা’ এবং ‘উপকন্ঠ’ লেখক- গজেন্দ্র কুমার মিত্র। এই তিনটি খন্ড আমার অনেক বেশি প্রিয়। আসলে এটি ত্রিপিটক উপন্যাস, খাস ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ট্রিলজি’। একটা কিনলে বা পড়লে পরবর্তী বাকী দু’টির জন্য হাঁসফাস করবেন! একেকটি বই যেন একেকটি নেশা। পৌষ ফাগুনের পালা শেষেরটি পড়ার পরেও দুঃখ হয় তারপর কি …।

কথাসাহিত্যিক গজেন্দ্র কুমার মিত্রের সর্বোত্তম সাহিত্যসৃষ্টি। উনবিংশ শতাবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরু -এই রকম সময়ের পটভূমিতে এই ট্রিলজি কাহিনীর সূত্রপাত। কুলীন ব্রাহ্মণের বিধবা পত্নী রাসমণি ও তার তিনি কন্যার জীবন নিয়ে এই উপন্যাস-ত্রয়ীর কাহিনী শুরু। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মধ্যমা শ্যামাকে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে, তবু রাসমণির তিন কন্যার ক্রমবর্ধমান পরিবারের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার নরনারী বিভিন্ন ঘটনাসূত্রে কাহিনীতে অসাধারণ বৈচিত্রের সৃষ্টি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কাহিনীর অখন্ডতা লাভ করেছে। সংস্কারে সংস্কৃতিতে উন্নত অথবা নিদারুণ দারিদ্র ক্লিষ্ট মধ্যবিত্ত সমাজের এই সব মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থ-সংকীর্ণতা, আশা-নিরাশা, ছোট বড়, সুখ দুঃখ. বিপদ আপদ সবকিছুর মধ্যদিয়েও তাদের অপরাজেয় জীবনাকোঙ্ক্ষার এবং জীবনযুদ্ধের এক নিটোল অনবদ্য কাহিনী শুনিয়েছেন লেখক যা আমরা আগে শুনিনি, আজকাল শোনা যায় না, অদূর ভবিষ্যতে শুনব কিনা সন্দেহ।

অনেকেই হয়তো গজেন্দ্র মিত্রকে সেভাবে জানেন না। পড়ুন এবং তারপর জানবেন।

৭২। ‘আমার প্রিয় ভৌতিক গল্প’- হুমায়ূন আহমেদ সম্পাদিত। মোট চব্বিশটি গল্প আছে। দারুন সব গল্প, ভূতের গল্প। জনপ্রিয় সব লেখকদের- চমৎকার সব গল্প। পড়ুন। আমার বিশ্বাস আপনাদের অনেক ভাল লাগবে।

৭৩। ‘অসাধু সিদ্ধার্থ’ লেখক- জগদীশ গুপ্ত। উপন্যাসের নটবর দলছুট চরিত্র। সে ‘লঘু-গুরুর’ বিশ্বম্ভর কিংবা পরিতোষের মতো ‘স্বভাবসিদ্ধ ইতর’ বা ‘কোমরবাঁধা শয়তান’ নয়; শয়তানিতে তার দক্ষতা প্রশ্নাতীত, কিন্তু উপন্যাসের আখ্যানে এটি অতীত, তার মানুষ আর প্রেমিক হয়ে ওঠার সাধনাটুকুই তার সপ্রাণ বর্তমান। এই বর্তমানটুকু মনে রাখলে তার বাইরের এবং ভেতরের মানুষটিকে চেনা যায় সহজেই। তার পরিণতির বেদনাটুকুও বোঝা যায়।

জগদীশ গুপ্তের উপন্যাসে সব সময়ই দ্রুত ঘটে যায় সব ঘটনা।

৭৪। ‘সেয়ানা’ লেখক- সত্যেন সেন। সত্যেন সেন জেল প্রকোষ্ঠে বসেও তিনি লিখেছেন নিরন্তর। এক সময় জেলখানায় পত্রিকা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে বাইরের খবর তিনি জানতেই পারতেন না। তখন সময় কাটবে কি করে ? এটা ব্রিটিশ যুগের কথা। ও সময় অবশ্য পত্রিকা বন্ধ করে বাইবেল দেয়া শুরু হলো। তাতেই সন্তুষ্ট হলেন সত্যেন সেন। তিনি বইবেলের কাহিনী নিয়ে লিখলেন দু”খানা উপন্যাস- অভিশপ্ত নগরী ও পাপের সন্তান।

সেয়ানা নামের উপন্যাসটির নায়ক জেল খানারই হয়তো কেউ। তিনি লিখতেন একদম ভেতর থেকে। তাই তার লেখা মানুষকে স্পর্শ না করে পারে না। সত্যেন দা” জেলে বসেও উবু হয়ে নিরন্তর লিখে চলতেন। জেলখানায় তো চেয়ার টেবিল ছিলো না, তাতে সত্যেনদার কিছু যেত আসতো না। সিমেন্টের ফ্লোরে দিনের পর দিন উবু হয়ে বসে লিখতে লিখতে তার কনুইয়ের চমড়া ইস্পাতের মতো হয়ে গিয়েছিলো।

৭৫। কাশবনের কন্যা’ লেখক- শামসুদ্দীন আবুল কালাম। শামসুদ্দীন আবুল কালামের দু’টি উপন্যাস সম্পর্কে হাসান আজিজুল হকের মন্তব্য। তিনি লিখেছেন, “… শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘কাশবনের কন্যা’ এবং ‘কাঞ্চনমালা’য় সমসাময়িক রাজনীতির কোনো ছাপ নেই… সময়ের কোনো বোধ নেই… ‘কাশবনের কন্যা’ ও ‘কাঞ্চনমালা’য় নরনারীর প্রেমই তো আসল বিষয়। তবু বলতে হয়, শামসুদ্দীন আবুল কালাম একটি স্থূল ও পুরুষ্টু কাহিনী ছাড়া আর কিছুই আমাদের দেন না। বরিশাল অঞ্চলের গ্রামজীবনকে কেন্দ্র করে ‘কাশবনের কন্যা’ উপন্যাসটি যেভাবে এগিয়ে চলে তা পাঁচশো বছর আগেকার গ্রাম হতে পারতো এবং যে-কোনো গ্রাম্য পুঁথির বিবরণ হলে তাতে কোনো বাধা ছিলো না। আধুনিক বাংলা উপন্যাসের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে উপন্যাস দুটি যে কাহিনী আমাদের উপহার দেয়, তার মধ্যে চিরায়ত বাংলাদেশের কোনো সত্যও ধরা পড়ে না। শ্লথ গদ্যে লেখা এই কাহিনী দুটিতে এক ধরনের আন্তরিকতা ছাড়া আর কিছু তেমন ধরা পড়ে না।…”

৭৬। ‘জলরাক্ষস’ লেখক- আবুবকর সিদ্দিক। লেখক আবু বকর সিদ্দিকীর ”জলরাক্ষস” বইটি প্রকাশিত হবার পর এরশাদের সামরিক-শাহী লেখকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। লেখককে সংক্ষিপ্ত বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তার প্রায় বিশ বছর পর এই লেখকেরই কন্যা বিদিশা সেই বিশ্ববেহায়ার অঙ্কশায়িনী হয়েছে। চেতনা বোধহয় প্রজন্মান্তরে বাধাহীনভাবে প্রবাহিত হয় না। নয়ত পিতাকে নির্যাতন আর অপমানকারীকে আলিঙ্গন করতে কন্যার বাধে না কেন?

আবুবকর সিদ্দিক কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে কট্টর বস্তুবাদী, সমাজনিষ্ঠ শিল্পী। আর বামপন্থী রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে জীবনকে সমীক্ষা করার একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতা এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয়। জীবনের একটা প্রধান সময় তাঁর অতিবাহিত হয়েছে বাম চিন্তাদর্শের ঘনিষ্ঠ সানি্নধ্যে। সেখান থেকে যে গভীর অভিজ্ঞতা ও প্রেরণার শাঁস তুলে এনেছেন তা যেমন বাস্তববাদী, তেমনি অকৃত্রিম।

৭৭। ‘বিলোরিস’ লেখক- অঞ্জলি লাহিড়ী। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন কমিউনিষ্ট বিপ্লবী। তেভাগা আন্দোলনের সক্রীয় কর্মী। বাংলা দেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও অসম মেঘালয়ে সক্রীয় স্বেচ্ছাসেবী, জীবনের পঞ্চাশ বছর পার করে লিখতে শুরু করেন অঞ্জলি লাহিড়ি। ক্রমেই অসমের বাংলা সাহিত্যের অভিবাবক স্বরূপা হয়ে উঠেন। নিজে অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য ছিলেন যখন বিয়ে করেছিলেন তখনকার আর সি পি আই দলের আরেক কর্মী প্রয়াত নিরেন লাহিড়িকে।

৭৮। ‘বাওয়ালী উপাখ্যান’ লেখক- হুমায়ূন রহমান। নাম কি তোমার?

করিম বাওয়ালী।- ভয়ার্তকন্ঠ বাওয়ালীর

কুঠির খাতায় নাম লিখিয়েছিলে?-সক্রোধ দৃষ্টি রেনী সাহেবের।

না হুজুর!

আর কোন প্রশ্ন করার প্রয়োজন মনে করলো না রেনী সাহেব, শপাং শপাং চাবুকের আঘাতে ককিয়ে উঠলেন করিম বাওয়ালি, মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।

বাবার এই অবস্থা দেখে গোলপাতার আড়ালে আর লুকিয়ে থাকতে পারলোনা কিশোরী কমল। সুন্দরবনের বাঘের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে বর্শাটা সে সাথে রাখতো সবসময়ে, সেটাই সর্বশক্তি দিয়ে আকড়ে ধরে লাফিয়ে এসে পরলো রেনীর সামনে। এই আতর্কিত হামলার জন্য রেনী প্রস্তুত ছিল না, কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই কমল বর্শাটা ছুড়ে দিল রেনীর বুকের দিকে লক্ষ করে। তবে রেনী ভাগ্যভাল যে সেটা বুকে না লেগে বাহুতে লাগলো, যন্ত্রনায় চিৎকার করে উঠলো সে।

অতো কিছু খেয়াল করার সময় নেই কমলের; সে তার বাবা দুজনে মিলে রেনীর চাবুকটা দিয়েই পেচিয়ে তাকে বেধে রেখে তার ঘোড়ায় করে গহীন অরন্যের দিকে হারিয়ে গেলেন।

তারপর? … বইটা পড়ুন। পুরান বইয়ের দোকানে গিয়ে দেখুন বইটা খুঁজে পান কিনা।

৭৯। ‘মোহিনীর থান’ লেখক- নাসিমা আনিস। কবি ও সাহিত্যিকদের কলমে আরেক উপেক্ষিত হচ্ছে হিজড়া সম্প্রদায়। তাদের সুখ-দুঃখ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাননি; ব্যতিক্রম নাসিমা আনিসের সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘মোহিনীর থান’।

৮০। ‘কুহেলিকা’ ও ‘মুত্যুক্ষুধা’ লেখক- কাজী নজরুল ইসলাম। “কুহেলিকা” নজরুলের শ্রেষ্ট একটি সৃষ্টি। এই উপন্যাস পাঠকদের মন ছুঁয়ে যাবে। কুহেলিকা’র মূল চরিত্র “জাহাঙ্গির” পার্শ্ব চরিত্র আরো আছে। তবে আমাকে ভবিয়েছে জাহাঙ্গিরের জন্ম সংক্রান্ত বিদ্রোহের বর্ণনা। বন্ধু হারুণের সাথে হারুণের বাড়ীর দিকে যাত্রা। হারুণের পাগলী মায়ের অদ্ভুত আচরণ। তাঁর অন্ধ পিতা, খোন্দকার সাহেব সহ তাঁর দুই বোনের চরিত্র, সাথে উপন্যাসের সংলাপ গুলো গভীর মনস্তাত্বি ভাব বহন করে।

মৃত্যুক্ষুধা প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তীকালের রচনা। এ উপন্যাসের ভাষা একান্তই নজরুলীয় বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ। তিনি চরিত্রের স্বাভাবিকতার স্বার্থে যার যার মুখে যে সংলাপ প্রযোজ্য তাই রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। উপন্যাসের প্রথমাংশ কৃষ্ণনগরে এবং শেষাংশ কলকাতায় রচিত। কৃষ্ণনগরে অবস্থানকালে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট এবং দুঃসাধ্য কৃচ্ছ্রসাধন ছিল নজরুলের নিত্য জীবনযাত্রার অঙ্গ। তাই দারিদ্রের চিত্র, সাম্য ও বিপ্লবীচেতনা এ উপন্যাসের রূপকল্পের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত।

৮১। ‘কারাগারে রাত দিন’ লেখক- জয়নাব আল গাজালী। একটি ইসলামী আন্দোলন কি পরিমান জুলুম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ধৈর্য্য ও বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় সেই অবিস্মরণীয় সত্য ঘটনা জানতে বইটি পড়ুন।

৮২। মন প্রকৌশল স্বপ্ন অনুপ্রেরণা আর জীবন গড়ার ফরমুলা – রাগিব হাসান । বইটা পড়ে এক ধরনের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। এতে স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে, ঘুরে দাঁড়ানো মানুষদের কথা বলা হয়েছে। অসংখ্য উদাহরণ দেয়া হয়েছে, অসংখ্য গল্প বলা হয়েছে।

আমাদের তরুণদের কিছু বাঁধাধরা সমস্যা আছে সেই সমস্যাগুলোর কথা বলা আছে। হতাশ হয়ে যাওয়া সেই তরুণদের কেউ না কেউ নিশ্চয়ই এই বইটা পড়ে এক ধরনের শক্তি পাবে, এক ধরনের সাহস পাবে, নিজের ভেতর অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে।

৮৩। আরজ আলি মাতুব্বর এর রচনাসমগ্র- প্রথাবিরোধী ধর্মদর্শনের প্রাচীন ধারাবাহিকতার বাংলাদেশী রূপকার হলেন আরজ আলি মাতুব্বর। তিনি মনে করতেন পশু যেমন সামান্য জ্ঞান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে ধর্মবাদী ব্যক্তিগণও তেমনি সামান্য জ্ঞান নিয়েই জীবন কাটিয়ে দেয়। মেধার বিকাশ, মুক্তচিন্তা, মুক্তজ্ঞান, বিজ্ঞান চেতনা ইত্যাদি মুক্তবৌদ্ধিক মনোভঙ্গির বিপক্ষে ধর্মপ্রবণ ব্যক্তিগণ দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। তাই ধর্ম অনেকাংশেই মানুষের মানবিক বিকাশকে সমর্থন করে না; মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা, উদারতা, সহানুভূতিশীলতা, মানবিকতা প্রভৃতির প্রসার-প্রচারকে অনেকাংশেই সীমিত করে তোলে। তিনি জানেন সমাজের যথার্থ মুক্তি ঘটে একমাত্র বস্তুবাদী দর্শনের চর্চাতেই। নিজের প্রান্তিক জীবনের সাধারণ কয়েকটি ঘটনাতেই তিনি বুঝে নিয়েছেন তার ও তার সমাজের আচরিত ধর্মের স্বরূপ। ক্রমাগত গ্রন্থ পাঠে বুঝে নিয়েছেন এর কারণাবলী। এই অন্ধকারাচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। তাই তিনি অনবরত প্রশ্নবাণে দগ্ধ করেছেন তথাকথিত সমাজপিতা ও তাদের আচরিত-প্রচারিত ধর্ম ও দর্শনকে।

৮৪। ‘বিবর্তনের পথ ধরে’ লেখক- বন্যা আহমেদ। বিবর্তন নিয়ে বাংলা ভাষায় এখন পর্যন্ত রচিত নিঃসন্দেহে সবচেয়ে শক্তিশালী বই এটি। না পড়লে চোখ বুজে বলে দেয়া যায় আপনি ঠকলেন।

৮৫। ‘যে গল্পের শেষ নেই’ লেখক- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। “যে গল্পের শেষ নেই” বইটি ১৯৫১ সালে প্রকাশিত হয়। প্রাক মানুষ, মানুষ, পরিবার, সমজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব রাজনীতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিস্তর মোটা মোটা বই লেখা হয়েছে, রয়েছে অতি মূল্যবান রেফারেন্স বই কিংবা এনসাইক্লোপেডিয়া। কিন্তু এই বইটিতে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়েছে শুন্য থেকে শুরু করে মানুষের উদ্ভব এবং আজকের সমাজ ব্যবস্থা পর্যন্তসকল বৈশিষ্টকে। এই বইটিতে দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। একেবারে গল্পের মত করে শুধুই মানুষের কথা বইটির প্রতিটি পাতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হোক না তা বহু বছরের আগের কথা, কথাগুলো তো আজও সত্য।

৮৬। ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ লেখক- রাহুল সাংকৃত্যায়ন। ‘ভোল্গা সে গঙ্গা’ গ্রন্থখানি ২০টি ছোটো গল্পের সমাহার। এই ছোটো ছোটো গল্প বা কাহিনীগুলো নিছক কল্পনা প্রসূত নয়, সমাজবিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ের দিকে লক্ষ্য রেখে গল্পগুলো ধারাবাহিক ভাবে রচিত হয়েছে। ইতিহাস আর সমাজবিজ্ঞান এর মূলতত্ত্বকে সর্বত্রই মেনে চলা হয়েছে। প্রায় ৬০০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে ভোলগা নদীর তীরে যে মানবগোষ্ঠী পরিবার স্থাপন করেছিলো, তাদেরই আবাস ও জীবন নিয়ে রচিত হয়েছে প্রথম গল্পটির দৃশ্যপট। ক্রমে সেই মানুষ মধ্য ভলগাতটে অগ্রসর হয়ে মধ্য এশিয়া অতিক্রম করেছিলো। উত্তর কুরু, তাজিকিস্তান পেরিয়ে একসময় সমগ্র গান্ধার এলাকা জুড়ে বসতি স্থাপন করেছিলো এই আর্যরা। ইতিহাসের এই ধারায় বিংশ শতাব্দীতে পৌছে সমাপ্ত হয়েছে গ্রন্থটির আখ্যান। এই ধারাবাহিকতা নিয়েই রচিত হয়েছে প্রতিটি গল্পের দৃশ্যপট।

৮৭। ‘নারী, সৃষ্টি ও বিজ্ঞান’ লেখক- পূরবী বসু। পূরবী বসুর দুটি পরিচয়- কথাশিল্পী এবং পুষ্টিবিজ্ঞানী। উভয়ক্ষেত্রে তাঁর পরিচিতের পরিধি সুবিস্তৃত। বিজ্ঞানজগতে পূরবী বসু একটি সম্মানিত নাম, বাংলাসাহিত্যে তাঁর কলমের খ্যাতি সর্বত্র। তাঁর প্রতিভার এই দ্বিমুখী ধারা এই গ্রন্থটির মধ্যে এক অপূর্ব মোহনায় মিশেছে- বইটি পড়ে এই মনে হয়েছে আমার।

৮৮। ‘ঈশ্বরের বাগান’ লেখক-অতীন বন্দোপাধ্যায়। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। তার জন্ম ১৯৩৪ সালে বাংলাদেশের ঢাকায়। ‘ঈশ্বরের বাগান’ উপন্যাসটিতে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্বাস্তু পরিবার, তাদের দৈনন্দিন যন্ত্রণা, চারিত্রিক বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্বময় সংঘাতের ছবি এঁকেছেন। লেখকের জাদুকরী কলমের টানে উপন্যাসটি অনন্যতার দাবি রাখে। বিদগ্ধ পাঠকমণ্ডলীর সংগ্রহশালায় এ উপন্যাস অপরিহার্য।

৮৯। ‘আয়না’ লেখক- আবুল মনসুর আহমদ। আয়না গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘হুজুর কেবলা’র শুরুটি এরকম_ এমদাদ তার সবগুলি বিলাতি ফিনফিনে ধূতি, সিল্কের জামা পোড়াইয়া ফেলিল; ফ্লেক্সের ব্রাউন রঙের পাম্পশুগুলি বাবুর্চিখানার বঁটি দিয়া কোপাইয়া ইলশা-কাটা করিল। চশমা ও রিস্টওয়াচ মাটিতে আছড়াইয়া ভাঙ্গিয়া ফেলিল; ক্ষুর স্ট্রপ, শেভিংস্টিক ও ব্রাশ অনেকখানি রাস্তা হাঁটিয়া নদীতে ফেলিয়া দিয়া আসিল; বিলাসিতার মস্তকে কঠোর পদাঘাত করিয়া পাথর বসানো সোনার আংটিটা এক অন্ধ ভিক্ষুককে দান করিয়া এবং টুথক্রীম ও টুথব্রাশ পায়খানার টবের মধ্যে ফেলিয়া দিয়া দাঁত ঘষিতে লাগিল।

৯০। ‘ত্রিপিটক’ –গৌতমবুদ্ধ। ত্রিপিটক বৌদ্ধ ধর্মীয় পালি গ্রন্থের নাম। বুদ্বের দর্শন এবং উপদেশের সংকলন। বুদ্ধের দর্শনের প্রধান অংশ হচ্ছে দুঃখের কারণ ও তা নিরসনের উপায়। বাসনা সর্ব দুঃখের মূল। বৌদ্ধমতে সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য। এটাকে নির্বাণ বলা হয়।

৯১। ‘আয়না’ লেখক- আবুল মনসুর আহমেদ। তৎকালীন সমাজের কিংবা জাতীয জীবনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে যেসব অসঙ্গিত লেখককে পীড়া দিয়েছে তাই তিনি তির্যক বাণীভঙ্গিতে লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি আয়না নামক গল্পগ্রন্থে। আবুল মনসুর আহমেদের প্রথম ব্যঙ্গ গল্প সংকলন আয়না। গল্পগুলোর রচনাকাল ১৯২২ সাল থেকে ১৯২৯ সাল অর্থাৎ বিশ শতকের বিশের দশক। গল্পগুলো প্রথম সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আয়নার উৎসর্গপত্রে আবুল কালাম শামসুদ্দীন-এর প্রতিটি উদ্ধৃতিটি ছিল এরকম: “বন্ধুরা বলেছেন, এই বইয়ে আমি সবাইকে খুব হাসিয়েছি। কিন্তু এ্ই হাসির পেছনে যে কতটা কান্না লুকানো আছে, তা তুমি যেমন জান, তেমন আর কেউ জানে না।”

৯২। ‘মুক্তচিন্তা’ লেখক- রতনতনু ঘোষ একজন প্রাবন্ধিক ও গবেষক। মুক্তমনারা বইটি খুবই পছন্দ করবেন আশা করি।

৯৩। ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ লেখক– দেবেশ রায়। তিস্তাপারের বৃত্তান্ত সমাজবাস্তবতা নির্ভর এক প্রকল্পায়ণ কথাসাহিত্য, যা পরিত্রাণহীন সত্যের দর্শন থেকে নেতিদেশ ও দৈশিকতার দর্শণয়িত পথ অভিসারী। এপিকধর্মী এই উপন্যাসের ক্রমপুষ্টিকরণ যে নির্দিষ্ট টাইম এবং স্পেস থেকে উৎসারিত, তা এক আকাশের হাঁ-মুখ থেকে নেমে আসা নদীবিস্তৃতিকে পুরায়ত জনপদের ঐকান্তিক ইতিহাস বলে দায়ী করে।

৯৪। ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’ লেখক– অবধূত। অবধূত ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক ও তন্ত্রসাধক। তাঁর প্রকৃতনাম দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। জন্ম কলকাতার ভবানীপুরে। পুত্র অমল মুখোপাধ্যায়ের জন্মের পর প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যু হলে উজ্জ্বয়িনীর মহাকাল মন্দিরে সন্ন্যাস (অবধূত) গ্রহণ করেন। অবধূত ছদ্মনামে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

৯৫। ‘বারো ঘর এক উঠোন’ লেখক– জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হয় বারো রকমের গল্পকে তিনি যেন বর্ণিত আখ্যানের মধ্যে অদৃশ্য সুতো দিয়ে জুড়ে দিয়েছেন। মনে হয় উপন্যাসের বর্ণিত আখ্যানের সর্বত্রই, তলে অবতলে গভীরে, ক্রমশই গল্পের সম্মোহনী ছায়া-প্রচ্ছয়া ঘনীভূত হচ্ছে। উপন্যাসের মধ্যে বারবার গল্পশিল্পের অতিরিক্ত এই সংক্রমণ, তার প্রভাব, তার আধিক্য, উপন্যাস রচনার কারুকৃতিকে অনেকাংশেই কিন্তু নষ্ট করে দিয়েছে।

৯৬। ‘সাদা খাম’ লেখক– মতি নন্দী। এই গ্রন্থে ধরা পড়েছে প্রতারণা ও স্বীকারোক্তির এক আশ্চর্য সংঘাত, আর্তনাদের ভেতর রূপান্তরিত মানুষের সংবেদ; যা সংশয় ও ফলশ্রুতির ভেতরে চিরকালীন জিজ্ঞাসা ফেলে রেখে, পাঠককে অনুসন্ধানী করে তোলে।

৯৭। ‘নুন চা’ লেখক– বিমল লামা। বইয়ের ফ্লাপ থেকেঃ ভৌগোলিক তরঙ্গ জমে ছিল পাহাড় হয়ে। তারই খাঁজে খাঁজে নিস্তরঙ্গ জীবনের নুনকথা। টয় ট্রেনর মতো ধারাবাঁধা নিসর্গের ভেতর দিয়ে ওঠা নামা। অপরূপ কিন্তু জীর্ণ। নিরাপদ কিন্তু অস্বাধীন। একথা বুঝতে সময় লাগেনা উরগোনের যখন লাল পতাকার পাশ দিয়ে উঠে এলো সবুজ নিশান। লাল সবুজের দ্বৈরথে তৈরি হল হলুদ শিখা। পুড়তে লাগল ঘরবাড়ি। ক্ষেত গোয়াল। স্মৃতি আর স্বপ্ন। নিসর্গের দাউ দাউ চিতা।

তবু লুকিয়ে ভালো বাসতে ছাড়ে না জুনি। জীবন বাজি রেখে ভালো বাসতে চায় উরগেনকে। জ্বলন্ত চিতার ফাঁকেই খুঁজে নিতে চায় কোনো স্নিগ্ধ কোণ। নিভৃতে শুধু ভালোবাসবে বলে। কিন্তু যেই নিভৃতের খোঁজ মেলার আগেই বুনো মোষের মতো তেড়ে আসে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে জুনিকে। তার যোনির ভেতর ঢেলে দেয় তপ্ত গরল।

কিন্তু জুনি যেন নিজেকে অভিযোজিত করতে চায় ভালোবাসার সংশ্লেষকের মতো। ভালোবাসতে চায় বহিরাগ গরলকেও। আর সেখানেই শুরু হয় তার সমান্তরাল এক লড়াই। সবার হয়ে কিন্তু একা একা।

রাজনীতির নিশানে যখন আকাশ ঢাকে, জুনি পড়ে থাকে মাটি কামড়ে, পৃথিবীর দিকে পিঠ করে, এগোতে চায় আর এক পৃথিবীর দিকে। পৃথিবীটাকে অবাক করে, হতবাক করে।

৯৮। ‘গড় শ্রীখন্ড’, ও ‘রাজনগর’ লেখক– অমিয়ভূষণ মজুমদার। অমিয়ভূষণ মজুমদারের প্রথম প্রকাশিত রচনা হল একটি নাটক। প্রথম উপন্যাস গড় শ্রীখণ্ড – ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পূর্বাশা পত্রিকায় ১৩৬০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা থেকে। গড় শ্রীখণ্ড আবহমান বাংলার উপন্যাস। ভারত স্বাধীনতার আগে-পরের সময়কালে পদ্মাপাড়ে স্থাপিত এ উপন্যাসের কাহিনী।

রাজনগর-এর কাহিনী শেষ ১৮৮৩-তে। নয়নতারাতে নয়নতারাও রাজচন্দ্রের মুহূর্তিক শারিরীক সম্পর্কের ফসল যুবক কুমারনারায়ণকে দিয়ে উপন্যাসটি শেষ করা হয়েছে। মানবমন ও সমাজের বিচিত্র অনালোকিত জগতই তাঁর আরোধ্য। বিশ্বসাহিত্যে সিরিয়াস ধারার একজন বুভুক্ষু পাঠক অমিয়ভূষণ মজুদার তাঁর মনন ও শৈলী দিয়ে সে সকল জগতকেই চিত্রায়িত করেছেন। গত পঞ্চাশ বছরের বাংলা উপন্যাসে তাঁর অমোঘ উপস্থিতি আমাদেরকে নিরন্তর প্রাগ্রসর করেছে।

৯৯। ‘ক্রান্তিকাল’ ও ‘কেয়াপাতার নৌকা’ লেখক– প্রফুল্ল রায়। ‘”ক্রান্তিকাল” বইটি পড়লে বোঝা যাবে ভারতীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্বাধীনতার আকুতি। এই উপন্যাসটি অবলম্বনে ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক শেখর দাস “ক্রান্তিকাল” নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন। যেখানে রূপা গাঙ্গুলী, সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়সহ অনেক বাঘা বাঘা অভিনেতা-অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন।

কেয়াপাতার নৌকো’র পরবর্তী খণ্ড ‘শতধারায় বয়ে যায়’ এবং তারও পরবর্তী খণ্ড ‘উত্তাল সময়ের ইতিকথা’। তিনটি উপন্যাসই আকারে মহাকাব্যিক। অসামান্য ক্ষমতাসম্পন্ন এইঔপন্যাসিক সারা জীবন জুড়ে পুরস্কারও পেয়েছেন প্রচুর।

এই লেখকের আরেকটি বইয়ের কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। তারই রচিত আরো একটি বই ঈশ্বরপুত্র। এই বইটির ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে মাইকেল সমরেশ দত্ত নামের এক বিপত্নীক মানুষকে ঘিরে। মাইকেল সমরেশ দত্ত আদর্শহীন মানুষদের মধ্যে বিরলতম চরিত্র। বহুজন হিতায় নিজেকে সপে দিয়েছে সে। বহু দুঃস্থ, সম্বলহীনের পরম আশ্রয় সে। নারী পাচার চক্রের কবল থেকে একটি সরল গ্রাম্য যুবতীকে বাচাতে গিয়ে কোন মূল্য দিতে হয় তাকে তাই নিয়ে এই আশ্চর্য আখ্যান ঈশ্বরপুত্র।

১০০। ‘মহাস্থবির জাতক’ লেখক– প্রেমাঙ্কুর আতর্থী। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর জন্ম ১৮৯০ সালে। ‘মহাস্থবির জাতক’-এর প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় ‘মহাস্থবির’ (প্রেমাঙ্কুর আতর্থী) লিখেছিলেন: “মানুষের জীবনের কাহিনীই সব-চাইতে বিচিত্র উপন্যাস – উপন্যাসের ঘটনা ও চরিত্রের জন্য আশা করি কারও কাছে কোনও জবাবাদিহিতে পড়তে হবে না”। চার-খণ্ডের সম্পূর্ণ বইটি লিখে ও বলে শেষ করতে ওঁর লেগেছিল কুড়ি বছর। চতুর্থ খণ্ড প্রকাশিত হয় প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মৃত্যুর পরে। এই খণ্ডটি লেখার সময়ে তিনি প্রায় দশ বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। কবি উমা দেবীকে মুখে মুখে বলতেন, আর তিনি সেগুলো লিপিবদ্ধ করতেন। চতুর্থ পর্ব-এর নিবেদনে উমা দেবী লিখেছিলেন: “মহাস্থবির জাতকের প্রথম পর্ব যখন লেখা হচ্ছিল, তখন একদিন কথা প্রসঙ্গে (প্রেমাঙ্কুর আতর্থী) বলেছিলেন, যে, পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত সময়ের কথাই তিনি লিপিবদ্ধ করবেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি সে ইচ্ছে ত্যাগ করেন।”

লেখক পরিচিতি

রাজীব নূর খান
গল্পকার। গবেষক। ফটোগ্রাফার।

10 thoughts on “নির্বাচিত ১০০ টি বই

  • April 14, 2015 at 12:18 am
    Permalink

    লেখক, আপনার এ পোষ্টে কয়েক জন লেখকের নামের বানান ভুল আছে। দয়া করে ঠিক করে নিবেন বা দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঠিক করে দেবেন।

    Reply
  • May 11, 2015 at 5:04 am
    Permalink

    ১০০ বইয়ের তালিকায় সুমন্ত আসলামের তবুও একদিন! কী কৌতুক! দুই বাংলা মিলে ১০০ কেন, ৩০০ বইয়ের তালিকাতেও থাকার যোগ্যতা রাখে না হুমায়ুন আহমেদের তিনটি বই। উনি বইয়ের মান নয়, লেখকের রাশভারী নাম এবং জনপ্রিয়তা দেখে তালিকা করেছেন। এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত একটি তালিকা। গল্পপাঠে প্রকাশের যোগ্য অবশ্যই নয়! হ্যাঁ গল্পপাঠ কী বলতে চেয়েছে সেটাও আমি পড়েছি। সেক্ষেত্রে ১০০ ভেতরে আটকে না রেখে, গল্পপাঠ নিজেই মাঝ মাঝে বইেয়র তালিকা দিলে পারে। এ ধরণের তালিকা দেখলে একদম উঠতি পাঠকের ধারণা জন্মে যাবে যে এগুলোই বাংলা সাহিত্যের সেরা একশো বই!!!

    Reply
  • March 19, 2016 at 3:39 am
    Permalink

    আপনার বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে জ্ঞান আর বিচক্ষণ অবলোকনগুলি পড়ে খুবি মুগ্ধ হলাম।
    আপনার তালিকার যেই বইগুলি আমি পড়েছি, সেই বইগুলির পাঠের অভিজ্ঞতার সাথে আপনার
    সারাংশের বর্ণায় সাদৃশ্য খুঁজে পেয়ে পাঠক হিসেবে বেশ আনন্দিত হয়েছি, আপনার বিবরণগুলি এতটাই যথার্থ যে সেই বইগুলির নানান মুহূর্ত মনে করিয়ে দেয়।
    সাথে সাথে না-পড়া বইগুলি-র প্রতিও আগ্রহ জন্ম দিয়েছেন।
    আপনার এই তালিকাটি পড়ে বহু পাঠক উপকৃত হবে। আমার অনুরোধ, এইরকম লেখার আরো অনুদান করুন।
    – Suddhasattwa, iamsuddhasattwa@gmail.com

    Reply
  • August 19, 2016 at 4:28 pm
    Permalink

    চাণক্য সেনের পুত্র পিতাকে খুবই উঁচুদরের একটি উপন্যাস। তবে মনে হয় অল্প পঠিত।
    যাঁরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময়, পূর্বপশ্চিম এবং প্রথম আলো পড়েছেন তাঁদের বলছি ওনার লেখা একা এবং কয়েকজন উপন্যাসটিও পড়বেন। প্রাক স্বাধীনতা থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের একটি দলিল।
    নবকুমার বসুর চিরসখা অতি উঁচুদরের উপন্যাস। এছাড়া তিলোত্তমা মজুমদারের রাজপাট অবশ্যই পড়তে হবে। আমার আরো কিছু পছন্দের উপন্যাস / বই নিচে দিলাম যেগুলো মনে হয় পড়া উচিত:
    সাহেব বিবি গোলাম – বিমল মিত্র
    অমৃতকুম্ভের সন্ধানে – কালকূট
    ধাত্রীদেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    মরুতীর্থ হিংলাজ – অবধূত
    গভীর নির্জন পথে – সুধীর চক্রবর্তী (বাউল ফকির দের নিয়ে লেখা সংকলন)
    দারোগার দপ্তর – প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (কিছু সত্যি ও কিছু কল্পিত আধাকল্পিত পুলিশ কাহিনী। অবশ্যই সংগ্রহ যোগ্য)
    ব্যোমকেশ সমগ্র – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    ঘনাদা সমগ্র – প্রেমেন্দ্র মিত্র
    শেষ দেখা হয়নি – নীললোহিত
    শিবরাম রচনা সমগ্র – শিবরাম চক্রবর্তী
    বাঙালনামা – তপন রায়চৌধুরী (স্মৃতিকথা)
    অদ্ভুতুড়ে সিরিজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    Reply
  • February 21, 2018 at 4:38 pm
    Permalink

    "প্রদোষে প্রকৃতজন" নামের উপন্যাসটি আমারও ভাল লেগেছিল।।
    কিন্তু শরৎ বাবুর কোন বই তালিকায় নেই কেন?অসাধারন কয়টি বই আছে তার। অথচ জাফর ইকবাল, শাহরিয়ার কবিরদ মত অখ্যাত নাম এখানে

    Reply
  • May 16, 2018 at 11:28 am
    Permalink

    এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    Reply
  • May 16, 2018 at 11:32 am
    Permalink

    এমন কোন বই আছে যাতে সকল সাহিত্যিকের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম আছে,?

    Reply
  • May 21, 2018 at 5:44 pm
    Permalink

    ভাল লাগলো এই তালিকাকৃত অনেকাংশ বই আমার পড়া আছে… আপনাকে ধন্যবাদ আরো কিছু বইয়ের নাম যানতে পেরে

    Reply
  • September 19, 2018 at 9:20 am
    Permalink

    ভালো উদ্যোগ। যে কোনো তালিকাই ব্যক্তিগত তালিকা। একজন পাঠকের ভালোলাগার তালিকা।

    আশ্চর্য হই, যখন সেই তালিকা দেখে কেউ প্রশ্ন করে, অমুক নাই তমুক কেন? এই করে আপনার নিজের মুখের স্বাদ অন্যের মুখে জবরদস্তি চালানোর চেষ্টা করছেন, তাই না?

    বই পড়ি আমরা নিজের সহজাত জবরদস্তিভাবটা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টায়। চিন্তার বিস্তৃতি ঘটানোর জন্যে। কোনো পাঠকই তার নিজের পছন্দের বইয়ের জন্যে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। বই পড়েও মূর্খতা না কমলে, বই পড়ে লাভ কী ভাই?

    চাইলে, আপনি নিজের পছন্দ বলুন। আমরা পাঠকরা সম্ভব হলে, সেগুলোও পড়বো।

    রাজীব নূর খানকে অনেক ধন্যবাদ, তালিকার সাথে অতি সংক্ষিপ্ত বই পরিচিতির জন্যে।

    Reply
  • February 15, 2022 at 12:39 pm
    Permalink

    ~
    অনুসর্গ – বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষায় আবহমান বাঙলা ও বাঙালির শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা। যা মানুষের মননে-মগজে স্বাধীন চেতনার স্বাদ পৌঁছে দিয়ে পারস্পরিক আত্মিক সম্পর্ককে ঋদ্ধ করে চলে…

    অনুসর্গ'র ওয়েবপেইজটি ভিজিট করুন https://anusargo.com

    শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ অনলাইন মাধ্যম।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *